রোম সম্রাটকে লিখিত হযরত নবী করীম (সা)-এর পত্র

মাওলানা মুহিউদ্দীন খান

খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীতে আরব উপদ্বীপের দুই দিকে ছিল দুটো বিরাট রাষ্ট্রশক্তি- একটি পারস্য সাম্রাজ্য এবং অপরটি রোমান সাম্রাজ্য। আর এ দু’টি সাম্রাজ্যই ছিল তখনকার দুনিয়ার সেরা দু’টি শক্তি। আরব উপদ্বীপের পূর্ব দিকে পারস্য উপসাগরের দুই তীরে বিস্তৃত ছিল পারস্য সাম্রাজ্য। বর্তমান আফগানিস্তান থেকে শুরু করে ইয়ামান পর্যন্ত এই সাম্রাজ্যের সীমা বিস্তৃত ছিল। তখনকার এশিয়ার সর্ববৃহৎ ও সর্বাধিক শক্তিমান এবং প্রাচীন সভ্যতা-সংস্কৃতির ধারকরূপে পারস্য সাম্রাজ্যের অনন্য  বৈশিষ্ট্যের কথা এখন পর্যন্ত ইতিহাসের একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হয়ে আছে।
অপর দিকে আরব উপদ্বীপের পশ্চিম দিকে অবস্থিত লোহিত সাগরের তীরবর্তী এলাকা থেকে শুরু করে কৃষ্ণসাগরের উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল প্রাচীন বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য। আরবরা এটাকে রোম সাম্রাজ্যরূপে অভিহিত করত। এই দু’টি বিশাল সাম্রাজ্যের সীমান্ত বর্তমান ইরাকের দজলা-ফুরাত তীরে একত্রিত হয়েছিল। রোম ইউরোপের প্রাচীনতম শহরগুলোর একটি। বর্তমানে ইতালির রাজধানী। খ্রিষ্টীয় চতুর্থ শতাব্দীর গোড়ার দিকে বিশাল রোম সাম্রাজ্য পূর্ব ও পশ্চিম দু’টি অংশে বিভক্ত হয়ে যায়। পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের আওতাধীন ছিল এশিয়ার মাইনর, মিসর, শাম, ফিলিস্তিন প্রভৃতি অঞ্চল। সম্রাট কনস্টানটাইন ৩২৬ খ্রিস্টাব্দে এশিয়া ও ইউরোপের সংযোগস্থলে অবস্থিত বসফোরাস প্রণালির তীরে একটি শহরের পত্তন করেন। এটির নামকরণ করা হয়েছিল সম্রাটের নিজের নামের সাথে যুক্ত করে কনস্টানটিনোপল। মুসলমানগণ এ শহরটি অধিকার করে এর নামকরণ করেছিলেন ইস্তাম্বুল। কয়েক শতাব্দীব্যাপী এই ঐতিহ্যবান শহরটি ইসলামী খিলাফতের রাজধানী ছিল এবং এখন পর্যন্ত এটি মুসলিম জাহানের একটি গুরুত্বপূর্ণ শহররূপে বিবেচিত।
কনস্টানটিনোপলকেন্দ্রিক বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের পূর্ব অংশকেই পবিত্র কুরআনে এবং ইসলামী ইতিহাসে রোম সাম্রাজ্য নামে উল্লেখ করা হয়েছে। এই সাম্রাজ্যের সম্রাটের উপাধি ছিল কায়সার।
ইতিহাসবিদ এডওয়ার্ড গিবনের বর্ণনা অনুযায়ী এই সাম্রাজ্যটি ছিল তদানীন্তন পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা সুসভ্য এবং সম্রাট কায়সার সাম্রাজ্যের সর্বেসর্বা হওয়ার পাশাপাশি খ্রিস্টানদের ধর্মীয় প্রধান রূপেও বিবেচিত হতেন। প্রিয়তম নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুওয়তপ্রাপ্তির তিন বছরের মাথায় (৬১৩ খ্রি.) ইরানের শাহান শাহ খসরু পারভেজ হঠাৎ করেই রোম সাম্রাজ্য আক্রমণ করে বসেন। অতি অল্প সময়ের মধ্যেই আগ্রাসী ইরানীরা ইরাক, শাম ও মিসর অধিকার করে এশিয়া-মাইনরে ঢুকে পড়ে। রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াস (৬১০-৬৪১ খ্রি.) ইরানীদের এই হামলা প্রতিহত করতে পারলেন না। অগ্নিউপাসক ইরানীরা রোম সাম্রাজ্যের সমগ্র পূর্বাঞ্চল দখল করে রাজধানী কনস্টন্টিনোপলের দ্বারদেশ পর্যন্ত পৌঁছে গেল। অভাবিত পূর্ব জয় লাভ করার পর ইরানীরা খ্রিষ্টান জনগণের ওপর ভীষণ অত্যাচার নির্যাতন শুরু করে। খ্রিষ্টধর্মের সব ক’টি আলামত ভূলুণ্ঠিত করা হয়। এমনকি তাদের সর্বপ্রধান ধর্মীয় আলামত পবিত্র ক্রসের সেই দুর্লভ কাষ্ঠখণ্ডটি বাইতুল মোকাদ্দাস থেকে ছিনিয়ে এনে তদানীন্তন পারস্যের রাজধানী মাদায়েনে পৌঁছে দেয়া হয়Ñ যা সম্পর্কে তাদের বিশ্বাস ছিল যে, এ কাষ্ঠখণ্ডটিতেই হযরত ঈসা (আ) কে ফাঁসিতে ঝুলানো হয়েছিল!
প্রতিবেশী দু’টি বৃহৎশক্তির মধ্যে ভয়াবহ যুদ্ধ এবং রোমানদের সেই শোচনীয় পরাজয়ের সময়টিতে মক্কায় হযরত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর অনুসারীগণের ওপর চলছিল কাফের-মুশরেকদের পক্ষ থেকে অমানুষিক অত্যাচার-নির্যাতন। অগ্নিউপাসক পারস্যবাসীদের অবিশ্বাস্য বিজয় সংবাদে মক্কার অংশীবাদী পৌত্তলিকরা ছিল দারুণ উল্লসিত। তারা মুসলমানদের লক্ষ্য করে বলতে লাগল, অহি-নবী-রাসূল এবং আসমানি দীনের দাবিদার খ্রিস্টানরা যেভাবে পৌত্তলিক পারসিকদের হাতে পর্যুদস্ত হয়েছে, ঠিক সেভাবেই আসমানি প্রত্যাদেশপ্রাপ্তির দাবিদার মুসলমানরাও আমাদের হাতে উৎখাত হবে।
মক্কার কাফেরদের সে উল্লাস ও আস্ফালনের জবাবেই নাযিল হয় পবিত্র কুরআনের সূরা রোমের প্রাথমিক কয়েকটি আয়াত। যে আয়াতগুলোতে বলা হয়েছে যে, রোম তার প্রতিবেশীর হাতে পরাজিত হয়েছে। কিন্তু এই পরাজয়ই শেষ কথা নয়। খুব শিগগিরই আগামী কয়েক বছরের মাথায় ওরা পুনরায় জয়ী হবে। অগ্র-পশ্চাৎ সব বিষয়ই মহান আল্লাহর নিয়ন্ত্রণাধীন। সেদিন মুসলমানগণও উৎফুল্ল হবে আল্লাহর সাহায্যে। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা সাহায্য করেন। তিনি প্রবল পরাক্রান্ত ও দয়ালু। এটা আল্লাহর ওয়াদা, তিনিও কখনও ওয়াদা খেলাপ করেন না।
পবিত্র কুরআনের এই ভবিষ্যদ্বাণীটিতে দু’টি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছিল। এক, তখনকার সেই দুরবস্থার কবল থেকে রোম সাম্রাজ্যের আশু উত্তরণ ঘটবে এবং পৌত্তলিকদের বর্তমান উল্লাস বিষাদে রূপান্তরিত হবে। দুই. সেদিন আল্লাহর সাহায্যের বরকতেই মুসলমানদেরও উল্লসিত হওয়ার কারণ ঘটবে।
