রামপালের কালো ধোঁয়া নাকি সবুজ সুন্দরবন -হারুন ইবনে শাহাদাত

পৃথিবীতে একটাই সুন্দরবন। আল্লাহতায়ালা এই নিয়ামত বাংলাদেশকে দান করেছেন। এই নিয়ামত রক্ষা করা এদেশের প্রত্যেক মানুষের দায়িত্ব। এই দায়িত্বের বাইরে আমরা কেউ নই। তবে এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যারা দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছেন সেই ক্ষমতাবান মানুষদের দায়িত্ব অন্য সবার চেয়ে অনেক অনেক বেশি। কিন্তু তারা যখন স্বার্থান্ধ হয়ে যান, তখন অবশ্যই নাগরিক হিসেবে সবার দায়িত্ব সেই অন্ধচোখে আলো দিয়ে তাদের বিবেককে জাগ্রত করতে সচেষ্ট হওয়া। সেই দায়িত্বে অংশ হিসেবেই এই ক্ষুদ্র প্রয়াস। রামপালের কালো ধোঁয়া থেকে প্রিয় সুন্দরবনকে বাঁচানোর আর্তচিৎকার।
বিদ্যুৎশক্তি দিয়ে দেশকে আলোকিত ও সমৃদ্ধ করতে সুন্দরবনের অদূরে রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে সরকার ভারতের সাথে চুক্তি করেছে। এই প্রকল্প হাতে নেয়ার পর থেকেই সচেতনমহলের পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। প্রতিবাদের অংশ হিসেবে পত্রপত্রিকায় লেখালেখি, অন্যান্য মিডিয়ায় আলোচনা, বক্তৃতা বিবৃতি প্রচার করা হয়েছে। রাজপথে মিছিল, মিটিং, লংমার্চ হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। প্রতিবাদ স্তব্ধ করতে সরকারের নির্দেশে মিছিল, মিটিং এ লাঠিচার্জ হয়েছে, তারপরও প্রতিবাদ থামেনি। শত প্রতিবাদেও সরকারের ঘুম ভাঙছে না। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে তারা জেগে জেগেই ঘুমাচ্ছে, নয় তো চুক্তির নামে কারো কাছে দাসখত দিয়েছে।

এ কেমন দোস্তি !
রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে নির্মাণে মোট ব্যয়ের ৭০% মিটানো হবে বিদেশী (ভারতীয়) ব্যাংক থেকে আনা ঋণের টাকায়। আনয়নকৃত ঋণের সমস্ত সুদ বহন করবে বাংলাদেশ। বাকি ৩০% ব্যয়ের ১৫% বহন করবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। বাকি মাত্র ১৫% ব্যয় বহন করবে ভারতীয় রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল থারমাল পাওয়ার করপোরেশন (এনটিপিসি)। কিন্তু প্রকল্পের লাভ ভাগ হবে ঠিক সমান হারে! ৫০% বাংলাদেশ, বাকি ৫০% ভারতীয় এনটিপিসি! প্রকল্প কোন রকম আর্থিক ঝুঁকির মুখোমুখি হলে সমস্ত ক্ষয়ক্ষতি বহন করবে বাংলাদেশ। ৭০% ঋণ দিয়ে দোস্তি করবে কোন দেশ? আমাদের বন্ধুপ্রতিম দেশ ভারত ছাড়া আর কে? কেমন অকৃত্রিম বন্ধুত্ব ৮৫% ব্যয় এবং সমস্ত আর্থিক ঝুঁকি বহন করে বাংলাদেশের লাভের পরিমাণ (যদি আদৌ হয়) ৫০%, আর ১৫% ব্যয় ও কোনরূপ আর্থিক ঝুঁকির ভাগীদার না হয়েই ভারতীয় এনটিপিসির লাভের পরিমাণ ৫০%!
বন্ধুত্বের ঋণ শোধ করতে সরকার আরো কি করছে দেখি, বাংলাদেশী প্রতিষ্ঠান ওরিয়ন গ্রুপ দেশে তিনটি পাওয়ার প্ল্যান্ট স্থাপন করছে। তার মধ্যে মুন্সীগঞ্জের মাওয়া পাওয়ার প্ল্যান্ট থেকে সরকার বিদ্যুৎ কিনবে ৪ টাকা প্রতি ইউনিট ও খুলনার লবণচড়া এবং চট্টগ্রামের আনোয়ারা প্ল্যান্ট থেকে ৩.৮০ টাকা দরে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ কেনা হবে। অথচ রামপাল থেকে একই কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে আমরা কিনবো ৮.৮৫ টাকা দরে! দ্বিগুণেরও মাত্র বেশি কিছু টাকা। রামপালে প্রয়োজনীয় সমস্ত কয়লা আমদানি করা হবে বন্ধুদেশ থেকে। টনপ্রতি দাম পড়বে মাত্র ১৪৫ ডলার! প্রতিদিন লাগবে মাত্র ১৩০০০+ টন কয়লা। বিশ্ববাজারে কয়লার টনপ্রতি দাম কোয়ালিটি ভেদে সর্বোচ্চ ৫০-৮০ ডলারের কাছাকাছি। বিশেষজ্ঞদের মতে প্রতিদিন বিদ্যুৎকেন্দ্রটি যদি ২০ ঘন্টা করে ৩০ বছর চালু থাকে এবং ইউনিট প্রতি ৪.৮৫ টাকা আর্থিক ক্ষতি ধরা হয় কেবল তাহলেই অঙ্কটা দাঁড়াবে এক লাখ চল্লিশ হাজার কোটি টাকা! পরিবেশগত ও অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির কথা বাদই দিলাম।
লাভ-ক্ষতির এই হিসাব প্রসঙ্গে আমাদের সবচেয়ে বড় উন্নয়নসহযোগী জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) এর এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কয়লাভিত্তিক আমদানিনির্ভর বিদ্যুৎ প্রকল্প শুধু আমদানিনির্ভরতার ঝুঁকিই বাড়াবে। এগুলো টেকসই হবে না। এর দ্বারা লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি হবে। এখন প্রশ্ন হলো তারপরও কেন এই দোস্তি?

