লক্ষ্য অর্জনের পথে – মু. রাজিফুল হাসান

পর্ব-১০

(গত সংখ্যার পর)

উত্থান-পতনের বিশ্লেষণ
হযরত মুহাম্মদ সা.র নবুওয়াত প্রাপ্তির মাধ্যমে আল্লাহর পক্ষ থেকে মানবজাতির জন্য সর্বশেষ নাযিলকৃত হেদায়েতের গ্রন্থ আল-কোরআন (এর বিধি-বিধান) বাস্তবায়নের যাত্রা শুরু হয়। রাসূল সা.-এর নেতৃত্বে সুদীর্ঘ তেইশ বছরে আল্লাহর দেওয়া আইন কানুন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মক্কা ও মদিনাসহ আরবের কিছু জায়গায়। অর্থাৎ মুসলিম উম্মাহর লক্ষ্য বাস্তবায়ন হয়েছিল। পরবর্তীতে খলিফাগণ আল্লাহর জমিনে আল্লাহর আইন বাস্তবায়নের এই কাজটিকে আরো ব্যাপকভাবে প্রচার ও প্রসার করেন। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহুর সময়ে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হয়েছিল অর্ধ পৃথিবীজুড়ে। পরবর্তী দু’জন খলিফার (হযরত উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু ও হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু) সময়ে ইসলামী রাষ্ট্রের পরিধি সমান হারে বৃদ্ধি পায়নি, তবে খলিফাদ্বয় রাষ্ট্রের কাঠামো আর মৌলিক নিয়ম কানুন বজায় রেখেছিলেন জীবন দিয়ে। নবুয়াত থেকে খোলাফায়ে রাশেদার এই সময়টি ইসলামের শ্রেষ্ঠ যুগ হিসেবে খ্যাত। চার খলিফার পরও খেলাফতের শাসন চলছে আরো প্রায় ১২৫৪ বছর। অর্থাৎ ৬৬৩ সাল থেকে ১৯১৭ সাল পর্যন্ত পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে খেলাফতের শাসন চলছে। বৃহদাকারে যেসকল খেলাফত প্রতিষ্ঠা ছিল সেগুলো হলো উমাইয়া খেলাফত, আব্বাসী খেলাফত, ফাতেমীয় খেলাফত এবং সর্বশেষ উসমানী খেলাফত। তাছাড়াও ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিম শাসন উল্লেখ করার মতো। এসকল শাসনামলে বিভিন্ন সময় ইসলামী রাষ্ট্রের পরিধি যেমন হ্রাস-বৃদ্ধি পেয়েছে আবার শতভাগ মৌলিকত্ব বজায় রেখে ইসলামের নীতিমালা অনুসরণের ক্ষেত্রেও হয়েছে কিছু ব্যত্যয়। ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও মান সংরক্ষণের এই প্রচেষ্টার ধারাবাহিকতায় হয়েছে অনেক উত্থান-পতন। আজ আধুনিক যুগে এসে কোন এক জায়গা অথবা রাষ্ট্রকে একক কেন্দ্র ধরে পৃথিবীতে বৃহদাকারে খেলাফত প্রতিষ্ঠা না থাকলেও, পৃথিবীর অসংখ্য জায়গায় (রাষ্ট্রে) চলছে সেই কাক্সিক্ষত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের প্রচেষ্টা। এই প্রয়াস (যা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে উম্মাহর দায়িত্ব) পূরণে শুরু থেকে আজ অবধি ছোট-বড় যত অর্জন হয়েছে, তার সবটুকুই ছিল সর্বশক্তিমান আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালার অশেষ মেহেরবানি। তার সাহায্য ব্যতীত ছোট একটি পদক্ষেপ গ্রহণও মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়, এটাই মুসলমানদের বিশ্বাস। তবে তিনি হচ্ছেন সেই মহান সত্তা যিনি মানুষকে জয়-পরাজয় দেন মানুষের নিয়ত আর চেষ্টা-প্রচেষ্টা ভিত্তিতে। এ বিষয়ে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা বলেন-
إِنَّ اللَّهَ لَا يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ حَتَّىٰ يُغَيِّرُوا مَا بِأَنفُسِهِمْ ۗ
“আল্লাহ কোন জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যে পর্যন্ত না তারা তাদের নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে।” (সূরা আর রা’দ: ১১)
আর এ বিষয়ে হাদীস হলো-
عَنْ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ : إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّةِ، وَإِنَّمَا لِامْرِئٍ مَا نَوَى، فَمَنْ كَانَتْ هِجْرَتُهُ إِلَى اللهِ وَرَسُولِهِ فَهِجْرَتُهُ إِلَى اللهِ وَرَسُولِهِ، وَمَنْ كَانَتْ هِجْرَتُهُ لِدُنْيَا يُصِيبُهَا أَوْ امْرَأَةٍ يَتَزَوَّجُهَا فَهِجْرَتُهُ إِلَى مَا هَاجَرَ إِلَيْهِ.(متفقٌ على
