রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামী

এ.কে.এম. নাজির আহমদ

(গত সংখ্যার পর)

jamat-e-islami-195x110১৯৯১ সনে সরকার গঠনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে সহযোগিতা প্রদান
পঞ্চম জাতীয় সংসদ ছিলো একটি ঝুলন্ত সংসদ।
সরকার গঠনের জন্য কমপক্ষে ১৫১টি আসন প্রয়োজন। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ১৪০টি আসন পেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল  হলেও সরকার গঠনের জন্য এর কমপক্ষে আরো ১১ জন সংসদ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন ছিলো।
আওয়ামী লীগ ৮৮টি আসনের সাথে জাতীয় পার্টির (এরশাদ) ৩৫টি আসন এবং অন্যান্য ১৯টি আসন মিলে জোটবদ্ধ হলে আসন সংখ্যা দাঁড়ায় ১৪২টি। তার মানে, আওয়ামী লীগের সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ছিলো আরো ৯ জন সংসদ সদস্যের সমর্থন।
অর্থাৎ আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন জামায়াতে ইসলামীর ১৮ জন সংসদ সদস্যকেই “ব্যালান্স অব পাওয়ার” বানিয়ে দেন। জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন ছাড়া না বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, না আওয়ামী লীগের পক্ষে সরকার গঠন সম্ভব হচ্ছিলো।
এমতাবস্থায় আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা তাঁর দলের অন্যতম শীর্ষ নেতা আমির হোসেন আমুকে জামায়াতে ইসলামীর অন্যতম শীর্ষ নেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের নিকট প্রেরণ করেন এবং বেশ কয়েকটি মন্ত্রিত্ব নিয়ে জামায়াতে ইসলামীকে আওয়ামী লীগের সাথে কোয়ালিশন সরকারে যোগদানের আহ্বান জানান।
এই দিকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের পক্ষ থেকে দলটির তৎকালীন মহাসচিব আবদুস সালাম তালুকদার জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত আমীর আব্বাস আলী খান বরাবর সরকার গঠনে তাঁদের দলকে সমর্থন করার জন্য অনুরোধপত্র পাঠান।
১১ই মার্চ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ, মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ও অ্যাডভোকেট শেখ আনছার আলী অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি শাহাবুদ্দীন আহমদের নিকট সমর্থনপত্রটি হস্তান্তর করেন।
১৯৯১ সনের ১৯ শে মার্চ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি শাহাবুদ্দীন আহমদ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে প্রধানমন্ত্রী করে ১০ জন পূর্ণমন্ত্রী ও ২১ জন প্রতিমন্ত্রীর সমন্বয়ে একটি মন্ত্রিপরিষদ গঠন করেন।
১৯৯১ সনের ২০ শে মার্চ বেলা আড়াইটায় নির্ধারিত ছিলো মন্ত্রীদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান।
“আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা কিংবা তাঁর দলের কোনো নেতা বা সংসদ সদস্য উক্ত শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন না।”
২৮ শে মার্চ জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত ৩০টি মহিলা আসনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের ২৮ জন এবং জামায়াতে ইসলামীর ২ জন নমিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন।
জামায়াতে ইসলামীর দু’জন মহিলা সংসদ সদস্য হচ্ছেন- হাফিযা আসমা খাতুন ও খন্দকার রাশেদা খাতুন।

সংসদীয় পদ্ধতিতে প্রত্যাবর্তনে ভূমিকা পালন
১৯৭২ সনে প্রবর্তিত সরকার পদ্ধতি ছিলো সংসদীয় বা পার্লামেন্টারি।
১৯৭৫ সনের ২৫ শে জানুয়ারি জাতীয় সংসদে গৃহীত সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী অনুযায়ী দেশে রাষ্ট্রপতি পদ্ধতি বা প্রেসিডেনশিয়াল পদ্ধতি চালু হয়।
১৯৯১ সন পর্যন্ত দেশে প্রেসিডেনশিয়াল পদ্ধতিই চালু ছিলো।
১৯৯১ সনে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর রাজনৈতিক দলগুলো সরকারপদ্ধতি নিয়ে নতুন করে মতামত ব্যক্ত করা শুরু করে।
প্রেসিডেন্ট পদ্ধতি কোন মন্দ পদ্ধতি নয়। এই পদ্ধতি সফলভাবেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চালু রয়েছে। তবে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রেসিডেন্ট পদ্ধতি স্বৈরশাসনে রূপান্তরিত হওয়ার বহু নমুনা রয়েছে। এই পদ্ধতিতে একই ব্যক্তি রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধান হন বিধায় স্বৈরশাসনের রূপ নেয়ার ঝুঁকি থাকে।
সংসদীয় পদ্ধতিতে রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধান হন ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তি। সংসদীয় পদ্ধতি ব্রিটেনে সফলভাবে প্রচলিত রয়েছে কয়েক শতাব্দী ধরে।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল গোড়া থেকেই প্রেসিডেনশিয়াল পদ্ধতিতে বিশ্বাসী ছিলো। প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াও একই মতের অনুসারী ছিলেন।