সুন্দরবনের ভারতীয় অংশে হচ্ছে না কেন?
এই প্রকল্প ভারতের অংশের সুন্দরবনের আশপাশে হচ্ছে না, কারণ ভারতীয় আইন মতে সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও জনবসতির ১৫-২৫ কিলোমিটারের মধ্যে এই ধরনের প্রকল্পের অনুমোদন নেই। অথচ রামপাল প্রকল্পের জন্য বাগেরহাটে ১৮৩৪ একর জমি অধিগ্রহণ করে (অনেক পরিবারকে উচ্ছেদ করে) বালু ভরাটের মাধ্যমে দু’টি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য চুক্তি হয় বাংলাদেশ (বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড; পিডিবি) ও ভারতের (ন্যাশনাল থারমাল পাওয়ার করপোরেশন; এনটিপিসি) মধ্যে। এই প্রকল্প হবে বাংলাদেশের পৃথিবী বিখ্যাত ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের মাত্র ৯-১৩ কিলোমিটারের মধ্যেই (যদি সরকারিভাবে দাবি হচ্ছে যে এটি সুন্দরবনের বাফারজোনের ১৪ কিলোমিটার দূরে), যা সুন্দরবনের বনাঞ্চল, পরিবেশ ও জীবসম্পদের জন্য বিপজ্জনক, এমনকি দীর্ঘমেয়াদে সুন্দরবনের টিকে থাকার জন্য আশঙ্কাজনক। ভয়ঙ্কর ব্যাপার হচ্ছে এই প্রকল্প হবে কয়লাভিত্তিক, যার নির্মাণ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নিরুৎসাহিত করা হয় অথবা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিরুদ্ধে রয়েছে কঠোর আইন, যেহেতু এটি পরিবেশবান্ধব নয় এবং মানুষ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য ক্ষতিকর। যেমন, কানাডা ও ফ্রান্সে কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের বিরুদ্ধে রয়েছে কঠোর আইন (প্রমাণ করতে হবে যে এটি পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর নয়, যথেষ্ট ক্ষতির সম্ভাবনা থাকলে তা অনুমোদিত হবে না) ও জনমত।
প্রাথমিক চুক্তি স্বাক্ষরের আগে কোনও প্রকার পরিবেশ বিপর্যয় বিষয়ক যাচাই ও গবেষণা না করে সরকার চুক্তি স্বাক্ষর করে। পরে সরকারি সমীক্ষাতেই (প্রস্তাবিত রামপাল কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিবেশ সমীক্ষা) দেখা যায় যে এটি পরিবেশ, বিশেষ করে সুন্দরবনের সংরক্ষিত জীববৈচিত্র্যের জন্য ক্ষতিকর। কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য কয়লা আমদানি হবে বিভিন্ন দেশ থেকে, যেহেতু সুন্দরবন-সংলগ্ন নদীপথ জাহাজ চলাচলের জন্য উপযুক্ত নয় এই কয়লা ছোট ছোট নৌকা ও লঞ্চের মাধ্যমে বহন করে নিয়ে যেতে হবে বিদ্যুৎকেন্দ্রে, এই মালামাল ওঠানামা ও চলাচলে (কয়লা-ভর্তি নৌকা ডুবি) রয়েছে কয়লা পানি ও পরিবেশে নিঃসৃত হওয়ার ঝুঁকি। ফলে আবর্জনা, তেল, জাহাজ-লঞ্চ-নৌকা চলাচলে জলদূষণ ইত্যাদিতে সুন্দরবন ও সংলগ্ন পরিবেশের জল ও বায়ুদূষণ। শুধু তাই নয়, এই চলাচলে সৃষ্ট ঢেউয়ে প্লাবিত হবে আশপাশের জমি এবং ক্ষয় হবে সুন্দরবনের ভূমি যা সুন্দরবনের গাছগাছালির জন্য প্রয়োজনীয়। এ ছাড়া রয়েছে নির্মাণকাজ ও বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানোর ফলে সৃষ্ট শব্দদূষণ ও আলো-দূষণ, যা সুন্দরবন ও আশপাশের জনপদের মানুষ ও প্রাণীদের জীবনচক্রে বিশেষ ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে।
শুধু সুন্দরবন নয়, বিদ্যুৎকেন্দ্রের আশপাশের মানুষ ও জনপদের জন্য ব্যাপারটি ক্ষতিকর হবে। গবেষণায় দেখা গেছে, যে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের পাশে বসবাসকারী মানুষজন দীর্ঘমেয়াদে ৩-৬ গুণ বেশি আক্রান্ত হন ক্যানসার, হৃদরোগ, উচ্চরক্তচাপ ও নিউরোডিজেনারিটিভ স্নায়ুরোগে, যেহেতু কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের ফলে সৃষ্ট বায়ু ও জলদূষণ মানুষকে তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। সরকার বলছে যে এই প্রকল্পের ফলে অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হবে, অথচ এই প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণের মাধ্যমে উচ্ছেদ করা হয়েছে হাজার হাজার মানুষকে, যারা এখন ভূমি ও কর্মহীন। এই জনপদের মানুষের প্রধান জীবিকা মাছ আহরণ, সুন্দরবন থেকে গাছগাছালি মধু ইত্যাদি আহরণ ও কৃষিকাজ; বিদ্যুৎকেন্দ্রের ফলে সৃষ্ট দূষণে দীর্ঘমেয়াদে যখন পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে সুন্দরবন বিনষ্ট হবে তখন আরও অধিক মানুষ ভূমি ও জীবিকাহীন হয়ে যাবে। অর্থাৎ অল্প কিছু মানুষের কর্মসংস্থানের বিনিময়ে নষ্ট হচ্ছে অনেক মানুষের জীবন ও জীবিকা।