صحته
অনুবাদ: উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “আমি রাসূল সা.-কে বলতে শুনেছি যে, যাবতীয় কার্য নিয়ত বা সংকল্পের উপর নির্ভরশীল। আর মানুষের জন্য তাই প্রাপ্য হবে, যার সে নিয়ত করবে। অতএব যে ব্যক্তির হিজরত (দেশত্যাগ) আল্লাহর (সন্তোষ লাভের) উদ্দেশ্যে ও তাঁর রাসূলের জন্য হবে; তার হিজরত আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জন্যই হবে। আর যে ব্যক্তির হিজরত পার্থিব সম্পদ অর্জন কিংবা কোন মহিলাকে বিবাহ করার উদ্দেশ্যেই হবে, তার হিজরত যে সংকল্প নিয়ে করবে তারই জন্য হবে। (বুখারি হাদীস নং- ১, ৫৪, মুসলিম- ১৯০৭, তিরমিযি- ১৬)
তাই দ্বীন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য অর্জনের পথে রাসূল সা.-এর যুগ থেকে আজ আধুনিক যুগ পর্যন্ত যত উত্থান-পতন হয়েছে, সেখানে ইসলামের মূলনীতির ওপর থেকে মুসলমানদের চেষ্টা-প্রচেষ্টা বা পদক্ষেপসমূহ গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনার বিষয়। মুসলমানরা যখন মূলনীতির উপর অবিচল থেকে সঠিক পদক্ষেপ নিতে পেরেছিল, তখন এসেছিল আল্লাহর সহযোগিতা এবং কাক্সিক্ষত বিজয় (সফলতা)। যে পদক্ষেপের মাঝে ছিল সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সর্বোৎকৃষ্ট কৌশল অবলম্বন, সীমাহীন ধৈর্যের বাঁধ, প্রজ্ঞা আর মৌলিক মানবীয় গুণের সমন্বয়। আবার এসকল মানদ-ে পিছিয়ে পড়ার কারণে বরণ করতে হয়েছে অনেক পরাজয় আর লাঞ্ছনা-বঞ্চনার জীবন। তাই লক্ষ্য অর্জনের পথে এই উত্থান-পতনের ধারাবাহিকতায় মুসলমানদের পদক্ষেপসমূহ বিশ্লেষণ যেমন জরুরি, আবার এ পথে বাধাদানকারী শক্তিসমূহের পদক্ষেপও বিশ্লেষণের যথার্থ দাবি রাখে। আর এই বিশ্লেষণের মাধ্যমেই হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জনের সঠিক পথ।
১. নবুয়তের যুগ (৬১০-৬৩৩):
হযরত মুহাম্মদ সা.-এর নিকট প্রথম ওহি নাযিল হওয়া থেকে তার ওপর পর্যন্ত সময়টি হলো নবুয়তের সময়কাল বা যুগ। অর্থাৎ ৬১০ থেকে ৬৩৩ সাল পর্যন্ত এই সময়টিতে পবিত্র কোরআন ধাপে ধাপে নাযিল হয়। আর কোরআন নাজিলের প্রতিটি ধাপ ছিল রাসূল সা.-এর দ্বীন প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের বিভিন্ন প্রেক্ষাপটকে কেন্দ্র করে। তাই রাসূল সা.-এর প্রতিটি কাজই (পদক্ষেপ) ছিল আল্লাহর নির্দেশনার আলোকে, যা পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে-
۞يُوحَىٰ وَحْيٌ إِلَّاهُوَ إِنْ ۞الْهَوَىٰ عَنِ يَنطِقُ وَمَا
“সে (মুহাম্মদ সা.) নিজের খেয়ালখুশি মতো কথা বলে না। যা তাঁর কাছে নাযিল করা হয়, তা ওহী ছাড়া আর কিছুই নয়। (আন-নাজম: ৩-৪)
অর্থাৎ মুহাম্মদ সা. যা বলেন সবই আল্লাহর পক্ষ থেকে। এই বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণেই রাসূল সা. হলেন পৃথিবীর সমগ্র মানবতার জন্য অনুসরণীয় ও অনুকরণীয়। আর এই স্বীকৃতির ঘোষণা দিয়েছেন স্বয়ং আল্লাহ সুবহানাতায়ালা নিজেই-
لَّقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِّمَن كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا
“যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্যে রাসূলুল্লাহর মধ্যে উত্তম নমুনা রয়েছে।” (সূরা আল আহ্যাব: ২১)
এসকল কারণেই নবুয়তের এই যুগটি হলো মুসলিম উম্মাহর জন্য সর্বোত্তম আদর্শ যুগ। যে যুগের গৃহীত মূলনীতি ও শিক্ষার উপর ভিত্তি করে আজ অবধি পরিচালিত হয়ে আসছে মুসলিম জাতি এবং পৃথিবীর প্রলয় পর্যন্ত মুসলিম জাতি যেকোনো বিষয়ে মূলনীতি গ্রহণে মানদ- (কষ্টিপাথর) হিসেবে গ্রহণ করতে হবে হযরত মুহাম্মদ সা.-এর নবুয়তি জীবনের শিক্ষা থেকেই।