আওয়ামী লীগ গোড়াতে সংসদীয় পদ্ধতি প্রবর্তন করে পরে প্রেসিডেনশিয়াল পদ্ধতি চালু করে।
পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জনগণ কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হয়ে রাজনৈতিকভাবে দারুণ বেকায়দায় পড়ে। সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করা ছাড়া দলটির কোন বিকল্প পথ ছিলো না। আর সংসদীয় সরকারপদ্ধতিতে প্রত্যাবর্তনের দাবি ছাড়া অন্য কোন দাবি নিয়ে মাঠে নেমে কোন ফায়দা হতো না। অতএব আওয়ামী লীগ এই দাবি নিয়েই সোচ্চার হয় এবং সংসদীয় পদ্ধতিতে প্রত্যাবর্তনের জন্য জাতীয় সংসদে সংবিধান সংশোধনী বিল জমা দেয়।
জামায়াতে ইসলামীর লিয়াজোঁ কমিটি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের শীর্ষ নেতাদের সাথে যোগাযোগ করে বাংলাদেশে সংসদীয় সরকারপদ্ধতি চালু করার যৌক্তিকতা তুলে ধরে। এই বিষয়ে মতবিনিময়ের জন্য প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত আমীরসহ কয়েকজন শীর্ষ নেতার সাথে বসতে চাইলেন।
মিটিংয়ের তারিখ, সময় নির্ধারিত হয়। মিটিংয়ে প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সাথে ছিলেন আবদুস সালাম তালুকদার ও কর্নেল (অব:) মুস্তাফিজুর রহমান।
জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত আমীর আব্বাস আলী খানের সাথে ছিলেন আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও মুহাম্মদ কামারুজ্জামান।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল প্রেসিডেনশিয়াল পদ্ধতির পক্ষে যুক্তি পেশ করে। জামায়াতে ইসলামী সংসদীয় পদ্ধতির পক্ষে যুক্তি পেশ করে। এইভাবেই মিটিং শেষ হয়ে যায়।
সুখের বিষয়, ঐ রাতেই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল সংসদীয় সরকার পদ্ধতির পক্ষে সিদ্ধান্ত নেয় এবং জাতীয় সংসদে সংবিধান সংশোধনী বিল উত্থাপনের আয়োজন সম্পন্ন করে।

সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা নিজামীর ওপর সন্ত্রাসী হামলা
১৯৯১ সনের ২৭শে মে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ড. মুহাম্মদ মনিরুজ্জামান মিঞা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদেরকে একটি মিটিংয়ে যোগদান করতে আহ্বান জানান। ক্যাম্পাসে একটি সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই তিনি মিটিংয়ের আয়োজন করেন।
ভারপ্রাপ্ত আমীর আব্বাস আলী খান এই মিটিংয়ে আমন্ত্রিত হন। তিনি ঐ দিন ঢাকা অনুপস্থিত থাকবেন বিধায় তদানীন্তন সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী এমপিকে পাঠাবেন বলে ভাইস চ্যান্সেলরকে টেলিফোনে জানান।
ঐ মিটিংয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্যবৃন্দ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিবৃন্দ মিলে প্রায় ৬০ জন উপস্থিত হন।
মিটিং চলাকালে ছাত্রলীগের একটি মিছিল মাওলানা নিজামীর বিরুদ্ধে শ্লোগান দিতে দিতে সম্মেলন কক্ষে ঢুকে পড়ে। মিছিলকারীরা মাওলানা নিজামীকে মিটিং থেকে বের করে দেওয়ার দাবি জানায়।
ভাইস চ্যান্সেলর সাহেব শান্তিপূর্ণভাবে সুন্দর যুক্তি দিয়ে তাদেরকে বুঝাবার চেষ্টা করেন। ওরা চলে যায়।
মিটিং আবার শুরু হয়। এই সময় কয়েকটি ছাত্রসংগঠনের কর্মীরা একত্র হয়ে আবার সম্মেলন কক্ষে ঢুকে পড়ে এবং মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর ওপর আঘাত হানতে শুরু করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোক্টর হামলাকারীদেরকে থামাতে গিয়ে নিজেও আহত হন।
আহত মাওলানা নিজামী ফ্লোরে পড়ে যান এবং জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। এবার সন্ত্রাসীরা সেখান থেকে সরে পড়ে।
খবর পেয়ে পুলিশ ছুটে আসে এবং গুরুতর আহত নিজামী সাহেবকে উঠিয়ে ইবনে সিনা হাসপাতালে নিয়ে যায়।
প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় সংসদের স্পিকার ও মন্ত্রীদের অনেকেই তাঁকে দেখতে হাসপাতালে যান।
বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ এই সন্ত্রাসী হামলার নিন্দা করে বিবৃতি দেন।
বড় দলগুলোর মধ্যে ব্যতিক্রম ছিলো আওয়ামী লীগ। এই দলটির পক্ষ থেকে সন্ত্রাসী হামলার নিন্দা করে কোন বিবৃতি দেয়া হয়নি।

জাতীয় সংসদ কর্তৃক সংবিধানের একাদশ ও দ্বাদশ সংশোধনী গ্রহণ
সরকারপদ্ধতি সম্পর্কে মতপার্থক্য থাকায় পঞ্চম জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে সংবিধান সংশোধনী গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল এবং আওয়ামী লীগের সাথে যোগাযোগ করে মতপার্থক্য দূর করার চেষ্টা চালানো হয়। অবশেষে মতপার্থক্য দূর হয়।
