রাসূলুল্লাহ সা.-এর প্রশিক্ষণ -মো. রাশেদুল ইসলাম

পঞ্চম কিস্তি
(মে সংখ্যার পর)

বিশুদ্ধ আকিদা পোষণ
আল্লাহ আমাদের ইলাহ; নভোমণ্ডলের একমাত্র অধিপতি, তিনি সকল সৃষ্টির সকল প্রয়োজন পূরণকারী ও আশ্রয় দানকারী। আল্লাহ আমাদের রব; যিনি সকল কর্তৃত্বের অধিকারী, আমাদের একমাত্র প্রতিপালক ও তত্ত্বাবধায়ক। আল্লাহ সেই সত্তা; যার উপর আমাদের আস্থা-বিশ্বাস অবিচল। আমরা যেমন তাঁর অনুগ্রহে ধরায় এসেছি, আবার তাঁর নির্দেশেই ফিরে যেতে হবে। আমাদের সকল কার্যক্রম, ইবাদতের মূল কেন্দ্রবিন্দু মহান আল্লাহ।
আমরা যে অকাট্য দ্বীনের উপর চলি, টিকে থাকার অক্লান্ত প্রচেষ্টা করি; তার মূল ভিত্তি একমাত্র ও কেবলমাত্র আল্লাহর উপর নির্ভরশীল। এ ভিত্তিমূল ধরে এগুনো পথিকরা শেষ পর্যন্ত পথের শেষ ও চূড়ান্ত মঞ্জিল জান্নাতে পৌঁছুতে পারেন। পথ থেকে বিচ্যুতি শুধু মঞ্জিল বিচ্যুত হওয়া নয়। বরং পথের সকল কার্যকরণের তথা হক নষ্টের দায়ে দণ্ডিত হয়ে অনন্তকাল শাস্তি ভোগ করাই ক্ষমতাবান মহাপরাক্রমশালী আল্লাহর পক্ষ থেকে ফয়সালা প্রাপ্ত হওয়া।
ফয়সালার ব্যাপারটা আমাদের অনেকের কাছে কিতাবিক তথা থিওরি হিসেবে জানি। এর যে বাস্তবতা আছে, তা মানতে পারি না। এই মানতে না পারার বিষয়টা আকিদাগত। মূলত মহান আল্লাহকে জীবন-জগতের সকল ক্ষেত্রে ইলাহ ও রব হিসেবে মেনে নেওয়া ঈমানদারিত্ব এবং মুসলমানিত্বের পরিচয় বলে যে সিদ্ধান্ত প্রত্যেক সৃষ্টিশীল সত্তাকে ধারণ করতে হয়, তার থেকে সরে আসলে মানতে পারা যায় না।
বর্তমান বিশ্বে ইসলামী চিন্তাধারার ক্রমবর্ধমান প্রসারের সাথে পাল্লা দিয়ে একইসাথে যেভাবে আল্লাহর একত্ববাদে আস্থাশীল মানুষের সংখ্যা বাড়ার কথা ছিলো, তা কিন্তু হচ্ছে না। প্রায় দুই’শো কোটি মুসলমান। এর মধ্যে একটা বড় অংশ আকিদাগত জায়গায় অস্থিতিশীল অবস্থায় অবস্থান করছে। তা না-হলে আইয়্যামে জাহিলিয়াতের প্রভাব থেকে তাওহিদের শক্ত ভিতের উপর দাঁড়ানো মুসলিম মিল্লাত যেভাবে প্রিয় রাসূল সা.-এর হাতে হাত রেখে বাইয়াত নিয়ে বিপ্লব সাধন করেছিলেন, তার বাস্তবায়ন পুনরাবৃত্তি হতো বিশ্বব্যাপী।
তার মানে দাঁড়াচ্ছে- আকিদাগত ভিত্তি মজবুত করা ছাড়া মুসলিম যেমন পথ চলতে পারে না, তেমনি দ্বীন বিজয়ের জন্য আকিদাগত মজবুতি বাধ্যতামূলক। এই পয়েন্টেই আলোচনা ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। আকিদাগত মজবুতির বিষয়টির কতটুকু কিতাবিক এবং কতটুকু বাস্তবিক। আমরা যদি এই আলোচনা করতে চাই, শুরুতেই আমলের সাথে জ্ঞানের সম্পর্ক কেমন থাকা উচিত তা নিরূপণ করতে হবে। আমলের সাথে জ্ঞানের সম্পর্ক নিয়ে বিস্তারিত কথা বলার প্রয়োজন নেই। আসলে জ্ঞান ছাড়া আমল অর্থহীন। জ্ঞান ছাড়া আমল অন্ধকারে পথের দিশা খুঁজে বের করার মতো। এখানে পথিকের জ্ঞানহীনতা মানে- দৃষ্টি শক্তিহীনতা, ঘ্রাণ শক্তিহীনতা। এ দুয়ের অনুপস্থিতি অনুভূতি শক্তিহীনতা নিশ্চিত করে। এরকম অনুভূতিশক্তিহীনতা নিশ্চিত করে পথের দিশা খুঁজে না পাওয়া।
