রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামী

এ.কে.এম. নাজির আহমদ

(গত সংখ্যার পর)

Jamat১৯৯৬ সনের ১৫ই ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, আওয়ামী লীগ এবং জামায়াতে ইসলামীর যুগপৎ আন্দোলনের ফলেই স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের পতন ঘটে। প্রতিষ্ঠিত হয় বিচারপতি শাহাবুদ্দীন আহমদের পরিচালনাধীন কেয়ারটেকার সরকার। এই কেয়ারটেকার সরকার একটি সুষ্ঠু নির্বাচন জাতিকে উপহার দিতে সক্ষম হয়। জামায়াতে ইসলামীর ১৮ জন সংসদ সদস্যের সমর্থন নিয়ে বাংলাদেশ জাতায়তাবাদী দল সরকার গঠন করে।
নবগঠিত সরকারের উচিত ছিলো অবিলম্বে সংবিধানে কেয়ারটেকার সরকারপদ্ধতি সংযোজিত করে নেয়া। রহস্যজনক কারণে সরকার কেয়ারটেকার পদ্ধতি সংবিধানে সংযোজন করার ব্যাপারে অনীহা প্রদর্শন করতে থাকে। জামায়াতে ইসলামী, আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি সংসদে উত্থাপনের জন্য কেয়ারটেকার সরকারপদ্ধতি বিল জমা দেয়। কিন্তু সরকারি দলের সিদ্ধান্ত ছাড়া এই বিষয়ে আলোচনা শুরু হতে পারছিলো না। সরকারের অপ্রত্যাশিত মনোভঙ্গি ও ভূমিকার কারণে রাজনৈতিক অঙ্গন আবার উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ফলে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামী কেয়ারটেকার সরকারপদ্ধতি সংবিধানে সংযোজনের দাবিতে যুগপৎ আন্দোলন শুরু করতে বাধ্য হয়। জামায়াতে ইসলামী সরকার গঠনে যেই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে সহযোগিতা করলো, সেই দলের সরকারের বিরুদ্ধেই আন্দোলনে নামতে বাধ্য হলো।
এক পর্যায়ে আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে। সরকারের পক্ষে মেয়াদ পূর্ণ করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। এই পরিস্থিতিতেই সরকার ১৯৯৬ সনের ১৫ই ফেব্র“য়ারি ষষ্ঠ জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত করে। আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামী এই নির্বাচন বর্জন করে।
এই অস্বাভাবিক নির্বাচনের পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল সরকার গঠন করে। এই সরকার দুই সপ্তাহের মধ্যে সংবিধানে কেয়ারটেকার পদ্ধতি সংযোজন করে পদত্যাগ করে।

১৯৯৬ সনের ১২ই জুন অনুষ্ঠিত সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ
১৯৯৬ সনের ১২ই জুন অনুষ্ঠিত হয় সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন।
সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় রাষ্ট্রপতি ছিলেন বিচারপতি শাহাবুদ্দীন আহমদ। কেয়ারটেকার সরকারপ্রধান ছিলেন বিচারপতি মুহাম্মাদ হাবিবুর রহমান।
এই কেয়ারটেকার সরকারে অপরাপর উপদেষ্টা ছিলেন সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদ, ড. মুহাম্মদ ইউনুস, ড. ওয়াহিদউদ্দীন মাহমুদ, অধ্যাপক শামসুল হক, অধ্যাপক জামিলুর রহমান চৌধুরী, শেগুফতা বখত চৌধুরী, এ.জেড.এম. নাছির উদ্দীন, সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী, ড. নাজমা চৌধুরী ও মেজর জেনারেল (অব:) আবদুর রহমান খান।
নির্বাচনের পূর্বে আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা মাক্কায় গিয়ে উমরা পালন করেন। দেশে ফিরে ইহরামের পট্টিবাঁধা অবস্থায় তাসবিহমালা হাতে নিয়ে তিনি নির্বাচনী অভিযানে নামেন। গোটা নির্বাচনী অভিযানে তিনি দুই হাত জোড় করে জনগণের নিকট দলের অতীত ভুলের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং দলটিকে আরেকবার ক্ষমতাসীন করার জন্য বিনীতভাবে ভোটারদের প্রতি আবেদন জানান।
এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ১৪৬টি আসন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ১১৬টি আসন, জাতীয় পার্টি (এরশাদ) ৩২টি আসন এবং জামায়াতে ইসলামী ৩টি আসন লাভ করে।
জামায়াতে ইসলামী থেকে জাতীয় সংসদে নির্বাচিত তিনজন সদস্য হচ্ছেন মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী (পিরোজপুর), কাজী শামসুর রহমান (সাতক্ষীরা) এবং মিজানুর রহমান চৌধুরী (নীলফামারী)
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে জামায়াতে ইসলামীর এটি চতুর্থ উপস্থিতি।
জাতীয় পার্টির (এরশাদ) সমর্থন নিয়ে আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা সরকার গঠন করেন।
১৯৯৬ সনের ২২শে জুলাই জাতীয় সংসদ বিচারপতি শাহাবুদ্দীন আহমদকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করে।
ক্ষমতাসীন হয়ে শেখ হাসিনার জনগণ কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত ‘ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ’-ই তাঁর দলের আদর্শ বলে ঘোষণা করেন। মাদরাসা শিক্ষাকে সংকুচিত করে ফেলার প্রয়াস চালান। তাঁর দল মাদরাসাগুলোকে ‘মৌলবাদীদে’র আখড়া বলে প্রচারণা চালাতে থাকে। কোথাও কোন বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটলে এটি মৌলবাদীদের কাজ বলে প্রচারণা চলতে থাকে। আর ‘মৌলবাদী’ বলতে তাঁরা ইসলামপন্থীদেরকে বুঝাতেন। বড়ো বড়ো কয়েকজন আলেমকে গ্রেফতার করে আলেমসমাজের মাঝে ত্রাস সৃষ্টি করা হয়। গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, প্রতিষ্ঠান, সংস্থার নামের পূর্বে “বঙ্গবন্ধু” যোগ করা হয়। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, পেশাজীবী সংগঠন, হাটবাজার, সরকারি খাস জমি ইত্যাদি দলীয় লোকদের নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। মন্ত্রিসভা প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন হিসেবে ব্যবহৃত ‘গণভবন’টিকে শেখ হাসিনার স্থায়ী বাসভবন হিসেবে বরাদ্দ দেয়। শেখ হাসিনা ঘোষণা করেন যতোদিন তিনি রাজনীতি করবেন, ততোদিন গণভবনেই থাকবেন। জাতীয় ঐক্য গড়ার বিপরীত তিনি জাতীয় বিভেদ সৃষ্টির নীতি গ্রহণ করেন। ‘স্বাধীনতার পক্ষ’ এবং ‘স্বাধীনতার বিপক্ষ’ শক্তির ধুয়া তুলে তিনি ইসলামী শক্তিকে ঘায়েল করার অপপ্রয়াস চালাতে থাকেন। তাঁর সময়ে বিরোধী দলের ডাকা হরতাল বানচাল করার লক্ষ্যে সরকারি দলের পক্ষ থেকে জংগি মিছিল বের করার সংস্কৃতি চালু হয়। বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য শাসন বিভাগের সহযোগিতা প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সর্বোচ্চ আদালতের প্রতি কটাক্ষ করে বারবার বক্তব্য রেখেছেন। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি অত্যন্ত শালীন ভাষায় তাঁকে সতর্ক করা সত্ত্বেও তিনি সংশোধিত হননি।
ইসলামের প্রতি বিদ্বেষের কারণে শেখ হাসিনার শাসনামলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন বাংলাদেশে এলে তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে ‘মৌলবাদীদের উত্থান’ বিষয়ক পুস্তিকায় একটি ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরা হয়। তবে মি. ক্লিনটন এর দ্বারা বিভ্রান্ত হননি।

গ্যারান্টি ক্লজবিহীন ফারাক্কা চুক্তির প্রতিবাদ