প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ এডওয়ার্ড গিবন লিখেছেন, পবিত্র কুরআনে উপরোক্ত ভবিষ্যদ্বাণী যখন উচ্চারিত হয়েছিল তখন রোমানদের পক্ষে বিজয়ী পারস্য শক্তির ওপর পুনঃবিজয় লাভ তো দূরের কথা, তাদের পক্ষে মাথা তুলে দাঁড়ানোর কোনো দূরতম সম্ভাবনাও ছিল না। অপর দিকে মুসলমানগণও তখন যেরূপ অবর্ণনীয় দুরবস্থায় পতিত ছিল সেই পরিস্থিতিতে তাদের পক্ষেও অদূর ভবিষ্যতে জাতীয় পর্যায়ে কোনো সুসংবাদের আশা করাটা ছিল সম্পূর্ণ দুরাশা মাত্র। কিন্তু হযরত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর অনুসারীগণ কুরআনের এই ভবিষ্যদ্বাণীর ওপর এতটাই দৃঢ় আস্থাশীল ছিলেন যে, হযরত আবু বকর (রা) উবাই ইবনে খালফ নামক জনৈক কুরাইশ সর্দারের সাথে এই ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তবায়িত হওয়া না হওয়ার প্রশ্নে এক শ উটের বাজি ধরে বসলেন। অর্থাৎ যুক্তিসঙ্গত সময়ের মধ্যে কুরআনে উক্ত ভবিষ্যদ্বাণী যদি বাস্তবায়িত না হয় তবে হযরত আবু বকর (রা) উবাইকে একশ উট  দেবেন। আর যদি বাস্তবায়িত হয়ে যায় তবে উবাই হযরত আবু বকর (রা)কে একশ উট প্রদান করবে। এই ঘটনার কয়েক বছর পরই (৬২২ খ্র্রি.) একদিকে হযরত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা থেকে হিজরত করে মদিনায় চলে এলেন, অপর দিকে রোম সম্রাট কায়সার তার রাজধানী কনস্টানটিনোপলের সন্নিকটে ইরানের অবরোধ ভেঙে প্রতিপক্ষের ওপর প্রতি আক্রমণ করতে সমর্থ হলেন।
সম্রাট হিরাক্লিয়াস যখন ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে ইরানীদের ওপর প্রতি-আক্রমণ করার উদ্দেশে রওয়ানা হয়েছিলেন তখন রাজধানী কনস্টান্টিনোপলের বহু জ্ঞানী-গুণীর মনেও এরূপ একটি ধারণা সৃষ্টি হয়েছিল যে, এটাই সম্ভবত রোম সম্রাটের শেষ যুদ্ধযাত্রা। কিন্তু সকল জল্পনা-কল্পনার জাল ছিন্ন করে রোম সম্রাট বিজয় লাভ করলেন। শুধু জয়লাভই করলেন না, আজারবাইজান পর্যন্ত পৌঁছে পারসিকদের সর্বাপেক্ষা বড় অগ্নিকুণ্ডটি সম্পূর্ণ ধূলিসাৎ করে দিলেন। অপর দিকে হিজরি ২ সনে বদরের ময়দানে অকল্পনীয় বিজয় লাভ করে মজলুম মুসলমানগণও উল্লসিত হওয়ার সুযোগ লাভ করলেন। আর এভাবেই পবিত্র কুরআনের তাৎপর্যপূর্ণ দু’টি ভবিষ্যদ্বাণীই অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়িত হলো। হৃতরাজ্য পুনরুদ্ধার এবং শত্রুর ওপর অকল্পনীয় বিজয় লাভ করার আনন্দে উদ্বেলিত হিরাক্লিয়াস বাইতুল মোকাদ্দাস জিয়ারত করতে এসেছিলেন। ঠিক এ সময়টিতেই হযরত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দূত দেহইয়া বিন খলিফা কালবী (রা) হযরত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পত্রসহ বাইতুল মোকাদ্দাস পৌঁছেন।
ভরা দরবারে হযরত দেহইয়া বিন খলিফা কালবি (রা) প্রিয় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পত্রটি সম্রাটের হাতে অর্পণ করেন। পত্রের বিষয়বস্তু ছিল নিম্নরূপ :
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম!
