রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামী

jamat e islamiএ.কে.এম. নাজির আহমদ

(গত সংখ্যার পর)

অবস্থার নাজুকতা উপলব্ধি করে মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ, ব্রিগেডিয়ার নাজমুল হুদা ও কর্নেল হায়দার বঙ্গভবন থেকে বেরিয়ে শেরেবাংলা নগরে উপস্থিত হন রংপুর থেকে আগত সেনাদের সাথে কথা বলার জন্য। কিছুক্ষণ পরই মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ, ব্রিগেডিয়ার নাজমুল হুদা ও কর্নেল হায়দার বিদ্রোহী সিপাহিদের গুলিতে নিহত হন।
প্রায় একই সময় বঙ্গভবনে গুলিবিদ্ধ হয়ে গ্রেফতার হন কর্নেল শাফায়াত জামিল। ব্রিগেডিয়ার নুরুজ্জামান ত্বরিত ঢাকার বাইরে চলে গিয়ে আত্মরক্ষা করেন।
৭ই নভেম্বর ঢাকা রেডিও স্টেশন থেকে ঘোষণা করা হয় বীর বিপ্লবী সিপাহিরা ক্ষমতা দখল করেছে এবং অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করেছে।
রাতে ঘোষণা করা হয় যে রাষ্ট্রপতি এ.এস.এম. সায়েমের নিকট প্রধান সামরিক প্রশাসকের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে এবং মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনী প্রধান নিযুক্ত হয়েছেন।
সেই দিন অস্ত্র হাতে সিপাহিরা দলে দলে রাজপথে নেমে আসে। ট্রাকে ট্রাকে সিপাহিরা রাজপথে টহল দিতে থাকে। তাদের সাথে মিলিত হয় হাজার হাজার মানুষ। মিছিলে মিছিলে ভরে যায় ঢাকা শহর। নানা রকমের শ্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে বাতাস। মহা-উল্লাসে গলা ফাটিয়ে লোকেরা শ্লোগান দিতে থাকে : “আল্লাহু আকবার”, “সিপাহি জনতা ভাই ভাই”, “বাংলাদেশ জিন্দাবাদ।” সেই দিন গগণবিদারী “আল্লাহু আকবার” ধ্বনি এক অবিস্মরণীয় আবহ সৃষ্টি করেছিল।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সিরাতুন্নবী সম্মেলন
১৯৭৬ সনের ৫-৭ মার্চ তারিখ ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত হয় একটি সিরাতুন্নবী সম্মেলন।
এই সম্মেলনের ব্যবস্থাপনা কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় আলেম মাওলানা সাইয়েদ মুহাম্মদ মাসুম এবং সেক্রেটারি ছিলেন পুরাতন ঢাকার কৃতী সন্তান জনাব আবদুল ওয়াহিদ। এই সম্মেলনে বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল এম.এ.জি. তাওয়াব একটি আবেগপূর্ণ বক্তব্য পেশ করেন। অগণিত মানুষ এই সম্মেলনে যোগদান করে। বাঁধভাঙা পানির স্রোতের মতো ছুটে আসে মানুষ। এই সম্মেলনে ঢাকা মহানগরীর অধিবাসীদের ইসলামী চেতনার যেই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে তা ছিলো অতুলনীয়, গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ বার্তাবহ।

ধর্মভিত্তিক রাজনীতির ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ প্রত্যাহার
১৯৭৬ সালের ৩রা মে রাষ্ট্রপতির জারিকৃত একটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৮ নাম্বার অনুচ্ছেদটি বাতিল করে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ তুলে নেয়া হয়।

