রাশিয়া কি ক্রমেই শক্তিধর হয়ে উঠছে -সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা

১৯৯০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর মূলত বিশ্বপরাশক্তি এক কেন্দ্রে কেন্দ্রীভূত হয়। স্নায়ুযুদ্ধকালীন সময়ে বিশ্বের শক্তিচর্চায় একটা ভারসাম্য লক্ষ্য করা যেত। কিন্তু বিশ্বপরাশক্তির এক নক্ষত্রের কক্ষচ্যুতির পর সে ভারসাম্য অটুট থাকেনি। কারণ সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন বহুধা বিভক্তির কারণে রাশিয়া অতীত গৌরব ও পরাক্রম হারিয়ে বসে। একান্ত বাধ্য হয়েই রাশিয়া অনেকটাই নিভৃতে ও নেপথ্যে চলে যায়। আর নীরবেই চলতে থাকে হৃত গৌরব পুনরুদ্ধারের কসরত।
মনে করা হয়েছিল যে, স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর রাশিয়া আর স্বরূপে ফিরে আসতে পারবে না। কিন্তু সেই নিভৃতচারী রাশিয়া আবারো স্বমূর্তিতে আবির্ভূত হওয়ার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বের শক্তিমান রাষ্ট্রগুলোর সাথে আবারো ক্ষমতার দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছে নেপথ্যের এই পতিত পরাশক্তি। যা শক্তিমান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বেশ ভাবিয়ে তুলেছে। সম্প্রতি তুরস্কের সাথে সামরিক টানাপড়েন, রুশ জঙ্গিবিমানের তুরস্কের আকাশসীমা লঙ্ঘন, তুরস্ক কর্তৃক রুশবিমান গুলি করে ভূপাতিত করণ এবং রাশিয়ার তীব্র প্রতিক্রিয়ায় প্রমাণ হয় যে, রাশিয়া ইতোমধ্যেই তাদের খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে, যা বিশ্বপরিস্থিতিকে আবারো শীতল যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
রাশিয়ার স্বরূপে ফেরার ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি সিরিয়ার লাতাকিয়ায় নিজ বিমানঘাঁটিতে সম্পূর্ণ নতুন ও সর্বাধুনিক সামরিক বিমানবহর সু-৩৫ ফ্লাঙ্কারই পাঠিয়েছে। এর আগে গত ৬ ফেব্রুয়ারি সু-৩৪ ফুলব্যাক রুশ বোমারু বিমানের বিরুদ্ধে আকাশসীমা লঙ্ঘনের অভিযোগ করে তুরস্ক। রাশিয়ার বিরুদ্ধে এটি ছিল দেশটির নতুন দফা আকাশসীমা লঙ্ঘনের অভিযোগের ঘটনা। তুর্কি আকাশসীমা লঙ্ঘনের সাম্প্রতিকতম ওই অভিযোগ ওঠার প্রেক্ষাপটে লাতাকিয়া বিমানঘাঁটিতে রাশিয়ার পক্ষে সর্বাধুনিক ওই সামরিক বিমান পাঠানোর ঘটনা ঘটল। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এসবের মাধ্যমেই তুরস্ক ও ন্যাটোর কাছে এ কড়া বার্তাই রাশিয়া পাঠাতে চায় যে, তারা এখন আত্মরক্ষামূলক নয় বরং আক্রমণাত্মক নীতির অনুসারী। গত নভেম্বরে রুশ যুদ্ধবিমান সু-২৪-এর বিরুদ্ধে ২০ সেকেন্ড আকাশসীমা লঙ্ঘনের প্রথম অভিযোগ তুলে তা গুলি করে ভূপাতিত করেছিল তুরস্ক। এতেই উভয় দেশের মধ্যে সম্পর্কের মারাত্মক অবনতি ঘটে।
মূলত সে ঘটনার পর থেকে আঙ্কারার সঙ্গে মস্কোর সম্পর্কের বরফ জমাট বাঁধতে শুরু করে। ওই বরফ এখনো গলানো সম্ভব হয়নি। যদিও ভিনদেশের যুদ্ধবিমানের আকাশসীমা লঙ্ঘন বা সতর্কতা উপেক্ষা করার ঘটনায় দোষী বিমান ভূপাতিত করার আইনসম্মত অধিকার তুরস্কের রয়েছে, তবু স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে রুশ বিমানকে গুলি করে আঙ্কারা খুবই আগ্রাসী অবস্থান নিয়েছে। এ পদক্ষেপ রুশ প্রেসিডেন্ট ভদিমির পুতিনকে দ্বিগুণ জোরালো জবাব দিতে দৃশ্যত উৎসাহিত করেছে। ফলে এই দুঃখজনক ঘটনাকে কেন্দ্র করে উভয় দেশের মধ্যে একটা সামরিক সংঘাতও তৈরি হওয়ার প্রেক্ষাপটও তৈরি হয়েছিল।
বহির্বিশ্বে নিজ শক্তিমত্তা ও সামরিক সামর্থ্যরে জানান দেয়ার চেয়েও যেটা প্রেসিডেন্ট পুতিনের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ তা হলো রুশ জনগণকে নিজেদের নিরাপত্তার ব্যাপারে আশ্বস্ত করা। সেটি মাথায় রেখে সিরিয়া অভিযানে অংশগ্রহণকারী রুশ বিমানের নিরাপত্তায় সেখানে এরই মধ্যে অত্যাধুনিক এস-৪০০ বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মোতায়েন করেছে রাশিয়া। আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র সজ্জিত যুদ্ধবিমানগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে তুর্কি সীমান্ত ঘেঁষে আত্মরক্ষামূলক মহড়া চালাতেও। ফলে উভয় দেশের মধ্যে একটা অনাকাক্সিক্ষত উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়।
এদিকে বারবার তুরস্কের আকাশসীমায় বিমান ঢুকিয়ে রাশিয়া আঙ্কারাকে এ বার্তা পাঠাতে চায়, মস্কো কোনো কিছু পরোয়া করে না এবং সিরিয়া ও এর বাইরে ক্রমাগত নিজ আধিপত্য বৃদ্ধির ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে দেশটি আগ্রহী। একদিকে আকাশসীমা লঙ্ঘন, অন্য দিকে ব্যাপক প্রাণঘাতী হামলায় সক্ষম যুদ্ধবিমান সিরিয়ায় পাঠিয়ে ওই বার্তাকেই আরও জোরালো ভিত্তি দিয়েছে রাশিয়া।
তারা ইঙ্গিত দিয়েছে, তুরস্ক যদি আবার বিমান ভূপাতিত করার মত দুঃসাহস দেখায়, তবে এই বিমানগুলো দিয়ে তাকে সমুচিত জবাব দেয়া হবে। লাতাকিয়ায় মোতায়েন সু-৩৫ রুশ সামরিক বিমানকে ইউরোপের সাম্প্রতিক সময়ের সর্বাধুনিক যুদ্ধবিমান টাইফুন ও রাফায়েলের মতোই কর্মক্ষমতাসম্পন্ন বলে মনে করা হয়। সিরিয়া অভিযানে অংশগ্রহণ করছে এই উভয় বিমানই। তাই রাশিয়ার সু-৩৫-এর যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারে কেবল মার্কিন এফ-২২ মোটর স্টিলথ জঙ্গিবিমান। এ অবস্থায় ন্যাটো ও তুরস্ককে চাপে রাখার মোক্ষম অস্ত্রও হতে পারে এই বিমান। ক্রেমলিন তার সার্থক ব্যবহার করছে বলেই মনে করছেন আন্তর্জাতিক বোদ্ধামহল।
রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ দিক থেকে এমন পদক্ষেপের উদ্দেশ্য সম্ভবত সম্ভাব্য তুর্কি আগ্রাসনের বিপরীতে প্রতিরক্ষামূলক শক্তির প্রদর্শন। তবে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে, এর মধ্য দিয়ে আকাশসীমায় তুরস্কের কাছ থেকে রাশিয়া ফের সমীহ আদায়ে বদ্ধপরিকর বলেই মনে হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উত্তর আটলান্টিকের সামরিক জোট ন্যাটো, বিশেষত উত্তর ইউরোপের দেশ ও তুরস্কের আকাশসীমা কিছুক্ষণের জন্য লঙ্ঘনের ঘটনা রাশিয়ার চাপ সৃষ্টির একটি কৌশলে পরিণত হয়েছে।
জুয়া খেলার মত বড় ধরনের ঝুঁকি নিয়মিত নিচ্ছে রাশিয়া। এর কারণ, দেশটি ভালোভাবেই অবগত আছে ন্যাটো দেশগুলো রুশবিমান ভূপাতিত করে মারাত্মক উত্তেজনা সৃষ্টির ঝুঁকি নেবে না। নভেম্বরে রাশিয়ার যে বিমানটি তুরস্ক ভূপাতিত করেছিল, গত ৬ ফেব্রুয়ারি তুর্কি আকাশসীমা লঙ্ঘনকারী বিমান সু-৩৪ সেটার চেয়েও সর্বাধুনিক। আবার এই আকাশসীমা লঙ্ঘনের ঘটনার পরপরই লাতাকিয়ায় চারটি সু-৩৫ সামরিক বিমান মোতায়েন করল রাশিয়া।
