রাসুলুল্লাহ (সা)-এর যৌবনকাল

ড. মুহাম্মদ রেজাউল করিম

এই জগতে অনেক মহামানব আবির্র্ভূত হয়েছেন। তাঁদের কৃতিত্ব এক-এক ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ। কেউ ধর্মে, কেউ যুদ্ধে, কেউ বাগ্মিতায়, কেউ সাহিত্যে, কেউ রাজনীতিতে মহত্ত্ব লাভ করেছেন। কিন্তু মহত্ত্বের সর্বক্ষেত্রে কৃতিত্ব লাভ করছেন কেবলমাত্র একজন। তিনি আমাদের প্রিয়নবী মানবতারবন্ধু মুহাম্মদ রাসূলুল্লাহ (সা)। এ জন্য ফরাসী লেখক আলফ্রেড দে-লামার্টিন তাঁর তুর্কীও ইতিহাসের প্রথম খণ্ডে লিখেছেন- ‘‘দার্শনিক, বক্তা, ধর্ম-প্রচারক, যোদ্ধা, আইন-রচয়িতা, ভাবের বিজয়কর্তা, ধর্মমতের ও প্রতিমাবিহীন ধর্ম-পদ্ধতির সংস্থাপক, মুহাম্মদকে (সা) মানুষের মহত্তের যতগুলি মাপকাটি আছে তা দিয়ে মাপলে, কোন লোক তাঁর চেয়ে মহৎ হতে পারবে না’’ এই জন্য তাঁকে বলা হয় অতি মহামানব- ‘‘খাইরূল বাশার’’। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা) ছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব। তিনি শুধু মুসলমানদেরই স্বীকৃত কোন নেতা ছিলেন না। তিনি অতীত, বর্তমান এবং অনাগত ভবিষ্যতের একমাত্র পথ প্রদর্শক। স্থান-কাল-বর্ণ-গোত্র কোন কিছুই তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। তিনি কেমন এটা শুধুমাত্র তাকে দিয়েই মূল্যায়ন করা সম্ভব।  এই মহামানব আরবের এক বিশিষ্ট, সম্ভ্রান্ত ও ঐতিহ্যবাহী পরিবারে, নির্মল স্বভাব বিশিষ্ট এক ব্যতিক্রমী শিশু পিতৃহীন অবস্থায় জন্মগ্রহণ করে। এক জনৈকা দরিদ্র ও সুশীলা ধাত্রীর দুধ খেয়ে গ্রামের সুস্থ ও অকৃত্রিম পরিবেশে প্রকৃতির কোলে লালিত পালিত  হয়ে বেড়ে ওঠেন। সে বিশেষ ব্যবস্থাধীনে মরুভূমিতে ছোটাছুটি করতে করতে জীবনের কর্মক্ষেত্রে কঠিন বিপদ মুসিবত ও দুঃখ-কষ্টের মোকাবিলা করার প্রস্তুতি নিয়ে থাকেন। ছাগল ভেড়া চরিয়ে চরিয়ে এক বিশ্বজোড়া জাতির নেতৃত্ব দেয়ার প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। শৈশবের পুরো সময়টা অতিবাহিত কারার আগেই এই ব্যতিক্রমী শিশু মায়ের স্নেহময় ছায়া থেকেও বঞ্চিত হয়। দাদার ব্যক্তিত্ব পিতামাতার এই শূন্যতা খানিকটা পূরণ করতে পারলেও কিছুদিন যেতে না যেতেই এই আশ্রয়ও তার হাতছাড়া হয়ে যায়। অবশেষে চাচা হন অভিভাবক। এ যেন কোন পার্থিব আশ্রয়ের মুখাপেক্ষী না হয়ে একমাত্র আসল মনিবের আশ্রয়ে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের প্রস্তুতি পর্ব।