বিদ্যুৎ নাকি সুন্দরবন
বিদ্যুৎ না সুন্দরবন, কোনটা চাই? এই বিতর্ক যখন তুঙ্গে সেই প্রেক্ষাপটে বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক ও সিলেট শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল এ প্রসঙ্গে লিখেছেন, ‘আমি জ্বালানি বিশেষজ্ঞ নই, অর্থনীতির মানুষ নই, পরিবেশ সম্পর্কে আমার জ্ঞান কমনসেন্সের একটু বেশি। কাজেই রামপালের এই বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে আমার মতামতের কোনো বিশেষজ্ঞ মূল্য নেই। আমি নিজেও সেটা খুব ভালো করে জানি কিন্তু রামপালের বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে সাধারণ মানুষ কী ভাবছে আমার মনে হয় সরকারের সেটা জানার দরকার আছে।
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে সমমনা বেশ কয়েকজন শিক্ষক অনেক বছর থেকে সপ্তাহের একটি দিন বসে কোনো একটা বিষয় নিয়ে আলোচনা করি। এই সপ্তাহে আমাদের আলোচনায় বিষয় ছিল, “বিদ্যুৎ নাকি সুন্দরবন? নাকি দুটোই?” নানা বিষয়ের নানা বয়সের অনেক শিক্ষকের মাঝে আমি একজন শিক্ষককেও খুঁজে পাইনি যিনি রামপালের এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটিকে মেনে নিতে রাজি আছেন। এই শিক্ষকেরা আবেগনির্ভর যুক্তিহীন মানুষ নন। দেশের জন্য তাদের ভালোবাসা আছে, সরকারের জন্য মমতা আছে। তারপরও তাদের কারো কাছে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র একটি গ্রহণযোগ্য প্রজেক্ট নয়। পত্র-পত্রিকায় অনেক লেখালেখি বের হয়েছে তার মধ্যে কোনো লেখাতেই রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের পক্ষে কাউকে কিছু লিখতে দেখিনি। শুনেছি টেলিভিশনের টক শোতে সরকারের পক্ষের কিছু মানুষ এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের পক্ষে কথা বলে যাচ্ছেন কিন্তু কয়লানির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রের পক্ষে কাউকে নরম করতে পেরেছেন বলে মনে হয় না। পৃথিবীর সামনে গর্ব করার মতো আমাদের যে যৎসামান্য নিদর্শন রয়েছে, সুন্দরবন তার মধ্যে ব্যতিক্রম। যারা সুন্দরবন দেখেছেন, তারা এটাকে নিজের সন্তানের মতো ভালোবাসেন, সেই সুন্দরবনের ক্ষতি হয়ে যাবে সেটি এই দেশের কেউ মেনে নেবে না। দেশের একেবারে সাধারণ মানুষও এতদিনে জেনে গেছেন যে, প্রস্তাবিত ১৩২০ মেগাওয়াটের অর্ধেকও পাওয়া সম্ভব নয়, প্রায় দ্বিগুণ দামে এই ইলেকট্রিসিটি কিনতে হবে, পরিবেশ নষ্ট হবে বলে দুই দুইটি ব্যাংক এই প্রজেক্ট থেকে নিজেদের সরিয়ে নিয়েছে। আমার মনে হয় এর পরও জোর করে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি করার চেষ্টা করলে সরকার তার অর্জনের অনেকটুকুই ম্লান করে ফেলবে।’
লন্ডন প্রবাসী পরিবেশকর্মী নূরুল আমীন বরষণ লিখেছেন, ‘যদি আন্তর্জাতিক মানদন্ড মেনে চলা হয় তবে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রশ্নই আসে না। কেননা পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবন এই প্রকল্পের বিপজ্জনক সীমার মধ্যেই অবস্থিত। সুন্দরবন বিশ্বব্যাপী রামসার এলাকা হিসেবে স্বীকৃত এবং ইউনেস্কোর বিশ্ব প্রাকৃতিক সংরক্ষণ অঞ্চলেরও একটি অংশ। তাই বিশ্ব জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ অঞ্চল হিসেবে এই এলাকায় এ ধরনের প্রকল্প হতে পারে না। ভারত বলছে যে এখানে সুপার ক্রিটিক্যাল পদ্ধতিতে কোল বেজড পাওয়ার প্ল্যান্ট করবে কিন্তু যেই পদ্ধতিটি ভারত আমাদের দেশে করতে চাচ্ছে, সেটি ভারত তাদের নিজেদের দেশেই করতে পারেনি। ভারত পরীক্ষামূলকভাবে গুজরাট ও মধ্য প্রদেশের কয়েকটি রাজ্যে এটি শুরু করলেও তা স্থায়ী হয়নি। স্থানীয় লোকজনের আপত্তির মুখে সেটি বন্ধ করে দিতে তারা বাধ্য হন। শুধু তাই নয়, স্বয়ং ইন্ডিয়ান এটমিক কমিশনের চেয়ারম্যান এই ধরনের প্রকল্পকে অতি উচ্চাভিলাষী বলে মন্তব্য করেছেন। অর্থাৎ বলা যায় একটা এক্সপেরিমেন্টাল প্রজেক্টের জন্য আমরা সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকাকে বেছে নিয়েছি। এছাড়াও এই রিপোর্টে বহু অসঙ্গতি রয়েছে যার কিছু উদাহরণ ইতঃপূর্বে আমি দিয়েছি। ভারত যদি পরীক্ষামূলক ভাবে এই কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র আমাদের সুন্দর বনে করতে চায় তবে তা তারা তাদের সুন্দরবনের অংশে করে না কেন?
বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হচ্ছে রামপালের স্থাপিত হতে যাওয়া বিদ্যুৎকেন্দ্র। অন্য দিকে সদ্য শেষ হওয়া রামপাল লংমার্চ থেকে সমমনা বাম রাজনৈতিক দলগুলো তা প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়েছে তেল-গ্যাস-খনিজসম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি এবং বিরোধী দল বিএনপি। সুন্দরবন বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল যা বাংলাদেশের প্রাকৃতিক রক্ষা দেয়াল। সুন্দরবনের আয়তন ১০ হাজার বর্গ কিলোমিটারের বেশি। এ-বনভূমির দুই-তৃতীয়াংশ বাংলাদেশে, বাকিটুকু ভারতে। বাংলাদেশ অংশে মানুষের আগ্রাসনে সুন্দরবন ক্রমাগত সংকুচিত হলেও শত শত বছর ধরে বাংলাদেশসহ এ অঞ্চলের মানুষ, প্রাণী এবং প্রকৃতিকে ঘূর্ণিঝড়সহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে মায়ের মতো রক্ষা করছে। জীববৈচিত্র্যের এক বিপুল সম্ভার সুন্দরবন ৪৫৩টি প্রজাতির প্রাণীসহ নানা বিপন্ন প্রাণীর আবাসস্থল এবং একইসাথে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে সুন্দরবনকে সুরক্ষা প্রদানকারী রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা একসময় ৪০০-৪৫০টি হলেও চোরাকারবারিদের মাধ্যমে বর্তমানে তা ১০০-এর কাছাকাছি সংখ্যায় দাঁড়িয়েছে। উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক গুরুত্ব বিবেচনায় সুন্দরবনের অংশ বিশেষকে ১৯৯২ সালের ২১ মে ‘রামসার এলাকা’ ঘোষণা করা হয়। তা ছাড়া ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ এলাকা হিসেবে সুন্দরবনের বেশ কিছুটা অংশ ইউনেস্কো’র স্বীকৃতিপ্রাপ্ত।
সুন্দরবন রক্ষায় ভারত ও বাংলাদেশ সরকারও যৌথ উদ্যোগে ২০১২-এর ২৯ জানুয়ারি বাংলাদেশ ও ভারত এক সমঝেতা স্মারক স্বাক্ষর করে। অথচ চুক্তির বিপরীতমুখী অবস্থান নিয়ে বিতর্কিত, একপেশে, অস্বচ্ছ এবং ত্রুটিপূর্ণ পরিবেশগত সমীক্ষার ভিত্তিতে সুন্দরবনের কাছে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র করার সব উদ্যোগ সম্পন্ন।
সুন্দরবন-সংলগ্ন ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ১৬০ কোটি ডলারের কাজ পায়। অথচ ২০১৫ এর ১৩ মার্চ ভারতের ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইব্যুনাল তথ্য বিকৃতি ও জালিয়াতি এবং প্রতারণার দায়ে কর্নাটক রাজ্যে এনটিপিসি’র প্রস্তাবিত একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিবেশ ছাড়পত্র স্থগিত করে দেয়। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কিভাবে কাজ করে, খুব সহজে যদি মূল বিষয়টা দেখি তা অনেকটা এইরকমÑ কয়লা বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রথমে পাউডারে বিচূর্ণ করা হয় চক্রের কনভেয়র যা পরবর্তীতে বয়লারে যাওয়ার আগে পালভারাইজড হয়। পিসিসি (চঈঈ= চঁষাবৎরুবফ ঈড়ধষ ঈড়সনঁংঃরড়হ) সিস্টেমের কম্বাশন চেম্বার হয়ে বয়লারে উচ্চতাপে পুড়ানো হয়। এইখানে চিনমি (ঝঃধপশ) হয়ে কয়লা পোড়া ধোঁয়া বের হবে আর ভস্মীভূত ছাই নিজ দিয়ে নির্গত হয়। অন্যদিকে পানি থেকে রূপান্তরিত বাষ্প টার্বাইনে উচ্চ চাপে প্রবেশ করে যেখানে হাজার প্রোপেলারকে সে হাইস্পিডে ঘুরাতে থাকে যা বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। এই বাষ্প টার্বাইন থেকে আবার কনডেনসারে কন্ডেন্সড হয়ে পুনরায় বয়লারে যায় আরেকবার ব্যবহৃত হতে। এই সহজ চক্রে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো তার উৎপাদন চক্র শেষ করে। এইখানে পরিবেশ দূষণের উপাদান নির্গত হয় চিমনি দিয়ে, নির্গত পানির সাথে এবং ভস্মীভূত ছাই হিসেবে। এইখানে উল্লেখ্য পানি বিশুদ্ধিকরণের জন্য ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট বসানো হলেও আমার জানামতে দুনিয়াজুড়ে চিমনি দিয়ে নির্গত বিষাক্ত ধোঁয়ার কোন প্রকার ট্রিটমেন্ট করা হয় না।
