রিসালাতে মুহাম্মদী ও দায়ী-ইলাল্লাহ

অধ্যাপক মফিজুর রহমান

index يَا أَيُّهَا الْمُدَّثِّرُ – قُمْ فَأَنذِرْ – وَرَبَّكَ فَكَبِّرْ – وَثِيَابَكَ فَطَهِّرْ – وَالرُّجْزَ فَاهْجُرْ -وَلا تَمْنُنْ تَسْتَكْثِرُ – وَلِرَبِّكَ فَاصْبِرْ

Translation

i. You Mohammad’(s) enveloped in garments! ii. Arise and warn. iii. And Magnify Your Lord-Allah. iv. And Purify Your garments v. And keep away from as Rujz (the idols) vi. And show not favour seeking worldly gain vii. For the soke of thy lord, be patient.

অনুবাদ
১. হে বস্ত্রাচ্ছাদিত, ২. উঠ এবং সতর্ক কর, ৩. আর তোমার রবের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা কর, ৪. তোমার পরিচ্ছদ পবিত্র রাখ, ৫. শিরক পরিহার করে চল, ৬. অধিক পাওয়ার আশায় দান করো না, ৭. আল্লাহর দিকে চেয়ে ধৈর্য ধারণ কর। (সূরা মুদ্দাসসির : ১-৭ )
 পটভূমি
নামকরণ : الْمُدَّثِّرُ এ সূরার প্রথম শব্দ থেকে নামকরণ করা হয়েছে শব্দটির অর্থ বস্ত্রাবৃত

Enveloped in garments. এটি একটি

symbolical Word. প্রতীকী এ শব্দটির মধ্যে হাজার বিষয় লুকিয়ে রয়েছে।
শানে নজুল : ইহা মক্কায় অবতীর্ণ প্রথম অহি নাজিলের ১০ দিন পর ইহা দ্বিতীয় অহি। ইহা নবুওয়তের প্রথম পর্যায়ে নাজিল হয়।
বিষয়বস্তু : এখানে নবুওয়তে মুহাম্মদীর গুরুদায়িত্ব। এ পথের সীমাহীন নির্যাতন ও ধৈর্যের পরামর্শ দাওয়াতের মূল বিষয় মানবতার গাফিলতির বিষয় সতর্ক করা। প্রভুর সার্বভৌমত্ব ঘোষণা সত্যকে অমান্যকারীদের পরিণতি। সালাতে অবহেলা, বঞ্চিতদের অধিকার নিশ্চিত না করার ও পরকালের প্রতি বিশ্বাসহীনতার পরিণতি শুভ হবে না। শিরকের ও মূর্তিপূজার ক্ষতি ও ক্ষমাহীনতার সতর্কবাণী। আর ঈমান ও খোদাভীতির পথে রয়েছে মুক্তি। আয়াতগুলো সংক্ষিপ্ত, ছোট ছোট কিন্তু ব্যঞ্জনায় ও অর্থে, গভীরতায় যেন অতল। মক্কা যুগের সূরাগুলোর মত মূল বিষয় ঈমানসংক্রান্ত তাওহিদ, রেসালাত ও পরকালকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। আর নবীগণ এসেছিলেন মূলত ঈমানের দাওয়াত নিয়ে।

তাফসির :
এবার একে একে সাতটি আয়াতের ব্যাখ্যার দিকে যেতে চাই।
يَا أَيُّهَا الْمُدَّثِّرُ
হে বস্ত্রাবৃত ‘মুহাম্মদ (সা)’
এই ভাবে ডাকাটি একটি তাৎপর্যবহ।
সারা কুরআনে কোথাও এমন দেখা যায় না আল্লাহ তায়ালা ‘হে মুহাম্মদ! বলে ডেকেছেন। যদিও অন্যান্য নবী-রাসূলদের নাম ধরে আল্লাহ তায়ালা ডেকেছেন। যেমন-হে আদম, হে মূসা, ইবরাহিম, ইয়া নূহ। সম্ভবত এর মধ্যেও মহান প্রভু মুহাম্মদ (সা)-এর মর্যাদার বুলন্দি দিয়েছেন। যখন ডাকার প্রয়োজন হয়েছে আল্লাহ তায়ালা লকব তথা বিশেষণ দিয়ে সম্বোধন করেছেন মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা)কে। যেমন يا ايُها الرسول يا ايُها النبئُ
ইত্যাদি বলে সম্বোধন করেছেন। নবুওয়তের দায়িত্বভারে রাসূল যখন কম্পমান, জিবরাইলকে পূর্ণ অবয়বে দেখেছিলেন আকাশ পৃথিবীজুড়ে রয়েছে যা দেখে প্রথমবারের মতো তিনি সহধর্মিণী হযরত খাদিজাকে কম্বল জড়িয়ে দিতে বলেন زملوني
