রাসূলূল্লাহর (সা) যুদ্ধনীতি

অধ্যাপক মুহম্মদ মতিউর রহমান

ইসলাম অর্থ শান্তি। আরবি ‘সালাম’ অর্থাৎ শান্তি শব্দ থেকে ইসলাম শব্দটি উদ্ভূত। ইসলামের অন্য অর্থ- আল্লাহর নিকট পূর্ণরূপে আত্মসমর্পণ। মূলত উভয় শব্দের অর্থ ও তাৎপর্য অভিন্ন। কারণ আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণের মাধ্যমে তাঁর আদেশ-নির্দেশ মতো জীবন পরিচালনা করলে শান্তি লাভ করা সম্ভব। আল্লাহর হুকুম অমান্যকারীগণ দুনিয়ায় অন্যায়-অনিয়ম-বিশৃঙ্খলা ও ফাসাদ সৃষ্টি করে। ফলে দুনিয়ায় অশান্তি সৃষ্টি হয়। একমাত্র আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই দুনিয়ায় শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব। অতএব, জীবনে তথা মানবসমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠাই ইসলামের মূল লক্ষ্য। কিন্তু দুনিয়ায় কোনো কিছুই এমনি এমনি অর্জিত হয় না। কোন কিছু অর্জনের জন্য যেমন সাধনা দরকার, ত্যাগ-তিতিক্ষা প্রয়োজন, তেমনি দৃঢ়চিত্তে তা অর্জনের জন্য কর্মপ্রচেষ্টা একান্ত অপরিহার্য। দুনিয়ায় শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্যও তেমনি অব্যাহত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। দুনিয়ায় যারা জুলুম-অন্যায় করে, শান্তি-শৃঙ্খলা ব্যাহত করে, তাদের প্রতিহত করা এবং প্রয়োজনে তাদেরকে বল প্রয়োগে নিবৃত্ত করা প্রয়োজন। অন্যথায়, সমাজে শান্তিপ্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। তাই যুদ্ধের প্রসঙ্গ এসে পড়ে। কিন্তু যুদ্ধ স্বাভাবিকভাবে কারো কাম্য নয়।
মহান স্রষ্টা অসংখ্য গ্রহ-তারা-নক্ষত্র ইত্যাদি সৃষ্টি করে তা সুশৃঙ্খলভাবে নিয়ন্ত্রণ করছেন। সব কিছুকে তিনি একটি প্রাকৃতিক নিয়মের মধ্যে আবদ্ধ করে রেখেছেন। সকলে ইচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায় স্রষ্টার সে নিয়ম মেনে চলছে। এ নিয়মের কোন ব্যতিক্রম ঘটলে সৃষ্টিজগতে বিশৃঙ্খলা ঘটতে বাধ্য এবং তার ফলে মুহূর্তেই সৃষ্টিজগতে মহাপ্রলয় ঘটে যেতে পারে। মহাসৃষ্টির একটি ক্ষুদ্র গ্রহ হলো আমাদের এ পৃথিবী। এ পৃথিবীতে অসংখ্য সৃষ্টিনিচয়ের মধ্যে মানুষ অন্যতম মাখলুক বা আল্লাহর সৃষ্টজীব। অন্য সব সৃষ্টির জন্য আল্লাহ যেমন প্রাকৃতিক নিয়ম তৈরি করেছেন, মানুষের জন্যও আল্লাহর পক্ষ থেকে তেমনি একটি নিয়ম বা নীতিমালা তৈরি করে দেয়া হয়েছে। এক কথায় এ নীতিমালার নাম ইসলাম। তবে অন্যসব সৃষ্টির জন্য যে প্রাকৃতিক নিয়ম রয়েছে, তারা ইচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায় তা মেনে চলতে বাধ্য। কিন্তু মানবজাতির জন্য যে নীতিমালা তৈরি করা হয়েছে, মানুষ ইচ্ছা করলে তা মেনে চলে আল্লাহর অনুগত বান্দা হিসেবে তার জীবনকে সফল ও সুন্দর করে তুলতে পারে। তবে মানুষকে আল্লাহপ্রদত্ত এ নীতিমালা অমান্য করে তার নিজের খেয়ালখুশি মোতাবেক চলার অধিকারও দেয়া হয়েছে। সে ক্ষেত্রে আল্লাহর অনুগত বান্দাদের পরিণাম কী হবে এবং অবাধ্যদের পরিণতি কী হবে মহান স্রষ্টা তাও সুস্পষ্টভাবে তাঁর ঐশী কিতাবে বর্ণনা করেছেন।
