রোহিঙ্গারা কি কালের গর্ভে হারিয়ে যাচ্ছে? -সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা

১৪৩০ থেকে ১৭৮৪ সাল পর্যন্ত ২২ হাজার বর্গমাইল আয়তনের রোহিঙ্গা স্বাধীন রাজ্য থাকলেও মিয়ানমারের রাজা বোদাওফায়া এ রাজ্য দখল করার পর বৌদ্ধ আধিপত্য শুরু হয়। ফলে রোসাঙ্গ রাজসভার বাংলা ভাষার কবি-সাহিত্যিকরা যে রাজ্যকে রোসাং ও মুসলিম জনপদ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন তা বৌদ্ধ উগ্রবাদীদের নির্মমতা ও নিষ্ঠুরতায় কালের গর্ভে হারিয়ে যায়। ফলে রোহিঙ্গা মুসলিমরা এখন নিজ দেশেই পরবাসী, বাস্তুহারা ও অধিকারহীন এক যাযাবর জনগোষ্ঠী। যাদের রক্তে প্রতিনিয়ত রঞ্জিত হচ্ছে মুসলিম জনপদ। কোনোভাবেই থামছে না উগ্রবাদীদের জিঘাংসা।
মূলত ‘অহিংসা পরম ধর্ম’-বিদ্বেষহীনতাই প্রকৃত ধর্ম’ বৌদ্ধ ধর্মের প্রধান উপজীব্য হলেও মিয়ানমারের মুসলমানদের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য নয় বলেই মনে হচ্ছে। অহিংস ধর্মের ধারক-বাহকরা কী কারণে সহিংস ও উগ্র হয়ে উঠলেন তা কারো বোধগম্য নয়। উগ্রবাদীরা হরহামেশাই মুসলমানদের হামলা, দেশ থেকে বিতাড়ন, নির্বিচারে হত্যা, বসতবাড়ি থেকে উৎখাত, নাগরিকত্ব হরণ, ব্যবসা-বাণিজ্য ধ্বংস, মসজিদে আগুন ও পুড়িয়ে মানুষ হত্যাসহ নানাবিধ জুলুম-নির্যাতন চালিয়ে আসছে দীর্ঘকাল ধরে। থামছে না তাদের সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা।
এসব মুসলিমবিরোধী দাঙ্গা ও হত্যাযজ্ঞের জন্য প্রধানত উগ্রবাদী ও ধর্মান্ধ বৌদ্ধদের একতরফা দায়ী করা হলেও সর্বসাম্প্রতিক গবেষণায় ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে। প্রাপ্ত এক তদন্ত প্রতিবেদনে জানা গেছে, মিয়ানমার সরকার ও সেনাবাহিনী অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবেই সে দেশে মুসলিমবিরোধী দাঙ্গা-হত্যাযজ্ঞে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে। মূলত ক্ষমতাসীনরা নিজেদের ক্ষমতাকে নিরাপদ ও নিষ্কন্টক রাখতেই মুসলমানদের ওপর উগ্রবাদীদের উসকে দিয়েছে এবং বিশ্ব ইতিহাসকে প্রতিনিয়ত রক্তাক্ত ও কলঙ্কিত করছে।
মিয়ানমার সরকার যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর পরিকল্পিতভাবে হত্যা চালিয়েছিল তার জোরালো প্রমাণ খুঁজে পেয়েছে আল জাজিরার তদন্তকারী দল। সর্বসাম্প্রতিক এক তদন্ত প্রতিবেদনে সে সত্যই বেরিয়ে এসেছে। ইয়েল ইউনিভার্সিটির ল স্কুলের এক প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করেই তারা এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে। গত ২৬ অক্টোবর ‘ঊীপষঁংরাব : দ ঝঃৎড়হম বারফবহপব’ ড়ভ মবহড়পরফব রহ গুধহসধৎ’ শিরোনামে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই দাবি করেছে আল জাজিরা। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের লয়েনস্টেইন ক্লিনিক মিয়ানমারের ওপর দীর্ঘ আট মাস ধরে গবেষণা চালানোর পর ওই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়। এক বিবৃতিতে ওই ক্লিনিক জানায়, রোহিঙ্গাদের ওপর ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছে এবং এতে ইন্ধন জুগিয়েছেন স্থানীয় রাজনীতিবিদ ও ক্ষমতাসীনরাই। তাদের ভাষায়, তারা যে উগ্রবাদী ও সহিংস বিবৃতি দিয়ে সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা সৃষ্টি করেছে তাতে গণহত্যা এড়ানোর কোনো উপায় ছিল না বরং এটিই ছিল বাস্তবতা।