যৌবনে পদার্পন
এখানে দাড়িয়ে এই মহামানব নিজেকে গুছিয়ে নেন এক কঠিন সংগ্রামের জন্য। যাকে বিশ্বমানবতার জন্য রহমত স্বরূপ প্রেরণ করা হলো, তিনি যেন সমাজের সব শ্রেণীর মানুষের দঃখ কষ্ট হৃদয় দিয়ে উপলদ্ধি করতে পারেন মাবুদ যেন সেই আয়োজনই করলেন তাঁর প্রিয় মানুষটির জন্য। এখানেও রয়েছে এক অজানা আনন্দ আর পরিস্থিতি মোকাবেলার যাবতীয় প্রস্তুতি। জীবনের সকাল বেলায় যেন সারা দিনের আয়োজন শেষ। যৌবনে পদার্পন করা পর্যন্ত এ ব্যতিক্রমধর্মী কিশোরকে অন্যান্য ছেলেদের মত দুষ্ট ও বখাটে হয়ে নয়, বরং প্রবীণদের মত ভাবগাম্ভীর্য নিয়ে আত্মপ্রকাশ করতে দেখা যায়। যখন তিনি যৌবন পদার্পণ করেন, তখন চরম নোংরা পরিবেশে লালিত পালিত হওয়া সত্ত্বেও নিজের যৌবনকে লিষ্কলংক রাখতে সক্ষম হয়। সমাজে প্রেম, কু-দৃষ্টি বিনিময় ও ব্যভিচার যুবকদের জন্য গর্বের ব্যাপার, সেই সমাজে এই অসাদারণ যুবক নিজের দৃষ্টিকে পর্যন্ত কলুষিত হতে দেননা। যে সমাজে প্রত্যেক অলিগলিতে মদ তৈরীর কারখানা এবং ঘরে ঘরে পানশালা, সে সমাজে প্রত্যেক মজলিশে পরনারীর প্রতি প্রকাশ্য প্রেম নিবেদন ও মদ্যপানের বিষয়ে কবিতা পাঠের জমজমাট আসর বসে, সেখানে এই নবীন যুবক একটি ফোঁটা মদও মুখে নেননা। যেখানে জুয়া জাতীয় অনুষ্ঠানের রূপ পরিগ্রহণ করেছিল, সেখানে আপাদমস্তক পবিত্রতায় মণ্ডিত এই যুবক জুয়ার স্পর্শ পর্যন্ত করেন না। রূপকথার গল্পবলা ও গানবাজনা যেখানে সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ, সেখানে ভিন্ন এক জগতের এই অভিবাসী এই সব অপসংস্কতির ধারে কাছেও ঘেষেনা। দু’একবার যদিও এ ধরনের বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানে যাওয়ার সুযোগ তাঁর হয়েছিল, কিন্তু যাওয়া মাত্রই তাঁর এমন ঘুম পায় যে, সেখানকার কোন অনুষ্ঠানই তার আর দেখা ও শোনার সুযোগ হয়ে ওঠেনি।

সচ্চরিত্র ও সত্যাশ্রয়ী যুবক
যে বয়সে ছেলেরা  সাধারণত বিপথগামী হয়ে থাকে, ঠিক সেই বয়সেই তিনি গরিব ও নিপীড়িত মানুষদেও সহায়তা এবং অত্যাচারীদের জুুলুম উচ্ছেদের লক্ষ্যে ‘হালফুল ফুযুল’ নামে একটা সংস্কারকামী সমিতিকে যোগদান করেন। এতে যোগদানকারীরা তাদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করে। তিনি ধর্ম প্রবর্তক হলেন, তাতে বিস্ময়ের কোনও কথা ছিল না। কিন্তু যিনি এক আজন্ম অনাথ নিরক্ষর সহায়-সম্পদবিহীন দরিদ্র, তিনি কিরূপে অতি মহামানব হলেন, সেটা কি পরম আশ্চর্যের বিষয় নয়? টমাস কারলাইল বিস্মিত হয়ে বলতে বাধ্য হয়েছেন, ‘‘এই আরবের মানুষ মুহাম্মদ, আর সেই একটি শতাব্দী—- এ কি এমনটি নয় যে, কোনও স্ফুলিঙ্গ, একটি মাত্র স্ফুলিঙ্গ পৃথিবীর উপর পড়লো, এমন পৃথিবীর উপর, যাকে মনে হয়েছিল সামান্য বালিমাত্র। কিন্তু দেখ তো, সেই বালি হয়ে দাঁড়িয়েছে একেবারে বারুদ; আকাশ-প্রমাণ হয়ে জ্বলে উঠেছে দিল্লী থেকে গ্রানাডা পযর্ন্ত।” নবুয়ত লাভের পর রাসূল (সা) ঐ সমিতির স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলতেন : “ঐ অঙ্গীকারের পরিবর্তে কেউ যদি আমাকে লাল রং এর উটও দিত, তবু আমি তা থেকে ফিরে আসতামনা। আজও কেউ যদি আমাকে ঐ রকমের কোন চুক্তি সম্পাদন করতে ডাকে, তবে আমি সে জন্য প্রস্তুত।”