“আমাকে কম্বল জড়িয়ে দাও।” (বুখারী) لقد خشيت علئ نفسي“আমার জীবন সম্পর্কে আশঙ্কা করছি।” কয়েকদিনের ব্যবধানে দ্বিতীয় অহিতেও একই অনুভূতিতে তিনি চাদর আবৃত অবস্থায়। আল্লাহ তায়ালার সম্বোধনটি ছিল অনেক প্রশ্নের সরাসরি জওয়াব। যেন বলা হচ্ছে, নবুওয়তের মহান দায়িত্ব পালনই হচ্ছে সকল প্রতিকূলতার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য মানসিক প্রস্তুতি। সবধরনের বাধার পাহাড় অতিক্রম করার অদম্য সাহস। দায়িত্বের প্রয়োজনে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করার সিদ্ধান্ত। আর সাথে আরাম-আয়েশ, ঝামেলাবিহীন, আশঙ্কামুক্ত জীবনের দূরতম কোন সম্পর্ক নেই। আল্লাহ তায়ালা তাই আরামের কম্বল ও চাদর থেকে বেরিয়ে আসার ও মানবতার মুক্তির কঠিন দায়িত্ব নিয়ে কোমর সোজা করে দাঁড়াবার আহ্বান করেছেন। খুলে ফেলতে হবে ভয় আর হতাশার আবরণ। এ ডাকে যেন মুহাম্মদে আরবিকে ধ্যানস্থ ও নির্লিপ্ততার জীবন থেকে বিশাল কর্মযজ্ঞের আহবান শুনিয়ে দিচ্ছে। সাগরের বেলাভূমি থেকে তরঙ্গবিক্ষুব্ধ অর্থে সমুদ্রে মুহাম্মদ (সা) কে নিক্ষেপ করে দিয়েছে।
قُمْ فَأَنذِرْ
উঠ ও সাবধান কর।

এতদিনের প্রায় ৪০ বছরের নির্লিপ্ত জীবনের খোলস থেকে জাগরিত হও, বেরিয়ে আস। জাগিয়ে দাও মৃতদের বস্তি। শত শত বছরের বেখবরের জিন্দেগির ঘুম ভেঙে দাও। প্রয়োজনে বিশ্বমানবতার নকিব মুহাম্মদকে (সা) সবার আগে ওঠার জন্য বলা হয়েছে قُمْ উঠ। কম্বল ছুড়ে দাও আর সিদ্ধান্ত নিয়ে দাঁড়াও। মহাকবি ইকবাল যেমন বলেন, “তু শম্শীরে যে নিয়ামে খোদ্ বেরুয়াঁ, বেরুয়া আজ নিয়ামে খোদ বেরুয়া” তুমিত শমশের ধারল তরবারি, খাপ থেকে আজ বেরিয়ে আস বাইরে চলছে যুদ্ধের দামামা। পৃথিবী যেন মৃতদের বস্তি। যেখানে মানবতার মৃত্যু হয়ে গেছে। বীভৎস যৌনাচার, নেশা আর রক্তপাত মানবতার শবদেহের ওপর নৃত্য করেছে এক বছর দুই বছর নয়, শত শত বছর ধরে এদের চেহারা শুধু মানুষের। এদের জঘন্য কর্মকা- শয়তানকেও হার মানায়। এ দানবদেরকে তাদের অশ্লীলতা থেকে সাবধান করাও সহজ বিষয় নয় যারা বাধা দেবে তাদেরকে এদের দন্ত, নখরে ক্ষত-বিক্ষত হতেই হবে। মানব ইতিহাসের মধ্যে সে সময়ের আরবদের মত অসভ্যতার নজির আর কখনও কোথায়ও দেখা যায়নি। মূর্তিপূজার এত সমারোহ, শরাব আর নেশার এমন উন্মত্ততা, খুনের ও হত্যার এ জিঘাংসা দেখলে মনে হতো মানবতা, সভ্যতা, শিষ্ঠাচার রুচিবোধ্য, শালীনতা এ জনপদ থেকে বিদায় নিয়েছে শত বছর আগে। আরব উপদ্বীপের বাইরে সমগ্র পৃথিবীতে তখনও অন্ধকারে, কোথায়ও নেই হেদায়তের সামান্য আলোর রশ্মি। একজন পয়গম্বরও পৃথিবীর কোন কোন জনপদে জীবিত নেই। প্রায় ছয়শত বছর পূর্বে ঈসা (আ)কেও উঠিয়ে নেয়া হয়েছে। রাসূল (সা) বলেন, “আমি ও ঈসার মধ্যখানে আর কোন নবী নেই।” যে পৃথিবীর মানুষকে হেদায়াতের পথে আনার জন্য লাখ লাখ আম্বিয়ায়ে কিরাম যুগে যুগে এসেছিলেন ধরণীতে, সে বিশ্ব তখন নবুওয়তের কদম হতে মাহরুম। পৃথিবীতে জমিন তখন অহির আবেহায়াতের জন্য পিপাসার্ত। সে মুহূর্তে আল্লাহ তায়ালা লাখো আম্বিয়ায়ে কেরামের জিম্মাদারি এক সাথে বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সা)-এর ওপর অর্পণ করেন আর নির্দেশ দেন। আমি জীবনের ব্যাপারে আশঙ্কা করছি এই বলে কম্বলের নিচে লুটিয়ে পড়ার সুযোগ নেই। শুধু জাজিরাতুল আরব নয়, সারা পৃথিবীর প্রতিটি জনপদে বিভ্রান্ত, দিশাহারা ও গোমরাহিতে নিমজ্জিত আল্লাহর বান্দাদের সাবধান করা এ দায়িত্ব তোমার। সারা জীবনে কিয়ামত পর্যন্ত আর নবী আসবে না এ বোঝা বহন করে যেতে হবে তোমাকে। আল্লাহ বলেন, وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلاَّ كَافَّةً لِلنَّاسِ بَشِيراً وَنَذِيراً وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لا يَعْلَمُونَ