প্রখ্যাত মিশরীয় স্কলার শায়খ মুহাম্মদ আল গাজালী তাঁর ‘আকিদাদতুল মুসলিম’ বইয়ে এ ব্যাপারে যথার্থই বলেছেন। আল্লাহর একত্ববাদ সংক্রান্ত মৌলিক বিষয়ে এখন পর্যন্ত যেসকল কিতাবাদি প্রচলিত, তার ধরন ও নীতি-পদ্ধতির ব্যাপারে তিনটি অনুভূতি ব্যক্ত করেছেন তিনি :
– কিতাবগুলোর প্রকাশভঙ্গি সম্পূর্ণ তাত্ত্বিক। যার আলোচনা শুষ্ক, নিরানন্দ এবং নিরেট দার্শনিক ধরনের। জীবনবোধ তৈরিতে পরিপূর্ণভাবে সক্ষম নয়।
– কিতাবাদিগুলোর আলোচনা ব্যাপক নয়। ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ এবং মূল পাঠে বিস্তর ফারাক। তার উপর ভাষাগত প্রাঞ্জলতা অনুপস্থিত।
– রাজনৈতিক সংঘাত এবং ফেরকাগত বিরোধের জেরে ইসলামের মৌলিক বিষয়ের উপর প্রচলিত বিতর্কে শত্রুতা, ঘৃণা-বিদ্বেষ, অপবাদ ও সমালোচনা এতো বেশি, যে পরিবেশে প্রকৃত সত্যের সন্ধানে ব্যাপকতা অর্জন অত্যন্ত কঠিন কাজ।
এ বিষয়ে আমার অবজারভেশন আরেকটু অ্যাডভান্সড। আকাইদ নিয়ে আমাদের দেশে সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ানোর সুযোগ রাখা হয়নি এটা তো ধ্রুব বিষয়। যেখানে পড়ানো হয়, সেখানেও নামকাওয়াস্তে। অনেক ক্ষেত্রে আকাইদ শাস্ত্রকে প্রচলিত দর্শনিক তত্ত্বের সাথে তুলনা করে বুদ্ধিবৃত্তিক অনুমাননির্ভর করে বিবেচনা করা হয়, ফলে ইসলামের সুমহান আদর্শের বাস্তবিক জীবনের সাথে মিলিয়ে পড়ানো হয় না। অথচ রাসূলুল্লাহ সা. তাঁর গোটা জীবনে সাহাবাদের প্রশিক্ষণের সকল ক্ষেত্রে এটাকে কেন্দ্র করেই এগিয়েছেন।
আবার আমাদের দেশে আকিদা নিয়ে আলোচনা ও কিতাবাদির অভাবও রয়েছে। যার দরুন উপরোক্ত আলোচনার পাশাপাশি এটাও আলোচনা করা জরুরি যে, আকিদা বলতে রাসূলুল্লাহ সা. তাঁর সাহাবায়ে আজমাইনদের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী যে বিষয়-সত্তা উপস্থাপন করেছেন, তার অনুপস্থিতি এখন অকাট্য। একজন মুমিনকে আল্লাহ, ফিরিশতাগণ, দুনিয়াতে আল্লাহ প্রেরিত জীবনবিধান ও নবী-রাসূলগণ, আখিরাত, তকদির এসবের উপর পূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করতে হয় এবং তা লালন করে জীবন পরিচালনা করতে হয়। আমাদের আলেম-উলামাগণ আকিদা সম্পর্কিত উপরোক্ত বিষয়াদির বাইরে ব্যক্তিবিশেষের অনেক কর্মকেও হাজির করেন। যেমন, কেউ কোনো মতবাদ পেশ করলো কিংবা কাজের পলিসি পেশ করলো, তাকেও আকিদা বলে বিশ্বাস করা হয়। যার ফলে আল্লাহর রাসূল সা.-এর জীবনকে আদর্শ হিসেবে বেছে নেয়ার জন্য মানুষের মধ্যে ব্যাকুলতার অভাব তৈরি হয়।
বস্তুত আমলের বিশুদ্ধতা এবং সেই আমল নিয়ে আল্লাহর পছন্দনীয় বন্দা হওয়ার বড় প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে বিশুদ্ধ আকিদা পোষণ না করা। আর আমলের পূর্বশর্ত অনুভূতিসম্পন্ন জ্ঞানার্জন। রাসূল সা. তার প্রশিক্ষণ ম্যানুয়ালে সেই বিষয়টিই বিশেষভাবে নিশ্চিত করেছেন। জ্ঞানকে হৃদয়ে স্থান দিতে হলে হৃদয়কে সর্বপ্রথম রুজু করতে হবে আল্লাহর দিকে তথা একজন মুমিনের জন্য মৌলিক দিকে। এজন্যই আকিদাগত বিশুদ্ধতা সবার আগে জরুরি।