এই তরুণ এক আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে মাথা নোয়াননি
এই মানুষটির শুরুই যেন বলে দিচ্ছে তাঁর শেষটা কেমন হবে। দেব-দেবী আর মূর্তিপূজা যে সমাজের আভিজাত্যের অংশ সে সমাজে সবকিছুকে কার ইশারায় প্রত্যাখান করেছেন? যে সমাজে দেবমূর্তির সামনে সিজদা করা ধর্মীয় প্রথা হয়ে দাঁড়িয়েছিল, সেখানে হযরত ইবরাহীমের বংশধর এই পবিত্র মেজাজধারী তরুণ আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে মাথাও নোয়াননা এবং কোন মোশরেকসুলভ ধ্যানধারণাও পোষণ করেন না। এমনকি একবার যখন তাকে দেব মূর্তির সামনে বলি দেয়া জন্তুর রান্না করা গোশত খেতে দেয়া হয়, তখন তিনি তা খেতে অস্বীকার করেন। হযরত ইবরাহীমের বংশধরেরা যেখানে ইবরাহীমী আদর্শকে বিদয়াত চালু করে, সেখানে এই লাজুক যুবক এক মুহূর্তের জন্যও এই বিদয়াতকে গ্রহণ করেন না।
জীবন সঙ্গীনি নির্বাচন
এ যুবক জীবন সঙ্গীনি নির্বাচন করার সময় মক্কার উঠতি যৌবনা চপলা চঞ্চলা মেয়েদের দিকে ভ্রƒক্ষেপ পর্যন্ত না করে এমন এক মহিলাকে বিয়ে করেন যার সর্বপ্রথম বৈশিষ্ট্য এই যে, তিনি অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত পরিবারের সতী সাধ্বী ও সচ্চরিত্র মহিলা। তাঁর এ নির্বাচন তাঁর মানসিকতা ও স্বভাব চরিত্রের গভীরতাকেই ফুটিয়ে তোলে। বিয়ের প্রস্তাব হযরত খাদীজাই পাঠান, এই যুবকও এ প্রস্তাব সর্বান্তকরণে গ্রহণ করেন।

বন্ধুবান্ধব ও সহচর নির্বাচন
কোন ব্যক্তির চরিত্র ও মানসিকতাকে যদি তাঁর বন্ধুবান্ধব ও সহচরদেরকে দেখে যাচাই করতে হয়, তাহলে আসুন দেখা যাক কেমন লোকেরা এ যুবকের বন্ধু ছিল?
সম্ভবত হযরত আবু বকরের সাথেই ছিল তাঁর সবচেয়ে গভীর বন্ধুত্ব ও সবচেয়ে অকৃত্রিম সম্পর্ক। একে তো সমবয়সী, তদুপরি সমমনা। তাঁর অপর এক বন্ধু ছিলেন হযরত খাদীজার চাচাতো ভাই হাকীম বিন হিযাম। এই ব্যক্তি হারাম শরীফের একজন খাদেম ছিলেন। দেমাদ বিন সা’লাবা আযদী নামক একজন চিকিৎসকও ছিলেন তাঁর অন্যতম বন্ধু। কই, এ যুবকের বন্ধু মহলে একজনও তো নীচ, হীন, বদ অভ্যাস, জুলুমবাজ ও পাপাচারী লোক দেখা যায় না।

