রাসূলুল্লাহ সা. -এর বুদ্ধিমত্তা সায়ীদ মোস্তাফিজ

রাসূল সা.-এর জীবনের প্রতিটি দিক এতটা সমৃদ্ধ যে তাঁকে সম্পূর্ণরূপে উপস্থাপন করতে একজন ইবনে হিশামের কলম যথেষ্ট নয়। পরিপূর্ণ নয় এ পর্যন্ত লিখিত পৃথিবীর কোনো গ্রন্থই। শিশুদের সাথে রাসূলের সা. সম্পর্ক নিয়েই যদি কেউ লেখা শুরু করে হয়তো তা সিরাত ইবনে হিশামের চাইতেও বড় গ্রন্থে পরিণত হবে তবুও তা সম্পূর্ণ হবে না। আমার এ বক্তব্য অন্ধ আনুগত্যের বহিঃপ্রকাশ নয়। অনেক বিধর্মীও রাসূল সা.-কে জানতে গিয়ে এ কথা অকপটে স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে। সিরাত তো একটা মহাসাগর। এই উত্তাল জ্ঞান সাগরের তীরে আছড়ে পড়া কিছু ঢেউ আমি স্পর্শ করেছি মাত্র, আমার ক্ষুদ্র পাত্রে তার যৎ সামান্যই ধারণ করা সম্ভব হয়েছে। রাসূল সা.-কে নিয়ে ক’লাইন লিখতে গিয়ে তাঁর মর্যাদার বরখেলাফের আতঙ্কে আমার কলম কেঁপে উঠেছে বারবার।

তৎকালীন জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে বিরোধীরা মোটেও কাঁচা ছিল না। উটের পায়ের চিহ্ন দেখে কারও অনুসরণ করা বা গোবর খুঁচিয়ে খেজুরের বিচি দেখে মদিনার উট কিনা তা বুঝতে পারার মতো কঠিন বিষয়েও মক্কার কাফেররা ছিল পারদর্শী। কথায় কথায় রক্তপাতের সংস্কৃতিতেও ছিল অভ্যস্ত। এই রকম ঝানু প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়াইটা একদমই সহজ ছিল না। এর ওপর ছিল মুনাফিকদের উৎপাত। যা কিনা কাফেরদের চেয়েও ভয়ঙ্কর। একেবারে প্রথম সারিতে নামাজ পড়া ছদ্মবেশীরা কামড় বসানোর সামান্যতম সুযোগ পেলেই পিছপা হতো না।
প্রাচ্যের লেখকরা অস্ত্র এবং ইসলামকে একাকার করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু অস্ত্রই ইসলাম বিজয়ের জন্য যথেষ্ট ছিল না। একমাত্র অস্ত্রকেই যারা ইসলাম বিজয়ের মাধ্যম হিসেবে চিহ্নিত করতে চায় তাদের উদ্দ্যেশপ্রণোদিত রচনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
যেখানে বিরোধীদের অভিযোগ ছিল- ‘এ কেমন রাসূল যে খাবার খায় এবং হাটবাজারে ঘুরে বেড়ায়। সাথে থাকে না কোনো সতর্ককারী ফেরেস্তা।’ (সূরা ফুরকান : ৭)
অথচ রাসূল সা. তো রক্তে মাংসে গড়া মানুষই ছিলেন। আবেগ-অনুভূতি, সুখ-দুঃখ ছিল তাঁর জীবনে। চিন্তা-পেরেশানির ভোগান্তি তাঁকেও পোহাতে হয়েছে। মায়ের উদর থেকেই জন্ম নিয়েছিলেন আবার মৃত্যুও বরণ করতে হয়েছিল তাঁকে। ওহি দ্বারা তিনি চালিত হতেন ঠিকই আবার প্রজ্ঞা ও সৃজনশীলতার ক্ষেত্রেও ছিলেন অগ্রগণ্য। কৌশল ও দূরদর্শিতাতেও ছিলেন অনন্য। দাওয়াতে, সন্ধিতে, যুদ্ধে তা পরিষ্কারভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

