রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামী

এ.কে.এম. নাজির আহমদ

Story(গত সংখ্যার পর)

সেনাপতির রাজনীতির বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ
১৯৮১ সালের ২৭ শে ডিসেম্বর সেনাভবনে সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল এইচ.এম. এরশাদ জাতীয় পত্রিকা এবং সংবাদ সংস্থাসমূহের সম্পাদকদের সমাবেশে একটি বক্তব্য দেন। এতে তিনি বলেন, ‘আমাদের সর্বস্তরের সামরিক লোকজন রাজনীতিতে সামরিক অ্যাডভেঞ্চার কামনা করে না, কিংবা সশস্ত্র বাহিনীতে তাঁরা রাজনৈতিক অ্যাডভেঞ্চার চান না। তাঁরা কেবলমাত্র জনগণকে সাহায্য করতে এবং যে কোন ভবিষ্যৎ (সামরিক) অভ্যুত্থানের অপচেষ্টার বিরুদ্ধে ভারসাম্য বজায় রাখতে চান।….. দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের স্বার্থে জাতীয় পর্যায়ে প্রেসিডেন্টের নেতৃত্বে গঠন করা দরকার এমন একটি দায়িত্ব ও ক্ষমতাসম্পন্ন ‘জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ’-যার সদস্য থাকবেন উপরাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, উপপ্রধানমন্ত্রী এবং কতিপয় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ছাড়াও তিন সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান।’
মূলত এটি ছিলো একটি রাজনৈতিক বক্তব্য। রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষই যে এই বক্তব্যের উৎস তা বুঝতে কারো অসুবিধা হয়নি।
১৯৮২ সালের ১লা জানুয়ারি একটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি দশ সদস্যবিশিষ্ট ‘জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ’ গঠন করেন। রাষ্ট্রপতির নেতৃত্বে এতে সদস্য রাখা হয় উপরাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, শিল্পমন্ত্রী এবং সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর প্রধানকে।
পরবর্তীতে ‘জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ’-এর সদস্য সংখ্যা দশ থেকে কমিয়ে ছয়ে আনা হয়। পরিবর্তিত পরিষদে রাষ্ট্রপতি, উপরাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং সেনাবাহিনী প্রধান, নৌবাহিনী প্রধান ও বিমানবাহিনী প্রধানকে রাখা হয়। স্পষ্টতই প্রতীয়মান হয় যে সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল এইচ.এম. এরশাদ-এর চাপেই এমনটি করতে হয়েছে। অন্যান্য রাজনৈতিক দল এবং জামায়াতে ইসলামী এটিকে একটি সরকারের ওপর আরেকটি সরকার বলে আখ্যায়িত করে।
এদিকে দেশের আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে থাকে। আবার, নানাভাবে প্রচারিত হতে থাকে, রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তারের স্বাস্থ্যের অবস্থা ভালো নয়।
১৯৮২ সালের ২৪ শে মার্চ ভোরে রেডিও ও টেলিভিশনে ঘোষণা করা হয় যে দেশে সামরিক শাসন জারি করা হয়েছে এবং সেনাপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসক নিযুক্ত হয়েছেন। অতঃপর সকাল ১১টায় রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তার ঘোষণা করেন যে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির সার্বিক অবনতি এবং স্বাস্থ্যগত কারণে তিনি সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল এইচ.এম. এরশাদের অনুকূলে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছেন। তাঁর বিষণœ চেহারা দেখে কারো বুঝতে অসুবিধা হয়নি যে চাপ সৃষ্টি করে তাঁর কাছ থেকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কেড়ে নেয়া হয়েছে।
২৭ শে মার্চ রাষ্ট্রপতি পদে নিযুক্ত করা হয় বিচারপতি আহসানউদ্দিন চৌধুরীকে।
ইতোমধ্যে মেজর জেনারেল এইচ.এম. এরশাদ মুলত বিকৃত শাসনতন্ত্রে তাঁর ইচ্ছামতো পরিবর্তন সাধনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
১৯৮৩ সালের ১৫ ফেব্র“য়ারি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে ১৫ দলীয় ঐক্যজোট। অপর দিকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে ৭ দলীয় ঐক্যজোট।
১৯৮৩ সালের ১লা এপ্রিল থেকে দেশে ঘরোয়া রাজনীতির অনুমতি দেয়া হয়।
১৯৮৩ সালের ২৮ শে মার্চ (অর্থাৎ ঘরোয়া রাজনীতি শুরুর তিন দিন আগে) জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে প্রচারিত হয় গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য সংবলিত একটি হ্যান্ডবিল।
এই হ্যান্ডবিলে বলা হয়, ‘শাসনতন্ত্রে হাত দিতে গেলে এমন জটিলতার সৃষ্টি হবে যে, শেষ পর্যন্ত দেশ কোন্ সঙ্কটে পতিত হয়, তা বলা যায় না। কারণ শাসনতন্ত্র এমন এক পবিত্র দলিল, যার ওপর জনগণের আস্থা না থাকলে দেশে কোনক্রমেই স্থিতিশীলতা আসতে পারে না। যে শাসনতন্ত্র জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা রচিত, সে শাসনতন্ত্রই জনগণের আনুগত্য লাভ করতে সক্ষম হয়। জনগণের ওপর চাপিয়ে দেয়া শাসনতন্ত্র কখনো ঐ মর্যাদা পায় না। দেশের বর্তমান শাসনতন্ত্র জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারাই রচিত। এ পর্যন্ত যে কয়েকবার একে সংশোধন করা হয়েছে তার কোনটাই শাসনতন্ত্রের বহির্ভূত (ঁহপড়হংঃরঃঁঃরড়হধষ) পদ্ধতিতে করা হয়নি। এসব সংশোধনীর পক্ষে ও বিপক্ষে যত মতই থাকুক, এসব সংশোধনী আইনসম্মত বলে স্বীকার করতে সবাই বাধ্য। কারণ এসব সংশোধনী হয় জাতীয় সংসদে গৃহীত হয়েছে, না হয় গণভোটের মাধ্যমে অনুমোদিত হয়েছে। তাই বর্তমান শাসনতন্ত্রে যে কোন রকম সংশোধনী আনতে হলে জাতীয় সংসদের প্রয়োজন। যাঁরা শাসনতন্ত্রে যে সংশোধনীই আনতে চান, তাঁদের জন্য একমাত্র সঠিক ও নিয়মতান্ত্রিক মাধ্যমই হলো জাতীয় সংসদ। সংলাপের মাধ্যমে এটা কিছুতেই সম্ভব নয়। এ ব্যাপারে মতের বিভিন্নতা ব্যাপক। কেউ চান সংশোধন-পূর্বকালীন শাসনতন্ত্র। কেউ চান চতুর্থ সংশোধনীর পূর্বের শাসনতন্ত্র। কেউ চান পঞ্চম সংশোধনীর পরবর্তী, আর কেউ ষষ্ঠ সংশোধনীসহ চান। এর মীমাংসা কে করবে এবং কিভাবে হবে।’
সুখের বিষয়, সকল রাজনৈতিক দল এই কথা বুঝতে সক্ষম হয় যে নির্বাচিত জাতীয় সংসদ ছাড়া শাসনতন্ত্র সংশোধনে হাত দেয়ার অধিকার কাউকে দেয়া উচিত নয়। বিশেষ করে সামরিক সরকারের হাতে এই ক্ষমতা তুলে দেয়া হবে মস্ত বড়ো ভুল।
১৯৮৩ সালের ২০ শে নভেম্বর বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ চত্বরে জামায়াতে ইসলামী একটি জনসভার আয়োজন করে। প্রধান বক্তা ছিলেন ভারপ্রাপ্ত আমীর আব্বাস আলী খান। উক্ত জনসভায় প্রধান বক্তা দু’টি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দেন :
এক. এরশাদ সরকার অবৈধ। কারণ সেনাপতি হিসেবে শাসনতন্ত্রের আনুগত্য করাই তাঁর কর্তব্য ছিলো। তিনি অন্যায়ভাবে শাসনতন্ত্র মুলতবি করে নির্বাচিত সরকারকে উচ্ছেদ করেছেন।
দুই. শাসনতন্ত্র পুনর্বহাল করার লক্ষ্যে মেজর জেনারেল এরশাদকে ক্ষমতা ত্যাগ করতে হবে। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে একটি কেয়ারটেকার সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে।

গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে যুগপৎ আন্দোলন
আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৫ দলীয় জোট এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নেতৃত্বাধীন ৭ দলীয় জোট কিছু যুগপৎ কর্মসূচি দিতে থাকে। জামায়াতে ইসলামীকে যুগপৎ আন্দোলনে শরিক করতে অনীহা লক্ষ্য করা গেলো।
১৯৮৩ সনের ২৮ শে নভেম্বর ১৫ দলীয় জোট ও ৭ দলীয় জোট সবিচালয় ঘেরাও কর্মসূচি দেয়। জনগণের তেমন সাড়া পাওয়া যায়নি। সচিবালয়ের দেয়াল ভাঙা ইত্যাদি কিছু ঘটনা ঘটে। সরকার এই সুযোগে সামরিক শাসন আবার দৃঢ় করে নেয়। রাজনৈতিক তৎপরতা আবার বন্ধ হয়ে যায়।
এই সময়টিতে জামায়াতে ইসলামীর লিয়াজোঁ কমিটি দুই নেত্রীসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দের সাথে যোগাযোগ করে অগণতান্ত্রিক পদ্ধতি অনুসরণ করে গণতন্ত্রে উত্তরণ সম্ভব নয় বলে জামায়াতে ইসলামীর দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে। এই বক্তব্যের প্রতি তাঁরা ইতিবাচক মনোভঙ্গি ব্যক্ত করেন।
তখন থেকে ১৫ দলীয় জোট ও ৭ দলীয় জোটের সাথে জামায়াতে ইসলামীর লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে থাকে। একই দিনে পৃথক পৃথক রুটে মিছিল, পৃথক পৃথক স্থানে সমাবেশ এবং পৃথক পৃথক বিবৃতি প্রদান চলতে থাকে।
১৯৮৪ সনের গোড়ার দিকে এরশাদ সরকার উপজিলা নির্বাচনের ঘোষণা দেয়।
এটা ছিলো এরশাদের স্বৈরশাসনের ভিত্ মজবুত করার কৌশল। ১৫ দলীয় জোট ও ৭ দলীয় জোট এবং জামায়াতে ইসলামী এটিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে গ্রহণ করে। তিন দিক থেকেই উচ্চারিত হয় : সর্বাগ্রে জাতীয় সংসদ নির্বাচন চাই। নির্বাচিত জাতীয় সংসদই সিদ্ধান্ত নেবে উপজিলা পরিষদ হবে কী হবে না। প্রশাসনের কোন পরিবর্তন সাধনের ইখতিয়ার সামরিক সরকারের নেই।
এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে ১৫ দলীয় জোট, ৭ দলীয় জোট এবং জামায়াতে ইসলামীর যুগপৎ আন্দোলন শক্তি সঞ্চয় করতে সক্ষম হয়।

