লক্ষ্য অর্জনের পথে – মু. রাজিফুল হাসান

পর্ব-১১

১.৪. দীপ্তময় শপথে উন্মোচিত হলো নতুন প্রভাতের আলো :
নবুয়তের ১১তম বছরে মদিনার খাজরাজ গোত্রের ছয়জন লোকের একটি দল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট ইসলাম গ্রহণ করলেন। অতঃপর নওমুসলিমগণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে উদ্দেশ করে বলল, “আমরা আমাদের সম্প্রদায়কে এক ভয়ঙ্কর শত্রুর শত্রুতার মুখে অসহায় অবস্থায় রেখে এসেছি। আমরা আশা করি আল্লাহ আমাদের গোটা সম্প্রদায়কেই আপনার সমর্থক করে দেবেন। আমরা তাদের কাছে ফিরে গিয়ে আপনার দাওয়াত তাদের কাছেও তুলে ধরবো। আল্লাহ যদি তাদেরকে আপনার সমর্থক বানিয়ে দেন তাহলে আপনার চেয়ে সম্মানিত ও পরাক্রান্ত আর কেউ থাকবে না।” (সিরাতে ইবনে হিশাম, ১১৫ পৃষ্ঠা)
মদিনায় পৌঁছে প্রকৃত অর্থেই তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেওয়া তাদের ওয়াদা রক্ষা করেছিল। তারা তাদের গোত্রের লোকদের নিকট ইসলাম গ্রহণের আহ্বান জানালো এবং ক্রমান্বয়ে মদিনার প্রতিটি ঘরে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দিয়েছিল। অবস্থা এমন হয়েছিল যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নিয়ে আলোচনা হতো না, এমন একটি ঘরও অবশিষ্ট ছিল না। পরবর্তী বছর নবুয়তের ১২তম বছরে হজের মৌসুমে মদিনা থেকে ১২ জন লোক রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে উপস্থিত হন। তাদের মাঝে পাঁচজন ছিল, যারা আগের বছর ইসলাম গ্রহণ করেছিল। আর অবশিষ্ট সাতজন ছিল নতুন, যাদের মাঝে পাঁচজন ছিল খাজরাজ গোত্রের এবং দু’জন আউস গোত্রের অন্তর্ভুক্ত। তারা মক্কা থেকে দুই মাইল দূরে মিনায় আকাবা নামক স্থানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট সমবেত হলো। তাদের মাঝে যারা অমুসলিম ছিল তারা ইসলাম গ্রহণ করে এবং সকলে মিলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট কয়েকটি বিষয়ে বাইয়াতবদ্ধ হয়। আর এই বাইয়াত গ্রহণের অনুষ্ঠানকে আকাবার প্রথম বাইয়াত বলা হয়। বাইয়াতের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে হযরত উবাদা ইবনুল সামিত (রা) বলেন, “আমি আকাবার প্রথম বাইয়াতে উপস্থিত ছিলাম। আমরা ছিলাম বারোজন পুরুষ। নারীদের বাইয়াতের পদ্ধতিতেই আমাদের বাইয়াত সম্পন্ন হয় এবং তা ছিল যুদ্ধের নির্দেশ আসার পূর্বেকার ঘটনা। আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে অঙ্গীকার করেছিলাম যে, ১. আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করবো না, ২. চুরি-ডাকাতি করবো না, ৩. ব্যভিচার করবো না, ৪. সন্তান হত্যা করবো না, ৫. কারো বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ রটাবো না এবং ৬. ন্যায়সঙ্গত ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অবাধ্যতা করবো না।”
অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “এসব অঙ্গীকার পূরণ করলে তোমাদের জন্য জান্নাতও রয়েছে। আর এর কোনো একটি ভঙ্গ করলে তোমাদের পরিণতি আল্লাহর হাতে ন্যস্ত থাকবে। ইচ্ছে করলে তিনি শাস্তি দেবেন, ইচ্ছে করলে মাফ করে দেবেন।” (সিরাতে ইবনে হিশাম, ১১৫-১১৬ পৃষ্ঠা)
