রাসূল সা-এর সাংসারিক জীবন । আবুল হাসেম মোল্লা

সাংসারিক জীবনের শান্তি সুখ একজন মানুষকে প্রকৃত সুখী করে তুলতে অনবদ্য ভূমিকা পালন করে। টাকা কড়ি বিত্ত বৈভবের পরিমাণ যতই হোক না কেন, সংসারে সুখ না থাকলে ব্যক্তি ভিতর থেকে অন্তঃসারশূন্য হয়ে পড়ে। স্বাভাবিক জীবন ধারণে ব্যত্যয় ঘটে মারাত্মকভাবেমহান আল্লাহ তায়ালার অগণিত সৃষ্টির মাঝে সেরা সৃষ্টি হলো মানবজাতি, যাদেরকে অভিহিত করা হয় আশরাফুল মাখলুকাত অভিধায়। মূলত জ্ঞান-বুদ্ধির বিবেচনায় ও দায়িত্ববোধ সম্পন্ন বৈশিষ্ট্যের কারণেই মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকৃত হয়েছে। একজন মানুষ কোন না কোনভাবে অপরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকে। পারস্পরিক নির্ভরশীলতার এই অনুশীলনের প্রাথমিক কেন্দ্র হচ্ছে পরিবার তথা সংসার। সংসারে যে যত বেশি ত্যাগ, অপরকে অগ্রাধিকার দান, ভারসাম্যপূর্ণ নীতি ইত্যাকার সদাচরণ মেনে চলার প্রশিক্ষণ লাভ করে থাকে; সামাজিক ও ব্যাষ্টিক জীবনে সে তত বেশি সফল ও আদর্শ মানুষ হিসেবে আত্মপরিচয় লাভ করে থাকে। এ কথা দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট যে, মানবজীবন পরিচালনার যতগুলো দিক ও বিভাগ রয়েছে প্রতিটি ক্ষেত্রেই মানবতার মহান শিক্ষক বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সা) ছিলেন সর্বোত্তম আদর্শের অধিকারী। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেছেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহর রাসূলের জীবনেই রয়েছে তোমাদের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ।” (সূরা আহজাব : ৩৬)। যেহেতু জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন উন্নত চরিত্রের মূর্ত প্রতীক সে হিসেবে সাংসারিক জীবনেও যে তিনি কালজয়ী আদর্শের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তা আলাদা বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রচণ্ড অভাবের মুখোমুখি হয়েও তৃপ্তির ঢেঁকুর, স্ত্রীগণের সাথে ভালোবাসা বিনিময়, অধীনস্থদের সাথে ক্ষমা ও কোমল আচরণ, মেহমানদারির অনুপম ত্যাগ, আল্লাহ তায়ালার জন্য সর্বস্ব ত্যাগ করার অদম্য প্রেরণা লালন করেও যিনি সংসারবিমুখ হননি, বিশ্বনেতা হয়েও অনাড়ম্বর জীবন ধারণের যে চিত্র তিনি অঙ্কন করেছেন; যে কোন পাষাণ হৃদয়ের অধিকারীও তাঁর ভালোবাসায় উদ্বেলিত না হয়ে পারে না। অধুনা পরিবারবিমুখ বস্তুগত দর্শনের করাল গ্রাসে নিপতিত হয়ে যে মানবতা ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মৃত্যুর প্রহর গুনছে, হতাশাগ্রস্ত হয়ে আত্মহত্যার ন্যায় জঘন্য পথে পা বাড়াচ্ছে; সে মানবগোষ্ঠীকে জীবনের প্রকৃত স্বাদ আস্বাদন করাতে কিয়ামত পর্যন্ত তাঁর আচরিত আদর্শের কোন বিকল্প হতে পারে না। দিকহারা মানবতার আশার আলো হিসেবে আলোকবর্তিকার ভূমিকায় অবস্থান করছে রাসূল (সা) এর সাংসারিক জীবনের অনন্য আদর্শ। বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধে রাসূল (সা) এর সে অসাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলো তুলে ধরার প্রয়াস পাবো।