সংবিধানের একাদশ সংশোধনী ছিলো অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি শাহাবুদ্দীন আহমদের সুপ্রিম কোর্টে ফিরে যাওয়ার বিধান সংক্রান্ত। আর দ্বাদশ সংশোধনী ছিলো প্রেসিডেনশিয়াল পদ্ধতির সরকার বিষয়ক বিধানগুলোর স্থলে সংসদীয় সরকারবিষয়ক বিধানগুলোর প্রতিস্থাপন সংক্রান্ত।
১৯৯১ সনের ১০ই আগস্ট রাতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, আওয়ামী লীগ, জামায়াতে ইসলামী, অন্যান্য দল এবং স্বতন্ত্র সদস্যগণ সর্বসম্মতভাবে সংশোধনী দু’টি পাস করে অনুপম ঐক্যের উদাহরণ স্থাপন করেন। এই ঐক্যের উদাহরণ গোটা জাতিকে বিপুলভাবে পুলকিত করে।

১৯৯১ সনের ৮ই অক্টোবর প্রেসিডেন্ট নির্বাচন
ইতঃপূর্বে প্রেসিডেনশিয়াল পদ্ধতি চালু ছিলো বিধায় সংবিধানে জনগণের ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্চাচিত হওয়ার বিধান ছিলো।
সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনী গৃহীত হওয়ায় সংসদ সদস্যদের ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্চাচিত হওয়ার বিধান প্রতিস্থাপিত হয়।
১৯৯১ সনের ৮ই অক্টোবর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দিন ধার্য হয়।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের পক্ষ থেকে জনাব আবদুর রহমান বিশ্বাস মনোনীত হন।
আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে মনোনীত হন সাবেক প্রধান বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী।
জাতীয় সংসদে দু’জন মহিলাসহ জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য ছিলেন ২০ জন। প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীদ্বয় তাঁদের ভোট পাওয়ার জন্য ভিন্ন ভিন্ন সময়ে এসে আমীরে জামায়াত অধ্যাপক গোলাম আযমের দু’আ চান।
অবশ্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী ভোট প্রদানের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেনি। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নমিনির এমনিতেই সংখ্যাধিক্য ভোট পাওয়া নিশ্চিত ছিলো। জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্যগণ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোট দিচ্ছেন না জেনে জাতীয় পার্টির (এরশাদ) ৩৫ জন সদস্যও ভোটদানে বিরত থাকেন। এতে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীর ভোট সংখ্যা আরো কমে যায়।
সর্বোচ্চসংখ্যক ভোট পেয়ে জনাব আবদুর রহমান বিশ্বাস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।

আমীরে জামায়াত অধ্যাপক গোলাম আযমের নাগরিকত্ব মামলা
১৯৭৩ সনের ১৮ই এপ্রিল শেখ মুজিবুর রহমান সরকার বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করার অভিযোগে ৩৯ জন বিশিষ্ট ব্যক্তির নাগরিকত্ব বাতিল করে। এঁদের মধ্যে ছিলেন- সর্বজনাব নূরুল আমীন (এনডিএফ), অ্যাডভোকেট হামিদুল হক চৌধুরী (পিডিপি), মাহমুদ আলী (পিডিপি), অ্যাডভোকেট জুলমত আলী খান (মুসলিম লীগ), ওয়াহিদুজ্জামান (মুসলিম লীগ), কাজী আবদুল কাদের (মুসলিম লীগ), এ.কিউ.এম. শফিকুল ইসলাম (মুসলিম লীগ), ড. গোলাম ওয়াহিদ চৌধুরী, রাজা ত্রিদিব রায় (চাকমা রাজা), আবদুল জাব্বার খদ্দর (কৃষক শ্রমিক পার্টি), মাওলানা আবদুর রহিম (জামায়াতে ইসলামী), অধ্যাপক গোলাম আযম (জামায়াতে ইসলামী), শেখ আনসার আলী (জামায়াতে ইসলামী), মাস্টার শফিকুল্লাহ (জামায়াতে ইসলামী), অধ্যাপক মহিউদ্দিন চৌধুরী (জামায়াতে ইসলামী), অধ্যাপক আবদুল খালেক (জামায়াতে ইসলামী), অধ্যাপক ইউসুফ আলী (জামায়াতে ইসলামী), মাওলানা তমিজুদ্দীন (জামায়াতে ইসলামী), ব্যারিস্টার কুরবান আলী প্রমুখ।
১৯৭১ সনের ২২ শে নভেম্বর অধ্যাপক গোলাম আযম জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তান-এর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের অধিবেশনে যোগদানের জন্য লাহোর গিয়েছিলেন। অধিবেশন শেষে তিনি ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন। ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হওয়ায় প্লেন গতিপথ পরিবর্তন করে জিদ্দা গিয়ে অবতরণ করে। সেখান থেকে অধ্যাপক গোলাম আযম আবার লাহোর আসেন।
১৯৭৩ সনের এপ্রিল মাসে অধ্যাপক গোলাম আযম হাজ পালনের জন্য মাক্কা যান। সেখানে অবস্থান কালেই তিনি তাঁর নাগরিকত্ব বাতিলের ঘোষণা সম্পর্কে অবহিত হন। তিনি লন্ডন চলে যান।
১৯৭৬ সনের জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশ সরকার ঘোষণা করে যে যাঁদের নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়েছিল তাঁরা নাগরিকত্ব বহালের জন্য সরাসরি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিবের নিকট দরখাস্ত করবেন।