রাষ্ট্রপতি হন জিয়াউর রহমান
১৯৭৭ সালের ২১শে এপ্রিল রাষ্ট্রপতি বিচারপতি এ.এস.এম. সায়েম মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের নিকট রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও দায়িত্ব হস্তান্তর করেন।
১৯৭৭ সালের ২২শে এপ্রিল রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান একটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে ১৯৭২ সালের সংবিধানের শিরোনামে “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম” সংযোজন এবং চার মূলনীতি ‘জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা’ কথাগুলোর পরিবর্তে “সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস, জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র এবং সমাজতন্ত্র অর্থাৎ ‘অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুবিচার” কথাগুলো প্রতিস্থাপন করেন।

১৯৭৭ সালের গণভোট
১৯৭৭ সালের ৩০শে মে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান একটি গণভোটের আয়োজন করেন।
তাঁর গৃহীত পদক্ষেপগুলোর প্রতি জনগণের সমর্থন আছে কি না তা যাচাইয়ের জন্য ছিলো এই গণভোট।
ভোটারগণ বিপুলভাবে তাঁর প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করে।

১৯৭৮ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন
১৯৭৮ সালের ৩রা জুন অনুষ্ঠিত হয় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ছিলেন গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই তিনি অবাধ নির্বাচনে অন্যদের সাথে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করে গণমানুষের নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দেশ শাসন করতে চেয়েছেন।
জেনারেল (অব:) মুহাম্মদ আতাউল গনী ওসমানীকে বিপুল ভোটে পরাজিত করে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।

একদলীয় শাসনব্যবস্থার বিলুপ্তি সাধন
১৯৭৮ সালের ১৫ই ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এক ফরমান জারি করে এক দলীয় ব্যবস্থা বাতিল করে বহুদলীয় ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন।
বাংলাদেশের জনগণ অনুভব করে যে তাদের বুকের ওপর থেকে একটি জগদ্দল পাথর অপসারিত হয়েছে।

‘ইসলামিক ডিমোক্রেটিক লীগ’ গঠন
১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ ইয়াহইয়া খান সকল প্রকারের রাজনৈতিক তৎপরতার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। এই নিষেধাজ্ঞা জামায়াতে ইসলামীর জন্যও প্রযোজ্য ছিলো।
১৯৭২ সালে বাংলাদেশের জন্য যেই সংবিধান গৃহীত হয় সেটিতেও ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল গঠনের ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিলো।
১৯৭৭ সালের ৩০শে মে গণভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের গৃহীত পদক্ষেপগুলো অনুমোদিত হওয়ায় ইসলামের নামে রাজনৈতিক দল গঠন করার পথে আর কোন বাধা রইলো না।
ফলে ইসলামী রাজনৈতিক দল গঠন নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু হয়।
এই চিন্তারই ফসল “ইসলামিক ডিমোক্রেটিক লীগ”।
১৯৭৬ সালের ২৪শে আগস্ট ডিমোক্রেটিক পার্টি, নেযামে ইসলাম পার্টি, খেলাফতে রব্বানী পার্টি এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতৃবৃন্দ ইসলামিক ডিমোক্রেটিক লীগ (ও.উ.খ) নামে একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফরম গড়ে তোলেন।
মাওলানা ছিদ্দিক আহমদকে (নেযামে ইসলাম পার্টি) চেয়ারম্যান, মাওলানা আবদুর রহীম (জামায়াতে ইসলামী), মাওলানা আবদুস সুবহান (জামায়াতে ইসলামী), এডভোকেট সা‘দ আহমদকে (জামায়াতে ইসলামী) ভাইস চেয়ারম্যান এবং এডভোকেট শফিকুর রহমানকে (ডিমোক্রেটিক পার্টি) সেক্রেটারি জেনারেল করে এর কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করা হয়।
ইসলামিক ডিমোক্রেটিক লীগ বলিষ্ঠভাবে উচ্চারণ করে যে ইসলাম একটি পূর্ণাংগ জীবন বিধান। মানুষের কল্যাণ এর বাস্তবায়নের ওপর নির্ভরশীল।
ইসলামিক ডিমোক্রেটিক লীগ ১৯৭৯ সনের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেয়।