মূলত মিয়ানমার সরকারের উসকানি ও আশকারায় যে দেশটির মুসলমানদের ওপর সাম্প্রদায়িক সহিংসতা চালানো হয়েছিল মানবাধিকার সংগঠন ফোর্ট রাইটস এবং আল জাজিরার তদন্ত দলের অনুসন্ধানেও তা দিবালোকের মত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তারা দাবি করছেন স্থানীয় নেতারা বৌদ্ধ ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা উসকে দিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে সচেষ্ট ছিলেন। তারা জাতিগত ধর্মীয়বিদ্বেষ ছড়িয়ে মূলত রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করেছে। বিভিন্ন সময় তারা রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য রেখে ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি করেছে। এ ছাড়াও ঐ নেতারা মুসলিমনিধনের জন্য চরমপন্থী বৌদ্ধ গোষ্ঠীগুলোকে আর্থিক সহায়তাসহ সকল ধরনের সহায়তা দিয়েছেন বলেও প্রমাণ খুবই জোরালো। ফলে বৌদ্ধ উগ্রবাদীদের রাষ্ট্রীয় ও সামরিক পৃষ্ঠপোষকতা খুবই স্পষ্ট।
দেশটিতে ৮ নভেম্বর সাধারণ নির্বাচনের আগে এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এতে ক্ষমতাসীন, সেনাবাহিনী ও উগ্রবাদীদের থলের বিড়াল বেরিয়ে পড়েছে। প্রতিবেদনে আরও অভিযোগ করা হয়েছে যে, সংখ্যালঘু মুসলিমদের দেশ ছাড়া করতে ক্ষমতাসীন এবং সেনাসমর্থিত ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ইউএসডিপি) বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছিল। আর বাস্তবেও এর প্রতিফলন লক্ষ্য করা গেছে। তবে এ বিষয়ে মিয়ানমার প্রেসিডেন্টের কার্যালয় এবং মুখপাত্রদের মন্তব্য করার অনুরোধ জানালেও তারা এতে রাজি হয়নি বরং তারা কৌশলে বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন। যা অভিযোগের সত্যতা প্রতিপাদন করে।
মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে গণহত্যা চালিয়েছিল তা আরও জোরালো ও মজবুত ভিত্তি পেয়েছে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং ইন্টারন্যাশনাল স্টেট ক্রাইম ইনিশিয়েটিভ (আইএসসিএল) গোষ্ঠীর পরিচালক পেনি গ্রিনের বক্তব্য থেকে। তিনি বলেন, ইউএসডিপি দলের নেতা এবং প্রেসিডেন্ট থিয়েন সেইন নিজে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ঘৃণ্য ও উসকানিমূলক বক্তব্য রেখেছেন যাতে মিয়ানমারের মুসলিমদের সংখ্যা হ্রাস, উচ্ছেদ এবং পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। আইএসসিএল আরো বলেছে, ২০১২ সালে রাখাইনে সংখ্যাগরু বৌদ্ধ ও সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিমদের মধ্যে যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছিল তা কোন দাঙ্গা নয়, তা সম্পূর্ণ পূর্ব পরিকল্পিত ছিল।
ওই দাঙ্গায় অগণিত মানুষ নিহত হয়েছিলেন যাদের সিংহভাগই ছিল রোহিঙ্গা মুসলিম। সে সময় গৃহহীন হয়েছিলেন আরও হাজার হাজার বনি আদম। যদিও অধ্যাপক গ্রিন একে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হিসেবে স্বীকার করতে চান না। তার ভাষায় এটি কোন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা নয়। এটি পরিকল্পিত সহিংসতা, নির্মম ও নিষ্ঠুর নিধনযজ্ঞ। রাখাইন মুসলিমদের ওপর হামলা চালানোর জন্য তখন বাসে করে বিভিন্ন এলাকা থেকে বৌদ্ধদের সংগঠিত করা হয়েছিল। শুধু তাই নয়, এসব হামলাকারীদের জন্য খাবার-দাবার সরবরাহ ও বিনোদনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কেউ না কেউ এসবের ব্যয় বহন করেছিলেন। অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে গোটা আগ্রাসী পরিকল্পনাটি রচিত হয়েছিল। ফলে নেপথ্যের কুশীলবরা থেকেছে জানা-শোনার বাইরে।
