রাসূলুল্লাহর (সা) একটি পত্র ও মুজিজা

ড. মুহাম্মদ আবদুল মাবুদ

হিজরি ষষ্ঠ সনে রাসূলুল্লাহ (সা) আরবের পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন রাজা-বাদশাহ ও শাসকদের নিকট ইসলামের দাওয়াত সংবলিত পত্রসহ দূত পাঠান। দিহইয়া ইবন খলিফা আল-কালবীকে রোমান সম্রাট হিরাকল, আবদুল্লাহ ইবন হুযাফা আসসাহমীকে পারস্যের কিসরা, উমার ইবন উমাইয়া আদ-দামরীকে হাবশার নাজ্জাশী, হাতিব ইবন আবী বালতা’আ আল লাখমীকে মিসরে রোমান সম্রাট হিরাকলের প্রতিনিধি শাসক মুকাওকাস, সুলায়ত ইবন আমর আল-আমিরীকে ইয়ামামার শাসক ইবন আলী আল-হানাফী, শুজা ইবন ওয়াহাবকে আল-হারিছ ইবন আবি শিমার আল-গাসসানী, আলা’-ইবন ইল-হাদরামীকে বাহরাইনের শাসক আল মুনযির ইবন সাওয়া এবং আমর ইবন আল আসকে আল জানাদীর দুই পুত্র জায়ফার ও আব্বাসের নিকট পাঠান। (তারিখ আত তারাবী ৩/৮৪-৮৫; ইবন কাছীর, আস-সীরাহ আন-নাবাবিয়্যাহ-২/৫৮-১৫৯)
রাসূলুল্লাহ (সা) যে সকল রাজা-বাদশাহ ও আমির উমারার নিকট পত্র পাঠান তারা ছিলেন বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর নেতৃস্থানীয় ও প্রতিনিধিত্বশীল ব্যক্তিবর্গ। তারা যদি রাসূলের দাওয়াতে সাড়া দিয়ে ইসলাম গ্রহণ করতেন তাহলে ইসলাম তাদের জনগণের মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়তো। কিন্তু আরব উপদ্বীপের বাইরে একমাত্র হাবশার নাজ্জাশী ছাড়া কোনো রাজা-বাদশাহ ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। তবে এ কথা জানা যায় যে, তাদে কেউ কেউ রাসূলুল্লাহ (সা) প্রেরিত দূতের সাথে ভালো আচরণ করেন এবং অত্যন্ত সম্মানের সাথে পত্র গ্রহণ করেন। উত্তর দানেও তারা শিষ্টাচারের পরিচয় দেন। আবার অনেকের আচরণ ছিল এর সম্পূর্ণ বিপরীত। এখানে কেবল পারস্য সম্রাট কিসরার নিকট লিখিত পত্রটি সম্পর্কে কিঞ্চিৎ আলোচনা করা হবে।
পারস্য সম্রাট কিসরা আবরুভেজের নিকট প্রেরিত রাসূলুল্লাহর (সা) পত্র নিম্নরূপ :
‘এ পত্র মুহাম্মদ রাসূলুল্লাহর পক্ষ থেকে পারস্যের মহান সম্রাট কিসরার প্রতি। যারা সত্য-কঠিন পথের অনুসরণ করেছে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছে তাদের প্রতি সালাম। আমি আপনাকে মহান আল্লাহর আহ্বানের দ্বারাই আহ্বান জানাচ্ছি। নিশ্চয়ই আমি গোটা মানবজাতির প্রতি আল্লাহর রাসূল হিসেবে এসেছি। যাতে, যারা জীবিত আছে তাদেরকে সতর্ক করতে পারি এবং কাফিরদের জন্য আল্লাহর বাণী সত্যে পরিণত হবে। আপনি ইসলাম গ্রহণ করুন, শান্তি ও নিরাপদে থাকুন। যদি আপনি ইসলাম গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন তাহলে এই মাজুসীদের (অগ্নি উপাসক) সকল পাপ আপনার ওপর বর্তাবে।’
পারস্য সম্রাট কিসরা আবরুভেজ বংশীয় উত্তরাধিকার হিসেবে তার পবিত্র সাম্রাজ্যের অধিকার লাভ করেন। স্বভাবই তিনি ও তার আরবদের অনুগত ও অধীন হওয়া মেনে নিতে পারেননি। তাছাড়া সম্রাট ও সাম্রাজ্য ছিল পারস্যের জনগণের নিকট অতি পবিত্র, তাই ব্যক্তি সম্রাটও ক্ষমতার জন্য আরবদের এই দীনকে ভীতি ও সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখা ছিল অতি স্বাভাবিক। তা ছাড়া পারসিকরা আরবের এ দু’টি অঞ্চল হিজায থেকে কোনো অংশে কম ছিল বলে মনে করতো না।
