রক্তাক্ত কাশ্মীর স্বাধীনতাই একমাত্র সমাধান – ড. মুহাম্মদ রেজাউল করিম

রক্তাক্ত কাশ্মীর স্বাধীনতাই একমাত্র সমাধান - ড. মুহাম্মদ রেজাউল করিমপৃথিবীর ভূস্বর্গ হিসেবে পরিচিত কাশ্মীর। অনেক সভ্যতার মিলনস্থল। পারস্য, মধ্য-এশিয়া, চীন ও ভারতীয় সভ্যতার মিলন হয়েছে কাশ্মীরে। ঐতিহাসিকদের দৃষ্টিতে প্রতিটি সভ্যতাই যেন পর্বতবেষ্টিত কাশ্মীর উপত্যকার সীমানায় এসে থমকে গেছে। কেউ এসে এককভাবে একে দখল করতে পারেনি। কাশ্মীর শীতল ও নিরিবিলি হওয়ায় ধ্যান-জ্ঞান সাধনায় এলাকাটি বেশ উপযোগী। ফলে কাশ্মীর ছিল জ্ঞানের কেন্দ্র। ভারতীয় সভ্যতার অগণিত তথ্য ও উপাখ্যান লিখিত ও ব্যাখ্যাত হয়েছে কাশ্মীর থেকে। যুগান্তকারী সব জ্ঞানের বিকাশ হয়েছে এই জনপদে। বৈদিক যুগের পাঞ্জাবের তক্ষশীলা বিদ্যাকেন্দ্র ব্যাপকভাবে প্রভাবিত ছিল কাশ্মীরের জ্ঞান দ্বারা। বিখ্যাত ব্যাকরণবিদ পানিনির ব্যাকরণের ব্যাখ্যা ‘মহাভাষ্য’ লিখেছিলেন যিনি তার নাম পাতাঞ্জলি। তিনি ছিলেন কাশ্মীরী। খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকেই এমন অসংখ্য জ্ঞান সাধকের উপস্থিতি পাওয়া যায় এখানে।
বৈজ্ঞানিক ধারণা, পৃথিবীর বয়স ৪.৬ বিলিয়ন বছর। আর ৩০ বিলিয়ন বছর আগে হিমালয় পর্বতমালা সৃষ্টি হয়েছে। ইতিহাসবিদরা বলেন, এখানে মানববসতি শুরু হয় খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০০ বছর আগে। অর্থাৎ, এখন থেকে পাঁচ হাজার বছর আগে। সম্ভবত, নূহের (আ) মহাপ্লাবনের কাছাকাছি সময়ে। প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, প্যালিওলিথিক, নিওলিথিক ও মেগালিথিক সকল যুগের প্রত্ননিদর্শনের সন্ধান মিলেছে কাশ্মীর ভূখণ্ডে।
কাশ্মীরের শ্রীনগর পাঁচ হাজার বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী রাজধানী। ঐতিহাসিক ঝিলাম নদী শহরের বুক চিরে বয়ে গেছে। পাশেই সুবিশাল ডাল লেক। দক্ষিণ থেকে উত্তরের অগণন প্রত্ননিদর্শন রয়েছে এখানে। মোগলদের প্রকৃতি আর প্রকৌশলের মিশেলে গড়ে তোলা বাগান-বিলাস। চারপাশে পর্বতের সারি, মধ্যে সমতল ভূমিতে মানুষের বসবাস। ওয়াল্টার আর, লরেঞ্জের বর্ণনায় কাশ্মীর হলো, ‘কালো পর্বতমালার মধ্যে একখণ্ড জমিন সাদা পায়ের ছাপের মতো। কাশ্মীরের মুসলিম ইতিহাস কৃষি, বাণিজ্য, শিক্ষা, ভাষা, সংস্কৃতি ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে প্রভূত উন্নতি সাধন করেছে। তাই মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের আকুল আকাঙ্ক্ষা ছিল কাশ্মীরের তৃণভূমিতে মৃত্যুবরণ করার। তিনি ফার্সি ভাষায় বলেছিলেন, ‘আগার ফেরদৌস বেরোহি যামিন- হামিন আস্ত, হামিন আস্ত, হামিন আস্ত- যদি পৃথিবীতে কোন বেহেশত থেকে থাকে তাহলে তা এখানে, এখানে, এখানে।’