বিশ্বের প্রতিরক্ষা ও সামরিক ভারসাম্যসহ রাশিয়ার সাম্প্রতিক সামরিক ব্যয় বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে বিশ্বপরাশক্তিগুলোর সেনা ও সামরিক সক্ষমতা নিয়ে গবেষণাকারী একটি থিংক ট্যাংক এক বার্ষিক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, সামরিক প্রযুক্তিতে পশ্চিমাদের শ্রেষ্ঠত্ব চীন ও রাশিয়ার নিকট খর্ব হচ্ছে। লন্ডনভিত্তিক থিংক ট্যাংক ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (আইআইএসএস) প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রবহির্ভূত বিভিন্ন গ্রুপ সামরিক প্রযুক্তি ক্ষেত্রে সহজে প্রবেশাধিকার পাওয়ায় বিশ্ব ‘জটিল সামরিক ভারসাম্য’ সঙ্কটের সম্মুখীন। রিপোর্টে আরো বলা হয়, রাশিয়া ও চীন তাদের সামরিক বাহিনীকে সর্বাধুনিক রূপে গড়ে তোলার জন্য প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছে। সামরিক প্রযুক্তিতেও দেশ দু’টির ব্যাপক অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। যা প্রতিপক্ষদের বেশ ভাবিয়ে তোলার মতো।
আইআইএসএসের প্রধান নির্বাহী জন চিপম্যান এএফপিকে বলেছেন, ‘আমরা আগে মনে করতাম নতুন নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবনে পশ্চিমারা সেরা এবং প্রতিদ্বন্দ¦ী দেশগুলোর চেয়ে তারা অনেক এগিয়ে। কিন্তু বর্তমানে প্রযুক্তিগত অগ্রগামিতার ব্যবধান অত্যন্ত সূক্ষ্ম। চিপম্যান বলেন, ২১ শতকে সামরিক সক্ষমতা বলতে শুধুমাত্র বিমান, ট্যাংক এবং জাহাজকে বোঝায় না বরং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা যেমন-সাইবার নিরাপত্তা, সাইবার অস্ত্র এবং ড্রোনকে বোঝায়।
আইআইএসএস জানিয়েছে, ১৯৮৯ সালে বার্লিন প্রাচীরের পতনের পর থেকে এখন পর্যন্ত ইউরোপের প্রতিরক্ষা বাজেট অত্যন্ত কম। প্রতিরক্ষা ব্যয়ে শীর্ষ ৫ দেশের মধ্যে যথারীতি সবার ওপরে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির বার্ষিক প্রতিরক্ষাব্যয় ৫৯৭৫ বিলিয়ন ডলার। এরপর রয়েছে যথাক্রমে চীন (১৪৫৮বি), সৌদি আরব (৮১৯ বি), রাশিয়া (৬৫৬ বি) ও ব্রিটেন (৫৬২ বি)। লক্ষণীয় হলো, যুক্তরাষ্ট্র প্রতিরক্ষা ব্যয়ে শীর্ষস্থানীয় হলেও ২০১০ সালের তুলনায় ২০১৫ সালে প্রায় ২০ শতাংশ ব্যয় হ্রাস করেছে। অন্য দিকে, রাশিয়া তার প্রতিরক্ষাব্যয় বৃদ্ধি করেছে দ্বিগুণেরও বেশি।
মূলত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোও সামরিক সক্ষমতায় এগিয়ে যাচ্ছে। মার্কিন সহায়তায় সৌদির প্রতিরক্ষা খাত ক্রমেই শক্তিধর হয়ে উঠছে। আর সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি একটি চলমান প্রক্রিয়া। ক্রমেই তারা প্রতিরক্ষা খাতকে সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী করে গড়ে তুলছে। অন্য দিকে আন্তর্জাতিক অবরোধ প্রত্যাহার হওয়ায় ইরানও তাদের প্রতিরক্ষা খাত যুগোপযোগী করে তোলার জন্য কাজ শুরু করেছে। ধারণা করা হচ্ছে একটা যৌক্তিক সময়ের মধ্যে ইরানও তাদের প্রতিরক্ষা খাত সমৃদ্ধশালী করে তুলতে সক্ষম হবে।