২০১৬’র ফেব্রুয়ারিতেই বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ চুক্তি হওয়ার কথা থাকলেও সুন্দরবনের ওপর ধ্বংসাত্মক প্রভাব বিবেচনা করে ইতোমধ্যে রামসার কর্তৃপক্ষ, ইউনেস্কো এবং আইইউসিএন ২০১২ সাল থেকে সরকারের কাছে তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। উদ্বেগ আমলে তো নেয়া হয়ই-নি, এমনকি রামসার কনভেনশন সচিবালয় এবং ইউনেস্কো একাধিকবার সরকারের কাছে ইআইএ প্রতিবেদন চাইলেও সরকার তা দিতে অপারগতা জানায়। এ প্রেক্ষিতে গত ২২ মার্চ ২০১৬ ইউনেস্কো কার্যালয় থেকে একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে এসে সুন্দরবন এলাকা পরিদর্শন করেছেন।

সুন্দরবন ও পরিবেশ সংক্রান্ত জরিপ রিপোর্টটি প্রতারণামূলক:
সিইজিআইএস এর ইআইএ রিপোর্টটার মধ্যে যে বিভিন্ন কারিগরি বিষয়গুলি থাকা উচিত সে জিনিসগুলি সম্পূর্ণ ত্রুটিপূর্ণ ছিল। আমি একটা উদাহরণ দিচ্ছি, ইআইএ রিপোর্টটিতে বলা হয়েছে যে পার্শ্ববর্তী যে পশুর নদীতে জাহাজগুলি ল্যান্ড করবে বা ছোট ছোট কার্গো যেগুলো কয়লা নিয়ে আসবে বড় জাহাজ থেকে, এগুলি যেখানে অবস্থান করবে সেই পুরো এলাকাটি হচ্ছে ডলফিনের জন্য একটি অভয়াশ্রম বা ব্রিডিং গ্রাউন্ড। এই ডলফিনগুলি বিশেষ ধরনের ডলফিন যারা মিষ্টি এবং লবণ পানির সংযোগস্থলে অবস্থান করে। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে তারা এই অভয়াশ্রমের কথা উল্লেখ করে সতর্কতার কথা বলেছেন কিন্তু এ ধরনের অভয়াশ্রম সংরক্ষণের জন্য কি ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হবে সে ব্যাপারে কোন দিকনির্দেশনা দেননি। এই রিপোর্টের বহু জায়গায়, বহুক্ষেত্রে যেমন সুন্দরবনের ক্ষেত্রে কী ধরনের ক্ষতি হবে এই ব্যাপারে চতুরতার সাথে একটা বক্তব্য প্রদান করা হয়েছে।
বক্তব্যটি অনেকটা এরকম, যেহেতু কোস্টাল বেল্ট এবং এই অঞ্চলটি ঝড়-ঝঞ্ঝা, ঘূর্ণিঝড় এবং সর্বোপরি একটি দুর্যোগপূর্ণ এলাকা সে কারণে এই প্রকল্পে কয়লা পোড়ানোর ফলে যে বায়ুদূষণসহ অন্যান্য দূষণ হবে তা সুন্দরবনের দিকে না গিয়ে মূল ভূখন্ডের দিকে চলে আসবে বা প্রশমন হয়ে যাবে। যার ফলে সুন্দরবনের কোন ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা নেই বলে তারা মন্তব্য করেছেন। এটা যেকোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ হাস্যকর বলে মনে করবে। তাহলে সাইক্লোন বা ক্লাইমেট চেঞ্জের যে ব্যাপারগুলি সেগুলি তো পরিবেশ দূষণের জন্যই ঘটছে, পক্ষান্তরে আমরা বলছি এটি একটি ঘূর্ণিঝড় ও দুর্যোগপূর্ণ এলাকা, তাহলে আমরা কি কামনা করি যে ঘনঘন ঘূর্ণিঝড় হবে শুধুমাত্র এই কয়লা বিদ্যুৎ উৎপাদনের কারণে যেসকল দূষণ হবে সেগুলিকে শুধুমাত্র প্রশমন করার জন্য? যেকোনো একটি ইআইএ রিপোর্ট করতে গেলে তার একটা বেজ লাইন সার্ভে প্রয়োজন হয়, পূর্বে কি ছিল, পরবর্তী পাঁচ বা দশ বছর পর কী হবে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেখানকার ভূমি এবং পারিপার্শ্বিক যে বিষয়গুলি উল্লেখ করা প্রয়োজন তার কিছুই এই রিপোর্টে করা হয়নি।
তারা শুধুমাত্র একটি জিনিস করেছে আর তা হচ্ছে প্রকল্পের জন্য দু’টি সম্ভাব্য স্থানের তুলনা, যার একটি লবণছড়া এবং আরেকটি রামপাল। লবণছড়ার চাইতে রামপালকে প্রকল্পের জন্য বেশি উপযোগী দেখানো হয়েছে কেননা লবণছড়ার আশপাশে আবাসন, শিল্পায়ন, নগরায়ন আছে কিন্তু পক্ষান্তরে রামপালে তা কম। কিন্তু তারা এটি পুরোপুরি এড়িয়ে গেছেন যে এটি একটি জলাভূমি অঞ্চল যেখানে মানুষ মাছ চাষ করে, ধান, শাক সবজিসহ চাষ করে, সর্বোপরি পুরো এলাকাটি কৃষিজমি। যেখানে জনসংখ্যার চাপে কৃষিজমি এমনিতেই কমে যাচ্ছে সেখানে ১৮০০ একরের বেশি কৃষিজমি তারা অধিগ্রহণ করেছেন এবং ভবিষ্যতে তাদের আরও জমি অধিগ্রহণের পরিকল্পনা আছে কয়লা নিয়ে এসে রাখার জন্য এবং প্রকল্প সংশ্লিষ্ট অন্যান্য স্থাপনার জন্য। কিন্তু দুঃখজনক বিষয়টি হচ্ছে এর ফলে ভূ-প্রাকৃতিক যে পরিবর্তন হবে সেটি প্রশমনের ব্যাপারে কি পদক্ষেপ নেয়া হবে তার কোনো দিকনির্দেশনার উল্লেখ এই রিপোর্টে নেই।