“আমি আপনাকে মানব জগতের জন্য বাশির ও নাজির করে পাঠিয়েছি কিন্তু অধিকাংশ মানুষ এ সত্যটি বুঝে না।” (সূরা সাবা : ২৮)
অতঃপর মুহাম্মদ (সা) উঠে দাঁড়ালেন নবুওয়তের পাহাড় মাথায় নিয়ে। এ দায়িত্ব পালনের নির্মমতায় ব্যক্তি-পরিবার ও জীবনের আরাম, সুখ-শান্তি এমনকি নিশ্চিন্তের জন্য একটি রজনীও এলো না ঘুমানোর জন্য। এভাবে ২৩টি বছরের নবুওয়তি হায়াত তিল তিল করে নিঃশেষ হলো। অতিক্রম করতে হলো তায়েফের নিষ্ঠুরতা, বদর, ওহুদ, খন্দক ও হোনায়নের রক্তাক্ত মনজিলগুলো। সাফা পহাড়ের উঠে যে ঘোষণা দিয়ে দাওয়াত শুরু হয়েছিল। ‘হে মানুষেরা বল আল্লাহ ছাড়া আর প্রভু নাই।’ সে দাওয়াতকে কিয়ামত পর্যন্ত বহন করে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব উম্মতের ওপর রেখে বললেন, আরাফা মাঠে, ‘হে উপস্থিত জনম-লী তোমরা আমার এ পয়গাম অনুপস্থিত আমার উম্মতের নিকট পৌঁছে দিয়েছি?’ সোয়া লক্ষ মানুষ আরাফাতের মাঠ থেকে চিৎকার করে বললেন, ‘হ্যাঁ আপনি আমাদের নিকট আল্লাহর বাণী পৌঁছে দিয়েছেন।” অতঃপর শাহাদাত অঙ্গুলি আকাশের দিকে উঁচঁ করে নবীজি (সা) বললেন, “আল্লাহ আপনি সাক্ষী থাকুন আল্লাহ আপনি, সাক্ষী থাকুন, আল্লাহ আপনি সাক্ষী থাকুন।” উঠ ও সতর্ক করÑএ আয়াতের সার্থক ও জ্বলন্ত নমুনা নবীর জীবন থেকে বর্ণনা করা হলো অতি সংক্ষেপে।
وَرَبَّكَ فَكَبِّرْ 
অহফ সধমহরভু ুড়ঁৎ ষড়ৎফ, “তোমার রবের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা কর।”
যদিও মানুষের মধ্যে নবুওয়তের ফেতনা বারবার মাথা চাড়া দিয়েছে মানুষকে রুহের জগতে আল্লাহ তায়ালা এ বিষয়ে ক্বরার নিয়ে বলেছিলেন الست بربكمআমি কি তোমাদের রব নই? মানুষেরা জবাবে বলেছিল, “হ্যাঁ অবশ্যই قالوا بلআপনি আমাদের রব।” পৃথিবীর বিপর্যয় সৃষ্টিকারী স্বৈরশাসকগণ নিজদের রব ঘোষণা দিয়ে বলছিল, انا ربكم لاعلئ
আমি তোমাদের বড় প্রভু। আল্লাহর রবুবিয়তের শ্রেষ্ঠত্বের ওপর ঈমান আনতে হবে শুধু তাই নয় বরং এর ঘোষণা দিতে হবে। যা অতি ঝুঁকিপূর্ণ বিস্ময়। নিজ শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার অহঙ্কারী শক্তিগুলো- الله اكبر
আল্লাই শুধু মহীয়ান ও গরিয়ানÑ এ আওয়াজ সইতে পারেনি ও এ কথার আওয়াজ দানকারীদের বারদাশত করেনি। নমরূদ সইতে পারেনি ইবরাহিম (আ)-এর আওয়াজ; ফিরআউন বরদাশত করেনি মূসা (আ) এর ঘোষণা, অনুরূপভাবে আবু লাহাবের দল সহ্য করেনি মুহাম্মদ (সা)-এর দাওয়াত। রবের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণার শেষ মনজ্লি হচ্ছে জমিনের ওপর শুধু আল্লাহর সার্বভৌমত্ব চলবে, তারই বিধান সকলের ওপর সব বিধিবিধানের ওপর কার্যকর থাকবে। এর মোকাবেলায় যা কিছু মাথা উঁচু করতে চাইবে তার মস্তিষ্ক জমিনে লুটিয়ে দিতে হবে।
وَثِيَابَكَ فَطَهِّرْ 
অহফ চঁৎরভু ুড়ঁৎ মধৎসবহঃং.
