লকডাউন : ভোগান্তি ও অস্থিরতা -খাঁন মোহাম্মদ নজরুল

বিশ্ব এক ভয়াবহ লগ্ন পার করছে। অতি ক্ষুদ্রকায় এক অণুজীবের কাছে আজ পর্যুদস্ত, বিপর্যস্ত গোটা পৃথিবী। মানচিত্র আজ দখলে নিয়েছে করোনাভাইরাস। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে চীনের হুবেই প্রদেশ থেকে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস পুরো বিশ্বকে অচল ও স্থবির করে দেয়। তার মাত্র কিছুদিন আগেও লোকজন ক্ষমতা, শৌর্য-বীর্য প্রদর্শনের অসুস্থ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত ছিল। তারা ভেবেই নিয়েছিল পুরো পৃথিবী তাদের নখদর্পণে। পৃথিবীটা যেন তাদের হাতের তালুতে থাকা ক্রীড়নক মাত্র। বহু রাষ্ট্রনায়ক বাগযুদ্ধ বা বাণিজ্যযুদ্ধের দামামা বাজাতো; সামরিক মহড়া, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ, মিসাইল ও ভারী অস্ত্রের প্রদর্শনী করতো। প্রায়শই চাউর হতো ‘তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ¯œায়ুযুদ্ধের’ মতো গালভরা সব শব্দ। ক’দিন আগেও মানুষ ব্যস্ত ছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন রোবট তৈরিতে। অথচ আজ তারা অতি আণুবীক্ষণিক এক অণুজীবকে প্রতিহত-পরাস্ত করতে পারছেনা। নুয়ে পড়েছে তাদের দাম্ভিকতার শির; চূর্ণ হয়েছে অহমিকা। আজ ধনী-গরিব, রাজা-প্রজা সবাই মৃত্যুভয়ে কাতর। প্রকৃতি তার প্রাকৃতিক ক্ষমতার চাদরে অঘোষিত নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে সবকিছুকে। ছোট-বড়, উন্নত-অনুন্নত কোনো দেশই রক্ষা পাচ্ছে না এই নিয়ন্ত্রণ থেকে।