হুসেইন মুহাম্মাদ এরশাদ কর্তৃক রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ
১৯৮৩ সনের ১১ ডিসেম্বর প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হুসেইন মুহাম্মাদ এরশাদ বিচারপতি আহসান উদ্দীন চৌধুরীকে সরিয়ে নিজেই রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

জেনারেল (অব.) মুহাম্মাদ আতাউল গনী ওসমানীর মৃত্যু
জেনারেল (অব:) মুহাম্মাদ আতাউল গনী ওসমানী ছিলেন বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক। ‘জেনারেল ওসমানী ‘সাহায্য’ ছাড়া অন্য কোন ধরনের হস্তক্ষেপ ও মুরুব্বিয়ানা সহ্য করতে চাইতেন না।’
‘নিজ দেশের স্বাধীন সত্তা সম্পর্কে তাঁর যে ভয়ঙ্কর অহঙ্কার ছিলো তার দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েই তিনি এটা চেয়েছিলেন। তাঁর বাহিনী ভারতীয় বাহিনীর সাথে সংযুক্ত হোক, এটা তিনি কিছুতেই চাইতেন না।’
লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার একক নেতৃত্বে ভারতীয় বাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর যৌথকমান্ড গঠন তিনি সহজভাবে নিতে পারেননি।
তাই দেখা যায় যৌথকমান্ড গঠনের পরও তিনি মুক্তিবাহিনীকে সরাসরি কমান্ড করতেন।
এইসব কারণেই পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের পুরো ঘটনা তাঁর নিকট গোপন রাখা হয়।
১৯৮৩ সনের ২৪ শে নভেম্বর সাপ্তাহিক বিচিত্রা-র পক্ষ থেকে তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো, ‘পাকিস্তানি সৈন্যদের আত্মসমর্পণ আপনার নিকট হলো না কেন?’ জওয়াবে তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের এমন অনেক ঘটনা আমি জানি, যাতে অনেকেরই অসুবিধা হবে। আমি একটা বই লিখছি। তাতে সব ঘটনাই পাবেন। একটা আত্মজীবনী লিখবো। অনেক অজানা ইতিহাস থাকবে তাতে। জেনারেল ওসমানীর জীবনীগ্রন্থ হবে না সেটা, সেটা হবে বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাস।’
চিকিৎসার জন্য লন্ডন যাওয়ার প্রাক্কালে সিএমএইচ হাসপাতালে তিনি এই সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন।
অনেক কথা, অনেক ইতিহাস বুকে নিয়ে ১৯৮৪ সনের ১৬ জানুয়ারি জেনারেল (অব:) মুহাম্মাদ আতাউল গনী ওসমানী লন্ডনে মৃত্যুবরণ করেন।