“তোমার পরিচ্ছদ পরিচ্ছন্ন ও পবিত্র রাখ।”
স্বাভাবিক অর্থে পোশাক পবিত্র থাকা ইবাদাতের জন্য একটি শর্ত। শরীর যেমন পাক তেমনি পোশাক পরিচ্ছদও পাক থাকা জরুরি। কুরআন ও হাদীসের পোশাক তথা লিবাস শব্দটি রূপক অর্থেও ব্যবহৃত হয়েছে। ইমাম মুসলিম একটি হাদীস গ্রহণ করেছেন যেখানে নবীজি (সা) বলেন, প্রত্যেক মুসলিমের জন্য ৪টি জিনিস নাহলেই নয় ১. একটি প্রশস্ত বাড়ি ২. উন্নত ও দ্রুতগামী যানবাহন ৩. নতুন ও সুন্দর কাপড় এবং ৪. উজ্জ্বল মশা। হাদীসের সব কথাগুলো রূপক। সাহাবীদের প্রশ্নের জবাবে হাদীসের পরবর্তী অংশে রাসূল (সা) জবাব দিয়েছেন। আমি শুধু লিবাস ও পোশাকের বিষয়ে বলছি। নবীজিকে জিজ্ঞাসা করা হলো من لباس الجديد নুতন কাপড় অর্থ কী?- قال رسولا الله الحياء
তিনি বলেন ‘হায়া ও লজ্জার’ ভূষণ সুন্দর।”
আবার কুরআনে উত্তম পোশাক বলা হয়েছে, লিবাসুত তাকওয়াকে খোদাভিরুতার পোশাক সকল পোশাকের চেয়ে বেশি পবিত্র ও সুন্দর। উল্লিখিত আয়াতে পোশাক পবিত্র রাখা সম্পর্কে ব্যাখ্যকারীগণ দায়ীর বাইর ও ভেতর পুরোটা পবিত্র থাকার ব্যাপারে আলোকপাত করেছেন। এর তাৎপর্য হচ্ছে প্রকাশ্য ও গোপনীয় সকল বিষয় এর অন্তর্ভুক্ত। দায়ীদের সব কিছু ইখলাসের পানিতে বিশুদ্ধ হতে হবে। নবীয়ে কারিম (সা) কে নির্দেশের মাধ্যমে সর্বযুগের দায়ীদের জন্য রয়েছে নসিহত।
পবিত্রতার বিষয়টি ব্যাপক ও বিস্তৃত। সকল প্রকার মলিনতা, কুটিলতা, কুফরির অপবিত্রতাকেও এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে এগুলো হতে পাক-সাফ হতে হবে দায়ীদেরকে। মনের পবিত্রতার একটি বিষয় হচ্ছে সবকিছু পবিত্র রাখা। অপর দিকে নবী করিম (সা) বাল্যকাল হতে পোশাক পরিচ্ছদে ছিলেন সতর্ক ও পরিচ্ছন্ন। কেউ তাঁর পোশাকে কখনও কোন দাগ কালিমা দেখেনি যা ছিল মিল ও নিদাগ।
وَالرُّجْزَ فَاهْجُرْ 
অহফ শববঢ় ধধিু অৎঁলু (রফড়ষং)
‘হে মুহাম্মদ! তুমি সব অপবিত্রার মূল ‘শিরক’ হতে দূরে থাক।”
সকল নবীর ওপর আল্লাহ তায়ালার পক্ষ হতে যে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তা মূলত ঈমানের দাওয়াত। আর সকল ঈমানিয়াতের মূল বিষয় হলো-‘তাওহিদ’ যা শিরকের বিপরীত বিষয়। তাই নবীদের আহবান হলো ‘শিরক বর্জন ও তাওহিদ গ্রহণ। আল্লাহর নির্দেশ হচ্ছে দায়ী হবে দাওয়াতের পূর্ণাঙ্গ আদর্শ। শিরক বর্জনের দাওয়াত দেয়ার সাথে সাথে নিজকে শিরকের অপবিত্রতা থেকে অনেক দূরে থাকতে হবে। মানবসভ্যতার সূচনা হয়রত আদম (আ) থেকে, এর পর তার সন্তানদের মধ্যে প্রথম জাহেলিয়াত ও গোমরাহি হচ্ছে মূর্তিপূজা। তাওহিদের সাথে এর সঙ্ঘাত আবহমান কালের। সে মূর্তি ইট, পাথর বা মাটির নির্মিত বা জীবিতদের পূজা হোক আল্লাহ ছাড়া সব কিছুর পূজা এক ও অভিন্ন। মুসলিম মিল্লাতের পিতা ইবরাহিম (আ) ছিলেন মূর্তি নির্মাণকারী পৌরহিত আজরের সন্তান। তিনি নিজ হাতে মূর্তি ভাঙেন ও পরিণামে নির্যাতিত হন, অনলকু-ে নিক্ষিপ্ত হন নমরূদের হাতে ও দেশান্তেরিত হন। তিনি আল্লাহর ইশারায় বন্দেগির প্রাণকেন্দ্র কাবা বিনির্মাণের সময় দোয়া করেন যেন মহান এই ঘরকে নিরাপদ করেন ও তার সন্তানদেরকে মূর্তিপূজার কদর্যতা হতে রক্ষা করেন এবং নিজকেও। ইবরাহিম দোয়ার হাত তুলে বলেন,