এই ঘোষণা অনুযায়ী যাঁরা আবেদন করেছিলেন তাঁরা নাগরিকত্ব ফিরে পান।
১৯৭৬ সনের মে মাসে অধ্যাপক গোলাম আযম তাঁর নাগরিকত্ব ফিরে পাওয়ার জন্য স্বরাষ্ট্র সচিবের নিকট আবেদন করেন। কিন্তু কোন ইতিবাচক সাড়া পাননি।
১৯৭৭ সনের জানুয়ারি মাসে তিনি তদানীন্তন প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক মে. জেনারেল জিয়াউর রহমানের নিকট আবেদনপত্র পাঠান। কোন সদুত্তর মেলেনি।
১৯৭৮ সনে তিনি নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নিকট আবেদনপত্র প্রেরণ করেন। এবারও তাঁকে নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেওয়া হলো না।
অবশেষে তাঁর অসুস্থ বৃদ্ধা আম্মার আবেদনে সরকার তাঁকে বাংলাদেশে আসার ভিসা দেয়।
১৯৭৮ সনের ১১ই জুলাই তিনি দেশে ফিরেন। দেশে ফিরে তিনি নাগরিকত্ব বহালের জন্য আবারো আবেদন পেশ করেন।
১৯৭৮ সনের নবেম্বর মাসে সরকার তাঁকে ১০ই ডিসেম্বরের মধ্যে দেশ থেকে চলে যেতে বলে। অধ্যাপক গোলাম আযম লিখিতভাবে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে জানান যে তাঁর পক্ষে দেশ ত্যাগ করা সম্ভব নয়। এরপর সরকার আর কিছুই বলেনি।
১৯৮০ সনের মে মাসে জানা যায় যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অধ্যাপক গোলাম আযমের নাগরিকত্ব বহালের সুপারিশ সংবলিত ফাইল দস্তখতের জন্য প্রেসিডেন্টর নিকট পাঠিয়েছেন। ঐ মাসেই জাতীয় সংসদের এক সদস্যের প্রশ্নের জওয়াবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন যে তাঁর নাগরিকত্ব বহালের বিষয়টি সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে।
১৯৮৮ সনের ৩১শে মে জাতীয় সংসদে তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ একটি বিবৃতি দেন। তিনি বলেন, “অধ্যাপক গোলাম আযম বাংলাদেশী নাগরিকত্ব লাভের উদ্দেশ্যে সরকারের নিকট যেই আবেদন করেছেন, তা সরকার এখনো বিবেচনা করেনি। ঐ আবেদন এখনো নাকচ করা হয়নি বলে তিনি বাংলাদেশে অবস্থান করছেন।”
১৯৯১ সনের ৯ই মার্চ ভারপ্রাপ্ত আমীর আব্বাস আলী খানের নেতৃত্বে জামায়াতে ইসলামীর একটি ডেলিগেশন বঙ্গভবনে গিয়ে অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট বিচারপতি শাহাবুদ্দীন আহমদের সাথে সাক্ষাৎ করে। সাক্ষাতের এক পর্যায়ে জনাব আব্বাস আলী খান বলেন, “আমি জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত আমীর। নির্বাচিত আমীর অধ্যাপক গোলাম আযম। তিনি জন্মসূত্রে এই দেশের নাগরিক। অন্যায়ভাবে তাঁর নাগরিকত্ব হরণ করা হয়েছে। তাঁর নাগরিকত্ব অধিকার বহাল করার জন্য ১৫ বছর ধরে দাবি জানানো হচ্ছে। আমরা আশা করি আপনি তাঁর নাগরিকত্ব বহাল করে ঐ অন্যায়ের প্রতিকার করবেন।”
বিচারপতি শাহাবুদ্দীন আহমদ বলেন, “আমি তাঁর ফাইলটা ভালো করে দেখেছি। আমার বুঝেই আসে না যে তাঁর নাগরিকত্ব এতোদিন পর্যন্ত কেন বহাল হলো না। আমি ওয়াদা করছি, সরকার গঠন করে জাতীয় সংসদ চালু করার আসল দায়িত্ব পালন করার পর আমি এই কাজ অবশ্যই করবো। আমি কখনো ওয়াদা খেলাফ করি না। এই বিষয়ে আপনারা নিশ্চিন্ত থাকুন।”
১৯৯১ সনের অক্টোবর মাসে বিচারপতি শাহাবুদ্দীন আহমদ নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট আবদুর রহমান বিশ্বাসের নিকট প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা ও দায়িত্ব হস্তান্তর করে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির পদে ফিরে যান।
১৯৯৫ সনের ১লা ফেব্র“য়ারি বিচারপতি শাহাবুদ্দীন আহমদ সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। ঐ বছরের কোন এক সময় বিচারপতি শাহাবুদ্দীন আহমদ ড. জি. ডব্লিও. চৌধুরীকে বলেন, “আমি জীবনে ওয়াদা ভঙ্গ করিনি। একটি মাত্র ওয়াদা আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে ভঙ্গ হয়ে গেলো বলে আমি বিবেকের দংশন বোধ করছি।…… জাতীয় সংসদে সংবিধান সংশোধনী পাস হয়ে যাওয়ার পর উপযুক্ত সময় মনে করে আমি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ফাইলটি তলব করি। বারবার তাকিদ দিয়েও যখন ফাইলটি পেলাম না, তখন আমি কৈফিয়ত তলব করি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানালো, ‘ফাইলটি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।”
১৯৭৮ সনে দেশে ফেরার পর থেকে অধ্যাপক গোলাম আযম বারবার আমীরে জামায়াত নির্বাচিত হয়ে আসছিলেন। তাঁর নাগরিকত্ব ছিলো না বিধায় রাজনৈতিক অঙ্গনে ভূমিকা পালন করতেন ভারপ্রাপ্ত আমীর জনাব আব্বাস আলী খান।
