রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামী

এ.কে.এম. নাজির আহমদ

Jamat(গত সংখ্যার পর)
বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানের প্রয়াস চালান।
১৯৯৬ সনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। শেখ হাসিনা সরকার ১৯৯৭ সনের ২রা ডিসেম্বর শন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতির সাথে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। এটি ছিলো একটি অসম চুক্তি। এই চুক্তি স্বাক্ষর করে আওয়ামী লীগ সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামের ওপর বাংলাদেশ সরকারের নিয়ন্ত্রণ শিথিল করে ফেলে। এই চুক্তি অনুযায়ী উপজাতিগুলোই পার্বত্য চট্টগ্রামের জমির মালিক। সেখানে বসবাসকারী অ-উপজাতীয় লোকেরা জমির মালিকানা ভোগ করতে পারবে না। আবার গোটা পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসন করবে উপজাতির লোকেরাই।
১৯৭৬ সনের ২০শে অক্টোবর রাষ্ট্রপতি বিচারপতি এ.এম.এম. সায়েম Chittagong Hill Tracts Development Board Ordinance  ১৯৭৬ জারি করেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়নের জন্য সরকার বহুমুখী কার্যক্রম হাতে নেয়।
১৯৮৯ সনে “রাঙ্গামাটি পার্বত্য জিলা স্থানীয় সরকার পরিষদ”, “খাগড়াছড়ি পার্বত্য জিলা স্থানীয় সরকার পরিষদ” এবং “বান্দরবান পার্বত্য জিলা স্থানীয় সরকার পরিষদ” আইন প্রণীত ও প্রবর্তিত হয়।
এই আইনের ৬৪ নং ধারায় বলা হয় ‘পার্বত্য জিলার এলাকাধীন কোন জায়গাজমি পরিষদের পূর্ব অনুমোদন ব্যতিরেকে বন্দোবস্ত দেয়া যাবে না এবং অনুরূপ অনুমোদন ব্যতিরেকে উক্ত রূপ জায়গাজমি উক্ত জিলার বাসিন্দা নন এমন কোন ব্যক্তির নিকট হস্তান্তর করা যাবে না। তবে শর্ত থাকে যে সংরক্ষিত () ও রক্ষিত () বনাঞ্চল, রাষ্ট্রীয় জায়গাজমি এবং রাষ্ট্রীয় স্বার্থে প্রয়োজন হতে পারে এইরূপ কোন জায়গাজমি বা বনের শিল্প-কারখানা এলাকা সরকার বা জনস্বার্থের প্রয়োজনে হস্তান্তরিত বা বন্দোবস্তকৃত ক্ষেত্রে এই বিধান প্রযোজ্য হবে না।’
শেখ হাসিনার শাসনামলে ১৯৯৭ সনের ২রা ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির পক্ষে জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। এই চুক্তি অনুযায়ী পার্বত্য জিলার স্থানীয় সরকারগুলোর নাম হয় “রাঙ্গামাটি পার্বত্য জিলা পরিষদ”, “খাগড়াছড়ি পার্বত্য জিলা পরিষদ” এবং “বান্দরবান পার্বত্য জিলা পরিষদ”।
পূর্ববর্তী আইনের ৬৪ নাম্বার ধারার পরিবর্তে নিম্নোক্ত ধারাটি সংযোজিত হবে বলে স্থিরিকৃত হয় :
‘পার্বত্য জিলার এলাকাধীন বন্দোবস্তযোগ্য খাস জমিসহ কোন জায়গাজমি পরিষদের পূর্ব অনুমোদন ব্যতিরেকে ইজারা প্রদানসহ বন্দোবস্ত, ক্রয় বিক্রয় ও হস্তান্তর করা যাবে না। তবে শর্ত থাকে যে রক্ষিত ()  বনাঞ্চল, কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ এলাকা, রাষ্ট্রীয় শিল্প-কারখানা ও সরকারের নামে রেকর্ডকৃত ভূমির ক্ষেত্রে এই বিধান প্রযোজ্য হবে না।’
‘পার্বত্য জিলা পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ও আওতাধীন কোন প্রকারের জমি, পাহাড় ও বনাঞ্চল পরিষদের সাথে আলোচনা ও এর সম্মতি ব্যতিরেকে সরকার কর্তৃক অধিগ্রহণ ও হস্তান্তর করা যাবে না।
তিনটি পার্বত্য জিলা পরিষদ সমন্বয়ে “পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ” গঠনের বিধান রাখা হয় এই চুক্তিতে।
‘পার্বত্য জিলা পরিষদের নির্বাচিত সদস্যদের দ্বারা পরোক্ষভাবে এই পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হবেন যার পদমর্যাদা একজন প্রতিমন্ত্রীর সমকক্ষ হবে এবং তিনি অবশ্যই উপজাতীয় হবেন।’
‘যে সকল অ-উপজাতীয় ও অ-স্থানীয় ব্যক্তিদেরকে রাবার বা অন্যান্য প্ল্যান্টেশনের জন্যে জমি বরাদ্দ করা হয়েছিলো তাদের মধ্যে যারা গত দশ বছরের মধ্যে প্রকল্প গ্রহণ করেননি বা জমির সঠিক ব্যবহার করেননি সে সকল জমির বন্দোবস্ত বাতিল করা হবে।’
‘সরকার ও জনসংহতি সমিতির মধ্যে চুক্তি সম্পাদনের পর এবং জনসংহতি সদস্যদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সাথে সাথে সীমান্ত রক্ষীবাহিনী (বিডিআর) ও স্থায়ী সেনানিবাস (তিন জিলা সদরে তিনটি এবং আলীকদম, রামু ও দীঘিনালা) ব্যতীত সামরিক বাহিনী, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সকল অস্থায়ী ক্যাম্প পার্বত্য চট্টগ্রাম হতে পর্যায়ক্রমে স্থানীয় নিবাসে ফেরত দেওয়া হবে এবং এই লক্ষ্যে সময় নির্ধারণ করা হবে’ ইত্যাদি।
১৯৯৭ সনের ২রা ডিসেম্বর এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এটিকে “শান্তিচুক্তি” বলা হয়।
জামায়াতে ইসলামী এই অবিজ্ঞজনোচিত এবং জাতীয় স্বার্থবিরোধী চুক্তির তীব্র সমালোচনা করে। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃবৃন্দ বিভিন্ন জনসভায় এই চুক্তির বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানাতে থাকেন।

চারদলীয় জোটের অংশীদার রূপে ভূমিকা পালন
