রবীন্দ্রনাথ ও আমাদের জাতীয় সঙ্গীত -এবনে গোলাম সামাদ

ভারতের জাতীয় সঙ্গীত একটি নয়, দুইটি। একটি হলো রবীন্দ্রনাথ রচিত ও সুরারোপিত গান ‘ভারত ভাগ্য বিধাতা’; আরেকটি হলো বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৩৮-১৮৯৪) রচিত গান ‘বন্দেমাতারম’। বন্দেমাতারম গানটি হলো ২৬ পঙক্তির; এর মধ্যে বিশ ছত্র হলো সংস্কৃত ভাষায় রচিত আর কেবল মাত্র ছয় ছত্র হলো বাংলা ভাষার। গানটি আছে বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস আনন্দমঠ-এ। গানটিতে দেশমাতৃকাকে তুলনা করা হয়েছে মা দুর্গার সঙ্গে। বলা হয়েছে ‘ত্বংহি দুর্গা দশপ্রহরণ ধারিণী’। গানটিতে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কোনো সুর দিয়ে গিয়েছিলেন না। রবীন্দ্রনাথ এই গানটির প্রথম স্তবকে সুর প্রদান করে ১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় অনুষ্ঠিত জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে নিজে গেয়ে শোনান। সেই থেকে গানটির প্রথম স্তবক তার দেওয়া সুরেই গীত হচ্ছে। ভারতের সংবিধান রচনা পরিষদের ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে ২৪ জানুয়ারি রবীন্দ্রনাথের ‘ভারত ভাগ্য বিধাতা’ এবং রবীন্দ্রনাথের সুর দেওয়া বন্দেমাতারম গানের প্রথম স্তবককে ভারতের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গ্রহণ করা হয়। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন ব্রাহ্ম। ব্রাহ্মরা নিরাকার এক ঈশ্বরে বিশ্বাসী এবং সকল প্রকার মূর্তিপূজার বিরোধী। কিন্তু আদি ব্রাহ্ম সমাজ হয়ে ওঠে হিন্দু পুনর্জীবনবাদী এবং বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের হিন্দুত্ববাদের বিশেষ অনুরক্ত। তাই রাজা রামমোহন রায়ের (১৭৭০-১৮৩৩) নিরাকার একেশ্বরবাদের স্থলে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মা দর্গুার ধারণাকে রবীন্দ্রনাথের গ্রহণ করতে বাধেনি। রবীন্দ্রনাথের একটি প্রবন্ধ আছে, যার নাম ‘হিন্দুত্ব’। এই প্রবন্ধটি এখন হয়ে উঠেছে দুষ্প্রাপ্য। তাই লেখাটি পড়া সহজ নয়। কিন্তু যারা পড়েছেন তাদের সবার মত-ই হলো লেখাটিতে ফুটে উঠেছে সারা ভারতজুড়ে গোঁড়া হিন্দু সমাজজীবন গড়ে তুলবারই প্রত্যয়। হিন্দু সমাজের একটি বৈশিষ্ট্য হলো বর্ণাশ্রম ব্যবস্থা। রাজা রামমোহন রায় যে ব্রাহ্ম সমাজ গড়েন তাতে জাতিভেদ প্রথা ছিলো না। কিন্তু আদি ব্রাহ্ম সমাজে প্রবর্তিত হয় জাতিভেদ প্রথা। বলা হয় একমাত্র ব্রাহ্মণ থেকে যারা ব্রাহ্ম সমাজভুক্ত হবে তাদের ওপর ন্যস্ত করতে হবে ব্রাহ্ম সমাজের নেতৃত্বের ভার, অন্যদের ওপর নয়। রাজা রামমোহন রায়কে রাজা উপাধি দিয়েছিলেন দিল্লির নামমাত্র মোগল স¤্রাট দ্বিতীয় আকবর। তিনি রামমোহন রায়কে তার প্রতিনিধি করে ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দে লন্ডনে পাঠান। যার উদ্দেশ্য ছিলো রাজা রামমোহন রায় ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে ঠিক করবেন দ্বিতীয় আকবর মাসিক কী পরিমাণ ভাতা পাবেন। ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে রামমোহন লন্ডনে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দ্বিতীয় আকবরের মাসিক ভাতা স্থির করতে পারেন। কিন্তু তিনি এরপর দেশে না ফিরে লন্ডনে থেকে যান। ১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দে দেহত্যাগ করেন। তাকে ব্রিস্টলে কবর দেওয়া হয়। রবীন্দ্রনাথের পিতামহ দ্বারকানাথ ঠাকুর নেতৃত্ব পান রাজা রামমোহন রায় প্রতিষ্ঠিত ব্রাহ্ম সমাজের। তিনি ছিলেন রামমোহন রায়ের বিশেষ অনুরক্ত। তিনি তাঁর শেষ জীবনে লন্ডনে যান এবং সেখানেই থাকেন বাস করতে। দেশে আর ফেরেন নি। তিনি লন্ডনে মারা যাবার পর তাকে সমাধিস্থ করা হয় ব্রিস্টলে। কিন্তু আদি ব্রাহ্ম সমাজে মানুষ মারা যাবার পর তার শবদাহ করা শুরু হয়। কবর দানের প্রথা বাদ পড়ে। রবীন্দ্রনাথের পিতা দেবেন্দ্রনাথের শবদাহ করা হয়। শবদাহ করা হয় রবীন্দ্রনাথের। এভাবেই আদি ব্রাহ্ম সমাজের ফিরে আসে হিন্দুত্বের নানা রীতি-নীতি। শবদাহ যার মধ্যে একটি।
১৯০৪ সালের আগস্ট মাসে রবীন্দ্রনাথ লেখেন তার বিখ্যাত শিবাজি উৎসব কবিতাটি। কবিতাটিতে তিনি বলেন যে, শিবাজি চেয়েছিলেন সারা ভারতে একটি হিন্দুরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে। তার এই নীতি ছিলো সঠিক। কিন্তু বাঙালিরা (অর্থাৎ বাঙালি হিন্দুরা) তার ডাকে সাড়া না দিয়ে করেছেন ভুল। সেই ভুল শুদ্ধ করার সময় এসেছে। তার নিজের কথায় :
সেদিন শুনি নি কথা- আজ মোরা তোমার আদেশ
শিরপাতি লব।
কণ্ঠে কণ্ঠে বক্ষে বক্ষে ভারতে মিলিবে সর্বদেশ
ধ্যানমন্ত্র তব।
ধ্বজা করি উড়াইব বৈরাগীর উত্তরীবসন-
দরিদ্রের বল।
‘একধর্মরাজ্য হবে এ ভারতে’ এ মহাবচন
করিব সম্বল।

আমরা রবীন্দ্রনাথের বিরোধিতা করি তার এই হিন্দুত্ববাদী চিন্তাচেতনার কারণে। কারণ রবীন্দ্রনাথ ১৯০৫ সালে তার ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি লেখেন ও সুর দেন বঙ্গভঙ্গরদ করার আন্দোলনকে উদ্দীপ্ত করার লক্ষ্যে। কিন্তু বাংলাভাষী মুসলমান কার্জনের বঙ্গভঙ্গকে সমর্থন করেছিল। ১৯০৫ সালেই বিশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে রচিত গানকেই কেন বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত করা হয়েছে? তার কোনো ব্যাখ্যা এ পর্যন্ত কোনো রবীন্দ্রভক্ত বুদ্ধিজীবী দেয়ার চেষ্টা করেননি; যে বাঙালি হিন্দুরা ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করেছিলেন। তাদেরই অনেকে আবার ১৯৪৭ সালে চান বঙ্গভঙ্গ করতে। এমনকি জ্যোতিবসুর মতো মার্ক্সবাদী কমিউনিস্ট নেতা বাংলাদেশের প্রাদেশিক পরিষদে ভোট দেন বঙ্গভঙ্গের পক্ষে।