মিয়ানমারের সাবেক জাতিসংঘ দূত থমাস ওজিয়া কুইনটান এ সহিংসতার জন্য প্রেসিডেন্ট থিয়েন সেই এবং অন্যান্য মন্ত্রীদের ওপর তদন্ত করার আহবান জানিয়েছিলেন। এটি প্রমাণ হয় যে, গণহত্যা এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য মুসলিমবিরোধী দাঙ্গা ছড়াতে কলকাঠি নেড়েছিল মিয়ানমার সরকার। এই তথ্যের ওপর সামরিক কর্মকর্তা কর্তৃক প্রস্তুতকৃত নথি সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছে আল জাজিরা।
এতে দেখা যায়, মুসলিমদের মিয়ানমারের জনগোষ্ঠীর জন্য বিপজ্জনক উল্লেখ করে নানা ধরনের ঘৃণ্য বক্তব্য উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের তদন্তে মুসলিমবিরোধী বিদ্বেষ ছড়াতে মিয়ানমার সরকার যে ঘৃণ্য ও সাম্প্রদায়িক বক্তব্য রাখে তাও প্রমাণিত। দেশটির এক প্রাক্তন সংসদ সদস্য সেনাবাহিনী কর্তৃক মুসলিম বিদ্বেষ ছড়ানোর প্রমাণ দিয়েছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই নারী সদস্য আল জাজিরাকে বলেছেন, পর্দার আড়াল থেকে আসল কলকাঠি নেড়েছিল সেনাবাহিনী। যদিও তারা ওই দাঙ্গার সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিল না। তারা গোপনে বৌদ্ধ ধর্মান্ধ নেতাদের অর্থ সরবরাহসহ সকল ধরনের সহায়তা করেছে।
সরকার ও সেনাবাহিনী মুসলিমবিদ্বেষ কেন ছড়িয়েছিল? এমন প্রশ্নের জবাবে আল জাজিরার অবস্থান হচ্ছে, বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের মিয়ানমারের সেনাশাসনের বিরোধিতা থেকে নিবৃত্ত রাখতেই এই ঘৃণ্য পথ বেছে নিয়েছিল তারা। উল্লেখ্য, ২০০৭ সালে সামরিক সরকারকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিল গেরুয়া বিদ্রোহ। এরপরই তারা মুসলিম-বৌদ্ধ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার নীলনকশা রচনা করে। ফলে সরকার বিরোধী মূল ইস্যুটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হয় এবং মুসলিমবিদ্বেষের বিষয়টি মুখ্য হয়ে ওঠে।
এ প্রসঙ্গে ফোর্ট রাইট গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা ম্যাট স্মিথ বলেন, রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে একাধিক গণহত্যার প্রমাণ মিলেছে। যার কয়েকটির সঙ্গে দেশের ক্ষমতাসীন লোকজন জড়িত ছিল। ঘটনার ধারাবাহিকতায় প্রমাণিত হয় যে, মিয়ানমারে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় মুসলিম বিতাড়ন, নিপীড়ন ও নিধনের ঘটনা ঘটেছে। তা কোনভাবেই অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
কখনো থেমে থাকেনি বৌদ্ধ উগ্রবাদীদের নির্মমতা। ২০১২ সালের ১৪ জুন সংঘটিত দাঙ্গায় অন্তত ১৬০০ ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া হয়। দাঙ্গায় অন্তত ৩০ হাজার মানুষ উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়েছে এবং রাখাইন রাজ্য স্থাপিত ৩৭টি আশ্রয় শিবিরে অন্তত অর্ধ লক্ষ বনি আদম আশ্রয় নিয়েছে। স্থানীয় সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী রাখাইনদের সহায়তায় মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী নাসাকা, পুলিশ ও লুন্টিন বাহিনী এসব হত্যাকান্ড ও লুটতরাজের ঘটনা ঘটিয়েছে। মাত্র ৬ দিনের ব্যবধানে নিহত হয়েছিল ৪ শতাধিক মুসলমান, যা ইতিহাসের সকল বর্বরতা ও নিষ্ঠুরতাকে হারা মানায়।
