রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামী

 এ. কে. এম. নাজির আহমদ

Jamat-Islami-Bangladesh(গত সংখ্যার পর)

“সাবেক প্রধান বিচারপতি কে.এম. হাসান প্রধান উপদেষ্টার পদ গ্রহণে অসম্মতি জানানোর সাথে সাথে বিচারপতি হামিদুল হকও সেই পথে হাঁটলেন। বিচারপতি এম.এ. আজিজও একটি সাংবিধানিক পদে কর্মরত থাকায় অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের ভেতর থেকে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের সংবিধাননির্দেশিত আর কোনো উপায় থাকলো না।”
“১৪ দলীয় জোট বিচারপতি মাহমুদুল হকের ব্যাপারে আগ্রহী হলে চারদলীয় জোট তাদের অনিচ্ছা প্রকাশ করে।”
“প্রেসিডেন্ট প্রধান উপদেষ্টা ইস্যুতে ২৮ অক্টোবর, ২০০৬ তারিখ বিকেলে সর্বদলীয় বৈঠক আহ্বান করেন। সেখানেও বিষয়টি সুরাহা না হলে মহামান্য প্রেসিডেন্ট সংবিধানের ৫৮ (গ) ৬-এর অনুচ্ছেদ মোতাবিক স্বীয় দায়িত্বের অতিরিক্ত হিসেবে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। প্রেসিডেন্টের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের প্রস্তাব চারদলীয় জোট স্বাগত জানালেও ১৪ দলীয় জোট সংবিধানপ্রদত্ত সকল পন্থা প্রয়োগ না করেই সর্বশেষ পন্থা অনুসরণ করায় বিষয়টির সমালোচনা করে এবং এ ব্যাপারে তাদের অসম্মতি জানায়।”
“২৯ অক্টোবর, ২০০৬ তারিখ বিকেলে বঙ্গভবনে মহামান্য প্রেসিডেন্ট প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে চারদলীয় জোট উপস্থিত থাকলেও ১৪ দলীয় জোট অনুপস্থিত ছিলো।”
“৩১ অক্টোবর, ২০০৬ তারিখ সন্ধ্যায় দশজন উপদেষ্টাকে নিয়ে উপদেষ্টা পরিষদ গঠিত হলো। এ দশজন উপদেষ্টা হলেন বিচারপতি মো. ফজলুল হক, ড. আকবর আলি খান, লে. জেনারেল (অব.) হাসান মশহুদ চৌধুরী, সি.এম.শফি সামি, ধীরাজ কুমার নাথ, এম. আজিজুল হক, মাহবুবুল আলম, ডা. সুফিয়া রহমান, বেগম ইয়াসমীন মুরশেদ ও বেগম সুলতানা কামাল।”
“দেশকে স্থিতিশীল করে বিশ্বাসযোগ্য একটি সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দিতে নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার কাজ শুরু করলো। ২ নভেম্বর ২০০৬ তারিখ উপদেষ্টা পরিষদ নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো। প্রশাসনেও অনেক রদবদল করা হলো। র‌্যাবের মহাপরিচালকসহ অনেকের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করা হলো। পুলিশের উচ্চপর্যায়ে রদবদল করা হলো। নতুন আইজি ও ডিএমপি কমিশনার হিসেবে যথাক্রমে মো. খোদাবকস ও এ.বি.এম. বজলুর রহমানকে নিয়োগ দেওয়া হলো। কিন্তু এসব কার্যক্রম আন্দোলনকারী দলসমূহকে আশ্বস্ত করতে পারলো না।”
“সরকারের উচ্চপর্যায়ে সমন্বয়হীনতা ও টানাপড়েনের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ হিসেবে সরকারের চার উপদেষ্টা লে. জেনারেল (অব.) হাসান মশহুদ, ড. আকবর আলি খান, সি.এম. শফি সামি এবং বেগম সুলতানা কামাল ১১ ডিসেম্বর, ২০০৬ তারিখে একযোগে পদত্যাগ করেন।”
“তত্ত্বাবধায়ক সরকার অতি দ্রুতই তাদের শূন্যস্থান পূরণে উদ্যোগী হয়। ১২ ডিসেম্বর, ২০০৬ তারিখে ড. শোয়েব আহমেদ, প্রফেসর মইনউদ্দিন খান, মেজর জেনারেল (অব:) রুহুল আমিন চৌধুরী এবং শফিকুল হক চৌধুরী নতুন উপদেষ্টা হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। উপদেষ্টা পরিষদের হঠাৎ এ পরিবর্তনের কারণে ২২ জানুয়ারির নির্বাচনের ব্যাপারে ধীরে ধীরে শঙ্কা বাড়তে থাকে। ১৪ দলীয় জোট তখনো নির্বাচনের ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড” তৈরি হয়নি বলে চাপ অব্যাহত রাখে, অন্য দিকে চারদলীয় জোট নির্ধারিত সময়ে নির্বাচনের জন্য চাপ সৃষ্টি করে।”
“১৮ ডিসেম্বর, ২০০৬ তারিখে পল্টন ময়দানে ১৪ দলের সমাবেশে জাতীয় পার্টি ও এল.ডি.পি (ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী) যোগ দিলে ১৪ দলের পরিকল্পিত নির্বাচনী মহাজোট গঠিত হয়।
২০ ডিসেম্বর রাজনৈতিক দলের দাবি অনুযায়ী ২২ জানুয়ারি নির্বাচনের তারিখ সঠিক রেখে সকল দলের অংশগ্রহণের সুবিধার্থে মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় পিছিয়ে দেয়া হয়।”
“৩ জানুয়ারি, ২০০৭ তারিখে হোটেল শেরাটনে জনাকীর্ণ এক সংবাদ সম্মেলনে মহাজোট প্রেসিডেন্টের প্রধান উপদেষ্টার পদ আঁকড়ে থাকা, ভোটার লিস্টের ত্র“টি ও ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরি হয়নি বলে ২২ জানুয়ারি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে না বলে ঘোষণা দেয়। তারা ৭ ও ৮ জানুয়ারি সারাদেশে অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করে তাদের সকল প্রার্থীকে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের নির্দেশ দেয়। ফলে এতোদিন ধরে চলমান সমঝোতা প্রক্রিয়া এবং দেশকে ভয়াবহ এক সংঘর্ষ থেকে বাঁচানোর যে চেষ্টা চলছিলো তা এক মুহূর্তে ফিকে হয়ে যায়।”
“দিনে দিনে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তখন চূড়ান্ত সংঘর্ষের দিকে মোড় নিচ্ছিলো। ৭-৯ জানুয়ারি সারাদেশে অবরোধ পালিত হলো। ভাঙচুর, বিক্ষোভ, মিছিল আর বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষে পুরো দেশ অচল হয়ে পড়লো।
মহাজোট ঘোষণা করলো, সরকার যদি নির্বাচনী কর্মকাণ্ড নিয়ে এগিয়ে যায় তাহলে ১৪ জানুয়ারি থেকে ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত সারাদেশে অবরোধ ও বঙ্গভবন ঘেরাও কর্মসূচি পালিত হবে। ২১ ও ২২ জানুয়ারি দেশব্যাপী সর্বাত্মক হরতাল। তাতেও কাজ না হলে এরপর থেকে শুরু হবে লাগাতার কর্মসূচি। মহাজোটের এরকম কঠোর হুঁশিয়ারি সত্ত্বেও সরকার তার অবস্থানে অনড় থাকলো। সংবিধানে উল্লিখিত নব্বই দিনের মধ্যে নির্বাচনের বাধ্যবাধকতা অবলম্বন করে চারদলীয় জোটও নির্বাচনের পক্ষে অনড় থাকলো।”
“এসময় ক্ষমতাধর কয়েকটি দেশের প্রতিনিধি আমার সাথে দেখা করে জানালো, সব দলের অংশগ্রহণ ব্যতিরেকে নির্বাচন অনুষ্ঠানে সেনাবাহিনী সহায়তা করলে জাতিসংঘ শান্তি মিশন থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে প্রত্যাহারের জন্য তারা জাতিসংঘকে অনুরোধ করবে। প্রচ্ছন্ন এ হুমকির অবশ্যম্ভাবী পরিণতি অনুধাবন করতে আমার অসুবিধা হলো না।”
“(১১ জানুয়ারি) প্রথমে খবর ও পরে জাতিসংঘ সদর দফতর থেকে টেলিফোন পেলাম। আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল মি. গুইহিনো কোনোরকম ভনিতা না করেই জানালো, সব দলের অংশগ্রহণ ব্যতীত নির্বাচন তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। এরকম একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী যদি ভূমিকা রাখে তাহলে জাতিসংঘ শান্তি মিশন থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে প্রত্যাহার করার বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হবে।”
“দেশের সার্বিক পরিস্থিতি ও জাতিসংঘের মনোভাব নিয়ে আমি নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী প্রধানের সাথেও কথা বললাম। তারাও একমত হলো, রাষ্ট্রের এ পরিস্থিতি মহামান্য প্রেসিডেন্টকে অবগত করে তাঁর দিকনির্দেশনা চাওয়া প্রয়োজন। আমরা  প্রেসিডেন্টের সাথে কথা বলার জন্য সময় চাইলাম।”…
“দীর্ঘ নীরবতা ভেঙে প্রেসিডেন্ট এক সময় সারা দেশে জরুরি অবস্থা জারির পক্ষে মত দিলেন। সিদ্ধান্ত হলো বর্তমান উপদেষ্টা পরিষদ তিনি ভেঙে দেবেন এবং প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে পদত্যাগ করবেন। দেশের আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কায় রাত এগারোটা থেকে সান্ধ্য আইন জারি করা হবে। প্রেসিডেন্ট রাতে জাতির উদ্দেশ্যে জরুরি অবস্থার প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে ভাষণ দেবেন।”
“মহামান্য রাষ্ট্রপতি সম্ভাব্য প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ড. ইউনূস অথবা ড. ফখরুদ্দীনের নাম প্রস্তাব করেছিলেন। … কিন্তু তিনি (ড. ইউনূস) প্রধান উপদেষ্টা হতে আগ্রহী হলেন না।”
“ড. ইউনূস অস্বীকৃতি জানানোর পর ড. ফখরুদ্দীনের নাম উঠে আসে। মেজর জেনারেল মাসুদউদ্দিন চৌধুরী ড. ফখরুদ্দীনের বাসায় যান এবং রাষ্ট্রপতির পক্ষ থেকে প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নেয়ার জন্য তাঁকে অনুরোধ করেন।… প্রায় আধঘণ্টা পর তাঁর স্ত্রী ফোন করে তাঁর সম্মতির কথা জানালেন।”