রাষ্ট্রপতি এরশাদের সাথে বিরোধী দলগুলোর সংলাপ
১৯৮৪ সনের গোড়ার দিকে যুগপৎ আন্দোলন শক্তি সঞ্চয় করতে পারায় হুসেইন মুহাম্মাদ এরশাদ বিরোধী দলগুলোর সাথে সংলাপের তাকিদ অনুভব করেন।
জামায়াতে ইসলামী ১৫ দলীয় জোট এবং ৭ দলীয় জোটের নেতৃবৃন্দকে বুঝাবার চেষ্টা করে যে সংলাপ সফল করতে হলে সকল বিরোধী দল একই সংগে গিয়ে একই কথা বলা প্রয়োজন। জামায়াতে ইসলামীর এই কথার যৌক্তিকতা তাঁরা বুঝতে ব্যর্থ হন।
১৯৮৪ সনের ৯ এপ্রিল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ৭ দলীয় জোটের নেতৃবৃন্দ বঙ্গভবনে গিয়ে রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মাদ এরশাদের কাছে ৩৩ দফা দাবি পেশ করে বঙ্গভবন ত্যাগ করেন।
১৯৮৪ সনের ১০ এপ্রিল ভারপ্রাপ্ত আমীর আব্বাস আলী খানের নেতৃত্বে জামায়াতে ইসলামীর একটি টিম বঙ্গভবনে গিয়ে রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মাদ এরশাদের নিকট জামায়াতে ইসলামীর বক্তব্য তুলে ধরে। বক্তব্যে বলা হয়, ‘সেনাপ্রধান হিসেবে শপথ নেয়ার সময় আপনি যেই শাসনতন্ত্রের হিফাজতের দায়িত্ব নিয়েছিলেন তা মুলতবি করে এবং নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করার কোনো বৈধ অধিকার আপনার ছিলো না। শাসনতন্ত্র পুনর্বহাল করে নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকারের হাতে ক্ষমতা তুলে দিন। এই ব্যাপারে দু’টি বিকল্প পদ্ধতি অবলম্বন করতে পারেন :
১. আপনি যদি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চান তাহলে সুপ্রিম কোর্টের কর্মরত প্রধান বিচারপতির নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর করুন। তাঁর নেতৃত্বে একটি অরাজনৈতিক ও নির্দলীয় কেয়ারটেকার সরকার নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা করুক। এই নির্বাচনে জনগণ আপনাকে নির্বাচিত করলে আপনি দেশ শাসনের বৈধ অধিকার পাবেন।
২. আপনি যদি ঘোষণা করেন যে, আপনি নিজে নির্বাচনে প্রার্থী হবেন না এবং কোন রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে থাকবেন না তাহলে আপনাকেও কেয়ারটেকার সরকারপ্রধান হিসেবে গ্রহণ করতে আমরা সম্মত। নির্বাচনের পর আপনি পদত্যাগ করবেন এবং নির্বাচিত সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পালন করবে।’
১৯৮৪ সনের ১১ এপ্রিল আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৫ দলীয় জোটের নেতৃবৃন্দ বঙ্গভবনে গিয়ে হুসেইন মুহাম্মাদ এরশাদের সাথে সংলাপ করেন প্রায় তিন ঘন্টা।
পৃথক পৃথক সংলাপের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি এরশাদ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে প্রচণ্ড মতবিরোধ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পেয়ে যান। এতে তিনি দৃঢ়তা দেখাতে শুরু করেন।
জামায়াতে ইসলামীর লিয়াজোঁ কমিটি উভয় জোটের সাথে যোগাযোগ অব্যাহত রাখে।
১৯৮৪ সনের ২৭ শে সেপ্টেম্বর ১৫ দলীয় জোট, ৭ দলীয় জোট ও জামায়াতে ইসলামীর ডাকে সারা দেশে হরতাল পালিত হয়।
১৪ অক্টোবর ঢাকাতে ১৫ দলীয় জোট, ৭ দলীয় জোট এবং জামায়াতে ইসলামী যুগপৎ মহাসমাবেশ অনুষ্ঠিত করে। ১৫ দলীয় জোটের মহাসমাবেশ বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ চত্বরে, ৭ দলীয় জোটের মহাসমাবেশ বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে এবং জামায়াতে ইসলামীর মহাসমাবেশ মতিঝিল শাপলা চত্বরে অনুষ্ঠিত হয়। জামায়াতে ইসলামীর মহাসমাবেশে প্রধান বক্তা ছিলেন ভারপ্রাপ্ত আমীর আব্বাস আলী খান।
৮ ডিসেম্বর সারা দেশে হরতাল পালিত হয়। এরপর ২২ ও ২৩ শে ডিসেম্বর পালিত হয় দুই দিনের টানা হরতাল।

রাষ্ট্রপতি এরশাদের গণভোট বর্জন
১৯৮৫ সনের ২১ শে মার্চ রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মাদ এরশাদ তাঁর প্রতি জনগণের আস্থা আছে কি না তা যাচাইয়ের জন্য গণভোটের আয়োজন করেন।
ভাড়াটে কিছু লোক ছাড়া ভোটকেন্দ্রে কেউ যায়নি। তথাপিও নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে ঘোষণা করা হয় যে, বিশাল সংখ্যক ভোটার রাষ্ট্রপতির প্রতি তাদের আস্থা ব্যক্ত করেছে। অবশ্য যাতে বাধামুক্তভাবে গণভোট সম্পন্ন হতে পারে সেই জন্য ১লা মার্চ থেকেই রাজনৈতিক তৎপরতা নিষিদ্ধ করা হয়েছিলো।

উপজিলা চেয়ারম্যান নির্বাচন বয়কট
এবার এরশাদ ঘোষণা করলেন যে, ১৯৮৫ সনের ১৬ ও ২০ মে উপজিলা চেয়ারম্যান নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সংলাপে সকলেই সর্বাগ্রে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি উত্থাপন করেছিলেন। হুসেইন মুহাম্মাদ এরশাদের উপজিলা চেয়ারম্যান নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা সেই দাবির প্রতি বৃদ্ধাঙুলি দেখানোর মতোই ছিলো।
১৫ দলীয় জোট, ৭ দলীয় জোট এবং জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে উপজিলা চেয়ারম্যান নির্বাচন বয়কট করার ঘোষণা দেয়া হয়।
নির্বাচনের দিন হরতালও পালিত হয়।