তাজের আমীন’ বা ‘সৎ ব্যবসায়ী’ উপাধিতে ভূষিত
এই যুবক যখন অর্থোপার্জনের ময়দানে পদার্পন করলেন, তখন বাণিজ্যের ন্যায় পবিত্র ও সম্মানজনক পেশা বেছে নিলেন। দেশের বড় বড় পুঁজিপতি এই যুবককে তাদের পুঁজিগ্রহণ ও বাণিজ্য করার জন্য মনোনীত করে। এ যুবকের মধ্যে এমন গুণ নিশ্চয়ই ছিল যে জন্য তারা তাদের মনোনীত করেছিল। সায়েব, কায়েস বিন সায়েব, হযরত খাদীজা এবং আরো কয়েক ব্যক্তি একে একে এই যুবকের অনুপম সততার বাস্তব অভিজ্ঞতা লাভ করেন এবং তারা সবাই তাকে এক বাক্যে ‘তাজের আমীন’ বা ‘সৎ ব্যবসায়ী’ উপাধিতে ভূষিত করেন। আব্দুল্লাহ বিন আবিল হামসার সাক্ষ্য আজও সংরক্ষিত রয়েছে যে, নবুয়তের পূর্বে একবার এই তরুণ সৎ ব্যবসায়ীর সাথে তার কথা হয় যে, আপনি এখানে দাঁড়ান, আমি আসছি। কিন্তু পরে সে ভুলে যায়। তিন দিন পর ঘটনাক্রমে আব্দুল্লাহ ঐ জায়গা দিয়ে যাওয়ার সময় দেখতে পায়, ঐ সৎ ব্যবসায়ী আপন প্রতিশ্রুতির শেকলে আবদ্ধ হয়ে সেই জায়গায়ই ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি আব্দুল্লাহকে বললেন, ‘তুমি আমাকে কষ্ট দিয়েছ। আমি তিন দিন ধরে এখানে দাঁড়িয়ে আছি।’ (আবু দাউদ)

হাজরে আসওয়াদ পুনঃস্থাপন
মুহাম্মদ (সা) কেমন সংস্কারক ছিলেন, তাঁর গুণাবলি ও যোগ্যতা কতখানি, তা এ ঘটনা থেকেই বোঝা যায়। কা’বা শরীফ সংস্কারের সময় হাজরে আসওয়াদ পুনঃস্থাপন নিয়ে কুুরাইশদের মধ্যে তীব্র অন্তর্দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। এটা এতদূর গড়ায় যে, তলোয়ার পর্যন্ত বেরিয়ে পড়ে এবং সাজ সাজ রব পড়ে যায়। কিন্তু ভাগ্যক্রমে এই গোলযোগ মিটমাট করার সুযোগটা এই যুবকই লাভ করেন। চরম উত্তেজনার মধ্যে শান্তির পতাকাবাহী এই বিচারক একটা চাদর বিছিয়ে দেন এবং চাদরের ওপর রেখে দেন হাজরে আসওয়াদ নামক সেই পাথর। তারপর তিনি কুরাইশ গোত্রের সকল শাখার প্রতিনিধিদেরকে চাদর উত্তোলনের আহ্বান জানান। পাথর সমেত চাদও উত্তোলিত হয়ে যখন যথাস্থানে উপনীত হলো, তখন এই যুকব পাথরটা তুলে যথাস্থানে স্থাপন করলেন। গোলযোগ থেমে গেল এবং সকলের মুখ আনন্দে উজ্জ্বল ও উৎফুল্ল হয়ে উঠলো।

