রাজনীতির নামে অপরাজনীতি । মুহাম্মদ আবদুল জব্বার

রাজনীতির-নামে-অপরাজনীতি
জনগণের চাওয়া নয় বরং নিজে চাইলে নেতা হওয়া যায়। জোর করে ভোটাধিকার হরণ করে, ভয়-ভীতি দেখিয়ে, খুনা-খুনি করে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে নেতা হওয়াটাই যেন বিশেষ ক্রেডিট!

ছোটবেলা বাপ-চাচাদের কাছে শুনতাম- ‘রাজার যে নীতি তাই রাজনীতি। রাজনীতি দেশ ও দশের তরে! রাজনীতি কেবল মাত্র দেশের সিংহভাগ মানুষের জীবন-মান উন্নয়নের জন্য।’ কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় রাজনীতির অর্থে পরিবর্তন এসেছে! এখন রাজনীতির অর্থ নেকামি, ধান্ধাবাজি, শঠতা, ধোঁকাবাজি ইত্যাদি ইত্যাদি। আমাদের দেশে বর্তমানে রাজনীতি হলো আঙুল ফুলে কলা গাছ হওয়ার অন্যতম হাতিয়ার। রাজনীতি হলো ক্ষমতা অপব্যবহারের মাধ্যম! এমন রাজনীতিকে সাধারণ মানুষ মন থেকে ঘৃণা করে! এহেন অপরাজনীতির কবল থেকে দেশবাসী মুক্তি চায়।
এক সময় রাজনীতির প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা ছিল, ছিল ভালোবাসা! আর এখন রাজনীতি ও রাজনৈতিক ব্যক্তিকেও মানুষ পছন্দ করে না। যে রাজনীতি মানুষের মৌলিক অধিকার হরণ করে, ন্যায় বিচারব্যবস্থা ও সুশাসনকে বৃদ্ধাঙুলি দেখায়; সত্যকে সত্য বলতে পারে না, নেতার অন্ধ আনুগত্য করতে গিয়ে নীতিকে বিসর্জন দেয়, অকপটে মিথ্যার বেসাতির জাল বিস্তার করে স্বার্থসিদ্ধি করতে কূটজাল বিস্তার করে, এসব জনবিধ্বংসী ছলচাতুরীকে রাজনৈতিক নেকামি বা অপরাজনীতি বৈ কি বলা চলে? সেই অপরাজনীতির খপ্পরে এখন সিংহভাগ রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও রাজনৈতিক দল। দেশ ও দশের তরে রাজনীতির প্রতিযোগিতার পরিবর্তে সর্বত্র প্রতিহিংসা ও জিঘাংসার রাজনীতির তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে। এই প্রতিযোগিতায় কার কী ক্ষতি হচ্ছে তাতে কার কী আসে যায়! এমন রাজনীতির কবলে পড়ে নিঃস্ব হচ্ছে নাম না জানা কত মানুষ!
আমজনতা; জজমিয়া আর জাহালম ‘নাটক’ আরো কত দিন নীরবে নিভৃতে সহ্য করে যেতে হবে তা কে বা জানে! যে রাজনীতিতে রাজনৈতিক সহকর্মীকে খুন করতে হাত কাঁপে না! অপরাজনীতির দৌরাত্ম্য এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, পক্ষ-প্রতিপক্ষ সে যেই হোক না কেন যেকোন মূল্যে নিজের মতের বিপক্ষ শক্তিকে কুপোকাত করতে পারাটাই যেন রাজনীতির মুখ্য বিষয়। যেখানে আদর্শ নীতি নৈতিকতার কোনো বালাই নেই। প্রতিনিয়ত এমন পরিস্থিতি দেশকে সংঘাতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। একনায়কতন্ত্র ও একদলীয় শাসনব্যবস্থার কোপানলের দেশ।