স্ত্রীগণের সাথে গল্প : রাসূল (সা) বেরসিক অথবা নীরস ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন না। তিনি সাংসারিক প্রয়োজনে স্ত্রীগণের সাথে পরামর্শ, গল্প, ভাব বিনিময় করে সময় কাটাতেন। তবে সালাতুল ইশা আদায়ের পরে কথাবার্তা বলে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করাকে তিনি অপছন্দ করতেন। হাদিসের বাণী, “আর তিনি (রাসূল) ইশার সালাতের পূর্বে নিদ্রা যাওয়া এবং পরে কথাবার্তা বলা অপছন্দ করতেন।” (বুখারি, ই.ফা-৫২০)
ইনসাফকরণ : রাসূল (সা) ছিলেন ন্যায় ইনসাফের মূর্ত প্রতীক। তাঁর সাংসারিক জীবনের একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়েও তিনি ন্যায় নিষ্ঠতার ব্যত্যয় ঘটাননি। তিনি বলেছেন, যাদের একাধিক স্ত্রী আছে অথচ সে তাদের প্রতি ইনসাফ না করে কারো প্রতি জুলম করে; তাহলে কিয়ামতের দিন সে শরীরের একাংশ অবশ অবস্থায় উত্থিত হবে। এটা তিনি শুধু কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেননি বরং তিনিও তাঁর স্ত্রীগণের মাঝে ইনসাফ করত পালা বদল করে সময় দিতেন।
সন্তান পরিপালন : প্রসিদ্ধ মতে রাসূল (সা) এর দুইজন পুত্র ও চারজন কন্যা সন্তান ছিলেন। প্রথম সন্তানের নাম ছিল কাসেম। সে হিসেবে তাঁর উপনাম ছিল আবুল কাসেম। অপরজনের নাম ছিল আবদুল্লাহ। ছেলেদের দু’জনই শিশু অবস্থায় মৃত্যুবরণ করায় ‘তিনি নির্বংশ’ বলে কাফেররা মানসিকভাবে দুর্বল করার লক্ষ্যে প্রচার শুরু করে দেয়। মেয়েদের মধ্যে জয়নাব ছিলেন সবার বড়। এরপর ছিলেন রুকাইয়া, উম্মে কুলসুম ও ফাতেমা। উনারা সবাই স্ত্রী খাদিজার (রা) গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। নবুয়ত লাভের পূর্বেই সন্তানগণের জন্ম ও পরিপালন হওয়ায় তার বিস্তারিত বিবরণ তত সমৃদ্ধভাবে পাওয়া যায়নি। তবে সবার কনিষ্ঠ হওয়ায় ফাতেমা (রা) এর প্রতি উনার অসাধারণ মমত্ববোধের পরিচয় পাওয়া যায়। রাসূল (সা) বলেছেন, “ফাতেমাকে যে কষ্ট দেয় সে মনে হয় যেন আমাকেই কষ্ট দেয়।”
হাসি-কৌতুক করা : আত্মিক এবং জৈবিক দুটি বৈশিষ্ট্যের সমন্বয়ে মানবসত্তা গঠিত। জৈবিক চাহিদা মিটানোর প্রয়োজনে মানুষ যেমন খাবার গ্রহণ করে থাকে ঠিক একইভাবে মনের আনন্দ লাভের নিমিত্তেও মানুষের হাসি, কৌতুক ও বিনোদনের প্রয়োজন হয়ে থাকে। রাসূল (সা) অত্যন্ত গাম্ভীর্যপূর্ণ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও তিনিও সাংসারিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে নির্মল হাস্যরস করে পরিবেশ প্রাণবন্ত করে রাখতেন। একবার আয়েশা সিদ্দিকা (রা) রাসূল (সা) এর সাথে উচ্চস্বরে কথা বলছিলেন এমন সময় তাঁর পিতা