রাসূলুল্লাহ (সা.) এর আনুগত্য ও অনুকরণের অপরিহার্যতা

মুহা: রফিকুল ইসলাম

عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ قَالَ001 ্রكُلُّ أُمَّتِيْ يَدْخُلوْنَ الجَنَّةِ إِلَّا مَنْ أَبَىগ্ধ قَالُوْا يَا رَسُوْلَ اللهِ، وَمَنْ يأبَى ؟ قَالَ ্রمَنْ أَطَاعَنِيْ دَخَلَ الجَنّةِ، وَمَنْ عَصَانِيْ فَقَدْ أَبَىগ্ধ. البُخَارِيْ.
অর্থ: হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ ( সা:) বলেছেন, আমার সকল উম্মত জান্নাতে প্রবেশ করবে শুধু যে অস্বীকার  করেছে সে ছাড়া। সাহাবাগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসুল ( সা:)  কে অস্বীকার করবে ? রাসুলুল্লাহ ( সা:) বললেন, যে আমার আনুগত্য করল সে জান্নাতে যাবে আর যে আমার অবাধ্য হল বা অমান্য করল, সে অস্বীকার করল। (সহীহ আল-বুখারী)।

রাবী পরিচিতি:
প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আবু হোরায়রা রা. এর প্রকৃত নাম আবদুর রহমান বিন সখর আদ্ দাওসী। তিনি ৭ম হিজরীতে  ত্রিশ বছর বয়সে ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলাম গ্রহণের পর রাসূলুল্লাহ সা. তাঁর নাম রাখেন আবদুর রহমান বা আবদুল্লাহ। ইসলাম গ্রহণের পর রাসূল স. এর সঙ্গ কোনভাবেই ত্যাগ করেননি। তিনি যেখানেই সফরে যেতেন তিনি তাঁর সাথে থাকতেন। সাহাবীগণের মধ্যে  তিনি সর্বাধিক   হাদীস বর্ণনা কারী । ইমাম আস্-সুয়ূতী র.( মৃ. ৯১১ হি.) এর মতে তাঁর বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা ৫৩৭৪ টি। এর মধ্যে বুখারী এবং মুসলিমে  বর্ণিত হয়েছে ৩২৫ টি। অবশেষে হাদীসের এই মহান সাধক  ৫৯ হিজরীতে ৭৮ বছর বয়সে  মারা যান।