পৃথিবীতে রাত-দিন, আলো-অন্ধকার, সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায়, ভালো-মন্দ, শুভ-অশুভ, কল্যাণ-অকল্যাণ ইত্যাদি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী দু’টি দিক বা বিষয় রয়েছে। এর কোন্টি শ্রেয় আর কোনটি শ্রেয় নয়, তা সহজেই বোধগম্য। ইসলাম শান্তির ধর্ম। ইসলাম অনুসরণের মাধ্যমে শ্রেয় বিষয়গুলো আয়ত্ত হয় আর ইসলাম বর্জনের ফলে অশ্রেয় বিষয়গুলো বিধিলিপি হয়ে দাঁড়ায়। মহান স্রষ্টা যিনি সর্বজ্ঞ, সর্ব ক্ষমতার অধিকারী, অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ সবকিছু এককভাবে যাঁর করায়ত্ত, তিনিই জানেন তাঁর সৃষ্টির জন্য কোনটি ভালো বা কল্যাণকর। সেভাবেই তিনি মানবজাতির জন্য এক নির্ভুল, নিখুঁত ও সর্বাঙ্গসুন্দর নীতিমালা দিয়েছেন, যা যথাযথ অনুসরণ করলে জীবনে সাফল্য অনিবার্য এবং সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা-কল্যাণ প্রতিষ্ঠা সম্ভব। আর ইসলাম অনুসরণ না করলে তার পরিণতি হয় ভয়াবহ ও অকল্যাণকর। তাই মানবসমাজে শান্তিশৃঙ্খলা-কল্যাণ সাধনের জন্যই ইসলামের প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য। এ জন্য আল্লাহর অনুগত বান্দাদেরকে সচেতনভাবে সর্বদা অতন্দ্র প্রহরীর ন্যায় ইসলামকে ধারণ ও তা প্রতিষ্ঠার জন্য নিরলসভাবে সচেষ্ট হওয়া প্রয়োজন। এটা ঈমানের অপরিহার্য দাবি। এটাকে ইসলামী পরিভাষায় বলা হয় জিহাদ। আল্লাহতায়ালা তাই ঈমানের পরই জিহাদের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। এ সম্পর্কে কতিপয় আয়াত উদ্ধৃত হলো :
অর্থ- যারা ঈমান এনেছে এবং যারা আল্লাহর পথে হিজরত করে এবং জিহাদ করে, তারাই আল্লাহর অনুগ্রহ প্রত্যাশা করতে পারে। আল্লাহ ক্ষমাপরায়ণ, পরম দয়ালু। (সূরা বাকারা, আয়াত : ২১৮)
অর্থ- তোমরা আল্লাহর পথে সংগ্রাম কর এবং জেনে রাখ যে আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। (সূরা বাকারা, আয়াত : ২৪৪)
অর্থ- তোমরা কি মনে কর যে, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে, যখন আল্লাহ তোমাদের মধ্যে কে জিহাদ করেছে এবং কে ধৈর্যশীল তা এখনো জানেন না (অর্থাৎ পরীক্ষা করা হয়নি)। (সূরা আল ইমরান, আয়াত :১৪২)
অর্থ- এবং তোমরা তাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে থাকবে যতক্ষণ না ফিত্না দূরীভূত হয় এবং আল্লাহর দ্বীন সামগ্রিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং যদি তারা বিরত হয় তবে তারা যা করে আল্লাহ তার সম্যক দ্রষ্টা। (সূরা আনফাল, আয়াত : ৩৯)
অর্থ- যারা ঈমান আনে, হিজরত করে এবং সম্পদ ও জীবন দ্বারা আল্লাহর পথে জিহাদ করে তারা আল্লাহর নিকট মর্যাদায় শ্রেষ্ঠ, আর তারাই সফলকাম। (সূরা তওবা, আয়াত : ২০)
অর্থ- সুতরাং যারা পরকালের বিনিময়ে তাদের পার্থিব জীবন বিক্রয় করে তারা আল্লাহর পথে সংগ্রাম করলে সে নিহত হোক অথবা বিজয়ী হোক তাকে মহাপুরস্কার দান করবো। (সূরা নিসা, আয়াত : ৭৪)
অর্থ- যারা আমার (আল্লাহ) উদ্দেশ্যে সংগ্রাম করে আমি তাদেরকে অবশ্যই আমার পথে পরিচালিত করবো। আল্লাহ অবশ্যই সৎকর্মপরায়ণদিগের সঙ্গে থাকেন। (সূরা আনকাবুত, আয়াত : ৬৯)