অতঃপর হজের কার্যক্রম শেষ হলে মুসলমানদের এ দলটি মদিনায় ফিরে গেল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সাথে মুসআব ইবনে উমাইর রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে মদিনায় পাঠালেন, যেন তিনি মদিনার মুসলমানদের দ্বীনি শিক্ষা প্রদান করেন এবং অমুসলিমদের মাঝে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেন। মদিনায় পৌঁছে হযরত মুসআব ইবনে উমাইর রাদিয়াল্লাহু আনহু আশ্রয় নেন হযরত আসওয়াদ ইবনে যুরারার (রা) ঘরে। অতঃপর তারা দু’জন মিলে এমনভাবে দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালনা করলেন যে, এক বছরের মাঝে মদিনার (আনসারদের) বেশি সংখ্যক পরিবার থেকেই কয়েকজন করে ইসলাম গ্রহণ করে। তাদের মাঝে পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও ছিল। তবে বনি খেতমা, বনি উমাইয়া বিন যায়েদ ও বনি ওয়ায়েলের পরিবারগুলো থেকে কেউ ইসলাম গ্রহণ করেনি। অতঃপর নবুয়তের ১৩তম বছর হজ উপলক্ষে মদিনার মুশরিকদের সাথে অনেক নওমুসলিমও মক্কায় আগমন করেন। পথিমধ্যে মুসলমানরা নিজেদের মাঝে আলোচনা করছিল মক্কায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্কটময় অবস্থান এবং তাঁকে মদিনায় নিয়ে আসা সংক্রান্ত বিষয়ে।
মক্কায় আগত (মদিনার) মুসলমানদের মাঝে কয়েকজন ব্যতীত অন্যদের কারো সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সাক্ষাৎ হয়নি। তাই মক্কায় পৌঁছে কাব ইবনে মালিক (রা) ও বারা ইবনে মারুর (রা)সহ কয়েকজন মুসলিম মিলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে খুঁজে বের করলেন এবং কিছুটা গোপনে তার সাথে সাক্ষাৎ করেন। সাক্ষাতে তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে নির্ধারিত দিনে আকাবা নামক স্থানে সাক্ষাতের ওয়াদা করেন। ইতোমধ্যে কিছুদিন আগেই মদিনা থেকে ফিরে আসা মুসআব ইবনে উমাইর (রা) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মদিনার মুসলিমদের ঈমানী চেতনা এবং তাদের সঙ্কল্পের কথা অবহিত করেন। এবার কাক্সিক্ষত সময়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সাক্ষাতের পালা। মূলত যেদিন হজের আনুষ্ঠানিকতা শেষ এর পরবর্তী রাতটাই ছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে মদিনার মুসলমানদের সাক্ষাৎ হবার প্রতিশ্রুত রাত (সময়)। সে রাতের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে কাব ইবনে মালিক (রা) বলেন, “সেই রাতে আমরা আমাদের কওমের লোকদের সাথে কাফিলার মধ্যেই ঘুমালাম। রাত এক-তৃতীয়াংশ অতিক্রান্ত হওয়ার পর আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেয়া ওয়াদা মোতাবিক আকাবার উদ্দেশে বেরিয়ে পড়লাম। নিশাচর পাখির মত অতি সন্তর্পণে ও অতি গোপনে বেরিয়ে পড়লাম। পথ চলতে চলতে আমরা আকাবার নিকটবর্তী গিরিবর্তে গিয়ে সমবেত হলাম। আমরা সর্বমোট ৭৩ জন লোক জমায়েত হলাম, যাদের মাঝে দুইজন মহিলাও ছিলেন। মহিলা দু’জন হলেন মুসাইব বিনতে কাব ও আসমা বিনতে আমর ইবনে আদি। আমরা গিরিবর্তে সমবেত হয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতীক্ষায় রইলাম। অবশেষে তিনি তাঁর চাচা আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিবকে সাথে নিয়ে সেখানে পৌঁছলেন। তখনও আব্বাস (রা) ইসলাম গ্রহণ করেননি। তিনি কেবল ভ্রাতষ্পুত্রের ঐ গুরুত্বপূর্ণ কাজটি প্রত্যক্ষ করা ও তাঁর নিরাপত্তা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার জন্যই এসেছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন বৈঠকে বসলেন, তখন সর্বপ্রথম আব্বাস আমাদের সাথে কথা বললেন।