১.১. ব্যর্থ হয়েছে উতবার কৌশল: সময়টি খুব বেশি ভালো যাচ্ছিল না কোরাইশ সর্দার উতবা ইবনে রাবিআর। একইভাবে অন্যান্য কোরাইশ কাফেরদেরও। আর এর কারণ হলো এইতো কিছুদিন আগেই ইসলাম গ্রহণ করেছে হামজা ইবনে আবদুুল মুত্তালিব। হযরত হামজার (রা) ইসলাম গ্রহণের পরপরই বৃদ্ধি পেতে লাগল মুসলিমদের সংখ্যা। আর এই কারণেই কিছুটা বিষন্ন এবং চিন্তিত কোরাইশ নেতাগণ। এমনই সময়ে এক নতুন ফন্দি আঁটলো উতবার মাথায়। আর তা হলো রাসূল সা.-এর নিকট প্রস্তাব নিয়ে যাওয়ার ফন্দি। যে প্রস্তাবের কিছু অংশও যদি মুহাম্মদ সা.কে মানানো যায়, তবে আপাতত দ্বীন প্রচারের কাজ বন্ধ করা যাবে। নতুন পরিকল্পনার বিষয়ে কোরাইশ নেতাদের সাথে পরামর্শ করল উতবা। দ্বীন প্রচারের কাজ বন্ধে উতবার প্রস্তাবে স্বায় (সম্মতি) দেয় কোরাইশ সর্দাররা। তাই দেরি না করে উতবা তার কৌশল বাস্তবায়নের জন্য চলে গেল মসজিদুল হারামে একাকী বসে থাকা হযরত মুহাম্মদ সা.-এর নিকট।
অতঃপর উতবা বলল: “ভাতিজা, তুমি আমাদের গোত্রের মধ্যে কতখানি সম্ভ্রান্ত ও বংশমর্যাদা সম্পন্ন তা তোমার অজানা নয়। তুমি একটা মারাত্মক ব্যাপার নিয়ে তোমার জাতির কাছে আবির্ভূত হয়েছ। তোমার এ দাওয়াত জাতির মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করেছে। তুমি তাদেরকে বেকুফ ঠাওরিয়েছ এবং তাদের পূর্বপুরুষদের হেয় প্রতিপন্ন করেছ। আমার কথা শোনো! তোমার কাছে কয়েকটা বিকল্প প্রস্তাব রাখছি। একটু ভেবে দেখো এর কিছু কিছু মেনে নিতে পার কি না।”
রাসূলুল্লাহ সা. বললেন: “বেশ, বলুন। আমি শুনি।”
উতবা বললো, “ভাতিজা, তুমি যে নতুন দাওয়াত দিতে শুরু করেছ, এর দ্বারা যদি বিপুল সম্পদ লাভ করা তোমার ইচ্ছা হয়ে থাকে, তাহলে আমরা তোমার জন্য অর্থ সংগ্রহ করে তোমাকে আমাদের ভিতরে সবচেয়ে বিত্তশালী বানিয়ে দেবো। আর যদি তুমি পদমর্যাদা লাভ করতে চাও তাহলে আমরা তোমাকে এ দেশের রাজা বানিয়ে দেবো। আর যদি এমন হয়ে থাকে যে, তোমার কাছে জিন আসে, তাকে তুমি হটাতে পারছ না, তাহলে আমরা তোমার চিকিৎসা করাবো। যত টাকা লাগুক তোমাকে সুস্থ করে তুলবো। কেননা অনেক সময় জিন মানুষের ওপর পরাক্রান্ত হয়ে থাকে এবং তাকে তাড়ানোর জন্য চিকিৎসার প্রয়োজন হয়।”
এবার রাসূল সা. বললেন: “হে আবুল ওয়ালিদ, আপনার কথা কি শেষ হয়েছে?” জবাবে উতবা বলল: “হ্যাঁ।”
রাসূল সা. বললেন: “তাহলে আমার কিছু কথা শুনুন।”
উতবা: “বলো।”
অতঃপর রাসূলুল্লাহ সা. কোরআনে বর্ণিত সূরা হামিম আস সাজদা তিলাওয়াত করা শুরু করলেন। যার অর্থ হলো, “পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু। হা-মীম! এটা পরমত করুণাময় ও দয়ালু আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিল হওয়া কিতাব। আরবি ভাষায় নাযিলকৃত কিতাব কুরআন। এর আয়াতগুলোকে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, জ্ঞানী লোকদের জন্য। সুসংবাদবাহী ও সতর্ককারী হিসেবে তা এসেছে। কিন্তু তাদের অধিকাংশই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে; তারা শুনতে চায় না। তারা বলে, তুমি যে বিষয়ের দিকে আমাদের আহ্বান করছো, আমাদের মন তা থেকে পর্দার আড়ালে রয়েছে।”
এ সময় উতবা খুবই মনোযোগ সহকারে কোরআনের কথাগুলো শুনছিল। আর তিলাওয়াত করতে করতে রাসূল সা. একসময় সিজদার আয়াতে গিয়ে থামলেন এবং সিজদা করলেন। অতঃপর রাসূল সা. উতবাকে উদ্দেশ্য করে বললেন: “যা শুনবার তা তো শুনলেন। এখন যা করণীয় মনে করেন করুন।”
অতঃপর উতবা উঠে তার সঙ্গী-সাথীদের কাছে ফিরে গেলো। সঙ্গীরা তাকে দেখে পরস্পর বলাবলি করতে লাগলো, উতবা এক রকম চেহারা নিয়ে গিয়েছিল, এখন ভিন্ন রকম চেহারা নিয়ে ফিরে আসছে।” দলবলের মধ্যে গিয়ে বসতেই সবাই তাকে জিজ্ঞেস করলো: “হে আবুল ওয়ালিদ, আপনার কথা কী?”
