রাজনীতির দুর্বিচক্র ও সমঝোতা

মাসুমুর রহমান খলিলী

গত বছরের শেষ মাসটি বিভিন্ন ঘটনার মধ্য দিয়ে পেরিয়ে নতুন বছরের জন্য নানা জল্পনা ও শঙ্কার জন্ম দিয়ে গেছে। বাংলাদেশের রাজনীতির গতি কোন দিকে তা নিয়ে দেশের ভেতর ও বাইরের নানা মহলের নানা পরিকল্পনা সক্রিয় রয়েছে। এসব পরিকল্পনা খুব কমই জানা যায় স্পষ্টভাবে। তবে ঘটনাপরম্পরায় অনুভব করা যায় কেউ বাংলাদেশকে নিয়ে নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য সন্তর্পণে কাজ করে যাচ্ছে। আগামী দিনগুলো এ ক্ষেত্রে হয়ে উঠতে পারে অতি গুরুত্বপূর্ণ।

নববাহাত্তর
১৯৭৫ সালের পর বাংলাদেশের রাজনীতির চর্চা ও সংস্কৃতিতে যে আমূল পরিবর্তন এসেছিল, সেটি পাল্টে দিয়ে আবার ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫-এর অবস্থায় ফিরিয়ে নেয়ার লক্ষ্য ছিল আওয়ামী লীগের পুরনো। সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য আওয়ামী লীগ শিক্ষা, সংস্কৃতি, গণমাধ্যম ও রাজনীতির অঙ্গনে কাজ শুরু করে দীর্ঘ মেয়াদি সময় নিয়ে। এ লক্ষ্যের প্রাথমিক সাফল্য এসেছিল ১৯৯৬ সালে। সে সময় আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। আর রাষ্ট্রীয় প্রশাসনকে কাজে লাগিয়ে যেসব পরিবর্তন আনা যায় তা আনতে সক্ষম হয়। ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পরাজয়ের জন্য প্রস্তুত ছিল না। ফলে রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের পুরোটা সে সময় করা সম্ভব হয়নি। ২০০৮ সালের পর ক্ষমতায় এসে সে কাজ হাতে নিয়েছে আওয়ামী লীগ সরকার। এবার আগের মতো আর ধীরে চলো নীতি নেই। এবার বৈপ্লবিক সরকারের মতোই দ্রুত সব পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। সংবিধান সংশোধনের মতো অনেক বড় কাজ দুই বছরের মাথায় করে ফেলা হয়েছে। বিচার বিভাগের ওপর নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতায় আসার আগেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মাধ্যমে অনেকটা এগিয়ে নেয়া হয়েছিল। ক্ষমতায় আসার পর দ্রুত বাকি কাজ সম্পন্ন করা হয়। শাসক দল ও সমমনাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে আইন করে বিরোধী রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। এবার সে প্রক্রিয়াটি আইন না করে প্রশাসন ও বিচার বিভাগের সহায়তায় করা হচ্ছে। জামায়াতসহ কোনো কোনো দলের কার্যক্রম কার্যত নিষিদ্ধ করে রাখা হয়েছে। অন্য দলগুলোও খোলামেলা গণতান্ত্রিক পরিবেশে তাদের কর্মসূচি পালন করতে পারছে না। রাষ্ট্রের প্রশাসনকে দলের দৃষ্টিভঙ্গিতে চালানো হচ্ছে। শিক্ষা-সংস্কৃতি এমনকি ধর্মচর্চার ওপরও একধরনের বিধিনিষেধ তৈরি করে রাখা হয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাস পড়ানো হচ্ছে আওয়ামী লীগের দলীয় দৃষ্টিকোণ অনুসারে। বিভিন্ন ইংরেজিমাধ্যম স্কুলের ছাত্রদের ভারতীয় বই পড়ানো হচ্ছে যেখানে ভারতকে নিজের দেশ মাহাত্মা গান্ধীকে জাতির পিতা পড়ানো হয়। সংস্কৃতিতে প্রতিবেশী দেশের প্রভাব বিস্তৃত করতে বিশেষভাবে আমদানি করা হচ্ছে ভারতীয় চলচ্চিত্র আর দেখানো হচ্ছে হিন্দি স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল। এভাবে ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫-এর সার্বিক পরিবেশকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা হচ্ছে বিশেষ পরিকল্পনার আওতায়। সিকিমের পার্লামেন্ট ভারতের সাথে একীভূত হওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে সেখানে এ রকম একটি আবহ সৃষ্টি হয়েছিল।