১৯৭৯ সালের ১৮ই ফেব্রæয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ
১৯৭৯ সালের ১৮ই ফেব্রæয়ারি অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের নির্বাচন।
এটি ছিলো বাংলাদেশের দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ২০৭টি আসনে, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ৩৯টি আসনে এবং মুসলিম লীগ ১৪টি আসনে বিজয়ী হয়।
ইসলামিক ডিমোক্রেটিক লীগ থেকে মনোনীত জামায়াতে ইসলামীর ৬ জন সদস্য জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। নির্বাচিত সদস্যগণ হচ্ছেন- মাওলানা আবদুর রহীম (পিরোজপুর), মাস্টার মুহাম্মাদ শফীকুল্লাহ (ল²ীপুর), মাওলানা নুরুন্নবী সামদানী (ঝিনাইদহ), অধ্যাপক রেজাউল করীম (গাইবান্ধা), এ. এস. এম. মোজাম্মেল হক (ঝিনাইদহ) এবং অধ্যাপক সিরাজুল হক (কুড়িগ্রাম)।
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে জামায়াতে ইসলামীর এটাই প্রথম উপস্থিতি।

জাতীয় সংসদ কর্তৃক সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী গ্রহণ
১৯৭৯ সালের ৫ই এপ্রিল জাতীয় সংসদে গৃহীত হয় সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী বিল। ৬ই এপ্রিল থেকে এটি কার্যকর হয়। এই সংশোধনীতে ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট হতে তখন পর্যন্ত প্রণীত সকল আদেশ, বিধান ও ফরমান এবং সংবিধানে যা কিছু সংশোধন, সংযোজন, পরিবর্তন, বিলোপ সাধন এবং প্রতিস্থাপন করা হয়েছে, সেইগুলো বৈধভাবে প্রণীত ও গৃহীত হয়েছে বলে ঘোষিত হয়।
এই সংশোধনী গৃহীত হওয়ার পর বাংলাদেশের মানুষ তাঁদের স্বকীয়তা খুঁজে পায় এবং স্বাধীনভাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার হিম্মত লাভ করে।

জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ
১৯৭৯ সালের ২৫, ২৬ ও ২৭শে মে ঢাকাস্থ ইডেন হোটেল প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয় একটি কনভেনশন। বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ আব্বাস আলী খানের আহŸানে এই কনভেনশনে উপস্থিত হন সারা বাংলাদেশ থেকে আগত কমবেশি ৪৫০ জন সদস্য।
সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন আব্বাস আলী খান। এই সম্মেলনে অধ্যাপক গোলাম আযমের একটি দীর্ঘ ভাষণ পড়ে শুনানো হয়। পরে এটি “বাংলাদেশ ও জামায়াতে ইসলামী” নামে প্রকাশিত হয়।
এই ভাষণে তিনি বলেন,
“আল্লাহ পাকই সমস্ত পৃথিবীর সৃষ্টা। আমরা তাঁর দাসত্ব কবুল করে মুসলিম (অনুগত) হিসেবে পরিচয় দিতে গৌরব বোধ করি। মুসলিমের দৃষ্টিতে আল্লাহর গোটা দুনিয়াই তাঁর বাসভূমি। কিন্তু আমাদের মহান সৃষ্টা যে দেশে আমাদেরকে পয়দা করলেন, সে দেশের সাথে স্বাভাবিক কারণেই আমরা বিশেষ ধরনের এক গভীর সম্পর্ক অনুভব করি। কারণ আমরা ইচ্ছে করে এ দেশে পয়দা হইনি। আমাদের দয়াময় প্রভু নিজের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে এদেশে পয়দা করেছেন। তাই আমাদের স্রষ্টা আমাদেরকে এদেশে পয়দা করাই যখন পছন্দ করেছেন, তখন এদেশের প্রতি আমাদের মহব্বত অন্য সব দেশ থেকে বেশি হওয়াই স্বাভাবিক।”
“বাংলাদেশে মুসলিম, হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ ও উপজাতীয়সহ প্রায় দশ কোটি লোক বাস করে। বাংলাদেশী হিসেবে সবার সাথেই আমাদের ভালোবাসার সম্পর্ক থাকতে হবে। আমাদের দেশের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নায় আমরা সমান অংশীদার। ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে সকল বাংলাদেশী আমাদের ভাই-বোন। সবার কল্যাণের সাথেই আমাদের মঙ্গল জড়িত। এদেশে আমরা যে আদর্শ কায়েম করতে চাই এর আহŸান সবার নিকটই পৌঁছাতে হবে। আমাদের সবারই স্রষ্টা আল্লাহ। তাঁর দেয়া আদর্শ অমুসলিমদের মধ্যে পৌঁছানো আমাদেরই কর্তব্য। আল্লাহর সৃষ্ট সূর্য, চন্দ্র, আলো, বাতাস ইত্যাদি আমরা যেমন সমভাবে ভোগ করছি, আল্লাহর দীনের মহা নিয়ামতও আমাদের সবার প্রাপ্য। বংশগতভাবে মুসলিম হবার দাবীদার হওয়ার দরুন আল্লাহর দীনকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত নিজস্ব সম্পদ মনে করা উচিত নয়। অমুসলিম ভাইদেরও যে তাদের স্বার্থেই দীন ইসলামকে জানা প্রয়োজন এবং গ্রহণযোগ্য কিনা বিবেচনা করা কর্তব্য সে বিষয়ে আমাদের দেশীয় ভাই হিসেবে তাদেরকে মহব্বতের সাথে একথা বুঝানো আমাদের বিরাট দায়িত্ব ও দীনী কর্তব্য।”
“বাংলাদেশে যারা রাজনীতি করেন, তাদের সবাইকে আমরা ও একারণেই শ্রদ্ধা করি যে, তারাও দেশ সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করেন, দেশকে উন্নত করতে চান, দেশের সমস্যাগুলোর সমাধানে আগ্রহী এবং জনগণের কল্যাণকামী। তারা শুধু নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত নন, গোটা দেশের ভালমন্দ সম্পর্কে সজাগ দৃষ্টি রাখেন। এ ধরনের লোকদের সঠিক প্রচেষ্টায়ই একটি দেশ সত্যিকার উন্নতি লাভ করতে পারে। কিন্তু যারা দেশ গড়ার চিন্তাই করে না, যারা কেবল আত্ম-প্রতিষ্ঠায় ব্যস্ত, তারা দেশের সম্পদ নয়, তারা দেশের আপদ। যারা শুধু আত্ম-প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য নিয়েই রাজনীতি করেন, তারা দেশের কলঙ্ক। আর যারা দৈহিক শক্তি বা অস্ত্রশক্তির বলে জনগণের ওপর শাসক সেজে বসতে চায়, তারা দেশের ডাকাত।
সব রকম রাজনৈতিক দলের প্রতি সম্মানবোধ সত্তে¡ও সবার সাথে আমাদের সমান সম্পর্ক রক্ষা করা সম্ভব নয়। বিভিন্ন মানদণ্ডে আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রধানত তিন শ্রেণীতে ভাগ করা যায় :
১। যেসব দল ইসলামকে দলীয় আদর্শ হিসেবে স্বীকার করে।
২। যেসব দল ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদে বিশ্বাসী।
৩। যেসব দল সমাজতন্ত্রের আদর্শে দেশ গড়তে চায়।
আমরা যেহেতু ইসলামী আদর্শে বিশ্বাসী, সেহেতু প্রথম শ্রেণীভুক্ত দলগুলোর সাথে আমাদের আদর্শিক সম্পর্কের দরুন তাদের সঙ্গে আমাদের নিম্নরূপ সম্বন্ধ বজায় রাখতে হবে :