এই বিশুদ্ধতা অন্তরের ব্যাপার। বাহ্যিকভাবে কিছু দৃষ্টিভঙ্গি চর্চা করার নাম বিশুদ্ধ আকিদা পোষণ নয়। বর্তমানে ঈমানদারিত্বের রূপ অনেকটা আনুষ্ঠানিকতা নির্ভর। জ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে অন্তরের পূর্ণতার চেয়ে সনদ প্রাপ্তিকেই বেশি প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। ঈমানদারের অন্তরের সাথে আল্লাহর সংযুক্তি ব্যতীত জ্ঞানের পূর্ণতা আসবে না। আমাদের সকল প্রচেষ্টা এভাবেই হতে হবে। আল্লাহ বলেন-
এ বেদুইনরা বলে, “আমরা ঈমান এনেছি” তাদের বলে দাও তোমরা ঈমান আন নাই। বরং বল, আমরা অনুগত হয়েছি। ঈমান এখনো তোমাদের মনে প্রবেশ করেনি। তোমরা যদি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্যের পথ অনুসরণ করো তাহলে তিনি তোমাদের কার‌্যাবলির পুরস্কার দানে কোনো কার্পণ্য করবেন না। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়ালু। (সূরা হুজুরাত : ১৪)
সার কথা হচ্ছে, হৃদয়ের গভীরে ঈমানদারির সাথে আকিদাগত মজবুতি তখনই বিশুদ্ধভাবে গেঁথে যাবে, যখন আমরা ইসলামের অনুসৃত প্রকাশভঙ্গি অনুসরণ করবো এবং একইসাথে তার উপস্থাপন করবো ব্যক্তি-সমাজ-রাষ্ট্রীয় জীবনে।

হৃদয়ের রোগ দূরীকরণ
বলতে গেলে ইসলামী জ্ঞানের মূলে প্রবেশ এবং তার মাধ্যমে ঈমান নিশ্চিত করে বাস্তব প্রতিফলনের বড় প্রতিবন্ধক হচ্ছে হৃদয়ের রোগ। এই বিষয়টি একজন অ-ঈমানদারের ক্ষেত্রে যেমন ঈমানদারের ক্ষেত্রে তা অন্যরকম। অ-ঈমানদার ব্যক্তিকে জ্ঞানের ভিত্তিমূলে প্রবেশ করতে হয় না, এবং এটি সে সজ্ঞানেই করে। কারণ, আল্লাহর পক্ষ থেকে পৃথিবীতে তার জন্য দেওয়া দায় দায়িত্ব পালনের চেয়ে ব্যক্তিগত গণ্ডিত সুখী থাকাকেই সে বেশি প্রয়োজনীয় মনে করে। ক্ষেত্রবিশেষে নিজের বাইরে তার চিন্তা করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। এজন্য ঈমানদার ব্যক্তির মতো করে এতকিছু ভাবনায় রেখে জ্ঞানের ভুবনে বিচরণ করা তার পক্ষে জটিল মনে হয়। এরকম জটিল সমস্যার সম্মুখীন ব্যক্তিরা আসলে হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করা ছাড়াই জ্ঞানের ভুবনে সর্বেসর্বা হতে চান, যা সম্পূর্ণ বিভ্রান্তি। এই বিভ্রান্তির মূল কারণ অন্যায়-অসুন্দর ও মিথ্যার প্রতি ঝোঁক প্রবলতর হওয়ার কারণে। এই ঝোঁকপ্রবণতা আবার তৈরি হয় সত্য-ন্যায়-সুন্দরের প্রতি আকর্ষণ হারিয়ে ফেলার কারণে।
বান্দা যখন গুনাহ করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন তার অন্তর মরিচাবরণে ঢেকে যায়। এই মরিচার জন্য অন্য কাউকে দোষারোপ করার সুযোগ নেই। কারণ আল্লাহ তাকে আগেই সতর্ক করেছিলেন। দিনকে দিন তার খারাপ কাজ তাকে আল্লাহর আয়াত থেকে গাফেল করে ফেলে। আল্লাহ বলেন-
তাকে যখন আমার আয়াত শুনানো হয় সে বলে, এ তো আগের কালের গল্প। কক্ষনো নয়, বরং এদের খারাপ কাজের (বারবার করতে করতে) জং ধরেছে।