সাউথ এশিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর রিজিওনাল কো-অপারেশন গঠন
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান উপমহাদেশের ৭টি রাষ্ট্রের একটি সংস্থা কায়েমের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। সাড়াও পেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর স্বপ্ন বাস্তবায়িত হওয়ার আগেই তিনি শহীদ হন।
১৯৮৫ সনের ৭-৯ ডিসেম্বর বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, নেপাল, ভুটান ও মালদ্বীপের রাষ্ট্রপ্রধান/সরকারপ্রধানগণ ঢাকাতে মিলিত হয়ে সাউথ এশিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর রিজিওনাল কো-অপারেশন (ঝঅঅজঈ) গড়ে তোলেন। প্রতিষ্ঠা সম্মেলনেই অনেক মূল্যবান প্রস্তাব ও সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এইগুলো বাস্তবায়িত হলে সবগুলো দেশই উপকৃত হতো। কিন্তু বৃহৎ দেশ ভারতের সহযোগিতার অভাবে ঝঅঅজঈ বেশিদূর এগুতে পারেনি।

১৯৮৬ সনের ৭ মে অনুষ্ঠিত তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ
রাষ্ট্রপতি এরশাদ এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনের উদ্যোগ নেন।
নির্বাচন ঘোষণার পর ১৫ দলীয় জোট ও ৭ দলীয় জোটের সাথে জামায়াতে ইসলামীর লিয়াজোঁ কমিটির যোগাযোগ আরো বেড়ে যায়।
রাষ্ট্রপতি এরশাদের অধীনে নির্বাচন মোটেই অবাধ ও নিরপেক্ষ হওয়ার সম্ভাবনা ছিলো না।
জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে দুই জোটকে বলা হলো, রাষ্ট্রপতি এরশাদকে পদত্যাগ করে কেয়ারটেকার সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি জানালে নির্বাচন বয়কট করার ভিত্তি তৈরি হতে পারে। আর তাঁকে ক্ষমতায় রেখে নির্বাচনে গেলে তাঁর অবস্থান মজবুত করতে সহযোগিতা করা হবে।
কিন্তু জামায়াতে ইসলামী কর্তৃক প্রস্তাবিত কেয়ারটেকার সরকারের দাবির সাথে একমত হলে জামায়াতে ইসলামীর ভাবমর্যাদা বৃদ্ধি পায় বিধায় এই বিষয়ে একমত হতে জোটদ্বয়ের অনীহা ছিলো লক্ষ্য করার মতো।
এমতাবস্থায় জামায়াতে ইসলামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা এবং অপর দু’টি জোটকেও নির্বাচনমুখী করার সিদ্ধান্ত নেয়।
১৯৮৬ সনের ১৯ শে মার্চ রাত ২টায় জানা যায় যে, আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে। কিন্তু বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল তখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেনি। রাত ৩টায় জামায়াতে ইসলামীর লিয়াজোঁ কমিটিকে দলটি থেকে জানানো হয়, ‘একটা টেকনিক্যাল কারণে আমরা এখনো সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি। আগামীকাল সিদ্ধান্ত নেবো। আপনারা আপনাদের সিদ্ধান্ত পত্রিকায় দিয়ে দিন।’ কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি।
১৯৮৬ সনের ৭ মে জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
জামায়াতে ইসলামী ৭৬টি আসনে নমিনি দেয়।
নিজ নামে জামায়াতে ইসলামীর এটিই ছিলো জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথম অংশ গ্রহণ। তাই জামায়াতে ইসলামীর জনশক্তির মধ্যে বেশ উৎসাহ-উদ্দীপনা পরিলক্ষিত হয়।
এই নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি হয়।
এই নির্বাচনে হুসেইন মুহাম্মাদ এরশাদের জাতীয় পার্টি ১৫৮টি আসনে, আওয়ামী লীগ ৯৬টি আসনে, জামায়াতে ইসলামী ১০টি আসনে, জাসদ ৪টি আসনে, অন্যান্য দল ১০টি আসনে এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ২২টি আসনে বিজয়ী হয়।
জামায়াতে ইসলামী থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা হচ্ছেন : অধ্যাপক মুজিবুর রহমান (রাজশাহী), জনাব এ.এস.এম. মোজাম্মেল হক (ঝিনাইদহ), জনাব লতিফুর রহমান (নওয়াবগঞ্জ), জনাব কাজী শামসুর রহমান (সাতক্ষীরা), জনাব জবানউদ্দীন আহমদ (নিলফামারী), অ্যাডভোকেট নূর হোসাইন (যশোর), জনাব মকবুল হোসেন (ঝিকরগাছা), জনাব আবদুর রহমান ফকির (বগুড়া), জনাব মীম. উবাইদুল্লাহ (নওয়াবগঞ্জ) এবং জনাব আবদুল ওয়াহিদ (কুষ্টিয়া)।
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে জামায়াতে ইসলামীর এটি দ্বিতীয় উপস্থিতি।