‘আমার সোনার বাংলা’ গানের সঙ্গে নেই আমাদের কোনো জাতীয় চেতনার ঐক্য। আজকের পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশের উদ্ভব হয়েছে পাকিস্তান আন্দোলনের ফলে। যা ছিলো একদিন পূর্ব পাকিস্তান; তাই আজ হয়েছে বাংলাদেশ। পাকিস্তান আন্দোলনের ইতিহাসকে বাদ দিয়ে আজকের বাংলাদেশের উদ্ভব ব্যাখ্যা করা যায় বলে মনে হয় না। কিন্তু রবীন্দ্রভক্তরা বোঝাতে চাচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ নাকি হলেন বর্তমান বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ভিত্তি। তার কারণেই নাকি সম্ভব হতে পেরেছে আজকের পৃথক রাষ্ট্র বাংলাদেশের উদ্ভব। কিন্তু বাংলা যত মানুষের মাতৃভাষা তার মধ্যে শতকরা ৬০ ভাগের বাস হলো বাংলাদেশে। আর শতকরা ৪০ ভাগ বাস করেন ভারতে। সব বাংলাভাষী মানুষের পক্ষে এক বাংলা ভাষাভিত্তিক রাষ্ট্রের পতাকাতলে আসা সম্ভব হয়নি। আর তারা আসতেও চাচ্ছেন না। কেন আসতে চাচ্ছেন না? রবীন্দ্রবাদীরা তার ব্যাখ্যা দেয়ার প্রয়াসী হচ্ছেন না।
যদি পাকিস্তান না হতো; তবে বর্তমান বাংলাদেশের মানুষকে হতে হতো ভারতেরই অংশ। আর তাদের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে হয়তো মেনে নিতে হতো হিন্দিকেই। যেমন : হিন্দি হয়ে উঠেছে বিহার ও ঝাড়খণ্ডের ভাষা। এক সময় বিহারের ভাষা ছিলো মাগধি প্রাকৃত। কিন্তু সে ভাষাটা এখন হয়ে পড়েছে একেবারেই অপ্রচলিত। ভারতে জনসংখ্যার দিক থেকে বাংলা ভাষার স্থান হলো তৃতীয়। প্রথম স্থান হলো হিন্দি। দ্বিতীয় স্থান হলো তেলেগু ভাষার। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের বাংলাভাষী মানুষ বাংলা ভাষাকে পশ্চিমবঙ্গের একমাত্র সরকারি ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি। সেখানে প্রাদেশিক সরকারের ভাষা হিসেবে চলছে ইংরেজি, বাংলা এবং নেপালি ভাষা। আজ যারা বাংলাদেশে বাঙালিত্বে গৌরব করছেন তারা বোধ হয় জানেন না পশ্চিমবঙ্গে বাংলা ভাষার ভিত্তি কতটা দুর্বল হয়ে উঠছে। বাংলা ভাষা বেঁচে থাকলে; থাকবে বর্তমান বাংলাদেশকে নির্ভর করে। বর্তমান বাংলাদেশ ভারতের অংশ হলে বাংলা ভাষা নিয়ে তাদের সেই গৌরবের কোনো ভিত্তি রচিত হতে পারতো না। পাকিস্তান আন্দোলনের ইতিহাসকে টপকে গিয়ে আজকের বাংলাদেশের অস্তিত্বের ইতিহাসকে ব্যাখ্যা করা যায় বলে মনে করা চলে না। রবীন্দ্রনাথ জন্মেছিলেন কলকাতায়। কলকাতায় কোন রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন হয়নি। রাষ্ট্রভাষার আন্দোলন হয়েছে ঢাকায়। অথচ কলকাতায় ছিলো এক সময়ে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির কেন্দ্র। এক্ষেত্রে আরেকটি বিষয়ও উল্লেখ করতে হয় রবীন্দ্রনাথ এক সময় চেয়েছিলেন কলকাতার বাংলাকে সারা বাংলাদেশের বাংলা করে তুলতে। কিন্তু আমরা সেটাকে মেনে নিতে চাইনি। আমরা রবীন্দ্রনাথের মতো গেলুম, খেলুম, পেলুম লিখছি না। সব