হেরা গুহায় নিভৃত প্রকোষ্ঠে এক আল্লাহর ইবাদত
তিনি সাংসারিক, ব্যবসায়িক ও অন্যান্য দুনিয়াবী ব্যস্ততা থেকে মুক্ত হয়ে যখনই কিছু সময় অবসর পেয়েছেন, তখন তা আমোদ ফূর্তি ও বিনোদনে কাটাননি। যত্রতত্র ঘোরাঘুরি করে, আড্ডা দিয়ে, অথবা অলসভাবে ঘুমিয়ে কাটাননি। বরং সমস্ত হৈ হাঙ্গামা থেকে দূরে সরে ও সমস্ত কর্মব্যবস্ততা পরিহার করে নিজের নির্মল ও নিষ্কলুষ সহজাত চেতনা ও বিবেকের নির্দেশক্রমে এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর ইবাদত করতেন হেরা গুহার নিভৃত প্রকোষ্ঠে গিয়ে। বিশ্বজগতের প্রচ্ছন্ন মহাসত্যকে হৃদয়ঙ্গম করা ও মানব জীবনের অদৃশ্য রহস্যগুলোকে জানার জন্য আপন সত্তায় ও বিশ্ব প্রকৃতির অতলান্তে চিন্তা গবেষণা চালাতেন। তিনি ভাবতেন, কিভাবে আপন দেশবাসী ও গোটা মানবজাতিকে নৈতিকতাহীনতা ও নীচতা থেকে টেনে তুলে ফেরেশতার পর্যায়ে উন্নীত করা যায়। যে যুবকের যৌবনের অবসর সময় ব্যয় হলো এরূপ একান্ত চিন্তুা গবেষণা কার্যে, তাঁর উঁচু ও পবিত্র স্বভাব সম্পর্কে মানবীয় বিবেক বুদ্ধি ও অন্তদৃষ্টি কি কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না?

এক অসাধারণ মহামানব
দৈনন্দিন জীবনের এ জাতীয় ঘটনাবলি নিয়ে ভবিষ্যতের বিশ্বনবী কুরাইশদের চোখের সামনেই মক্কী সমাজের কোলে লালিত পালিত হতে থাকেন, ক্রমে যৌবনে পদার্পন করেন এবং পরিপক্কতা লাভ করেন। জীবনের এই চিত্র কি বলে দিচ্ছিলনা যে, এ যুবক এক অসাধারণ মহামানব? এভাবে বেড়ে ওঠা ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে কি কোনভাবে এমন ধারণা পোষণ করা চলে যে, ইনি কোন মিথ্যাচারী মানুষ হতে পারেন? কিংবা হতে পারেন কোন পদলোভী, স্বার্থপর অথবা ধর্মকে পুঁজি করে ব্যবসায় ফেঁদে বসা কোন ধর্মব্যবসায়ী? কক্ষনো নয়। খোদ কুরাইশরাই তাঁকে সাদেক (সত্যবাদী), আমীন (বিশ্বাসী ও সৎ) জ্ঞানীগুণী, পবিত্রাত্মী ও মহৎ চরিত্রধারী মানুষ বলে স্বীকার করেছে এবং বারংবার করেছে। তাঁর শত্রুরাও তাঁর মনীষা ও নৈতিকতার শ্রেষ্ঠত্বের সাক্ষ্য দিয়েছে এবং কঠিনতম দ্বন্দ্ব সংঘাতের মধ্যেও দিয়েছে। সত্যের এই মহান আহ্বায়কের জীবন চিত্রকে কুরআন নিজেও সাক্ষী হিসেবে পেশ করে তাঁকে বলছে, “আমি তো এর আগেও তোমাদের মাঝেই জীবনের একটা অংশ অতিবাহিত করেছি, তবুও কি তোমাদের বুঝে আসেনা?” (সূরা ইউনুস : ১৬০)
ঊৎহড়ষফ ঞরিহড়নু বলেছেন, মুহাম্মদ (সা) ইসলামের মাধ্যমে মানুষের মধ্যকার বর্ণ, বংশ এবং শ্রেণীগত পার্থক্য সম্পূর্ণরূপে খতম করে দিয়েছেন। কোন ধর্মই এর চেয়ে বড় সাফল্য লাভ করতে পারেনি যে সাফল্য মুহাম্মদ (সা) এর ধর্মের ভাগ্যে জুটেছে। আজকের বিশ্ব যার অভাবে অশ্র“পাত করছে সে অভাব কেবলমাত্র মুহাম্মদী সাম্যনীতির মাধ্যমেই মেটানো সম্ভব। মানুষের মধ্যকার বর্ণ, বংশ, গোত্র ও শ্রেণীগত পার্থক্যকে চুর্ণ করে একমাত্র মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতেই।
শান্তির দূত মুহাম্মদ (সা)
যে সমাজকে বলা হয় আইয়্যামে জাহেলিয়াত। সেখানে শান্তি, মানবতাবোধ, শৃঙ্খলা শুধুই কল্পনা। যে দেশে যুদ্ধ একটা খেলা এবং রক্তপাত, একটা তামাশায় পরিণত হয়েছিল, সেখানে মানবতার সম্মানের পতাকাবাহী এই যুবক এক ফোঁটাও কারো রক্তপাত করেননি। তারুণ্যে এই যুবককে ‘হারবুল ফুজ্জার’ নামক বিরাট যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে হয়েছিল, কোরাযেশ গোত্রের এই যুদ্ধে অশগ্রহণ ন্যায়সংগত ছিল বলে তিনি এই যুদ্ধে যোগদান করলেও কোন মানুষকে নিজে কোন আঘাত করেননি। মানুষের মূল্যায়ন একমাত্র তিনিই প্রবর্তন করেছিলেন।