وَإِذْ قَالَ إِبْرَاهِيمُ رَبِّ اجْعَلْ هَذَا الْبَلَدَ آمِناً وَاجْنُبْنِي وَبَنِيَّ أَنْ نَعْبُدَ الأَصْنَام- رَبِّ إِنَّهُنَّ أَضْلَلْنَ كَثِيراً مِنْ النَّاسِ فَمَنْ تَبِعَنِي فَإِنَّهُ مِنِّي وَمَنْ عَصَانِي فَإِنَّكَ غَفُورٌ رَحِيمٌ َ
“প্রভু হে! এ শহরকে নিরাপত্তার নগরী বানাও, মূর্তিপূজার ঘৃণিত কাজ হতে আমাকে ও আমার সন্তানদেরকে রক্ষা কর। এ মূর্তিগুলোই তো বেশির ভাগ মানুষকে গোমরাহির দিতে ঠেলে দিয়েছে।” (সূরা ইবরাহিম : ৩৫ : ৩৬)
সে ইবরাহিম (আ) ও ইসমাইলের সন্তানেরা এক রাতে স্থাপন করে ৩৬০ দেবতা যার মধ্যে ইবরাহিম ও ইসমাইলের মুর্তিও ছিল? ইতিহাসের নির্মম পরিহাস যেন তারই নাম। আবার তাদেরই বংশের বিশ্বের সকল যুগের শ্রেষ্ঠ মহামানব মুহাম্মদ (সা) কে পাঠালেন পৃথিবীতে মূর্তির বিনাশ সাধন করার জন্য। নবীজি (সা) বলেন, “আমাকে প্রেরণ করা হয়েছে মূর্তির বিনাশ সাধনে।” (আল হাদীস )
অষ্টম হিজরিতে রাসূল (সা) মক্কা বিজয়ের দিন ইহরাম ছাড়া ১০ হাজার সাহাবীর সাথে উন্মুক্ত তরবারি হাতে কাবায় প্রবেশ করেন দেবতাদের মাথায় আঘাত করে বলেন, “সত্য সমাগত অসত্য আজ বিতাড়িত, মিথ্যা অপসৃত হওয়ার যোগ্য।” (আল কুরআন)
সমস্ত গুনাহের মূল শিরক থেকে হিজরত করার যে নির্দেশ আল্লাহ তায়ালা মুহাম্মদ (সা) কে দিয়েছেন তা থেকে তিনি শতভাগ মুক্ত শুধু থাকেননি বরং উম্মতকে তার ব্যাপারে কঠোরভাবে বলেন- لا تشرك بالله و ان قُتلت و حُرِّقت
“সাবধান শিরক করা যাবে না জ্বলন্ত আগুনে যদি জ্বালিয়েও দেয়া হয়, কতল করে লাশ যদি টুকরাও করা হও।” (আহমদ)
আর পৃথিবীকে এ কঠিন পাপাচার থেকে মুক্ত করার জন্য তিনি রেখে গিয়েছেন সর্বাত্মক জিহাদ যা পৃথিবীর প্রলয় দিন অবদি চলতে থাকবে।” (আল হাদীস)
وَلا تَمْنُنْ تَسْتَكْثِرُ 
অহফ ঝযড়ি হড়ঃ ভধাড়ঁৎ ংববষধরহম মধরৎভ
“অধিক পাওয়ার আশায় ইহসান করো না।”
নবুওয়তের জন্য আল্লাহ তায়ালা ব্যক্তি বাছাই করেন এখানে কোন পরামর্শের সুযোগ নেই। এ ব্যাপারে আল্লাহর সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত। তিনি যাকে চান অনুগ্রহ করেন,
يَخْتَصُّ بِرَحْمَتِهِ مَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ ذُو الْفَضْلِ الْعَظِيمِ
“যিনি তাঁর অনুগ্রহের জন্য যাকে চান মনোনীত করেন, তার দয়া বিশাল ও সীমাহীন।” (সূরা আলে ইমরান : ৭৪)
মুহাম্মদ (সা) কে আল্লাহ তার নবুওয়ত ও রিসালাতের জন্য শুধু বাছাই করেননি বরং তাকে বিশ্বনবী হওয়ার জন্য মনোনীত করেন, এই কারণে তিনি এককভাবে সকল নবীর চেয়ে আলাদা ও বিশেষ উচ্চ মর্যাদার অধিকারী। মানবতার ওপর নবীজির ইহ্সান যত বড় আল্লাহ তায়ালার ইহসান তার ওপর এর চেয়ে অনেক বড়। সৃষ্টিরা তো আল্লাহর অনুগ্রহের মহাসমুদ্রে ডুবে রয়েছে।
নবীগণ তাদের দাওয়াতের কোনো বিনিময় কওমের নিকট চাননি। কুরআন বলছে, اتَّبِعُوا مَنْ لا يَسْأَلُكُمْ أَجْراً وَهُمْ مُهْتَدُونَ “তোমরা তাদের অনুসরণ কর যারা তোমাদের নিকট দাওয়াতের বিনিময় দাবি করে না, আর তারাই হেদায়াতের ওপর প্রতিষ্ঠিত।”     (সূরা ইয়াসিন : ২১)
দাওয়াতে জমিন মজলুম নবী নূহ (আ) কওমকে বলেন এ প্রসঙ্গেÑ وَمَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ مِنْ أَجْرٍ إِنْ أَجْرِي إِلاَّ عَلَى
رَبِّ الْعَالَمِينَ “হে জাতি! আমি তোমাদের নিকট প্রতিদান চাই না, তাতো বিশ্ব জাহানের প্রভুর হাতে রয়েছে।” (সূরা শোয়ারা : ১০৯)
প্রতিদান তো দূরের কথা দাওয়াতের বিনিময়ে নবীগণ অকথ্য নির্যাতন নিপীড়ন, বঞ্চনা, দেশান্তরের মতো কঠিন পরিস্থিতির মনজিল অতিক্রম করেছেন, এমনকি অনেককে বরণ করতে হয়েছে শাহাদাতের পরিণতি। কুরআন বলছে,
يَا حَسْرَةً عَلَى الْعِبَادِ مَا يَأْتِيهِمْ مِنْ رَسُولٍ إِلاَّ كَانُوا بِهِ يَسْتَهْزِئُون
“আমার বান্দাদের বিষয় আফসোস! তাদের নিকট যত রাসূল এসেছে, তাকে জাতিরা উপহাস করেছে।” (সূরা ইয়াসিন : ৩০)
নবীগণ, অলিগণ বা সাধারণ মুমিনদের পক্ষে কোন বিষয়ে আল্লাহর ওপর কেউ ইহসান করার কোন সুযোগ নেই বরং নবুওয়তের জন্য মনোনীত করে বা আল্লাহর অলিদের মধ্যে শামিল করে অথবা মুমিনদেরকে ঈমানের পথ প্রদর্শন করে তিনি আল্লাহই ইহ্সান করেছেন। তাই উল্লিখিত আয়াতে আল্লাহর নির্দেশ হচ্ছে হে মুহাম্মদ (সা) দাওয়াতের কোন পার্থিব বিনিময় নয়, তামাম পৃথিবীর সব কিছু এর বিনিময় হিসেবে নগণ্য যা শুধু আল্লাহর নিকট রয়েছে, এখানে দায়িত্বই সব কিছু হতে গুরুত্বপূর্ণ। নবুওয়তের এ পথে সাহায্যকারীদের জন্য এ আয়াত যেন এক আলোর মশাল। এ পথে পার্থিব জগতে শুধু ত্যাগ ও কোরবানি দিয়ে যেতে হবে আর প্রতিফল দিবসে মহান প্রভু এর অনেক বেশি বিনিময় দেয়ার ওয়াদা করেছেন, তিনি অঙ্গীকার ভঙ্গ করেন না।
وَلِرَبِّكَ فَاصْبِرْ 
ঋড়ৎ ঃযব ংধশব ড়ভ ঃযু ষড়ৎফ নব ঢ়ধঃরপহঃ
“তুমি তোমার প্রভুর দিকে চেয়ে ধৈর্য ধারণ কর।”
দাওয়াতের ময়দান যে ফুল ছড়ানো নয় বরং অত্যাচার জুলুম নির্যাতন নিপীড়ন, গুম, হত্যার আতঙ্কে পরিপূর্ণ এ আয়াতই যেন সতর্কবার্তা। জমিনে যারা নবুওয়তের আমানত নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন সে লাখ লাখ নবীর মধ্যে দু-চারজনকে বাদ দিলে সকলের জীবন যে অত্যাচার জুলুমের বিষাক্ত তীরে ক্ষত-বিক্ষত, তাঁদের পবিত্র রক্তে লাখ বার পৃথিবীর মাটি সিক্ত হয়েছিল ইসলামের ইতিহাস এর দলিল।
ইতিহাসের এ শ্রেষ্ঠ সন্তানগুলো যাঁদের চরিত্র ছিল নিষ্কলুষ, সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থভাবে যারা মানুষের কল্যাণে ছিলেন নিবেদিত তাদেরকে মানুষেরই হাতে এ অকথ্য নির্যাতন ও অবর্ণনীয় যাতনার কেন শিকার হতে হলো? এর উত্তর সংক্ষিপ্তভাবে দেয়া কঠিন, কুরআন শরিফতো বলেছে নবীরা একজনও এমন ছিল না যাকে তারা অত্যাচার করেনি আর বলেছিল,
إِلاَّ قَالُوا سَاحِرٌ أَوْ مَجْنُونٌ
“এরা জাদুকর ও উন্মাদ।” (সূরা জারিয়াত-৫২)
বিশ্বনবী (সা) নবুওয়তের ১৩টি বছর কিভাবে মক্কায় অতিবাহিত করলেন, বিশেষ করে শেষ ৩টি বছর, যখন জীবন সাথী খাদিজাও নেই। প্রিয়তম চাচা আবু তালিবও বেঁচে নেই। এর মধ্যে দাওয়াতের উদ্দেশ্যে তায়েফ গমন ও তায়েফবাসীর নির্মম অত্যাচারের কাহিনি এতই হৃদয়বিদারক যে এর দৃষ্টান্ত ইতিহাসে নেই। এরপরও কাফিরদের ষড়যন্ত্র থেমে নেই। রাসূল (সা) কে হত্যার সিদ্ধান্ত নিতে বৈঠক চলছে দারুন্নদওয়ায় আবু জাহেলের সভাপতিত্বেÑ
وَإِذْ يَمْكُرُ بِكَ الَّذِينَ كَفَرُوا لِيُثْبِتُوكَ أَوْ يَقْتُلُوكَ أَوْ يُخْرِجُوكَ وَيَمْكُرُونَ وَيَمْكُرُ اللَّهُ وَاللَّهُ خَيْرُ الْمَاكِرِينَ