আল কুরআন থেকে উদ্ধৃত উপরোক্ত আয়াতসমূহে জিহাদের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য সম্পর্কে যা বলা হয়েছে, তা অতিশয় তাৎপর্যপূর্ণ ও বিশেষভাবে অনুধাবনযোগ্য। প্রকৃতপক্ষে, জিহাদ হলো এক নিরন্তর প্রচেষ্টা বা সংগ্রামের নাম। নিজেকে সংশোধন করা থেকে শুরু করে সমাজের সর্বক্ষেত্রে আল্লাহর দ্বীনকে প্রতিষ্ঠা ও বিজয়ী করার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চলানোর নাম জিহাদ। এ জিহাদেরই একটি বিশেষ দিক হলো যুদ্ধ। যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন যুগে, বিভিন্ন সমাজে ভিন্ন ভিন্ন নীতিমালা অনুসৃত হয়ে থাকে।
পৃথিবীতে সাধারণত ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা জাতিগত স্বার্থ, লোভ-প্রলোভন, হিংসা-বিদ্বেষ ও আধিপত্য বিস্তারের উদ্দেশ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এ ধরনের যুদ্ধে সর্বদাই ধ্বংস, হত্যা ও অশান্তি সৃষ্টি হয়। কিন্তু ইসলামে জিহাদ বা যুদ্ধ কখনও ব্যক্তিগত স্বার্থ, লোভ-লালসা, হিংসা-বিদ্বেষ, আধিপত্য বিস্তার অথবা পার্থিব কোনো কিছু অর্জনের জন্য সংঘটিত হয় না। মানব সমাজে বা পৃথিবীতে শান্তি-শৃঙ্খলা, সত্য-ন্যায় ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যেই কেবল জিহাদ বা যুদ্ধ করা ইসলাম সমর্থন করে বা অপরিহার্য গণ্য করে। ইসলামের ইতিহাস আলোচনা করলে দেখা যায় যে, শুধুমাত্র অপশক্তির হাত থেকে মানুষ বা সমাজকে নিরাপত্তা দানের উদ্দেশ্যেই রাসূলুল্লাহ (সা) আল্লাহর নির্দেশে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছেন। কিন্তু সে ক্ষেত্রেও কতিপয় সুনির্দিষ্ট নিয়মনীতি অনুসরণ করার জন্য মহান স্রষ্টা তাঁকে সুস্পষ্ট নির্দেশনা প্রদান করেছেন। নিম্নোক্ত আয়াতসমূহে এ নির্দেশনার বর্ণনা রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা) তা যথাযথভাবে অনুসরণ করে পৃথিবীতে যুদ্ধের উন্নত মহান নীতি ও আদর্শ তুলে ধরেছেন, যা সর্বকালের কল্যাণব্রতী মানুষের জন্য একান্ত অনুসরণীয়।
মক্কায় ইসলাম গ্রহণের পর সেখানকার কাফিরগণ মুসলমানদের ওপর অকথ্য জুলুম-নির্যাতন চালায়। কিন্তু মুসলমানদেরকে তখন প্রতিরোধ করার অনুমতি দেয়া হয়নি। আকাবার বাইয়াতের পরই আল্লাহর তরফ থেকে এ ব্যাপারে প্রথম অনুমতি আসে এবং হিজরতের পরে মদিনায় ক্ষুদ্র ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরেই তা কার্যকরী করার সুযোগ সৃষ্টি হয়। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহর ঘোষণা- “যুদ্ধের অনুমতি দেয়া হলো তাদেরকে যারা আক্রান্ত হয়েছে, কারণ তাদের প্রতি অত্যাচার করা হয়েছে। আল্লাহ নিশ্চয়ই তাদেরকে সাহায্য করতে সম্যক সক্ষম; তারা বলে, ‘আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ।’ আল্লাহ যদি মানবজাতির এক দলকে অন্য দল দ্বারা প্রতিহত না করতেন, তাহলে বিধ্বস্ত হয়ে যেত খ্রিস্টান সংসারবিরাগীদের উপাসনাস্থল, গির্জা, ইহুদিদের উপাসনালয় এবং মসজিদসমূহ যাতে অধিক স্মরণ করা হয় আল্লাহর নাম। আল্লাহ নিশ্চয়ই তাকে সাহায্য করেন যে তাঁকে সাহায্য করে। (অর্থাৎ আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠায় যারা সচেষ্ট)। আল্লাহ নিশ্চয়ই শক্তিমান, পরাক্রমশালী। আমি এদেরকে দুনিয়ায় প্রতিষ্ঠা দান করলে এরা সালাত কায়েম করবে, জাকাত দেবে এবং সৎকাজের নির্দেশ দেবে ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করবে; সকল কর্মের পরিণাম আল্লাহর ইখতিয়ার।” (সূরা হজ, আয়াত ৩৯-৪১)