চলতি বছরের মার্চ মাসে আবারও পরিকল্পিত দাঙ্গা শুরু হয়। মেইকতিলা শহরে বৌদ্ধ ও মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে বড় ধরনের দাঙ্গার ঘটনা ঘটে। সহিংসতায় কমপক্ষে ১০ জনের প্রাণহানি ঘটে। কয়েকটি মসজিদের ওপর হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। গত ১ মে উগ্রবাদী বৌদ্ধদের হামলায় নতুন করে অন্তত ২টি মসজিদ ও ২ শ’ ঘড়বাড়ি ধ্বংস করা হয়েছে। যা উগ্রবাদীদের নৃশংসতার প্রমাণ বহন করে।
মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের বিতাড়ন ও হত্যা করেই তারা ক্ষান্ত হয়নি বরং মুসলিম জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নতুন ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছে। এমনিতেই তো হাজার হাজার মুসলমানের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। এমনকি তাদেরকে ৮ নভেম্বর সাধারণ নির্বাচনে প্রার্থী হতে দেয়া হয়নি। আর এ ব্যাপারে ক্ষমতাসীন দল ইউএসডিপি এবং অং সান সূ চির নেতৃত্বাধীন বিরোধী দল ন্যাশনাল লিগ অব ডেমোক্র্যাসি (এনএলডি) একাট্টা। যদিও গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী অং সান সু চিকে উদারনৈতিক গণতন্ত্রবাদী মনে করা হয়। কিন্তু তিনি নিজের ব্যক্তিত্ব দিয়ে তা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন।
মূলত গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করতে মিয়ানমারের জন্য এ নির্বাচন কঠিন পরীক্ষা হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে। দেশটিতে ২০১০ সাল থেকেই বদলাতে শুরু করেছে রাজনৈতিক দৃশ্যপট। তবে সেনাবাহিনীর মদদপুষ্ট সরকারের ছত্রছায়ায় ২০১১ সাল থেকেই কট্টর বৌদ্ধ গোষ্ঠীগুলো সুবিধা পেয়ে আসছে। যার ফলশ্রুতিতে দেশের রাজনীতিতে তাদের সীমাহীন প্রভাব লক্ষণীয়। আর এ প্রভাব আশঙ্কাজনকভাবে ক্রমবর্ধমান। হয়তোবা এ কারণেই এ নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেননি রাখাইন মুসলিমরা। শুধু কি তাই! চলতি বছরের গোড়ার দিকে মিয়ানমার সরকার লাখ লাখ রোহিঙ্গা মুসলিমদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়ায় এ জনগোষ্ঠীর অনেকেই ভোটাধিকার প্রয়োগেরও সুযোগ পাচ্ছেন না। ফলে তাদের মানবাধিকার আজ ভূলুন্ঠিত। সর্বোপরি বিশ্ববিবেকও রীতিমতো নীরব।
সেনাশাসিত মিয়ানমারে ২৫ বছরের মধ্যে প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচনে সুকৌশলে মুসলিমদের বাদ দেয়া হয়েছে। প্রায় ৩০ লাখ রোহিঙ্গা মুসলিমকে ভোটার না করার পাশাপাশি বড় দলগুলোতে কোন মুসলিম প্রার্থী রাখা হয়নি।
দেশটির নোবেলজয়ী গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী অং সান সু চির দলের এক সূত্র জানিয়েছে, সূ চির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসি (এনএলডি) থেকে কোন মুসলিম প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়া হচ্ছে না। অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খোদ সু চির নির্দেশেই দলের মধ্যে মুসলিমদের কাটছাঁট করা হয়েছে। মূলত দেশটির উগ্রপন্থী বৌদ্ধদের মুসলিমবিরোধী মনোভাবের কারণেই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে গণতন্ত্রপন্থী দলটি। ফলে উদার গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এখন রীতিমতো প্রশ্নবিদ্ধ। কারণ, স্থানীয় ও জাতীয় নির্বাচনে এনএলডির ১,১৫১ জন প্রার্থীর মধ্যে একজন মুসলিম ছিল না। যদিও দেশটিতে ৫০ লাখ মুসলিমের বসবাস। দেশটির মোট জনসংখ্যার তুলনায় তা প্রায় ৪ থেকে ১০ শতাংশের মধ্যে।