অসাংবিধানিক কেয়ারটেকার সরকার
রাষ্ট্রপতি ড. ইয়াজউদ্দীন আহমদ ২০০৭ সনের ১১ই জানুয়ারি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন এবং নির্বাচন মুলতবি করেন।
২০০৭ সনের ১২ই জানুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্ণর ড. ফখরুদ্দীন আহমদ প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।
অন্যান্য উপদেষ্টাগণ ১৩, ১৬ ও ১৮ তারিখে শপথ গ্রহণ করেন। অন্যান্য উপদেষ্টা হচ্ছেনÑ ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন, ড. এ. বি. মির্জা আজিজুল ইসলাম, মে. জে. এম. এ. মতিন বিপি (অব.), তপন চৌধুরী, গীতিআরা সাফিয়া চৌধুরী, ড. ইফতেখার আহমদ চৌধুরী, আইয়ুব কাদরী, মে. জে. ডা. এ. এস. এম. মতিউর রহমান (অব.), মো. আনোয়ারুল ইকবাল, ড. চৌধুরী সাজ্জাদুল করিম, ড. এ. এম. এম. শওকত আলী, এ. এফ. হাসান আরিফ, মে. জে. গোলাম কাদের (অব.), বেগম রাশেদা কে. চৌধুরী, হোসেন জিল্লুর রহমান, রাজা দেবাশীষ রায়, ব্রি. জে. এম. এ. মালেক (অব.), অধ্যাপক ম. তামিম, মাহবুব জামিল ও মানিক লাল সমদ্দার।
এই সরকার সংবিধানসম্মত সরকার ছিলো না। মহামান্য রাষ্ট্রপতির সমর্থন এবং সশস্ত্রবাহিনীর পৃষ্ঠপোষকতাই ছিলো সরকারের পক্ষে ংধহপঃরড়হ বা অনুমোদন।
সংবিধান অনুযায়ী কেয়ারটেকার সরকারের প্রধান দায়িত্ব ৯০ দিনের মধ্যে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশনকে সহযোগিতা প্রদান।
এই সরকার অনেকগুলো সংস্কারমূলক কাজে হাত দেয়। সংবিধান কেয়ারটেকার সরকারকে এইসব কাজের দায়িত্ব দেয়নি। পরবর্তী জাতীয় সংসদ এই সরকারের কার্যাবলিকে বৈধতা দিলে তবেই এই সরকার সংবিধানসম্মত সরকার বলে গণ্য হবে।
“১৪ জানুয়ারি, ২০০৭ তারিখে উপদেষ্টা পষিদের প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হলো। বৈঠকের পর ঘোষণা করা হলো তত্বাবধায়ক সরকার নির্ভুল ভোটার তালিকা ও স্বচ্ছ বাক্সে নির্বাচন করার মতো গুরুত্বপূর্ণ কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রথম বৈঠকেই দেশকে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দিতে তাদের দৃঢ় সংকল্প দেশবাসীকে আশ্বস্ত করলো। একটি সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন তত্বাবধায়ক সরকারের একমাত্র কাজ হলেও নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি পূর্বশর্ত হিসেবে অনেকগুলো কাজ সরকারের সামনে এসে পড়লো। এর ভেতরে দুর্নীতি দমন ও দুর্নীতিবাজদের প্রচলিত আইনে বিচারের সম্মুখীন করা ছিলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”
“নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ দাবি ছিলো দীর্ঘ দিনের। অতীতের সরকার তাদের নির্বাচনী অঙ্গীকারে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের প্রতিশ্র“তি দিলেও বিভিন্নভাবে তা বিলম্বিত করা হয়েছে।…
সর্বশেষে ১০ জানুয়ারি ২০০৭ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ আলাদা করার জন্য সাত দিন সময় দিয়ে রুল জারি করে। নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার এ সময় শেষ হওয়ার আগেই প্রয়োজনীয় প্রজ্ঞাপন জারি করে নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে আলাদা করার ঘোষণা দিয়ে চূড়ান্ত প্রক্রিয়ার সূচনা করে। ফলে ১ নভেম্বর, ২০০৭ তারিখে বিচার বিভাগ আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাহী বিভাগ থেকে আলাদা হয়ে যায়।”৫৫
নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন
২০০৭ সনের ৫ ফেব্র“য়ারি সাবেক সচিব ড. এ.টি.এম. শামসুল হুদা প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং সাবেক যুগ্মসচিব ছহুল হোসেন নির্বাচন কমিশনার নিযুক্ত হন। ১৪ই ফেব্র“য়ারি নির্বাচন কমিশনের অন্তর্ভুক্ত হন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম. সাখাওয়াত হোসেন।
২০০৭ সনের ৫ই এপ্রিল নির্বাচন কমিশন নির্বাচন আইন সংস্কার বিষয়ে খসড়া সুপারিশমালা প্রকাশ করে।
অতঃপর জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকবৃন্দ, সুশীলসমাজ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দের সাথে মত বিনিময়ের উদ্যোগ গ্রহণ করে।