(ক) ইসলামবিরোধী শক্তির পক্ষ থেকে তাদের কারো উপর হামলা হলে আমরা ন্যায়ের খাতিরে তাদের পক্ষে থাকব ও হামলা প্রতিহত করতে সাহায্য করব।
(খ) ইসলামী দল হিসেবে যারা পরিচয় দেন, তাদের সাথে দীনের ব্যাপারে সহযোগিতা করব। এ সহযোগিতার মনোভাব নিয়েই তাদেরকে দীনি ভাই হিসেবে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেব।
(গ) ইসলামী দলের নেতা ও কর্মীদের জন্য যেসব বিশেষ গুণ অপরিহার্য, সে বিষয়ে কোন দলের মধ্যে কোন কমতি বা ত্র“টি দেখা গেলে মহব্বতের সাথে সে বিষয়ে তাদেরকে সংশোধনের উদ্দেশ্যে ভুল ধরিয়ে দেব। অনুরূপভাবে আমাদের ভুল-ত্র“টি ধরিয়ে দিলে কৃতজ্ঞতার সাথে তা কবুল করব।
(ঘ) কোন সময় যদি কোন ইসলামপন্থী দল আমাদের বিরোধিতা করে, তবুও আমরা তাদের বিরোধিতা করব না। প্রয়োজন হলে বন্ধুত্বপূর্ণ ভাষায় জওয়াব দেব।
(ঙ) নির্বাচনের সময় তাদের সাথে দরকার হলে সমঝোতা করব।
দ্বিতীয় ও তৃতীয় নম্বরে উল্লেখিত দলগুলোর সাথে আমরা নিম্নরূপ সম্পর্ক রক্ষার চেষ্টা করব :
(ক) যেসব রাজনৈতিক দল সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ইসলামকে জীবনাদর্শ মনে করে না, তাদের সাথেও আমরা কোন প্রকার শত্র“তার মনোভাব পোষণ করব না। দেশ ও জাতির কল্যাণের জন্য মত ও পথ বাছাই করার স্বাধীনতা সবারই থাকা উচিত। আমরা তাদের মত ও পথকে ভুল মনে করলে যুক্তির মাধ্যমে শালীন ভাষায় অবশ্যই সমালোচনা করব।
(খ) তাদের কেউ আমাদের প্রতি অশোভন ভাষা প্রয়োগ করলেও আমরা আমাদের শালীনতার মান বজায় রেখেই জওয়াব দেব। গালির জওয়াবে আমরা কখনও গালি দেবো না বা অন্যায় দোষারোপের প্রতিশোধ নিতে গিয়ে আমরা ন্যায়ের সীমা লংঘন করব না।
(গ) দেশের স্বার্থ ও জনগণের কল্যাণে তাদের যেসব কাজকে আমরা মঙ্গলজনক মনে কবর, সেসব ক্ষেত্রে তাদের সাথে সহযোগিতা কবর।”
“যারা রাজনীতি করেন, তাদের উপরে ভাল-মন্দ প্রধানত নির্ভরশীল। ভ্রান্ত রাজনীতি গোটা দেশকে বিপন্ন করতে পারে। ভুল রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত জনগণের দুর্গতির কারণ হতে পারে। তাই সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টি করে দেশ ও জাতিকে প্রতিযোগিতার এ দুনিয়ায় বাঞ্ছিত উন্নতির দিকে এগিয়ে নেবার ব্যাপারে আন্তরিকতা থাকলে সকল রাজনৈতিক দলের পক্ষেই নিম্নের নীতিমালা অনুসরণ করা কর্তব্য ঃ
১। সকল রাজনৈতিক দলকেই নিষ্ঠার সাথে স্বীকার করে নিতে হবে যে, আল্লাহর সার্বভৌমত্বের অধীনে জনগণই খিলাফাতের (রাজনৈতিক ক্ষমতার) অধিকারী ও সরকারী ক্ষমতার উৎস।
২। গণতন্ত্রের এই প্রথম কথাকে স্বীকার করার প্রমাণ স্বরূপ নির্বাচন ব্যতীত অন্য কোন উপায়ে ক্ষমতা হাসিলের চিন্তা পরিত্যাগ করতে হবে।
৩। বাংলাদেশের সম্মান রক্ষা ও সুনাম অর্জনের উদ্দেশ্যে বিশ্বের স্বীকৃত গণতান্ত্রিক নীতিগুলোকে আন্তরিকতার সাথে পালন করতে হবে এবং এর বিপরীত আচরণ সতর্কতার সাথে বর্জন করতে হবে।
অগণতান্ত্রিক আচরণ দেশকে সহজেই দুনিয়ায় নিন্দনীয় বানায়। তাই দেশের সম্মান রক্ষার প্রধান দায়িত্ব সরকারী দলের।
৪। অভদ্র ভাষায় সমালোচনা করা, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অস্ত্র ব্যবহার করা এবং দৈহিক শক্তি প্রয়োগ করাকে রাজনৈতিক গুণ্ডামি ও লুটতরাজ মনে করে ঘৃণা করতে হবে। ব্যক্তি স্বার্থে লুটতরাজ ও গুণ্ডামি করাকে সবাই অন্যায় মনে করে। কিন্তু এক শ্রেণীর ভ্রান্ত মতবাদ রাজনৈতিক ময়দানে এসব জঘন্য কাজকেই বলিষ্ঠ নীতি হিসেবে ঘোষণা করে। এ ধরনের কার্যকলাপের প্রশ্রয়দাতাদেরকে গণতন্ত্রের দুশমন হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে।
৫। সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কোন ব্যক্তি বা দলকে স্বাধীনতার শত্র“, দেশদ্রোহী, বিদেশের দালাল, দেশের দুশমন ইত্যাদি গালি দেয়াকে রাজনৈতিক অপরাধ বলে গণ্য করতে হবে। সবাই যদি আমরা একে অপরকে এ গালি দিতে থাকি, তাহলে দুনিয়াবাসীকে এ ধারণাই দেয়া হবে যে, এ দেশের সবাই কারো না কারো দালাল, এমন দেশের কোন মর্যাদাই দুনিয়ায় স্বীকৃত হতে পারে না।”
এই সম্মেলনে একটি নতুন গঠনতন্ত্র অনুমোদিত হয়। সেই গঠনতন্ত্রের ভিত্তিতে ১৯৭৯ সনের ২৭শে মে থেকে চারদফা পূর্ণাংগ কর্মসূচি নিয়ে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ কর্মতৎপরতা শুরু করে।