আওয়ামী শাসনে পিষ্ট হয়ে মানুষ তাদের সঠিক চিন্তা ও মতামত ব্যক্ত করতে পারছে না বললেই চলে। মামলা-হামলা থেকে জান বাঁচানোই যেখানে মুখ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এহেন পরিস্থিতির ফলে সুস্থ ধারার রাজনীতি চর্চার পরিবর্তে বল প্রয়োগের রাজনীতি সৃষ্টি হচ্ছে, প্রকৃত রাজনৈতিক আদর্শ কর্মীর সৃষ্টি না হয়ে সুবিধাবাদী কর্মীর সংখ্যা বাড়ছে, যা রাজনৈতিক দলসমূহকে চূড়ান্ত বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এতে করে সময়ের পরিক্রমায় একটি পক্ষ একদলীয় শাসক গোষ্ঠীর জুলুমবাজির শিকার হয়ে স্টিম পলিটিক্সের দিকে ধাবিত হবে। যা সুস্থ রাজনীতির চর্চা ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে দুর্বল করে সংঘাতের দিকে ঠেলে দিবে। শেষতক যার পরিণতি হবে ভয়াবহ!
বর্তমানে ক্ষমতা কুক্ষিগত করাই যেন দেশে রাজনৈতিক ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। আগে শুনতাম মানুষ যাকে ভোট দেয়, নিজের চাওয়ার চাইতে জনগণের চাওয়াতে তিনি জননেতা বা জনপ্রতিনিধি হয়। এখন ঘটছে ঠিক তার উল্টোটা। জনগণের চাওয়া নয় বরং নিজে চাইলে নেতা হওয়া যায়। জোর করে ভোটাধিকার হরণ করে, ভয়-ভীতি দেখিয়ে, খুনা-খুনি করে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে নেতা হওয়াটাই যেন বিশেষ ক্রেডিট! মানুষ এ ধরনের রাজনৈতিক নেকামি মন থেকে ঘৃণা করে। তবে সাধারণ মানুষের ঘৃণা করা না করাতে ক্ষমতান্ধদের কিছু যায় আসে না।
আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে ক্ষমতায় সমাসীনের পর থেকে দেশকে বিরোধী দলশূন্য করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে! সেই মিশন বাস্তবায়ন করতে গিয়ে বিএনপি ও জামায়াতের সাথে তারা কী না করেছে? খালেদা জিয়াকে বছরের পর বছর কারাগারে আবদ্ধ করে, তারেক জিয়াকে সাজা দিয়ে বিএনপিকে খণ্ড-বিখণ্ড করতে তারা কী না করেছে? অপর দিকে জামায়াতে ইসলামীকে নেতৃত্বশূন্য করতে টেস্ট কেস হিসেবে শীর্ষ নেতাদের হত্যা ও নানা মামলায় সাজা কার্যকর অব্যাহত রেখেছে। পুলিশি হয়রানির কারণে বিরোধীদলীয় কার্যালয়গুলো অঘোষিতভাবে বন্ধ হয়ে আছে। সভা-সমাবেশ নেই বললে চলে। ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দেশে আর কার্যত কোনো বিরোধী দল আছে বলে মনে হয় না। এহেন পরিস্থিতিতে চারদিকে আওয়ামী লীগের জয় জয়কার অবস্থা । রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন- সরকারবিরোধী প্ল্যাটফর্ম সক্রিয় হয়ে না উঠলে আওয়ামী লীগ অচিরেই নিজেদের পতন নিজেরাই ডেকে আনবে। তাই তাদের উচিত প্রতিহিংসা আর জেল জুলুমের পথ পরিহার করে রাজনৈতিক সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করা। যাতে সবাই তাদের মত-পথ চর্চা করতে পারে।