সত্যের বাণী প্রচারই সব পাল্টে দিল
কিন্তু জাতির এই উজ্জ্বল রতœটি যখন নবুয়তের পদে অধিষ্ঠিত হয়ে সত্যের বাণী পেশ করলেন, তখন তাদের মনোভাব সহসাই পাল্টে গেল। তাঁর সততা, সত্যবাদিতা, ভদ্রতা, মহত্ত্ব¡ ও বংশীয় শ্রেষ্ঠত্ব সব কিছুরই মূল্য কমে গেল। কাল পর্যন্ত যে ব্যক্তি জাতির চোখের মনি ছিলেন, আজ তিনি দুশমন, বিদ্রোহী ও জাতির কলঙ্ক খেতাব পেলেন। কাল পর্যন্ত যাকে প্রতিটি শিশু পর্যন্ত সম্মান করতো, আজ তিনি সকলের ক্রোধভাজন। দীর্ঘ চল্লিশোর্ধ বছর ধরে যে ব্যক্তি নিজেকে নিষ্কলুষ প্রমাণ করেছেন, তিনি আজ আল্লাহর একত্ববাদ, সত্য ও ন্যায়ের বাণী শোনানো মাত্রই কুরাইশদের চোখে খারাপ হয়ে গেছেন। আসলে তিনি খারাপ ছিলেন না। বরং কুরাইশের মূল্যায়নকারীদের চোখেই ছিল বক্রতা এবং তাদের মানদণ্ডই ছিল ভ্রান্ত।
কিন্তু সত্যিই কি কুরাইশদের চোখ এত অন্ধ ছিল যে, ঘোর তমসাচ্ছন্ন পরিবেশে এমন আলোকময় একটা চাঁদকে তারা দেখতে পায়নি? চরিত্রহীনদের সমাবেশে সৎ চরিত্রবাদ একজন নেতাকে দেখে কি তারা চিনতে পারেনি? আস্তাকুড়ে পড়ে থাকা মুক্তার একটা মালা কি তাদের নজর কাড়তে পারেনি? অসভ্য ইতর মানুষদের সমাজে এই আপাদমস্তক ভদ্রতা ও শিষ্টাচারে মণ্ডিত ব্যক্তি কি নিজের যথোচিত আদর ও কদর আদায় করতো পারেন নি? না, তা নয়। কুরাইশরা ভালোভাবেই জানতো মুহাম্মদ কেমন মানুষ। “মহানবী মুহাম্মদ (সা) কর্তৃক সংঘটিত বিপ্লব ছিল একটি প্রচণ্ড অগ্নিস্ফুলিঙ্গ যা দিল্লী থেকে গ্রানাডা এবং দুনিয়া থেকে আসমান পর্যন্ত যে অবমানবতা ও অসত্যের আবর্জনা মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছিল, তা চোখের নিমিষে পুড়ে ছারখার করে দিল।” জর্জ বার্নার্ড শ তাঁর “এবঃঃরহম গধৎৎবফ’ গ্রন্থে লিখেছেন- “ওভ ধষষ ঃযব ড়িৎষফ ধিং ঃড় নব ঁহরঃবফ ঁহফবৎ ড়হব ষবধফবৎ ঃযবহ গঁযধসসধফ (ঝ.গ) ড়িঁষফ যধাব নববহ ঃযব নবংঃ ভরঃঃবফ সধহ ঃড় ষবধফ ঃযব ঢ়বড়ঢ়ষব ড়ভ াধৎরড়ঁং হববফং ফড়মসধং ধহফ রফবধং ঃড় ঢ়বধপব ধহফ যধঢ়ঢ়রহবংং.” “যদি সমগ্র বিশ্বের ধর্ম, সম্প্রদায়, আদর্শ ও মতবাদসম্পন্ন মানবজাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে কোন নায়কের শাসনাধীনে আনীত হতো, তা একমাত্র মুহাম্মদই (সা) সর্বাপেক্ষা সুযোগ্য নেতারূপে তাদের শান্তি ও সমৃদ্ধির পথে পরিচালিত করতে পারতেন।”