অপরূপ মহিমায় ভাস্বর মনোমুগ্ধকর এই জনপদে প্রায় দেড় কোটি মানুষের বসবাস। কিন্তু ৭২ বছর ধরে আধিপত্যবাদী শক্তির নখরে রক্তাক্ত ক্ষতবিক্ষত। এনসাইক্লোপিডিয়া অব ব্রিটানিকাতে কাশ্মীর শব্দটি প্রাচীন কাশ্যপনগর এর পরিবর্তিত রূপ। এটি অনেক প্রাচীন ও ঐতিহাসিক স্থান। ‘কাশ্মীরে ইসলামের আগমন কোনো রাজার শোষণ বা দখল করার মাধ্যমে হয়নি। বরং পীর ও সাধকদের হাত ধরে ইসলাম এসেছিল ও বিকশিত হয়েছিল। ভালোবাসা, ভ্রাতৃত্ব আর সাম্যের বার্তা নিয়ে ক্রমান্বয়ে জনসংখ্যার সংখ্যাধিক্য অর্জন করেছিল। কাশ্মীরে ইসলামের ভিত্তি গড়ে তোলাটা চতুর্দশ শতকে হলেও মুসলমানদের আনাগোনা বহু পুরনো। অধ্যাপক ফিদা এম হাসনাইন লিখেছেন, ‘৬২৮ সালে ইসলামের নবী মুহাম্মদ সা. তার দূত পাঠাচ্ছিলেন বিভিন্ন সম্রাটের কাছে। ৬৩০ সালে তিনি এশিয়ার বিভিন্ন রাজার কাছে দূত পাঠান। আবু হুযাইফা ইয়ামান (রা)কে দিয়ে একটি পত্র পাঠানো হয়েছিল চীনে। ওই আরব দূত সিল্করুট হয়ে চীনের দিকে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে তীব্র তুষারপাতের কারণে তিনি কাশ্মীরে আটকা পড়েন। আরব ওই দূতকে সাদরে অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন কাশ্মীরের রাজা ভীনাদিত্য। এমনকি তিনি আবু হুযাইফা ইয়ামানকে ‘জলকার’ উপাধি দেন। পরের বছর নবী সা. দু’জন দূত পাঠান কাশ্মীরের রাজার কাছে। সঙ্গে দেন কিছু উপহার। এর মাধ্যমে ইসলাম কাশ্মীরে আসে সপ্তম শতকেই। সরাসরি আরব থেকেই আসে।
জম্মু-কাশ্মীর দীর্ঘদিন হিন্দু এবং মুসলিম সুলতানদের দ্বারা শাসিত হয়েছে। স¤্রাট আকবরের সময়ে তার রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৭৫৬ সাল থেকে আফগান শাসকদের অধীনে থাকার পর ১৮১৯ সালে শিখ রাজ্য পাঞ্জাবের সাথে সংযুক্ত হয়। ১৮৪৬ সালে ব্রিটিশ ও শিখদের মধ্যে ঐতিহাসিক সাবরুন যুদ্ধে শিখরা পরাজিত হলে পর অমৃতসর চুক্তি (Treaty of Amritsar) অনুযায়ী কাশ্মীর ভূখণ্ড ইংরেজরা গুলাব সিংয়ের কাছে মাত্র ৭.৫ মিলিয়ন নানকশাহি রুপির বিনিময়ে বিক্রি করে। হতভাগা কাশ্মীরীদের এই কেনাবেচাকে ১৯৪৭ সালে মহাত্মা গান্ধী ‘ডিড অব সেল’ হিসাবে আখ্যায়িত করেছিলেন। বিখ্যাত কবি আল্লামা ইকবালও কাশ্মীরকে উপমিত করেছিলেন ‘বিক্রীত জাতি’ হিসাবে। তার কবিতায় বলেন, ‘হায়! ফসলের মাঠ, পানির ছড়া, উপত্যকার কৃষকদেরও ওরা বেচে দিল! বেচতে বাদ রাখেনি কিছুই’। এ নিয়ে হাফিজ জালান্দারি তার বিখ্যাত উর্দু কবিতার শিরোনাম দিয়েছিলেন ’৭৫ লাখ কা সওদা’। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ১৮৪৬ সালে কাশ্মীরকে বিক্রির ঘটনা কোন জাতির বিক্রি হওয়ার সর্বাধিক আলোচিত বিষয়। ১৭০ বছর পরও ৭৫ লাখ রুপির এই ক্রয় চুক্তি এখনও কাশ্মীর জাতিসত্তার সমস্যার মূল হিসেবে সামনে আসছে।