‘কেয়ারটেকার সরকারের রূপরেখা’ প্রণয়ন
১৯৮০ সালের মাঝামাঝি আমীরে জামায়াত অধ্যাপক গোলাম আযম সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য “কেয়ারটেকার সরকার” সংক্রান্ত একটি সুচিন্তিত রূপরেখা জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের অধিবেশনে পেশ করেন। বিস্তারিত আলোচনার পর কর্মপরিষদ রূপরেখাটি সর্বসম্মতিক্রমে গ্রহণ করে।
রূপরেখাটি নিম্নরূপÑ
১. সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি প্রেসিডেন্ট কর্তৃক কেয়ারটেকার সরকারপ্রধান নিযুক্ত হবেন।
২. প্রধান বিচারপতি কেয়ারটেকার সরকারপ্রধানের দায়িত্ব গ্রহণের পর দল নিরপেক্ষ লোকদের মধ্য থেকে একটি টিম গঠন করে প্রেসিডেন্টের নিকট পেশ করবেন। প্রেসিডেন্ট তাঁদেরকে নিয়োগ দেবেন। এই টিমের কোন ব্যক্তি আসন্ন নির্বাচনে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করতে পারবেন না।
৩. কেয়ারটেকার সরকারপ্রধানের সুপারিশের ভিত্তিতে প্রেসিডেন্ট একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন করবেন।
৪. নির্বাচন অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার উদ্দেশ্যে কেয়ারটেকার সরকার বিধিবিধান প্রণয়ন করতে পারবেন। সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারিগণ কেয়ারটেকার সরকারের সকল নির্দেশ পালন করতে বাধ্য থাকবেন।
৫. নিরপেক্ষভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠানে সফলতা অর্জন করার জন্য প্রেসিডেন্ট কেয়ারটেকার সরকারকে সার্বিক সহযোগিতা করবেন।
১৯৮০ সালের ৭ই ডিসেম্বর জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত আমীর আব্বাস আলী খান রমনা গ্রিনে আহূত এক সাংবাদিক সম্মেলনে এই রূপরেখা প্রকাশ করেন।