যেমন কুরআনে বলা হয়েছে, “তাদের চোখ আছে, কিন্তু তা দিয়ে তারা দেখতে পায় না।” চোখ থাকতে যারা অন্ধ হয় তাদের দ্বারা হেন বিপদ নেই যা ঘটতে পারে না এবং হেন বিপর্যয নেই যা দেখা দিতে পারে না। হযরত মুহাম্মদ (সা) আমাদের সকলেরই আদর্শ। স্বামী দেখতে পাবে তার মধ্যে স্ত্রী-অনুরাগী আদর্শ স্বামী। পুত্র দেখতে পাবে তাঁর মধ্যে পিতৃ-মাতৃভক্ত আদর্শ পুত্র। পিতা দেখতে পাবে তাঁর মধ্যে মমতাশীল কর্তব্যপরায়ণ আদর্শ পিতা। গৃহী দেখতে পাবে তাঁর মধ্যে স্বহস্তে গৃহে কর্মরত আদর্শ গৃহী। যোগী দেখতে পাবে তাঁর মধ্যে ধ্যান-নিরত আদর্শ যোগী। প্রজা দেখতে পাবে তাঁর মধ্যে সদা হাস্যবদন আদর্শ প্রজা। ভৃত্য দেখতে পাবে তাঁর মধ্যে আদর্শ কর্তব্যনিষ্ঠ পরিশ্রমী আদর্শ ভৃত্য। বণিক দেখতে পাবে তাঁর মধ্যে একজন সৎ, আদর্শ বণিককে। সেনাপতি দেখতে পাবে তাঁর মধ্যে রণকুশল স্থির-মস্তিষ্ক সেনাপতি। নেতা দেখতে পাবে তাঁর মধ্যে হিতৈষী জনসেবক আদর্শ নেতা। বিচারকর্তা দেখতে পাবে তাঁর মধ্যে নিরপেক্ষ ন্যায়নিষ্ঠ, আদর্শ বিচারক। আর তাইতো মহাগ্রন্থ আাল-কুরআনে তাঁর সম্বন্ধে বলা হয়েছে, ‘‘লাকাদ কানা লাকুম ফী রাসূলিল্লাহি উস্ওয়াতুন হাসানা’’- “নিশ্চয়ই আল্লাহর রাসূলের (সা) মধ্যে তোমাদের জন্য অতি উত্তম আদর্শ আছে।” আসুন আমরা সুন্দর সমাজ বিনির্মাণে মুহাম্মদ (সা) কে জীবনের সর্বক্ষেত্রে আদর্শের মডেল হিসেবে গ্রহণ করি। বিশেষ করে যুবসমাজই হচ্ছে সমাজ বিনির্মাণের আসল কারিগর বা মূল শক্তি। তাদের মেধা ও নৈতিক শক্তির উপর বির্নিমিত জাতির মেরুদণ্ড। আর এই শক্তির উৎস যদি হয় মুহাম্মদের (সা) যৌবনকাল, তাহলে  আজকের পথহারা যুব সমাজ পাবে পথের দিশা। জাতি পাবে তার কাঙ্খিত নেতৃত্ব।
লেখক : সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির

SHARE

Leave a Reply