ইসলামের যুদ্ধনীতি সম্পর্কে আরো কতিপয় আয়াত :
অর্থ- যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তোমরাও আল্লাহর পথে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর; কিন্তু সীমা লংঘন করো না। আল্লাহ সীমালংঘনকারীগণকে পছন্দ করেন না। (সূরা বাকারা : ১৯০)
অর্থ- তোমরা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে থাকবে যতক্ষণ ফিতনা দূরীভূত না হয় এবং আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠিত না হয়। যদি তারা বিরত হয় তবে জালিমদেরকে ব্যতীত আর কাউকে আক্রমণ করা চলবে না। (অর্থাৎ নারী, শিশু, বৃদ্ধ, পঙ্গু, রুগ্ণ, সাধু-সন্ন্যাসী, ধর্ম-যাজক প্রমুখ যারা যুদ্ধ করতে বা যুদ্ধে সহায়তা করতে অক্ষম তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার অনুমতি ইসলাম দেয়নি)। (সূরা বাকারা, আয়াত : ১৯৩)
পৃথিবীতে যত যুদ্ধ সংঘটিত হয়ে থাকে সবই মূলত ব্যক্তিগত স্বার্থ উদ্ধার, অর্থসম্পদ, ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি লাভের উদ্দেশ্যে এবং নারীলিপ্সার কারণে। কিন্তু ইসলাম এ ধরনের ক্ষুদ্র ও জাগতিক স্বার্থ উদ্ধারে যুদ্ধ করার অনুমতি দেয় না। উপরিউক্ত আয়াতসমূহ থেকে স্পষ্টত উপলব্ধি করা যায় যে, কেবলমাত্র আক্রান্ত হলে বা জালেমের জুলুম থেকে বাঁচার জন্য এবং অন্যায়-অসত্যকে প্রতিহত করে ন্যায় ও সত্যকে প্রতিষ্ঠিত বা আল্লাহর দ্বীনকে কায়েম করা বা প্রতিষ্ঠিত রাখার জন্যই শুধু যুদ্ধ করা সঙ্গত। আবার এরূপ যুদ্ধেও সীমালংঘন বা নীতিজ্ঞানবর্জিত হওয়া সঙ্গত নয়। অন্যায়-অসত্য বা জুলুম-নির্যাতনকে প্রতিহত করার জন্য যতটুকু প্রয়োজন ঠিক ততটুকু শক্তি প্রয়োগই বিধেয়, তার অতিরিক্ত নয়। ইসলামের যুদ্ধ শুধুমাত্র অন্যায়-অবিচার প্রতিরোধ, জুলুম-নির্যাতন বন্ধ, মানবিক বিপর্যয় রোধ, অরাজকতা-বিশৃঙ্খলা দূরীকরণ, শান্তিশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা তথা সার্বিক মানবিক কল্যাণে সংঘটিত হয়ে থাকে। তাই ইসলামের যুদ্ধ হত্যা, অশান্তি ও অরাজকতা সৃষ্টি করে না, বরং সমাজের নিরাপত্তা বিধানের অপরিহার্য তাগিদেই তা সংঘটিত হয়ে থাকে।
রাসূলুল্লাহ (সা) দুনিয়ায় প্রচলিত যুদ্ধ সম্পর্কে যে ধারণা, নীতি-পদ্ধতি ও যুদ্ধের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য তা সম্পূর্ণ বদলে দিতে সক্ষম হন। প্রচলিত যুদ্ধের লক্ষ্য হলোÑ ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা কোনো জাতির স্বার্থ চরিতার্থকরণ, দম্ভ-অহমিকা ও শক্তির পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন এবং বলপ্রয়োগে রাজ্য দখল বা অন্যের ওপর আধিপত্য বিস্তার। এ লক্ষ্য অর্জনে নির্বিচার হত্যা, রক্তপাত, ধ্বংস, লুটপাট, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগসহ নানা মানবিক বিপর্যয় সংঘটিত হয়। এর পরিণতি হয় ভয়াবহ। এ ধরনের যুদ্ধে বিভিন্ন জনপদ ও সভ্যতা ধ্বংস হয়, ইতিহাসে পাশবিক বর্বরতার নিষ্ঠুরতম চিহ্ন অবলোকন করে মানবজাতি যুগ যুগ ধরে শঙ্কিত ও আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে। অন্য দিকে আল্লাহর বিধান অনুযায়ী রাসূলুল্লাহ (সা) যে যুদ্ধনীতি ও যুদ্ধের রীতি-পদ্ধতি অনুসরণ করেন, তা মানবজাতির জন্য চির অনুসরণযোগ্য সর্বোত্তম আদর্শ। এর লক্ষ্য ব্যক্তি-গোষ্ঠী-জাতির স্বার্থ-দম্ভ-অহমিকা ও বর্বর শক্তি প্রদর্শন নয়, জুলুম-নির্যাতনের মাধ্যমে কাউকে পদানত, পরাভূত ও অধীনস্থ করা নয়। এ যুদ্ধের একমাত্র লক্ষ্য স্রষ্টার প্রতি অবিচল আনুগত্য প্রদর্শনের মাধ্যমে পৃথিবীতে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠা করে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা। অন্যায়-দুর্নীতি, জুলুম-নির্যাতন, অসত্য-অবিচার ও মানবতাবিরোধী সব কিছুর মূলোৎপাটন করে সুখী-সুন্দর-কল্যাণময় সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। বৃহত্তর কল্যাণ সাধনের উদ্দেশ্যে অতি স্বল্প ক্ষতির বিনিময়ে সর্বোত্তম সুফল অর্জন। এটাকে নিতান্ত যৌক্তিক বলা যায়। সাধারণত সমাজে যখন কেউ খুনখারাবি, চুরি-ডাকাতি, জুলুম-নির্যাতন বা অশান্তি-বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে তখন সমাজের প্রচলিত আইনে তা প্রতিষেধকের উপায় হিসেবে অপরাধীকে শাস্তি প্রদান করা হয়। এ শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে সমাজের বৃহত্তর শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। তাই এটাকে যৌক্তিক ও কাম্য বলেই বিবেচনা করা হয়। কিন্তু অপরাধীকে শাস্তি প্রদান করাকে যারা নিষ্ঠুরতা বা বর্ববরতা মনে করেন তারা প্রকারান্তরে সমাজের শান্তি-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তাকেই ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেন। এটাকে কখনও সুবিবেচনাপ্রসূত মনে করা যায় না।
রাসূলুল্লাহর (সা) যুদ্ধনীতির মূল উদ্দেশ্য ছিল ন্যূনতম ক্ষতিসাধনের মাধ্যমে মানবসমাজকে নিরাপদ করা। কোনোরূপ ধ্বংস বা অশান্তি সৃষ্টি করা কখনই তাঁর লক্ষ্য ছিল না। প্রকৃতপক্ষে, ইসলাম যুদ্ধকে কখনো উৎসাহিত করে না, যুদ্ধ অপরিহার্য হলে কেবল তখনই রাসূলুল্লাহ (সা) যুদ্ধে অবতীর্ণ হতেন এবং সে ক্ষেত্রেও আল্লাহর সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা অনুসরণ করতেন। রাসূলুল্লাহ (সা) প্রদর্শিত যুদ্ধনীতি অনুসরণ করার মধ্যেই মানবজাতির প্রকৃত কল্যাণ নিহিত এবং বর্তমান অশান্তি ও বিভীষিকাপূর্ণ এ পৃথিবীতে শান্তি ও কল্যাণের নিশ্চয়তা প্রদান করা সম্ভব। সংক্ষেপে রাসূলুল্লাহর (সা) যুদ্ধনীতির কয়েকটি মৌলিক গুরুত্বপূর্ণ দিকের উল্লেখ করা হলো :
কেবলমাত্র আক্রান্ত হওয়ার পর আত্মরক্ষার জন্য যুদ্ধ করা জায়েজ।
সমাজের ফিত্না দূর করা এবং আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য যুদ্ধ করা বৈধ।
