রাসূলুল্লাহ সা.-এর প্রশিক্ষণ মো. রাশেদুল ইসলাম

১ম কিস্তি

মানুষকে তার স্ব স্ব অবস্থানে থেকে নির্ধারিত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে যোগ্যতা এবং দক্ষতা হাসিল করা অত্যন্ত জরুরি। একজন সাধারণ জ্ঞানবান ব্যক্তির কাছে এ বিষয়টি অত্যন্ত সহজবোধ্য বিষয়। অযোগ্য এবং অদক্ষ ব্যক্তির দ্বারা কাজের ক্ষতি সাধন খুব মামুলি ব্যাপার। বলা যায় দক্ষতা এবং যোগ্যতাহীন ব্যক্তির হাতে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বের ক্ষেত্র অনিরাপদ। এ ক্ষেত্রে সচেতন ব্যক্তির কর্তব্য হচ্ছে যোগ্যতা অর্জন করা। আমরা যারা মুসলিম, তাদের জন্য এই কর্তব্য পালন আরো বেশি জরুরি। কারণ, অমরা এমন এক জীবনব্যবস্থা চর্চা করি এবং তার ব্যাপারে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে থাকি, তা মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে মনোনীত। পাশাপাশি মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া নির্ধারিত দায়িত্বের অংশ। আর নিজের জন্য এই জীবনব্যবস্থার চর্চা এবং অন্যান্য মানুষের চর্চা নিশ্চিতের জন্য গাইডলাইন ফলো করতে হয়। আমাদের জন্য এর মূল গাইডবুক হচ্ছে আল-কুরআন। আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং আখিরাতের সফলতা কামনা করে তাঁর (আল্লাহর) স্মরণে সময় অতিবাহিত করবো বলেই তিনি আমাদের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালামকে কুরআনের আলোকে জীবন অতিবাহিতকারী হিসেবে নমুনা পেশ করেছন। (সূরা আহজাব : ২১) সাহাবায়ে আজমাঈন তার বাস্তব উদাহরণ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালাম কুরআনে আল্লাহর নির্দেশনার আলোকে সাহাবায়ে আজমাঈনদের জীবন গঠন করে তা আমাদের সামনে পেশ করে গেছেন। তাই তিনি (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এই মহান কাজটি করে দেখিয়েছেন, সেই প্রশিক্ষণপদ্ধতি সামনে রাখতে পারলে আমরাও সাহাবায়ে আজমাঈনদের মতো যোগ্যতা ও দক্ষতা অর্জন করতে পারবো ইনশাআল্লাহ।
ইসলামী শিষ্টাচার শিক্ষা দুনিয়ার অন্যান্য সকল নিয়ম-নীতি শিক্ষা হতে অনন্য ও পৃথক। এ শিষ্টাচার নীতির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এটা এমন এক পরিপূর্ণ ব্যবস্থা, যার মধ্যে মানবাত্মার সকল চিন্তা-ভাবনা বেষ্টিত। আর এই নিয়মপদ্ধতি এতোটাই গভীর প্রতিক্রিয়া এবং প্রভাবের অধিকারী যে, বাস্তবজীবনে মানুষের হৃদয়ের অন্তঃপুরে দৃঢ়তার সাথে প্রভাব বিস্তার করে থাকে। শুধুমাত্র এর প্রভাবেই চরম জাহিলিয়াতের যুগে আরবের মরুভূমিতে এমন এক সম্প্রদায় তৈরি হয়েছিলো, যাদের প্রভাবে সমগ্র বিশ্বে এক বিশাল আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিলো এবং পথভ্রষ্ট মানুষদের সঠিক পথের দিশা দিয়ে সোনার মানুষে পরিণত করা সম্ভব হয়েছিলো। সাহাবায়ে আজমাঈনদের এই অর্জনের মূলে ছিলো তিনটি মূলনীতি-