আবু বকর (রা) এসে উপস্থিত হলেন। তিনি মেয়ের হাত ধরে চড় মারতে উদ্যত হলেন আর বললেন, ভবিষ্যতে কখনো যাতে রাসূল (সা)-এর কণ্ঠের চেয়ে তোমার গলার আওয়াজ বড় না শুনি। রাসূল (সা) আবু বকর (রা)কে শান্ত করার চেষ্টা করলেন। রাগান্বিত অবস্থায় আবু বকর (রা) চলে যাওয়ার পর রাসূল (সা) স্বীয় স্ত্রী আয়েশাকে (রা) বললেন, দেখলে তো! এই লোকটার হাত থেকে আমি তোমাকে কিভাবে বাঁচালাম? (মিশকাত : ৪৮৯১)। আরেকবার রাসূল (সা) তাঁর স্ত্রীগণের সাথে অভিমান করলেন। তিনি বললেন, আমি আর এক মাস তোমাদের সাথে কোন সম্পর্ক রাখব না। স্ত্রীগণ ব্যথিত হলেন। কিন্তু রাসূল (সা) তাঁর সিদ্ধান্তে অনড়। তিনি ঘরের উপরে আলাদা মাচা তৈরি করে থাকলেন। কারো সাথে কোন সম্পর্ক রাখলেন না। এভাবে চলছিল, ২৯তম দিনে তিনি নেমে এলেন। তখন স্ত্রীগণ একে অপরের সাথে টিপ্পনী কেটে বলছিলেন, দেখছ! উনি বলেছেন এক মাসের মধ্যে নামবেন না। এখন দেখি ২৯ দিনেই নেমে এসেছেন। তখন মানবতার মহান শিক্ষক মুহাম্মদ (সা) মুচকি হেসে বললেন, মাস তো ২৯ দিনেও হয়। (বুখারি : ই.ফা-১৭৮৬)
জীবনসঙ্গীর অন্তরের চাওয়া অনুধাবন : আয়েশা সিদ্দিকা (রা) মাঝে মধ্যে স্বামী মুহাম্মদ (সা) এর সাথে হালকা মান-অভিমান করতেন। রাসূল (সা) যে তা বুঝতেন না, তা কিন্তু নয়। বরং তিনিও তা সুন্দরভাবে উপস্থাপন করে সমাধা করে জীবনসঙ্গিনীর মন জয় করে নিতেন। হাদিসের বাণী, “রাসূল (সা) বলেছেন, হে আয়েশা! আমি তোমার রাগ ও খুশি উভয়ই বুঝতে পারি। আয়েশা (রা) বললেন, আমি জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি তা কিভাবে বুঝতে পারেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ? তিনি বললেন, যখন তুমি খুশি থাক, তখন তুমি বলো : হ্যাঁ, মুহাম্মদের রবের কসম! আর যখন তুমি রাগান্বিত হও, তখন তুমি বলে থাকো : না, ইবরাহীমের রবের কসম! আয়েশা (রা) বললেন, আমি বললাম হ্যাঁ। আমিতো শুধু আপনার নামটা বর্জন করি। (বুখারি, ই.ফা-৫৬৪৯)
সাংসারিক জীবনের শান্তি সুখ একজন মানুষকে প্রকৃত সুখী করে তুলতে অনবদ্য ভূমিকা পালন করে। টাকা কড়ি বিত্ত বৈভবের পরিমাণ যতই হোক না কেন, সংসারে সুখ না থাকলে ব্যক্তি ভিতর থেকে অন্তঃসারশূন্য হয়ে পড়ে। স্বাভাবিক জীবন ধারণে ব্যত্যয় ঘটে মারাত্মকভাবেসংসারের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অন্যকে সুযোগ না দেয়া : হাফসা (রা) এর ব্যাপারে একবার উমর (রা)কে তাঁর স্ত্রী বললেন, তুমি আমার সাথে প্রভাব খাটাও! আর তোমার মেয়ে হাফসাসহ অন্যরা স্বীয় স্বামী মুহাম্মদ (সা) এর সাথে সাথে (পাল্টা) কথা বলে! এ কথা শুনে ওমর ফারুক (রা) তৎক্ষণাৎ গিয়ে মেয়েকে ধমক দিয়ে বুঝালেন। এরপর আয়েশাকে (রা) সতর্ক করলেন। ধারাবাহিকভাবে ওমর (রা) রাসূল (সা)-এর স্ত্রী উম্মু সালামাহর (রা) সাথেও এ বিষয়ে আলোচনা করলেন। ওমর (রা) বললেন, “এক পর্যায়ে উম্মু সালামাহ (রা) বললেন, হে খাত্তাবের বেটা! কী আশ্চর্য! তুমি প্রত্যেক ব্যাপারেই নাক গলাচ্ছ! রাসূল (সা) ও তাঁর স্ত্রীদের মধ্যকার ব্যাপারেও তুমি হস্তক্ষেপ করতে চাচ্ছ। আল্লাহর কসম, তিনি আমাকে এত শক্তভাবে ধরলেন যে, আমার রাগ খতম হয়ে গেল।