‘মাইনাস টু ফর্মুলা’ বাস্তবায়ন প্রয়াস
অসাংবিধানিক কেয়ারটেকার সরকার ক্ষমতা গ্রহণের দুই মাস পর ২০০৭ সনের ১৫ই মার্চ শেখ হাসিনা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে ঢাকা ছাড়েন এবং এপ্রিল মাসের ভেতরে দেশে ফিরবেন বলে জানান।
২০০৭ সনের ১৮ই এপ্রিল সরকার একটি প্রেসনোট জারি করে তাঁর দেশে ফেরার পথে বাধা সৃষ্টি করে। শেখ হাসিন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে লন্ডন এসে পৌঁছেন। ব্রিটিশ ওয়ারওয়েজের কনফার্মড টিকিট থাকা সত্ত্বেও তিনি হিথ্রো বিমানবন্দরে বোর্ডিং পাস পাননি। শেখ হাসিনার দেশের ফেরার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে প্রদত্ত প্রেসনোটে বলা হয় : “নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে সরকার অবগত হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট সফররত আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা ২৩ এপ্রিল, ২০০৭ তারিখে দেশে প্রত্যাবর্তন করতে পারেন। উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক অতীতে তাঁর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের দায়িত্বহীন লাগাতার আন্দোলন ও কর্মকাণ্ডের কারণে সৃষ্ট অরাজক পরিস্থিতিতে দেশের জনশৃংখলা বিপর্যস্ত এবং নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক জীবন বিপন্ন হয়ে পড়ে এবং ফলশ্র“তিতে অনিবার্যভাবেই জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে হয়েছে। সম্প্রতি তিনি বিদেশে অবস্থানকালেও বিভিন্ন সভা সমাবেশ এবং দেশি ও আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় প্রদত্ত বক্তব্যের মাধ্যমে বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী সম্পর্কে বিভিন্ন উসকানি ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্য রেখেছেন।
এমতাবস্থায় শেখ হাসিনা এ সময় দেশে প্রত্যাবর্তন করলে আগের ন্যায় উসকানিমূলক বক্তব্য প্রদান এবং জনশৃংখলাবিরোধী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে জনমনে বিদ্বেষ ও বিভ্রান্তি সৃষ্টির প্রয়াস চালাতে পারেন। এতে দেশের আইনশৃংখলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটার এবং বিরাজমান স্থিতিশীলতা বিঘিœত এবং জননিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক জীবন বিপন্ন হওয়ার আশংকা রয়েছে।
আরও উল্লেখ্য যে, শেখ হাসিনা নিজেও তাঁর ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয়ে উদ্বিগ্ন এবং তাঁর দলের মাধ্যমে সরকারের কাছে বিশেষ নিরাপত্তা সুবিধার আবেদন করেছেন। উল্লিখিত কারণে সরকার জনস্বার্থে বর্তমান অবস্থায় শেখ হাসিনার দেশে প্রত্যাবর্তন বিষয়ে বিশেষ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। গৃহীত এই ব্যবস্থা সাময়িক।”
২০০৭ সনের ২৪শে এপ্রিল এই নিষেধাজ্ঞা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট দাখিল করা হয়। ২৫শে এপ্রিল সরকার নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয়।
২০০৭ সনের ৭ই মে শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আসেন।
২০০৭ সনের ১৬ই জুলাই অসাংবিধানিক কেয়ারটেকার সরকার রাজধানীর গুলশান থানায় দায়েরকৃত তিন কোটি টাকার একটি চাঁদাবাজির মামলায় শেখ হাসিনাকে গ্রেফতার করে। আদালত তাঁর জামিনের আবেদন নামঞ্জুর করে তাঁকে সংসদভবন এলাকায় স্থাপিত বিশেষ সাবজেলে প্রেরণ করে।
শেখ হাসিনার মুক্তি দাবি করে বেগম খালেদা জিয়া একটি বিবৃতি দেন। বিবৃতিতে তিনি বলেন, “শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক গ্রেফতার এবং তাঁকে আদালতে আনা নেওয়ার সময় তাঁর মর্যাদা রক্ষায় প্রশাসনিক ব্যর্থতা আমাকে বেদনাহত করেছে। একটি দলের প্রধান, একজন জাতীয় নেতার কন্যা, সাবেক একজন প্রধানমন্ত্রী, একজন প্রবীণ নারী, সর্বোপরি দেশের একজন সম্মানিত নাগরিক হিসাবে আদালত প্রাঙ্গনে তাঁকে যে ধরনের অসম্মানজনক ও অশোভন পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হয়েছে তাতে আমি গভীরভাবে মর্মাহত। আমার ধারণা, বিবেকবান নাগরিকদের অনুভূতি এতে আহত হয়েছে এবং দেশে বিদেশে ক্ষুণœ হয়েছে সরকারের ভাবমর্যাদা। সরকার আরও সচেতন থাকলে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব হতো।
শেখ হাসিনা বিভিন্ন সময়ে আমাদের সরকার ও দলের সমালোচনার গণ্ডি পেরিয়ে আমাদের পরিবার এবং ব্যক্তিগতভাবে আমার বিরুদ্ধেও নানান রকম অযৌক্তিক, অরাজনৈতিক ও অসৌজন্যমূলক উক্তি করেছেন। তাতে আমি যেমন কষ্ট পেয়েছি, ঠিক একই রকম দুঃখবোধ করছি তাঁকে অনাকাক্সিক্ষত আচরণের শিকার হতে দেখে। মানুষ হিসেবে আমরা কেউই ভুল-ভ্রান্তি ও ত্র“ুটিবিচ্যুতির ঊর্ধ্বে নই। সমস্যাজর্জরিত একটি দেশে যিনি যত বড় দায়িত্ব পালন করেন তাঁর তত বেশি ভুলত্র“টির আশংকা থাকে। তাছাড়া এদেশে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যর্থতার পাশাপাশি রাজনীতিকদের সাফল্যকেও খাটো করে দেখা উচিত নয়। তবে আমরা কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নই। ইচ্ছাকৃত আইনভঙ্গ এবং দেশ ও সমাজের জন্য ক্ষতিকর তৎপরতায় লিপ্ত হলে সবার বিরুদ্ধেই আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যায়। কিন্তু এক্ষেত্রে দুটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এক. অভিযুক্ত মাত্রই অপরাধী নয়। কাজেই তাদের যথাযথ সম্মান ও মর্যাদা সুরক্ষা করা সরকার ও প্রশাসনের কর্তব্য। এবং দুই. সকল অভিযুক্ত যাতে সন্দেহাতীতভাবে ন্যায়বিচার পায় এবং তাদের মানবাধিকার পুরোপুরি বজায় থাকে সেই লক্ষ্যে আত্মপক্ষ সমর্থন ও আইনগত সহায়তা লাভের সুযোগের পরিপূর্ণ নিশ্চয়তা থাকতে হবে। শেখ হাসিনার ক্ষেত্রেও আমি এ দু’টি বিষয়ে নজর রাখার আহ্বান জানাচ্ছি।….”
২০০৭ সনের ৩ রা সেপ্টেম্বর গ্লেবাল এগ্রো ট্রেড কোম্পানি (গ্যাটকো) মামলায় বেগম খালেদা জিয়া এবং তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র আরাফাত রহমানকে গ্রেফতার করা হয়। এই মামলার অভিযোগে বলা হয় প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে বেগম খালেদা জিয়া চট্টগ্রাম বন্দর ও কমলাপুর কন্টেইনার ডেপোর কাজ পাইয়ে দিতে উক্ত কম্পেনিকে সহায়তা করেন। এতে সরকারের এক হাজার কোটি টাকা ক্ষতি হয়। চিফ মেট্রোপলিটান ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে অনুমতি নিয়ে বেগম খালেদা জিয়া একটি বক্তব্য দেন। বক্তব্যে তিনি বলেন,
“বাংলাদেশকে নিয়ে বিরাট ষড়যন্ত্র চলছে। এ ষড়যন্ত্রের অংশ হিসাবেই বিএনপি ভাঙার ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে এবং আমাকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেয়ার অপচেষ্টা করা হচ্ছে। ইতঃপূর্বে আমাকে দেশ থেকে বাইরে পাঠিয়ে দেবার ষড়যন্ত্র করা হয়েছিল। এখন আমাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আমি বাইরে চলে গেলে আজ আমাকে এভাবে গ্রেফতার করা হতো না। আমি বলতে চাই এ দেশের মাটি ছাড়া আমার ও আমার পরিবারের কোন ঠিকানা নেই। এই দেশ আমার ঠিকানা। এই দেশেই আমি মরব।
আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন অভিযোগ এনে এ মামলা করা হয়েছে। এই মামলা ষড়যন্ত্রের মামলা। বিএনপি পাঁচবার এ দেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল। বাংলাদেশের উন্নয়ন আর কল্যাণে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, আমার ও বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। এ দেশের জন্য আমরা নিবেদিতভাবে কাজ করেছি। আমার, আমার পরিবারের বা আমার ছেলেদের অর্থের কোন লোভ নেই, অর্থের কোন প্রয়োজন নেই। এ দেশের জনগণের ভালোবাসা ও সমর্থন আমরা সব সময় পেয়েছি ও পাচ্ছি। এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় পাওয়া। আমরা সব সময় দেশপ্রেমের পরিচয় দিয়েছি। আমার প্রিয় দেশেবাসীকে বিনীতভাবে জানাতে চাই, আমি এবং আমার পরিবার সম্পূর্ণভাবে নির্দোষ। মহামান্য আদালতকে সবিনয়ে জানাতে চাই, আমরা সম্পূর্ণ নির্দোষ। তাই এই মামলা থেকে সুবিচার চাই। শুধু আমি নই, যে কোন নেতা নেত্রীর বিরুদ্ধেই মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করা হোক।…….”
শুনানি শেষে আদালত বেগম খালেদা জিয়ার জামিন নামঞ্জুর করে সংসদ ভবন এলাকায় একটি বিশেষ সাবজেলে তাঁকে প্রেরণ করে। আর তাঁর পুত্র আরাফাত রহমানের সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে।
“শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে এ সরকারের আমলে দায়েরকৃত কতিপয় চাঁদাবাজি মামলাসহ যেসব মামলা ছিল সেগুলো হলো : ২০০৭-এর ডিসেম্বর ব্যবসায়ী আজম জে চৌধুরীর দায়ের করা চাঁদাবাজির মামলা, নাইকো দুর্নীতি মামলা, ফ্রিগেট ক্রয়ে দুর্নীতির মামলা, বেপজায় পরামর্শক নিয়োগে দুর্নীতির মামলা, মেঘনাঘাট বিদ্যুৎ কেন্দ্র দুর্নীতির মামলা, ব্যবসায়ী তাজুল ইসলাম ফারুক ও নূর আলীর দায়ের করা দুটি পৃথক চাঁদাবাজির মামলা। এ ছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে ছিল বার্জ মাউন্টেড বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপনে দুর্নীতির মামলা এবং মিগ-২৯ যুদ্ধবিমান ক্রয়ে দুর্নীতির মামলা।
অন্যদিকে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত এ সরকারের আমলে যেসব মামলা হয় সেইগুলো হলো : নাইকো দুর্নীতি মামলা, গ্যাটকো দুর্নীতি মামলা, বড় পুকুরিয়া কয়লা খনিতে ঠিকাদার নিয়োগে দুর্নীতি মামলা এবং জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের অর্থ আত্মসাৎ মামলা।
এইসব মামলা সাধারণ আইনে হলে দুই নেত্রীই আইনি প্রক্রিয়ায় জামিন পেতেন। কিন্তু মামলাগুলো জরুরী বিধিতে হওয়ায় এবং দুই নেত্রী বিশেষ কারাগারে আটক থাকায় এসব মামলা ভিন্ন মাত্রা পেয়ে দুই নেত্রীর মুক্তি প্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়।”৫৯