আওয়ামী লীগ সরকার গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ক্ষমতায় এসে স্বৈরশাসনের পথই বেছে নেয়। দেশে এক শাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটে।
১৯৯৯ সনের ৩০শে নভেম্বর ২৯ মিন্টো রোডে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, ইসলামী ঐক্যজোট, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতৃবৃন্দ আওয়ামী দুঃশাসন থেকে দেশকে উদ্ধার করার সংকল্প নিয়ে চারদলীয় জোট গঠন করেন এবং একটি ঘোষণাপত্রের মাধ্যমে দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানান। নেতৃবৃন্দের এই ঐক্য জনগণের মধ্যে বিপুল সাড়া জাগায়। চারদলীয় জোটের ঘোষণাপত্রটি ছিলো নিম্নরূপ :
“আমরা বাংলাদেশের চারটি রাজনৈতিক দল প্রধান, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের আমীর গোলাম আযম ও ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান আজিজুল হক আমাদের নিজ নিজ দল, জোট ও সমমনা অন্যান্য রাজনৈতিক দল এবং আর্থসামাজিক সংগঠনগুলোর মধ্যে ব্যাপক আলোচনার ভিত্তিতে সম্মিলিতভাবে দেশবাসীর পক্ষে ঘোষণা দিচ্ছি যে, একের পর এক জনস্বার্থ বিরোধী, রাষ্ট্রঘাতী, সংবিধান বিরোধী, জনগণের ধর্মবিশ্বাস বিরোধী, স্বৈরাচারী ও অমানবিক কর্মকাণ্ড এবং সরকার পরিচালনায় ব্যর্থতার দায়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গঠিত ক্ষমতাসীন সরকার রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকার সকল বৈধতা হারিয়েছে।
আমরা সম্মিলিতভাবে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করছি,
ষ    যেহেতু আজ বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা বিপন্ন, এবং
ষ    যেহেতু এই সরকার প্রতিনিধিত্বমূলক রাজনীতির সুষ্ঠু ও অবাধ পরিবেশ ধ্বংস করে দেশব্যাপী রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও দলীয় অস্ত্রবাজির এক সংঘাতময় পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে, সকল নাগরিকের জীবন, জীবিকা, সম্পদ এবং নারীর সম্ভ্রম বিপন্ন করেছে, এবং
ষ    যেহেতু সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা আজ চরম হুমকির সম্মুখীন, এবং
ষ    যেহেতু আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে, জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিধানে সরকার সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে এবং রাষ্ট্রক্ষমতার অপব্যবহার, ভয়ভীতি ও নির্যাতনের মাধ্যমে একদলীয় ফ্যাসিবাদী কায়দায় রাষ্ট্র পরিচালনা করার জন্য সরকার রাজপথ দখলের নামে সরাসরি সংঘাতের পথ বেছে নিয়েছে, সমগ্র জাতিকে সরকারের মদদপুষ্ট দলীয় লোকদের দ্বারা সৃষ্ট সন্ত্রাসের কাছে জিম্মি করেছে এবং এই সরকারের অত্যাচার-অনাচার, জেল, জুলুম, নির্যাতন, হয়রানি ও মিথ্যা মামলার কারণে মানবাধিকার লংঘন চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং হাজার হাজার বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের কারাবন্দী করা হয়েছে, এবং তিনশোরও বেশি রাজনৈতিক কর্মীকে হত্যা করা হয়েছে, এবং
ষ    যেহেতু শুধু নিরস্ত্র মিছিলের ওপরেই নয়, সম্মানিত সংসদ সদস্যদের ওপরও পুলিশ লেলিয়ে দিয়ে সরকার গণতান্ত্রিক নীতিবোধের প্রতি চরম অবজ্ঞা প্রদর্শন করেছে, এমনকি সম্মানিত সংসদ সদস্যদের ওপর গুলি চালিয়ে হত্যার অপচেষ্টা করতেও সরকার দ্বিধা করেনি, এবং
ষ    যেহেতু এ সরকার তাদের একান্ত বশংবদ প্রধান নির্বাচন কমিশনারের মাধ্যমে নির্বাচন প্রক্রিয়ার পবিত্রতা সম্পূর্ণভাবে কলুষিত করেছে, এ সরকারের আমলে জাতীয় সংসদের উপ-নির্বাচনসহ কোন নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ হয়নি, ক্ষমতাসীন দল জনগণের ভোটাধিকার ছিনতাই করে নির্বাচনকে কী নিদারুণ প্রহসনে পরিণত করতে পারে লক্ষ্মীপুর, মিরেরসরাই, পাবনা, ফরিদপুর এবং টাঙ্গাইলে অনুষ্ঠিত উপ-নির্বাচন তার সর্বশেষ জঘন্য উদাহরণ। বিরোধী দলসমূহের ৪-দফা দাবি উপেক্ষা করে একদলীয় একতরফা ভোটবিহীন পৌরসভা নির্বাচন করে জনগণকে ভোটের অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে। ভোটার তালিকা প্রণয়ন এবং ভোটার পরিচয়পত্র প্রদান হীনতম দলীয়করণের শিকারে পরিণত করেছে, এবং
ষ    যেহেতু জাতীয় সংসদকে সম্পূর্ণভাবে অকার্যকর করে দেয়া হয়েছে এবং আইনের শাসনকে আজ দলীয় শাসনে পরিণত করা হয়েছে, এবং
ষ    যেহেতু একটি বিশেষ রাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীল পররাষ্ট্রনীতি ও অর্থনীতি অনুসরণের কারণে আজ আমাদের নিজস্ব জাতীয় অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ার দরুণ অর্থনীতি চরম বিপর্যয়ের সম্মুখীন এবং সরকারের আত্মঘাতী নীতির কারণে দেশে জাতীয় এবং বিদেশী নতুন পুঁজি বিনিয়োগ স্থবির হয়ে গেছে, এবং
ষ    যেহেতু ব্যাংক এবং অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠাসমূহে নৈরাজ্য সৃষ্টি করা হয়েছে, এবং