… কিছুক্ষণ পরে আমি পুরো ঘটনা রাসূল (সা) এর কাছে বলছিলাম। উম্মু সালামাহর সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনা শুনে রাসূল (সা) মুচকি হাসলেন।” (বুখারি, ই.ফা-৪৫৪৮)।
হালকা মনোমালিন্য: সাংসারিক জীবনে হালকা মান অভিমান ঘটে যাওয়া নিন্দনীয় নয়। বরং উদ্ভূত পরিস্থিতি কিভাবে সমাধান করা যায় এর মধ্যেই রয়েছে প্রকৃত সফলতা। রাসূল (সা) বিশ্ব মানবতার মহান শিক্ষক ও গাম্ভীর্যপূর্ণ আদর্শিক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিলেন বটে। কিন্তু সাংসারিক জীবনে স্ত্রীগণের সাথে তাঁর কখনো কোন মান অভিমান ঘটেনি; ব্যাপারটা কিন্তু এমন নয়। বরং একজন মানুষ হিসেবে উনাকেও মাঝে মধ্যে দু-একটি বিষয়ে স্ত্রীগণের পরস্পরের স্বামীর প্রতি ভালোবাসার আধিপত্য নিয়ে পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়েছিল। (সূরা তাহরিমের ১,২ আয়াতের তাফসির দ্রষ্টব্য)। অবশ্য উন্নত চরিত্রের চূড়ান্ত আদর্শ মুহাম্মদ (সা) এখানেও আদর্শের যে ছাপ রেখেছেন; কিয়ামত পর্যন্ত প্রতিটি সংসারী নারী-পুরুষকে অনুপ্রাণিত করবে। রাসূল (সা) এর ন্যায় মহান ব্যক্তিত্বের ক্ষেত্রেও এমন ঘটনার বাস্তবতা দেখে আমাদের মতো যেকোনো সাধারণ মানুষ হতাশ না হয়ে বরং সমাধানের রাস্তা খুঁজে পাবে।
প্রচন্ড লজ্জাশীলতা : সাংসারিক জীবনের প্রাইভেসি রক্ষার ব্যাপারে রাসূল (সা) অত্যন্ত শক্ত অবস্থানে ছিলেন। স্বামী-স্ত্রীর একান্ত গোপনীয়তা বাহিরে প্রকাশ করাকেও তিনি জঘন্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করেছেন। একবার রাসূল (সা) তাঁর গৃহাভ্যন্তরে থাকা অবস্থায় বাহির থেকে কেউ একজন উঁকি দেয়ার চেষ্টা করেছে। রাসূল (সা) প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হলেন। হাদিসের বাণী, “একদিন জনৈক ব্যক্তি রাসূল (সা) এর দরজার ছিদ্র দিয়ে উঁকি দিল। তখন রাসূল (সা) এর হাতে একটি শলাকা ছিল যা দিয়ে তিনি মাথা চুলকাচ্ছিলেন। এমতাবস্থায় তিনি বললেন, আমি যদি নিশ্চিতভাবে জানতাম যে তুমি সংগোপনে আমার দিকে তাকাচ্ছ, তাহলে আমি এ শলাকা দ্বারা তোমার চোখ ফুঁড়ে দিতাম। কেননা অনুমতি নেয়ার বিধান চোখের কারণেই দেয়া হয়েছে। (বুখারি : ৬৯০১)। রাসূল (সা) এর লজ্জাশীলতা এত প্রবল ছিল যা কুমারী নারীর চেয়েও প্রাধান্য লাভ করেছিল, (বুখারি, ই.ফা-৫৬৮৯)। রাসূল (সা) এর নিমন্ত্রণপ্রাপ্ত হয়ে অনেকে উনার গৃহে খাবারে অংশগ্রহণ করতেন। কিন্তু কেউ কেউ খাবার শেষ করে এত দীর্ঘ সময় গল্পে জড়িয়ে পড়তেন যাতে রাসূল (সা) এর সাংসারিক স্বাভাবিক কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটত। কিন্তু তিনি প্রচণ্ড লজ্জাশীলতায় কিছু বলতে পারতেন না অধিকন্তু বিব্রতবোধ করতেন। কুরআনের বাণী, “আর যখন তোমাদেরকে ডাকা হবে তখন তোমরা প্রবেশ কর এবং খাবার শেষ হলে চলে যাও আর কথাবার্তায় লিপ্ত হয়ো না; কারণ তা নবীকে কষ্ট দেয়, তিনি তোমাদের বিষয়ে সংকোচ বোধ করেন; কিন্তু আল্লাহ সত্য প্রকাশে সংকোচ বোধ করেন না।” (সূরা আহজাব, ৩৩:৫৩)