ব্যাপারেই আমরা হতে চাচ্ছি না রবীন্দ্র অনুসারী। আমাদের দেশের অনেক বুদ্ধিজীবী বলছেন রবীন্দ্রনাথ ছিলেন নাকি একজন মুক্তচিন্তার মানুষ। কিন্তু তিনি বরাবরই খুশি হয়েছেন কেউ তাকে কবিগুরু বললে। মাইকেল মধুসূদন দত্ত যিনি প্রথম সাহিত্যে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের সূচনা করেন; তাকে আমরা কবিগুরু বলি না। কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে বলি। রবীন্দ্রনাথ কোনো প্রতিবাদ করে যাননি।
ইংরেজি ভাষা এখন কার্যত হয়ে উঠেছে বিশ্বের প্রধান ভাষা। কিন্তু ইংরেজি ভাষার কোনো একাডেমি নেই। ভাষাটা গড়ে উঠেছে স্বতঃস্ফূর্তভাবে। কোনো বিশেষ একাডেমির তত্ত্বাবধানে নয়। কিন্তু আমরা গড়েছি বাংলা একাডেমি, বাংলা ভাষার উন্নতির লক্ষ্যে। বাংলা একাডেমি বাংলা ভাষার উন্নতি করছে না ক্ষতি করছে সেটা নিয়ে বিতর্ক তোলা যায়। বাংলা একাডেমি থেকে উত্তরাধিকার নামে একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশিত হয়। এই পত্রিকার ১৪১৮ বঙ্গাব্দের বৈশাখ সংখ্যা প্রকাশ করা হয়েছিল রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে। উক্ত সংখ্যাটি পড়লে মনে হয় বাংলাদেশ যেন স্থাপিত হয়েছে রবীন্দ্রনাথের উত্তরাধিকারকেই নির্ভর করে। পত্রিকাটির এই সংখ্যাটিকে বলা চলে রবীন্দ্রপূজার একটি চরম দৃষ্টান্ত। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ছিলেন একজন সেনাবাহিনীর লোক। তিনি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন আকস্মিকভাবে। তাঁকে বলা চলে একজন বিপদকালীন নেতা। যাদের আবির্ভাব ঘটে জাতির বিশেষ সময়ের চাহিদার প্রয়োজনে।
জিয়াউর রহমান চেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটিকে পরিত্যাগ করতে। কিন্তু তিনি সেটা করে যেতে পারেননি। বিএনপির বর্তমান কর্ণধাররা জাতীয় সঙ্গীত প্রসঙ্গে কী ভাবছেন তা আমরা জানি না। তবে আমাদের মত অনেকেই মনে করেন যে গানটিকে জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে না রাখাই হবে শ্রেয়। এই গানটিকে আমরা আমাদের জাতীয় সঙ্গীত করতে চেয়েছিলাম না। কিন্তু প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার গানটিকে জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গ্রহণ করে, প্রধানত ইন্দিরা গান্ধীর চাপে পড়ে। ইন্দিরা গান্ধীর পরিকল্পনা ছিল রবীন্দ্রনাথের নাম করে ধীরে ধীরে বাংলাদেশকে ভারতের অঙ্গরাষ্ট্রে পরিণত করা। গত ২২ শে শ্রাবণ প্রতি বছরের মতই রবীন্দ্রনাথের তিরোধান দিবসে বাংলাদেশের পত্রপত্রিকায় রবীন্দ্র সাহিত্য নিয়ে যথেষ্ট উচ্ছ্বাস প্রকাশ করা হলো। আমাদের বর্তমান লেখাটির লক্ষ্য হলো এই সমবেত প্রশংসা সঙ্গীতের মধ্যে কিছুটা বেসুরা সঙ্গীত যুক্ত করা।

লেখক : বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট

SHARE

Leave a Reply