রাষ্ট্রের ব্যর্থতা ও জনমনে ভাবান্তর । সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা

রাষ্ট্রের ব্যর্থতা ও জনমনে ভাবান্তর । সৈয়দ মাসুদ মোস্তফাসভ্যতার ক্রমবিকাশের সাথে সাথে মানুষের চিন্তা-চেতনা, আবেগ-অনুভূতি, বোধ-বিশ্বাসেও নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। সভ্যতাকে অধিকতর সুশৃঙ্খল ও পরিশীলিত করতেই মানুষের মধ্যে রাষ্ট্রচিন্তার উন্মেষ ঘটে। যুক্ত হয় এক নতুন মাত্রা। বিজ্ঞান, দর্শন, ধর্ম, নীতিশাস্ত্র, অর্থনীতি; এমনকি সাহিত্যেও এর প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। সে ধারাবাহিকতায় আধুনিক রাষ্ট্রের পথচলা। উদ্দেশ্য গণমানুষের অধিকার নিশ্চিতকরণ ও সভ্যতাকে গতিশীল এবং পরিশীলিত রূপ দান করা। অধ্যাপক গ্যাটেলের ভাষায়, ‘Political thought represents a high type of intellectual achievement.’ অর্থাৎ ‘রাষ্ট্রচিন্তা কোন যুগের উন্নত বুদ্ধিমত্তা ও দার্শনিক চিন্তাসূত্রের প্রতিফলন ঘটায়।’
সময়ের প্রয়োজনেই রাষ্ট্রচিন্তায় গতিশীলতা এসেছে। যুক্ত হয়েছে নানাবিধ অনুষঙ্গও। গ্রিক রাষ্ট্রের অস্থিতিশীলতা ও যুদ্ধাবস্থাসহ নানাবিধ প্রতিকূলতা এবং বৈরি পরিস্থিতি অবসানের জন্য প্লেটো তার বিখ্যাত ‘The Republic’ গ্রন্থে একটি আদর্শ রাষ্ট্রের বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি আদর্শ রাষ্ট্রের বর্ণনা দিতে গিয়ে তারই গুরু মহাজ্ঞানী দার্শনিক সক্রেটিসের মূলনীতি ‘Virtue of Knowledge’ এবং ‘যা আদর্শ তাই বাস্তব’ প্রভৃতি নীতি দ্বারা যথেষ্ট প্রভাবিত হয়েছেন। প্লেটো তার ‘The Republic’ গ্রন্থে যে আদর্শ রাষ্ট্রের বর্ণনা দিয়েছেন তার মূল উদ্দেশ্য হলো সুন্দর, সাবলীল বা শান্তিপূর্ণ জীবনযাপন। এ কথা অস্বীকার করা যাবে না যে, গণমানুষের কল্যাণ ও মানুষের অধিকার পুরোপুরি নিশ্চিত করতেই রাষ্ট্রচিন্তার ব্যুৎপত্তি। আর নাগরিকরা রাষ্ট্রের সে কল্যাণ ও সেবা প্রাপ্তির অনুকূলেই রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে এবং রাষ্ট্রকে কর দেয়। আর এভাবেই রাষ্ট্রের সাথে সাধারণ মানুষ বা নাগরিকদের সেতুবন্ধ রচিত হয়।
বস্তুত, রাষ্ট্র একটি তত্ত্বগত ধারণা মাত্র। কারণ, রাষ্ট্রকে কল্পনা করতে হয়। সরকার কিন্তু রাষ্ট্রের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য (concrete) রূপ। রাষ্ট্রের ইচ্ছা সরকারের মাধ্যমেই প্রকাশিত এবং কার্যকর হয়। তাই সরকার ও রাষ্ট্র সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘The word Ôgovernment’, judged by its philological derivation, apparently has a close affinity to the rudder or steering of a ship’.