আব্বাস বললেন, “হে খাজরাজ গোত্রের জনমণ্ডলী মুহাম্মাদ আমাদের মধ্যে কিরূপ মর্যাদার অধিকারী, তা আপনাদের নিশ্চয়ই জানা আছে। তাঁকে তাঁর সম্প্রদায়ের লোকদের জুলুম নির্যাতন থেকে আমরা এ যাবৎ রক্ষা করেছি। তাঁর সম্প্রদাযের মধ্যে তিনি একটা বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। ফলে তাঁর সম্প্রদায় ও জন্মভূমিতে তিনি সম্মান ও নিরাপত্তার অধিকারী। তা সত্ত্বেও আপনাদের প্রতি তাঁর অদম্য আগ্রহ এবং আপনাদের মধ্যেই তিনি থাকতে কৃতসঙ্কল্প। এখন আপনারা ভেবে দেখুন, তাঁকে আপনারা যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন তা রক্ষা করতে পারবেন কি না এবং তাঁর শত্রুদের হাত থেকে তাঁকে নিরাপদে রাখতে পারবেন কি না। তা যদি পারেন তা হলে আপনাদের দায়দায়িত্ব ভালো করে বুঝে নিন। আর যদি মনে করেন যে, ভবিষ্যতে আপনারা তাঁকে তাঁর শত্রুদের হাতে সমর্পণ করবেন এবং সাথে করে নিয়ে যাওয়ার পরও তাঁকে লাঞ্ছনার মুখে ঠেলে দেবেন, তাহলে এখনই সেই দায়িত্ব গ্রহণ থেকে বিরত থাকুন। কেননা বর্তমানে তিনি তাঁর স্বজাতির কাছে ও আপন মাতৃভূমিতে সম্মানে ও নিরাপদে আছেন।”
এখানে হযরত আব্বাসের (রা) বক্তব্য লক্ষ্য করলে দেখা যায়, তিনি মদিনার মুসলমানদের সামনে কিছু বিষয় স্পষ্ট করতে চেয়েছেন। মদিনার মুসলমানরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মদিনায় নিয়ে যাওয়ার যে প্রস্তাব করেছে, তাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সায় বা আগ্রহ আছে। তবে মদিনার মুসলমানরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে গ্রহণ করা বা আশ্রয় দেওয়ার অর্থ হলো ইসলামের শত্রুদেরকে নিজেদের শত্রু হিসেবে গ্রহণ করা।
কারণ এই সময়টি ছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য একটি সঙ্কটময় সময়। শিয়াবে আবু তালিবে তিন বছর কারারুদ্ধ জীবন কাটানোর পর পরই নবুয়তের দশম বছরে মারা যান রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চাচা আবু তালিব। যিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিরাপত্তা দিতে প্রতিনিয়ত কুরাইশদের প্রতিরোধ করে আসছিলেন। আবার দ্বীন প্রতিষ্ঠার এই কণ্টকাকীর্ণ পথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নবুয়তের দায়িত্ব পালন করে দিন শেষে ঘরে ফিরে যার কাছ থেকে প্রশান্তি পেতেন, সেই সহধর্মিণী হযরত খাদিজাতুল কুবরাকেও (রা) হারিয়েছেন একই বছর। ফলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কষ্ট যেন দ্বিগুণ হয়ে গেল। আর এই দু’জনকে হারানোর পর থেকেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে কুরাইশদের খারাপ আচরণের মাত্রা আরো বেড়ে গেল, যা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি বক্তব্য থেকে স্পষ্ট হয়। আবু তালেব মারা যাওয়ার পর একদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চলার পথ রুদ্ধ করে, তার মাথায় ধুলো নিক্ষেপ করল কুরাইশদের এক লোক। আর এই লোকটি কুরাইশদের নেতা পর্যায়ের কেউ ছিল না বরং অত্যন্ত নিম্নশ্রেণীর এক অর্বাচীন ছিল। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ধুলো মাথায় বাড়ি গেলে, তার এক মেয়ে কাঁদতে কাঁদতে তার মাথার ধুলো মুছে পরিষ্কার করে দেয়। এ সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন: “মা, কাঁদিস না! তোর আব্বাকে আল্লাহ রক্ষা করবেন।” এক পর্যায়ে আরো বলেন, “আবু তালিব মারা যাওয়ার আগে কুরাইশরা আমার সাথে কোন রকম খারাপ আচরণ করতে পারেনি।”