ষ    যেহেতু সরকারের প্রভু-তোষণ নীতির ফলে বাংলাদেশ ভারতীয় পণ্যের চোরাবাজারে পরিণত হওয়ায় দেশের অধিকাংশ শিল্প খাতে একের পর এক কলকারখানা বন্ধ হচ্ছে আর বিপুল সংখ্যক শ্রমিক-কর্মচারী বেকার হয়েছে, এবং
ষ    যেহেতু সরকার নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণে এবং বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস সরবরাহ ও ব্যবস্থাপনায় চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে, এবং
ষ    যেহেতু একদিকে সার, বিদ্যুৎ ও কীটনাশক ওষুধসহ সকল কৃষি উপকরণের মূল্য বৃদ্ধি এবং অন্যদিকে উৎপাদিত কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না করার ফলে কৃষক সমাজ এবং কৃষি খাত আজ এক চরম বিপর্যয়ের সম্মুখীন এবং গ্রামের মানুষ অপুষ্টি, অভাব ও আয়ের অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে দিন যাপন করছে, এবং
ষ    যেহেতু আজ তিন কোটি কর্মক্ষম বেকার যুবকের জন্য সরকার কর্মসংস্থানের জন্য কোন কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি, এবং
ষ    যেহেতু শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার ও প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করার নানা অপচেষ্টায় সরকারের যোগসাজশে সুস্পষ্ট, এবং মজুরি কমিশনের সুপারিশ প্রণয়ন ও শ্রমিকদের সাথে স্বাক্ষরিত চুক্তি বাস্তবায়নে সরকারের কোনই উদ্যোগ নেই, এবং
ষ    যেহেতু সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি, তাদের প্রতিনিধিদের ভয়ভীতি প্রদর্শন, চাকারচ্যুত ও জেলে পুরে সরকার তাদের ন্যায্য দাবি থেকে বঞ্চিত করছে, এবং তিন বছর ধরে পে-কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে কর্মচারীদের সাথে শঠতা করছে, এবং
ষ    যেহেতু ক্ষমতায় এসেই এ সরকার শেয়ার মার্কেটে ফটকাবাজারির সুযোগ ও ব্যবস্থা করে দিয়েছে। ক্ষমতাসীনদের দেশীয় দোসর ও বিদেশী মহাজনরা সাধারণ মধ্যবিত্ত হাজার হাজার পরিবারের আজীবনের সঞ্চয় লুণ্ঠন করে নিয়েছে। পুঁজি বাজারের সংকটে শিল্পোন্নতির সম্ভাবনা তিরোহিত হয়েছে, এবং
ষ    যেহেতু এই সরকার রাষ্ট্রঘাতী লক্ষ্যে আমাদের জাতিগঠনমূলক সকল প্রতিষ্ঠান যথা বিচার বিভাগ, প্রশাসন, পুলিশ, প্রতিরক্ষাবাহিনী, শিল্প ও বাণিজ্যিক কাঠামোসমূহকে একে একে পঙ্গু করে দেয়ার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে, এবং
ষ    যেহেতু সরকার উচ্চ আদালতকে আক্রমণের লক্ষ্যে পরিণত করেছে। বিচারকদের জবাবদিহিতার ভুয়া প্রশ্ন তুলে বিচারকগণকে তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন ও মর্যাদাহীন করতে চাইছে, এবং
ষ    যেহেতু সংবাদপত্রকে নিয়ন্ত্রণে রাখার উদ্দেশ্যে সরকার সংবাদপত্রের জবাবদিহিতার ধুয়া তুলে পর্দার অন্তরালে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণের অপচেষ্টা করছে। সমালোচনাকারী সাংবাদিকদের বেছে বেছে জীবননাশের হুমকি দেয়া হচ্ছে, তাদের মিথ্যা মামলায় জড়ানো হচ্ছে, আর যেসব সংবাদপত্র সরকারের দুর্নীতির কাহিনী প্রকাশ করছে ও সরকারের ব্যর্থতা তুলে ধরছে তাদের বিজ্ঞাপনের প্রাপ্য কোটা থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে এবং
ষ    যেহেতু জাতীয় রেডিও এবং টেলিভিশনকে সরকারদলীয় প্রচার, বিরোধী দলের চরিত্র হনন ও নির্লজ্জ মিথ্যাচারে অন্যায়ভাবে ব্যবহার করছে, এবং
ষ    যেহেতু পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির মাধ্যমে সরকার সংবিধান লংঘন করে নাগরিকদের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি ও নতুন অশান্তির বীজ বপন করেছে এবং দেশের এক-দশমাংশ ভূখণ্ড রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণবহির্ভূত করার ষড়যন্ত্রের অংশীদার হয়েছে, এবং
ষ    যেহেতু তথাকথিত পানি চুক্তিতে গঙ্গার পানির হিস্যার গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার কোন বিধান এবং চুক্তি ভঙ্গের বিষয়ে কোন সালিশের ব্যবস্থা না রেখে সরকার বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে, এবং
ষ    যেহেতু দলীয়করণ ও সন্ত্রাসের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার মান ও পরিবেশ ধ্বংস করা হয়েছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহকে সন্ত্রাস, দুর্নীতি, অসহায় মানুষকে জিম্মি এবং ছাত্রীদের সম্ভ্রমহানির হীন ক্ষেত্রে পরিণত করা হয়েছে, এবং
ষ    যেহেতু সরকার ইসলামী মূল্যবোধ এবং সকল ধর্ম বিশ্বাস, আচার-আচরণ ও আলেমসমাজের ওপর ক্রমাগত আঘাত হেনে চলেছে এবং দেশের ঐতিহ্যবাহী মাদ্রাসা শিক্ষা বন্ধ করে দেয়ার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে, এবং
ষ    যেহেতু সরকারের মন্ত্রী, এমপি, উপদেষ্টা, দলীয় মদদপুষ্ট দালাল এবং অসৎ ব্যক্তিদের সীমাহীন দুর্নীতি ও অস্ত্রধারীদের চাঁদাবাজি দেশের আর্থ-সামাজিক পরিবেশ বিপন্ন ও দুঃসহ করে তুলেছে, এবং
ষ    যেহেতু ট্রান্সশিপমেন্টের নামে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে ভারতকে করিডোর দেয়ার উদ্যোগ নিয়ে সরকার জাতীয় স্বার্থ ও অস্তিত্বের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, এবং