উতবা বললো: “আমি এমন বাণী শুনেছি যা আর কখনো শুনিনি। হে কোরাইশগণ, সত্যিই তা কবিতাও নয়, কোন জ্যোতিষীর কথাও নয়। তোমরা আমার কথা শোনো এবং এই ব্যাপারটা আমার ওপর ছেড়ে দাও। এই লোকটা যা করতে চায় করতে দাও। তার সাথে কোনো সংশ্রব রাখো না। আমি নিশ্চিত যে, মুহাম্মদ যে কথা প্রচারে নিয়োজিত, তা ভবিষ্যতে বিরাট আলোড়ন তুলবে। আরবরা যদি তার বিপর্যয় ঘটায় তাহলে তোমরা অন্যের সাহায্যে তার হাত থেকে রক্ষা পেয়ে গেলে। আর যদি সে আরবদের ওপর জয়যুক্ত হয় তাহলে তার রাজত্ব তোমাদেরই রাজত্ব হবে। তার মর্যাদা তোমাদেরই মর্যাদার কারণ হবে। পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা সৌভাগ্যবান জনগোষ্ঠী।”
উতবার কথা শুনে সবাই একবাক্যে বলে উঠলো: “মুহাম্মদ এবার তোমাকে যাদু করেছে।”
উতবা বললো: “এটা আমার অভিমত। এখন তোমরা যা ভালো বুঝ কর।”
উপরোক্ত বর্ণনা হতে এটি খুবই স্পষ্ট, যে উদ্দেশ্য নিয়ে রাসূল সা.-এর নিকট উতবা গিয়েছিলো; তা সে বাস্তবায়ন করতে পারেনি। বরং কোরাইশদের উদ্দেশ করে বলা তার কথার মাঝে ইসলাম ও রাসূল সা. সম্পর্কে তার (উতবার) দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে। অর্থাৎ উতবা রাসূলকে সা. তার বশ্যতায় নিতে পারেনি বরং সে নিজেই বশ্যতা প্রকাশ করতে বাধ্য হয়েছিল। আর এটি এজন্য সম্ভব হয়েছিল যে, রাসূল সা. উতবার কথার বিপরীতে সঠিক জবাব দিতে পেরেছিলেন বলে। প্রথমত, জবাবের জন্য রাসূল সা. যে উৎস থেকে কথা বলেছেন তা ছিল আল কোরআন, যা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সমাধানের গ্রন্থ। দ্বিতীয়ত, জবাবের জন্য যে আয়াতগুলো তিনি তিলাওয়াত করেছিলেন, সেসকল আয়াতের কথাগুলো ছিল উতবার (তথা তৎকালীন কোরাইশ মুশরিকদের) চিন্তা-চেতনা ও কার্যকলাপের প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বাস্তবিক, উপযুক্ত এবং যথার্থ জবাব। তাহলে রাসূল সা.-এর আন্দোলনের এ অধ্যায় থেকে আমরা দু’টি মূলনীতি নির্ধারণ করতে পারি।
মূলনীতি-১: সর্বোত্তম উৎস তথা আল-কোরআন থেকে জবাব দেওয়া।
মূলনীতি-২: সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য যথার্থ জবাব বাছাই করা।

১.২. কারামত প্রদর্শন নয় বরং সত্য দাওয়াতে অবিচল আল্লাহর রাসূল সা.: ক্রমান্বয়ে ইসলামের দাওয়াত ছড়িয়ে পড়ছে কোরাইশ গোত্রসমূহের নারী-পুরুষদের মাঝে। এহেন অবস্থায় কোরাইশরা নিজ নিজ গোত্রের মুসলমানদের আটকে রেখে, আবার কারো ক্ষেত্রে নির্যাতন চালিয়ে ইসলাম থেকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টায় রত। তবে তাতে ফল পাচ্ছে না কোরাইশ কাফেররা। কারণ শত নির্যাতন-নিপীড়নের মাঝেও ঈমানের ওপর অবিচল ছিল মুসলমানগণ। ফলে কোরাইশ নেতাদের পেরেশানি দিনদিন বাড়তেই থাকলো। কারণ কোরাইশদের দৃষ্টিতে নিজেরা শত চেষ্টা করেও মুসলমানদেরকে দ্বীনের পথ থেকে ফিরিয়ে আনতে না পারা ও মোহাম্মদ সা.র দাওয়াতি কার্যক্রম বন্ধ করতে না পারাটা ছিল তাদের নেতৃত্বে দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ। তাই জনগণের সামনে নিজেদের নেতৃত্বকে সুপ্রতিষ্ঠিত রাখার লক্ষ্যে উপায় খুঁজছিল তারা। একদিন সূর্যাস্তের পর কোরাইশ সর্দাররা কাবা শরীফের নিকট সমবেত হলো, যেখানে কোরাইশদের প্রত্যেক গোত্রের গোত্রপতিগণ উপস্থিত ছিল। তারা পরস্পরকে বলাবলি করছিল যে “মোহাম্মদকে ডেকে পাঠাও, তার সাথে কথা বল, প্রয়োজনে ঝগড়াও কর। তাহলে জনতার কাছে তোমরা দোষ এড়িয়ে যেতে পারবে।”