ফারাক্কা ভারতের অঙ্গরাজ্য পশ্চিম বঙ্গের মুর্শিদাবাদ জিলার রাজমহল ও ভগবানগোলার মাঝে অবস্থিত একটি স্থান। এটি বাংলাদেশের চাঁপাইনওয়াবগঞ্জ জিলার পশ্চিম সীমানা থেকে ১৮ কিলোমিটার (১১ মাইল) দূরে অবস্থিত। কলকাতা বন্দরের নাব্যতা বৃদ্ধির প্রয়োজনের কথা বলে ভারত সরকার ১৯৬১ সনে ফারাক্কা নামক স্থানে গঙ্গা নদীতে একটি বাঁধ নির্মাণ শুরু করে। এই বাঁধের নির্মাণকাজ সমাপ্ত হয় ১৯৭৪ সনের ডিসেম্বর মাসে।
শেখ মুজিবুর রহমানের সম্মতি নিয়ে ভারত সরকার ৪০ দিনের জন্য পরীক্ষামূলকভাবে বাঁধের সবগুলো গেট খুলে দেয় ১৯৭৫ সনের ২১শে এপ্রিল। কিন্তু প্রতিশ্র“ত মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে যাওয়ার পরও গেটগুলো আর কখনো বন্ধ হয়নি।
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে গঙ্গার পানির ন্যায্য শেয়ার প্রাপ্তির লক্ষ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরের প্রয়াস চালানো হয়।
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান জাতিসংঘের ৩১তম অধিবেশনে গঙ্গার পানিবণ্টন ইস্যুটি উত্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। কিন্তু কয়েকটি বন্ধু রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের ফলে ইস্যুটি শেষ পর্যন্ত জাতিসংঘে উত্থাপিত হয়নি।
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ১৯৭৭ সনের ৫ই নভেম্বর গঙ্গার পানিবণ্টন বিষয়ে ভারতের সঙ্গে একটি চুক্তি হয়। ১৯৮৮ সনে চুক্তির মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে যায়। কোন চুক্তি ব্যতিরেকেই ভারত ১৯৮৮ সন থেকে ১৯৯৬ সন পর্যন্ত একতরফা পানি প্রত্যাহার করতে থাকে।
১৯৯৬ সনের ১২ই ডিসেম্বর শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার গঙ্গার পানিবণ্টন বিষয়ে ভারতের সাথে ফারাক্কা চুক্তি নামে একটি চুক্তি সম্পাদন করে।
১৯৭৭ সনের ৫ই নভেম্বর সম্পাদিত ৫ বছর মেয়াদি চুক্তিতে শুকনো মওসুমে বাংলাদেশ গঙ্গা নদীর ৮০ ভাগ পানি পাওয়ার গ্যারান্টি ক্লজ ও বিরোধ নিরসনে সালিশি ক্লজ সংযোজিত ছিলো। কিন্তু ১৯৯৬ সনের ১২ই ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত চুক্তিতে বন্যা ও খরা দেখা দিলে পানি প্রবাহের হার কত হবে তা স্পষ্ট করে উল্লেখ নেই।
একজন নদী বিশেষজ্ঞ বলেন, “বাংলাদেশ ভাটির দেশ হিসেবে ভারতের সাথে অভিন্ন নদীসমূহের পানিতে ন্যায়পরায়ণতা ও যৌক্তিকতার নীতি অনুসারে শুষ্ক মৌসুমে চাহিদার নিম্নতম পরিমাণ পানি পাওয়ার অধিকার রাখে। ফলে ফারাক্কা চুক্তিতে গ্যারান্টি ক্লজ না থাকা ভারতকে অসম সুবিধা প্রদান করেছে।
অপরপক্ষে দু’দেশের চুক্তির বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার জন্য নিরপেক্ষ সালিশীর সুবিধা রাখা অপরিহার্য ছিলো। ফারাক্কা চুক্তিতে এই সালিশীর সুবিধা না থাকায় ভারতের কোন অন্যায় আচরণ বা চুক্তির শর্তভঙ্গের কারণে কোথাও নালিশ করার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে বাংলাদেশ।”
ফারাক্কা বাঁধের মাধ্যমে গঙ্গা নদীর পানি প্রত্যাহার ও গতিপথ পরিবর্তনের জন্য যেসব সমস্যার উদ্ভব হয়েছে সংক্ষেপে সেগুলো হলো :
১. ইতোমধ্যেই বাংলাদেশের অনেকগুলো নদী মরে গেছে। যেমন, গড়াই নদী (কুষ্টিয়া-মাগুরা), চিকনাই নদী (নাটোর-পাবনা), বড়াল নদী (নাটর-পাবনা), মুসা খান নদী (নাটোর), মানস নদী (বগুড়া), হরিহর নদী (যশোর), মুক্তেশ্বরী নদী (যশোর), হরাই নদী (রাজবাড়ী), কালিগঙ্গা নদী (ঝিনাইদহ), ভৈরব নদী (মেহেরপুর-চুয়াডাঙ্গা-ঝিনাইদহ-যশোর-খুলনা-বাগেরহাট), পালং নদী (শরীয়তপুর), বামনি নদী (লক্ষ্মীপুর-নোয়াখালী), হামকুড়া নদী (খুলনা) এবং মুড়িচাপ নদী (সাতক্ষীরা)।