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় ২০১৫ এর ১২ ডিসেম্বর যে প্যারিস চুক্তিতে বিশ্ববাসী ঐকমত্য হয়, ২০৩০ সাল পর্যন্ত ব্যাপকভিত্তিক কার্বন নিঃসরণ হ্রাসে বিশ্বের প্রধান চারটি কার্বন নিঃসরণকারী দেশ যুক্তরাষ্ট্র, চীন, যুক্তরাজ্য, জাপান এবং ভারতসহ শিল্পোন্নত রাষ্ট্রগুলো সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার করে। অথচ সুন্দরবনের কাছে ভারত-বাংলাদেশ সরকার যৌথভাবে এবং ওরিয়ন গ্রুপ বেসরকারিভাবে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের মাধ্যমে শুধুমাত্র সুন্দরবনকেই ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে না, আখেরে কোটি কোটি মানুষের জীবন এবং জীবিকাকে হুমকির মুখে ফেলবে। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির অন্যতম শিকার বাংলাদেশ। বাংলাদেশকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে সুরক্ষা প্রদানকারী সুন্দরবনের অর্থনৈতিক এবং পরিবেশগত অবদানের মূল্য লাভ-ক্ষতির হিসাবে ধরা হয়নি। ১৭৯৭ থেকে শুরু করে ২০০৯ সালের আইলা পর্যন্ত সময়ে ৪৭৮টি মাঝারি ও বড় জলোচ্ছ্বাস এবং ঘূর্ণিঝড় তোমেন, গোর্কি, সিডর, নার্গিস বাংলাদেশের উপকূলকে ক্ষতবিক্ষত করেছে। ১৭৯৭ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত ১৭৩ বছরে ৩২৯টি প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনেছে এবং স্বাধীনতার পর ১৪৯টি ঝড় বা জলোচ্ছ্বাস হয়েছে।
সুন্দরবন না থাকলে জাতীয় অর্থনীতির জন্য কত ট্রিলিয়ন ডলারের ক্ষতির কারণ হতো এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগ তার হিসাব নীতিনির্ধারকরা করেনি অর্থাৎ তাগিদ অনুভব করতেও দেয়া হয়নি। পরিবেশ আইন ১৯৯৫ এর ধারা ৫-এর অধীনে সরকারি প্রজ্ঞাপনমূলে ১৯৯৯ সালে সুন্দরবন রিজার্ভ ফরেস্ট ও এর চতুর্দিকে ১০ কিলোমিটার এলাকাকে প্রতিবেশগত সঙ্কটাপন্ন বা ‘লাল চিহ্নিত এলাকা’ এলাকা ঘোষণা করায় পরিবেশ সংরক্ষণ আইন-১৯৯৭ এর ৭(৪) ধারা মতে সুন্দরবন এলাকায় কোন শিল্প স্থাপনে পূর্ণ পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা (ইআইএ) সাপেক্ষে পরিবেশ অধিদপ্তরের ‘লোকেশন ছাড়পত্র’ এবং ‘পরিবেশ ছাড়পত্র’ নেয়ার বাধ্যতা রয়েছে। কিন্তু পূর্ণ ইআইএ ছাড়াই পরিবেশ অধিদফতর ২০১১ এর ২৩ মে এ প্রকল্পকে শর্তসাপেক্ষে প্রাথমিক ছাড়পত্র দেয়া হয়। অথচ প্রস্তাবিত প্রকল্পের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে পরিবেশ অধিদপ্তর ২০১২-এ বলেছিল যে, ওই অধিদফতর সুন্দরবনের অতি গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্র্যের উপরে বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে এ বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।
উল্লেখ্য, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১১ তারিখে তৎকালীন প্রধান বন সংরক্ষক এক পত্রে উল্লেখ করেন যে, ‘সুন্দরবনের অভ্যন্তরে সমগ্র জীববৈচিত্র্য হুমকির সম্মুখীন হবে’। উল্লেখিত পত্রে প্রধান বন সংরক্ষক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি রামপালে স্থাপনের সিদ্ধান্ত পুনঃবিবেচনার আহবান জানান। অথচ সংরক্ষিত বনাঞ্চল হিসাবে সুন্দরবনের আইনগত অভিভাবক বন বিভাগের আপত্তিকে অগ্রাহ্য করে বিতর্কিত পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা বা ইআইএ’র ভিত্তিতে এগিয়ে চলছে সুন্দরবনকে হুমকির মুখে ফেলা রামপালের সরকারি-বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র। যে শর্তে প্রাথমিক ছাড়পত্র দিয়েছিলো পরিবেশ অধিদফতর সে শর্ত ভঙ্গ করা হলেও, পরিবেশ অধিদফতর কোনো আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।
পরিবেশ বিজ্ঞানীরা বলেছেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রের ছাই থেকে সালফার-ডাই-অক্সাইড ছড়ানোর কারণে বন্য-গাছপালা ধীরে ধীরে মারা যাবে। ইআইএ অনুযায়ী রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য বছরে ৪৭.