অতঃপর একজন গিয়ে রাসূল সা.কে ডেকে আনলেন।
কোরাইশ নেতাগণ রাসূল সা.কে উদ্দেশ্য করে বললো: “হে মুহাম্মাদ তোমার সাথে কিছু কথা বলার জন্য আমরা তোমাকে ডেকে পাঠিয়েছি। খোদার কসম, তুমি তোমার সম্প্রদায়ের মধ্যে যে বিভেদ সৃষ্টি করেছ, তেমন আর কোন আরব কখনো করেছে বলে আমাদের জানা নেই। তুমি পূর্বপুরুষদের ভর্ৎসনা করেছ, প্রচলিত ধর্মের নিন্দা করেছ, দেব-দেবীকে গালিগালাজ করেছ, বুদ্ধিমান লোকদের বোকা ঠাওরিয়েছ এবং জাতির ঐক্যে ভাঙন ধরিয়েছ। মোটকথা, আমাদের ও তোমার মধ্যে কোন খারাপ জিনিসই আনতে তুমি বাকি রাখনি। এখন কথা হলো এসব কথা বলে তুমি যদি সম্পদ অর্জন করতে মনস্থ করে থাক, তাহলে আমরা তোমাকে টাকা কড়ি সংগ্রহ করে দিই, যাতে তুমি আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বিত্তশালী হতে পার। আর যদি এর দ্বারা তুমি পদমর্যাদার প্রত্যাশী হয়ে থাক, তাহলে আমরা তোমাকে সরদার বানিয়ে দিই। আর যদি তুমি রাজা বাদশাহ হতে চাও তাহলে এসো তোমাকে আমাদের রাজা বানিয়ে নিই। আর তোমার কাছে যে দূত আসে সে যদি কোন জিন-ভূত হয়ে থাকে এবং তোমার ওপর পরাক্রান্ত হয়ে থাকে তাহলে আমরা যত টাকা লাগুক, তোমার চিকিৎসা করাতে প্রস্তুত যাতে তুমি সুস্থ হয়ে ওঠ অথবা তোমার সম্পর্কে জনতার কাছে আমাদের কোনো জবাবদিহি করতে না হয়।”
রাসূলুল্লাহ সা. জবাবে বললেন: “তোমরা যা যা বলছ তার কোনটাই আমি চাই না। আমি যে দাওয়াত তোমাদের কাছে পেশ করেছি তার উদ্দেশ্য এ নয় যে, আমি তোমাদের সম্পদ চাই কিংবা তোমাদের মধ্যে পদমর্যাদায় শ্রেষ্ঠ হতে চাই কিংবা তোমাদের রাজা হতে চাই। আমাকে আল্লাহ তোমাদের কাছে রাসূল করে পাঠিয়েছেন, তিনি আমার প্রতি এক কিতাব নাযিল করেছেন এবং তোমাদের জন্য সাবধানকারী ও সুসংবাদ দানকারী হতে আমাকে আদেশ করেছেন। তাঁর আদেশ অনুসারে আমি তোমাদের কাছে আমার প্রতিপালকের বাণী পৌঁছে দিয়েছি এবং তোমাদেরকে কল্যাণের জন্য সদুপদেশ দিয়েছি। এখন তোমরা যদি আমার এই দাওয়াত গ্রহণ করে নাও, তাহলে সেটা তোমাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতের সৌভাগ্য বয়ে আনবে। আর যদি তা প্রত্যাখ্যান কর তাহলে তোমাদের ও আমার ব্যাপারে আল্লাহর চূড়ান্ত ফায়সালা না আসা পর্যন্ত আমি ধৈর্য ধারণ করবো।”
কোরাইশ সর্দাররা বললো: “হে মুহাম্মদ, আমরা যে কয়টা প্রস্তাব তোমার কাছে পেশ করলাম তার কোনটাই যদি তোমার কাছে গ্রহণযোগ্য না হয়, তাহলে আর একটা কথা শোনো। তুমি তো জান, দুনিয়ায় আমাদের মতো সংকীর্ণ আবাসভূমি আর কারো নেই, পানির অভাব ও অন্যান্য উপকরণের দৈন্যের কারণে আমরা যেরূপ দুঃসহ জীবন যাপন করি, পৃথিবীতে আর কোনো জাতি এমন জীবন যাপন করে না। সুতরাং তোমার যে প্রভু তোমাকে রাসূল করে পাঠিয়েছেন, তার কাছে প্রার্থনা কর যেন তিনি এই পাহাড় পর্বতগুলোকে এখান থেকে দূরে সরিয়ে নেন যাতে আমাদের আবাসভূমি আরো প্রশস্ত হয় এবং তিনি যেন ইরাক ও সিরিয়ায় নদ-নদীর ন্যায় আমাদের এ দেশেও