নবুওয়াতের পূর্বেই কাবাঘর পুনঃনির্মাণের এক পর্যায়ে হাজরে আসওয়াদ স্থাপনের মর্যাদা লাভে যখন গোত্রগুলো রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে চলেছে তখন মধ্যস্থতাকারী একজন ব্যক্তির জন্য অপেক্ষা করছিল সবাই। সিদ্ধান্ত হলো আগামীকাল যে সবার আগে কাবায় প্রবেশ করবে তার সিদ্ধান্ত মেনে নেয়া হবে। ভাগ্যক্রমে রাসূল সা. প্রবেশ করলেন সর্বাগ্রে। একজন যোগ্য বিচারককে দেখে চারদিকে নেমে এলো স্বস্তির ছায়া। চাদর বিছিয়ে চারকোনা ধরালেন চার গোত্রের প্রতিনিধিকে। নিজে সম্পাদন করলেন পাথর স্থাপনের বাকি কাজ। রাসূল সা.-এর এমন উপস্থিত বুদ্ধিদীপ্ত সমাধান কোনো প্রকার রক্তপাত ছাড়াই সন্তুষ্টচিত্তে গৃহীত হয়েছিল সেদিন। যেহেতু তখনও ওহি নাযিল শুরু হয়নি সেহেতু এই ঘটনার মাধ্যমেই প্রমাণিত হয় তিনি নিজ বুদ্ধিমত্তা ও প্রজ্ঞা দিয়েও কাজ করতেন। দাওয়াতি পন্থাতেও ফুটে ওঠে এই বৈশিষ্ট্য। তাঁর দাওয়াতের পদ্ধতি এমন ছিল যে গোত্রপ্রধানদের কাছে তা আগে পৌঁছাতে চেষ্টা করতেন। গোত্রপ্রধান দাওয়াত কবুল করা মানে পুরো গোত্র সে দাওয়াতকে গ্রহণ করবে খুব সহজেই। তাঁর নিপুণ কৌশলের আরেক নমুনা দেখা যায় বদর যুদ্ধের প্রাক্কালে। যখন সিরিয়া থেকে ফেরা বাণিজ্য কাফেলাকে আক্রমণ করা মদিনাবাসীর কাছে মনে হয়েছিল সহজ ও লাভজনক। তখন রাসূল সা.-এর প্রসারিত দৃষ্টি বদরের প্রান্তর পেরিয়ে পৌঁছেছিল মক্কা বিজয়ের পথে। ফলে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে তিনশত তেরো জনের ক্ষুদ্র কাফেলা এক হাজার সৈন্যের মোকাবেলায় পাড়ি জমিয়েছিল সেইদিকেই। রাসূলের সা. এই দূরদর্শী সিদ্ধান্তে যেমন এসেছিল ময়দানের বিজয় ঠিক তেমনই সম্ভব হয়েছিল বাণিজ্য কাফেলার পথরোধও। আবার উহুদের যুদ্ধে রাসূল সা. গিরিপথের সৈনিকদের বলেছিলেন তোমরা যদি ময়দানে তোমার ভাইদের মৃতদেহ পাখিতে খাচ্ছে দেখ তবুও এখান থেকে সরবে না। তার এ দূরদর্শী চিন্তার দিকে লক্ষ্য না করায় ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল পরে। বিজয়ী কাফেলা কোণঠাসা হয়েছিল গিরিপথের আক্রমণে।

মক্কার কাফেরদের সাথে, মদিনার ইহুদিদের সাথে কিংবা বিভিন্ন সন্ধিগুলোতে তাঁর দূরদর্শিতা আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যেসবের অধিকাংশই বাহ্যিকভাবে মুসলমানদের স্বার্থবিরোধী মনে হয়েছে। ফলে এ ব্যাপারে আপত্তি তুলেছিলেন খুব কাছের সাহাবিরাও। কিন্তু এর ফলাফল ইসলামের পক্ষেই এসেছে অবশেষে। ইহুদিরা মুসলমানদের সাথে মুনাফিকদের মতোই বাইরে বন্ধুত্বের ভান করলেও গোপনে ছিল কট্টর ষড়যন্ত্রকারী। আল্লাহর রাসূল সা. সে বিষয়ে অবগত হওয়ার পরও তাদের সাথে সংঘাত এড়িয়ে পরিস্থিতি মোকাবেলা করেছেন কৌশলে। চতুর্মুখী চ্যালেঞ্জের সাথে লড়েছেন প্রজ্ঞা দিয়ে। প্রতিটি সমস্যার সমাধান করেছেন একে একে। সফল রাষ্ট্রনীতিতে মদিনা সনদ ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম লিখিত সংবিধান। এর প্রতিটি শর্তেই ছিল শান্তির বার্তা। মূলত অন্যদের কাছে মুসলমানদের চরিত্রকে উপস্থাপন করায় ছিল এই সনদের প্রধান উদ্দেশ্য। যার ইতিবাচক ফলাফল এসেছিল মুসলমানদের পক্ষে।