২০ লক্ষ টন কয়লা সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে পরিবহনের ফলে সুন্দরবন ও এই বনের উদ্ভিদ ও প্রাণীর কী ক্ষতি হবে সমীক্ষায় বলা হয়নি। কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রে বছরে ৪৭ লক্ষ ২০ হাজার টন কয়লা পুড়িয়ে ৭ লক্ষ ৫০ হাজার টন ফ্লাই অ্যাশ ও ২ লক্ষ টন বটম অ্যাশ উৎপাদিত হবে। এই ফ্লাই অ্যাশ, বটম অ্যাশ, তরল ঘনীভূত ছাই ইত্যাদি ব্যাপক মাত্রায় পরিবেশ দূষণ করে কারণ এতে ক্ষতিকর সালফার এবং কার্বন ডাই অক্সাইডসহ বিভিন্ন ভারী ধাতু যেমন আর্সেনিক, পারদ, সীসা, নিকেল, ভ্যানাডিয়াম, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম, রেডিয়াম ইত্যাদি মিশে থাকে। বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের মালামাল ও যন্ত্রপাতি সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে নদীপথে পরিবহন করা হবে। এর ফলে বাড়তি নৌযান চলাচল, তেল নিঃসরণ, শব্দদূষণ, আলো, বর্জ্য নিঃসরণ ইত্যাদি পরিবেশ আইন অনুসারে নিয়ন্ত্রণ না করা গেলে সুন্দরবনের ইকো সিস্টেম বিশেষ করে রয়েল বেঙ্গল টাইগার, হরিণ, ডলফিন, ম্যানগ্রোভ বন ইত্যাদির ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে ।
বায়ুদূষণের ক্ষতিকারক উপাদানগুলো মেঘমালার মাধ্যমে ছড়াবে। রাতে জাহাজ চলাচল এবং মালামালা খালাসের ফলে সৃষ্ট শব্দ ও আলোর দূষণে সুন্দরবনে যে বিঘœ সৃষ্টি হবে তাও ইআইএ প্রতিবেদনে বিবেচনায় রাখা হয়নি। নাব্যতা হ্রাস পাওয়া পশুর নদীর সঙ্কট বাড়বে। কয়লা পরিবহনের সময় জাহাজডুবি হয়ে প্রতিবেশ এবং পানিদূষণ যে নিয়মিত ঘটবে তা সর্বশেষ শ্যালা নদীতে লঞ্চডুবিতে আবারো স্পষ্ট হয়েছে। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য একেকটি কার্গোতে ৮-১০ হাজার টন কয়লা পরিবহন করা হবে-যা ডুবলে দূষণের ঝুঁকি অনেক বেশি।
উল্লেখ্য, ভারতেরই ওয়াইল্ড লাইফ প্রটেকশন অ্যাক্ট ১৯৭২ অনুযায়ী, বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ১৫ কিমি ব্যাসার্ধের মধ্যে কোন বাঘ-হাতি সংরক্ষণ অঞ্চল, জীব বৈচিত্র্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বনাঞ্চল, জাতীয় উদ্যান, বন্য প্রাণীর অভয়ারণ্য কিংবা অন্য কোন ধরনের সংরক্ষিত বনাঞ্চল থাকা চলবে না। এ প্রেক্ষিতে ভারতের মধ্যপ্রদেশে জনবসতি সম্পন্ন এলাকায় কৃষিজমির ওপর এনটিপিসি’র কয়লাভিত্তিক প্রকল্প গ্রহণযোগ্য হতে পারে না বলে ভারতের কেন্দ্রীয় গ্রিন প্যানেল এনটিপিসি’র ১৩২০ মেগাওয়াটের একটি বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পের অনুমোদন দেয়নি। সুতরাং, সুন্দরবনের কাছে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষেত্রে তা যৌক্তিক হয় কিভাবে?

রামপালে প্রকল্প পরিচালনাসহ অন্যান্য কাজে পশুর নদী থেকে ঘণ্টায় ৯,১৫০ ঘনমিটার পানি সংগ্রহ করা হবে, যেটিকে নদীর মোট পানি প্রবাহের ১% এরও কম দেখানো হলেও তথ্যদাতাদের মতে, পানি প্রবাহের যে তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে তা ২০০৫ সালের। তথ্যদাতাদের মতে পরিশোধন করা হলেও পানির তাপমাত্রা, পানি নির্গমনের গতি, দ্রবীভূত নানা উপাদান পশুর নদী, সমগ্র সুন্দরবন তথা বঙ্গোপসাগরের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। ২০১০ সালে সরকার সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের আওতাধীন পশুর নদীকে অন্তর্ভুক্ত করে ৩৪০ হেক্টর, ৫৬০ হেক্টর ও ১৭০ হেক্টর নদী ও খালের জলাভূমি জলজ প্রাণী বিশেষত ‘বিরল প্রজাতির গাঙ্গেয় ডলফিন ও ইরাবতী ডলফিন’ সংরক্ষণের স্বার্থে ‘‘বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য” ঘোষণা করেছে।
বিদ্যুৎ প্রকল্পে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে আশ্বাস প্রদান করা হয়েছে। ১৩২০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ পর্যায়ে মাটি কাটা, মালামাল পরিবহন, নির্মাণ কাজের শ্রমিক ইত্যাদি ৪ হাজার অস্থায়ী কর্মসংস্থান এবং পরিচালনা পর্যায়ে দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিক মিলিয়ে সর্বোচ্চ ৬০০ মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হতে পারে। বরং উল্টো বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হলে মাটি পানি বাতাস দূষিত হয়ে সুন্দরবন ও তার চারপাশের নদী, খাল ও জলাভূমির ওপর নির্ভরশীল জেলে, কৃষক, বাওয়ালী, মউয়ালসহ কয়েক লক্ষ মানুষের জীবিকা হুমকির মুখে পড়বে। পাঁচ লক্ষ এর অধিক