ইসলামী বিপ্লবের ৭ দফা গণদাবি
১৯৮১ সনের ৩০শে জানুয়ারি রমনা গ্রীনে অনুষ্ঠিত একটি কর্মী সমাবেশে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ-এর ভারপ্রাপ্ত আমীর আব্বাস আলী খান ‘ইসলামী বিপ্লবের ৭ দফা গণদাবি’ পেশ করেন।
দাবিগুলো হচ্ছেÑ
১. বাংলাদেশকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করতে হবে
ক. আল্লাহর সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি দিতে হবে।
খ. কুরআন-সুন্নাহর আইন জারি করতে হবে।
গ. প্রচলিত আইনকে কুরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী সংশোধন করতে হবে।
ঘ. মুসলিম-অমুসলিম সকলের প্রতি ইসনাফ ও সুবিচার কায়েম করতে হবে।
২. ঈমানদার যোগ্য লোকের সরকার কায়েম করতে হবে
ক. আল্লাহবিমুখ ও অসৎ লোকদের নেতৃত্বের পরিবর্তন ঘটাতে হবে।
খ. সৎ ও যোগ্য লোকদেরকে শাসনক্ষমতা দিতে হবে।
গ. পৃথক নির্বাচনের ভিত্তিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন করতে হবে।
৩. বাংলাদেশের আযাদির হেফাজত করতে হবে
ক. জনমনে জাতীয়তার ইসলামী চেতনা জাগাতে হবে।
খ. রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে গণতন্ত্রসম্মত বানাতে হবে।
গ. মৌলিক মানবাধিকার বহাল করতে হবে।
ঘ. যাবতীয় অসম চুক্তি বাতিল করে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করতে হবে।
ঙ. মুসলিম জাহানের ঐক্য-প্রচেষ্টা জোরদার করতে হবে।
৪. আইন শৃঙ্খলা পূর্ণরূপে বহাল করতে হবে
ক. জান-মাল ও ইজ্জত-আবরুর হেফাজত করতে হবে।
খ. সমাজবিরোধী যাবতীয় কার্যকলাপ বন্ধ করতে হবে।
গ. বিচার বিভাগকে শাসন বিভাগ থেকে পৃথক করতে হবে।
৫. ইসলামী অর্থব্যবস্থা চালু করতে হবে
ক. সরকারকে ভাত-কাপড় ও বাসস্থানসহ মৌলিক মানবীয় প্রয়োজন পূরণের দায়িত্ব নিতে হবে।
খ. জনশক্তিকে দক্ষ বানিয়ে বেকার সমস্যার সমাধান করতে হবে।
গ. মেহনতি মানুষের ন্যায্য অধিকার দিতে হবে।
ঘ. পরিবার-পরিকল্পনার নামে ঈমান ও চরিত্রধ্বংসী জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বন্ধ করতে হবে।
ঙ. সুদ, ঘুষ, মদ, জুয়া, শোষণ, দুর্নীতিসহ যাবতীয় যুলুম খতম করতে হবে।
৬. ইসলামী শিক্ষা ও সংস্কৃতি প্রবর্তন করতে হবে
ক. সর্বস্তরে ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা কায়েম করতে হবে।
খ. ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকায় স্থাপন করতে হবে।
ঘ. শুক্রবারকে সরকারি ছুটির দিন ঘোষণা করতে হবে।
ঙ. অপসংস্কৃতি বন্ধ করে ইসলামী সংস্কৃতি চালু করতে হবে।
৭. কুরআন-হাদীস মোতাবেক মহিলাদের যাবতীয় অধিকার বহাল করতে হবে
ক. মহিলাদের ইসলামসম্মত মর্যাদা দিতে হবে।
খ. মহিলাদের জন্য পৃথক শিক্ষাব্যবস্থা চালু করতে হবে।
গ. মহিলাদের পৃথক কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে।
ঘ. মহিলাদের নৈতিক অধঃপতনের ষড়যন্ত্র রোধ করতে হবে।