হাদীসের ব্যাখ্যা:
এ হাদীসের ভাষ্য অত্যন্ত পরিষ্কার । নবী করিম স. এর প্রকৃত উম্মতগণ জান্নাতে যাবে, কিন্তু যারা নবী স. কে  মানবে না অথবা অস্বীকার করবে তাদের কী হবে ? অপর দিকে যারা রাসূল স. কে অনুসরণ করছে তাঁরা কতটা করবে? এ ধরনের কিছু প্রশ্ন আমাদের সামনে আসে। সুতরাং আমরা এ সংক্রান্ত আলোচনা আল- কুরআন এবং আল- হাদীসের আলোকে উপস্থাপন করছি।
হাদীসের প্রথম অংশ ( كُلُّ أُمَّتِيْ يَدْخُلوْنَ الجَنَّةِ ) এ অংশের সাথে মানুষের অনেক কিছু জড়িত। তবে এ হাদীসের বর্ণনা অনুযায়ী পহেলা যে বিষয়টা এসেছে তা হলো (مَنْ أَطَاعَنِيْ ) অর্থাৎ ‘যে আমার আনুগত্য করল’।  এই আনুগত্যের দাবী হলো নবী করিম (স.) দীর্ঘ ২৩ বছরে আল-কুরআনের যত নির্দেশনা পেয়েছেন এবং নিজের বিবেক-বুদ্ধি প্রয়োগ করে যে সকল কাজ করেছেন তা সবই নিজের পরিম-লে বাস্তবায়ন করা। এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ তায়ালা সুরা আল- হাশরের ৭ নং আয়াতে বলেন:
وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانتَهُوا وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَاب
(রসূল যা কিছু তোমাদের দেন তা গ্রহণ করো এবং যে জিনিস থেকে তিনি তোমাদের বিরত রাখেন তা থেকে বিরত থাকো। আল্লাহকে ভয় করো। আল্লাহ কঠোর শাস্তিদাতা)
উক্ত আয়াতে স্পষ্টভাবে বলা  হয়েছে  রাসূল (স.) এর উপর যে নির্দেশনা এসেছে তা অনুসরণ করতে হবে । সেক্ষেত্রে কোন ছাড় নেই। যদি এমন কোন ব্যাপার হয় যা আমাদের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের সাথে জড়িত, অথবা এ সংক্রান্ত কোন বিষয় নিয়ে পরস্পরের মধ্যে বাদানুবাদ হয় তবে সে-সব কিছুর সমাধানের জন্য মুমিনদেরকে সরাসরি আল্লাহর নির্দেশ এবং রাসূল (স.) এর পদ্ধতি অনুসরণ করতে বলা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ أَطِيعُواْ اللّهَ وَأَطِيعُواْ الرَّسُولَ وَأُوْلِي الأَمْرِ مِنكُمْ فَإِن تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللّهِ وَالرَّسُولِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ ذَلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلاً
(হে ঈমানদারগণ! আনুগত্য করো আল্লাহর এবং আনুগত্য করো রসূলের আর সেই সব লোকের যারা তোমাদের মধ্যে দায়িত্ব ও ক্ষমতার অধিকারী। এরপর যদি তোমাদের মধ্যে কোন ব্যাপারে বিরোধ দেখা দেয় তাহলে তাকে আল্লাহ ও রসূলের দিকে ফিরিয়ে দাও। যদি তোমরা যথার্থই আল্লাহ ও পরকালের ওপর ঈমান এনে থাকো। এটিই একটি সঠিক কর্মপদ্ধতি এবং পরিণতির দিক দিয়েও এটিই উৎকৃষ্ট।) সুরা আন-নিসা: ৫৯।
যে ব্যক্তি  রাসূল (স.) এর আনুগত্য করবে সে আল্লাহ তায়া‘লার আনুগত্য করল , আর যদি কেউ নবী করিম (স.) কে বাদ দিয়ে জীবনের কোন বিষয় বাস্তবায়ন করে তবে তা আল্লাহর দায় থেকে সে মুক্ত হয়ে যাবে। মহান আল্লাহ সুরা আন-নিসার ৮০ নং আয়াতে বলেন:
مَّنْ يُطِعِ الرَّسُولَ فَقَدْ أَطَاعَ اللّهَ وَمَن تَوَلَّى فَمَا أَرْسَلْنَاكَ عَلَيْهِمْ حَفِيظًا
(যে ব্যক্তি রসূলের আনুগত্য করলো সে আসলে আল্লাহরই আনুগত্য করলো। আর যে ব্যক্তি মুখ ফিরিয়ে নিলো, যাই হোক, তাদের ওপর তো আমি তোমাকে পাহারাদার বানিয়ে পাঠাইনি।) মানব জীবনের সকল স্তরে যদি আল্লাহ নিদের্শিত এবং রাসূল (স.) প্রদর্শিত নির্দেশাবলীর প্রতিফলন না ঘটে তবে তা হবে আনুগত্যহীন কাজ এবং তা এক পর্যায়ে মানুষকে কুফরির দিকে নিয়ে যায়। এ ব্যাপারে আল কুরআনের নির্দেশনা হলো :
قُلْ أَطِيعُواْ اللّهَ وَالرَّسُولَ فإِن تَوَلَّوْاْ فَإِنَّ اللّهَ لاَ يُحِبُّ الْكَافِرِينَ
( হে নবী ! তাদেরকে বলুন, আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য কর। তবে যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয় তাহলে নিশ্চই আল্লাহ এমন লোকদের মহব্বত করবেন না যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করতে অস্বীকার করে। সুরা আল ইমরান: ৩২।
রাসূল সা.) এর আনুগত্যের মাধ্যমে জান্নাত ও আল্লাহর রহমত পাওয়ার নিশ্চয়তা বিদ্যমান। মহান আল্লাহ বলেন:
وَأَقِيمُوا الصَّلاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ
নামায কায়েম করো, যাকাত দাও এবং রসূলের আনুগত্য করো, আশা করা যায়, তোমাদের প্রতি করুণা করা হবে।- সুরা আন-নূর: ৫৬।
তিনি আরও বলেন:
(হে নবী! লোকদের বলে দাওঃ “যদি তোমরা যথার্থই আল্লাহকে ভালোবাসো, তাহলে আমার অনুসরণ করো, আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের গোনাহ মাফ করে দেবেন। তিনি বড়ই ক্ষমাশীল ও করুণাময়।” তাদেরকে বলোঃ আল্লাহ ও রসূলের আনুগত্য করো।) সুরা আলে ইমরান: ৩১।