১৯৪৭ সালে ভারত, পাকিস্তান ভাগের সময় কাশ্মীরের তৎকালীন রাজা হরি সিং হিন্দু হলেও তার প্রজারা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ায় তার পক্ষে ভারত অথবা পাকিস্তান কোনো একটিতে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। ১৯৪৭ সালের অক্টোবর মাসে একদল মুসলিম পাকিস্তানে যাওয়ার চেষ্টা করলে পাকিস্তান তাদেরকে গ্রহণ করতে কাশ্মীরে প্রবেশ করে। ফলে রাজা হরি সিং ভারতে পালিয়ে গিয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের কাছে সামরিক সহায়তা চায়। সে ভারতকে কাশ্মীরে প্রবেশের অনুমতি দিয়ে ২৬ অক্টোবর একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। যদিও এর সত্যা-সত্যি প্রমাণে রয়েছে অনেক প্রশ্ন। ১৯৪৭-১৯৪৮ সাল পর্যন্ত ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে প্রথম যুদ্ধ হয়। পরবর্তীতে ১৯৪৮ সালের ১৩ আগস্ট তারিখে জাতিসংঘ পাকিস্তানকে তাদের সৈন্য প্রত্যাহার করে নেয়ার নির্দেশ দেয়। ফলে ভারতও সৈন্য প্রত্যাহার করে নেয়। কাশ্মীর শত শত বছর ধরেই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ। ১৯৪১ সালো আদমশুমারি অনুযায়ী জম্মু-কাশ্মীরে মুসলিম ছিল ৭৫.৯৭ শতাংশ। আর সবচেয়ে জনবহুল কাশ্মীর উপত্যকায় এ হার ৯৫ শতাংশ। জম্মু-কাশ্মীর পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার, নইলে স্বাধীন হওয়ার কথা। কিন্তু চক্রান্ত তা হতে দেয়নি।
রক্তাক্ত কাশ্মীর স্বাধীনতাই একমাত্র সমাধান - ড. মুহাম্মদ রেজাউল করিমপাকিস্তান ও ভারত জন্ম হওয়ার আগে ২০০ বছর কাশ্মীর ভারতীয় উপমহাদেশ (Indian Sub-continent) একটি সমৃদ্ধ অঞ্চল ছিল। ব্রিটিশ রয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন এর পরিকল্পনা অনুযায়ী ভারত ও পাকিস্তান নামে দু’টি দেশের বিবাদের বিষয় (Apple of discord) বানিয়ে রেখে যায় কাশ্মীর রাজ্যকে। অথচ কাশ্মীর যা বর্তমান বিশ্বের অনেক স্বাধীন রাষ্ট্রের চেয়েও বেশি সমৃদ্ধ ও বিস্তৃত। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা (৯৩% মুসলিম)। ভাষা-সংস্কৃতিতে পাকিস্তানের সাথে সাদৃশ্য থাকায় পাকিস্তানের অংশ না বানিয়ে, লর্ড এর কূটকৌশলের কারণে কাশ্মীরকে দু’ভাগ ও পরবর্তীতে তিন ভাগ হয়ে যেতে হয়। কাশ্মীর দীর্ঘদিনের আজাদি ও স্বায়ত্তশাসনের দাবির মুখে ১৯৯০ সালে ভারতীয় সংবিধানে ৩৭০ নং ধারায় কাশ্মীরের জন্য আলাদা সংবিধান, পতাকা প্রভৃতি অনুমোদন করে।