ষ    যেহেতু সরকার আমাদের সীমান্তে ভারতীয় সেনাদের আক্রমণ, বিডিআর সদস্য ও নাগরিকদের হত্যা, জমি এবং সম্পদ দখলের প্রক্রিয়াকে বন্ধ করতে ব্যর্থ হয়েছে;
সেহেতু আজ সকল বিরোধী রাজনৈতিক দল, পেশাজীবী, বুদ্ধিজীবী, কৃষিজীবী, প্রকৌশলী, শিক্ষক, আলেম-উলামা, ডাক্তার, আইনজীবী, ছাত্র-যুবক, শ্রমিক, মহিলা, সংস্কৃতিসেবী ও অন্যান্য সকল শ্রেণীর জনসাধারণের একটি মাত্র দাবি। আর তা হলো, বর্তমান সরকারকে অবিলম্বে পদত্যাগ করে সাংবিধানিক নিয়ম মোতাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সর্বাগ্রে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে হবে।
আমাদের স্বাধীনতা, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও জাতীয় অর্থনীতি, আমাদের বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ রক্ষার এটাই আজ একমাত্র শান্তিপূর্ণ সাংবিধানিক পথ।
একবিংশ শতাব্দীর দ্বারপ্রান্তে এসে আমরা এক বিরাট চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। ন্যূনতম পর্যায়ের উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে জাতি গঠন প্রক্রিয়াকে সমুন্নত রেখে ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করে আমাদের বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ায় শামিল হতে হবে। তাই আমাদের চার দলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা এই যে, যথাসত্বর ব্যাপক ঐক্যের ভিত্তিতে একটি দেশপ্রেমিক ও সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল শক্তিশালী সরকার গঠন করে একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা।
এই ভবিষ্যৎ সরকারের দায়িত্ব ও কর্তব্য হবে “সর্বশক্তিমান আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস, জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুবিচার”- সংবিধানের এই মূলনীতি সংরক্ষণ ও বাস্তবায়ন; কঠোর হস্তে দুর্নীতি দমন; প্রশাসনিক শৃংখলার পুনরুদ্ধার; সর্বস্তরে মেধা ও যোগ্যতার স্বীকৃতি; অস্ত্রধারী চাঁদাবাজ দমন ও সকল নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা বিধান; আইনের শাসন পুনরুদ্ধার ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষা; বিশেষ ক্ষমতা আইন বাতিল; শিক্ষার মান ও পরিবেশ পুনরুদ্ধার; সাম্প্রদায়িক শান্তি ও সহনশীলতা প্রতিষ্ঠা; রেডিও টেলিভিশনের স্বায়ত্তশাসন প্রদান; দেশীয় শিল্পের বিকাশ ও চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ; সর্বক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক মান ও শৃংখলা প্রতিষ্ঠা; মানবসম্পদ উন্নয়ন; সংবিধানে সার্বজনীন মানবাধিকারের ঘোষণা ও বহুদলীয় গণতন্ত্রের মূলনীতিগুলোর বাস্তবায়ন ও সুরক্ষা; কৃষক শ্রমিকের ভাগ্যোন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচন; বিপুল বেকার যুবসমাজের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান, মুদ্রাস্ফীতি ও দ্রব্যমূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে রেখে সকল জনগণের সঞ্চয় ও জীবন মানের সুরক্ষা; নারী সমাজের অধিকার, মর্যাদা ও ক্ষমতায়ণ প্রক্রিয়া এবং শিশুদের সুন্দরতম জীবন বিকাশের সুযোগ নিশ্চিতকরণ, জাতীয় সংস্কৃতি সংরক্ষণ, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ ও বহুমুখী শক্তি সঞ্চয়; প্রাকৃতিক সম্পদের সদ্ব্যবহার ও সুনিয়ন্ত্রণ; সংবিধানের মূলনীতি পরিপন্থী সকল আইন সংশোধন; সর্বসম্প্রদায়ের নাগরিকের জন্য আর্থ-সামাজিক নিরাপত্তা বিধান; এবং জাতীয় স্বার্থের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ গতিশীল পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করা।
আমাদের সমগ্র জনগণ আজ ঐক্যবদ্ধ। আমাদের অপ্রতিরোধ্য আন্দোলনের জয় হবেই, ইনশাআল্লাহ।
সরকারের মনে রাখা উচিত জনগণের ইচ্ছা প্রতিফলনের মধ্যে দিয়েই সামাজিক শান্তি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হতে হবে। সংঘাতের পথ বিপর্যয়ই ডেকে আনে। এটাই ইতিহাসের শিক্ষা।
আমরা সম্মিলিতভাবে ঘোষণা করছি, চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত চলমান এক দফা আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হবে। চক্রান্ত যত কুটিলই হোক, নির্যাতন যত বর্বরই হোক, জনজোয়ার কখনও স্তব্ধ হয় না।
আমরা দেশের সকল জাতীয়তাবাদী, গণতন্ত্রকামী, ইসলামী দল, গ্র“প, কৃষক-শ্রমিক-ছাত্র, সকল পেশাজীবী, সংস্কৃতিসেবী সংগঠন ও ব্যক্তিকে চলমান গণ-আন্দোলনে শামিল হবার উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি।
আমাদের আন্দোলনের বিজয় ত্বরান্বিত করার জন্য আমরা দেশজুড়ে সকল মহল্লায়, গ্রামে, শহরে ও বন্দরে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোলার আহ্বান জানাচ্ছি।

বেগম খালেদা জিয়া