“হে নবী, কাফেরেরা যখন সিদ্ধান্ত নিচ্ছিল, আপনাকে বন্দি করা, হত্যা করা বা দেশ থেকে বের করে দেয়ার বিষয়ে, তারা যখন ষড়যন্ত্র করছিল, আল্লাহও তাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিচ্ছিলেন, আল্লাহ উত্তম পরিকল্পনাকারী।” (সূরা আনফাল ৩০)।
এরপর অস্থিরতার সুযোগ নেই আল্লাহর দিকে চেয়ে ধৈর্য ধারণ করতে হবে। একটি নিজস্ব আবাসস্থল প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে হবে। অত্যাচারী জালেমদের জন্য মেয়াদ নির্দিষ্ট আছে। এর মধ্যে অনুতপ্ত হয়ে ফিরে না এলে আল্লাহর গজব সবকিছু সহ জমিনের সাথে মিশে দেবে। কুরআন বলছে,
فَاصْبِرْ لِحُكْمِ رَبِّكَ وَلا تَكُنْ كَصَاحِبِ الْحُوتِ
“হে মুহাম্মদ (সা)! আল্লাহর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত ধৈর্য ধারণ কর। সাবধান মাছওয়ালার (ইউনুস আ) মত অস্থির হয়ো না।” (সূরা কালাম : ৪৮)
দাওয়াতের এ নবুওয়তি দায়িত্ব পালনে ধৈর্যের চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করতে হবে। তাই এ পথের পথিকদের মনে রাখতে হবে। সমস্ত জুলুম, অত্যাচার নির্যাতন, গুম, হত্যা, একটি সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে তা দৃঢ়তার সাথে সবর ও ধৈর্য ধারণ করতে হবে।

 শিক্ষণীয় বিষয় : দায়ীদের বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলি:
১. দায়ীদের জন্য কর্মসংস্থানের পথ নেই। আরাম, আয়েশ, সুখ, শান্তি, নিশ্চিন্ততা ও ঝুঁকিহীনতা এ পথে কমই দেখা মেলবে!
২. এর জন্য কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে আর দাঁড়াতে হবে কোমর সোজা করে।
৩. চরম গাফিলতিতে নিমজ্জমান মানবগোষ্ঠীকে ‘সাবধান’ করাই কাজ ছিল নবীদের।
৪. দায়ীদের মূল ঘোষণা হলো-আল্লাহু আকবার, সার্বভৌমত্ব তারই চলবে।
৫. তাদের ভেতর ও বাইর হবে পবিত্র। দায়ীরা হবে মুখলিস ও মুত্তাকি।
৬. শিরক্রে সাথে কোন প্রকার আপস চলবে না ও করবে না।
৭. দাওয়াতে ইলাহির কোন বিনিময় নেই। পৃথিবী এর মূল্য দিতে পারবে না। নবীগণ বলতেন আমাদের বিনিময় শুধু আল্লাহই দেবেন।
৮. যে পথের প্রতিটি পদে রয়েছে জুলুম-নির্যাতনের অপরিহার্যতা সেখানে ধৈর্যই একমাত্র অবলম্বন।
৯. একটি নির্দিষ্ট সময় পর জালেমদের ওপর আল্লাহর গজব অনিবার্য।
১০. নবীগণও হেদায়াতের মালিক নন বরং দায়ীগণ মুবাল্লিগ মাত্র। হেদায়াত সম্পূর্ণ আল্লাহ তায়ালার হাতে।

 উপসংহার
পৃথিবীর সূচনাকাল থেকে অদ্যাবধি একটি বিষয় সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মধ্যে কোন মতানৈক্য নেই যে সত্য ও মিথ্যার মধ্যে, ন্যায় ও অন্যায়ের সাথে সংঘাত চলবেই। এর যেন শেষ নেই। চলছে ও চলবে। ধরন ও প্রকৃতি ভিন্ন হলেও লড়াই ও যুদ্ধ চলছে নিরন্তর। আর প্রতিটি পক্ষ নিজ নিজ অবস্থানে সন্তুষ্ট আছে, এ দ্বন্দ্ব ও সংঘর্ষ থেকে সম্ভবত পৃথিবীর নিষ্কৃতি নেই, এ প্রক্রিয়া থেকে পৃথিবী নামক গ্রহটির আমৃত্যু রেহাই নেই। পৃথিবীবাসীদের বিবদমান দুই পক্ষের এক পক্ষে অবস্থান নেয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই। ঘরে যারা আগুন দিলো তারা দ্বিতীয় পক্ষ, আর যারা