যুদ্ধে একমাত্র শত্র“পক্ষের অস্ত্রধারীদের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ করা জায়েজ।
নারী, শিশু, পঙ্গু, রুগ্ণ, সাধু-সন্ন্যাসী, ধর্মযাজক বা পুরোহিত এবং নিরীহ সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ বা তাদের কোনোরূপ ক্ষতিসাধন সম্পূর্ণ অবৈধ।
শত্র“-পক্ষের বাড়ি-ঘর, ফসল, গবাদিপশু ইত্যাদি ধ্বংস করা অবৈধ।
যুদ্ধাহত কোনো ব্যক্তিকে কষ্ট দেয়া নিষেধ।
যুদ্ধবন্দীদের সাথে মানবিক আচরণ করা বিধেয়। কোনো অবস্থাতেই তাদের ওপর নির্যাতন করা বৈধ নয়।
যুদ্ধবন্দী নারীদের ওপর পাশবিক নির্যাতন বা কোনোরূপ জুলুম করা সম্পূর্ণ অবৈধ।
রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর জীবদ্দশায় অনুষ্ঠিত সকল যুদ্ধে মুসলমানদের সেনাপতি ছিলেন। বহিঃশত্র“র আক্রমণ থেকে মদিনার রক্ষাব্যূহ নির্মাণে, অভিনব রণকৌশল অবলম্বনে, সৈন্য পরিচালনা, সমরকৌশল বিনির্মাণে ও যুদ্ধ পরিচালনায় তাঁর অপূর্ব পারদর্শিতা এবং নৈপুণ্য ছিল অতিশয় বিস্ময়কর। এ ছাড়া যুদ্ধকালে এবং যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে শত্র“র সাথে কিরূপ ব্যবহার করতে হবে মহানবী (সা) সে ক্ষেত্রেও এক অনুসরণীয় আদর্শ রেখে গেছেন। তিনি জীবনে মোট সাতাইশটি যুদ্ধ পরিচালনা এবং ষাটটি সমরাভিযানের আয়োজন করেন। সাধারণত বিধর্মীদের সরাসরি আক্রমণের মোকাবেলায় এ সাতাইশটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়। সামরিক অভিযানগুলো প্রেরিত হয় প্রধানত মদিনার নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ এবং ইসলাম প্রচার নির্বিঘেœ পরিচালনার উদ্দেশ্যে। রাসূলুল্লাহ (সা) যখন খবর পেয়েছেন যে, কোন গোত্র বা অঞ্চলের লোকেরা মদিনা আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন তাদের পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণের পূর্বেই তাদের সমরায়োজন ব্যর্থ করার উদ্দেশ্যে তাদের বিরুদ্ধে সমরাভিযান পরিচালনা করেন। সমরকৌশলের এটা এক অতি কার্যকর দিক। শত্র“পক্ষকে পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে মদিনা পর্যন্ত অগ্রসর হতে দিলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রচণ্ড যুদ্ধ এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনা ছিল। তাই তাদের আগ্রাসী তৎপরতা অঙ্কুরে বিনষ্ট করে দেয়ায় ব্যাপক যুদ্ধ এবং ক্ষয়-ক্ষতির আশঙ্কা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এড়ানো সম্ভব হয়। এ ছাড়া কোন কোন ক্ষেত্রে দ্বীন প্রচারের উদ্দেশ্যে প্রেরিত মুবাল্লিগ বা রাসূলের দূতকে অন্যায় অথবা ষড়যন্ত্রমূলকভাবে হত্যা করা হয়, কখনো বা বন্দী বা নিপীড়ন করা হয়। এমতাবস্থায় সমরাভিযান প্রেরণ করে বিরুদ্ধ-শক্তিকে সমুচিত শিক্ষা প্রদান অপরিহার্য হয়ে পড়ে। রাসূলুল্লাহ (সা) যুদ্ধবন্দীদের সাথে যে মানবিক আচরণ করেছেন, মানবজাতির ইতিহাসে তা এক অতুলনীয় আদর্শ হয়ে আছে।
লেখক : বিভাগীয় প্রধান, বাংলা বিভাগ, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

SHARE

Leave a Reply