চেয়ারপারসন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল
হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ
চেয়ারম্যান, জাতীয় পার্টি
গোলাম আযম
আমীর, জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ
আজিজুল হক
চেয়ারম্যান, ইসলামী ঐক্যজোট

মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী আমীরে জামায়াত নির্বাচিত হন
২০০০ সনের জুলাই মাসে অনুষ্ঠিত কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার অধিবেশনে অধ্যাপক গোলাম আযম স্বাস্থ্যগত কারণে আমীর পদ থেকে অব্যাহতি লাভের জন্য আবেদন করেন। দীর্ঘ আলোচনার পর কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা তাঁর আবেদন গ্রহণ করে।
জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন আমীরে জামায়াত নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু করে। যথাসময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
২০শে অক্টোবর নির্বাচনের ফল ঘোষণা করা হয়।
২০০১-২০০৩ কার্যকালের জন্য আমীরে জামায়াত নির্বাচিত হন মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী।

২০০১ সনের ১লা অক্টোবর অনুষ্ঠিত অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ
২০০১ সনের ১লা অক্টোবর অনুষ্ঠিত হয় অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন।
এই নির্বাচনকালে রাষ্ট্রপতি ছিলেন বিচারপতি শাহাবুদ্দীন আহমদ।
কেয়ারটেকার প্রধান ছিলেন বিচারপতি লতিফুর রহমান। অন্যান্য উপদেষ্টা ছিলেন বিচারপতি বি.কে.রায় চৌধুরী, রোকেয়া আফজাল রহমান, মেজর জেনারেল (অব:) মইনুল ইসলাম চৌধুরী, সৈয়দ মঞ্জুর ইলাহী, এম. হাফিজুদ্দিন খান, এ.কে.এম. আমানুল ইসলাম চৌধুরী, সৈয়দ ইশতিয়াক আহমদ, ব্রিগেডিয়ার (অব:) আবদুল মালিক, আবদুল মুয়ীদ চৌধুরী এবং এ.এস.এম. শাহজাহান।
শেখ হাসিনা ক্ষমতা ত্যাগ করার পূর্বে প্রশাসন, পুলিশ ও নির্বাচন কমিশনে তাঁর পছন্দের ব্যক্তিদেরকেই বসিয়ে যান।
২০০১ সনের ১লা অক্টোবরের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র কয়েকদিন আগে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ আকস্মিকভাবে চারদলীয় জোট ত্যাগ করেন। তবে নাজিউর রহমান মঞ্জুর নেতৃত্বে জাতীয় পার্টির একটি অংশ চারদলীয় জোটে থেকে যায়।
রাষ্ট্রপতি শাহাবুদ্দীন আহমদ এবং কেয়ারটেকার প্রধান বিচারপতি লতিফুর রহমান দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে এমন এক নির্বাচন অনুষ্ঠিত করেন যা পূর্ববর্তী দু’টি কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের চেয়েও অধিকতর সুষ্ঠু হয়েছিলো।
এই নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ১৯৩টি আসন, আওয়ামী লীগ ৬২টি আসন এবং জামায়াতে ইসলামী ১৭টি আসন লাভ করে।
জামায়াতে ইসলামী থেকে নির্বাচিত সদস্যগণ হচ্ছেন- মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী (পাবনা), মাওলানা আবদুস সুবহান (পাবনা), অধ্যাপক আবদুল্লাহিল কাফী (দিনাজপুর), আযিযুর রহমান চৌধুরী (দিনাজপুর), মিযানুর রহমান চৌধুরী (নিলফামারী), মাওলানা আবদুল আযিয (গাইবান্ধা), মুফতী আবদুস সাত্তার (বাগেরহাট), মিয়া গোলাম পারওয়ার (খুলনা), শাহ মুহাম্মাদ রুহুল কুদ্দুস (খুলনা), আবু সাঈদ মুহাম্মাদ শাহাদাত হোসেন (যশোর), মাওলানা আবদুল খালেক মন্ডল (সাতক্ষীরা), রিয়াছাত আলী বিশ্বাস (সাতক্ষীরা), গাজী নজরুল ইসলাম (সাতক্ষীরা), মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী (পিরোজপুর), ফরিদুদ্দীন চৌধুরী (সিলেট), ডা: সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের (কুমিল্লা), শাহজাহান চৌধুরী (চট্টগ্রাম)।
সংসদের মহিলা আসনগুলো থেকে জামায়াতে ইসলামী ৪টি আসন লাভ করে। জামায়াতে ইসলামী থেকে নির্বাচিত মহিলা সদস্যগণ হচ্ছেন- ডা. আমেনা বেগম, শাহানারা বেগম, সুলতানা রাজিয়া ও রোকেয়া বেগম।
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে জামায়াতে ইসলামীর এটি পঞ্চম উপস্থিতি।
প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া আমীরে জামায়াত মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীকে কৃষিমন্ত্রী এবং সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদকে সমাজকল্যাণমন্ত্রী নিযুক্ত করেন।
এই নির্বাচনে পরাজিত হয়ে আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা বেসামাল হয়ে পড়েন। সচেতন ভোটারগণ তার সাজানো বাগান তছনছ করে দেওয়ায় তিনি ভীষণ ক্ষুব্ধ হন।
তিনি নির্বাচনের ফল প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি রাষ্ট্রপতি, কেয়ারটেকার সরকারপ্রধান, নির্বাচন কমিশন এবং প্রশাসনকে পক্ষপাতিত্ব করার অভিযোগে অভিযুক্ত করেন।