সংলাপের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি ও ইসি
রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের ব্যাপারে নির্বাচিত রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সংলাপের আয়োজন করেন। এই সংলাপে ক্ষমতাসীন মহাজোটের শরিক সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়েছে। বিরোধী চার দলের মধ্যে বিএনপি ও অন্য কয়েকটি দলকেও আমন্ত্রণ জানান হয়েছে। বিএনপি এবং বিরোধী ঘরানার যে ক’টি দল সংলাপে অংশ নিয়েছে তারা নির্বাচন কমিশনের পুনর্গঠনের চেয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ব্যাপারে আলোচনার ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। এতে সরকারের সংলাপ আয়োজনের দু’টি লক্ষ্য আপাতদৃষ্টিতে সফল হয়নি। এ লক্ষ্যের একটি ছিল বিএনপি নির্বাচন কমিশনের পুনর্গঠনের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোনো প্রস্তাব দিলে সেখান থেকে কয়েকজনকে নিয়ে সরকারের পক্ষে বলা সম্ভব হতো সবার আলোচনার ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করা হয়েছে। অতএব কমিশন নিয়ে কোনো বিতর্কের সুযোগ নেই। আর নির্বাচন কমিশন নিয়ে আলোচনায় বিএনপি না গেলে বলার সুযোগ আসবেÑ বিরোধী দল আসলে গঠনমূলক কিছু করতে চায় না। কূটনৈতিক অংশীদারদের এ বিষয়টি বুঝাতে তারা সক্ষম হবে। বিএনপি সংলাপে অংশ নিয়ে নির্বাচন কমিশনের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কিছু না বলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিষয়টি সামনে নিয়ে আসার কারণে এ দু’টি লক্ষ্যের কোনোটি অর্জন সম্ভব হয়নি। এ কারণে আওয়ামী লীগের মহাসচিব সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ‘বিএনপি জনরোষ থেকে রক্ষা পেতে সংলাপে অংশ নিয়েছে’ বলে মন্তব্য করেছেন। এই সংলাপে মহাজোটের অংশীদার কয়েকটি দল ছাড়া মূল ধারার কোনো ইসলামি দলকে দাওয়াত দেয়া হয়নি। আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থাকতেই বাংলাদেশে মূল ধারার ইসলামি দলগুলোকে জঙ্গি হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করে এসেছে। ক্ষমতায় যাওয়ার পর এই প্রচারণা আরো জোরদার করা হয়েছে। সংবিধান সংশোধন করে এমনভাবে বিন্যাস করা হয়েছে যাতে যেকোনো সময় এসব দলকে সরকারি আদেশে হোক অথবা আদালতের মাধ্যমে হোক নিষিদ্ধ করা সম্ভব হয়। এ ব্যাপারে প্রতিবেশী দেশের পক্ষ থেকে কোনো সময় আপত্তি আসেনি কিন্তু পশ্চিমা কূটনৈতিক অংশীদাররা মনে করে, গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে কাজ করা মধ্যপন্থী ইসলামি দলগুলোকে নিষিদ্ধ করা হলে এসব দলের জনশক্তির একটি অংশ জঙ্গিবাদ বা চরমপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে। এটি পশ্চিমা স্বার্থের জন্য মোটেই অনুকূল হয় না। পশ্চিমা দেশগুলোর এই দৃষ্টিভঙ্গির কারণে সরকারের পক্ষে এখনো পর্যন্ত জামায়াতসহ মূল ধারার ইসলামি দলগুলোকে নিষিদ্ধ করা সম্ভব হয়নি। তবে এসব দলকে পুলিশি শক্তি প্রয়োগ ও দমন-পীড়ন চালিয়ে চরমপন্থার দিকে ঠেলে দেয়ার একটি চেষ্টা লক্ষ করা যায়। বস্তুত রাষ্ট্রপতির সংলাপে ইসলামি দলগুলোকে আমন্ত্রণ জানিয়ে সরকার তাদের বৈধ দল হিসেবে স্বীকৃতি দিতে চায়নি। যদিও এসব দলের সংসদে প্রতিনিধিত্বও রয়েছে।
নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের ব্যাপারে সরকার কী করবে এ ব্যাপারে একরকম সিদ্ধান্ত নেয়াই আছে। সে সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কমিশনের সদস্য নির্বাচনের জন্য একটি সিলেকশন বোর্ডের প্রজ্ঞাপনের খসড়া তৈরি করা হয়েছে। এই বোর্ড গঠনের পর তারা হয়তো প্রতি পদের জন্য দু’জনের নাম সুপারিশ করবে। বোর্ডের সম্ভাব্য সদস্যদের সবাই যেহেতু সরকারি ঘরানার, তাই তারা সরকারের ইচ্ছার বাইরে কোনো সুপারিশ করবে না। ফলে নির্বাচন কমিশন সরকারের ইচ্ছার বাইরে গঠন হওয়ার সম্ভাবনা এখন নেই। বড়জোর এটি হতে পারে যে সরকারের পক্ষ থেকে তিনজন সদস্যের নিয়োগ দানের পর দুইজন সদস্য প্রস্তাব করার জন্য বিরোধী দলের প্রতি আহ্বান জানানো হবে। এটি বিরোধী দল গ্রহণ করলে কমিশনের বিরুদ্ধে তাদের আপত্তি জানানোর কিছু থাকবে না।

বিদায়ের মহাসমাবেশ
বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া চট্টগ্রামে রোডমার্চের সর্বশেষ সমাবেশে সরকার বিদায়ের একটি কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন। এ কর্মসূচির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ১২ মার্চ ঢাকায় মহাসমাবেশ। এর আগে বিভাগীয় ও জেলাপর্যায়ের সমাবেশ ও গণসংযোগের মাধ্যমে জনমত গঠনের কর্মসূচি রয়েছে।
বিএনপি ও চারদল হরতাল অবরোধের মতো তুলনামূলক সমালোচিত কর্মসূচি থেকে সরে এসে রোডমার্চের কর্মসূচি নিয়েছে। এ কর্মসূচির মাধ্যমে বিরোধী দলের জনসম্পৃক্ততা অনেক বেশি বৃদ্ধির প্রমাণ রাখতে পেরেছে। বিভিন্ন দেশে শাসন পরিবর্তনে এই জনসম্পৃক্ততা মুখ্য ভূমিকা রেখেছে। বিরোধী দলের এই কৌশল এখনো পর্যন্ত ইতিবাচক বলে মনে হয়েছে। কিন্তু সরকারকে বিদায় করার জন্য ঢাকায় মহাসমাবেশের যে ডাক বিরোধীদলীয় নেত্রী চট্টগ্রামে দিয়েছেন সেটি কিভাবে বাস্তবায়নের চেষ্টা হবে তা স্পষ্ট নয়। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে সাধারণভাবে সভা সমাবেশ করতেই যেখানে বিভিন্নভাবে বাধা দেয়া হচ্ছে সেখানে মেয়াদপূর্তির আগেই সরকারকে বিদায় করার ঘোষণা দিয়ে সমাবেশ বিরোধী দলকে ঢাকায় করতে দেবে সেটি স্বাভাবিক নয়। অবশ্য এই কর্মসূচির নির্ধারিত সময় যেহেতু আরো এক মাস পরে আসবে সেহেতু এর মধ্যে আরো অনেক কিছু স্পষ্ট হতে পারে। এমন একটি ধারণা বিরোধী দলের চিন্তায় থাকতে পারে যে আগামী দুই মাস অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সরকারকে অনেক বিরূপ অবস্থার মোকাবেলা করতে হবে। এতে জনমতে আরো বৈরী অবস্থা দেখা দিতে পারে। আর বিক্ষুব্ধ জনতার সমাবেশ তাহরির স্কোয়ারের মতো সরকার পতনের অবস্থানে পরিণত হতে পারে। এ ধরনের একটি আশাবাদের সাথে বাস্তবতার অবশ্য বেশ খানিকটা ব্যবধান দেখা যায়।

বাইরের মেকানিজম
বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিশেষ বিশেষ সময়ে কূটনৈতিক অংশীদার বিভিন্ন দেশের ভূমিকা বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ২০০৭ ও ২০০৮ সালের পরিবর্তনেও তাদের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দেখা দিয়েছিল। বাংলাদেশের রাজনীতিতে কূটনৈতিক অংশীদারদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্য, ভারত, চীন বিশেষভাবে প্রভাব রাখে। এর বাইরে রাশিয়া পাকিস্তান সৌদিআরব প্রভৃতি দেশের কম বেশি প্রভাব থাকে। তিন দিক বিস্তৃত বৃহৎ প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারতের প্রভাব বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে বেশি। পূর্ব-উত্তর অঞ্চলের রাজ্যগুলোর বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন দমন করা, নিজস্ব পণ্যের বাজার নিশ্চিত করা, সর্বোপরি নিজের প্রভাব বলয়ের মধ্যে স্থায়ীভাবে ধরে রাখার স্বার্থে বাংলাদেশের রাজনীতি ও সরকারকে সব সময় প্রভাবের মধ্যে রাখার চেষ্টা করে ভারত। স্বাধীনতার পর থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত এ প্রভাব ছিল একচ্ছত্র। ৭৫ এর পট পরিবর্তনের পর সেটি ন্যূনতমপর্যায়ে নেমে আসে। এরপর আবার তা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০১ ও ২০০৭ সাল থেকে এ প্রভাব আবার বাড়তে থাকে। এখন বাংলাদেশের আর্র্থসামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর প্রতিবেশী এ দেশটির প্রভাব অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। এ অবস্থা অব্যাহত রাখতে ভারতের নানা প্রচেষ্টা সক্রিয় থাকা স্বাভাবিক। বাংলাদেশে কম-বেশি সব রাজনৈতিক দলের সাথে ভারতীয় নেটওয়ার্কের নানামুখী যোগাযোগ থাকলেও আওয়ামী লীগের সাথে সম্পর্ক অনেকটা ন্যাচারাল। ফলে আওয়ামী লীগ যত বেশি দিন ক্ষমতায় থাকবে ততই ভারতের স্বার্থের জন্য তা অনুকূল বলে মূল্যায়িত হতে পারে। তবে প্রতিবেশী দেশটি বাংলাদেশের রাজনীতিকে এমন একপর্যায়ে নিয়ে যেতে চায় যাতে প্রতিবেশী দেশটির স্বার্থের বিপক্ষে গিয়ে বাংলাদেশে কারো পক্ষে কোনো নীতিনির্ধারণ সম্ভব না হয়। তবে এ লক্ষ্য অর্জনে ভারতের একটি বড় বাধা হলো দেশটির অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা। বাংলাদেশে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা যতটা দেশটি দিতে পারে সেভাবে অর্র্থনৈতিক সহযোগিতা করার ক্ষমতা নেই। আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে ভারতের একটি বিশেষ ভূমিকা আছে কিন্তু সে ভূমিকা নিয়ন্ত্রকের মতো নয়। নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবে। আইএমএফ প্রধান নির্বাচনেও রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পরোক্ষ ভূমিকা। এর বাইরে জাতিসঙ্ঘের সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ফোরামেও রয়েছে আমেরিকার বিশেষ প্রভাব। বিশ্বব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের এ ভূমিকার কারণে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আমেরিকার বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। তবে বাংলাদেশের মতো দেশে আমেরিকান স্বার্থ অন্য অনেক কিছুর সাথে সংশ্লিষ্ট। একসময় আমেরিকায় দক্ষিণ এশিয়ায় নানা কারণে ভারতের শ্রেষ্ঠত্ব বা দেশটিকে আঞ্চলিক মোড়ল হিসেবে মেনে নেয়ার কথা বলেছিল। সেটি শেষ পর্যন্ত মার্কিন স্বার্থের জন্য অনুকূল বিবেচিত হয়নি। ছোট ছোট দেশগুলোর সাথে এক দিকে আমেরিকার দূরত্ব এতে কিছুটা বেড়েছে; আবার দক্ষিণ এশিয়ায় আমেরিকার স্বার্থের প্রতি কাক্সিক্ষত ছাড়ও দেয়নি নয়াদিল্লি। ফলে যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ এশিয়ার নীতির ক্ষেত্রে কিছুটা হলেও পরিবর্তন আনছে বলে প্রতীয়মান হয়। এর কম-বেশি প্রভাব বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ঘটনাবলির ওপরও পড়তে পারে।
চীন বিশ্বে যেকোনো অর্থনৈতিক সঙ্কটে পড়া দেশকে পুনরুদ্ধারের সামর্থ্য রাখে। বাংলাদেশের বর্তমান সঙ্কটে চীনা সহায়তা সবচেয়ে কার্যকর ছিল। কিন্তু বাংলাদেশ চীনের সাথে বিদ্যমান সম্পর্ক অব্যাহত রাখুক সেটিও ভারত এমনকি আমেরিকাও কামনা করে না। ফলে চীনা সহায়তার জন্য গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণকাজ দেয়া বা অন্য যেসব শর্ত রয়েছে তা পূরণ করা বাংলাদেশের জন্য সহজ না-ও হতে পারে। তবে এটি বলার অপেক্ষা রাখে না, বাংলাদেশে এখন যে অর্থনৈতিক সঙ্কট ঘনীভূত হচ্ছে তা দূর করতে হলে চীন আমেরিকা বা সৌদি আরবের সহায়তার প্রয়োজন অবশ্যই হবে।

সমঝোতার উদ্যোগ
আন্দোলন, সংগ্রাম আর সমঝোতাÑ রাজনীতির এটি একটি স্বাভাবিক কৌশল। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর রাজনৈতিক সমঝোতার ব্যাপারে খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি। বিরোধী দল সমঝোতার মাধ্যমে সরকারকে পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকতে দেয়ার কথা বললেও সরকার তার প্রান্তিক অ্যাজেন্ডাগুলো বাস্তবায়নে একতরফা অগ্রসর হওয়ার কৌশল নেয়। ফলে সমঝোতার পরিবর্তে রাজনীতিতে সঙ্ঘাতই প্রবল হয়ে ওঠে। সরকার ও বিরোধী পক্ষের দূরত্ব বাড়তে থাকে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারপদ্ধতি বাতিল এবং বিরোধীদলীয় নেত্রী ও তার পরিবারের সদস্যদের একের পর এক মামলা দিয়ে শাস্তি প্রদানের উদ্যোগে দুই পক্ষের দূরত্ব দূরতিক্রম্য হয়ে ওঠে। এভাবে পেরিয়ে যায় সরকারের তিন বছর।
সরকার সুশাসনের চেয়েও রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডাকে বেশি গুরুত্ব দিতে গিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় নানামুখী সঙ্কট দেখা দেয়। প্রশাসনিক দক্ষতা বারবার প্রশ্নের মুখে পড়ে। শাসক দলের রাজনৈতিক আধিপত্যের কারণে অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসন অচল হয়ে পড়ার উপক্রম হয়। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বাড়তে থাকে অব্যাহতভাবে। বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ বন্ধ করে দেয়ায় নতুন কর্মসংস্থানের জন্য প্রয়োজনীয় শিল্পায়ন মুখ থুবড়ে পড়ে। বেকার ও আধা বেকারের সংখ্যা বাড়তে থাকে। সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকগুলোও নেতিবাচক হয়ে পড়ে। বেশি দামে বিদ্যুৎ ও গ্যাস কিনে কম দামে বিক্রি করতে গিয়ে ভর্তুকির অঙ্ক বেড়ে যায়। আওয়ামী লীগ শাসনে শেয়ারবাজারে দ্বিতীয় দফা ধসের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ৩০ লাখ বিনিয়োগকারী পরিবার। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে সরকার চালানোর ফলে তারল্যসঙ্কটে পড়ে ব্যাংকগুলো। ডলারের দাম ৬৮ থেকে বেড়ে হয় ৮৫ টাকা। এই তীব্র অর্থনৈতিক সঙ্কটে একের পর এক নির্বাচনে হারতে থাকে সরকারি দল। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা- এই ত্রিমুখী সঙ্কটে পড়ে সরকার সমঝোতার প্রয়োজন তীব্রভাবে উপলব্ধি করতে থাকে।