১৯৮৬ সনের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন বর্জন
১৯৮৬ সনের ১লা সেপ্টেম্বর হুসেইন মুহাম্মাদ এরশাদ আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় পার্টিতে যোগদান করেন এবং পার্টির চেয়ারম্যান হন।
১৯৮৬ সনের ৪ঠা সেপ্টেম্বর হুসেইন মুহাম্মাদ এরশাদ নিজকে লে. জেনারেল পদে উন্নীত করে সেনাবাহিনী থেকে অবসর গ্রহণ করেন।
অতঃপর জনগণের নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিজকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত নেন। জামায়াতে ইসলামীর লিয়াজোঁ কমিটি উভয় জোটের নেত্রীর সাথে যোগাযোগ করে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন বর্জনের ব্যাপারে সম্মত করার চেষ্টা করে।
১৯৮৬ সনের ১৫ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল নেতৃত্বাধীন জোট এবং জামায়াতে ইসলামী নির্বাচন বর্জন করায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন খুব পানসে হয়ে যায়। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন দ্বারা হুসেইন মুহাম্মাদ এরশাদ যেই গৌরব অর্জন করতে চেয়েছিলেন তা তিনি অর্জন করতে পারেননি।
১৯৮৬ সনের ২৩ শে অক্টোবর হুসেইন মুহাম্মাদ এরশাদ নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।
জামায়াতে ইসলামীর লিয়াজোঁ কমিটি স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন জোরদার করার লক্ষ্যে আবার যোগাযোগ শুরু করে।
এই সময় ১৫ দলীয় জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়া বামদের গড়া ৫ দলীয় জোট নোংরা রাজনীতিতে লিপ্ত হয়। তারা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের কাছে গিয়ে বলে, জামায়াতে ইসলামী আওয়ামী লীগের সাথে আঁতাত করে সংসদ নির্বাচন করেছে, তাই এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে জামায়াতে ইসলামীকে সাথে নেবেন না। আবার আওয়ামী লীগের কাছে গিয়ে বলে, জামায়াতে ইসলামী স্বাধীনতা বিরোধী দল। কাজেই তাদেরকে নিয়ে গণতান্ত্রিক আন্দোলন করা যাবে না।

১৯৮৭ সনের ৩রা ডিসেম্বর ১০ জন সংসদ সদস্যের পদত্যাগ
১৯৮৭ সনে রাষ্ট্রপতি এরশাদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে যুগপৎ আন্দোলন আবার গড়ে ওঠে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করায় আন্দোলনে বেশি সোচ্চার হয়।
১৯৮৭ সনের ৩রা ডিসেম্বর জামায়াতে ইসলামীর ১০ জন সংসদ সদস্য মাননীয় স্পিকার শামসুল হুদা চৌধুরীর নিকট গিয়ে পদত্যাগপত্র পেশ করেন। আওয়ামী লীগ সদস্যগণও পদত্যাগপত্র পেশ করবেন বলে জানানো হয়। কিন্তু নেত্রী বিদেশে থাকায় তাঁদের সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হচ্ছিলো। ঠিক এই অবস্থাতেই ৬ই ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতি এরশাদ জাতীয় সংসদ ভেঙে দেন। এতে আওয়ামী লীগ বেশ বেকায়দায় পড়ে যায়।

১৯৮৮ সনের ৩রা মার্চ অনুষ্ঠিত চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন
শাসনতান্ত্রিক শূন্যতা পূরণের জন্য রাষ্ট্রপতি এরশাদ তীব্রভাবে জাতীয় সংসদের নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন এবং নির্বাচন অনুষ্ঠানের কার্যক্রম শুরু করেন।
আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ৮ দলীয় জোট, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নেতৃত্বাধীন ৭ দলীয় জোট এবং জামায়াতে ইসলামী এই নির্বাচন বয়কট করে।
আ.স.ম. আবদুর রবের নেতৃত্বে কয়েকটি ছোট ছোট দল একত্রিত হয়ে এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে।
ভোটার উপস্থিতি ছিলো প্রায় শূন্য। তবুও নির্বাচন কমিশনকে দিয়ে ঘোষণা করানো হয় এই নির্বাচনে ৬০ ভাগ ভোটার ভোট দিয়েছেন। আরো ঘোষণা করা হয়, জাতীয় পার্টি ২৫১টি আসনে, আ.স.ম. আবদুর রবের নেতৃত্বাধীন কম্বাইন্ড অপোজিশন ১৯টি আসনে, অন্যান্য দল ৫টি আসনে এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীগণ ২৫টি আসনে বিজয়ী হয়েছেন।
বড় বড় দলগুলো নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করায় এই নির্বাচন দেশে-বিদেশে গ্রহণযোগ্য হলো না। কোন না কোন ভাবে জনমতকে প্রভাবিত করার জন্য রাষ্ট্রপতি এরশাদ তখন মরিয়া।
১৯৮৮ সনের ৭ই জুন জাতীয় সংসদ তাঁর সিদ্ধান্তে সংবিধানের অষ্টম সংশোধনী পাস করে।
‘রাষ্ট্রধর্ম’ শিরোনামে একটি অনুচ্ছেদ সংযোজন করে তাতে বলা হয় “ইসলাম প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্ম, তবে প্রজাতন্ত্রে অন্যান্য ধর্মও শান্তি ও সম্প্রীতিতে পালন করা যাবে।”
এই সময় বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা, অন্যতম সেক্টর কমান্ডার, মেজর জেনারেল (অব.) সি. আর. দত্তের উদ্যোগে “রাষ্ট্রধর্ম” অনুচ্ছেদ প্রত্যাহারের দাবিতে আন্দোলন চালাবার জন্য গঠিত হয় “হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ।”