এইভাবে ঘনিয়ে আসে ১৯৯২-৯৪ কার্যকালের জন্য আমীরে জামায়াতের নির্বাচন অনুষ্ঠানের সময়। এই নির্বাচনে অধ্যাপক গোলাম আযম আমীরে জামায়াত নির্বাচিত হলে তাঁর নাম প্রকাশ্যে ঘোষণা করা হবে কিনা বিষয়টি কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ ও শেষে কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরায় আলোচিত হয়। আলোচনান্তে সিদ্ধান্ত হয় যে এবার প্রকাশ্যে নাম ঘোষণা করা হবে।
১৯৯২-৯৪ কার্যকালের জন্য অধ্যাপক গোলাম আযম আমীরে জামায়াত নির্বাচিত হয়েছেন খবরটি পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার সাথে সাথেই ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ ও সমাজবাদে বিশ্বাসী গোষ্ঠী হৈ চৈ শুরু করে দেয়। তারা বলে, জামায়াতে ইসলামী একজন বিদেশীকে আমীর বানিয়ে সংবিধান লংঘন করেছে। অতএব দলটিকে বেআইনি ঘোষণা করতে হবে এবং অধ্যাপক গোলাম আযমকে দেশ থেকে বের করে দিতে হবে।
১৯৯২ সনের মার্চ মাসের মাঝামাঝি তারা ‘গণআদালত’ গঠনের ঘোষণা দেয়।
অধ্যাপক গোলাম আযমের বিরুদ্ধে কোন মামলা দায়ের হয়নি। তিনি কোন অপরাধের সাথে জড়িত ছিলেন না। দেশের আদালতে গিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ প্রমাণ করা যাবে না। সেই জন্য তারা আদালতের শরণাপন্ন না হয়ে তথাকথিত গণআদালত গঠনের উদ্যোগ নেয়।
জাহানারা ইমামকে এই আদালতের চেয়ারম্যান বানানো হয়। সদস্য ছিলেন এড. গাজিউল হক, ড. আহমদ শরীফ, স্থপতি মাযহারুল ইসলাম, ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ, ফয়েজ আহমদ, প্রফেসর কবীর চৌধুরী, কলিম শরাফী, মাও. আবদুল আউয়াল, লে. কে. (অব.) কাজী নূরুজ্জামান, লে. ক. (অব.) আবু ওসমান চৌধুরী ও ব্যারিস্টার শওকত আলী খান।
১৯৯২ সনের ২৬শে মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গণআদালত বিচার কার্য পরিচালনা করবে বলে ঘোষণা করা হয়।
দেশে একটি প্রতিষ্ঠিত সরকারের বর্তমানে এই ধরনের গণআদালতের ঘোষণা ছিলো অবৈধ ও বেআইনি। বিস্ময়ের ব্যাপার, এই আদালতের আয়োজকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে সরকার ১৯৯২ সনের ২৪শে মার্চ রাত ৩টার সময় অধ্যাপক গোলাম আযমের নিকট একটি শোকজ নোটিশ হস্তান্তর করে।
এতে বলা হয়, যেহেতু ১৮-৪-৭৩ তারিখের বিজ্ঞপ্তি দ্বারা আপনাকে বাংলাদেশের নাগরিক থাকার অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছিলো, যেহেতু আপনি নিবন্ধনকৃত বিদেশী এবং যেহেতু আপনি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদের পরিপন্থী কাজ করে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ-এর আমীর হয়েছেন, অতএব আপনাকে ২৪শে মার্চ বেলা ১০টার মধ্যে কারণ দর্শানোর জন্য নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে, কেন আপনাকে বাংলাদেশ থেকে বহিষ্কার করা হবে না এবং আইনগত অন্যান্য ব্যবস্থা নেওয়া হবে না।
নোটিশ প্রাপ্তির পর তাড়াহুড়ো করে জওয়াব তৈরি করতে হয়। জামায়াতে ইসলামীর সংসদীয় দলের উপনেতা মাওলানা আবদুস সুবহান স্বরাষ্ট্র সচিবের নিকট সকাল ১০টাতেই উক্ত জওয়াব পৌঁছিয়ে দেন।
২৪শে মার্চ খবর ছড়িয়ে পড়ে যে অধ্যাপক গোলাম আযমকে গ্রেফতার করা হচ্ছে। জামায়াতে ইসলামীর হাজার হাজার কর্মী ও সাধারণ মানুষ মগবাজার কাজী অফিস লেনে জমায়েত হয়। তাদের মুখে উচ্চারিত হতে থাকে গগণবিদারী শ্লোগান।
রাত ১১টায় অধ্যাপক গোলাম আযম তাঁর অফিস কক্ষে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃবৃন্দ ও পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে কিছু কথা বলেন। অতঃপর তিনি কেন্দ্রীয় কারাগারে যাওয়ার জন্য বাইরে আসেন। তাঁকে দেখে সমবেত জনতার মাঝে কান্নার রোল পড়ে যায়।
তিনি সমবেত জনমণ্ডলীর উদ্দেশ্যে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন।
বক্তব্যে তিনি বলেন,
‘আপনারা মনে রাখবেন, ভাবপ্রবণ হয়ে জোশের চোটে যদি হুঁশ হারিয়ে ফেলেন, তাহলে কোন কল্যাণ হবে না। অন্যরা যতো যুলুম-অত্যাচারই করুক না কেন, আপনারা প্রতিশোধ নেবেন না। প্রতিশোধ নেওয়া আমাদের রাসূলের তরিকা নয়। কেউ সন্ত্রাস করলেও আমরা সন্ত্রাস করবো না এবং সন্ত্রাস না করেই তাদেরকে পরাজিত করবো। সন্ত্রাসের মোকাবেলা সন্ত্রাস দিয়ে হবে না। সন্ত্রাসের মোকাবেলা ধৈর্য দিয়েই করতে হবে।’
অতঃপর তিনি পুলিশের একটি গাড়িতে ওঠেন। আরো একটি জিপ ও ৩টি লরি ভর্তি পুলিশ তাঁকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলো। তিনি রাত পৌনে বারোটায় গাড়িতে ওঠেন। ভিড় ঠেলে কাজী অফিস লেন পার হতে সময় লাগে ২০ মিনিট।
২৫শে মার্চ একটি সরকারি প্রেসনোটে বলা হয় অধ্যাপক গোলাম আযমকে কারণ দর্শানোর একটি নোটিশ দেওয়া হয়। তিনি যথাসময়ে উক্ত নোটিশের জওয়াব প্রদান করেন। তবে তাঁর জওয়াব সরকারের নিকট গ্রহণযোগ্য হয়নি। এমতাবস্থায় সরকার ‘ফরেনার্স এ্যাকট’-এর আওতায় অধ্যাপক গোলাম আযমকে আটকের আদেশ প্রদান করেছে।