আল্লাহর বান্দা ও রাসূল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পক্ষ থেকে রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াসের বরাবর। ন্যায়পথের অনুসারীগণের প্রতি সালাম। অতঃপর আমি আপনাকে ইসলামের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। যদি শান্তি লাভ করতে চান তবে ইসলামে দীক্ষিত হোন। যদি আপনি ইসলাম গ্রহণ করেন, তবে আল্লাহতায়ালা আপনাকে দ্বিগুণ প্রতিফল দেবেন। আর যদি প্রত্যাখ্যান করেন তবে আপনার সকল প্রজাসাধারণের ভ্রষ্টতার দায়ও আপনার ওপরই পতিত হবে।
হে আহলে কিতাবগুণ! বিতর্কিত সকল বিষয় স্থগিত রেখে এস আমরা এমন একটি বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছি যে বিষয়ে তোমাদের এবং আমাদের মধ্য কোনো মতপার্থক্য নেই। আর তা হচ্ছে, আমরা এক আল্লাহ ছাড়া আর কারও এবাদত করব না। অন্য কোনো কিছুকেই তাঁর শরিক সাব্যস্ত করবো না। আল্লাহ ছাড়া কাউকেই আমাদের উপাস্য রূপে গ্রহণ করবো না। যদি এ বিষয়গুলো আপনি অস্বীকার করেন তবে শুনে রাখুন যে, সর্বাবস্থায়ই আমরা আল্লাহর একত্বের বিশ্বাসে অটল থাকবো।Ñ মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ।
এই মোবারক পত্রের পাঠ শ্রবণ করে সম্রাট হিরাক্লিয়াস কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন। তাঁর মনোজগতে তখন যেন ঝড় বয়ে যাচ্ছিল। দরবারের লোকদের নির্দেশ দিলেন, আরবের কোনো বাণিজ্য কাফেলা বাইতুল মোকাদ্দাসে অবস্থানরত থাকলে তাদের মধ্যে থেকে দু-একজন বিজ্ঞ লোককে যেন দরবারে ডেকে আনা হয়। ঘটনাক্রমে সে সময় কোরাইশদের প্রধান ব্যক্তি আবু সুফিয়ান বাণিজ্য উপলক্ষে বাইতুল মোকাদ্দাসে অবস্থান করছিলেন। তাকেই দরবারে হাজির করা হলো।
সম্রাট তার সাথে হযরত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, তাঁর বংশমর্যাদা, তাঁর চরিত্র, তাঁর প্রচারিত দীনের  মৌল শিক্ষা, এই ধর্ম যারা গ্রহণ করেছেন তাদের অবস্থা সম্পর্কে দীর্ঘ আলোচনা করলেন।
আবু সুফিয়ানের সাথে রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াসের যে কথোপকথন হয়েছিল, বুখারী শরীফের বর্ণনা অনুযায়ী তা ছিল নিম্নরূপÑ
সম্রাট কায়সার : তোমাদের শহরে যিনি নবুওয়তের দাবি করেছেন, তাঁর বংশমর্যাদা কিরূপ?
আবু সুফিয়ান : অত্যন্ত সম্ভান্ত।
কায়সার : নবী-রাসূলগণের সবাই উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছেন যেন  কেউ তাঁর আনুগত্য গ্রহণ করতে গিয়ে নিজেকে ছোট করা হচ্ছে এমনটা ভাবতে না পারে।
এর বংশে কি অতীতে অন্য আরও কেউ নবী হওয়ার দাবি করেছেন বা কেউ কি রাজত্ব করেছেন?
আবু সুফিয়ান : না, কখনও না।
কায়সার : যদি এমনটি হতো তবে এরূপ মনে করার অবকাশ ছিল যে, পারিবারিক ধ্যান-ধারণার প্রভাবে এ ব্যক্তি নিজেকে নবী বলে প্রচার করছে। কিংবা সে তার পূর্ব পুরুষের বাদশাহী পুনরুদ্ধার করার লক্ষ্য নিয়ে এমন একটি দাবির আশ্রয় গ্রহণ করেছে। যারা তার ধর্মমত গ্রহণ করেছে তারা সমাজের প্রভাবশালী শ্রেণীর, না দুর্বল শ্রেণীর?