মূলত ‘হাল’ ব্যতীত যেমন নাবিকের পক্ষে জাহাজ চালানো সম্ভব হয় না, ঠিক তেমনিভাবে সরকার না থাকলে জনজীবন বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ে এবং সুষ্ঠুভাবে কোন কাজই তাদের দ্বারা সম্ভব হয় না। রাষ্ট্রও সফল ও সার্থক হয়ে ওঠে না।
রাষ্ট্র ও সরকার একে অপরের শুধু পরিপূরকই নয় বরং অবিচ্ছেদ্য অংশ। রাষ্ট্র, সরকার ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এসব সূত্র ধরেই মানব সভ্যতার ক্রমবিকাশ ঘটেছে এবং সে ধারাবাহিকতা এখনো অব্যাহত আছে এবং আগামী দিনেও থাকবে। তবে এ ক্ষেত্রে ব্যত্যয়টা বোধ হয় আমাদের পিছু ছাড়ছে না। জাতি হিসেবে কেন জানি আমরা পশ্চাৎমুখী হয়ে পড়েছি। সকল ক্ষেত্রেই যেন হ-য-ব-র-ল অবস্থা। জাতীয় সম্পদ রক্ষা রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলেও সে দায়িত্ব পালনেও আমরা সফলতা দেখাতে পারিনি। দেশে শুধু সম্পদের অপচয় ও লুটপাটই হচ্ছে না বরং বিদেশে অর্থপাচার হচ্ছে প্রতিনিয়ত। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি’ (জিএফআই) বলছে, গত এক বছরে প্রায় ৭৩ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পাচার হয়েছে। আর এই পাচারের সাথে সাধারণ মানুষ জড়িত নয় বরং বিশেষ শ্রেণিই জড়িত। এমনকি দুর্নীতির ধারণা সূচকে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের অন্যতম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ বলেও সংস্থাটি উল্লেখ করেছে। আধুনিক রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে ব্যবসা-বাণিজ্য উন্নতম অনুষঙ্গ হলেও গত বছরের অক্টোবরে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে সহজে ব্যবসা করার সূচক অনুযায়ী গত বছর ১৯০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৭৭তম। সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও রাষ্ট্রীয় সাফল্যের এসব সূচকে আমাদের অবস্থা আশাবাদী হওয়ার মতো নয় বরং উদ্বেগজনকই বলতে হবে।
বিশ্বের অপরাপর জাতি-রাষ্ট্র যখন উন্নয়ন-অগ্রগতির পথে অগ্রসর হচ্ছে, তখন আমাদের পদচারণা রীতিমত ভূতের মতই বলতে হবে। কথায় আছে ভূতের পা নাকি পেছন দিকে। তাই তাদের সামনে চলার কোন সুযোগ থাকে না। আমরা বোধ হয় একেবারে দিব্যি দিয়ে বসেছি যে, কোনোভাবেই সামনে চলা যাবে না বরং আমাদেরকে পশ্চাৎমুখিতার নিগড়েই আবদ্ধ থাকতে হবে। আর এ পশ্চাৎমুখিতায় আমাদের জাতীয় জীবনের জীবনীশক্তিকে দুর্বল করে ফেলছে। অবস্থা যেভাবে উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে তাতে আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী হওয়ার মতো তেমন সুযোগ নেই।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো ধর্ম, বর্ণ ও গোত্র নির্বিশেষে সকল শ্রেণির নাগরিকের জানমালের পরিপূর্ণ নিরাপত্তা বিধান করা। একই সাথে সুশাসন নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের প্রধান কর্তব্য। আর রাষ্ট্রের করণীয় বাস্তবায়নের দায়িত্বটা পুরোপুরি সরকারের। কিন্তু দেশের মানুষ রাষ্ট্রের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত ক্ষমতাবানদের সদিচ্ছার অভাব ও উপর্যুপরি ব্যর্থতার কারণেই। মূলত মহল বিশেষের আত্মস্বার্থ, গোষ্ঠীস্বার্থ ও ক্ষুদ্র ব্যক্তিস্বার্থের কারণেই আমরা একেবারে প্রান্তিকতায় এসে পৌঁছেছি। যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে রাষ্ট্র নামক সংঘের সূচনা হয়েছিল সে লক্ষ্য থেকে আমাদের অবস্থান যোজন যোজন দূরে বলেই মনে হচ্ছে। ফলে জনগণ রাষ্ট্রের কল্যাণ থেকে অনেক ক্ষেত্রেই বঞ্চিত হচ্ছে। সংবিধানে সকল নাগরিকের সমান অধিকারের নিশ্চয়তা দেয়া হলেও বাস্তব প্রয়োগটা প্রশ্নবিদ্ধই বলতে হবে। ফলে গণদুর্ভোগ বাড়ছে আশঙ্কাজনকভাবে। অধিকার বঞ্চিত হচ্ছে সাধারণ মানুষ।