আগুন দেয়নি আবার নেভানোর চেষ্টাও করছে না তারা কোন পক্ষ? কেউ তো বলবেন এরা নিরপেক্ষ, না এরা প্রথম পক্ষে রয়েছে। যারা আগুন দিয়েছে আর এরা তামাশা দেখছে অতএব এরা একই দলভুক্ত। তবে এটি ঠিক প্রথম দলটি শক্তিশালী, এরা ক্ষমতাধর ও কায়েমি স্বার্থবাদী। জালেম ও অত্যাচারীদের এ দলে রয়েছে ফেরাউন, নমরূদ, কারুন ও হামান, আবু লাহাব, আবু জাহল, ওৎবা ও মুগিরার উত্তরসূরিরা, এদের সংখ্যাও বেশি দাপটও প্রচ-। আবার দ্বিতীয় দল যারা অশান্তির দাবানল নেভাতে ব্যস্ত তারা সংখ্যায় নগণ্য শক্তিতেও দুর্বল, সৎ ও ন্যায়নিষ্ঠ, এরা নবীদের দলভুক্ত। আবু বকর, উমর, উসমান, আলী, বেলাল, খাব্বাব ও আম্মারের (রা) সংখ্যা সবসময় কম ছিল। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে চূড়ান্ত লড়াইয়ে ন্যায়নিষ্ঠ, দুর্বল ও সংখ্যালঘুরা জালেম, শক্তিশালী ও সংখ্যাগুরুদের ওপর বিজয়ী হয়েছে। তাদের বিজয়ের কারণ অস্ত্রবল, জনবল নয় বরং বিজয়ী হয়েছে মহান আল্লাহর গায়েবি মদদে। বদরের লড়াইয়ে ৩১৩ জন নিরস্ত্র মুমিন মুহাম্মদের (সা) সাথে, মোকাবেলায় ১০০০-এর পূর্ণ সশস্ত্র লড়াকো আবু জাহেলের নেতৃত্বে মুখামুুখি। রাসূল (সা) এর দুই হাত আকাশের দিকে দুই চোখের পানি দাঁড়ি ভিজিয়ে জমিনে পড়েছে, “মাবুদ! নবুওয়তের পুঁজি এ ক্ষুদ্র বাহিনী যদি আজ বদরের প্রান্তরে কাফেরের হাতে নিঃশেষ হয়ে যায় তবে তোমার দ্বীনের জন্য আর কারা বাকি থাকবে? তুমি তোমার সাহায্যের ওয়াদা পূর্ণ কর। আল্লাহ বলেন, فَلَمْ تَقْتُلُوهُمْ وَلَكِنَّ اللَّهَ قَتَلَهُمْ وَمَا رَمَيْتَ إِذْ رَمَيْتَ وَلَكِنَّ اللَّهَ رَمَى
“হে মুহাম্মদ (সা) বদরের যুদ্ধে তুমি (আবু জাহেল, ওৎবা, শায়বা) তাদেরকে হত্যা করেনি বরং আল্লাহই তাদেরকে নিহত করেছেন।” (সূরা আনফাল : ১৭)
ইতিহাস বলছে, সমস্ত কাফের নেতাগণ যারা হুঙ্কার দিয়েছিল বদরের মাঠে তাদের ক্ষত বিক্ষত লাশ জমিনে পড়েছিল। আর নবুওয়তি বাহিনী বিজয়ী হয়েছিল। আজও জমিনে যাদের হুঙ্কারে কাঁপছে যেদিন, দ্বীনের দায়ীদের নির্বিচারে যারা গুলি ছুড়ছে, হত্যা করছে, এমনকি বসতবাড়ি পর্যন্ত মিশিয়ে দিচ্ছে মাটির সাথে, তাদের যেন কেউ নেই। সাবধান! তাদের সাথে আকাশ পৃথিবীর মালিক রয়েছেন। তিনি জালেমদের অবকাশের শেষ প্রহর নির্দিষ্ট করে রেখেছেন। এর পূর্বে তাদের চেতনা ফিরে আসুক। আর দায়ীদেরকে সবরের কঠিন পরীক্ষায় পাস করতে হবে। কখনও সীমালঙ্ঘন করা যাবে না। নিরপরাধ কোন মানুষকে আঘাত করা হতে বিরত থাকতে হবে। আল কুরআনের শেখানো শব্দ দিয়ে মুনাজাতের হাত তুলে বলতে হবে-
رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا وَإِسْرَافَنَا فِي أَمْرِنَا وَثَبِّتْ أَقْدَامَنَا وَانْصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ
“প্রভু হে, আমাদের গুনাহ মাফ করে দাও, আমাদের বাড়াবাড়িকেও ক্ষমা করে দাও, আমাদের কসমকে দৃঢ় করে দাও আমাদেরকে কাফিরদের ওপর বিজয় দাও।” প্রভু হে, আমাদের প্রিয় মাতৃভূমির চলমান হিংসাত্মক পরিস্থিতে কুরআনের দায়ীদেরকে সূরা মুদ্দাসিরের ৭টি আয়াতের শিক্ষা পূর্ণরূপে নিজ জীবনে মেনে চলার তাওফিক দাও। আমিন।

লেখক : ইসলামী চিন্তাবিদ

SHARE

Leave a Reply