আবু সুফিয়ান : সাধারণ সমাজের দুর্বল শ্রেণীর লোক।
কায়সার : নবী-রাসূলগণের অনুসারী প্রথমাবস্থায় সাধারণ গরিব লোকেরাই হয়ে থাকে। তার অনুসারীর সংখ্যা দিন দিন বর্ধিত হচ্ছে না কমে যাচ্ছে?
আবু সুফিয়ান : তাঁর অনুসারীর সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বর্ধিত হচ্ছে, কমছে না।
কায়সার : ঈমানের আকর্ষণ এমনটাই হয়ে থাকে; তা দিন দিন শুধু বর্ধিত হয়। আচ্ছা! এ পর্যন্ত কি কেউ বিরূপ হয়ে তাঁকে পরিত্যাগ করে গেছে?
আবু সুফিয়ান : এ পর্যন্ত কেউ এমনটি করেনি।
কায়সার : ঈমানের বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে এই যে, শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে নয়, বরং সত্যের প্রভাবেই তা মানব হৃদয়ে দৃঢ়মূল হয়। আর একবার তা হৃদয় স্পর্শ করলে আর কখনও তা বিচ্যুত হয় না। আচ্ছা! নবুওয়তের দাবি উত্থাপন করার আগে কি তোমরা এই লোকটিকে সত্যবাদী বলে মনে করতো না কখনও তাকে মিথ্যায় জড়িত হতেও দেখা গেছে?
আবু সুফিয়ান : না, সে কখনও মিথ্যা বলতো না।
কায়সার : যে ব্যক্তি কোনো সময় মানুষের সাথে মিথ্যা বলে না, সে কেন সৃষ্টিকর্তার নামে মিথ্যা বলতে যাবে? নবীগণ কখনও মিথ্যা বলেননি, কাউকে প্রতারণাও করেননি। ইনি কি কখনও কোনো চুক্তি বা ওয়াদা অঙ্গীকারের অন্যথা করেছেন?
আবু সুফিয়ান : এখন পর্যন্ত তো এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি, তবে সম্প্রতি তার সাথে একটি চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে (হুদাইবিয়ার সন্ধি) দেখা যাক, সেটির মর্যাদা তিনি রক্ষা করেন কি না?
কায়সার : পয়গম্বর কখনও চুক্তি ভঙ্গকারী হননি। তোমাদের সাথে কি তার কখনও যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে?
আবু সুফিয়ান : জি হ্যাঁ, কয়েকবারই যুদ্ধ হয়েছে।
কায়সার : যুদ্ধের ফলাফল কী হয়েছে?
আবু সুফিয়ান : কখনও আমরা জয়যুক্ত হয়েছি, কখনও তিনি জয়যুক্ত হয়েছেন।
কায়সার : আল্লাহ প্রেরিত নবী-রাসূলগণের অবস্থা সাধারণত এমনটিই হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত জয় তাঁদেরই হয়ে থাকে। তাঁর শিক্ষার মূল কথাগুলো কী?