সুশাসনের অনুপস্থিতি ও আইনের প্রায়োগিক দুর্বলতার কারণেই জনজীবনের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এ জন্য স্বেচ্ছাচারিতা ও ক্ষমতার অপব্যবহার কম দায়ী নয়। প্রাপ্ততথ্য মতে, ২০১৮ সালে সারা দেশে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধ এবং তাদের হেফাজতে ৪৬৬ জন মানুষ মারা গেছে। এ ছাড়া গত বছর জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে অন্তত ৪৭০টি সহিংসতার ঘটনায় ৩৪ জন নিহত হয়েছে। গত বছর বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ও অন্যান্য দলের এবং নিজেদের মধ্যে কোন্দলের জেরে ৭০১টি রাজনৈতিক সংঘাতের ঘটনায় ৬৭ জন নিহত এবং সাত হাজার ২৮৭ জন আহত হয়েছে।
রাষ্ট্রের ব্যর্থতা ও জনমনে ভাবান্তর । সৈয়দ মাসুদ মোস্তফামানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, ২০১৮ সালে সারা দেশে ধর্ষণ ও গণধর্ষণের শিকার হয়েছে ৭৩২ জন নারী। এর মধ্যে ধর্ষণ-পরবর্তী হত্যার শিকার হয়েছে ৬৩ জন। ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করেছে সাতজন। নির্বাচনের রাতে নোয়াখালীর সুবর্ণচরের এক গৃহবধূকে দলবেঁধে ধর্ষণের বিষয়টিও এসেছে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনে।
২০১৮ সালে মানবাধিকার পরিস্থিতি চরম উদ্বেগজনক ছিল বলে দাবি করেছে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। এ ছাড়া নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের ক্ষেত্রে আশানুরূপ অগ্রগতি হয়নি বলে দাবি করা হয়েছে। গত বছর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে গুম হন ৩৪ জন। এর মধ্যে পরবর্তী সময়ে ১৯ জনের সন্ধান পাওয়া গেছে, যাদের অধিকাংশই বিভিন্ন মামলায় আটক আছেন। এ ছাড়া বেআইনি আটক গণগ্রেফতারসহ বিভিন্ন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুর মতো ঘটনা।
আসক আরও বলেছে, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে গত ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত কমপক্ষে ৪৭০টি সহিংসতার ঘটনায় ৩৪ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের ১৯ জন, বিএনপির ৪ জন, একজন আনসার সদস্য, ১০ জন সাধারণ মানুষ রয়েছেন। ধর্ষণ বিষয়ে সংগঠনটি বলেছে, ২০১৮ সালে সারা দেশে ধর্ষণ ও গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৭৩২ জন। ধর্ষণ হত্যার শিকার ৬৩ জন, ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করেছেন সাতজন। ২০১৭ সালে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৮১৮ জন। আর ২০১৬ সালে এই সংখ্যা ছিল ৭২৪, যা আধুনিক রাষ্ট্রের ধারণা, সফল রাষ্ট্র ও সুশাসনের সাথে মোটেই সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
দুর্নীতির ক্ষেত্রেও আমাদের অবস্থানের ক্রমেই অবনমন ঘটছে বলে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। বার্লিনভিত্তিক ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই) কর্তৃক প্রকাশিত দুর্নীতির ধারণা সূচক (সিপিআই) ২০১৮ অনুযায়ী ২০১৭ সালের তুলনায় বাংলাদেশের স্কোর ২ পয়েন্ট কমেছে এবং নিম্নক্রম অনুযায়ী অবস্থানের চার ধাপ অবনতি হয়েছে। বৈশ্বিক গড় স্কোরের তুলনায় বাংলাদেশের ২০১৮ সালের স্কোর যেমন অনেক কম তেমনি গতবারের চেয়ে ২ পয়েন্ট কমে বাংলাদেশের দক্ষিণ এশিয়ায় দ্বিতীয় সর্বনিম্ন স্কোর ও অবস্থানে থাকায় দেশে দুর্নীতির ব্যাপকতা ও গভীরতা উদ্বেগজনক।
প্রাপ্ত তথ্য মতে, ২০১৮ সালে ০-১০০ স্কেলে ২৬ স্কোর পেয়ে ১৮০টি দেশের মধ্যে তালিকার নিম্নক্রম অনুযায়ী বাংলাদেশের অবস্থান ১৩তম, যা ২০১৭ এর তুলনায় ৪ ধাপ নিম্নে এবং ঊর্র্ধ্বক্রম অনুযায়ী ১৪৯তম, যা ২০১৭ এর তুলনায় ৬ ধাপ অবনতি। এ ছাড়া ২০১৭ সালের তুলনায় বাংলাদেশের স্কোর ২ পয়েন্ট কমেছে, যেটা আমাদের জন্য বিব্রতকর। এক বছরেই দুই পয়েন্ট স্কোর কমে যাওয়াটা উদ্বেগজনক। শুধু তাই নয়, সূচকে অন্তর্ভুক্ত দক্ষিণ এশিয়ার ৮টি দেশের মধ্যে এবারও বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয় সর্বনিম্ন, আর এশিয়া প্যাসিফিকের ৩১টি দেশের মধ্যে অবস্থান চতুর্থ সর্বনিম্ন।