এই করোনার শতভাগ কার্যকরী প্রতিষেধক বা টিকা আবিষ্কার সম্ভব হয়নি এখনো। ভ্যাকসিন আবিষ্কারের গৌরব নিয়ে অনেক প্রতিযোগিতা চলমান এখনো। শক্তিধর দেশগুলোর রাজনৈতিক মারপ্যাঁচ ও অপপ্রচারও হচ্ছে অনেক। বাজারে কিছু ভ্যাকসিন গ্রহণযোগ্যতা পেলেও অনেকে ভ্যাকসিন নেয়ার পর আবারও করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন। ২০২০ সালের শেষের দিকে করোনার সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার কমতে থাকায় এসব ভ্যাকসিনের প্রতি মানুষের খানিকটা বিশ^াস গড়ে উঠেছিল। মানুষকে আশান্বিতও করেছিল অনেকটা। কিন্তু ২০২১ সালের মার্চে এসে সেই আশায় চিড় ধরছে। এখন অনেক দেশে করোনার সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার পুনরায় বাড়তে শুরু করেছে। অনেক দেশ নতুন করে লকডাউন, কারফিউয়ের মতো বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।
বাংলাদেশে চলছে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ। দেয়া হয়েছে লকডাউন। এ নিয়ে আশঙ্কা, ক্ষোভ, অস্বস্তির আনাগোনা সব মহলে। কারণ আমাদের জন্য অতীত লকডাউনের অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। বরং লকডাউন এক ভয়ঙ্কর বিষফোঁড়া। ২০২০ সালের লকডাউনে যে অপরিমিত ও অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে তার ক্ষত এখনো দগদগে। সেই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই নতুন লকডাউন একটি আতঙ্ক ও আশাহত বেদনার নাম। যেখানে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ গুছিয়ে উঠতে পারেনি এখনো। বাংলাদেশের শ্রমবাজার প্রায় ৬ কোটি ১০ লাখ লোকের উপর নির্ভর। এদের মধ্যে ১ কোটি ১০ লাখ লোক মাসিক বেতনভুক্ত এবং ২ কোটি ৭০ লাখ লোক স্ব-কর্মসংস্থানে নিয়োজিত। বাকিরা সবাই দিনমজুর। বিগত বছরের লকডাউনে শ্রমবাজারের এই বৃহৎ জনগোষ্ঠীর আয় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। অনেকে জমানো মূলধন থেকে ব্যয় নির্বাহ করেছে। অনেকে মূলধন শেষ করে চরম খাদ্যঝুঁকিতে দিনাতিপাত করেছে। অনেক কোম্পানি দেউলিয়া হয়ে গেছে। চাকরি হারিয়েছে অনেক মানুষ। অনেকের চাকরি আছে বেতন নেই। কোনো দিশা না পেয়ে বেশির ভাগ লোকই পাড়ি জমিয়েছেন গ্রামে। অনেকে আশায় বুক বেঁধে আছে এখনো- কবে না জানি তাদের বন্ধ কোম্পানি আবার চালু হয়, আবার তাদেরকে চাকরির জন্য ডাকে। ধার-দেনায় জড়িয়ে অধিকাংশ মানুষই জীবনকে করেছে বিষাক্ত। এদের কেউ কেউ পাওনাদারের ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে অজানা গন্তব্যে। ঋণগ্রস্ত কৃষকরা ধকল সামলাতে না পেরে কমিয়ে দিয়েছেন ফসলের চাষাবাদ। পুঁজি ভাঙা ব্যবসায়ীরা নতুন করে গুছিয়ে উঠার চেষ্টা করছে। ভাত-কাপড়ের নিশ্চয়তা না দিয়ে কোনো অপরিকল্পিত লকডাউন সাধারণ মানুষের জন্য বিভীষিকার নামান্তর। সরকার যদি সাধারণ জনগণের চিন্তা মাথায় রাখতেন তবে জনগণের কল্যাণে সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা নিতে পারতেন। গত ১ বছরের দুর্ভোগ থেকে শিক্ষা নিয়ে পদক্ষেপ নিতে পারতেন। মানুষ যেখানে খাদ্যের অভাবে, চিকিৎসার অভাবে মারা যায় সেখানে অনাকাক্সিক্ষত লকডাউন চরম দুর্ভোগের। গত বছর থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো অনলাইনে শিক্ষাকার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত পর্যাপ্ত ডিভাইসের ব্যবস্থা নেই। উপর্যুপরি প্রতিষ্ঠানগুলোতে ফরম ফিলাপ ও সেমিস্টার ফি প্রদানের জন্য চাপ দিচ্ছে। আমলাদের তৈরি এসব গণবিরোধী নির্দেশনা নতুন নতুন চিন্তা ভোগান্তির জন্ম দেয়।

বেসরকারি এনজিও ব্র্যাকের একটি জরিপে দেখা যায়- গত বছর করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে সবাইকে সামাজিক দূরত্ব মেনে চলতে মানুষকে ঘরে থাকতে হয়েছিল। এর প্রভাবে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল সমাজের নিম্ন আয়ের মানুষ। ফলে দেশের চরম দারিদ্র্যের হার ৬০ শতাংশ বাড়ে এবং ১৪ শতাংশ বা সোয়া দুই কোটি মানুষের ঘরে কোনো খাবার ছিল না।
বিশ্ব শ্রম সংস্থা (আইএলও) উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে, করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্বজুড়ে প্রায় ২৫ মিলিয়ন লোক চাকরি হারাতে পারে। নিশ্চয়ই বাংলাদেশও এ তালিকা থেকে বাদ পড়েনি।
আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থা অক্সফাম বলেছে লকডাউন, জরুরি অবস্থা প্রভৃতি কারণে বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রায় ৫০ কোটি লোক দরিদ্র হতে পারে যা ২০০৮ সালের মহামন্দাকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
স্থানীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেমের (সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং) এক জরিপ প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোভিড-১৯ এর কারণে লকডাউন ঘোষণায় বাংলাদেশে প্রায় ৬০ লাখ মানুষ তাদের কর্মসংস্থান হারায়। কর্মসংস্থান হারিয়ে ২০ শতাংশের অধিক লোক নতুন করে দারিদ্র্যের সম্মুখীন হন।
বিশ্বব্যাংকের আরেকটি হিসাব অনুযায়ী কোভিড-১৯ এর কারণে এক কোটি ৬৫ লাখ মানুষ নতুন করে দরিদ্র জনগোষ্ঠীতে যুক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ৫০ লাখ মানুষ চরম দারিদ্র্যে পতিত হন।
অ্যাসোসিয়েশন অব হোটেল ওয়ার্কার্স জানায়, চাকরি হারানোর ফলে সব থেকে বেশি ভোগান্তির শিকার হয়েছিল বিভিন্ন হোটেল রেস্তোরাঁর কর্মচারীরা। এবারের লকডাউনের কারণে হোটেল খাতের প্রায় ৩০ লাখ কর্মী কর্মসংস্থান হারাবে বলে ধারণা করছেন তারা।