আবু সুফিয়ান : তিনি বলেন, তোমরা এক আল্লাহর এবাদত কর। অন্য কাউকে আল্লাহর সাথে শরিক করো না। চারিত্রিক বিশুদ্ধতা রক্ষা করে চল। সত্য কথা বল। মানুষের সাথে ভালো ব্যবহার কর। পূর্ব-পুরুষদের অংশীবাদী রীতি-নীতি পরিত্যাগ কর। নামাজ পড়।
কায়সার : প্রতিশ্রুত যে নবীর কথা আমরা জেনে আসছি, তাঁর শিক্ষা হবে এরূপই। আমার দৃঢ়বিশ্বাস ছিল যে, অতিসত্বরই একজন নবীর আবির্ভাব ঘটবে। তবে এমন ধারণা ছিল না যে তিনি আরবের বুকে আবির্র্ভূত হবেন! হে আবু সুফিয়ান! যদি তুমি মিথ্যা বলে না থাক, তবে সেই দিন বেশি দূরে নয়, যেদিন আমি যে স্থানটায় বসে আছি, এটিও তাঁর পদানত হয়ে যাবে। হায়! আমি যদি তাঁর নিকট পৌঁছতে পারতাম তবে তাঁর পা দুয়ে দিতাম। (বুখারী শরীফ, প্রথম খণ্ড, তারিখে-তাবারি, তৃতীয় খণ্ড)
আবু সুফিয়ান পরে বর্ণনা করেছেন, আমার একবার ইচ্ছা হয়েছিল যে, মুহাম্মদ (সা) যেহেতু আমাদের দীন ধর্মের শত্রু সুতরাং তাঁর সম্পর্কে সম্রাটের মন বিষিয়ে দিই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিবেকের তাড়নায় সত্য কথাই আমাকে বলতে হয়েছে। আমি সম্রাটের প্রতিটি প্রশ্নেরই জবাবে সঠিক উত্তর দিয়েছি। তবে এতটুকু বলতে ছাড়িনি যে, হযরত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মহান কুরাইশ গোত্রের মধ্যে মোটেও কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি নন এবং তাঁর প্রচারিত ধর্মমতটি এমন কিছু নয়, যা নিয়ে মাথা ঘামানোর মত কিছু থাকতে পারে! আবু সুফিয়ানের সাথে সম্রাটের আলোচনা দরবারিদেরকে রীতিমতো ক্ষুব্ধ করে ফেলেছিল। হযরত হযরত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পত্রের প্রতি সম্রাটের মুগ্ধ প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করে দরবারিদের ক্ষোভের মাত্রা চরমে পৌঁছেছিল।
এরূপ প্রতিকূল অবস্থায় সম্রাট হযরত দেহইয়া (রা) কে লক্ষ্য করে বললেন, যদি আপনজনদের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া এবং তাদের হাতে আমার জীবন বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা না থাকতো তাহলে আমি অবশ্যই তোমাদের নবীর আনুগত্য গ্রহণ করতাম। নিঃসন্দেহে তিনি সেই প্রতিশ্রুত নবী, আমরা যাঁর অপেক্ষা করছি। (বুখারী শরীফ, প্রথম খণ্ড, তারিখে তাবারি, তৃতীয় খণ্ড)
বুখারী শরীফের আর একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, সম্রাট হিরাক্লিয়াসের অন্তরে সত্যের জ্যোতি পরিস্ফুট হয়ে উঠছিল কিন্তু শেষ পর্যন্ত সিংহাসন হারানোর ভয়ে সে আলো স্তিমিত হয়ে যায়।
ইতিহাসের প্রামাণ্য বর্ণনা অনুযায়ী রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াসকে লিখিত এই পত্রটি ছিল হযরত আবু বকর (রা)-এর হস্তলিখিত। হযরত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ হাতে পত্রের ওপর সিলমোহর লাগিয়েছিলেন। হিজরি সপ্তম শতাব্দীকাল পর্যন্ত এই পবিত্র পত্রটি স্পেনে সংরক্ষিত ছিল। হিজরি ষষ্ঠ শতাব্দীর বিখ্যাত মুহাদ্দেস ও ইতিহাসবিদ আল্লামা সুহাইলী (রহ) তাঁর সময়কালে পত্রটি স্পেনে সংরক্ষিত ছিল এবং তিনি সেটি জিয়ারত করেছেন বলে উল্লেখ করেছেন।