কেয়ারটেকার সরকারের দাবিতে আবার যুগপৎ আন্দোলন
১৯৮৯ সনের অক্টোবর মাসে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ৮ দলীয় জোট, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নেতৃত্বাধীন ৭ দলীয় জোট, বামদের ৫ দলীয় জোট এবং জামায়াতে ইসলামী কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদের নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন পরিচালনার সিদ্ধান্ত গ্রহণের সাথে সাথেই এরশাদবিরোধী আন্দোলন চাঙ্গা হয়ে ওঠে।
অনেক বিলম্বে হলেও জামায়াতে ইসলামীর কেয়ারটেকার সরকারের দাবি জাতীয় দাবিতে পরিণত হয়
১৯৯০ সনের ১৯ শে নভেম্বর বিকেলে অনুষ্ঠিত পৃথক পৃথক সমাবেশ থেকে ৮ দলীয় জোট, ৭ দলীয় জোট, ৫ দলীয় জোট এবং জামায়াতে ইসলামী কেয়ারটেকার সরকারের রূপরেখা প্রকাশ করে।
১৯৯০ সনের ২৭ শে নভেম্বর দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়। কারফিউ জারি করা হয়। ছাত্র-জনতা কারফিউ ভেঙে মিছিল করতে থাকে।
১৯৯০ সনের ৪ঠা ডিসেম্বর রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, ছাত্র, শ্রমিক এবং বিভিন্ন পেশার অগণিত লোক ঢাকা মহানগরীর রাজপথগুলো মিছিলে মিছিলে ভরে দেয়।
১৯৯০ সনের ৫ ডিসেম্বর বিরোধী দলগুলো সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি শাহাবুদ্দীন আহমদকে কেয়ারটেকার প্রধান করার জন্য চাপ সৃষ্টি করে। রাষ্ট্রপতি এরশাদ ঐদিনই জাতীয় সংসদ ভেঙে দেন।
১৯৯০ সনের ৬ ডিসেম্বর ব্যারিস্টার মওদূদ আহমদ উপরাষ্ট্রপতি পদে ইস্তফা দেন। রাষ্ট্রপতি এরশাদ বিচারপতি শাহাবুদ্দীন আহমদকে উপরাষ্ট্রপতি নিযুক্ত করেন, তাঁকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বানিয়ে, নিজে রাষ্ট্রপতি পদে ইস্তফা দেন।