১৯৮১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন
১৯৮১ সালের ৩০শে মে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামে একদল বিদ্রোহী সেনার হাতে মর্মান্তিকভাবে নিহত হন।
অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের উদ্যোগ নেন।
১৯৮১ সালের ১৫ই নবেম্বর রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার দেড় মাস পূর্বে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কাকে ভোট দেওয়া উচিত এই বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে জামায়াতে ইসলামী কর্তৃক প্রকাশিত একটি পুস্তিকা ভোটারদের মাঝে বিলি করা হয়। এতে বলা হয়েছেÑ
১. দেশের স্বাধীনতা কাদের হাতে নিরাপদ সেটাই পয়লা নম্বরে বিবেচ্য। প্রতিবেশী দেশ থেকেই স্বাধীনতা বিপন্ন হওয়ার আশংকা। তাই যারা এই প্রতিবেশী দেশকে অতি বন্ধু মনে করে তাদেরকে ভোট দেওয়া নিরাপদ নয়।
২. দ্বিতীয় বিবেচ্য বিষয় গণতন্ত্র। কাদের হাতে গণতন্ত্র নিরাপদ তা তাদের অতীত আচরণ থেকে স্পষ্ট জানা যায়। যারা একদলীয় শাসন জাতির ওপর চাপিয়ে দিয়েছিলো তারা গণতন্ত্রের দুশমন।
৩. যারা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ ও সমাজতন্ত্র কায়েম করতে চায় তাদেরকে ভোট দেওয়া আত্মহত্যারই শামিল।
৪. ইসলাম কায়েম করার উদ্দেশ্যে একাধিক প্রার্থী হয়েছেন। তাঁদের দ্বারা ইসলাম কায়েম হওয়া সম্ভব মনে করলে ভোট দিতে পারেন।
এই নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নমিনি ছিলেন বিচারপতি আবদুস সাত্তার। আওয়ামী লীগের নমিনি ছিলেন ড. কামাল হোসেন। বিচারপতি আবদুস সাত্তার বিপুল ভোটাধিক্যে ড. কামাল হোসেনকে পরাজিত করেন।
এই নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর জনশক্তি সুশৃংখলভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। (চলবে)
লেখক : সাবেক নায়েবে আমির
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী
তথ্যসূত্র :
১. এম. এ. ওয়াজেদ মিয়া, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ঘিরে কিছু ঘটনা ও বাংলাদেশ, পৃষ্ঠা-১৩০।
২. উদ্ধৃত, আবুল আসাদ, কালো পঁচিশের আগে ও পরে, পৃষ্ঠা : ২৭৬-২৭৭।
৩. শর্মিলা বসু, ডেড রেকনিং, পৃষ্ঠা-১৮১।
৪. খন্দকার আবুল খায়ের, ৭১-এ কি ঘটেছিল রাজাকার করা ছিল, পৃষ্ঠা-৬,৭,৮,৯।
৫. মওদুদ আহমদ, বাংলাদেশ : শেখ মুজিবর রহমানের শাসনকাল, পৃষ্ঠা-৭৫।
৬. আতিক হেলাল সম্পাদিত, মেজর জলিল রচনাবলী, পৃষ্ঠা-৩৫।

SHARE

Leave a Reply