বুখারী শরীফের ব্যাখ্যাকার আল্লামা কস্তলানি (রহ) (৮৫১ হি.-৯২৩ হি. মোতাবেক ১৪৪৭-১৫১৭ খ্রি.) লিখেছেন যে, মালিক মনসুর কালাদুন সালেহি (৬৭৮-৮২ হিজরি) স্পেনের এক শাসক আলফানসুর নিকট এখন দূত প্রেরণ করেছিলেন। আলফানসু মালিক মনসুরের দূত সাইফুদ্দীন ক্বালিজকে উক্ত পবিত্র পত্রখানা দেখিয়েছিলেন। পত্রটি স্বর্ণনির্মিত একখানা বাক্সের মধ্যে সংরক্ষিত ছিল। আলফানসু বলেছিলেন যে, এটি রাসূলুল্লাহর ওই পত্র যা তিনি আমাদের পূর্ব-পুরুষ রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াসের নিকট প্রেরণ করেছিলেন। (কস্তলানি প্রথম খণ্ড, ৬৭ পৃ:) পবিত্র এ পত্রটি বিগত শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে এসে পুনরায় আলোচনার বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়। পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত বিবরণী অনুযায়ী স্পেনে মুসলমানদের পতনের পর পত্রটি কোনো না কোনোভাবে পবিত্র মক্কায় নীত হয়। সেখান থেকেই এটি শরীফ হোসাইনের পুত্র আমীর আবদুল্লাহর হস্তগত হয়। এই আমীর আবদুল্লাহ ছিলেন জর্দানের পরলোকগত বাদশাহ হোসেনের পিতামহ।
আমীর আবদুল্লাহর নিকট থেকে পত্রটি তার এক স্ত্রীর হাতে পড়ে। সেই ভদ্রমহিলা পত্রটি হস্তান্তর করার ইচ্ছা ব্যক্ত করলে তখনকার আবুধাবির শাসক (আরব আমিরাতের তদানীন্তন রাষ্ট্রপ্রধান শায়খ যায়েদ বিন সুলতান আল নাহিয়ান প্রিয়তম হযরত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্পর্শধন্য এই অমূল্য পত্রটি নগদ দশ লক্ষ পাউন্ড মূল্যে ক্রয় কর নেন। এটা ছিল ইতিহাসে যে কোনা প্রাচীন পাণ্ডুলিপির সর্বোচ্চ মূল্য।
পবিত্র এই পত্রটি মসৃণ পাতলা চামড়ার ওপর লিখিত। আটটি ছত্রে পত্রটি সমাপ্ত। শেখ যায়েদের সংস্কৃতি ও পুরাতত্ত্ববিষয়ক উপদেষ্টা ডক্টর ইবরাহীম কর্তৃক বিভিন্নভাবে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের পর এটিই যে সেই আসল পত্র সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে। শায়খ যায়েদ মূল্যবান পত্রটি আবুধাবির জাদুঘরে সংরক্ষিত করেছেন বলে জানা যায়।
হযরত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক প্রেরিত পত্রাবলির যে কয়টি মূল কপি এ পর্যন্ত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে আবুধাবিতে সংরক্ষিত এই পত্রটি তন্মধ্যে পঞ্চম। ইতঃপূর্বে আরও চারটি পত্রের আসল কপি শনাক্ত করা হয়েছে। সেগুলোর মধ্যে- ১. হাবশার বাদশাহ নাজ্জাসীর বরাবর লিখিত পত্র। ২. রোম সম্রাট কর্তৃক নিয়োজিত মিসরের শাসক মকোকাসের উদ্দেশে প্রেরিত পত্র। ৩. বাহরাইনে নিযুক্ত ইরানের শাসনকর্তা মানযারের নামে প্রেরিত পত্র। ৪. পারস্য সম্রাট খসরু পারভেজকে লিখিত পত্র।
প্রত্নতাত্ত্বিক ও রাসায়নিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার দ্বারা এগুলো যে আসল পত্র সে বিষয়ে সুনিশ্চিত হওয়া গেছে। হাদিসের কিতাবসমূহে বর্ণনা পরম্পরার মাধ্যমে হযরত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক প্রেরিত পত্রাবলির যে বয়ান রয়েছে প্রত্নতাত্ত্বিকগণের দ্বারা শনাক্তকৃত পাঁচটি পত্রের পাঠোদ্ধার করে দেখা গেছে, এগুলোতে একটি শব্দেরও গরমিল নেই। হাদিসের বর্ণনাগুলো কত বিশ্বস্ততার সাথে সংরক্ষিত হয়েছে, এটাও তার একটা বাস্তব প্রমাণ!
আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মদ।

লেখক : বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ সম্পাদক, মাসিক মদিনা

SHARE

Leave a Reply