আরো কতগুলো নদী মরার পথে। যেমন, করতোয়া নদী (পঞ্চগড়-নিলফামারী-রংপুর-বগুড়া-সিরাজগঞ্জ), ইছামতি নদী (পাবনা), নবগঙ্গা নদী (চুয়াডাঙ্গা-ঝিনাইদহ-মাগুরা), চিত্রা নদী (নড়াইল-চুয়াডাঙ্গা-ঝিনাইদহ), ভাদ্রা নদী (যশোর-খুলনা) এবং কুমার নদী (কুষ্টিয়া-মাগুরা-ঝিনাইদহ-ফরিদপুর-মাদারীপুর)।
২. “শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের বৃহত্তর সেচপ্রকল্প গঙ্গা-কপোতাক্ষ প্রকল্পের ৩ লাখ একর জমিতে সেচের জন্য পানির দু®প্রাপ্যতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। তিস্তা নদীর বাঁধের নিকটে শুষ্ক মৌসুমে এখন জেগে উঠেছে বিস্তৃত বালুচর এবং বর্ষায় দেখা দিচ্ছে মারাত্মক প্লাবন ও বন্যা। ফলে যে জায়গায় এক সময় ছিল সবুজ ধানের সমারোহ, সেখানে দেখা দিয়েছে মরুকরণের আলামত।
৩. যখন গঙ্গা বেসিনের উজানে প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটে এবং হিমালয়ের বরফ গলতে থাকে তখন ফারাক্কা ব্যারেজে পানির প্রবল চাপ সৃষ্টি হয়। পানির চাপ এড়ানোর জন্য তখন প্রকল্পের সবকটি (১০১টি) স্লুইস গেট খুলে দেয়া হয়। ফলে বাংলাদেশে দেখা দেয় অকাল বন্যা।
৪. ফারাক্কা ব্যারাজের প্রভাবে দিন দিন নিচে নেমে যাচ্ছে বাংলাদেশের পানির স্তর। প্রতি বছর পানির স্তর নেমে যাচ্ছে প্রায় ৫ ফুট করে। ভূগর্ভস্থ পানির প্রায় ৮০ ভাগ বন্যার পানি থেকে সঞ্চিত হয়। ফারাক্কার প্রভাবে বাংলাদেশের পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার হার ক্রমাগত বৃদ্ধি পেতে থাকলে, কয়েক বছর পরে ইরি-বোরো চাষের জন্য ভূগর্ভস্থ পানি নেমে আসবে শূন্যের কোঠায়।
৫. ফারাক্কায় গঙ্গার পানি প্রত্যাহারের ফলে নদীর স্রোত হ্রাস পাওয়ায় দেশের দক্ষিণ অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে। শিল্প শহর খুলনা রূপসা নদীতে লবণাক্ততা এতই বৃদ্ধি পেয়েছে যে সেখানে নদীর পানি খাবারের জন্য ব্যবহার করা দূরের কথা কল-কারখানায় ব্যবহারের জন্যই অনুপযুক্ত হয়ে পড়ছে।
৬. গঙ্গা নদীর পানি দ্বারা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পলিমাটি জমির উর্বরা শক্তি বৃদ্ধি করার প্রাকৃতিক পদ্ধতি এখন বিপর্যস্ত। ফলে দিন দিন জমিতে রাসায়নিক সারের চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
৭. ইতোমধ্যে ফারাক্কার প্রভাবে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে মরুকরণের লক্ষণ শনাক্ত হয়েছে। এছাড়া লবণাক্ততা বৃদ্ধির ফলে দক্ষিণাঞ্চলের জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।”
জামায়াতে ইসলামী ভারত কর্তৃক গঙ্গা নদীর পানি যথেচ্ছ প্রত্যাহার করার বিরুদ্ধে গোড়া থেকেই প্রতিবাদ করে এসেছে। বিষয়টির ন্যায্য সমাধানের জন্য জাতিসংঘে উত্থাপনের দাবি জানিয়ে এসেছে।
১৯৯৬ সনে স্বাক্ষরিত গ্যারাণ্টি ক্লজবিহীন ৩০ বছর মেয়াদি চুক্তিও যে বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে সে সম্পর্কে সব সময়ই বক্তব্য দিয়ে এসেছে।

১৭ দফা দাবি নিয়ে আন্দোলন
১৯৯৭ সনের ১৭ই এপ্রিল জামায়াতে ইসলামী বিভিন্ন ইস্যু সমন্বিত করে জনমত গড়ে তোলার লক্ষ্যে ১৭ দফা দাবি প্রণয়ন করে। দাবিগুলো হচ্ছেÑ
১.    বাংলাদেশকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করতে হবে।
২.    বাংলাদেশের সংবিধানে আল্লাহর সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় সন্নিবেশিত থাকতে হবে।