রাজনীতিতে সমঝোতার বিষয়ে সরকারের অনাগ্রহ বিরোধী পক্ষকে তীব্র রাজনৈতিক আন্দোলনের কর্মসূচির দিকে এগিয়ে নেয়। গোড়াতে সরকারকে পতন ঘটানোর সামর্থ্য ও ইচ্ছা কোনোটাই প্রবলভাবে দেখা যায়নি বিরোধী দলের। কিন্তু বিরোধী দলের রাজনীতিকে নিশ্চিহ্ন করার পথেই সরকার ক্রমে এগিয়ে যাচ্ছে- এমন উপলব্ধি থেকে আন্দোলনকে চূড়ান্তপর্যায়ে উপনীত করার কথা ভাবতে থাকে তারা। এর মধ্যে বিরোধী দলের রোডমার্চ কর্মসূচিতে আশাতীত সাড়া মেলে। কিন্তু সরকার পতনের আন্দোলনে সাফল্য নিয়ে সংশয় থেকেই যায় বিরোধী শিবিরে।
ঠিক এমন এক পটভূমিতে কয়েকজন ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী কূটনৈতিক অংশীদারের পক্ষ থেকে আসে সমঝোতার প্রস্তাব। এ প্রস্তাবে ইস্যু হিসেবে উত্থাপিত হয় ছয়টি বিষয়। এর মধ্যে রয়েছে, এক. তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন। দুই. সরকারের মেয়াদ পূর্ণ করতে দেয়া। তিন. যুদ্ধাপরাধের বিচারপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে দেয়া। চার. বিরোধীদলীয় নেত্রী ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে চলমান মামলা স্থগিত রাখা। পাঁচ. দুই নেত্রীর নিরাপত্তাপ্রশ্নে অঙ্গীকারবদ্ধ থাকা। ছয়. আলোচনার মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন গঠন।
সমঝোতার ইস্যুগুলোর মধ্যে সরকারি দলের জন্য সবচেয়ে গুরত্বপূর্ণ হলো বর্তমান সরকারের মেয়াদের বাকি অংশ পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে ক্ষমতায় থাকা। আর যুদ্ধাপরাধ বিচারের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা। অন্য দিকে প্রধান বিরোধী দলের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হলোÑ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হওয়া এবং বিরোধীদলীয় নেত্রী ও তার পরিবারের সদস্যদের বিচারের নামে উদ্দেশ্যমূলক দণ্ডাদেশ দিয়ে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেয়ার প্রচেষ্টা বন্ধ করা।
উল্লিখিত চারটি বিষয়ে সমঝোতা হওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দুই প্রধান কূটনৈতিক অংশীদারের কোনো আপত্তি নেই। আওয়ামী লীগ নিজস্ব জনমত জরিপ করে দেখেছে আগামী সাধারণ নির্বাচন ন্যূনতমপর্যায়ে অবাধ ও নিরপেক্ষ হলেও সরকারি দল পুনর্নির্বাচিত হওয়ার নিশ্চিত সম্ভাবনা থাকবে না। এ অবস্থায় তীব্র অর্থনৈতিক সঙ্কট ও নিরাপত্তা হুমকির সাথে সাথে সরকার বিদায়ের রাজনৈতিক আন্দোলনও চলতে থাকলে ক্ষমতার বাকি মেয়াদ অনিশ্চিত হতে পারে। এ অবস্থায় পারস্পরিক সমঝোতার যে প্রয়োজন তা উপলব্ধি করছে সরকারি দল। এতে শেষ পর্যন্ত সমঝোতার প্রক্রিয়া বেশ খানিকটা অগ্রসরও হয়েছে।