অথচ বিচারপতি শাহাবুদ্দীন আহমদ আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্যদের দ্বারা নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি ছিলেন। কেয়ারটেকার সরকার প্রধান বিচারপতি লতিফুর রহমান ছাত্রজীবনে বাম ছাত্ররাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন। শেখ হাসিনার পরামর্শে প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিযুক্ত হয়েছিলেন জনাব এম.এ.সাঈদ। তার বিশ্বস্ত ব্যক্তি লে. জেনারেল হারুনুর রশীদই নির্বাচনকালে সেনাপ্রধান ছিলেন।
তিনি ঘোষণা করেন যে তার দলের সদস্যগণ জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে শপথ নেবেন না। অবশ্য পরে তিনি ও তার দলের সদস্যগণ শপথ নেন। কিন্তু তারা সংসদের অধিবেশনে যোগদান করা থেকে বিরত থাকেন।
চারদলীয় জোট সরকার কায়েম হওয়ার পর শেখ হাসিনা আমেরিকা সফরে গিয়ে দু’টি অপবাদ ব্যাপকভাবে প্রচার করেন।
এক. চারদলীয় জোটের দু’টি দলই মৌলবাদী। যেই কারণে আফগানিস্তানের তালেবান সরকারকে উৎখাত করা জরুরি ছিলো, একই কারণে বাংলাদেশের জোট সরকার উৎখাত করা প্রয়োজন।
দুই. ইসলামপন্থীরা সাম্প্রদায়িক ও সন্ত্রাসী। তারা হিন্দুদের ওপর নির্যাতন চালায় এবং হিন্দুদের সম্পত্তি দখল করে। আর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল এইসব কুকর্মে তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করে। অতএব জোট সরকার উৎখাত করা অত্যাবশ্যক।
সুখের বিষয়, আমেরিকা এবং ইউরোপের সরকারগুলো এই অপপ্রচারে বিভ্রান্ত হয়নি। এই দেশে অবস্থানকারী তাদের রাষ্ট্রদূতগণ হিন্দুদের বা সংখ্যালঘুদের নির্যাতনের কোন সত্যতা খুঁজে পাননি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন দায়িত্বশীল ব্যক্তি বাংলাদেশ সফর করে এই দেশকে ‘উদার মুসলিম রাষ্ট্র’ বলে মন্তব্য করেছেন এবং এই দেশে বিরাজমান সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রশংসা করেছেন।
সংসদে না গেলেও আওয়ামী লীগ রাজপথে থেকে জোট সরকারের বিরুদ্ধে বিষোদগার করতে থাকে। দলটি জোট সরকারকে সাম্প্রদায়িক সরকার, মৌলবাদী সরকার ইত্যাদি বলতে থাকে। আওয়ামী লীগ জোট সরকার বাংলাদেশকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করেছে বলে অপপ্রচার চালাতে থাকে। এই অপপ্রচার কোন বিদেশী শক্তিকে বাংলাদেশে হস্তক্ষেপ করার জন্য আহ্বানেরই শামিল ছিলো।
উল্লেখ্য, এই সময় ভারতের বেশ কয়েকটি পত্রিকা এবং কয়েকজন কলামিস্ট আওয়ামী লীগের বক্তব্যের প্রতি জোরালো সমর্থন জানাতে থাকে।

‘বাংলাদেশ সংখ্যালঘু সমিতি’-র অভিনন্দন
২০০১ সনের ১৩ই অক্টোবর ‘বাংলাদেশ সংখ্যালঘু সমিতি’-র একটি ডেলিগেশন জামায়াতে ইসলামী থেকে নিযুক্ত দু’জন মন্ত্রীকে অভিনন্দন জানানোর জন্য জামায়াতে ইসলামীর অফিসে আসে। এই ডেলিগেশনে ছিলেন সমিতির সম্মানিত সভাপতি এডভোকেট সমরেন্দ্র নাথ গোস্বামী, প্রধান উপদেষ্টা এডভোকেট মনোরঞ্জন দাস, সেক্রেটারি জেনারেল এডভোকেট গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক, সদস্য দিলীপ দাসগুপ্ত, এডভোকেট সুনীল বিশ্বাস, ডা. নির্মল চৌধুরী, শ্যামল চন্দ্র মজুমদার, দেবাশীষ শিকদার, আরাধন সরকার, শংকর মিত্র, এডভোকেট অং সুই থুই, সুকুমার রায়, নরেশ চন্দ্র সাহা, ইঞ্জিনিয়ার আশুতোষ ভৌমিক, এডভোকেট অশোক কুমার বিশ্বাস, এডভোকেট বিনয় কুমার পোদ্দার প্রমুখ।
অত্যন্ত আন্তরিকতাপূর্ণ পরিবেশে দীর্ঘক্ষণ আলাপ-আলোচনা হয়।

পল্টন ময়দানে জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত ‘জাতীয় উলামা সম্মেলন’
২০০৬ সনের ১১ই ফেব্র“য়ারি ঢাকাস্থ পল্টন ময়দানে জামায়াতে ইসলামী একটি জাতীয় উলামা সম্মেলনের আয়োজন করে। হাজার হাজার উলামা এই সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। এই সম্মেলনে আমীরে জামায়াত মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী একটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য প্রদান করেন। বক্তব্যে তিনি বলেন, “তথাকথিত ইসলামী জঙ্গিবাদের নামে বাংলাদেশকে ধর্মীয় উগ্রবাদী, মৌলবাদীদের আখড়া প্রমাণ করে- এদেশের আলেম-উলামা এবং ইসলামের বিরুদ্ধে যেই জঘন্য ষড়যন্ত্র করা হয়েছিলো, তার একটি লক্ষ্য ছিলো ইসলামকে কুৎসিত রূপে মানুষের কাছে তুলে ধরা, আলেম-উলামা এবং ইসলামী দল ও প্রতিষ্ঠানকে উগ্রবাদী, জঙ্গিবাদী হিসেবে চিহ্নিত করে ধ্বংস করা। প্রয়োজনে বিদেশী হস্তক্ষেপের অনুকূল পরিস্থিতি সৃষ্টি করা।”
“আলহামদুলিল্লাহ, চারদলীয় জোট সরকার শক্ত হাতে এর মোকাবিলা করেছে। এই চক্রান্ত, ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় সরকারকে সবচেয়ে বেশি শক্তি জুগিয়েছেন এই দেশের উলামায়ে কিরাম। তাঁরা ঐকমত্যের ভিত্তিতে ঘোষণা করেছেন, ইসলামের সাথে জঙ্গিবাদের কোন সম্পর্ক নেই। প্রতিটি মাসজিদ থেকে এই আওয়াজ তুলে ঘোষণা করা হয়েছে ইসলামের নাম ব্যবহার করে যারা বোমাবাজি করেছে তাদের সাথে ইসলামের কোন সম্পর্ক নেই। দেশের ভেতরে বাইরে এই কথাটি তাঁরা প্রতিষ্ঠিত করেছেন। সেই সাথে যারা ইসলামের দুশমনদের ক্রীড়নক হিসেবে ঐ জঘন্য কাজে ব্যবহৃত হচ্ছিলো তারা জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং মনস্তাত্ত্বি¡কভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। মাত্র দু’মাসের মধ্যে তাদের ইসলামের নামে বোমাবাজি কার্যক্রমের নেটওয়ার্ক ভেঙ্গে পড়ে। তাদের এই জঘন্য তৎপরতা চালাবার আর কোন সুযোগ থাকে না। এই জন্য আমি বিশেষ করে বাংলাদেশের দলমত নির্বিশেষে সকল স্তরের উলামায়ে কিরামকে অভিনন্দন জানাই, কৃতজ্ঞতা জানাই।”