রাজনীতিবিদ গ্রেফতার অভিযান
‘জরুরি অবস্থা ঘোষণার পর দেশের জাতীয় রাজনীতিতে শুরু হয় সিডরের মতো ঘূর্ণিঝড়। সন্দেহভাজন দুর্নীতিবাজ হিসেবে জাতীয় রাজনীতির মূলস্রোতের রাজনীতিবিদরা পাইকারি হারে গ্রেফতার হতে থাকেন। ২০০৭ সালে মাত্র এক বছরে দুই সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা, বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকোসহ ৭৯ জন প্রভাবশালী রাজনীতিক গ্রেফতার হন। এছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশনের পক্ষ থেকে ১৪১ জন সাবেক মন্ত্রী ও এমপির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়।
[উল্লেখ্য, তারেক রহমান গ্রেফতার হন ২০০৭ সনের ৭ই মার্চ রাত ১টা ১০মিনিটে।]
গ্রেফতার অভিযান শুরুর আগে ৪২০ জনের নামের একটি তালিকা প্রস্তুত করা হয়। প্রথম কিস্তিতে ৫০ জন সন্দেহভাজন ব্যক্তির নামের তালিকা প্রকাশ করা হয়। তাদের মধ্যে বিএনপির সাবেক এমপি ও মন্ত্রীর সংখ্যা ছিল ২৬ জন, আওয়ামী লীগের ১৮ জন, ইসলামী ঐক্যজোটের একজন এবং জামায়াতে ইসলামীর দুইজন।
জামায়াতে ইসলামীর সাবেক এমপি শাহজাহান চৌধুরী এবং সাবেক এমপি আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ তাহেরের নামও ছিল এই তালিকায়।……. দ্বিতীয় তালিকায় জামায়াতে ইসলামীর সাবেক এমপি গাজী নজরুল ইসলামের নাম ছিল।’