রাজনীতির-নামে-অপরাজনীতি
আদর্শবাদী প্রতিটি নাগরিককে নিজের মুক্তির ঘণ্টা নিজেকেই বাজাতে হবে, শিকল পরা জনগোষ্ঠীকে মুক্ত করতে হিম্মত নিয়ে সকল অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে, যেখানে অন্যায় সেখানেই প্রতিবাদ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। সত্য, সুন্দর ও মানবতার পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে হবে।

বিরোধী দলবিহীন সংসদ গণতন্ত্রের জন্য হুমকি। তাই সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে কার্যকর বিরোধী দলের কোনো বিকল্প নেই। এমন শাসনব্যবস্থায় একদলীয় শাসন ও একদলীয় রাজনীতিকে বাহ্যত শক্তিশালী করলেও ফ্যাসিবাদকে সাংঘাতিক ভাবে উসকে দিয়ে গণতন্ত্রকে গলাটিপে হত্যা করে। কালের ব্যবধানে দেশে বিরোধীদল ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহ অকার্যকর হয়ে যায়। দেশে ২০১৪ সালের মতো এবারের বিরোধীদলও নামকা ওয়াস্তে এরশাদের জাতীয় পার্টি! একেবারে গৃহপালিত বিরোধী দল! যদিওবা কয়দিন আগে জাতীয় পার্টির শীর্ষ নেতা জি.এম কাদের বলেছেন, তারা এবার গৃহপালিত বিরোধী দল নয় বরং কার্যকর বিরোধী দল হিসেবে ভূমিকা পালন করবেন! বক্তব্য বিবৃতিতে আওয়ামী লীগ সরকার বা জাতীয় পার্টি যাই বলুক না কেন, তাদের অতীতে প্রশ্ন বিদ্ধ ভূমিকার নিরিখে দেশবাসী এখন আর এমন বক্তব্য বিশ্বাস করে না।
দেশের সামগ্রিক উন্নতি-অবনতির প্রতিচ্ছবি তুলে ধরতে মিডিয়ার কোনো বিকল্প নেই। যার মাধ্যমে দেশবাসী সচেতন হয়। যে কোন ভালো ও মন্দের ব্যাপারে তাদের মত ব্যক্ত করতে পারে। এতে দেশে কোন অন্যায়-অবিচার মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে না। তবে সরকার যখন মিডিয়াকে নিজের আয়ত্তে নিয়ে ‘মিডিয়া ক্যু’ করে তখন মিডিয়ার মালিক/পরিচালক/কর্মীরা দেশের প্রকৃত অবস্থা তুলে ধরতে পারেন না। দেশের মিডিয়াগুলোকে সরকার ‘ক্যু’ করেছে। তাই তারা দেশের আসল সত্য প্রচার করতে পারছে না। যেমন পারেনি ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরে নির্বাচনের অনিয়মের কথা! কারণ আসল সত্য প্রচার করলে লাইসেন্স থাকবে না! যেমন অতীতে বেশ কয়টি মিডিয়া তাদের লাইসেন্স হারিয়েছে।
মিডিয়াগুলো নীতি নৈতিকতা বা আইনের কাছে ধরাবাঁধা নয়, বরং আওয়ামী সরকারের কাছে ধরাবাঁধা! তাইতো কিছু মিডিয়া সরকারের ফরমায়েশ বাস্তবায়ন করতে গিয়ে সত্যকে মিথ্যা বানাতে আর মিথ্যাকে সত্য বানাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে! এতে সচেতন বিবেকবানরা পত্রিকা-টিভির খবরকে গুরুত্ব দেয় না, কোন মিডিয়াকে দেশের প্রতিচ্ছবিও মনে করে না।
উপরোক্ত অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বলা চলে সর্বত্র এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশ বিরাজ করছে। একনায়কতন্ত্র আর ফ্যাসিবাদের কবলে পড়ে দেশের বিশাল জনগোষ্ঠী মুক্তির প্রহর গুনছে। তারা সকল বাধা বিপত্তি মাড়িয়ে বাধাহীন মুক্তজীবন চায়। তাদের আকুতি, কখন বাজবে সেই মুক্তির ঘণ্টা? কেই বা বাজাবে সেই মুক্তির ঘণ্টা! আমি মনে করি আদর্শবাদী প্রতিটি নাগরিককে নিজের মুক্তির ঘণ্টা নিজেকেই বাজাতে হবে, শিকল পরা জনগোষ্ঠীকে মুক্ত করতে হিম্মত নিয়ে সকল অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে, যেখানে অন্যায় সেখানেই প্রতিবাদ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। সত্য, সুন্দর ও মানবতার পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে হবে। আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে নিজের অধিকার নিজেই প্রতিষ্ঠার জন্য মরিয়া হয়ে লড়তে হবে। কারণ এই দেশ আমার, এই মাটি আমার, এই দেশের বুকে আমার জন্ম। কোন লুটেরাকে আমার অধিকার হরণ করে জনগণকে জিম্মি করে রাখতে দেব না! তাহলেই চাপিয়ে দেয়া অপরাজনীতির কবল হতে মুক্তি পাবে দেশ, মুক্তি পাবে আমজনতা। সেই বিশ্বাসের ফেরিওয়ালাদের আজ জাগতেই হবে, এর কোনো বিকল্প নেই।

লেখক : বিশিষ্ট কলামিস্ট

SHARE

Leave a Reply