এসব কারণে রাসূলুল্লাহর (সা) পত্র পেয়ে কিসরা প্রচ- রকম ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। দূতের সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন এবং পত্রটি ছিঁড়ে ফেলেন। সাথে সাথে তিনি ইয়েমেনে তার প্রতিনিধি শাসক বাযানকে লিখলেন, ‘তুমি হিজাযের এই ব্যক্তির (মুহাম্মদ) নিকট দু’জন এমন সাহসী লোক পাঠাও যারা তাকে পাকড়াও করে আনতে পারে।’ কিসরার এ পত্রের প্রেক্ষিতে ‘বাযান’ রাসূলুল্লাহর নিকট একটি পত্রসহ দু’জন দূত পাঠান। পত্রে তিনি বাহকদ্বয়ের সাথে রাসূলুল্লাহকে (সা) তার নিকট উপস্থিত হবার নির্দেশ দেন। পত্রসহ বাহকদ্বয় তায়েফে উপস্থিত হয়। সেখানে তারা মক্কার কুরাইশ বংশের কিছু লোকের দেখা পায় এবং তাদের নিকট রাসূলুল্লাহ (সা) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে অবগত হয় যে, তিনি মদিনায়। কুরাইশ ব্যক্তিবর্গ লোক দু’টির পরিচয় ও উদ্দেশ্য অবগত হয়ে দারুণ উৎফুল্ল হয়। তাদের একজন আনন্দের আতিশয্যে এমনও বলে : তোমাদের জন্য সুসংবাদ! এবার শাহেনশাহ ইরান কিসরা তাকে দেখে নেবেন। লোকটির জন্য তিনিই উপযুক্ত।
লোক দু’টি মদিনার পথে রওয়ানা হলো এবং এক সময় রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট উপস্থিত হয়ে নিজেদের পরিচয় দিয়ে বলল : কিসরা আপনাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য আমাদেরকে পাঠিয়েছেন। রাসূল (সা) তাদেরকে মদিনায় আগামীকাল আবার দেখা করতে বললেন। এর মধ্যে রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট আসমান থেকে এই খবর এসে গেল ‘আল্লাহ কিসরা আবরুভেজের ওপর তার পুত্র শিরাওয়ায়হিকে ক্ষমতাবান করেছেন। সে তার পিতাকে হত্যা করেছে।’ পরের দিন লোক দু’টি রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট এলে তিনি তাদেরকে এ সংবাদটি জানালেন। তারা বললো : আমরা কি আপনার পক্ষ থেকে এ সংবাদ আমাদের রাজাকে জানাবো? বললেন : ‘হ্যাঁ, তোমরা আমার পক্ষ থেকে তাকে এ সংবাদ অবহিত করো। তাকে এ কথাও বলো যে, আমার এ দীন, আমার এ রাষ্ট্র কিসরার সাম্রাজ্যের শেষ পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। তাকে আরো বলবে, যদি আপনি ইসলাম গ্রহণ করেন তাহলে যেসব অঞ্চল ও জনগোষ্ঠী আপনার শাসনাধীনে আছে তা সবই ঠিক থাকবে।’
লোক দু’টি ইয়েমেনে ফিরে গেল এবং বাযানের নিকট রাসূলুল্লাহর (সা) সব কথা খুলে বললো। বাযান সব কথা শুনে বললেন, আল্লাহর কসম! এ কোনো রাজা-বাদশাহর কথা নয়। তিনি যেমন বলেছেন, আমার মনে হয় তিনি একজন নবী। আমরা তাঁর কথার সত্য-মিথ্যা নিরূপণের জন্য অপেক্ষা করবো। যদি সত্য হয় তাহলে তিনি অবশ্যই একজন নবী। আর সত্য প্রমাণিত না হলে পরবর্তীতে তাঁর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব। এ কথা বলার অল্পক্ষণের মধ্যে তার হাতে ‘শিরাওয়ায়হি’-এর একখানা পত্র এসে পৌঁছে : ‘অতঃপর এই যে, আমি কিসরাকে (আবরুভেজ) হত্যা করেছি। আমার এ পত্র আপনার নিকট পৌঁছার পর আপনি ও আপনার নিকট যারা আছে, আমার আনুগত্য মেনে নেবেন। আর ইতঃপূর্বে কিসরা যে ব্যক্তির ব্যাপারে (রাসূলুল্লাহ সা) আপনাকে লিখেছিলেন, আমার পরবর্তী নির্দেশ না পৌঁছা পর্যন্ত তাঁকে কোনো রকম বিরক্ত করবেন না।’
শিরাওয়ায়হির এ পত্র পাঠ শেষে বাযান বলে ওঠেন : নিশ্চয়ই এ ব্যক্তি আল্লাহর রাসূল। অতঃপর তিনি এবং তার সাথে ইয়েমেনের মাটিতে পারস্যের যত লোক ছিলেন সকলে ইসলাম গ্রহণ করেন। তা ছাড়া পারস্য সাম্রাজ্যের প্রতিটি ইঞ্চি ভূমি অল্পকালের মধ্যে ইসলামী খিলাফতের অধীনে আসে। (তারিখ আত-তারাবী ৩/৯০, ইবন কাছির, আস-সীরাহ আন-নাবাবিয়্যাহ-২/১৫৮-১৬১)

SHARE

Leave a Reply