অপর দিকে দেশটির সেনাসমর্থিত ক্ষমতাসীনদের দল ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির (ইউএসডিপি) পক্ষ থেকেও কোন মুসলিমকে প্রার্থী করা হয়নি। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে অনেক মুসলিম প্রার্থীর আবেদন বাতিল করা হয়েছে। তাদের মা-বাবা মিয়ানমারের নাগরিক নয়-এমন নোংরা অজুহাতে প্রার্থিতা বাতিল করা হয়, যা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
সু চির দলের এক সূত্র থেকে বলা হয়েছে, ‘আমাদের মনে হয় সু চি মা বা থা’র (উগ্রপন্থী বৌদ্ধদের সংগঠন) ব্যাপারে সতর্ক রয়েছেন। এ কারণেই মুসলিমদের অপসারণের প্রক্রিয়া চলছে’। উগ্রপন্থী বৌদ্ধদের সংগঠন মা বা থা (অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য প্রটেকশন অব বেস অ্যান্ড রিলিজন ) সরাসরি মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিষোদগার করে থাকে। তারা রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর আক্রমণ ও উত্তেজনা সৃষ্টি করে আসছে। ফলে উগ্রবাদীদের সমর্থন হারানোর আঙ্কায় সু চির এমন সিদ্ধান্ত।
২০১০ সালের পর মুসলিমবিরোধী বেশ কয়েকজন উগ্রপন্থী বৌদ্ধকে মিয়ানমারের জেল থেকে ছেড়ে দেয়ায় বিষয়টি আরো জটিল আকার ধারণ করেছে। ফলে উগ্রবাদীরা অতিমাত্রায় বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। দেশটিতে মুসলিমবিরোধী চেতনা দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়াতেই শান্তিতে নোবেলজয়ী সু চি মুসলিমদের এড়িয়ে চলছেন, যা আগামী দিনে মিয়ানমারের মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্য আতঙ্কেরই বলতে হবে। মূলত ২০১২ সালে রোহিঙ্গা মুসলিমদের গণহত্যা ও এখন পর্যন্ত চলা নিষ্ঠুর নির্যাতনের ব্যাপারে কোন মন্তব্য করেননি তিনি। এমনকি রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব না দেয়ার ব্যাপারেও তিনি নিশ্চুপ থাকেন। জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুরু করে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন রোহিঙ্গা মুসলিমদের নির্যাতনে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও সু চি এ ব্যাপারে টুঁ শব্দটিও করেননি। পর্যবেক্ষকরা এটিকে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে আখ্যা দিলেও তা মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্য মোটেই ইতিবাচক নয়।
মূলত সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধদের ভোট ছুটে যেতে পারে এমন আশঙ্কা থেকেই তিনি এ অবস্থান নেন। মিয়ানমারে প্রায় ১৩৫টি সংখ্যালঘু নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী রয়েছে। এদের মধ্যে রোহিঙ্গাসহ গুটিকয়েক সম্প্রদায়ের সদস্যদের নাগিরকত্ব দেয়া হয়নি। তাই তারা নির্বাচনে ভোট দিতে পারেনি। দেশটির এবার সাধারণ নির্বাচনে ৯০টি দল অংশ নিয়েছে।
রোহিঙ্গা মুসলমানরা এখন নিজ দেশেই পরবাসী ও বাস্তুহারা। মজলুম মানুষের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠছে মিয়ানমারের বিভিন্ন মুসলিম জনপদ। ইতিহাসসমৃদ্ধ রোমাঙ্গের মুসলমানরা আজ অধিকার হারা। বৌদ্ধ উগ্রবাদীদের জিঘাংসা ও সহিংসতার শিকার এসব অধিকারহারা বনি আদম। তাদের প্রতিহিংসা থেকে রেহাই পাচ্ছে না নারী, শিশু ও বৃদ্ধরাও। কিন্তু বিশ্ববিবেক রহস্যজনকভাবে নীরব। তাহলে রোহিঙ্গা মুসলমানরা কি একদিন কালের গর্ভে হারিয়ে যাবে? সে প্রশ্ন এখন সর্বত্রই!

SHARE

Leave a Reply