নদ-নদী প্রবাহিত করে দেন। তাঁর কাছে আরো প্রার্থনা কর তিনি যেন আমাদের পূর্বপুরুষদের পুনরুজ্জীবিত করেন এবং পূর্বপুরুষদের মধ্যেই কুসাই ইবনে কিলাবও যেন অন্তর্ভুক্ত থাকেন যিনি অন্যতম সত্যবাদী ন্যায়নিষ্ঠ নেতা ছিলেন। তাদেরকে আমরা তোমার কথা সত্য না মিথ্যা জিজ্ঞেস করবো। তারা যদি বলেন তুমি সত্যবাদী এবং আমাদের দাবি অনুসারে তুমি যদি কাজ কর তাহলে আমরা তোমার ওপর বিশ্বাস স্থাপন করবো, তোমার খোদাপ্রদত্ত মর্যাদা আমরা স্বীকার করবো এবং তোমাকে যথার্থই আল্লাহর রাসূল বলে মেনে নেব।”
জবাবে রাসূলুল্লাহ সা. তাদেরকে বললেন: “এসব ব্যাপার নিয়ে আমি তোমাদের কাছে আসিনি। আমাকে আল্লাহ যে জিনিস দিয়ে পাঠিয়েছেন, তাছাড়া আর কোনো কিছু আমার ইখতিয়ারে নেই। আর যা দিয়ে আমাকে পাঠানো হয়েছে তা আমি তোমাদের কাছে পৌঁছিয়ে দিয়েছি। এটা যদি তোমরা গ্রহণ কর তাহলে এটা দুনিয়া ও আখিরাতে তোমাদের সৌভাগ্যের দুয়ার খুলে দেবে। আর যদি অগ্রাহ্য কর তাহলে আল্লাহ তোমাদের ও আমার মধ্যে একটা চূড়ান্ত ফায়সালা না করা পর্যন্ত আমি ধৈর্য ধারণ করবো।”
কোরাইশ সর্দাররা বললো: “এ প্রস্তাবও যদি তোমার মনঃপূত না হয়, তাহলে তুমি নিজের জন্য একটা কাজ কর। তোমার প্রতিপালককে বল তোমার সাথে একজন ফেরেশতা পাঠাতে। তিনি আমাদের সামনে তোমার কথা সত্য বলে সাক্ষ্য দেবেন এবং তোমার পক্ষ হয়ে আমাদের সাথে কথা বলবেন। আর আল্লাহ তোমার জন্য আনেকগুলো বাগবাগিচা ও প্রাসাদ বানিয়ে দিক এবং অনেক সোনা রূপার ধনদৌলত দান করুক। এতে করে তোমার যে অর্থলিপ্সা দেখতে পাই তা মিটবে। কেননা তুমি তো আমাদেরই মতো বাজারে ঘোরাফেরা কর এবং আমাদেরই মতো জীবিকা অন্বেষণ কর। তোমার এসব ধনদৌলত হলে আমরা বুঝবো, তুমি যথার্থই আমাদের চাইতে শ্রেষ্ঠ এবং তোমার প্রভুর কাছে মর্যাদাবান। তুমি নিজের ধারণা মোতাবিক সত্যিই যদি রাসূল হয়ে থাক তাহলে এসব করে দেখাও তো দেখি।”
জবাবে রাসূল সা. বললেন: “না এটাও আমি করবো না। আমি আল্লাহর কাছে এসব জিনিস চাইতে পারবো না। আমি তোমাদের কাছে এসব জিনিস নিয়ে আসিনি। আল্লাহ আমাকে কেবল সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী করে পাঠিয়েছেন। তোমরা যদি আমার আহ্বানে সাড়া দাও, তবে সেটা হবে দুনিয়া ও আখিরাতে তোমাদের সৌভাগ্যের উৎস। আর যদি প্রত্যাখ্যান কর, তাহলে আল্লাহ যা করেন তাই হবে। তিনি যতক্ষণ আমার ও তোমাদের মধ্যে নিষ্পত্তি করে না দেন ততক্ষণ আমি ধৈর্য ধারন করবো।”
কোরাইশ সর্দাররা বললো: “তাহলে কয়েক টুকরো মেঘ আমাদের মাথার ওপর ফেলে দাও, যেমন তুমি বিশ্বাস কর যে, আল্লাহ ইচ্ছা করলে তা পারেন। এটা না করলে আমরা তোমার ওপর ঈমান আনবো না।”
জবাবে রাসূল সা. বললেন: “এটা সম্পূর্ণ আল্লাহর ইখতিয়ারাধীন। তিনি ইচ্ছা করলে অবশ্যই তা করতে পারেন।”
উপরে বর্ণিত ঘটনায় যে বিষয়টি দৃশ্যমান হয় তা হলো, কাফেররা ঈমান আনয়নের শর্ত হিসেবে রাসূল সা.কে বিভিন্ন কারামত প্রদর্শনের আহ্বান জানান। জবাবে রাসূল সা. প্রতিবারই তাদের এই আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেন এবং তাকে যে দায়িত্ব দিয়ে পাঠানো হয়েছে তা কাফেরদের অবহিত করেন। এ ছাড়াও কাফেররা যদি দাওয়াত গ্রহণ করে, তবে তাদের প্রাপ্তি কী হবে; তাদেরকে সে বিষয়ে অবহিত করেন। আর যদি দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করা হয় তবে আল্লাহর সিদ্ধান্ত পর্যন্ত তিনি ধৈর্য ধারণ করে যাবেন বলে কাফেরদের অবহিত করেন।