কাশ্মীর সমস্যার সমাধান গণভোটের মাধ্যমেই সম্ভব। ‘গণতান্ত্রিক’ রাষ্ট্রের দাবিদার ভারত কখনই গণভোটে আগ্রহী নয়। কারণ, ভারত ভালো করে জানে কাশ্মীরের মুসলিমরা অধীন মানতে চায় না। ভারত স্বায়ত্তশাসনের ৩৭০ সাংবিধানিক ধারা বাতিল করে অধিকার হরণ করছে। লঙ্ঘন করছে সংবিধান। খুলে দিয়েছে অবাধ অসভ্য, উচ্ছৃঙ্খলদের অনুপ্রবেশের দুয়ার। মুদি সরকার বাস্তবায়ন করছে সংখ্যাগুরু কাশ্মীরী মুসলিমদের সংখ্যালঘুতে পর্যবসিত করার নীলনকশা।
কিন্তু ভারতের অধীনতা থেকে পূর্ণ স্বাধীনতার দাবিতে আন্দোলন চলছে। এসব আন্দোলনের অজুহাত দিয়ে ভারতীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাশ্মীরী বহু যুবককে তুলে নিয়ে কারাবাসে দিয়েছে। কাউকে বিচারিক কায়দায় হত্যা করেছে। কাউকে হত্যা করা হয়েছে বিচারবহির্ভূতভাবে। এসব ঘটনা বিশ্বমিডিয়ায় প্রকাশ পেয়েছে বহুবার। কিন্তু এবার ঘটলো সম্পূর্ণ অযাচিত ঘটনা। যে সম্বন্ধে বিশ্ববাসীর কোনো ধারণাই ছিলো না। সর্বশেষ গত ৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতির বিশেষ অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ও ৩৫এ ধারা বাতিলের মাধ্যমে এবার কাশ্মীরকে পরিচয়হীন বানিয়ে দিলো ভারত। সংসদের নিম্নকক্ষের সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ যখন বিশেষ অধ্যাদেশ পড়ে শোনাচ্ছিলেন তখনো ১২ মিলিয়ন কাশ্মীরবাসী সহ সারাবিশ্ব জানে না কী থেকে কী হয়ে গেলো!। একটি ঘোষণা একটি স্বাধীন জাতির ললাটে একে দিল অবর্ণনীয়, নির্যাতন আর একটি অমানিশার কালো ঘোর অন্ধকার।
নয়াদিল্লির এই সিদ্ধান্তের ভারতের অভ্যন্তরে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। সংসদে বিরোধীদলীয় সদস্যদেরকে প্রতিবাদ করতে দেখা যায়। ভারতের দিল্লি, কলকাতা ও হায়দারাবাদসহ বিভিন্ন জায়গায় জনগণ প্রতিবাদী মিছিল করে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এখনো বিক্ষোভ প্রতিবাদ অব্যাহত। অধ্যাদেশ জারির আগে মোদি সরকার সকল প্রকারের প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবেলার সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিয়ে রাখে। ৪ আগস্ট তারিখ রাত হতে কাশ্মীরে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। কয়েক দফায় ২০ হাজারের অধিক নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়। বন্ধ করা হয় ইন্টারনেট, টেলিফোন, মোবাইল সংযোগ এমনকি ডাক বিভাগও। সারাবিশ্ব থেকে কাশ্মীর উপত্যকাকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়। রাজ্যের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী, রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবশালী নেতৃবৃন্দকে গৃহবন্দিত্ব থেকে গ্রেফতার করা হয়। যোগাযোগের সকল মাধ্যম বিচ্ছিন্ন থাকায় কাশ্মীরের হালনাগাদ খবর বিশ্ব গণমাধ্যমে আসতে পারছে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে আগামী পৃথিবীর যুদ্ধ হবে পানিকে কেন্দ্র করে। কাশ্মীরে রয়েছে প্রকাণ্ড সব হিমবাহ। হিমালয় থেকে নেমে আসা ঝিলম, চেনাব, সাটলেজ, রাঙি, বিয়াস, সিন্ধু প্রভৃতি নদ-নদী ভারতের এক বিলিয়ন মানুষকে পানি এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। আবার পাকিস্তানের কৃষিও প্রধানত এই অঞ্চল থেকে প্রবাহিত পানির ওপর নির্ভরশীল। সুতরাং পানিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে ভারত মরিয়া। কেন্দ্রীয় জলশক্তিমন্ত্রী গজেন্দ্র সিং জানিয়েছেন, ভারতীয় নদ-নদীর পানি পাকিস্তানে যাওয়া বন্ধ করতে তিনি কাজ শুরু করেছেন।
‘হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রগঠনে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ’ (আরএসএস) এখন প্রায় উন্মুক্ত হিংস্র সিংহের মত। তারা মূলত ভারতের হিন্দু সাম্প্রদায়িক জঙ্গি সংগঠন। মুসলিমদের হত্যা ও উচ্ছেদ করা আরএসএসের অন্যতম প্রধান কর্মসূচি। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রধান নেতা ছিলেন গান্ধিজী। স্বাধীনতার চার মাসের মাথায় আরএসএস সদস্য নাথুরাম গডসে তাকে গুলি করে হত্যা করে। হত্যার কারণ সে আদালতে জবানবন্দীতে বলে গেছে। তার ভাষায়, ‘মুসলিমরা এক হাজার বছর ভারত শাসনের নামে হিন্দুদের ওপর অত্যাচার করে গেছে। অখণ্ড ভারত স্বাধীন হলে এসব অত্যাচারের শোধ নেয়া যেত। কিন্তু গান্ধী মুসলিমদের জন্য আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্রের সুযোগ দিয়ে ভারতকে খণ্ডিত করেছেন।’ এমনই কট্টর সাম্প্রদায়িক ও সন্ত্রাসবাদী মতাদর্শের জন্য ইংরেজ আমলে আরএসএস নিষিদ্ধ ছিল। পরে গান্ধী হত্যা ও বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পরও একে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়। আরএসএসের দৃষ্টিতে নাথুরাম ‘বিরাট বীর’। মধ্যপ্রদেশে মহাত্মা গান্ধীর এই স্বীকৃত খুনির নামে এখন মন্দির নির্মিত হচ্ছে।
তা ছাড়া প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং। তিনজনেরই চোখ এখন কাশ্মীরে। সরকারের প্রধান তিন কর্তাই আরএসএসের সদস্য ছিলেন। অমিত শাহ সম্প্রতি সংসদে বলেছেন, পাক-অধিকৃত আজাদ কাশ্মীরের জন্য তিনি প্রাণ দিয়ে দেবেন। রাজনাথ সিং বলেছেন, পাকিস্তানের সাথে কোনো আলোচনা যদি হতে হয়, তা হবে আজাদ কাশ্মীর নিয়ে। জম্মু-কাশ্মীর নিয়ে তাদের সাথে আমাদের কিসের কথা? এ ছাড়া প্রতিরক্ষামন্ত্রী আগে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার না করার নীতি থেকেও ভারতের সরে আসার ইঙ্গিত দিয়েছেন। তাহলে কি কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে পারমাণবিক যুদ্ধ অত্যাসন্ন? ভারত শক্তি দিয়ে কাশ্মীরীদের দমন করতে পারবে?