সমঝোতা থেকে আওয়ামী লীগ যে বিষয়গুলো অর্জন করতে চায় তার মধ্যে রয়েছেÑ এক. পুরো পাঁচ বছর মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা। মেয়াদের শেষ দুই বছর অর্থনৈতিক সঙ্কটের (দায় পরবর্তী সরকারের ওপর চাপিয়ে দিয়ে হলেও) আপাতসমাধান করা। দুই. যুদ্ধাপরাধের বিচার সম্পন্ন করার মাধ্যমে ১৯৭৫ পরবর্তী রাজনীতির যে নতুন ধারা সৃষ্টি হয়েছিল সেটিকে ক্ষীণতর করে ফেলা। তিন. সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোর সমন্বয়ে যে একটি বৃহৎ জোট ও সরকার পতনের আন্দোলনের বিপুল উদ্দীপনা গড়ে উঠেছিল তা দুর্বল করা। যুদ্ধাপরাধ বিচার প্রশ্নে বিএনপি পূর্বঘোষিত অবস্থান থেকে সরে এলে জামায়াত ও অন্য ইসলামি দলগুলোর সাথে দূরত্ব সৃষ্টি হবে। এতে বিরোধী পক্ষের একটি জোট ভেঙে দু’টি জোট সৃষ্টির সম্ভাবনা থাকবে। এই বিভাজনে পরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ তুলনামূলক ভালো অবস্থানে থাকবে। চার. বিরোধী দলের সাথে রাজনৈতিক সমঝোতার একটি প্রভাব নিরাপত্তা হুমকিকে কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করবে। সাধারণভাবে রাজনৈতিক পক্ষগুলোর বিভাজনের সুযোগ সংবিধানবহির্ভূত শক্তি গ্রহণের চেষ্টা করে।
সমঝোতা থেকে বিএনপি যা অর্জন করতে পারে তার মধ্যে রয়েছে, এক. তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে সে নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারের পতন ঘটানোর ক্ষেত্রে সাফল্য এলেও এরপর ক্ষমতায় যে বিএনপি যেতে পারবে তার নিশ্চয়তা নেই। দুই. বিরোধী দলের আন্দোলন সরকার দমন করতে সক্ষম হলে বিরোধী দলের নেত্রী ও তার পরিবারের সদস্যদের কোনো-না-কোনো মেয়াদের দণ্ড সরকার নিশ্চিত করে ফেলবে। এতে বিরোধীদলীয় নেত্রী ও তার পরিবারের রাজনীতি থেকে ছিটকে পড়ার শঙ্কা থেকে যেতে পারে। তিন. আওয়ামী লীগের মতো দলকে ক্ষমতাচ্যুত করার আন্দোলন সফল করতে বিএনপিকে অনেক আত্মত্যাগ করতে হবে। এ শক্তি দুই বছর পর নির্বাচনে জয়লাভের জন্য দেয়া গেলে বেশি ভালো ফল আসার সম্ভাবনা রয়েছে। চার. সমঝোতায় সম্মত হলে প্রভাবশালী কূটনৈতিক অংশীদারদের যে সহানুভূতি পাওয়া যাবে তা আন্দোলনের রাস্তায় না-ও মিলতে পারে।
সাধারণভাবে দুই পক্ষ লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে সে ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সমঝোতা হয়ে থাকে। বিবেচ্য ক্ষেত্রে দৃশ্যত সেটি দেখা যায়। তবে মুদ্রার অন্য পীঠও রয়েছে। এ ধরনের সমঝোতায় সাধারণভাবে যারা সরকারে থাকে তাদের সুবিধা হয় তাৎক্ষণিক এবং বেশি। অন্য দিকে বিরোধীপক্ষের প্রাপ্তি হয় বিলম্বে। এ ক্ষেত্রে বিরোধী দল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পুনঃপ্রবর্তনের বিষয়টি সাংবিধানিকভাবে নিশ্চিত করতে পারলে কৌশলগতভাবে বিএনপির অর্জন তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে। অবশ্য রাজনৈতিক সমঝোতায় যাওয়ার ক্ষেত্রে বিএনপির একলা চলো নীতি অন্যদের দলটির ব্যাপারে আস্থাহীনও করে তুলতে পারে। এ ক্ষেত্রে আন্দোলনের জন্য যেমন বিএনপির জোটের প্রয়োজন তেমনিভাবে নির্বাচনের জন্যও প্রয়োজন। সমঝোতা করতে গিয়ে বর্তমান বিরোধী জোট বিভক্ত হয়ে দু’টি পক্ষ হলে এ বিভক্তির সুবিধা আওয়ামী লীগ পেয়ে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হওয়ার পরও ক্ষমতা হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায় বিএনপির জন্য।

লেখক : বিশিষ্ট সাংবাদিক

SHARE

Leave a Reply