১৯৯১ সনের ২৭ শে ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ
১৯৯০ সনের ৬ ডিসেম্বর বিচারপতি শাহাবুদ্দীন আহমদ অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট হিসেবে কেয়ারটেকার সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি ৯ জন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে উপদেষ্টা নিযুক্ত করেন। উপদেষ্টাগণ হচ্ছেন-
১. জনাব কফিলউদ্দিন মাহমুদ (সাবেক অর্থ সচিব), ২. জনাব ফখরুদ্দীন আহমদ (সাবেক পররাষ্ট্র সচিব), ৩. ডা. এম.এ. মাজেদ (সাবেক সভাপতি, বি.এম.এ), ৪. ড. জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী (সাবেক ভিসি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়), ৫. এম.জি. কিবরিয়া (সাবেক আইজিপি), ৬. মেজর (অব:) রফিকুল ইসলাম (বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা), ৭. ব্যারিস্টার সৈয়দ ইশতিয়াক আহমদ (সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়ার আইনজীবী), ৮. ড. রেহমান সুবহান (অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ), ৯. জনাব আবদুল খালেক (সাবেক আইজিপি)।
বিচারপতি শাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন কেয়ারটেকার সরকার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
১৯৯১ সন বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ সন। “এই প্রথম সুযোগ আসে একটি নিরপেক্ষ ও নির্দলীয় সরকারের তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনের মাধ্যমে সত্যিকারের গণপ্রতিনিধিত্বমূলক সরকার নির্বাচন করার।”
২৬ শে ফেব্র“য়ারি সন্ধ্যায় কেয়ারটেকার সরকার প্রধান অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি শাহাবুদ্দীন আহমদ রেডিও-টেলিভিশন ভাষণে বলেন, “এবারের নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হতে বাধ্য।” রাতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি মুহাম্মাদ আবদুর রউফ রেডিও ও টেলিভিশন ভাষণে বলেন, “যে কোন মূল্যে নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ করা হবে।”
২৭ শে ফেব্র“য়ারি শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয় পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন।
এই নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ১৪০টি আসনে, আওয়ামী লীগ ৮৮টি আসনে, জাতীয় পার্টি (এরশাদ) ৩৫টি আসনে, জামায়াতে ইসলামী ১৮টি আসনে, অন্যান্য দল এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীগণ ১৯টি আসনে বিজয়ী হন। বেগম খালেদা জিয়া ও হুসেইন মুহাম্মাদ এরশাদ পাঁচটি পাঁচটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে প্রত্যেকটিতেই বিজয়ী হন। শেখ হাসিনা তিনটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে মাত্র ১টি আসনে বিজয়ী হন।
২৮ শে ফেব্র“য়ারি সন্ধ্যায় আওয়ামী লীগ সভানেত্রী এক সাংবাদিক সম্মেলনে “কতিপয় অদৃশ্য শক্তির গোপন আঁতাতের মাধ্যমে নির্বাচনে সূক্ষ্ম ও সুকৌশলে কারচুপি হয়েছে” বলে হাস্যকর উক্তি করেন।
১লা মার্চ এক সাংবাদিক সম্মেলনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া বলেন, “নির্বাচন অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ, সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে সম্পন্ন হয়েছে। তবে ভোটার তালিকা ছিলো ত্র“টিপূর্ণ। ভোটার তালিকায় ত্র“টি না থাকলে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল দুই-তৃতীয়াংশ আসন পেতো।” ঐ দিনই আওয়ামী লীগ প্রেসিডিয়ামের অন্যতম সদস্য ড. কামাল হোসেন (যিনি নির্বাচনে বিজয়ী হতে পারেননি) এক বিবৃতিতে গণরায়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, “নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে। আমি আশা করি, সবাই অর্জিত গণতন্ত্র রক্ষা করবেন।”
“৩রা মার্চ আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ব্যর্থতার দায়দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে সভানেত্রীর দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেন।”
তবে ৫ই মার্চ তিনি সহকর্মীদের অনুরোধে পদত্যাগপত্র প্রত্যাহার করে নেন।
এই নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর নমিনি ছিলেন ২২২ জন। ১৮ জন বিজয়ী হন। বিজয়ী সদস্যগণ হচ্ছেনÑ ১. মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী (পাবনা), ২. মাওলানা আবদুস সুবহান (পাবনা), ৩. মাওলানা আযিযুর রহমান চৌধুরী (দিনাজপুর), ৪. মাওলানা শাহাদাতুজ্জামান (বগুড়া), ৫. মাওলানা নাছিরুদ্দিন (নওগাঁ), ৬. লতিফুর রহমান (নওয়াবগঞ্জ), ৭. মাওলানা আবু বাকর শেরকুলি (নাটোর), ৮. মাওলানা হাবিবুর রহমান (চুয়াডাঙ্গা), ৯. মাওলানা সাখাওয়াত হুসাইন (যশোর), ১০. মুফতী আবদুস সাত্তার (বাগেরহাট), ১১. শাহ মুহাম্মাদ রহুল কুদ্দুস (খুলনা), ১২. এড. শেখ আনছার আলী (সাতক্ষীরা), ১৩. কাজী শামসুর রহমান (সাতক্ষীরা), ১৪. এ.এস.এম. রিয়াছাত আলী (সাতক্ষীরা), ১৫. গাজী নজরুল ইসলাম (সাতক্ষীরা), ১৬. ডা. এ.কে.এম. আসজাদ (রাজবাড়ী), ১৭. শাহজাহান চৌধুরী (চট্টগ্রাম) এবং ১৮. এনামুল হক মনজু (কক্সবাজার)।
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে জামায়াতে ইসলামীর এটি তৃতীয় উপস্থিতি। (চলবে)
লেখক : সাবেক নায়েবে আমির
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী

তথ্যসূত্র :
১. এম. এ. ওয়াজেদ মিয়া, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ঘিরে কিছু ঘটনা ও বাংলাদেশ, পৃষ্ঠা-১৩০।
২. উদ্ধৃত, আবুল আসাদ, কালো পঁচিশের আগে ও পরে, পৃষ্ঠা : ২৭৬-২৭৭।
৩. শর্মিলা বসু, ডেড রেকনিং, পৃষ্ঠা-১৮১।
৪. খন্দকার আবুল খায়ের, ৭১-এ কি ঘটেছিল রাজাকার করা ছিল, পৃষ্ঠা-৬,৭,৮,৯।
৫. মওদুদ আহমদ, বাংলাদেশ : শেখ মুজিবর রহমানের শাসনকাল, পৃষ্ঠা-৭৫।
৬. আতিক হেলাল সম্পাদিত, মেজর জলিল রচনাবলী, পৃষ্ঠা-৩৫।

SHARE

Leave a Reply