৩.    কুরআন ও সুন্নাহকে আইনের উৎস ঘোষণা করতে হবে। এমন কোন আইন প্রণয়ন করা যাবে না এবং কোন প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেয়া যাবে না যা কুরআন-সুন্নাহর পরিপন্থী। পারিবারিক প্রচলিত আইনে কুরআন ও সুন্নাহ বিরোধী যেসব ধারা রয়েছে তা অবিলম্বে কুরআন-সুন্নাহর আলোকে সংশোধন করতে হবে।
৪.    কাদিয়ানিরা যেহেতু হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে শেষ নবী মানে না এবং শুরু থেকে অনৈসলামী কাজে লিপ্ত, তাদেরকে অমুসলিম ঘোষণা করতে হবে।
৫.    সুদ-ঘুষ, মদ-জুয়া, ব্যভিচার উচ্ছেদসহ সকল প্রকার শোষণ এবং যাবতীয় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে।
৬.    বাংলাদেশের স্বাধীনতা হিফাযাতের লক্ষ্যে শক্তিশালী সেনাবাহিনী গঠন করতে হবে এবং জনগণ ও সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে ইসলামী চেতনা ও জিহাদী জযবা সৃষ্টি করতে হবে।
৭.    (ক) বাংলাদেশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত গঙ্গাসহ সকল আন্তর্জাতিক নদীর ন্যায্য হিস্যা আদায় করতে হবে। ফারাক্কা বাঁধ চালু করার পর থেকে এ পর্যন্ত সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের যে ক্ষতি হয়েছে তা আদায়ের জন্য ভারতের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে ক্ষতিপূরণের মামলা দায়ের করতে হবে।
(খ) ভারতকে ট্রানজিটের নামে করিডোর এবং চট্টগ্রাম বন্দর  ব্যবহার করতে দেয়া যাবে না। ভারতের স্বার্থ রক্ষার জন্য সার্ককে অকার্যকর করে তথাকথিত উন্নয়ন চতুর্ভুজ বা অন্য নামে উপআঞ্চলিক জোট গঠন করা চলবে না।
৮.    ভারতের মদদপুষ্ট তথাকথিত শান্তিবাহিনীর সাথে বাংলাদেশের সংবিধানপরিপন্থী কোন চুক্তি করা যাবে না। পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে কোন অবস্থাতেই সশস্ত্রবাহিনী প্রত্যাহার করা চলবে না।
৯.    সরকারের মূল দায়িত্ব হবে সূরা আল হাজ্জের ৪১ নং আয়াত অনুযায়ী;
ক) নামায কায়েমের মাধ্যমে জনগণের চরিত্র গঠন ও আল্লাহভীতি সৃষ্টি।
খ) যাকাতব্যবস্থা বাস্তবায়নের মাধ্যমে দুস্থ ও অসহায় মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বিধান;
গ) সৎকাজ ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা;
ঘ) অসৎ কাজ ও অন্যায়ের প্রতিরোধ।
সরকারের আরো দায়িত্ব হবে
ঙ) জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল নাগরিকের ভাত-কাপড়, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা তথা মৌলিক মানবীয় প্রয়োজন পূরণ।
চ) সকল নাগরিকের জান-মাল-ইজ্জত আব্র“ তথা মানবাধিকারের হিফাজত, আইনের শাসন কায়েম, সন্ত্রাস নির্মূলকরণ ও গণতান্ত্রিক অধিকার সংরক্ষণ।
ছ) অবিলম্বে বিশেষ ক্ষমতা আইন নামক কালাকানুন বাতিল করণ ইত্যাদি।
কুরআন-সুন্নাহ মুতাবিক মহিলাদের যাবতীয় অধিকার বহাল করে নারীদেরকে মর্যাদার আসনে সমাসীন করতে হবে। যৌতুক প্রথাসহ যাবতীয় নারী নির্যাতন কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে।
১০.    মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও উপজাতীয় সকল ধর্মের লোক যাতে স্বীয় ধর্মীয় মতামত ও রীতিনীতি সম্পূর্ণরূপে পালন করতে পারে এর নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে।
১১.    বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে সম্পূর্ণ পৃথক করে প্রকৃত অর্থে তাকে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ করতে হবে।
১২.    এক শ্রেণীর এনজিও-এর মাধ্যমে জাতীয় অর্থনৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধবিরোধী কার্যকলাপ, সুদি ঋণের মাধ্যমে শোষণ ও হয়রানি বন্ধ করতে হবে।