(সূরা মুতাফফিফিন : ১৩-১৪)
কোনো মানুষ যখন এরকম মরিচা বা জং ধরা অন্তর নিয়ে জ্ঞানের ভুবনে বিচরণ করতে থাকে, তখন সে আসলে জং ধরার কারণের বাইরে নিজেকে চিন্তা করতে পারে না। কেউ যদি কুরআনের জ্ঞান অর্জন করতে চায়, তার জন্য জ্ঞান রাখার পাত্র তথা কলব কুরআনিক সত্তা প্রিয় নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সা.-এর অনুরূপ হওয়া বাঞ্ছনীয়।
হৃদয় তথা কলব নষ্ট হলে একজন মানুষের জীবনে সবকিছু বরবাদ হয়ে গেলো। হৃদয়ের পরিচ্ছন্নতা নিয়ে রাসূল সা.-এর বক্তব্য সুস্পষ্ট।
নুমান ইবনু বশির রা. থেকে বর্ণিত : তিনি বলেন- আমি আল্লাহর রাসূল সা.কে বলতে শুনেছি যে, ‘হালাল স্পষ্ট এবং হারামও স্পষ্ট। আর এ দুয়ের মাঝে রয়েছে বহু সন্দেহজনক বিষয়- যা অনেকেই জানে না। যে ব্যক্তি সেই সন্দেহজনক বিষয় হতে বেঁচে থাকবে, সে তার দ্বীন ও মর্যাদা রক্ষা করতে পারবে। আর যে সন্দেহজনক বিষয়সমূহে লিপ্ত হয়ে পড়ে, তার উদাহরণ সে রাখালের ন্যায়, যে তার পশু বাদশাহ সংরক্ষিত চারণভূমির আশপাশে চরায়, অচিরেই সেগুলোর সেখানে ঢুকে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। জেনে রাখ যে, প্রত্যেক বাদশাহরই একটি সংরক্ষিত এলাকা রয়েছে। আরো জেনে রাখ যে, আল্লাহর জমিনে তাঁর সংরক্ষিত এলাকা হলো তাঁর নিষিদ্ধ কাজসমূহ। জেনে রাখ, শরীরের মধ্যে একটি গোশতের টুকরা আছে, তা যখন ঠিক হয়ে যায়, গোটা শরীরই তখন ঠিক হয়ে যায়। আর তা যখন খারাপ হয়ে যায়, গোটা শরীরই তখন খারাপ হয়ে যায়। জেনে রাখ, সে গোশতের টুকরোটি হল কলব (অন্তর)।
(বুখারি; আধুনিক প্রকাশনী-৫০)
একজন মানুষ আখিরাতে আল্লাহর পক্ষ থেকে জাহান্নামের আজাব থেকে নাজাত-প্রত্যাশী হলে তাকে তার কলব পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। পাশাপাশি যারা আখিরাতে মহা সাফল্য লাভের আশায় দুনিয়ায় নিজেকে গড়ে তোলার জন্য জ্ঞানার্জন করে সেই জ্ঞানভিত্তিক আমল করতে চায়, তার জন্যও হৃদয়ের রোগ দূর করা জরুরি। আল্লাহর কাছে নিরোগ কলব নিয়ে পৌঁছা জরুরি। এ ব্যাপারে মহান আল্লাহর বিধান সুস্পষ্ট।
যেদিন (আখিরাতে) অর্থ-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি কোন কাজে লাগবে না, তবে যে বিশুদ্ধ অন্তঃকরণ নিয়ে আল্লাহর সামনে হাজির হবে (কেবল সেই নাজাত পাবে)। (সূরা শু’আরা : ৮৮-৮৯)
সাহাবায়ে কেরাম এই বিধান সামনে রেখে পূর্বেকার জীবনের সকল ধ্যান-ধারণা যা তাঁদের হৃদয়ের ব্যাধি বৃদ্ধি করতে পারে, তা সম্পূর্ণরূপে পেছনে ফেলে নিজেদের তৈরির জন্য জ্ঞানার্জন এবং জ্ঞানভিত্তিক আমল করে পরিশুদ্ধ জীবনযাপন করেছেন। আর দুনিয়ার জীবনে আল্লাহকে ভয় করে চলার মতো ব্যক্তির জন্য কলব তথা অন্তরের রোগ থেকে বের হওয়ার অন্যতম উপায় হচ্ছে সহিহ ইলম অর্জন।