মজলুম বনি আদমের কান্নার আওয়াজ আরশ পর্যন্ত প্রসারিত হলেও পৃথিবীর বধির, অন্ধ, ক্ষমতা স্বার্থলিপ্সু অ-মানুষদের হৃদয় যেন নাড়া দিতে পারছে না। নির্যাতিত নারীর ক্রন্দন, বঞ্চিত, ক্ষুধার্ত অবুঝ শিশুর করুণ চাহনি ভাবিয়ে তুলছে। কত হিংস্র, জঘন্য, বর্বর আর অসভ্যতা বিশ্ববাসী দেখছে। কাশ্মীর এখন জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ড। গত কয়েকদিনে প্রায় লক্ষাধিক নর-নারী-শিশু নিহত নাকি এ হিসাব এরও বেশি? প্রতিনিয়ত গুম হচ্ছে হাজারো স্বাধীনতাকামী যুবক যোদ্ধারা। পাশবিক নিগ্রহের শিকার মায়ের জাতি নারী। নতুন প্রজন্মকে ধ্বংস করতে শিশুদের উপর চলছে অমানবিক নির্যাতন। হিন্দুত্ববাদী আরএসএস এর উত্তরসূরিরা জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করছে বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, স্কুল, মক্তব ও মসজিদ। জাতি ধ্বংসের এক উন্মুক্ত নেশায় মত্ত মোদি সরকারের রক্ত পিপাসুর দল। মানবতাবিধংসী জাতির নিধনের জঘন্যতম ঘটনা সম্প্রতি মিয়ানমারে প্রত্যক্ষ করেছে সারা বিশ্ব। রোঙ্গিরারা আজ নিজেদের ভিটে-মাটি থেকে বিতাড়িত হয়ে খোলা আকাশের নিচে ধুঁকে ধুুঁকে মরছে। কারণ তারা মুসলমান!।
কাশ্মীরীরাও অধিকাংশ মুসলমানমান। তাই তাদের জন্য আইন, মানবিকতা, অধিকার সবই যেন তুচ্ছ! মুসলমান না হলে এত দিনে সারা দুনিয়ায় হইচই পড়ে যেত। জাতিসংঘ, মানবাধিকার সংগঠন আর বিশ্ব মোড়লেরা থাকত সোচ্চার এবং সক্রিয়। কিন্তু মুসলমান! বলেই কি বিশ্ব মোড়লরা নিশ্চুপ!। তা ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম শাসকরাতো ক্ষমতায় টিকে থাকতে নিজেদের বিবেক বন্ধক রেখেছে পশ্চিমা প্রভুদের কাছে। মুসলমানদের নানাবিধ সংকট, আর বিভেদ তৈরি করে নিয়ন্ত্রণ করছে। আজ মুসলিম উম্মাহর নেই কোন কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। ফলে দিশেহারা ১৭০ কোটি মুসলমান জুলুম-নির্যাতন, লাঞ্ছনা বঞ্চনার শিকার হচ্ছে প্রতিনিয়ত। এ কথা আজ দিবালোকের মতো পরিষ্কার ভারত ১৯৭১ সালে নিজের স্বার্থেই বাংলাদেশের জনগণকে সহযোগিতা করেছিলো। আবার নিজেদের স্বার্থেই কাশ্মীরের স্বাধীনতাকামীদের দমন করছে।
বাংলাদেশ ৯০ ভাগ মুসলমানের দেশ। সে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বললেন, ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ বাধলে বাংলাদেশ ভারতের পক্ষে থাকবে। দুর্ভাগ্যজনক ও বোকামিসুলভ বক্তব্য কি দরকার ছিলো? কারণ আরেক পরাশক্তি চীন পাকিস্তানের আয়রন ফ্রেন্ড বলে পরিচিত। এ যুদ্ধে পাকিস্তানের মিত্র। সুতরাং বিনা ভোটের সরকার আগেভাগে অতিমাত্রার নতজানুতাকে দেশের জনগণ ভালো চোখে দেখনি। ভারতের উগ্রপন্থী নেতারা প্রতিদিন বাংলাদেশে জমিদখল, ভারতের শাসন জারি, হিন্দুদের পক্ষে হুঙ্কার দিয়ে আসছে। জনগণের সমর্থনহীন সরকার তার প্রতিবাদটুকু পর্যন্ত করছে না। প্রিয়া শাহাদের ঔদ্ধত্যপূর্ণ মিথ্যাচারেও সরকার নীরব। এখন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে এদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের অস্তিত্ব নিয়ে!
শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৬ থেকে ১৯৬৮ কালপর্বের কারাস্মৃতি নিয়ে গ্রন্থ ‘কারাগারের রোজনামচা’তে লিখেছিলেন, ‘গণতন্ত্রে বিশ্বাসী ভারত, গণতন্ত্রের পথে যেতে রাজি হয় না কেন? কারণ তারা জানে গণভোটের মাধ্যমে কাশ্মীরের জনগণের মতামত নিলে ভারতের পক্ষে কাশ্মীরের লোক ভোট দেবে না। তাই জুলুম করেই দখল রাখতে হবে।’ কাশ্মীরে শান্তি না আসার জন্য প্রায় ছয় দশক আগে ভারতের ‘একগুঁয়েমিকেই’ দায়ী করেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। আজকে ‘সুসম্পর্কের’ আবহে থাকা তার দল আওয়ামী লীগ এবং তার কন্যা শেখ হাসিনার সরকার যখন ইস্যুটিকে ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে দেখছে। (উৎস: সাউথ এশিয়ান মনিটর)
‘কাশ্মীরে চলমান জুলুম-নির্যাতন বন্ধ, স্বায়ত্তশাসন ফিরিয়ে দেয়া এবং উপত্যকাজুড়ে স্বাভাবিক অবস্থা বজায় রাখার দাবিতে আন্দোলন করে যাচ্ছেন বাংলাদেশের রাজনীতিক, ছাত্র ও সাধারণ মানুষ। ৯ আগস্ট র‌্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ বলেন, ‘কাশ্মীর ইস্যু ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়। আশা করব ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়টি নিয়ে কেউ দেশে পানি ঘোলা করার চেষ্টা করবেন না।’ সব হুমকি এড়িয়ে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে কাশ্মীর সলিডারিটি কাউন্সিলের ব্যানারে বিক্ষোভ করে কয়েকটি ইসলামী রাজনৈতিক দল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শিক্ষক কেন্দ্রের (টিএসসি) সঞ্জীব চত্বরে আয়োজন হয় ‘আযাদীর জন্য সিনেমা’ শিরোনামের অনুষ্ঠান। চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর এ অনুষ্ঠানে কাশ্মীরীদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সহসভাপতি (ভিপি) নুরুল হক নুরসহ লেখক, গবেষক ও বিভিন্ন বাম সংগঠনের নেতারা বক্তৃতা করেন।
৫ আগস্ট সন্ধ্যার পরপর খবর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সবার আগে রাতের নীরবতা ভাঙেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এক তরুণ লিখেছেন- যে কারণে আশা হারাতে হয় না। এই তরুণ-তরুণীদের শুধু সংখ্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এখানেই আশার বসত। ওরা একদিন বহু গুণ হবে।
কাশ্মীরের রাজনৈতিক নেতাকে গ্রেফতারে সরকারের অজুহাতের সমালোচনা করে ভারতীয় নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বলেছেন, ‘এটি পুরনো ঔপনিবেশিক অজুহাত। ব্রিটিশরা এভাবেই ২০০ বছর ধরে দেশ চালিয়েছিল’। ভারতীয় নাগরিক হিসেবে তিনি আর ‘গর্বিত নন’ বলেও জানিয়েছেন। আর দেশটির বিরোধী দল কংগ্রেসের প্রশ্ন- মোদি সরকার কাশ্মীরে কী গোপন করতে চাইছে? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন সমস্যার সমাধান হলো না। বরং এটাকে বলা যায় ‘কাশ্মীর রক্ষায় মোদির শেষ চেষ্টা’। বিশ্ববিদ্যালয়টির আরেক অধ্যাপক ড. এম শাহীদুজ্জামান বলেন, ৩৭০ অনুচ্ছেদ বিলুপ্তির মাধ্যমে একটি বড় ধরনের ফাটল তৈরি করা হলো। যা ভারতের ইতিহাস ও সংবিধানকে প্রশ্নের মুখে এনে দাঁড় করিয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, এমনিতে স্বায়ত্তশাসন থাকলেও তার সুফল থেকে বঞ্চিত ছিল কাশ্মীরীরা। তাদের মানবাধিকার ছিল না, শিক্ষা ছিল না, স্বাস্থ্যসেবা ছিল না। এবার তা আরও স্পষ্ট হয়ে গেল। আর পুরো উপমহাদেশকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে মোদি সরকার।