মুনাফিকদের ক্ষেত্রেও রাসূল সা.-এর দূরদর্শী ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ ছিল প্রশংসনীয়। বারবার তাদের কুটিলতা প্রকাশিত হওয়ার পরেও তাদের ব্যাপারে সাথে সাথেই কঠিন সিদ্ধান্তে না গিয়ে বরং সতর্কতার সাথে ষড়যন্ত্রের জালকে ছিন্ন ভিন্ন করেছেন। প্রথমদিকে তাদের বানানো মসজিদে দারের অনুমোদন ছিল তাঁর রাজনৈতিক দূরদর্শিতারই অংশ। তাবুক থেকে ফিরে যা ধ্বংস করা হয়েছিল। হোদায়বিয়ার সন্ধিতো ছিল একটি বুদ্ধিভিত্তিক লড়াই। যা মক্কা বিজয়ের পথকে সুগম করেছে। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যাকে ঘোষণা দিয়েছেন ফাতহুল মুবিন বা মহা বিজয় হিসেবে। হে নবী, অবশ্যই আমি আপনাকে সুপষ্ট বিজয় দান করেছি। (সূরা ফাতহ : ১)
মক্কা বিজয়ের পূর্বে কাফেলার মক্কা অভিমুখে গমনে প্রস্তুতির গোপনীয়তা রক্ষা ছিল একজন সেনাপতি হিসেবে অতি উচ্চমানের চিন্তাশীলতার পরিচয়। একেবারে সুসজ্জিত কাফেলা দেখে ভড়কে গিয়েছিল কাফেররা। মক্কার কাছাকাছি গিয়ে নির্দেশ দিয়েছিলেন বেশি বেশি চুলা এবং কম করে টয়লেট খননের। চুলার সংখ্যা দেখে লোকসংখ্যার অনুমান এবং কমসংখ্যক টয়লেটে সাহাবাদের দীর্ঘ সারির খবর বিচলিত করেছিল মক্কাবাসীকে। ফলে যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়ার ন্যূনতম মনোবলও ভেঙে পড়েছিল তাদের।

মক্কা বিজয়ের আগে যারা ইসলাম গ্রহণ করার সাহস পায়নি তারা মক্কা বিজয়ের পরে ইসলাম গ্রহণ করলেন। এবং যারা এতদিন ধরে শত্রুতা করে আসছিল তারাও ইসলাম গ্রহণ করল। এরপরেই হলো হুনাইনের যুদ্ধ। যুদ্ধে অর্জিত গণিমত বণ্টনের সময় রাসূল সা. নতুন ইসলাম গ্রহণকারীদের অগ্রাধিকার দিলেন। যদিও আনসার সাহাবিরা গনিমতের জন্য লালায়িত ছিলেন না তারপরও এ বিষয়টি তাদের আত্মসম্মানে আঘাত করল। এবং এখানে তৈরি হলো একটা বিদ্রোহের সম্ভাবনাও। রাসূল সা. বিষয়টি বুঝতে পারলেন। তাৎক্ষণিক একটা বক্তব্য দিলেন। নিমিষেই ঠাণ্ডা হয়ে গেল সবকিছু। প্রাথমিক দিকে ইসলাম গ্রহণকারীদের মতো এখনো আন্তরিকতায় পৌঁছেনি নতুনরা। এখনো তাদের মাঝে দুশমনি মনোভাব থেকে যাওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। দূরদর্শী রাসূল সা. তাদের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের জন্যই গনিমতে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন।
মুহাম্মদ সা.-এর সংগ্রামী জীবনের পরতে পরতে চিন্তাশীলতা ও বুদ্ধিদীপ্ততা দৃশ্যমান। আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সাহায্য ও স্পষ্ট নির্দেশনা আসার পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত লড়তেন নিজস্ব চিন্তা ও শক্তিতে। পরামর্শ করতেন সাহাবিদের সাথে। কোনটা গ্রহণ করতেন। কোনটা করতেন না। আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে নিতেন সিদ্ধান্ত। সিদ্ধান্তগুলো দূরদর্শী। ছোট ছোট সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়তো বড় বড় বিজয়ে।
লেখক : প্রাবন্ধিক

SHARE

Leave a Reply