২০০৮ সনে জামায়াতে ইসলামীর গণস্বাক্ষর সংগ্রহ অভিযান
অসাংবিধানিক কেয়ারটেকার সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার কিছুকাল পরই রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে শুরু করে। বিপুলসংখ্যক রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা দায়ের হতে থাকে। শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে গ্রেফতার করা হয়।
রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে গ্রেফতার করার পাশাপাশি বড়ো বড়ো দলগুলো থেকে কিছু ‘সংস্কারবাদী’ নেতা আবিষ্কার করে দল ভাঙার প্রচেষ্টা শুরু হয়। সাবেক দুই প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাও গ্রেফতার হন। বড়ো দুই দলের নেতা গ্রেফতার করা হলো, কিন্তু জামায়াতে ইসলামীর নেতাকে গ্রেফতার করা হলো না, তাতো হতে পারে না। সেই জন্য ২০০৮ সনের ১৮ই মে গ্যাটকো মামলায় আমীরে জামায়াত মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীকেও গ্রেফতার করা হয়।
জামায়াতে ইসলামী অসাংবিধানিক কেয়ারটেকার সরকারের ইখতিয়ারবহির্ভূত এই সব কার্যক্রমের বিরুদ্ধে জনমতের প্রতিফলন ঘটাবার জন্য ২০০৮ সনের ১লা জুন থেকে ১৫ জুন পর্যন্ত গণস্বাক্ষর সংগ্রহ অভিযান পরিচালনা করে।
নিম্নোক্ত দাবিগুলোর পক্ষে গণমানুষের স্বাক্ষর সংগ্রহ করা হয়Ñ
১.    অবিলম্বে জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার,
২.    জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও সাবেক মন্ত্রী মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী এবং চারদলীয় জোটনেত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াসহ সকল রাজবন্দির নিঃশর্ত মুক্তি,
৩.    রাজনৈতিক হয়রানিমূলক গ্যাটকো ও বড় পুকুরিয়া মামলাসহ সকল মিথ্যা মামলা অবিলম্বে প্রত্যাহার,
৪.    ২০০৮ এর অকটোবরে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান এবং
৫.    চাল, ডাল, আটা, ভোজ্য তৈল ইত্যাদি নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য জনগণের ক্রয় সীমার মধ্যে নিয়ে আসার জন্য সর্বোচ্চ ভর্তুকি প্রদান।
এইসব দাবির প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করে ১ কোটি ৪৯ লক্ষ ৮৪ হাজার ৯শত ৯৪ জন স্বাক্ষর করেন।
২০০৮ সনের ১লা জুলাই প্রায় দেড় কোটি মানুষের স্বাক্ষর সম্বলিত বিশাল বিশাল বান্ডিলগুলো ট্রাকে বোঝাই করে সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মুহাম্মাদ মুজাহিদ তেজগাঁও কার্যালয়ে প্রধান উপদেষ্টার সমীপে পেশ করেন। সমবেত সাংবাদিকদের সম্মুখে তিনি বলেন,
“জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ এই দেশের সর্ববৃহৎ ইসলামী দল। জামায়াতে ইসলামী একদিকে ইসলাম প্রচার ও প্রতিষ্ঠার কাজ করছে, অন্যদিকে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও সংরক্ষণের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ এই দেশের তৃতীয় বৃহত্তম দল। ২০০১ সনের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয় লাভ করার পর জামায়াতে ইসলামী চারদলীয় জোট সরকারের মন্ত্রীসভায় যোগদান করে এবং সংগঠনের আমীর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী ও সেক্রেটারী জেনারেল আলী আহসান মুহাম্মাদ মুজাহিদ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁরা পাঁচ বছর দক্ষতা, যোগ্যতা ও সততার সাথে মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে এই দেশের ইতিহাসে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ-এর আমীর ও সাবেক মন্ত্রী মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীকে মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার করে কারারুদ্ধ করা হয়েছে। এটি তাঁর ওপর এক বড়ো ধরনের যুলম। জামায়াতে ইসলামীর নেতা কর্মীরা তো বটেই, দেশের জনগণও এই জন্য বিক্ষুব্ধ। তারা কিছুতেই এই জুলুম-নির্যাতন মেনে নিতে পারছে না।”
“আইনানুগ নিয়মতান্ত্রিক দল জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে আমরা এই ব্যাপারে জনগণের দ্বারস্থ হয়েছি। দেশ, জাতি ও গণতন্ত্রের স্বার্থে আমরা জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে জাতির সামনে ৫-দফা দাবি পেশ করেছি।”
“আমরা ১লা জুন থেকে ১৫ই জুন পর্যন্ত ৫-দফা দাবির পক্ষে সারাদেশে গণস্বাক্ষর সংগ্রহ অভিযান পরিচালনা করেছি। দেশের ১ কোটি ৪৯ লক্ষ ৮৪ হাজার ৯ শত ৯৪ জন লোক ৫-দফা দাবির সমর্থনে স্বাক্ষর প্রদান করেছেন। এ থেকে স্পষ্টভাবে বুঝা যাচ্ছে যে দেশের জনগণ ৫-দফা দাবির পক্ষে রয়েছেন। সাংবিধানিক, গণতান্ত্রিক ও গঠনমূলক রাজনীতির বিচারে এর মূল্য অত্যধিক। যেই কোন গণতন্ত্রমনা ব্যক্তি এটিকে গুরুত্ব না দিয়ে পারেন না। এই বিশ্বাস নিয়েই আমরা আজ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধান উপদেষ্টার সমীপে আমাদের সংগৃহীত গণস্বাক্ষরগুলো পেশ করলাম।”
আমরা আশা করি সরকার জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাপ্রদর্শন করবেন এবং জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে উত্থাপিত ৫-দফা গণদাবি মেনে নেবেন।”
উপরে উল্লেখিত দাবিগুলোর প্রতি প্রায় দেড় কোটি মানুষের সমর্থন জ্ঞাপন নিশ্চয়ই একটি বড়ো বিষয় ছিলো।
উপদেষ্টা পরিষদের চিন্তাধারা পরিবর্তনে বিষয়টি নিশ্চয়ই প্রভাব বিস্তার করে থাকবে।

অভিযুক্ত রাজনীতিবিদগণ আইনি লড়াই শুরু করেন
২০০৮ সনে আটককৃত রাজনীবিদগণ একের পর এক জামিনে মুক্ত হতে থাকেন।
ফলে দুই নেত্রীর মুক্তির দাবিও জোরদার হতে থাকে।
‘শেখ হাসিনার কানের চিকিৎসা দেশে সম্ভব নয় বলে ডাক্তারদের অভিমত তাঁর মুক্তির দাবি অধিকতর জোরালো করে। ২০০৮ সনের ১১ই জুন সরকার নির্বাহী আদেশে শেখ হাসিনাকে আট সপ্তাহের জন্য প্যারোলে মুক্তি দিয়ে চিকিৎসার জন্য আমেরিকা যাওয়ার অনুমতি দেয়। কারোই বুঝতে অসুবিধা হয়নি যে শেখ হাসিনার সংগে সরকারের একটি অঘোষিত সমঝোতা হয়েছে।’
‘একই সময় বেগম খালেদা জিয়াকেও মুক্তি দেওয়া হবে বলা হলেও প্রাই দুই মাস সময় চলে যায়। বেগম খালেদা জিয়া দেশের বাইরে যেতে বা আগামী পাঁচ বছর রাজনীতি না করতে রাজি না হওয়ায় এবং তারেক রহমান আগামী পাঁচ বছর নির্বাচনে দাঁড়াতে পারবেন না বা রাজনীতি করতে পারবেন নাÑ এমন শর্তে রাজি না হওয়ায় সরকার এদের মুক্ত করতে রাজি হয়নি।’
বেগম খালেদা জিয়ার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেতে থাকে। তদুপরি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল তাঁর ও তারেক রহমানের মুক্তির দাবিতে আন্দোলনে নামার সিদ্ধান্ত নেয়।
তদুপরি শেখ হাসিনাকে মুক্তি দেওয়ার পর সরকারের পক্ষে বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের ব্যাপারে হার্ডলাইনে থাকা অসম্ভব হয়ে ওঠে।
এমতাবস্থায় ২০০৮ সনের ৩রা সেপ্টেম্বর তারেক রহমান এবং ১১ই সেপ্টেম্বর বেগম খালেদা জিয়া সব মামলায় জামিন পেয়ে জেল থেকে মুক্তি লাভ করেন।
উল্লেখ্য, আমীরে জামায়াত মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী ২০০৮ সনের ১৫ই জুলাই জামিনে মুক্তি লাভ করেন।

রাজনৈতিক দল সংস্কার প্রয়াস
অসাংবিধানিক কেয়ারটেকার সরকারের একটি অনাকাক্সিক্ষত কাজ ছিলো, রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্র সংস্কারের ধুয়া তুলে দুইটি প্রধান দলকে রক্ষণশীল ও সংস্কারপন্থী হিসেবে বিভক্ত করার চেষ্টা। আওয়ামী লীগ এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের সিনিয়ার নেতাদের মধ্যে কিছু সংস্কারপন্থী নেতা পাওয়া গেলো। কিন্তু সরকার শেখ হাসিনাকে গ্রেফতার করার পর আওয়ামী লীগের সংস্কারপন্থী নেতারা বেশি দূর এগুতে পারেননি। সরকার ও নবগঠিত নির্বাচন কমিশন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের সংস্কারপন্থীদেরকে সহযোগিতা প্রদান করে আসল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলটিকে মাইনাস করার প্রয়াস চালায়। কারাগারে অবস্থানরত বেগম খালেদা জিয়ার দৃঢ়তা এবং তাঁর প্রতি মাঠকর্মীদের আনুগত্য সংস্কারপন্থীদেরকে কোণঠাসা করে ফেলে। বেগম খালেদা জিয়া কারাগার থেকে বেরিয়ে আসার পর সংস্কারপন্থী নেতৃবৃন্দ তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করেন।
এইভাবে সরকারের অনাকাক্সিক্ষত প্রয়াসটি ব্যর্থ হয়ে যায়।
উল্লেখ্য, রাজনৈতিক দলগুলোর সংস্কারের কথা ওঠলে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, যেইসব বিষয়ে সংস্কারের কথা বলা হচ্ছে সূচনালগ্ন থেকেই জামায়াতে ইসলামীতে সেইগুলো প্রচলিত রয়েছে।

জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন ঠেকাবার অপপ্রয়াস
২০০৭ সনের ৮ই সেপ্টেম্বর থেকে শুধু রাজধানীতে সীমিত আকারে ঘরোয়া রাজনীতির অনুমতি দেয় সরকার। নির্বাচন কমিশন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাথে নির্বাচন আইন সংস্কার বিষয়ে সংলাপ করার সিদ্ধান্ত নেয়।
স্বাধীনতার পর থেকে এই পর্যন্ত অনুষ্ঠিত আটটি সংসদ নির্বাচনে অন্তত একটি আসন পেয়েছে কিংবা যেই কোন একটি নির্বাচনে অন্ততপক্ষে শতকরা দুই ভাগ ভোট পেয়েছে এমন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে নির্বাচন কমিশন আলোচনার সিদ্ধান্ত নেয়। প্রথম পর্বে ডাক পায় ইসলামী ঐক্যজোট, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, গণতন্ত্রী পার্টি, জাতীয় পার্টি (মঞ্জু), জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (ইনু), জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (রব), জামায়াতে ইসলামী, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (মোজাফফর), বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টি, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (নাজিউর), বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি এবং বাংলাদেশ সাম্যবাদী দল।
জামায়াতে ইসলামীর সাথে নির্বাচন কমিশনের বৈঠক হয় তিনবার। প্রথম দফা আলোচনা অনুষ্ঠিত হয় ২০০৭ সনের ২৫শে অকটোবর। সেক্রেটারী জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদের নেতৃত্বে দশ সদস্য বিশিষ্ট একটি প্রতিনিধিদল এই আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন। জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে একটি লিখিত বক্তব্য পেশ করা হয়। বক্তব্যে বলা হয়, বাংলাদেশের জনগণের প্রায় ৯০ ভাগ মুসলিম। গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে এই দেশের রাজনীতিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের বিশ্বাস ও
চিন্তাচেতনার প্রতিফলন ঘটবেই। এই ব্যাপারে কারো আপত্তি থাকা উচিত নয়। বক্তব্যে আরো বলা হয়, ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। এতে নামায, রোযা, যাকাতের মতো ইসলামী রাজনীতি ও ইসলামী অর্থনীতি প্রতিপালন করাও মুসলিমদের কর্তব্য। রাজনৈতিক দলগুলোর নিবন্ধনের ব্যাপারে জামায়াতে ইসলামী উদারনীতি অনুসরণের সুপারিশ করে। যারাই আবেদন করবে তাদেরকে শর্তাবলি পূরণের জন্য আরো এক বছর সময় দেওয়া প্রয়োজন বলে অভিমত ব্যক্ত করে। উপজিলা পরিষদ নির্বাচন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরেই হওয়া উচিত বলে মত প্রকাশ করে ইত্যাদি।
জামায়াতে ইসলামীর সাথে নির্বাচন কমিশনের দ্বিতীয় দফা আলোচনা হয় ২০০৮ সনের ২৬শে ফেব্র“য়ারি। এক-দশমাংশের কম ভোট পাওয়া বিভিন্ন বাম দলকে ডাকা হলেও বেশ কয়েকটি ইসলামী দলকে সংলাপে না ডাকা সঠিক কাজ নয় বলে জামায়াতে ইসলামী অভিমত ব্যক্ত করে। কোন রাজনৈতিক দলে ‘ধর্ম-বর্ণ ও লিঙ্গভেদে বৈষম্য’ থাকলে তা নিবন্ধনের জন্য অযোগ্য হবে বলে প্রস্তাবনা বাদ দেওয়ার জন্য বলা হয়।
জামায়াতে ইসলামীর সাথে নির্বাচন কমিশনের তৃতীয় দফা আলোচনা হয় ২০০৮ সনের ২০শে সেপ্টেম্বর। জামায়াতে ইসলামীর ডেলিগেশন বলে যে, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে যেই সময় আছে এই সময়ের মধ্যে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা সম্ভব নয়। ডেলিগেশন সংশোধিত গণপ্রতিধিত্ব অধ্যাদেশ প্রত্যাহার, সর্বাগ্রে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান এবং নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ স্থগিত রেখে পুরনো এলাকাভিত্তিক নির্বাচনের দাবি জানায়।
নির্বাচন কমিশনের সাথে সংলাপকালে কয়েকটি বাম দল বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী অবস্থানের অভিযোগ তুলে জামায়াতে ইসলামীকে নিবন্ধিত না করার সুপারিশ পেশ করে।
জামায়াতে ইসলামীর সাথে সংলাপের পরে ৪ঠা নবেম্বর থেকে আওয়ামী লীগের সাথে নির্বাচন কমিশনের আলোচনা শুরু হয়। আওয়ামী লীগ ‘ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার’ এবং তথাকথিত ‘যুদ্ধাপরাধী ও কলাবোরেটারদেরকে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার’ সুযোগ দানের বিপক্ষে মত প্রকাশ করে।
এটি ছিলো কৌশলে জামায়াতে ইসলামীকে কার্যত একটি বেআইনি দলে পরিণত করার অপপ্রয়াস।
বাম দলগুলো এবং আওয়ামী লীগ নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে জামায়াতে ইসলামীকে নিবন্ধনের বাইরে রেখে রাজনৈতিক ময়দান থেকে আউট করার অপপ্রয়াস চালায়। নিবন্ধন লাভের প্রয়োজনে জামায়াতে ইসলামী এই সময় মূল ভাবধারা ও বক্তব্য অক্ষুণœ রেখে গঠনতন্ত্রে বেশ কয়েকটি সংশোধনী আনতে বাধ্য হয়। এই সময়টিতেই ‘জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ’ নাম পরিবর্তন করে ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী’ রাখা হয়।
নির্বাচন কমিশন জামায়াতে ইসলামীকে নিবন্ধিত না করার কোন যুক্তিসংগত কারণ খুঁজে পায়নি।
ইসলামবিদ্বেষী দলগুলোর অপপ্রয়াস ব্যর্থ হয়ে যায়। জামায়াতে ইসলামী একটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।
২০০৮ সনের ৪ঠা নভেম্বর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী একটি নিবন্ধিত দল হিসেবে সার্টিফিকেট লাভ করে। এর নিবন্ধন নাম্বার-০১৪।