অধীনস্থদের সাথে উত্তম ব্যবহার : রাসূল (সা) এর পরিবারে দীর্ঘ সময় আনাস (রা) খাদেম হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। দীর্ঘ সময়ে তিনি রাসূল (সা) এর সাথে ঘটে যাওয়া আচরণ সম্পর্কে বলেন, “আমি রাসূল (সা) এর খেদমতে দশ বছর ছিলাম। আল্লাহর কসম! তিনি আমাকে কখনও বলেননি যে, উফ! কখনও বলেননি এমনটা কেন করলে? অথবা কখনও বলেননি যে, এমনটা কেন করলে না? (মুসলিম, শামেলা: ২৩০৯)
চুলায় আগুন জ্বলেনি দুই মাস : রাসূল (সা) চাইলে আল্লাহ তায়ালা তাঁকে উহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণের অধিকারী বানিয়ে দিতেন। তিনি তা চাননি, তিনি পরকালীন প্রাপ্তির আশায় আত্মত্যাগের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। অধিকন্তু অন্যদের পক্ষ থেকে প্রাপ্ত উপহারও অসহায় মানবতার মাঝে বিলিয়ে দিয়ে তিনি পরমানন্দ লাভ করতেন। সংসারে অনেক সময় নিয়মিত খাদ্যের আয়োজনও থাকত না। আয়েশা (রা) বলেন, “আমরা দুই মাসের মধ্যে তিনবার নয়া চাঁদ দেখতাম। কিন্তু এর মধ্যে রাসূলুল্লাহর (সা) গৃহগুলোতে রান্নার জন্য আগুন জ্বালানো হতো না। জিজ্ঞাসা করা হলো, আপনাদের জীবন ধারণের কী ছিল? আমি বললাম, কালো দু’টি জিনিস। খেজুর আর পানি। অবশ্য রাসূলের (সা) এর প্রতিবেশী কয়েকজন আনসার সাহাবীর অনেকগুলো দুগ্ধবতী প্রাণী ছিল। তারা তাঁকে সেখান থেকে দিত। তখন তা আমরা পান করে নিতাম। (বুখারি, ই.ফা-৬০১৫)
খাবারের দোষ না ধরা : আমরা জানি সাংসারিক কাজের একটা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো রান্নাবান্নার আয়োজন সম্পন্ন করা। রান্না কাজের সাথে যারা জড়িত থাকেন তারা আগুনের প্রচণ্ড তাপ সহ্য করে ঘর্মাক্ত হয়ে অক্লান্ত পরিশ্রম করে খাবারের উপযোগী করে তুলেন। ফলে রান্নার ব্যাপারে ন্যূনতম নেতিবাচক আচরণও রান্নাকারীকে লজ্জিত এবং বিব্রত করে তুলে। বহু মানুষ এ ক্ষেত্রে ত্যাগের দৃষ্টান্ত স্থাপনে সফলতার পরিচয় দিতে ব্যর্থ হন। কিন্তু রাসূল (সা) ছিলেন অত্যন্ত নির্মল চিন্তার অধিকারী। তাঁর আচরণ, কথা, দৃষ্টি প্রদান, শারীরিক ভঙ্গিসহ কোন প্রতিক্রিয়াতেই যাতে কেউ এতটুকু কষ্টও না পায় এ ব্যাপারে তিনি শতভাগ সতর্ক ছিলেন। এ জন্য তাঁর দীর্ঘ জীবনে কখনো তিনি খাবারের দোষ ধরতেন না। পছন্দ হলে খেতেন অন্যথায় এড়িয়ে যেতেন। আবু হুরাইরা (রা) বর্ণনা করেন, “নবী (সা) কখনো খাবারের দোষ ধরতেন না, পছন্দ হলে খেতেন অন্যথায় ছেড়ে দিতেন।” (বুখারি, শামেলা : ৩৫৬৩)