১. তাঁরা জ্ঞানের পিপাসা দূর করার একমাত্র উপকরণ হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন আল-কুরআন। তৎকালে বেশ বড় বড় সভ্যতা (রোমীয়, গ্রিক, পারস্য, ভারতীয়, চীনা সভ্যতা) প্রতিষ্ঠিত থাকলেও এসবের প্রভাববলয়ের বাইরে মহান আল্লাহর পরিপূর্ণ নির্দেশাবলি সমৃদ্ধ কুরআনের গাইডলাইনের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন একদল লোক তৈরি করেছিলেন, যাদের মন-মগজ, ও জ্ঞান-বুদ্ধি গড়ে উঠেছিলো সম্পূর্ণরূপে কলুষতা ও সকল প্রকার পঙ্কিলতামুক্ত।
২. তাঁরা মহাগ্রন্থ আল-কুরআনকে একমাত্র জীবনবিধান হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।
৩. জাহিলিয়াতের সকল মূল্যবোধ এবং ধ্যান-ধারণার প্রভাবমুক্ত হয়ে ইসলামকে একমাত্র আশ্রয়স্থল হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন তাঁরা এবং এটা করতে গিয়ে বিরোধী পক্ষের সকল জুলুম নির্যাতন মোকাবিলা করে সামনে এগিয়ে চলেছিলেন।
বর্তমানে আমরাও সেই যুগের মতোই জাহিলিয়াতের মহাসমুদ্রে আপতিত হয়ে পড়েছি এবং বর্তমান জাহিলিয়াত সে যুগের চেয়েও মারাত্মক। আমাদের বিচরণের সমগ্র পরিবেশ, মানুষের আকিদা-বিশ্বাস, স্বভাব-চরিত্র ও রীতিনীতি সব জাহিলিয়াতের বেষ্টনীর মধ্যে আবদ্ধ। আরো ভয়াবহ বিষয় হলো, আমরা যেসব বিষয়কে ইসলামী তাহজিব-তমদ্দুন, ইসলামী উৎস, ইসলামী জীবন-দর্শন এবং চিন্তাধারা বলে জানি, সেগুলোও অনেক ক্ষেত্রে জাহেলিয়াতেরই সৃষ্টি। যার ফলশ্রুতিতে আমাদের হৃদয়ে প্রকৃত দ্বীনি অনুভূতি ও মূল্যবোধ স্থায়ী হচ্ছে না। তাই ইসলামী জীবনবিধান নিজের জীবনে প্রতিষ্ঠা করা এবং ইসলামী আন্দোলনের পথপরিক্রমায় আমাদেরকে প্রশিক্ষণের বিষয়ে বিষয়ে সতর্ক হতে হবে। এ ক্ষেত্রে যেমনিভাবে প্রশিক্ষণ গাইডলাইন প্রয়োজন, তারচেয়েও বেশি জরুরি জাহিলিয়াতের প্রভাবাধীন পরিবেশ থেকে নিজেদেরকে সম্পূর্ণ রূপে পৃথক করে নেয়া।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রশিক্ষণপদ্ধতি গোটা কুরআনুল কারীমে বর্ণিত। যদিও এই সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধে এই বর্ণনা উপস্থাপন করা সম্ভবপর হবে না। তারপরও আমরা কিছু সংক্ষিপ্ত পয়েন্টে বিষয়টির নির্যাস উল্লেখ করার চেষ্ট করবো ইনশাআল্লাহ।
প্রশিক্ষণ ও প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য
প্রশিক্ষণ হচ্ছে একটি পরিকল্পিত কার্যক্রম। প্রশিক্ষণ গ্রহণের ফলে প্রশিক্ষণার্থীদের প্রয়োজনীয় জ্ঞান, দক্ষতা ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করা হয়। প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য হচ্ছে কোন ব্যক্তির জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধি করা এবং দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন সাধন করে কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে তার যোগ্যতার উন্নতি ও সমৃদ্ধি সাধন করা। আধুনিক যুগে বক্তৃতা, অংশগ্রহণমূলক আলোচনা, কেস স্টাডি, রোল প্লে, কর্মশালা/সেমিনার, মাঠ ভ্রমণ, ব্রেন স্টর্মিং, সিমুলেশন বা অনুকরণ, গেম ইত্যাদি পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণের এসব লক্ষ্য-উদ্দেশ্য এবং উপায় পদ্ধতি থাকা সত্ত্বেও তার মাধ্যমে ব্যক্তির স্থায়ী এবং দীর্ঘমেয়াদি উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য জ্ঞান ও দক্ষতা পরিপূর্ণভাবে হাসিল হয় না।
