রোহিঙ্গাবন্ধু আব্বাস মানবতায় নিবেদিত যুবক -আবু ওবাইদা আরাফাত

সাম্প্রতিক বিশ্বের বর্বরতম আলোচিত ঘটনা ‘রোহিঙ্গা ইস্যু’। গত ছয় মাস ধরে এখন পর্যন্ত গোটা বিশ্বের বিভিন্ন কূটনৈতিক মহল থেকে শুরু করে বিশ্বমিডিয়ার নজর বাংলাদেশের দিকে। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর পাশবিক নির্যাতনে শিকার হয়ে লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে বাংলাদেশে। বর্বরোচিত নানা অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে জীবনবাজি রেখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসার সময় পথিমধ্যেও প্রাণ হারিয়েছেন অসংখ্য মানুষ।
ফেসবুক থেকে শুরু করে বিভিন্ন সোস্যাল মিডিয়া ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর এই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের সচিত্র খবর ছড়িয়ে পড়লে মানুষ হিসেবে প্রত্যেকের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়েছে। মানবতায় নিবেদিত মানুষের অন্তরাত্মা কান্নায় বুক ভাসিয়েছে, চোখের নোনাজলে পালিয়েছে ঘুম; কেবল অনিবার্য বাস্তবতা চুকিয়ে মানবতা-পাগল মানুষ ছুটে গিয়েছে রোহিঙ্গা শিবিরে। নিজেদের মন-প্রাণ উজাড় করে শামিল হয়েছে মানবতার মিছিলে। মিয়ানমারের হায়েনার পাশবিক নির্যাতনে মুমূর্ষু জাতির কাছে তারা হাজির হয়েছে একেকজন ফেরেস্তা-মানব হিসেবে। তাদের মধ্যে অধিকাংশই এ দেশের যুবসমাজ।
ঠিক তেমনি যুবসমাজের অন্যতম প্রতিনিধি হিসেবে মানবসেবায় নিজেকে মেলে ধরেছেন আব্বাস উদ্দীন। রোহিঙ্গাদের অবর্ণনীয় কষ্ট উপাখ্যানে সৃষ্ট হৃদয়ের আঘাতটা হালকা করতে তার অবস্থান থেকে তিনি মানবসেবার অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
তার সাথে কথা বলে জানা গেছে, গত ৩ সেপ্টেম্বর থেকে এখন পর্যন্ত এমন কোনো শুক্রবার কিংবা ছুটির দিন নাই যে- রোহিঙ্গা ক্যাম্পে না গিয়েছেন। প্রথমে ফেসবুকে রোহিঙ্গা নির্যাতনের নির্মম চিত্র দেখে তিনি তাদের জন্য কিছু করার তাড়না অনুভব করেন। প্রথমবার তিনি টানা ১০ দিন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রত্যক্ষভাবে সেবাকাজ পরিচালনা করেন। ফেসবুকের অসংখ্য বন্ধু, দেশ-বিদেশের ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কাছের মানুষ তার উদ্যোগে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। তাকে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করেছেন চট্টগ্রামের অক্সিজেনের শামসুল আলম খান মুরাদ ও সাতকানিয়ার হানিফ।
উখিয়ার থাইংখালীস্থ তাজনিমার খোলা ক্যাম্পে ২৪৫০টি পরিবারের মাঝে বাঁশ, তেরপাল, শুকনা খাবার, জামা ইত্যাদি রসদের পাশাপাশি ১৫ দিনের চিকিৎসা ক্যাম্প পরিচালনা করেন তিনি। এরপর টেকনাফের হ্নীলা উপজেলার আলীখালী ও রঙ্গীখালী ক্যাম্পে ব্যাপক ত্রাণকার্যক্রম পরিচালনা করেন। এ পর্যন্ত তাদের মাধ্যমে করা কাজের বিবরণ :
মসজিদ ৪টি, ফোরকানিয়া ২টি, কোরআন, শরীফ ৪৮৫০টি, আমপারা ২৪০০টি, ১২০০ টুপি, পর্যাপ্ত পরিমাণ জায়নামাজ, রেয়াল ২৫০০টি, হাঁড়ি ১২০০টি, কলসি ৭৫০টি, কম্বল (শীতবস্ত্র) ৯৭৫০টি, সোলার ৪টি, বাচ্চাদের জুতা ২৩৫০, টয়লেট ১২৭, নলকূপ ৪২টি, গভীর নলকূপ ৭টি, বদনা ৭৫০টি, জগ ৭৫০টি।
বিভিন্ন সময়ে ১ দিনের চিকিৎসাসেবা ১৭ বার এবং BD Foods এর সহযোগিতায় ১ দিনে ১৮০০ পরিবারের মাঝে শুকনো খাবার বিতরণ। তা ছাড়া তাদের ব্যবস্থাপনায় মাসিক বেতনে রাখা হয়েছে মসজিদের ইমাম ও মুয়াজ্জিন।
এসব সহযোগিতা ছাড়াও রোহিঙ্গাদের কষ্ট লাঘবে বিতরণ করেছেন নগদ ১৯ লক্ষ ৭৭ হাজার ৫ শত টাকা।
বিভিন্ন ধরনের ত্রাণকার্য ও নগদ অর্থ মিলে তার মাধ্যমে প্রায় কোটি টাকার সেবাকাজ পরিচালিত হয়েছে।
বর্তমানে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি নিয়ে তার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সরকারের উদ্যোগে কূটনৈতিক সমাধানের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের নিজভূমে নিরাপদে পাঠিয়ে দিতে পারলে সবচেয়ে মঙ্গল। কূটনৈতিক দীর্ঘসূত্রতার সময়কালে তাদের জন্য বিভিন্ন কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা গেলে তাদের দ্বারা অপরাধ সংঘটনের আশঙ্কা অনেকাংশে কমবে।’ তিনি আরও জানান, ‘দরিদ্রতার সুযোগ নিয়ে অনেক এনজিও সংস্থা রোহিঙ্গাদের ধর্মান্তরিত করার লোভনীয় অফার দিচ্ছে।’
রোহিঙ্গাদের সেবায় নিবেদিত এ যুবক বলেন, ‘জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে রোহিঙ্গাদের বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানদের মমত্ববোধ আমার হৃদয়ে নাড়া দিয়েছে; মাইলের পর মাইল নিজের বাবা-মাকে কাঁধে নিয়ে সীমান্ত পার হওয়ার দৃশ্যটাও হৃদয়বিদারক।’
পেশায় ব্যবসা নেশায় মানবসেবায় মগ্ন এই যুবকের বাড়ি চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার মাদার্শা ইউনিয়নে। স্ত্রী, ফুটফুটে দুই সন্তান আদিল মাহমুদ ও আদিবা জান্নাতকে ঘিরেই তার সংসারযাপন।
রোহিঙ্গাদের মানবিক বিপর্যয়ে দেশের যুবসমাজ সারাবিশ্বে মানবসেবায় নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। মানবসেবায় রোহিঙ্গাবন্ধু আব্বাস উদ্দীনের ভূমিকা যুবসমাজের কাছে অনুকরণীয় হয়ে থাকবে বলেই আমাদের বিশ্বাস।

SHARE

Leave a Reply