এদেশের সিংহভাগ মানুষ নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত। বিভিন্ন অপ্রাতিষ্ঠানিক কাজ করে যাদের জীবিকা চলে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের তথ্য মতে- এ হার ৯০ শতাংশ। দিনমজুর, কারখানার শ্রমিক, কুলি, অটো, ভ্যান ও রিকশা চালক, হকার, ইত্যাদি। খোদ ঢাকা শহরে প্রায় এক কোটি ভ্যান বা রিকশাচালক, কারখানার শ্রমিক, গৃহকর্মী রয়েছে। রিকশা-সিএনজি চালক বাদে লকডাউনের কারণে প্রায় সকলের ইনকাম শূন্যের কোঠায়। চার দেয়ালের মাঝে নাতিশীতোষ্ণ বাতাসে যাদের সময় কাটে তাঁরা হয়তো দারিদ্র্যের এই দুঃসহ যাতনা বুঝবে না। কিন্তু বিশ শতাংশ দরিদ্র ও দশ শতাংশ চরম দরিদ্রের কাছে ক্ষুধার যাতনায় মারা যাওয়ার চেয়ে করোনায় মারা যাওয়াকে নস্যি মনে হবে। সরকারি হিসাবেই দেশে প্রায় বিশ শতাংশ দরিদ্র ও দশ শতাংশ চরম দরিদ্র লোক রয়েছে। সন্দেহ নেই চলমান মহামারীর প্রকোপে এই সংখ্যা বহু বৃদ্ধি পেয়েছে। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক এই মানুষগুলোর কোনো সঞ্চয় নেই। দিন এনে দিন খেতে হয়। লকডাউনের কারণে এদের উপার্জনও বন্ধ হয়ে যায়। এমতাবস্থায় নতুন করে লকডাউন দেয়ায় তা নিঃসন্দেহে দারিদ্র্যপীড়িত মানুষগুলোর ক্ষুধার রাজ্যে লকডাউনকে গদ্যময় মনে হবে।
কোনো রকম পরিকল্পনা ছাড়াই সরকার লকডাউনের প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। রমজান ও ঈদের সময় ব্যবসায়ী লোকজন অনেকটা সচলাবস্থার দিকে এগোতে পারেন। কিন্তু লকডাউনের কারণে মাঝারি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা চরম অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকিতে রয়েছে। সঙ্গতই অনেকে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ করছে।
ইতোমধ্যে জাতিসংঘের স্বাস্থ্য বিষয়ক প্রতিষ্ঠান বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) বলেছে, করোনাভাইরাসকে পুরোপুরিভাবে হয়তো কখনোই নির্মূল করা সম্ভব হবে না। মানুষকে জাতিগতভাবেই এই ভাইরাস বহন করতে হবে। পর্যায়ক্রমে সিজোনাল রোগে পরিণত হবে এটি।

যেহেতু এই রোগ পুরোপুরি নির্মূল সম্ভব নয় সেহেতু লকডাউনের বিকল্প আমাদের ভাবতেই হবে। বাংলাদেশ একটি উঠতি উন্নয়নশীল দেশ। উন্নত দেশের তুলনায় বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা ও প্রতিবন্ধকতা এ দেশের রয়েছে। তাই চাইলেই যখন তখন লকডাউন চলতে পারেনা। জীবন ও জীবিকা একে অপরের পরিপূরক। জীবিকা না থাকলে জীবন চলবে কিভাবে? জীবনের জন্যই জীবিকা অন্বেষণের উপায়ান্তর করতে হবে। অর্থনৈতিক সঙ্কট মোকাবিলায় লকডাউনের পরিবর্তে ব্যক্তিগত সচেতনতা ও সুরক্ষার প্রতি গুরুত্বারোপ করা যেতে পারে।
লেখক : কলামিস্ট

SHARE

Leave a Reply