মূলত ২০০১ থেকে ২০০৫ সালের মতো আমরা সর্বনিম্ন অবস্থানে না থাকলেও আমাদের আত্মতুষ্টির কোনো সুযোগ নেই। আমাদের অবস্থান এখনও অত্যন্ত দুর্বল এবং বৈশি^ক গড়ের তুলনায় অত্যন্ত নিচে। অথচ বাংলাদেশের ফলাফল আরো অনেক ভালো হতে পারতো এবং সে অবস্থা বা যোগ্যতাও বাংলাদেশের আছে। যে সমস্ত কারণে আমাদের ফলাফল আরো ভালো হয়নি বলে মনে করা হচ্ছে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, আমাদের দুর্নীতিবিরোধী অঙ্গীকার বা রাজনৈতিক ঘোষণা থাকলেও তার বাস্তব প্রয়োগটা নেই বললেই চলে। বিশেষ করে উচ্চপর্যায়ে যাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে খুব কম ক্ষেত্রেই তাদেরকে বিচারের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। আমাদের প্রশাসন ও রাজনীতিতে স্বার্থের দ্বন্দ্ব ব্যাপকভাবে বিদ্যমান। এ ছাড়া আমাদের ব্যাংকিং ও অর্থনৈতিক খাতে দুর্নীতির যে বিচারহীনতা, সারাদেশে ভূমি, নদী, জলাশয় দখলের যে প্রবণতা, রাষ্ট্রীয় ক্রয় খাতে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ, ক্রমবর্ধমান এবং বিব্রতকরভাবে বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অর্থপাচার এবং রাষ্ট্রীয় নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক যে প্রভাব সেগুলোও আমাদের ভালো স্কোর না হওয়ার ক্ষেত্রে প্রভাব রাখছে বলে মন করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আমাদের দেশের রূঢ় বাস্তবতায় মনে হচ্ছে, এক শ্রেণির লোক নির্যাতক আরেক শ্রেণির লোক নির্যাতিত হওয়ার জন্যই জন্ম নিয়েছে। এসব অতীতে হয়েছে, এখনও হচ্ছে এবং আগামী দিনেও হবে এমনটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তা নিয়ন্ত্রণে রাখতেই রাষ্ট্রের সক্রিয়তা ও আইনের শাসন প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্র অপরাধের প্রতিবিধান করতেই পুরোপুরি সফলতার পরিচয় দিতে পারেনি বলে জনশ্রুতি রয়েছে। যাদের ওপর এ দায়িত্ব অর্পিত তারা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করছেন না বলে অভিযোগও বেশ জোরালো। সম্প্রতি অধ্যক্ষ কর্তৃক ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির যৌন নিগ্রহ ও আগুনে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনা সেদিকেই অঙ্গুলি নির্দেশ করে। এ ধরনের ঘটনা আমাদের দেশে প্রতিনিয়তই ঘটছে। কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্রের নিষ্ক্রিয়তা, উদাসীনতা, আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাব ও বিচারহীনহার সংস্কৃতির কারণেই এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে। তনু ও সাগর-রুনিসহ বিভিন্ন চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার তেমন কোন অগ্রগতি দৃশ্যমান নয়। অতীতে এ ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে অপরাধীদের শাস্তির তেমন একটা নজির দেখা যায় না। তাই এসব অপরাধী ও সমাজবিরোধীরা এখন প্রায় অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। ফলে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে রাষ্ট্র ও সরকারের কার্যকারিতার বিষয়টি। যা একটি গণতান্ত্রিক ও সভ্য সমাজের জন্য মোটেই কাক্সিক্ষত নয়
সংবিধানের প্রস্তাবনায় (Preamble) বলা হয়েছে, ‘…Pledging that it shall be a fundamental aim of the State to realize through the democratic process a socialist society, free from exploitation-a society in which the rule of law, fundamental human rights and freedom, equality and justice, political, economic and social, will be secured for all citizens’.