পছন্দনীয় খাবার : বকরির কাঁধের অংশের গোশত, ছাতু, লাউ এ জাতীয় খাবার রাসূল (সা) এর পছন্দনীয় খাবার হিসেবে গণ্য ছিল। সিরকাকে তিনি উত্তম তরকারী হিসেবে মন্তব্য করেছেন। মধু ও মিষ্টি জাতীয় দ্রব্য পছন্দ করতেন। কিন্তু সকলে একসাথে খাওয়া ব্যতীত একান্ত ব্যক্তিগতভাবে তিনি কখনো তৃপ্তিভরে খাননি। সাফিয়্যা (রা) এর সাথে অনুষ্ঠিত তাঁর বিয়ের অলিমা সম্পন্ন হয়েছিল খেজুর এবং ছাতু দ্বারা। পাতিলের তলায় লেগে থাকা খাবার সচরাচর অন্যরা খেতে না চাইলেও রাসূল (সা) কিন্তু সেটা অধিক পছন্দ করতেন। (শামায়েলে তিরমিযী দ্রষ্টব্য)।
খাবারও খেতেন বাজারেও যেতেন : জীবন ধারণের জন্য খাবার গ্রহণ ও বেচাকেনার সম্পৃক্ততা মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। রাসূল (সা) তিনিও মানবসত্তায় গঠিত, তিনি মানবের ঊর্ধ্বে ছিলেন না। সে হিসেবে প্রকৃতগত এ বিষয়গুলোও এড়িয়ে যাওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না। মানুষ হয়ে তিনি যেন সমজাতীয় মানুষের আবেগ, অনুভূতি বুঝে তাদেরকে সংশোধনের চেষ্টা করেন; এ লক্ষ্যেই আল্লাহ তায়ালা তাঁকে রাসূল করে পাঠিয়েছেন। মানব সমাজে কোন ফেরেশতাকে রাসূল করে পাঠাননি। কিন্তু অবিশ্বাসীরা এতে নানান ধরনের কুতর্কে লিপ্ত হয়ে বলতে থাকে, “এ আবার কেমন রাসূল খাবারও খায় এবং বাজারেও যায়।” (সূরা ফুরকান : ৭)। মূলত আল্লাহ তায়ালা তাঁকে সংসারবিমুখ বৈরাগ্যবাদী দর্শন দিয়ে পৃথিবীতে পাঠাননি। বরং তাঁকে সংসারী করেই পাঠিয়েছেন। অথচ আজও কিছু মানুষ জ্ঞানের স্বল্পতার কারণে তথাকথিত বৈরাগ্যবাদকে ধার্মিক হওয়ার পূর্বশর্ত হিসেবে গণ্য করে। যা নিতান্তই অজ্ঞতা ও বাস্তবতা বিবর্জিত চিন্তাধারা বৈ অন্য কিছু নয়।
পিঠে চাটাইয়ের দাগ : একদিন দ্বিপ্রহরে হযরত ওমর ফারুক (রা) রাসূল (সা) এর সাক্ষাতে গেলেন। রাসূল (সা) তখন চাটাইয়ের ওপর শায়িত ছিলেন। তাঁর মাথার নিচে ছিল খেজুরের ছালভর্তি চামড়ার একটি বালিশ এবং পায়ের কাছে ছিল সল্ম গাছের পাতার একটি স্তূপ ও মাথার ওপর লটকানো ছিল চামড়ার একটি মশক। আমি রাসূল (সা) এর এক পাশে চাটাইয়ের দাগ দেখে কেঁদে ফেললে তিনি বললেন, তুমি কেন কাঁদছ? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! কিসরা ও কায়সার পার্থিব ভোগ বিলাসের মধ্যে ডুবে আছে। অথচ আপনি আল্লাহর রাসূল। তখন রাসূল (সা) বললেন, তুমি এতে সন্তুষ্ট নও যে, তারা দুনিয়া লাভ করুক আর আমরা আখেরাত লাভ করি। (বুখারি, ই.ফা-৪৫৪৮)। এভাবেই মানবতার মহান শিক্ষক আত্মত্যাগের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে আর্তমানবতার সেবায় জীবন অতিবাহিত করেন।
গোসলের ক্ষেত্রে পর্দা টাঙানো : ইতঃপূর্বে আলোচিত হয়েছে যে, রাসূল (সা) কুমারী নারীর চেয়েও বেশি লজ্জাশীল ছিলেন। আধুনিক কালের ন্যায় সে সময় গোসল করার জন্য ঘরের ভিতরে উন্নত ব্যবস্থা ছিল না। কিন্তু সে সময়ও রাসূল (সা) গোসল করার ক্ষণে একটা পর্দা টাঙিয়ে তার আড়ালে গোসল করতেন। (বুখারি, কিতাবুল গোসল)