রাসূল (স.) এর আনুগত্য করার ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর নির্দেশনা এসেছে আল-কুরআনে। নবী করিম (স.) এর কোন ফয়সালা , নিয়মাবলী ও কার্যাবলীর ব্যাপারে সামান্যতম কোন ভিন্নতার মনোভাব পোষণ করলে তারা মুমিন হিসেবে গণ্য হবেনা । মহান আল্লাহ বলেন:
فَلاَ وَرَبِّكَ لاَ يُؤْمِنُونَ حَتَّىَ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لاَ يَجِدُواْ فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُواْ تَسْلِيمًا
(না, হে মুহাম্মাদ! তোমার রবের কসম, এরা কখনো মু’মিন হতে পারে না যতক্ষণ এদের পারস্পরিক মতবিরোধের ক্ষেত্রে এরা তোমাকে ফায়সালাকারী হিসেবে মেনে না নেবে, তারপর তুমি যা ফায়সালা করবে তার ব্যাপারে নিজেদের মনের মধ্য যে কোনো প্রকার কুণ্ঠা ও দ্বিধার স্থান দেবে না, বরং সর্বান্তকরণে মেনে নেবে।) সুরা আন-নিসা:৬৫।
আল হাদীসেও  আনুগত্যের ব্যাপারে খুব জোরালো যে নির্দেশ এসেছে তাহলো:
وعن أبي هريرة رضي الله عنه قال قال رسول الله: ্রمن أطاعني فقد أطاع الله، ومن عصاني فقد عصى الله، ومن يطع الأمير فقد أطاعني، ومن يعص الأمير فقد عصانيগ্ধ متفق عليه.
– হযরত আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন: যে আমার আনুগত্য করল সে আল্লাহর আনুগত্য করল। আর যে আমার হুকুম অমান্য করল সে আল্লাহ্র হুকুমই অমান্য করল। আর যে আমীরের আনুগত্য করল সে আমারই আনুগত্য করল। যে আমীরের আনুগত্য করল না সে আমাকে অমান্য করল। (বুখারী, মুসলিম)
নবী করিম (স.) এর আনুগত্য ও তাঁর অনুসরণ করা ওয়াজিব। এ ব্যাপারে উলামাদের ‘ইজমা হলো :
وقد أجمع العلماء على وجوب طاعة النبي صلى الله عليه وسلم واتباعه؛
উপরোক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি যে, জান্নাতী মানুষ হবার জন্য কখনই আল্লাহ এবং রাসূলের সামান্যতম বিরোধিতা করা যাবেনা ।

হাদীসের শেষ অংশ (مَنْ أَبَى) ‘যে অস্বীকার করল’। কে অস্বীকার করল? সাহাবাগণের এমন প্রশ্নের উত্তরে রাসূল (স.) বললেন: ‘যে আমার অবাধ্য হলো বা  আমাকে অমান্য করল’। সুতরাং আমাদের কাছে দিবালোকের ন্যায় পরিস্কার যে, নবী (স.) এর উম্মতের মধ্যে জান্নাতে যাবেনা শুধুমাত্র সে, যে ‘ রাসূল এর অবাধ্য হয়েছে এবং তাঁকে অমান্য করেছে’।
আমাদের ভাবনার বিষয় হলো, আমরা কী নি¤েœ বর্ণিত বিষয়সমূহে রাসূল (স.) কে অমান্য করছি? যেমন: ক. আমরা ফরজ ওযাজিব কাজগুলো কতটা গুরুত্বের সাথে করি ? খ. আমাদের আর্থিক জীবনে হালাল- হারাম, সুদ-ঘুষ, ন্যায়- অন্যায় কতটা দেখে চলি? গ. একজন ছাত্র, শিক্ষক, এম.পি,মন্ত্রী, সচিব, পরিবারের কর্তা এবং দায়িত্বশীল হিসেবে আমার উপর অর্পিত আমানত কতটা পুরো করি? ঘ. সামাজিক জীবনে সকলের অধিকারের কতটুকু আদায় করতে পারি? ঙ. আমাদের দৈনন্দিন কর্মকা-ে রাসূল স. এর কতটুকু অনুসরণ করি? চ. যারা আল্লাহর দ্বীন প্রচার ও প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে তাদের কতটা বিরোধিতা করি?  ছ. আল্লাহর জমীনে আল্লাহর দ্বীন কায়েমের জন্য আল্লাহ তা‘য়ালার দেয়া সময়, অর্থ, মেধা এবং শ্রম দেয়ার জন্য আমরা কতটা উদগ্রীব ?

এ জাতীয় বিষয়গুলো সবসময় ভাবতে হবে। সে ভাবনা নবী (স.) এর দেখানো পথে হতে হবে, অন্যথায়  আমাদের অজান্তেই রাসূল (স.) কে অমান্যকারিদের কাতারে শামিল হয়ে যেতে পারি এবং জান্নাতে যাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে হেফাযত করুন।

হাদীসের শিক্ষা:

১.    সর্বাবস্থায় আল্লাহর এবং রাসূল (স.) এর আনুগত্য করার
মাধ্যমে জান্নাতে যাওয়ার পথ সুগম করতে হবে।
২.    রাসূলুল্লাহর (স.) এর সিরাত সবসময় অধ্যয়ন করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় তথ্যাবলী যথাযথভাবে মনে রাখতে হবে।
৩.    ব্যক্তিগত, সামাজিক , পারিবারিক ও রাষ্ট্রীয় সকল পর্যায়ে রাসূল (স.) এর কর্মনীতি অনুযায়ী কাজ করতে হবে।
৪.    সর্বোপরি কোন কাজ করার আগেই ভাবতে হবে- এটা কী নবী (স.) এর দেখানো অথবা করণীয় পদ্ধতিতে হচ্ছে?
মহান আল্লাহ তাঁর নির্দেশমত এবং রাসূল ( স.) এর দেখানো পথে আমাদের সকলকে চলার তৌফিক দিন।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, আরবি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

SHARE

Leave a Reply