অর্থাৎ ….আমরা অঙ্গীকার করিতেছি যে, আমাদের রাষ্ট্রে অন্যতম মূল লক্ষ্য হইবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠা, যেখানে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হইবে।
সংবিধানের ২৮(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘The state shall not discriminate against any citizen on grounds only of religion, race, caste, sex or place of birth’.
অর্থাৎ ‘কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদে বা জন্মস্থানের কারণে কোন নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র কোন বৈষম্য প্রদর্শন করিবে না’। কিন্তু শ্রুতিকটু হলেও এসব ক্ষেত্রে আমাদের সাফল্য যৎসামান্যই বলতে হবে।
মূলত গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও সুশাসন নিশ্চিতকরণই আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার মূল উদ্দেশ্য। প্রাগৈতিহাসিককালে তা ‘প্রকৃতি রাজ্য’ হিসেবে পরিচিত ছিল। অতীতের অনেক চিন্তাবিদের ন্যায় রুশোও শুরু করেছেন ‘প্রকৃতির রাজ্য’ থেকে। হব্স এবং লকের মত তিনিও বিশ্বাস করতেন, রাষ্ট্র সৃষ্টি হওয়ার পূর্বে মানুষ প্রাকৃতিক অবস্থায় বসবাস করতো। তবে তা হবসের প্রকৃতি রাজ্যের অনুরূপ ছিল না। তা ছিল অনেকটা লকের অঙ্কিত প্রাকৃতিক অবস্থার ন্যায়। রুশোর মতে ‘প্রকৃতি রাজ্য’ ছিল পৃথিবীতে স্বর্গের ন্যায়। মানুষ ছিল সুখী, আনন্দবিহ্বল এবং পরিপূর্ণ। মানুষের জীবন ছিল সৎ, স্বাভাবিক এবং সুন্দর। প্রাকৃতিক অবস্থায় কোন কৃত্রিমতা, সভ্যতা, সংস্কৃতি ও শিক্ষার ছাপ ছিল না; ছিল শুধু সুখ ও সম্প্রীতি। মানুষ সুখী, সহজ, সরল এবং সততার জীবনে অভ্যস্ত ছিল। রুশোর প্রকৃতি রাজ্যের বর্ণনা দিয়ে অধ্যাপক ডানিং (Dunning) বলেন, (‘In the natural men are to be found the elements of perfect happiness. He is independent, contented and self-sufficing.’) অর্থাৎ প্রাকৃতিক মানুষের মধ্যেই ছিল পরিপূর্ণ সুখের উপাদানগুলো। সে ছিল স্বাধীন, পরিতুষ্ট এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ।
অন্তত আমাদের দেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে এবং দেশে সুশাসন ও আইনের শাসনের দুর্বলতায় মানুষ বোধ হয় সেই রুশোর ‘প্রকৃতি রাজ্যে’র কথায় বারবার স্মরণ করছে। যে সভ্যতা, রাষ্ট্র ও সরকার জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিধান করতে পারছে না, সে সভ্যতাকে অসার ও অপ্রয়োজনীয় মনে করার যথেষ্ট কারণও আছে। কারণ, বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থা অপরাধ ও অপরাধীদের প্রতিবিধান করতে খুব একটা সাফল্য দেখাতে পারছে না। রাষ্ট্র নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তা দিতেই অনেকটাই ব্যর্থ হচ্ছে। এবারের ঈদেও সরকার জনগণের ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে পারেনি বরং প্রাণহানিসহ পথে পথে নানাবিধ বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়েছে সাধারণ মানুষকে। আর ‘দুষ্টের দমন ও শিষ্টের লালন’ এর ক্ষেত্রে আমাদের অর্জন যৎসামান্যই বলতে হবে।
এমতাবস্থায় দেশের মানুষ রুশোর সেই ‘প্রকৃতি রাজ্য’র কথা বেশি বেশি স্মরণ করছেন বলেই মনে হয়। যে রাজ্যের মানুষরা ছিল স্বাধীন, পরিতুষ্ট এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ।

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও কলামিস্ট

SHARE

Leave a Reply