মানুষ জীবন-জীবিকা আর আর্থ-সামাজিক কর্মকান্ডের জন্য প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল। সুন্দরবন ধ্বংস হলে তাই তাদের আয়ের উৎস বন্ধ হয়ে যাবে। কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র নিঃসৃত কঠিন এবং তরল বর্জ্য বিষাক্ত আর্সেনিক, মার্কারি, ক্যাডমিয়াম এবং ক্রোমিয়াম বহন করে। এই বিষাক্ত উপাদানগুলো খাবার পানিকে দূষিত করে ফেলতে পারে এবং সুন্দরবনের আশপাশের এলাকায় বসবাসকারী লোকজনের গুরুত্বপূর্ণ মানব অঙ্গ ও স্নায়ুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এবং ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়াসহ বিভিন্ন পরজীবী বাহিত রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পেতে পারে। দেশীয় কয়লার অপর্যাপ্ততার কারণে এ প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ভারতীয় অংশের বিবেচনায় আমদানিকৃত কয়লার পরামর্শ এসেছে। এই সুযোগে ভারত থেকে নিম্ন মানের কয়লা আমদানি হতে পারে যা দূষণের মাত্রাকে আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
প্রকল্পের বিরোধিতাকারীদের বিরুদ্ধে মামলায় আসামি করাসহ বিভিন্ন প্রকার আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের হুমকি প্রদান ন্যায্য ক্ষতিপূরণ না পাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দারিদ্র্য বৃদ্ধি পেয়েছে ইতোমধ্যেই এবং ভূমি অধিগ্রহণের ফলে অধিক সংখ্যক মানুষের বাস্তুচ্যুতিও হয়েছে। এর পাশাপাশি সুন্দরবনের গাছকাটা, বনের জমি দখল, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ, বন্যপ্রাণী শিকার কিংবা বিষ দিয়ে মাছ মারার মতো ক্ষতিকর কর্মকান্ড সাধারণ জনগণ নয় ক্ষমতার সাথে সংশ্লিষ্ট জলদস্যু ও প্রভাবশালীরা জড়িত।
ভারতের সাথে নৌসহ সব ধরনের ট্রানজিট চুক্তির পর পরই শুধু কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়, সুন্দরবনকে ঘিরে বিভিন্ন কলকারখানা স্থাপনে দেশি বিদেশি কোম্পানি যেন হুমড়ি খেয়ে পড়েছে’। অথচ সুন্দরবন সুরক্ষায় ভারত সরকার কী করছে তা জানতে সে দেশের জাতীয় পরিবেশ আদালত স্বতঃপ্রণোদিত আদেশে বলেছে, “সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ নষ্ট হতে বসেছে। এই পরিস্থিতিতে ম্যানগ্রোভের বর্তমান চেহারা কেমন, নদী বা খাঁড়িতে দূষিত ডিজেল ব্যবহার হয় কি-না, সেখানে বেআইনি ইট-ভাটা চলছে কি-না, বন এলাকায় অবৈধ হোটেল রেস্তোরাঁ বন্ধ করা হয়েছে কি-না, ইত্যাদি বিষয়ে রাজ্যের অবস্থান জানানো হোক। একই সাথে আদালত সরকারের বক্তব্যের সমর্থনে অবশ্যই স্যাটেলাইট ছবি থাকতে হবে”। আমরা আশা করি, বাংলাদেশের উচ্চ আদালতও এ ধরনের স্বঃপ্রণোদিত উদ্যোগ নিয়ে প্রাকৃতিক সুরক্ষা প্রদানকারী সুন্দরবনকে রক্ষায়ও উদ্যোগী হবেন। জনপ্রতি মাত্র ৮ওয়াট বিদ্যুৎ যা একটি এনার্জি সেভিং বাল্ব জ্বালানোর জন্যও যথেষ্ট নয়, সেজন্য দেশের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যূহ সুন্দরবন ধ্বংস অর্থাৎ দেশের স্বার্থ বিসর্জন কখনোই মেনে নেয়া যায় না, যাবে না। সুন্দরবনকে বাঁচাতে গেলে রামপাল প্রজেক্ট করা যাবে না। কিন্তু যেহেতু আমাদের বিদ্যুতের প্রয়োজন সেক্ষেত্রে আমরা ছোট ছোট টাইডাল পাওয়ার প্ল্যান্ট করতে পারি। যেহেতু এই এলাকাটি একটি টাইডাল জোন, আমরা উপকূলীয় উপজেলাগুলিতে ১০০ থেকে ২০০ মেগাওয়াটের মত বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারি টাইডাল পাওয়ার প্ল্যান্ট এর মাধ্যমে। যদিও এই ধরনের পাওয়ার প্ল্যান্ট থেকে কিছু দূষণের আশঙ্কা থেকে যায় কিন্তু তার মাত্রা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় খুবই কম। পৃথিবীর অনেক দেশেই এখন জলবিদ্যুৎ প্রকল্প রয়েছে এবং এক্ষেত্রে আমরা এটাকে গ্রহণ করতে পারি। আর সরকার যদি কয়লা বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট করতেই চায় তবে সেটা অন্য কোনো জায়গায় করতে পারে। অবশ্যই সেক্ষেত্রেও পরিবেশগত দিকটি বিবেচনায় রাখতে হবে।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক

SHARE