প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন কমিশন
এটা প্রত্যাশিত যে নির্বাচন কমিশন হবে সম্পূর্ণরূপে একটি নিরপেক্ষ ইনস্টিটিউশন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারগণ তাঁদের কর্মকাণ্ডে সম্পূর্ণরূপে দলনিরপেক্ষ হবেন। সকল রাজনৈতিক দলের সাথে তাঁরা একই রূপ আচরণ করবেন।
কিন্তু নির্বাচনি আইন সংস্কার বিষয়ে সংলাপ করতে গিয়ে নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়। আওয়ামী লীগের সাথে সংলাপে এই দলটির প্রতি নির্বাচন কমিশনের দুর্বলতা প্রকাশ পায়। সংলাপ উদ্বোধনকালে প্রধান নির্বাচন কমিশনার আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দকে সম্বোধন করে বলেন, “আজকের কেয়ারটেকার সরকার ও বর্তমান নির্বাচন কমিশন আপনাদেরই আন্দোলনের ফসল। আপনারা স্বাধীনতা আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন, বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছেন আপনারা। আওয়ামী লীগ কেবল একটি রাজনৈতিক দল নয়, এ দেশের উন্নয়ন এবং সংহতি অনেকাংশে আপনাদের ওপর স্থাপিত হয়েছে।”
২০০৭ সনের ২৮শে অকটোবর ডিসিদের সম্মেলনে প্রদত্ত ভাষণে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ড. এ.টি. এম. শামসুল হুদা বলেন, তিনি জাতিকে ১৯৭০ সনের নির্বাচনের মতো একটি নির্বাচন উপহার দিতে চান। কারোই বুঝতে অসুবিধা হলো না যে তিনি আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাসীন করার চিন্তাভাবনা করছেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল থেকে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে বক্তব্য আসতে থাকে। জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান  মোহাম্মাদ মুজাহিদ প্রধান নির্বাচন কমিশনার আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় বসানোর জন্য কাজ করছেন বলে অভিযোগ করেন।