১৯৯২ সনের ২৫শে মার্চ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সাংবাদিক সম্মেলনে ভারপ্রাপ্ত আমীর আব্বাস আলী খান বলেন, ‘অধ্যাপক গোলাম আযম জন্মগতভাবে বাংলাদেশী নাগরিক এবং তাঁর পূর্বপুরুষগণও বাংলাদেশের ভূ-সীমার মধ্যে জন্মগ্রহণ করেছেন।’ ‘অধ্যাপক গোলাম আযম যেহেতু কখনো তাঁর নাগরিকত্ব পরিত্যাগ করেননি, সেহেতু জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ-এর আমীর হওয়ার সম্পূর্ণ অধিকার তাঁর রয়েছে। এটা বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৮ নাম্বার অনুচ্ছেদের পরিপন্থী নয়।’
‘অধ্যাপক গোলাম আযম বিগত ১৪ বছর ধরে বাংলাদেশে নিজ বাসভবনে বসবাস করে আসছেন। এতে করে সরকার ল অব ইকুইসেন্স মুতাবিক স্বীকার করে নিয়েছে যে অধ্যাপক গোলাম আযম বাংলাদেশের নাগরিক। এটা সরকার এখন আইনত অস্বীকার করতে পারে না।’
এই সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক ইউসুফ আলী, জনাব আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ, জনাব মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, মাওলানা আবদুস সুবহান, আবদুল কাদের মোল্লা এবং অ্যাডভোকেট শেখ আনসার আলী।
১৯৯২ সনের ২৬শে মার্চ অবৈধ ও বেআইনি গণআদালত অধ্যাপক গোলাম আযমের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কর্তৃক গণহত্যা, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ, জনপদ ধ্বংস, নারী ধর্ষণ প্রভৃতি অপরাধজনক কাজে মদদকারী এবং স্বয়ং শান্তি কমিটি, আলবদর, আল-শামস বাহিনী গঠন করে এবং হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীকে রাজাকার বাহিনী গঠনে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করে গণহত্যা, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ, জনপদ ধ্বংস, নারী ধর্ষণের ন্যায় জঘন্য অপরাধ সংঘটনের নির্দেশ প্রদান, প্ররোচিতকরণ, বুদ্ধিজীবী হত্যার নীলনকশা প্রণয়ন করে নিজস্ব বাহিনী আলবদর, আল-শামসকে দিয়ে তাদের হত্যা করানো এবং মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তীকালে ‘পূর্ব পাকিস্তান পুনরুদ্ধার কমিটি’ গঠন করে বিদেশী শত্র“র চর হিসেবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে অপরাধ সংঘটনের বানোয়াট অভিযোগ গঠন করে।
সাক্ষী ছিলেন ড. আনিসুজ্জামান (অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ড. বোরহানুদ্দীন খান জাহাঙ্গীর, (অধ্যাপক, রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়), ড. মেঘনাদ গুহ ঠাকুরতা (শিক্ষক,
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়),  সৈয়দ শামসুল হক (কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার), শাহরিয়ার কবীর (সাহিত্যিক, সাংবাদিক), মুশতারী শফী (লেখিকা), সাইদুর রহমান, অমিতাভ কায়সার, হামিদা বানু, আলী যাকের, ড. মুশতাক হোসেন, মাওলানা ইয়াহইয়া মাহমুদ এবং আরো তিন জন।
তথাকথিত গণআদালত অধ্যাপক গোলাম আযমকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে এবং এক মাসের মধ্যে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানায়।
১৯৯২ সনের ৩১শে মার্চ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার জরুরি অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। অধিবেশনে গৃহীত একটি প্রস্তাবে আমীরে জামায়াত অধ্যাপক গোলাম আযমের গ্রেফতারির নিন্দা করা হয় এবং তাঁর আশু মুক্তি দাবি করা হয়। অপর প্রস্তাবে তথাকথিত গণআদালতিদের অপতৎপরতার নিন্দা করা হয় এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সরকারের নিকট দাবি জানানো হয়।
সারাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী ও সমাজবাদীদের আয়োজিত সভা সমাবেশের চেয়ে অনেক বড় আকারের সভাসমাবেশ এবং মিছিলে অধ্যাপক গোলাম আযমের মুক্তির দাবি উচ্চারিত হতে থাকে। সারাদেশে ব্যাপক হারে পোস্টার লাগানো হয়।
ভারপ্রাপ্ত আমীর আব্বাস আলী খান এবং সেক্রেটারি জেনারেল মতিউর রহমান নিজামী বিভিন্ন সভা সমাবেশে জোরালো বক্তব্য রাখতে থাকেন।
১৯৯২ সনের এপ্রিল মাসেই অধ্যাপক গোলাম আযমের পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ডিভিশনে দু’টি মামলা করা হয়।
বিচারপতি আবদুল জলিল ও বিচারপতি রুহুল আমীনের বেঞ্চে অধ্যাপক গোলাম আযমের গ্রেফতারিকে অবৈধ দাবি করে মামলা দায়ের করা হয়।
বিচারপতি ইসমাঈলুদ্দীন সরকার ও বিচারপতি বদরুল ইসলাম চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চে অধ্যাপক গোলাম আযমকে বাংলাদেশের নাগরিকত্বের অযোগ্য ঘোষণা করে সরকার যেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা সম্পূর্ণরূপে বেআইনি বলে দাবি করা হয়।
জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে মামলা দু’টির তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব  সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান  মোহাম্মদ মুজাহিদের ওপর অর্পণ করা হয়। আর মামলা পরিচালনার দায়িত্ব অর্পিত হয় ব্যারিস্টার এ.আর. ইউসুফ ও ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের ওপর।
১৯৯২ সনের ১২ই অগাস্ট হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ নাগরিকত্ব মামলার রায় ঘোষণা করে। বিচারপতি ইসমাঈলুদ্দীন সরকার নাগরিকত্ব বাতিলের পক্ষে রায় দেন। অপর দিকে বিচারপতি বদরুল ইসলাম চৌধুরী বাতিলের আদেশটিকে অবৈধ বলে রায় দেন।
বিভক্ত রায় হওয়ায় মামলাটি তৃতীয় বিচারপতি আনোয়ারুল হক চৌধুরীর বেঞ্চে প্রেরিত হয়।
১৯৯৩ সনের ২২শে এপ্রিল বিচারপতি আনোয়ারুল হক চৌধুরী অধ্যাপক গোলাম আযমের পক্ষে রায় দেন। দুঃখের বিষয়, সরকার এই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আবেদন পেশ করে।
১৯৯৩ সনের ১৩ই জুলাই হাইকোর্ট ডিভিশন বেঞ্চ অধ্যাপক গোলাম আযমকে গ্রেফতার করা অবৈধ বলে যেই মামলা করা হয়, সেই মামলার রায় ঘোষণা করে। রায়ে তাঁকে আটক রাখা বেআইনি বলে ঘোষণা করা হয়।
১৯৯৩ সনের ১৫ই জুলাই সকাল ১১টায় অধ্যাপক গোলাম আযম কেন্দ্রীয় কারাগারের গেটে এলে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতা ও কর্মীগণ বুলন্দ কণ্ঠে শ্লোগান দিতে থাকে। তাঁর গাড়ি অনুসরণ করে বিশাল মিছিল মগবাজারের দিকে এগিয়ে চলে। একটা ছোট মঞ্চ তৈরি করা হয়। এতে ওঠে অধ্যাপক গোলাম আযম সমবেত জনগণের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখেন। অধ্যাপক গোলাম আযম এবার ষোল মাস পর জেল থেকে মুক্তি লাভ করেন।
১৯৯৪ সনের ৪ঠা মে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে অধ্যাপক গোলাম আযমের নাগরিকত্ব মামলার শুনানি শুরু হয়। এটর্নি জেনারেল ৪ঠা মে থেকে শুরু করে ১৬ই মে-এর মধ্যে মোট সাত দিন তাঁর বক্তব্য পেশ করেন। অধ্যাপক গোলাম আযমের পক্ষে বক্তব্য রাখেন ব্যারিস্টার এ.আর.ইউসুফ।
১৯৯৪ সনের ২২শে জুন রায় ঘোষণার তারিখ নির্ধারিত হয়। বহুসংখ্যক ব্যারিস্টার, এডভোকেট এবং নেতাকর্মী আদালতকক্ষ ও চত্বরে ভিড় জমিয়েছিলেন। বিচারপতি মুহাম্মাদ হাবিবুর রহমান (প্রিজাইডিং জজ), বিচারপতি এ.টি.এম. আফজল, বিচারপতি মুসতাফা কামাল এবং বিচারপতি লতিফুর রহমান সর্বসম্মতভাবে অধ্যাপক গোলাম আযমের নাগরিকত্ব বাতিলের নির্দেশটিকে অবৈধ বলে রায় দেন।
১৯৯৪ সনের ২৩শে জুন জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী শাখা বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে ‘শুকরিয়া সমাবেশে’র আয়োজন করে।
দীর্ঘ ২৩ বছর পর জনসভায় দাঁড়িয়ে অধ্যাপক গোলাম আযম এক দীর্ঘ ও জ্ঞানগর্ভ ভাষণ পেশ করেন।
ভাষণে তিনি বলেন, “বাংলাদেশ আমার দেশ। এ দেশেই আমার জন্ম। জন্ম আমার এ দেশের রাজধানী ঢাকাতেই। জন্মগত নাগরিকত্ব আল্লাহর দান। কে কোথায় জন্ম নেবে তার ফায়সালা তিনিই করেন। জন্মসূত্রের নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়ার অধিকার কারো নেই, তবু কেড়ে নেয়া হয়েছিলো। আজ আমার কোন দুঃখ নেই। আল্লাহ তা’আলা সম্মানের সঙ্গে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের মাধ্যমে আমার নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দিয়েছেন। আলহামদুলিল্লাহ।”
“আমার কোন ব্যক্তিগত উচ্চাকাক্সক্ষা নেই। আমি নিজে দেশের বড় কিছু হবো, দেশের কোন কর্তা হবো এ ধরনের কোন কামনা আমার নেই। কিন্তু একটি কামনাই আমাকে অস্থির করে তোলে। দুনিয়া থেকে যখন বিদায় নেবো, আমার দেশের ১২ কোটি মানুষকে কী অবস্থায় রেখে যাবো। তাদেরকে সুখী ও নিরাপত্তাবোধ নিয়ে বেঁচে থাকার মতো অবস্থায় রেখে যেতে পারব কি নাÑ এটা আমার বড়ো চিন্তা।”
“জাতীয় ঐক্য ছাড়া দেশ গড়া যাবে না। এ কথাটা চিন্তা করা সহজ, কাজটা সবচে’ কঠিন। কিভাবে আমাদের দেশের মানুষ এ দুর্নাম থেকে মুক্তি পাবে যে, এটা গরিব এবং ভিক্ষুকের দেশ। সারা দুনিয়ায় এ বদনামের বোঝা আমরা বয়ে বেড়াচ্ছি। এদেশের মানুষের উন্নতি হোক এবং দুর্নাম ঘুচুক এটাই আমাদের সবচে’ বড় সাধনা, সবচে’ বড় কামনা। এ বিরাট কাজটা এমনি এমনি হবে না। কোন একটি দলের পক্ষেও সম্ভব হবে না। কোন দলীয় সরকারও একাকী পারবে না। দেশে অনেক সমস্যা। তাই আমি আরো মনে করি, এ বিরাট কাজ করা তখনই সম্ভব হবে, যখন আমরা রাজনৈতিক ভেদাভেদ, হিংসা-বিদ্বেষ, সন্ত্রাসী রাজনীতি এবং উত্তেজনাপূর্ণ রাজনীতি ইত্যাদি ক্ষান্ত করে সবাই সুস্থ রাজনীতি করতে রাজি হবো। আমি মনে করি, দেশ গড়ার চিন্তা-ভাবনা যাদের আছে, তারাই রাজনীতি করেন। আর রাজনৈতিক ময়দানে যারা নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাদের চেষ্টা সাধনার ওপরই জনগণের ঐক্য নির্ভর করে। জনগণের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে কোন নেতৃত্ব সফল হবে না। জনগণের মধ্যে ঐক্য সৃষ্টি করেই সত্যিকারভাবে দেশের কল্যাণ করা সম্ভব। এ ঐক্যের জন্য আসুন, আমরা সকলে চেষ্টা করি।”