“আজকের এই সময়টি শুধু বাংলাদেশের নয়, দুনিয়াব্যাপী মুসলিম উম্মাহর জন্য একটি সংকটকাল, একটি দুঃসময়। দুনিয়াব্যাপী ইসলামের জাগরণ ঠেকানোর জন্য বিশ্ব জনমত বিভ্রান্ত করার লক্ষ্যে মুসলিমদের চির দুশমন জায়নবাদী ইহুদিগোষ্ঠী নিজেরাই জঙ্গিবাদী প্রতিষ্ঠানের জন্ম দিয়েছে, লালন করছে, তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ব্যবহার করছে। আর তথ্যসন্ত্রাসের মাধ্যমে তাদের অপকর্ম, তাদের দোসরদের দায়দায়িত্ব ইসলামের ওপর, ইসলামী সংগঠন, প্রতিষ্ঠান এবং আলিম-উলামার ওপর চাপাবার অপকৌশল, অপচেষ্টা চালাচ্ছে।”
“ইসলামের সম্ভাবনা নষ্ট করার জন্য, ইসলামকে অসহিষ্ণু, উগ্রবাদী, সন্ত্রাসী, গণতন্ত্রবিরোধী একটি আদর্শ হিসেবে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করার দুনিয়াব্যাপী যেই জঘন্য ষড়যন্ত্র চলছে বাংলাদেশে এটা আমরা ব্যর্থ করতে সক্ষম হয়েছি। কিন্তু তারা এক ফ্রন্টে বিজয়ী হতে না পারলে আরো ফ্রন্ট খুলতে পারে। অতএব, ভবিষ্যতে যাতে ইসলামের নাম নিয়ে বাংলাদেশের মাটিতে কোন মহল এই ধরনের ন্যক্কারজনক ভূমিকা পালন করতে না পারে, সে জন্য মুসলিমদের অভিভাবক হিসেবে, মুসলিম উম্মাহর গার্ডিয়ান হিসেবে উলামায়ে কিরাম জনগণকে, দেশবাসীকে সতর্ক সাবধান হওয়ার জন্য, সচেতন রাখার জন্য আরো জোরালো ভূমিকা পালন করবেন, এটাই সময়ের দাবি।”
“দুনিয়াব্যাপী জিহাদ সম্পর্কে কিছু ব্যক্তির অপব্যাখ্যাকে কেন্দ্র করে বিভ্রান্তি সৃষ্টির একটি সুযোগ তারা পেয়েছে। জিহাদ মানেই যুদ্ধ নয়, জিহাদ একটি ব্যাপক বিষয়। ইসলাম কায়েমের জন্য, মানবসমাজে শান্তি, কল্যাণ, ন্যায়-ইনসাফ প্রতিষ্ঠার জন্য; অন্যায় অনাচার, দুরাচার পাপাচারমুক্ত এবং শোষণমুক্ত সমাজ গড়ার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টার নাম জিহাদ। এক শ্রেণীর বিভ্রান্ত ব্যক্তি, অল্প শিক্ষিত-অশিক্ষিত ব্যক্তি, জিহাদকে কিতাল নামে অভিহিত করছে। জিহাদ আর কিতালের পার্থক্য উলামায়ে কিরামকে মানুষের কাছে পরিষ্কার করতে হবে।”
“ইসলামের ব্যাপারে নারী সমাজকেও বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। নারী অধিকার ইত্যাদি নাকি ইসলামে নেই। ইসলামের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করতে হলে আধুনিক শিক্ষিত ব্যক্তিদের মন থেকে ইসলামের ব্যাপারে ভয়ভীতি দূর করার জন্য যেমন যুক্তিগ্রাহ্য বক্তব্য দিতে হবে, তেমনি এদেশের নারী সমাজের কাছেও ইসলামের সঠিক শিক্ষা, সঠিক ব্যাখ্যা, সঠিক পরিচয় তুলে ধরতে হবে। নারী সমাজকে প্রকৃত মর্যাদা ইসলামই দিয়েছে। আজকের দিনে নারীর ক্ষমতায়নের নামে, নারী অধিকারের নামে দুনিয়াব্যাপী নারী সমাজকে এক শ্রেণীর মতলববাজের ভোগের সামগ্রী হিসেবে ব্যবহারের চক্রান্ত, ষড়যন্ত্র চলছে। তা থেকে মুক্তি দেওয়ার একমাত্র উপায় ইসলাম, ইসলাম এবং ইসলাম। মানুষের যেই অধিকার ইসলাম দিয়েছে, বিশেষ করে নারী সমাজকে দিয়েছে, উলামায়ে কিরামের বক্তব্যে এই বিষয়টিও আসতে হবে।”
“এই উলামা সম্মেলন সার্থক ও সফল হওয়ায় মহান আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীনের দরবারে শুকরিয়া জানাই, আপনাদের সকলকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাই। এই সম্মেলনকে কেন্দ্র করে কালেমায় বিশ্বাসী সকল মানুষের ঐক্য গড়ে উঠুক, ইখলাসের সাথে দীনের জন্য যাঁরা কাজ করছেন এই জাতীয় উলামা সম্মেলন তাদের সকলের সাথে সংহতির একটি মাইলফলক হোক, এই আশাবাদ ব্যক্ত করে, সকল শ্রেণীর উলামায়ে কিরামের কাছে আমার মনের এই আকুতি পৌঁছে দেওয়ার জন্য দায়িত্ব গ্রহণের জন্য আপনাদের প্রতি আবেদন জানিয়ে আমার বক্তব্য শেষ করছি।”

আওয়ামী লীগের অপরাজনীতির কারণে অনিশ্চিত হয়ে পড়ে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন
নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘনিয়ে আসতে থাকে। আওয়ামী লীগ চারদলীয় জোট সরকারের পতন ঘটাবার জন্য বহু চেষ্টা করেও সফল হতে পারেনি।
আওয়ামী লীগ জোট বেশ কয়েকটি দাবি নিয়ে মাঠ গরম করার চেষ্টা করে।
তাদের একটি দাবি ছিলো সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি কে. এম. হাসানকে কেয়ারটেকার সরকারপ্রধান করা চলবে না। বিশ বছর পূর্বে আইনজীবী থাকা কালে তিনি নাকি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের সাথে যুক্ত ছিলেন।