২০০৮ সনের ২৯শে ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ
অসাংবিধানিক কেয়ারটেকার সরকার কর্তৃক গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলটিকে দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ফলে এই সরকারের সাথে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের বিরাট মনস্তাত্ত্বিক ফারাক সৃষ্টি হয়। পক্ষান্তরে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা এই সরকারকে তাঁর ‘আন্দোলনের ফসল’ ঘোষণা করে মনস্তাত্ত্বিকভাবে এই সরকারকে কাছে টেনে নেওয়ার কৌশল অবলম্বন করেন। অসাংবিধানিক কেয়ারটেকার সরকারের একটি দুশিন্তার কারণ ছিলো, এই সরকার এখতিয়ার বহির্ভূতভাবে যেইসব কাজ করেছে সেইগুলো পরবর্তী নির্বাচিত সরকার অনুমোদন দেবে কিনা। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী আমেরিকা যাওয়ার প্রাক্কালে ঘোষণা করলেন, তাঁর দল ক্ষমতায় এলে এই সরকারের যাবতীয় কর্মকাণ্ড অনুমোদন করবে। এতে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসুক, এটি চাওয়াই অসাংবিধানিক কেয়ারটেকার সরকারের পক্ষে স্বাভাবিক ছিলো।
নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঊনচল্লিশ দিন পূর্বে আমেরিকার বিখ্যাত জার্নাল “হার্ভার্ড ইন্টারন্যাশনাল রিভিউ”-তে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় এবং এক সময় ইরাকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনকারী মার্কিন মিলিটারি অফিসার কার্ল সিওভাককো-র “ঝঃবসসরহম ঃযব জরংব ড়ভ ওংষধসরপ ঊীঃৎবসরংস রহ ইধহমষধফবংয” শীর্ষক একটি তাৎপর্যপূর্ণ প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়।
প্রবন্ধের ভূমিকায় বলা হয়, “ইধহমষধফবংয যধং নববহ ধ ংবপঁষধৎ গঁংষরস ংঃধঃব ংরহপব রঃং রহফবঢ়বহফবহপব ভৎড়স চধশরংঃধহ ধহফ ভড়ঁহফরহম নু ঝযধরশয গঁলরনঁৎ জধযসধহ রহ ১৯৭১. ডযরষব রঃং ংযড়ৎঃ যরংঃড়ৎু যধং নববহ ভঁষষ ড়ভ সরষরঃধৎু পড়ঁঢ় ফ’বঃধঃং, রঃ যধং ধষধিুং ৎবঃঁৎহবফ ঃড় রঃং ৎড়ড়ঃং ধং ধ ংবপঁষধৎ ফবসড়পৎধঃরপ ংঃধঃব. ঞযবৎব ধৎব যড়বিাবৎ, হবি ংরমহং ড়ভ ধ ংযরভঃ ঃড়ধিৎফং ধ মৎড়রিহম ওংষধসরংস ঃযধঃ পড়ঁষফ লবড়ঢ়ধৎফরুব ঃযব ংধহপঃরঃু ড়ভ ংবপঁষধৎরংস রহ ঃযব পড়ঁহঃৎু. ডযরষব ঃযব মড়াবৎহরহম পড়হংঃৎঁপঃ’ং ষবমরঃরসধপু রং ংঁভভবৎরহম ঢ়ড়ষরঃরপধষষু ভৎড়স ঃযব ঢ়ধংঃ ঃড়ি ুবধৎং ড়ভ বসবৎমবহপু সরষরঃধৎু ৎঁষব, ওংষধসরংস সধু নব ঃযব নরমমবংঃ ঃযৎবধঃ ঃড় ঃযব পড়ঁহঃৎু’ং পড়হংঃরঃঁঃরড়হ ধহফ ংবপঁষধৎ ঁহফবৎঢ়রহহরহমং. অং বষবপঃরড়হং ধৎব ংপযবফঁষবফ ভড়ৎ উবপবসনবৎ ১৮ঃয ধহফ ঃযব সধলড়ৎ ঃড়ি ঢ়ড়ষরঃরপধষ ঢ়ধৎঃরবং লড়ংঃষব ড়াবৎ ঃযব পড়ঁহঃৎু’ং ভঁঃঁৎব, বধপয ঢ়ধৎঃু’ং ারংরড়হ ভড়ৎ ঃযব ঢ়ৎড়ঢ়বৎ সরী ড়ভ ওংষধস ধহফ মড়াবৎহসবহঃ রিষষ নব ধঃ ভড়ৎবভৎড়হঃ. জধযসধহ’ং অধিসর খবধমঁব যধং ষড়হম নববহ ঃযব ংঃধহফধৎফ নবধৎবৎ ড়ভ ংবপঁষধৎরংস ধহফ রভ বষবপঃবফ রঃ পড়ঁষফ ৎড়ষষ নধপশ ঃযব মৎড়রিহম ঃরফব ড়ভ ওংষধসরংস রহ ইধহমষধফবংয. ঞযব অধিসর খবধমঁব সঁংঃ, যড়বিাবৎ, রসঢ়ষবসবহঃ পবৎঃধরহ পযধহমবং ঃড় ঢ়ৎড়-ধপঃরাবষু পযবপশ ঃযরং ওংষধসরংস রভ রঃ যড়ঢ়বং ঃড় ংবপঁৎব ষড়হম ষধংঃরহম ংবপঁষধৎরংস ধহফ ফবসড়পৎধপু. ওভ ংঁপপবংংভঁষ, ধহ অধিসর খবধমঁব-ষবফ ইধহমষধফবংয পড়ঁষফ নব ঃযব মষড়নধষ বীধসঢ়ষব ড়ভ ংবপঁষধৎ মড়াবৎহধহপব রহ ধ গঁংষরস পড়ঁহঃৎু.”
অর্থাৎ ‘১৯৭১ সন হতে পাকিস্তান থেকে স্বাধীনতা প্রাপ্ত ও শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ একটি ধর্মনিরপেক্ষ মুসলিম রাষ্ট্রই ছিলো। এর সংক্ষিপ্ত ইতিহাসে বারবার সামরিক অভ্যুত্থান হলেও সবসময়ই একটি ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে এর মূল অবস্থায় ফিরে এসেছে। অবশ্য ইসলামী মতবাদের দিকে ঝুঁকে যাওয়ার নতুন ঝামেলার আলামত দেখা যাচ্ছে, যা দেশটিতে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের পবিত্রতাকে বিপদগ্রস্ত করতে পারে। যদিও গত দুই বছরের সামরিক শাসন ও জরুরী অবস্থার দরুন দেশটির শাসন কাঠামোর বৈধতা রাজনৈতিকভাবে বিপন্ন, ইসলামী মতবাদ দেশটির শাসনতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষ ভিত্তির জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। যেহেতু ডিসেম্বরের ১৮ তারিখ নির্বাচনের জন্য ধার্য হয়েেেছ, দেশের ভবিষ্যত সম্পর্কে দুই প্রধান দলের ধাক্কাধাক্কি ইসলাম ও সরকারের সংমিশ্রণের বিষয়টি প্রত্যেক দলের দৃষ্টিভংগিতে প্রাধান্য পাবে। রহমানের আওয়ামী লীগ দীর্ঘকাল থেকে ধর্মনিরপেক্ষতার পতাকাবাহী। বিজয়ী হলে দলটি বাংলাদেশে ইসলামী মতবাদের অগ্রসরমান স্রোতকে ঠেকাতে পারবে। যদি আওয়ামী লীগ দীর্ঘস্থায়ী ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ ও গণতন্ত্র নিশ্চিত করতে চায় তাহলে এটিকে অবশ্যই এমন কিছু পরিবর্তন আনতে হবে, যাতে ইসলামকে কার্যকরভাবে প্রতিহত করা যায়। যদি এতে দলটি সফল হয় তাহলে আওয়ামী লীগ মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর জন্য পৃথিবীব্যাপী ধর্মনিরপেক্ষ শাসনের আদর্শ নমুনা হতে পারে।’
প্রবন্ধের ভূমিকায় যেই মেসেজ দেওয়া হয়েছে তা হচ্ছে আওয়ামী লীগ ধর্মনিরপেক্ষতার পতাকাবাহী একটি দল এবং বিজয়ী হলে দলটি বাংলাদেশে ইসলামী মতবাদের অগ্রসরমান স্রোতকে ঠেকাতে পারবে।
এই মেসেজ প্রদানের মাধ্যমে প্রবন্ধকারদ্বয় মূলত বাংলাদেশে অগ্রসরমান ইসলামী স্রোতকে ঠেকাবার জন্য সারা দুনিয়ার ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী ব্যক্তি, সংস্থা ও সরকারগুলোর সমর্থন ও সহযোগিতা কামনা করেছেন।
“বাংলাদেশ নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন আসন্ন হলে এ নির্বাচনের ওপর বিদেশীদের নগ্ন প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। এ দেশের নির্বাচন সম্বন্ধে বিদেশী কূটনীতিক, মন্ত্রী এবং রাজনীতিকরা যেভাবে মন্তব্য করা শুরু করেন, সরকার কোন রকম সহায়তা না চাওয়া সত্বেও তারা নির্বাচনে কারিগরি সহায়তা দিতে যেভাবে মরিয়া হয়ে ওঠেন এবং যেভাবে তারা এ নির্বাচন প্রক্রিয়ায় নিজেদেরকে জড়িত করতে চান তাতে মনে হয় যে এ দেশের নির্বাচন নিয়ে বিদেশিদের আগ্রহ বাংলাদেশিদের চেয়ে অনেক বেশি।”
এই প্রেক্ষাপটেই অনুষ্ঠিত হয় নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন।
২০০৮ সনের ১৭ই ডিসেম্বর জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার করা হয়।
২০০৮ সনের ২৯শে ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয় নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন।
এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ২৩০টি আসনে, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলী ৩০টি আসনে, জাতীয় পার্টি (এরশাদ) ২৭টি আসনে, জাসদ ৩টি আসনে, ওয়ার্কার্স পার্টি ২টি আসনে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ২টি আসনে, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি ১টি আসনে, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি ১টি আসনে এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ৪টি আসনে বিজয়ী হয়।
জামায়াতে ইসলামী থেকে নির্বাচিত দুইজন সংসদ সদস্য হচ্ছেন মাওলানা শামসুল ইসলাম (চট্টগ্রাম) এবং এ.এইচ.এম. হামিদুর রহমান আযাদ (কক্সবাজার)।
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে এটি জামায়াতে ইসলামীর ষষ্ঠ উপস্থিতি।
বলাই বাহুল্য, এই নির্বাচনে জনমতের সঠিক প্রতিফলন ঘটেনি।
“নির্বাচনের ফলাফল হয় অপ্রত্যাশিত। নির্বাচনে মহাজোট বেশি আসন পাবে এমন ধারণা ভোটারদের মধ্যে লক্ষ্য করা গেলেও নির্বাচনি প্রচারে বেগম জিয়া ব্যাপক গণসাড়া জাগাবার পর নির্বাচনে তীব্র লড়াই হবে বলে সবাই ভাবেন। কোন জোটই সহজে একতরফাভাবে জিতবে এমনটা কেউ ধারণা করেননি। প্রাক-নির্বাচনি জরিপগুলোতে দুই প্রধান জোটের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতার তথ্য পরিবেশিত হলেও কোন জরিপের ফলাফলই প্রকৃত ফলাফলের কাছাকাছি যেতে পারেনি। ৮৭ শতাংশের বেশি ভোট পড়া এবং ৮৫টি আসনে ৯০ থেকে ৯৫.৪৩ শতাংশ ভোট পড়ায় নির্বাচন বিশ্লেষকদের মধ্যে সৃষ্টি হয় মিশ্র প্রতিক্রিয়া। একটি ভোট দিতে একজন ভোটারের যেখানে ২/৩ মিনিট সময় লাগার কথা, সেখানে প্রায় প্রতি মিনিটে একটি ভোট দেয়া সম্ভব কিনা সে প্রশ্ন উত্থাপন করে ভোট কারসাজির প্রতি ইঙ্গিত করেন কতিপয় নির্বাচন বিশ্লেষক। নির্বাচনি ফলাফলে বিএনপির ৮ শতাংশ ভোট কমে আওয়ামী লীগের ৮ শতাংশ বাড়লেও দু’দলের আসন প্রাপ্তির হ্রাসবৃদ্ধি (আওয়ামী লীগের ২৩০ আসনের বিপরীতে বিএনপি’র মাত্র ৩০ আসন) ছিল প্রায় অবিশাস্য।”৬৫
এই নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করে একজন বিদগ্ধ বিশ্লেষক বলেন, “গড় পড়তা ভোট দিতে সময় লেগেছে ৭০ সেকেন্ডের মতো। পাটিগণিতের হিসাব ভুল হতে পারে না। যুক্তিশীল মানুষের কাছে ভোট প্রদানের এই গড় সময়টি মোটেও বিশ্বাসযোগ্য হচ্ছে না। তাই বলা হচ্ছে, ভোটে বড় রকমের কারচুপি হয়েছে। একেবারেই ডিজিটাল কারচুপি।”৬৬
এই নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করতে গিয়ে, প্রখ্যাত কলম সৈনিক মাহমুদুর রহমান বলেন, “….১৯৭৩ সালে একই প্রকৃতির একটি নির্বাচন প্রত্যক্ষ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। সেই নির্বাচনে বিরোধীদলের যে ছিঁটেফোটা দু’একজন শত প্রতিকূলতার মধ্যেও নির্বাচিত হয়েছিলেন তাদের মধ্য থেকেও বাছাই করে নির্বাচনের বেসরকারি ফল ঘোষণার পরও বাদ দেয়া হয়েছিল। নির্বাচনে বিজয় লাভ করার পরও প্রশাসনিক নির্দেশে যাদের বাদ দেয়া হয়েছিল তাদের মধ্যে বরিশালের মরহুম মেজর জলিল, কুমিল্লার মরহুম রশীদ ইঞ্জিনিয়ার এবং টাংগাইলের মরহুম আলিম আর রাজির নাম মনে পড়ছে।”৬৭
নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের এই ফলকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ‘দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের বাস্তবায়ন’ বলে অভিহিত করে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী এই ফলকে “অবিশ্বাস্য” ও “বিস্ময়কর” বলে অভিহিত করেন এবং তদন্তের মাধ্যমে ৮০ থেকে ৯৫ শতাংশ ভোট পড়ার রহস্যটি উদঘাটন করার দাবি জানান।
(সমাপ্ত)

লেখক : নায়েবে আমীর
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী

SHARE

Leave a Reply