মেহমানদারি করানো : রাসূল (সা) এর পরিবারে খাবারের প্রাচুর্যতা ছিল না। বরং অভাব অনটনের মুখোমুখি হয়ে কখনও কখনও মাস পেরিয়ে যেত কিন্তু তাঁর চুলায় রান্নার জন্য কোন আগুন জ্বালানোর সুযোগ হতো না। এতদসত্ত্বেও কোন ক্ষুধার্ত ব্যক্তিকে খাদ্য দানে অথবা যে কোন আগন্তুককে মেহমানদারি করাতে তাঁর আন্তরিকতা, তৎপরতার কোন কমতি ছিল না। চাচাতো ভাই আলীকে (রা) নিজের পরিবারের নিয়মিত সদস্য গণ্য করে খোরপোষ দিয়েছেন। যায়দ বিন হারেসাকে (রা) পালকপুত্র হিসেবে লালন পালন করেছেন। নবুয়াত প্রাপ্তির পূর্ব থেকেই তাঁর এ উন্নত গুণাবলীর অনুশীলন ছিল সর্বজনবিদিত। এজন্য হেরা গুহায় প্রথম অহি পেয়ে তিনি যখন মানসিকভাবে চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েন তখন জীবন সঙ্গিনী খাদিজা (রা) বলেন, “অসম্ভব! কক্ষনো নয়, আল্লাহর কসম! আল্লাহ তায়ালা আপনাকে লজ্জিত করবেন না। কেননা আপনি আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখেন, আপনি মেহমানদারি করে থাকেন, অক্ষমের বোঝা বহন করে দেন..।” (বুখারি, ই.ফা-০৩)
স্বামী-স্ত্রীর প্রচন্ড ভালোবাসা : যে কোন সংসারের প্রধান অনুষঙ্গ স্বামী-স্ত্রীর মধুর সম্পর্ক। স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শনে রাসূল (সা) এর আচরণ ছিল অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী। আয়েশা (রা) বলেন, “আমি হায়েজ অবস্থায় হাড় চুষে খেয়ে তা নবীকে (সা) দিতাম। তিনিও তাঁর মুখ ঐ স্থানে লাগাতেন, যেখানে আমি লাগিয়েছি। আবার পানীয় দ্রব্য পান করে তাঁকে দিতাম, তিনি তখন ঐ স্থান থেকে পান করতেন যেখানে মুখ লাগিয়ে আমি পান করেছি।” (আবু দাউদ, শামেলা : ২৫৯)
মৃত স্ত্রীর বান্ধবীদের হাদিয়া পাঠানো : রাসূল (সা) এর আচরিত আদর্শ ছিল কালজয়ী, বিরল চরিত্রের সম্মিলন ঘটেছে তাঁর জীবনের পরতে পরতে। যে আদর্শ অনুসরণে কিয়ামত পর্যন্ত প্রতিটি সংসারী মানুষের জীবনে ভালোবাসার ছোঁয়া প্রবহমান থাকবে। স্ত্রী খাদিজা (রা) এর মৃত্যুর পরেও তিনি তাঁর প্রতি ভালোবাসার যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা পৃথিবীর ইতিহাসে অনন্য নজির হয়ে থাকবে। আয়েশা সিদ্দিকা (রা) বলেন, “আমি নবী (সা) এর কোন সহধর্মিণীর প্রতি এতটা অভিমান প্রদর্শন করিনি; যতটুকু খাদিজার (রা) প্রতি করেছি। কেননা আমি নবী (সা) এর নিকট তাঁর কথা বারবার শুনেছি, অথচ আমাকে বিবাহ করার পূর্বেই তিনি ইন্তেকাল করেছেন। .. কোন দিন বকরি জবেহ হলে খাদিজার (রা) বান্ধবীদের নিকট তাদের প্রত্যেকের আবশ্যক পরিমাণ গোশত নবী (সা) হাদিয়াস্বরূপ পাঠিয়ে দিতেন।” (বুখারি, ই.ফা-৩৫৪৪)