রাশিয়া যে ক্রমেই পূর্বের অবস্থানে ফিরে আসার চেষ্টা করছে তার প্রমাণ মেলে দেশটি গত নভেম্বর থেকে কয়েক ধাপে ইউক্রেন, মিসর ও তুরস্কের সাথে বিমান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। ফলে দেশটির বিমান সংস্থার ক্ষতি হয়েছে ৬০০ কোটি টাকার বেশি। রাশিয়ার বিখ্যাত বিমানবন্দর দোমোদেদোভোর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা দেনিস নুজদিন জানান, নভেম্বর থেকে রুশ সরকার নানা কারণে ইউক্রেন, মিসর ও তুরস্কের সাথে বিমান চলাচলের ওপর কয়েক পর্যায়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। বিশেষ করে তুরস্ক কর্তৃক রুশ জঙ্গিবিমান ভূপাতিত করার পর এ নিষেধাজ্ঞা আরো প্রকট হয়।
গত নভেম্বরে মিসর একটি রুশ যাত্রীবাহী বিমানে বোমা হামলা চালালে ২২৪ জন নিহত হয়। এর জেরে দেশটির সাথে সব ধরনের বিমান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে রুশ সরকার। তুরস্ক জঙ্গিবিমান ভূপাতিত করার পর গত ডিসেম্বরে দেশটিতে পর্যটকদের বিশেষ বিমানে ভ্রমণ বন্ধ করা হয়, এ ছাড়া অক্টোবরে ইউক্রেনের সাথে সব ধরনের বিমান চলাচল বন্ধ করে দেয়ায় বিমান সংস্থাগুলোর ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সম্প্রতি সিরিযায় প্রায় ৫ বছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে যুদ্ধবিরতির জন্য একটি চুক্তির বিষয়ে সম্মত হয়েছে বিশ্বের বৃহৎ শক্তিধর দেশগুলো। বিবিসি বলছে, জার্মানির মিউনিখে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যেই এই চুক্তি হবে বলে সমঝোতায় পৌঁছে বৃহৎ শক্তির দেশগুলো। বৈঠকের পর সাংবাদিক সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি বলেন, সিরিয়ায় অবরুদ্ধ অঞ্চলগুলোতে জরুরি ত্রাণ পৌঁছানোর ব্যাপারেও একমত হয়েছেন তারা।
সাংবাদিক সম্মেলনে কেরির পাশে ছিলেন রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ এবং জাতিসংঘের সিরিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত। তবে এই যুদ্ধবিরতি জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস) ও আল-কায়েদার সঙ্গে সম্পর্কিত নুসরা ফ্রন্টের ক্ষেত্রে কার্যকর হবে না বলে জানিয়েছেন কেরি। তিনি আরো বলেন, যুদ্ধবিরতির উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে সবগুলো পক্ষ একে কতটুকু সম্মান জানায় তার ওপর। রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ল্যাভরভ বলেন, আশাবাদী হওয়ার কারণ রয়েছে। কেননা আজ আমরা একটি বড় কাজ করেছি। যদিও সিরিয়া শান্তি আলোচনার প্রাক্কালে যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়ায় অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি চাইলেও রাশিয়া ১ মার্চ থেকে যুদ্ধবিরতি শুরুর প্রস্তাব দিয়েছিল।
মস্কো এ প্রস্তাব দিয়ে নিজেদের এবং সিরিয়া সরকারের জন্য বিদ্রোহীদেরকে নির্মূল করার লক্ষ্যে তিন মাস সময় নেয়ার চেষ্টা চালিয়েছে বলেই মনে করে যুক্তরাষ্ট্র। কেরির বক্তব্যেও তারই আভাস পাওয়া গেছে। এ কারণেই সাংবাদিক সম্মেলনেও কেরি বলেন, সন্ত্রাসীদের পরিবর্তে পশ্চিমাদের দৃষ্টিতে উদার বিদ্রোহীদের লক্ষ্য করে রুশ বিমান হামলা চালাচ্ছে। বৈঠকের পর যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফিলিপ হ্যামন্ড বলেন, এই যুদ্ধবিরতি তখনই কার্যকর হবে যদি রাশিয়া তার হামলা বন্ধ করে। অবশ্য রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়ে দিয়েছেন, বিমান হামলা চলবে। ফলে এ ক্ষেত্রেও রাশিয়ার আগ্রাসী মনোভাবের পরিচয় পাওয়া যায়।