তাদের আরেকটি বড়ো দাবি ছিলো প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি এম. এ. আযিযসহ নির্বাচন কমিশনের সকল কমিশনারকে পদত্যাগ করিয়ে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া জাতীয় সংসদে ভাষণ দিতে গিয়ে উত্থাপিত ইস্যুগুলো নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করে সংলাপ অনুষ্ঠানের আহ্বান জানান। আওয়ামী লীগ ৫ সদস্যের একটি তালিকা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের মহাসচিবের নিকট পাঠায়। চার দলের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল থেকে দুইজন এবং বাকি তিন শরিক দল থেকে একজন করে নাম দেয়া হয়। আওয়ামী লীগ থেকে বলা হলো, কমিটিতে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ঐক্যজোটের কেউ থাকলে তারা সংলাপে বসবে না। এটি ছিলো আওয়ামী লীগের একটি অযৌক্তিক দাবি। তারপর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়ার মধ্যে সংলাপ চলে। কিন্তু প্রধান উপদেষ্টা ও নির্বাচন কমিশন বিষয়ে মতানৈক্যের কারণে দুই সপ্তাহের দীর্ঘ সংলাপ ব্যর্থ হয়ে যায়।
তখনকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে তদানীন্তন সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদের কিছু বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য। এই লেখায় তাঁর বক্তব্যের কিছু অংশ উদ্ধৃত করা হচ্ছে।
“মূলত ২৩ অক্টোবর, ২০০৬ তারিখই ছিলো জোট সরকারের শেষ কার্যদিবস। কেননা এরপর পবিত্র ঈদুল ফিতরের ছুটি। ছুটি শেষে প্রথম কর্মদিবস ২৮ অক্টোবর, ২০০৬ তারিখ সরকারের শেষ দিন। এ দিনকে সামনে রেখে দু’দলই মাঠ দখলে রাখার অভিপ্রায়ে শক্তি প্রদর্শনে তৎপর হলে সারাদেশ জুড়ে উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠার এক ধরনের ভীতি ছড়িয়ে পড়ে। ২৭ অক্টোবর, ২০০৬ তারিখ সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে সংবিধান সমুন্নত রেখে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেন। ভাষণ শেষ হতেই চারদিকে হামলা, ভাংচুর আর লুঠতরাজের সংবাদ আসতে থাকলো। চট্টগ্রামে ২৯ অক্টোবর থেকে লাগাতার হরতালের কর্মসূচি ঘোষণা করা হলো। ঢাকার রাজপথ দখলে দুই দলের মারমুখী কর্মীরা থেকে থেকে সংঘর্ষে লিপ্ত হলো।
এমতাবস্থায় দেশের প্রতি গভীর মমত্ব বোধ দেখিয়ে সাবেক প্রধান বিচারপতি কে.এম.হাসান প্রধান উপদেষ্টার পদ গ্রহণে অসম্মতি জ্ঞাপন করেন। তিনি তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন, “কোনো বিশেষ মহল বা ব্যক্তি বিশেষের দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ ও এদেশের নাগরিকদের স্বার্থের কথা ভেবেই আমি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছি।” তাঁর এ সিদ্ধান্ত তাৎক্ষণিকভাবে দেশকে গৃহযুদ্ধের হাত থেকে রক্ষা করলেও সাংবিধানিক সঙ্কট তখন শুরু হয়েছে মাত্র।
উল্লেখ্য ২৮শে অক্টোবর ২০০৬ তারিখে বায়তুল মোকাররামের উত্তর গেটে জামায়াতে ইসলামীর পূর্ব ঘোষিত সমাবেশের আয়োজন চলছিলো। সমাবেশ শুরু হওয়ার কথা বিকেল তিনটায়। দুপুরের আগেই আওয়ামী লীগের লগি-বৈঠাধারীরা জামায়াতে ইসলামীর স্বেচ্ছাসেবকদের ওপর হামলা চালায়। সমাবেশে আসার পথে লোকদেরকে লগি-বৈঠা দিয়ে পিটাতে থাকে। কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ সভাস্থলে পৌঁছার পরও হামলাকারীরা হামলা চালাতে থাকে। জামায়াতে ইসলামীর স্বেচ্ছাসেবকগণ দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত হামলাকারীদেরকে প্রতিহত করে চলেন। হামলাকারীদের লগি-বৈঠার আঘাতে ৬ জন স্বেচ্ছাসেবক শাহাদাত বরণ করেন। আহত হন শত শত জন। শাহাদাত বরণকারীগণ হচ্ছেনÑ হুসাইন মুহাম্মদ মুজাহিদুল ইসলাম, হাফিয গোলাম কিবরিয়া শিপন, সাইফুল্লাহ মুহাম্মাদ মাসুম, মুহাম্মাদ হাবিবুর রহমান, মুহাম্মাদ জসিম (১) এবং মুহাম্মাদ জসিম (২)।
হত্যার পর হামলাকারীরা লাসের ওপর নেচে নেচে উল্লাস করতে থাকে। সন্ত্রাসীরা এমন জঘন্য তাণ্ডব চালালো কিন্তু পুলিশকে কোন ভূমিকা পালন করতে দেখা গেলো না।
“২৮ অক্টোবর, ২০০৬ তারিখে পুরো দেশ যেন রণক্ষেত্রে পরিণত হলো। ঢাকা, চট্টগ্রামসহ সারাদেশই সেদিন বস্তুত অচল হয়ে পড়েছিলো। বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ঝরে গিয়েছিলো অনেক তাজা প্রাণ। শুধু রাজনৈতিক বিশ্বাসের কারণে মানুষ এতো হিংস্র হতে পারে, নিজ চোখে না দেখলে তা বিশ্বাস করা কঠিন। প্রকাশ্য দিবালোকে বিভিন্ন চ্যানেলে টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে এসব নৃশংস ঘটনা ঘটলো। রাতে নির্মম এসব হত্যাকাণ্ডের দৃশ্য টেলিভিশনের পর্দায় দেখে আমি অত্যন্ত মর্মাহত হয়েছি।”
(চলবে)
লেখক : সাবেক নায়েবে আমির
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী
তথ্যসূত্র :
১. এম. এ. ওয়াজেদ মিয়া, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ঘিরে কিছু ঘটনা ও বাংলাদেশ, পৃষ্ঠা-১৩০।
২. উদ্ধৃত, আবুল আসাদ, কালো পঁচিশের আগে ও পরে, পৃষ্ঠা : ২৭৬-২৭৭।
৩. শর্মিলা বসু, ডেড রেকনিং, পৃষ্ঠা-১৮১।
৪. খন্দকার আবুল খায়ের, ৭১-এ কি ঘটেছিল রাজাকার করা ছিল, পৃষ্ঠা-৬,৭,৮,৯।
৫. মওদুদ আহমদ, বাংলাদেশ : শেখ মুজিবর রহমানের শাসনকাল, পৃষ্ঠা-৭৫।
৬. আতিক হেলাল সম্পাদিত, মেজর জলিল রচনাবলী, পৃষ্ঠা-৩৫।

SHARE

Leave a Reply