আল্লাহর প্রতি পূর্ণ সমর্পণ
আধ্যাত্মিকভাবে আল্লাহর কাছে পৌঁছুতে হলে আল্লাহর প্রতি নিজেরে পূর্ণ সমর্পণ প্রয়োজন। আর আল্লাহর প্রতি সমর্পণের জন্য সবার আগে বোধ করতে হবে যে, আল্লাহর ক্ষমতা-যোগ্যতার বিপরীতে আমার ক্ষমতা-যোগ্যতার তুলনা করার সুযোগ আছে কিনা। বাস্তবে আমরা মানুষরা এই ধরনের তুলনা করতেই পারি না। কারণ, আমাদের নিজস্বতা বলে আদতে কিছু নেই। আমাদের সকল কিছু আল্লাহ প্রদত্ত।
আমরা যে জ্ঞান অর্জন করি এবং তার ভিত্তিতে পৃথিবীতে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করি বলে মনে করি, তা স্রেফ আল্লাহর অনুগ্রহ। তিনি তা না দিলে আমাদের কারো ক্ষমতা নেই অর্জন করা। আমাদের প্রতি তাঁর দয়া আছে বলেই তা দিয়ে থাকেন। এমন অনেক ব্যক্তি দেখা যায়, যে ব্যাপক জ্ঞানী হওয়া সত্ত্বেও গুমরাহির জীবন বেছে নেয়। এ ব্যাপারে আয়াতুল কুরসিতে মহান আল্লাহ অত্যন্ত খোলামেলা কথা বলেছেন।
আল্লাহ এমন এক চিরঞ্জীব ও চিরন্তন সত্তা যিনি সমগ্র বিশ্ব-জাহানের দায়িত্বভার বহন করছেন, তিনি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই। তিনি ঘুমান না এবং তন্দ্রাও তাঁকে স্পর্শ করে না। পৃথিবী ও আকাশে যা কিছু আছে সবই তাঁর। কে আছে তাঁর অনুমতি ছাড়া তাঁর কাছে সুপারিশ করবে? যা কিছু মানুষের সামনে আছে তা তিনি জানেন এবং যা কিছু তাদের অগোচরে আছে সে সম্পর্কেও তিনি অবগত। তিনি নিজে যে জিনিসের জ্ঞান মানুষকে দিতে চান সেটুকু ছাড়া তাঁর জ্ঞানের কিছুই তারা আয়ত্ত করতে পারে না। তাঁর কর্তৃত্ব আকাশ ও পৃথিবীব্যাপী। এগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ তাঁকে ক্লান্ত পরিশ্রান্ত করে না। মূলত তিনিই এক মহান ও শ্রেষ্ঠ সত্তা। (সূরা বাকারাহ : ২৫৫)
এই যে আমাদের অসহায়ত্ব। এ থেকে পরিত্রাণের একমাত্র পথ তাঁর নিকট নিজেকে সমর্পণ করা। যেহেতু আমার জীবনের সকল কিছু পাওয়ার একমাত্র অবলম্বন মহান আল্লাহর অনুগ্রহ, সেহেতু দুনিয়ার কারো উপর নয়, শুধুমাত্র তাঁকেই ভরসাস্থল হিসেবে গ্রহণ করতে হবে বিনাদ্বিধায়। কারণ আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো সাহায্য করা অথবা আল্লাহ সাহায্য করলে তার সামনে প্রতিবন্ধকতা তৈরির মতো কেউ নেই।
আল্লাহ যদি তোমাদের সাহায্য করেন তাহলে কোন শক্তি তোমাদের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করতে পারবে না। আর যদি তিনি তোমাদের পরিত্যাগ করেন, তাহলে এরপর কে আছে তোমাদের সাহায্য করার মতো? কাজেই সাচ্চা মুমিনদের আল্লাহর ওপরই ভরসা করা উচিত।
(সূরা আলে ইমরান : ১৬০)
(চলবে)

লেখক : সম্পাদক, ছাত্র সংবাদ

SHARE

Leave a Reply