সিরিয়ায় যুদ্ধবিরতির ব্যাপারে বিশ্বের বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে এমন সময় সমঝোতা হলো যখন রুশবিমান বাহিনীর হামলার সহায়তায় সিরীয় সরকারি বাহিনী দেশটিতে বিদ্রোহীদের দখলে থাকা অঞ্চলে একের পর এক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করছে। সরকারি বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশ আলেপ্পোর দিকেও এগিয়ে যাচ্ছে। আলেপ্পো এখনো বিদ্রোহীপক্ষের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সিরিয়ার আলেপ্পোয় তীব্র লড়াইয়ের মুখে উদ্বাস্তু হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ। সেখানে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সেনাদের অভিযানে সহায়তা করছে রাশিয়ার বিমানবাহিনী।
৫ বছর আগে সিরিয়ার সংঘাত শুরু হয়। প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদকে উৎখাত করতে আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিমা দেশগুলো অনেক চেষ্টা করেছে। কিন্তু সিরিয়ার যুদ্ধে প্রেসিডেন্ট বাশারের পক্ষে রাশিয়া সম্পৃক্ত হবার পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে থাকে। রাশিয়া বলছে জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট বা আইএসকে লক্ষ্য করে তাদের বিমান হামলা চালানো হচ্ছে। কিন্তু পশ্চিমা দেশগুলো অভিযোগ করে প্রেসিডেন্ট আসাদ বিরোধীদের লক্ষ্য করে রাশিয়া বিমান হামলা চালাচ্ছে। গত সাড়ে চার বছরের যুদ্ধে সিরিয়ায় ৬৫ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। জাতিসংঘের হিসাবে এখন পর্যন্ত এই যুদ্ধ আড়াই লাখ মানুষ মারা গেছে। সিরিয়া থেকে হাজার হাজার শরণার্থীর স্রোত ইউরোপের দিকে গেছে। এতদিন পর যুদ্ধবিরতির বিষয়ে বৃহৎ শক্তিগুলো যে একমত হয়েছে সেটি কতটা কার্যকর হবে তা এখন দেখার বিষয়।
ঘটনার ধারাবাহিকতায় মনে হয় রাশিয়া সামরিক শক্তিতে অনেকটাই উচ্চাভিলাষী হয়ে উঠেছে। তারা পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকেও কোনোভাবেই পরোয়া করছে না। তুরস্ক কর্তৃক বিমান ভূপাতিত করার পর রাশিয়া যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে তাতে তারা এখন প্রতিরক্ষায় রক্ষণাত্মক কৌশল বাদ দিয়ে অনেকটাই আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছে। এসব ঘটনার মাধ্যমে রাশিয়া বিশ্ববাসীকে জানান দিতে চাইছে যে, তারা এখনো ফুরিয়ে যায়নি বরং স্বমহিমায় আবির্ভূত হয়ে নতুন পরাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পুরোপুরি সক্ষম।
তবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক মহল দাবি করছে যে, রাশিয়া শক্তির মহড়া প্রদর্শন করলেও বাস্তবতা কিন্তু সম্পূর্ণ আলাদা। মূলত তুরস্ক কর্তৃক বিমান ভূপাতিত করার ঘটনার পর রাশিয়া অনেকটা আত্মশ্লাঘায় ভুগছে। আর সে হতাশা থেকেই নিজের শক্তি ও পরাক্রম জানান দিয়ে তুরস্কসহ সামরিক প্রতিপক্ষকে চাপে রাখতেই শক্তি প্রদর্শনের মহড়া দিচ্ছে, যা বাস্তবসম্মত নয় বলেই মনে করছেন বোদ্ধামহল।

লেখক : বিশিষ্ট সাংবাদিক

SHARE

Leave a Reply