১৩.    জাতীয় অর্থনীতির উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে দেশকে স্বনির্ভর করার লক্ষ্যে;
ক) ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা পূর্ণাঙ্গরূপে চালু করতে হবে;
খ) দেশীয় শিল্প ও বাণিজ্যকে প্রটেকশন দান এবং যথাযথ বিকাশের সুযোগ দেবার উদ্দেশ্যে বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে।
গ) জনগণের ৮০% কৃষকই অর্থনীতির মেরুদণ্ড। তাদের অর্থনৈতিক উন্নতি ছাড়া দেশের সমৃদ্ধি অসম্ভব। কৃষি উৎপাদন লাভজনক করার উদ্দেশ্যে কৃষকদেরকে সুদবিহীন ঋণদান এবং কৃষিসামগ্রী সার, বীজ ও কীটনাশক সংগ্রহে ভর্তুকি প্রদান করতে হবে;
ঘ) কর্মক্ষম সকল জনশক্তিকে জাতীয় উৎপাদনে অবদান রাখার জন্য যোগ্য হবার সুযোগ দিয়ে বেকার সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে হবে;
ঙ) ইসলামী শ্রমনীতি প্রয়োগ করে সকল শ্রেণীর শ্রমিকদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তা বিধান করতে হবে।
চ) সকল ধরনের পেশাকে সম্মানজক গণ্য করতে হবে;
ছ) পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ দিতে হবে।
১৫.    নীতিনৈতিকতাহীন, ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তে যথার্থ ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করতে হবে। ড. কুদরতে খুদা শিক্ষা কমিশন ধর্মনিরপেক্ষ ও সমাজতান্ত্রিক শিক্ষাব্যবস্থার যে সুপারিশ করেছে, তা দেশের সংবিধানবিরোধী বলে বর্জন করতে হবে। ইসলামী মূল্যবোধের ভিত্তিতে সমাজ গঠন ও জাতীয় উন্নয়নে যোগ্য ভূমিকা পালনের উদ্দেশ্যে মহিলাদেরকে যথাযথ শিক্ষার সুযোগ দিতে হবে।
১৬.    জাতীয় প্রচার মাধ্যম ও পত্রপত্রিকা, রেডিও-টেলিভিশনকে শিক্ষা বিস্তার এবং জাতীয় চরিত্র গঠনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। বিশেষ করে টিভি-রেডিওসহ সকল মিডিয়াতে চরিত্রবিধ্বংসী নগ্নতা ও বেহায়াপনা এবং অপসংস্কৃতির বিস্তার বন্ধ করতে হবে।
১৭.    যাবতীয় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে ইসলামী আদর্শ, ঐতিহ্য ও মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটাতে হবে। রাষ্ট্রীয়ভাবে শিখা অনির্বাণ, শিখা চিরন্তন, মঙ্গল প্রদীপ প্রলনসহ সকল প্রকার বিজাতীয় ও অপসংস্কৃতি পরিহার করতে হবে।
নেতৃবৃন্দ বিভিন্ন জনসভায় এই দাবিগুলোর গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে বক্তব্য দিতে থাকেন।

জাতিসংঘের ইসলামবিরোধী প্রস্তাবে সরকারের স্বাক্ষরদানের প্রতিবাদ
১৯৯৭ সনের মাঝামাঝি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার মহিলা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে জাতিসংঘের একটি ফোরামে কুরআন ও সুন্নাহভিত্তিক ‘শরীয়া আইনকে অপরিবর্তনীয় ও অলংঘনীয় নয়’ বলে ঘোষণা করায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ যুগপৎ গভীর বিস্ময় ও উদ্বেগ প্রকাশ করে এবং উক্ত ইসলামবিরোধী প্রস্তাবে স্বাক্ষরদানের বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জ্ঞাপন করে।

১৯৯৭ সনের ২রা ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত তথাকথিত ‘শান্তি চুক্তি’র প্রতিবাদ
বাংলাদেশের এক-দশমাংশ ভূমি জুড়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের (রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান) অবস্থান। পার্বত্য চট্টগ্রামে চাকমা, গারো, ত্রিপুরা, মারমা, চাক, খীয়াং,  মুরং, পাংখো, তনচংগ্যা, হাজং, মাহাতো, মুন্ডা, ওঁরাও, রাজংশী প্রভৃতি উপজাতি বসবাস করে।