ইসলামে প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য
ইসলামের প্রশিক্ষণপদ্ধতি ব্যাপক, সর্বব্যাপী ও অনন্য বৈশিষ্ট্যের সমন্বয়ে পরিচালিত হয় যে, মানুষের জীবনের কোন দিক, কোনো বিভাগ এর গণ্ডির বাইরে নয়। মানুষের তৈরি পার্থিব প্রশিক্ষণপদ্ধতির লক্ষ্য হলো আদর্শ নাগরিক তৈরি। সংশ্লিষ্ট দেশ বা জাতির আদর্শভিত্তিক এই নাগরিক তৈরি মধ্যে বড় ফাঁকফোকর হচ্ছে, আদর্শের মৌলিকত্ব, ভিত্তি ও টার্মিনাল লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের গলদ। মানবরচিত সকল আদর্শ আজ পর্যন্ত সার্বজনীনতা পায়নি এখনো। মহান আল্লাহর নির্দেশনা অনুযায়ী ইসলাম ছাড়া সকল মতবাদ ভুল। (সূরা আলে ইমরান : ৮৫) অন্য দিকে ইসলামের প্রশিক্ষণপদ্ধতির মুখ্য উদ্দেশ্য হলো ভালো মানুষ তৈরি। এই ভালো মানুষ কেবলমাত্র কোনো ভৌগোলিক সীমারেখায় আবদ্ধ হবে না, বরং সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য ভালো নাগরিক, উত্তম অধিবাসী এবং আদর্শ মানুষ। সূরা তাকভিরের ২৭ নম্বর আয়াতের ঘোষণায় আল্লাহ সার্বজনীনতার ঘোষণা দিয়েছেন এভাবে-
‘এটা তো সমগ্র জগদ্বাসীর জন্য একটি উপদেশ।’
ইসলাম বর্ণ, গোত্র, বংশ, ভাষা ও ভৌগোলিক অবস্থানের সীমারেখা বাতিল করে দিয়েছে। আর ইসলামের সীমারেখার অধীনে আসা ব্যক্তিদের মর্যাদা ও সার্বজনীনতার ঘোষণা দিয়ে মহান আল্লাহ সূরা হুজুরাতের ১৩ নং আয়াতে বলেন-
‘এরপর তোমাদেরকে জাতি ও ভ্রাতৃগোষ্ঠী বানিয়ে দিয়েছি, যাতে করে পরস্পরকে চিনতে পারো। নিশ্চয় আল্লাহর নিকট সেই সর্বাপেক্ষা মর্যাদাশীল, যে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে নীতিপরায়ণ।’
জীবনগঠনের শাশ্বত উদ্দেশ্য একমাত্র ইসলামেই রয়েছে। সে সম্পর্কে আল্লাহ সূরা বাকারাহর ৩৮ নং বলেছেন-
‘অতঃপর আমার পক্ষ থেকে যে জীবনবিধান তোমাদের নিকট পৌঁছবে, যারা সে হেদায়াত ও বিধান অনুসারে নিজেদের জীবন গড়ে তুলবে, তাদের জন্য ভয়-ভীতি, দুঃখ-কষ্ট, বিপদ-মুসিবতের কোনো কারণ থাকবে না।’
উপরোক্ত আলোচনার সারসংক্ষেপ হিসেবে ইসলামে প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য সম্পর্কে আমরা নি¤েœাক্ত ৪ পয়েন্ট উল্লেখ করতে পারি:
১. আদর্শ মানুষ তৈরি।
২. তাকওয়াসম্পন্ন ইবাদতকারী মানুষ তৈরি।
৩. আল্লাহর প্রতিনিধিত্বকারী ব্যক্তিত্ব গঠন।
৪. মহান আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়ার জন্য উপযোগিতাসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব গঠন।
যারা নিজেকে আল্লাহর দিকে রুজু করে ফেলেন, তারা এ কথা নিশ্চিত জেনেই এগোন যে, তাঁদের শক্তি ও সামর্থ্যরে উৎস হলো আল্লাহ তায়ালা। তাই এ বিশ্বে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসারী প্রশিক্ষিত ব্যক্তি নিজের পজিশন ও মর্যাদা উপলব্ধি করে এবং নিজ আকাক্সক্ষা ও কর্মশক্তি দিয়ে দিয়ে দুনিয়ার উন্নতি পুনর্গঠন, সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিকাশ সাধনে তৎপর হয়। যাতে থাকে না কোনো পেরেশানি আর না থাকে অপারগতার প্রকাশ। (চলবে)
লেখক : প্রাবন্ধিক ও গবেষক

SHARE

Leave a Reply