আল্লাহর হক ও বান্দার হকে ভারসাম্য: আল্লাহ তায়ালা মানুষকে এ পৃথিবীতে দ্বিবিধ দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছেন। পরকালীন মুক্তির আশায় আল্লাহ তায়ালার ইবাদাতে যেমন মগ্ন থাকা বাঞ্ছনীয় ঠিক একইভাবে সংসার, সমাজের মানুষের দায়িত্ব পালনও এর আওতাভুক্ত। রাসূল (সা) এ ক্ষেত্রে শতভাগ ভারসাম্যতার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি রাতে সালাতে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে পা ফুলে ফেটে পড়ার উপক্রম হতো। এতদসত্ত্বেও তিনি তাঁর স্ত্রীগণের হক আদায়ের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ সচেতন ছিলেন। একবার কিছু লোক এসে নিজেদের ইখলাস জানান দেয়ার স্বার্থে নিজেদের ব্যাপারে নারী সংস্রব ত্যাগের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। রাসূল (সা) এমনটা শুনে রাগান্বিত হয়েছেন। তিনি বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে আল্লাহ তায়ালাকে আমিই সবচেয়ে বেশি ভয় করি। আমি রাতে ঘুমাই আবার সালাতও আদায় করি, আমি আমার স্ত্রীগণকে সময় দেই। এটাই আমার সুন্নাহ, যে ব্যক্তি আমার সুন্নাহ থেকে বিমুখ হবে সে আমার অন্তর্ভুক্ত নয়। (বুখারি, শামেলা : ৫০৬৩)


সাংসারিক জীবনের শান্তি সুখ একজন মানুষকে প্রকৃত সুখী করে তুলতে অনবদ্য ভূমিকা পালন করে। টাকা কড়ি বিত্ত বৈভবের পরিমাণ যতই হোক না কেন, সংসারে সুখ না থাকলে ব্যক্তি ভিতর থেকে অন্তঃসারশূন্য হয়ে পড়ে। স্বাভাবিক জীবন ধারণে ব্যত্যয় ঘটে মারাত্মকভাবে।


সাংসারিক জীবনের শান্তি সুখ একজন মানুষকে প্রকৃত সুখী করে তুলতে অনবদ্য ভূমিকা পালন করে। টাকা কড়ি বিত্ত বৈভবের পরিমাণ যতই হোক না কেন, সংসারে সুখ না থাকলে ব্যক্তি ভিতর থেকে অন্তঃসারশূন্য হয়ে পড়ে। স্বাভাবিক জীবন ধারণে ব্যত্যয় ঘটে মারাত্মকভাবে। পক্ষান্তরে সংসারের সুখী মানুষ শুধু মানসিক তৃপ্তি বোধ করে তাই নয়; বরং বহু অসাধ্য কাজ সাধনও তার জন্য সহজ হয়ে পড়ে। কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন অধিকার ও কর্তব্যের ভারসাম্য রক্ষাকরণ। অথচ অধুনা আমরা নিজেদের অধিকারের ব্যাপারে যতটা সচেতন কর্তব্য পালনে ততটা সচেতন নই। ফলে সংসারের প্রকৃত সুখ অর্জনে অনেকেই ব্যর্থ হন। এ ব্যর্থতার গ্লানি কাটিয়ে উঠতে প্রয়োজন ত্যাগ, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সহমর্মিতা ও অগ্রাধিকার প্রদানের দৃষ্টান্ত স্থাপন। আর রাসূল (সা) সে কাজটিই আঞ্জাম দিয়েছেন অত্যন্ত সুনিপুণভাবে। আজও কোন ব্যক্তি, পরিবার, সংসারে যদি রাসূল (সা) এর এ নীতি অনুসৃত হয়ে থাকে; ভঙ্গুর এ পৃথিবীতে এখনও সংসারে স্বর্গীয় সুখ আস্বাদন করা অবশ্যই সম্ভব যা আলাদা বলার অপেক্ষা রাখে না। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে জীবনের প্রতিটি ধাপে রাসূল (সা) এর আদর্শ অনুসরণ করে সুখী সমৃদ্ধ সংসার, সমাজ, রাষ্ট্র গঠনের তাওফিক দান করুন, আমিন।
লেখক : বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ

SHARE

Leave a Reply