লালদিঘি ময়দানে জামায়াতে ইসলামীর জনসভা
১৯৯৪ সনের ২৬শে জুলাই চট্টগ্রামের লালদিঘি ময়দানে জামায়াতে ইসলামীর জনসভার দিন ধার্য হয়।
স্থির হয় প্রধান বক্তা থাকবেন আমীরে জামায়াত অধ্যাপক গোলাম আযম।
লালদিঘি ময়দান সরকারি মুসলিম হাইস্কুলের খেলার মাঠ। জামায়াতে ইসলামী কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে জনসভা অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নিতে থাকে।
ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি নামক ইসলামবিদ্বেষী সংস্থাটি ঢাকার জনসভার সময় নীরব ছিলো। কিন্তু চট্টগ্রামের জনসভা ঘোষিত হলে ঐ সংস্থাটি জনসভা হতে দেবে না বলে ঘোষণা দেয়। উক্ত সংস্থার কর্মীরা দেয়ালে সাঁটানো জামায়াতে ইসলামীর বহুসংখ্যক পোস্টার ছিঁড়ে ফেলে। বেশ কিছু স্পটে মাইক পাবলিসিটিতে বাধা দেয়। সারা শহরে তারা আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয় যাতে ভয়ে জনগণ সেই জনসভায় উপস্থিত না হয়।
পুলিশ কমিশনার চট্টগ্রাম জামায়াতে ইসলামীর নেতৃবৃন্দকে জনসভা বাতিল করার অনুরোধ জানাতে থাকেন। নেতৃবৃন্দ পুলিশ কমিশনারকে বলেন, “আমরা কোন বেআইনি কাজ করছি না। জনসভা করা আমাদের বৈধ অধিকার। এই অধিকার সংরক্ষণ ও নিশ্চিত করার দায়িত্ব আপনার। সন্ত্রাসীরা অবৈধ তৎপরতা চালাচ্ছে। তাদেরকে দমন করার জন্য পুলিশবাহিনী রয়েছে। তাদেরকে দমনের বদলে জামায়াতে ইসলামীকে দমন করার চেষ্টা করছেন কেন? জামায়াতে ইসলামী জনসভা করবে, আইনশৃংখলার দায়িত্বে নিযুক্ত পুলিশবাহিনী সন্ত্রাসীদেরকে দমনের দায়িত্ব পালন করবে, এটাই কাম্য।”
সন্ত্রাসীরা যাতে ময়দান দখল করতে না পারে, সেই জন্য আগের দিন দুপুরেই জামায়াতে ইসলামীর দুই হাজার স্বেচ্ছাসেবক ময়দান দখলে নেন। বিকেলে সন্ত্রাসীরা মিছিল করে এসে ঢিল ছুঁড়তে থাকে। স্বেচ্ছাসেবকগণ তাদেরকে তাড়িয়ে দেন।
রাতে স্বেচ্ছাসেবকগণ ময়দানেই অবস্থান করেন। শেষ রাতে তাঁরা ছালাতুত্ তাহাজ্জুদ আদায় করে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামিনের নিকট দু’আ করতে থাকেন।
ইসলামবিদ্বেষীদের তৎপরতা জনগণের মাঝে উৎসুক্য সৃষ্টি করে। যাদের আসার কথা নয় এমন ব্যক্তিরাও পরিস্থিতি প্রত্যক্ষ করার জন্য এগিয়ে আসেন। সভা শুরুর আগেই মাঠ এবং মাঠের তিন দিক লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। বিকেল তিনটায় আল কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে জনসভার কাজ শুরু হয়।
সন্ত্রাসীরা নিউ মার্কেটে সমবেত হয়ে দাম্ভিকতাপূর্ণ বক্তব্য রাখতে থাকে। তাদের মধ্যে কিছু সংখ্যক লোক ছিলো অস্ত্রধারী।
জনসভা মঞ্চের দেড়শত গজ দূরে ছিলো কোতোয়ালি থানা। জনসভা এবং সন্ত্রাসীদের মাঝে পুলিশের দু’টি গ্র“প দাঁড় করিয়ে রাখা হয়।
এক পর্যায়ে সন্ত্রাসীরা পুলিশের প্রথম গ্র“পের বাধা উপেক্ষা করে জনসভার দিকে অগ্রসর হয়। অতঃপর তারা পুলিশের দ্বিতীয় গ্র“পকেও অতিক্রম করে সামনে এগুতে থাকে। জামায়াতে ইসলামীর স্বেচ্ছাসেবকগণ পরিস্থিতি সামলাবার জন্য অগ্রসর হন। সন্ত্রাসীরা বেপরোয়া গুলি চালাতে থাকে। তাদের গুলিতে আবুল খায়ের ও জাফর আহমাদ নামক দু’জন নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তি শাহাদাত বরণ করেন। আহত হন কয়েকশত লোক। সন্ত্রাসীদের গুলি উপেক্ষা করে স্বেচ্ছাসেবকগণ জনসভার শৃংখলা নিশ্চিত করেন। শত শত আহত ব্যক্তির আঘাতগুলো সবই ছিলো তাঁদের শরীরের সম্মুখ দিকে, পেছনের দিকে নয়।
অধ্যাপক গোলাম আযম ২৩ বছর পর লালদিঘি ময়দানে বক্তব্য পেশ করেন। চট্টগ্রামের এই সফল জনসভা জামায়াতে ইসলামীর অগ্রগতির পথে একটি মাইলফলক স্থাপন করে।
(চলবে)
লেখক : সাবেক নায়েবে আমির
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী

তথ্যসূত্র :
১. এম. এ. ওয়াজেদ মিয়া, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ঘিরে কিছু ঘটনা ও বাংলাদেশ, পৃষ্ঠা-১৩০।
২. উদ্ধৃত, আবুল আসাদ, কালো পঁচিশের আগে ও পরে, পৃষ্ঠা : ২৭৬-২৭৭।
৩. শর্মিলা বসু, ডেড রেকনিং, পৃষ্ঠা-১৮১।
৪. খন্দকার আবুল খায়ের, ৭১-এ কি ঘটেছিল রাজাকার করা ছিল, পৃষ্ঠা-৬,৭,৮,৯।
৫. মওদুদ আহমদ, বাংলাদেশ : শেখ মুজিবর রহমানের শাসনকাল, পৃষ্ঠা-৭৫।
৬. আতিক হেলাল সম্পাদিত, মেজর জলিল রচনাবলী, পৃষ্ঠা-৩৫।

SHARE

Leave a Reply