এখানে রাসূল সা.-এর আন্দোলনের এই দাওয়াতি জীবন থেকে দু’টি মূলনীতি খুঁজে পাওয়া যায়।
মূলনীতি-৩: দাওয়াতের ময়দানে কারামত (আকস্মিক কোন কিছু) প্রদর্শন করে ইসলামের দিকে মানুষকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা, রাসূল সা.-এর সুন্নাত নয়।
মূলনীতি-৪: দাওয়াত প্রদানের ক্ষেত্রে মূল দাওয়াত পেশ করতে হবে এবং দাওয়াত গ্রহণের সুফল জানিয়ে দিতে হবে। অতঃপর কেউ দাওয়াত গ্রহণ না করলে, আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল (ভরসা) করে ধৈর্যধারণ করতে হবে।

১.৩. মুশরিকদের আপসের প্রস্তাব কাজে আসেনি: সবেমাত্র শিয়াবে আবু তালিবের অবরুদ্ধ জীবন থেকে মুক্ত হলো মুসলমানরা। অতঃপর পূর্বের ন্যায় অব্যাহতভাবে দাওয়াতি কার্যক্রম জারি রাখলেন রাসূল সা.। শিয়াবে আবু তালিবের অবরুদ্ধ জীবনের প্রভাব আর বার্ধক্যজনিত কারণে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন আল্লাহর রাসূলের সা. চাচা আবু তালিব। এদিকে কোরাইশ মুশরিকরা শলা পরামর্শ করল যে, ইসলামের দাওয়াত কোরাইশদের মাঝে যেভাবে ছড়িয়ে পড়ছে তা যদি এখনই বন্ধ করা না যায়; তবে সংকট আরো ঘনীভূত হবে। শলা পরামর্শ করে ইসলামের দাওয়াত বন্ধ করার একটি উপায় বের করল তারা। আর তা হলো আবু তালিব বেঁচে থাকতেই, তার মধ্যস্থতায় মোহাম্মদের সা. সাথে একটি চুক্তি করে, তাকে আপসে নিয়ে আসা। সিদ্ধান্তক্রমে কোরাইশ নেতারা আবু তালিবের নিকট উপস্থিত হলো।
ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, “উতবা ও শাইবা ইবনে রাবিয়া, আবু জাহল, উমাইয়া ইবনে খালাফ, আবু সুফিয়ান ইবনে হারব প্রমুখ বড় বড় কোরাইশ নেতা আবু তালিবের কাছে গিয়ে হাজির হলো। তারা তাকে বললো, “হে আবু তালিব, আপনি আমাদের কাছে কতখানি শ্রদ্ধার পাত্র তা আপনার অজানা নয় আজ আপনি মারাত্মক রোগে আক্রান্ত। আপনার জীবন নিয়ে আমরা শঙ্কিত। আপনার ভাতিজার সাথে আমাদের সম্পর্কের ধরণও আপনার জানা। কাজেই তাকে ডাকুন, মৃত্যুর আগে তার সাথে আমাদের একটা আপসরফা করে দিয়ে যান। তার সম্পর্কে আমাদের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি নিন এবং আমাদের সম্পর্কে তার কাছ থেকেও প্রতিশ্রুতি আদায় করে দিন, যাতে আমরা তার ওপর কোন বাড়াবাড়ি না করি এবং সেও আমাদের ওপর কোনো বাড়াবাড়ি না করে। আমরাও তার ও তার ধর্মের ওপর হস্তক্ষেপ না করে আর সেও আমাদের ওপর কোনো বাড়াবাড়ি না করে। আমরাও তার ও তার ধর্মের ওপর হস্তক্ষেপ না করি আর সেও আমাদের ও আমাদের ধর্মের ব্যাপারে কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ না করে।”
অতঃপর আবু তালিব রাসূলকে সা. ডেকে আনলেন এবং বললেন: “ভাতিজা, এরা তোমার সম্প্রদায়ের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি। তারা এসেছে তোমার নিকট থেকে একটা কথা নিতে এবং তার বিনিময়ে তোমাকে একটা প্রতিশ্রুতি দিতে।