ব্রিটিশ শাসনামলে পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রথমে চট্টগ্রাম জিলারই অংশ ছিলো।
১৮৬০ সনে পার্বত্য চট্টগ্রাম নামে একটি নতুন জিলা গঠন করা হয়।
১৯০০ সনের ১৭ই জানুয়ারি ঞযব ঈযরঃঃধমড়হম ঐরষষ ঞৎধপঃং জবমঁষধঃরড়হ-১৯০০ জারি করা হয় এবং জিলাটিকে একজন ডেপুটি কমিশনারের অধীনে ন্যস্ত করা হয়।
১৯৬৫ সনের ১৮ই জুন মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার নেতৃত্বে ‘পার্বত্য ছাত্র সমিতি’ নামে একটি সংগঠনের জন্ম হয়। পরের বছর অনন্ত বিহারী খীসা এবং জে. বি. লারমার নেতৃত্বে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম উপজাতি (আদিবাসী) কল্যাণ সমিতি’ নামে আরো একটি সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটে। ক্রমশ উপজাতীয়দের একাংশের মাঝে বিচ্ছিন্নতাবাদী চিন্তার বিকাশ ঘটতে থাকে।
কেউ কেউ বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা প্রকট হয় যখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমাকে ধমক দিয়ে বলেছিলেন বিচ্ছিন্নতার পথ পরিহার করে বাঙালি জাতীয়তাবাদের মূল স্রোতে মিশে যেতে। ১৯৭২ সনে শেখ মুজিবুর রহমান ও আওয়ামী লীগ সরকার বাংলাদেশী জাতিসত্তার বদলে বাঙালি জাতিসত্তার বিষয়টিকে একচ্ছত্র প্রতিষ্ঠা দিলে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা (১৯৭২-৭৫ এ স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য) এর প্রতিবাদ করেন, শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে ডেপুটেশন নিয়ে যান, স্মারকলিপি দেন। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়িদের অসন্তোষ উত্থাপন করে তা সমাধানের দাবি জানান। শেখ মুজিবুর রহমান মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমাকে বাঙালি হয়ে যাবার কথা বলেন। তিনি বলেন ‘যা বাঙালি হইয়া যা’। শেখ মুজিবের এই প্রস্তাবে নিজেদের ঐতিহ্য ও স্বকীয় জাতিসত্তার ভবিষ্যত সম্পর্কে উপজাতীয়রা বিচলিত বোধ করেন। এখানে উল্লেখ্য যে ১৯৭২ সনের ২৯ জানুয়ারি চারু বিকাশ চাকমার নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি উপজাতীয় প্রতিনিধিদল পার্বত্য চট্টগ্রামের স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে ঢাকায় শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে সাক্ষাৎ করেন। রাজা মং প্র“ সাইন চৌধুরীর নেতৃত্বে আরেকটি পার্বত্য প্রতিনিধিদল শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের চেষ্টা করে ব্যর্থ হন, তবে তারা তাদের দাবিগুলো রেখে যান।
মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা ১৯৭২ সনের ফেব্র“য়ারি মাসের ১৫ তারিখে শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে সাক্ষাৎ করে উপজাতীয়দের চার দফা দাবি উত্থাপন করেনÑ
১.    পাবর্ত্য চট্টগ্রামের নিজস্ব আইন পরিষদ সংবলিত আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন। পার্বত্য চট্টগ্রাম একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হবে এবং এর একটি নিজস্ব আইন পরিষদ থাকবে।
২.    উপজাতীয় জনগণের অধিকার সংরক্ষণের জন্য ‘১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি’র অনুরূপ সংবিধি বাংলাদেশের সংবিধানে সংযোজন।
৩.    উপজাতীয় রাজাদের দফতরগুলো সংরক্ষণ।
৪.    সংবিধানে ‘১৯০০ সালের রেগুলেশনের সংশোধন’-নিরোধ সংক্রান্ত বিধি রাখা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালি অনুপ্রবেশ বন্ধ কর।
মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে যে চার দফা দাবি উত্থাপন করেছিলেন তার একটিও পূরণ না করে তিনি পাহাড়িদের বাঙালি হয়ে যাবার কথা বলায় পাহাড়িরা মারমুখী হয়ে ওঠে। মূলত এ কারণেই সংসদ সদস্য হওয়া সত্ত্বেও ১৯৭২ সনে দেশে যে প্রথম সংবিধান প্রণীত হয় মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা তাতে সই করেননি।
শেখ মুজিবুর রহমান একদিকে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার দাবিকে উপেক্ষা করেন, অন্যদিকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী চাকমা রাজা ত্রিদিব রায়কে পাকিস্তান থেকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য ত্রিদিব রায়ের মা বিনীতা রায়কে  মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাঠান। ত্রিদিব রায় তখন পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত ছিলেন। কিন্তু রাজা ত্রিদিব রায় বাংলাদেশে ফিরে আসতে অস্বীকার করেন। ১৯৭৩ সনে রাঙ্গামাটির এক নির্বাচনী জনসভায় চাকমা রাজার বিরুদ্ধে স্বাধীনতা বিরোধী তৎপরতার কথা উল্লেখ করে শেখ মুজিবুর রহমান পাহাড়িদের বাঙালি হয়ে যাবার পরামর্শ দেন।…
শেখ মুজিবুর রহমান উপজাতীয়দের চার দফা দাবি প্রত্যাখ্যান করার পর উপজাতীয়রা উপলব্ধি করলো যে বিপ্লবী সংগঠন তৈরি করা ছাড়া তাঁদের উদ্দেশ্য সফল হবে না।
“… চার দফা দাবি আদায় ও আওয়ামী লীগ সরকারের নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য শেখ মুজিবের আওয়ামী শাসনামলেও আন্ডারগ্রাউন্ডে গিয়ে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার নেতৃত্বাধীন ‘জনসংহতি সমিতি’ ৭ই জানুয়ারি ১৯৭৩ সালে ‘শান্তিবাহিনী’ নামে একটি সশস্ত্র উইং গঠন করে। ১৯৭৩ সালে গঠিত হলেও এর কার্যকলাপ ১৯৭৫ সালের অগাস্ট মাসের পর অর্থাৎ শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুর পর দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পায়। শান্তিবাহিনীর কার্যকলাপ এ সময়ে বৃদ্ধি পাওয়ার অন্যতম কারণ ছিল প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের চাকমা গেরিলাদের সহযোগিতা।”
“… জনসংহতি সমিতির সশস্ত্র উইং শান্তিবাহিনীর নেতা শন্তু লারমা ও চবরি মারমা ১৯৭৬ সালের কোন এক সময় সেনাবাহিনীর হাতে ধরা পড়েন। ১৯৮১ সাল পর্যন্ত তাদেরকে বন্দি করে রাখা হয়। এ সময় শান্তি বাহিনীর নেতৃত্বে আসেন প্রীতিকুমার চাকমা। ১৯৮১ সালে শান্তি বাহিনীর সাথে সরকারের আলোচনার শর্ত হিসেবে শন্তু লারমা ও চবরি মারমা মুক্তি পেয়ে পাহাড়ে ফিরে আসেন।”
একটি উপদলীয় কোন্দলের ফলে ১৯৮৩ সনের ১০ই নভেম্বর মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা নিহত হন। “শান্তি বাহিনী” লারমা গ্র“পের নেতৃত্ব লাভ করেন জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে শন্তু লারমা।    (চলবে)
লেখক : সাবেক নায়েবে আমির
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী
তথ্যসূত্র :
১. এম. এ. ওয়াজেদ মিয়া, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ঘিরে কিছু ঘটনা ও বাংলাদেশ, পৃষ্ঠা-১৩০।
২. উদ্ধৃত, আবুল আসাদ, কালো পঁচিশের আগে ও পরে, পৃষ্ঠা : ২৭৬-২৭৭।
৩. শর্মিলা বসু, ডেড রেকনিং, পৃষ্ঠা-১৮১।
৪. খন্দকার আবুল খায়ের, ৭১-এ কি ঘটেছিল রাজাকার করা ছিল, পৃষ্ঠা-৬,৭,৮,৯।
৫. মওদুদ আহমদ, বাংলাদেশ : শেখ মুজিবর রহমানের শাসনকাল, পৃষ্ঠা-৭৫।
৬. আতিক হেলাল সম্পাদিত, মেজর জলিল রচনাবলী, পৃষ্ঠা-৩৫।

SHARE

Leave a Reply