দুনিয়ার মুসলিম দেশগুলোর বিশেষ করে আরব দেশগুলোর শাসকদের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ! কাশ্মীরের ঘটনাবলিতে মধ্যপ্রাচ্যে আনন্দের জোয়ার বইছে যেন। আরব আমিরাত মোদিকে দিয়েছে সর্বোচ্চ বেসামরিক পদক ‘অর্ডার অব জায়েদ’। বাহরাইন দিয়েছে ‘কিং হামাদ অর্ডার’। এসবই লজ্জার! তার্কি, মালয়েশিয়া, ইরানসহ কয়েকটি দেশ কাশ্মীরের জনগণের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। বাংলাদেশের জনগণও কাশ্মীরের জনগণের পক্ষে। এখন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা, চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও আমেরিকার মতো পরাশক্তিগুলো যদি জাতিসঙ্ঘের মধ্যস্থতায় কাশ্মীরের স্বাধীনতার দাবি মেনে নিতে ভারতকে বাধ্য করে, তাহলেই শুধু মুক্ত ও স্বাধীন হতে পারে কাশ্মীর। দীর্ঘকাল ধরে চলা এই সঙ্কটের স্থায়ী সমাধান কাশ্মীরের সমস্যা একমাত্র সমাধান স্বাধীনতা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই।
আল্লাহ বলেন, “তোমাদের কী হলো, তোমরা আল্লাহর পথে অসহায় নর-নারী ও শিশুদের জন্য লড়বে না, যারা দুর্বলতার কারণে নির্যাতিত হচ্ছে? তারা ফরিয়াদ করছে, হে আমাদের রব! এই জনপদ থেকে আমাদের বের করে নিয়ে যাও, যার অধিবাসীরা জালেম এবং তোমার পক্ষ থেকে আমাদের কোনো বন্ধু, অভিভাবক ও সাহায্যকারী তৈরি করে দাও। যারা ঈমানের পথ অবলম্বন করেছে তারা আল্লাহর পথে লড়াই করে। আর যারা কুফরির পথ অবলম্বন করেছে তারা লড়াই করে তাগুতের পথে। কাজেই শয়তানের সহযোগীদের সাথে লড়ো এবং নিশ্চিত জেনে রাখো, শয়তানের কৌশল আসলে নিতান্তই দুর্বল।” (সূরা নিসা: ৭৫-৭৬)
আপাতদৃষ্টিতে শয়তান ও তার সাথীরা বিরাট প্রস্তুতি নিয়ে এগিয়ে আসে এবং জবরদস্ত কৌশল অবলম্বন করে কিন্তু তাদের প্রস্তুতি ও কৌশল দেখে ঈমানদারদের ভীত হওয়া উচিত নয় অবশ্যই তাদের সকল প্রস্তুতি ও কৌশল ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। তাই আজ গোটা মুসলিম উম্মাহকে কাশ্মীরীদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় পাশে দাঁড়াতে হবে। সাহায্যের হাত বাড়াতে হবে মজলুম প্রতি বিশ্বমানবতাকে। আল্লাহর নিকট তাদের জন্য দোয়া করতে হবে। ইনশাআল্লাহ সেদিন হয়ত বেশি দূরে নয় যেদিন জালিমদের মসনদ ভেঙে অসংখ্য মুসলিম রাষ্ট্রের জন্ম হবে, কাশ্মীরসহ অনেক রাষ্ট্র স্বাধীনতা লাভ করবে। আমেরিকা বিশ্বের মধ্যে এখনো সামরিক শক্তি, পলিসি, সব দিক থেকে সুপার পাওয়ার হিসেবেই খ্যাত। সেই আমেরিকা ১৮ বছর আফগানিস্তান দখলের ফলাফল ডাবল জিরো ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’- প্রবাদের মত। ভারত কোন দিক থেকেই এর কাছাকাছি অবস্থায়ও নেই। তারা কাশ্মীর দখল কত দিন টিকিয়ে রাখতে পারবে তাই দেখার বিষয়। তাই বিশেষজ্ঞরা মনে করেন এবার কাশ্মীর দখল ইন্ডিয়ার জন্য হিতে বিপরীত হতে পারে! সুতরাং ভারতের প্রতিটি পদক্ষেপই কাশ্মীরের স্বাধীনতার পথকে ত্বরান্বিত করবে।
লেখক : কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

SHARE

Leave a Reply