জবাবে রাসূল (সা) বললেন: “হ্যাঁ, তোমরা আমার নিকট থেকে একটা মাত্রকথা গ্রহণ করো তাহলে সমগ্র আরবের মালিক হয়ে যাবে এবং অনারব লোকেরা সবাই তোমাদের বশ্যতা স্বীকার করবে।”
আবু জাহল বললো: “বেশ! তা হলে একটা কেন, দশটা কথা গ্রহণ করতেও রাজি আছি।”
রাসূল সা. বললেন: “তোমরা ঘোষণা কর যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই এবং অন্য যে সব দেব-দেবীর পূজা করো তা আর করবে না।”
এ কথা শুনে তারা সবাই হাততালি দিলো। অতঃপর বললো: “আচ্ছা মুহাম্মদ, তুমি কি চাও যে, আমরা অন্য সব দেব-দেবীর বদলে শুধুমাত্র একজনের পূজা করি? এটা তোমার একটা আজগুবি কথা।” এরপর তারা পরস্পর বলাবলি করতে লাগলো, “দেখ, এই লোকটির কাছে তোমরা যা প্রত্যাশা করছো তা সে কখনো দেবে না। অতএব তোমরা চলে যাও। তার ও তোমাদের ব্যাপারে আল্লাহর ফায়সালা না আসা পর্যন্ত বাপ-দাদার ধর্ম পালন করতে থাক।”
এখানে কোরাইশদের মূল প্রস্তাবটি ছিল, ‘কোরাইশরা মুহাম্মদ সা. ও তার ধর্ম ইসলামের ওপর কোন প্রকার হস্তক্ষেপ করবে না। এবং মুহাম্মদও (সা) যেন তাদের (কোরাইশ মুশরিকদের) শিরকি ধর্মের ওপর কোনো হস্তক্ষেপ না করেন।’
এই প্রস্তাবটি খুব গভীরভাবে খেয়াল করলে অনুধাবন করা যায়, এ প্রস্তাবের মর্মার্থ হলো এখন থেকে মুহাম্মদ সা. শুধু নিজের ধর্ম নিজেই পালন করবেন, অন্য কাউকে তার দ্বীনের (ইসলামের) দিকে আহ্বান করতে পারবেন না। কারণ চুক্তির প্রস্তাবনা মতে, অন্য কাউকে তার দ্বীনের দিকে আহ্বান করার মানেই হলো কোরাইশদের ধর্মের উপর হস্তক্ষেপ করা। আর ইসলাম এরকম একটি ধর্ম যার মূল আহ্বান হচ্ছে, আল্লাহর একত্ববাদের দিকে। অর্থাৎ ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’ এই বাক্য মেনে নেয়ার আহ্বান। যে আহ্বানের অর্থ হলো ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই। আর হযরত মুহাম্মাদ সা. আল্লাহর রাসূল।’ অথচ তৎকালীন আরব সমাজে মুসলিম ব্যতীত অন্য যারা বসবাস করত, তারা ছিল আরবদের প্রচলিত ধর্মের অনুসারী। যে ধর্মের মূলে রয়েছে একাধিক খোদায় বিশ্বাস, যা ইসলাম ধর্মের মূল দাওয়াতের সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। আর তাই আরবের প্রচলিত ধর্মের অনুসারীদেরকে ইসলামের দাওয়াত দেওয়া মানেই হলো, তাদের ধর্মের উপর হস্তক্ষেপ করার শামিল। অর্থাৎ এই চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়ার অর্থই (মানে) হলো, মক্কায় নবুয়াতি দায়িত্বের কার্যক্রম বন্ধ করে দিতে হবে; সমাজে জাহিলিয়াত প্রতিষ্ঠিত দেখেও চুপ থাকতে হবে; যা ইসলামী বিশ্বাসের আলোকে মুনাফেকি চরিত্র ছাড়া কিছুই নয়।
তখন রাসুল সা. মুশরিকদের প্রস্তাবিত চুক্তির মর্মার্থ বুঝতে পেরেছিলেন। আর তাই তিনি আপসের এই চুক্তি করার পরিবর্তে তাদেরকে আহ্বান করেছিলেন একত্ববাদের দিকে। কিন্তু দুর্ভাগা মুশরিকরা অনেক কিছু মেনে নিতে পারলেও মেনে নিতে পারিনি তাওহিদের দাওয়াতকে। আল্লাহর রাসূলের সা. জীবনের এই প্রেক্ষাপট থেকে মুসলিম উম্মাহর লক্ষ্য বাস্তবায়নের পথে একটি মূলনীতি অনুধাবন করা যায়। আর তা হলো-

মূলনীতি-৫: ইসলামের মৌলিক বিষয়সমূহের ক্ষেত্রে কোনো প্রকার আপসের সুযোগ নেই।

(চলবে)
লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, প্রেরণা

SHARE

Leave a Reply