মক্কায় যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই করুণ অবস্থা তখন কিছুটা আশা নিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাওয়াতের বাণী প্রচারে ছুটে যান মক্কা থেকে ৬০ মাইল দূরে তায়েফ শহরে। আর সেখানে তিনি দশ দিন থেকে শহরের নেতৃস্থানীয় লোকদের নিকট ইসলামের দাওয়াত পেশ করেন। কিন্তু তারা ইসলাম গ্রহণ করেনি বরং তাকে শহর ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। যখন দুঃখভারাক্রান্ত মন নিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তায়েফ হতে মক্কার পথে রওনা হলেন, তখন উচ্ছৃঙ্খল বালকদের লেলিয়ে দিয়েছিল তার পেছনে। যারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বিভিন্ন গালমন্দ করে এবং বারেবারে পাথর নিক্ষেপে রক্তাক্ত করেছিল। [আর তারা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওপর এই বর্বরতা চালিয়েছিল সুদীর্ঘ পাঁচ কিলোমিটার পথ (দূরত্ব) পর্যন্ত।] এ সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শরীর থেকে এত বেশি রক্ত ঝরেছিল যে, তার জুতাগুলো রক্তে ভিজে পায়ের সাথে লেগে গিয়েছিল। অতঃপর মক্কায় ফিরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইসলামের দাওয়াত নিয়ে বনুকাল্ব, বনু হোনাইফা এবং বনু আমের গোত্রের নিকট হাজির হন। তবে তাদের কোন গোত্রই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাওয়াতে সাড়া দেয়নি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন গোত্রসমূহের নিকট দাওয়াত দিতে থেকেছিলেন তখন তার পেছনে পেছনে এই দাওয়াত অগ্রাহ্য করতে আহবান জানাচ্ছিলেন তাঁরই (রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের) আপন চাচা আবু লাহাব। এভাবেই দুঃখ-কষ্ট আর কুরাইশদের বিরোধিতার মাঝে কাটছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দিনগুলো। তখন বিরোধিতার এক পর্যায়ে কুরাইশরা চিন্তাভাবনা করছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হত্যা করে অথবা দেশ থেকে বিতাড়ন করে অথবা বন্দী করে দ্বীন প্রতিষ্ঠার কাজকে থামিয়ে দেয়ার। (সূরা ইউসুফ নাযিলের সময়কাল থেকে)
আর স্বাভাবিক দৃষ্টিতে এই সময়টিতে যারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আশ্রয় দিতে যাচ্ছে প্রকারান্তরে তারা নিজেদেরকে হুমকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে বোধগম্য হয়। তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে গ্রহণ করার মত কঠিন কাজটি করতে মদিনার মুসলমানরা কতটুকু প্রস্তুত আছে? তারা কি শুধু আবেগের বশীভূত হয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে গ্রহণ করতে যাচ্ছে নাকি বাস্তবতাকেও অনুধাবন করে (জেনে-বুঝে) রাসূলকে সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মদিনায় আহ্বান জানিয়েছে? তা অনুধাবন করাই ছিলো আব্বাসের বক্তব্যের মূল উদ্দেশ্য (সারাংশ)।
অতঃপর হযরত আব্বাসের বক্তব্যের পর জবাবে মদিনার মুসলমানদের পক্ষ থেকে কাব বিন মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “আপনার কথা আমরা শুনলাম। হে আল্লাহর রাসূল, এখন আপনি বলুন এবং (আমাদের কাছ থেকে) যেমন খুশি অঙ্গীকার নিন!”
কাবের (রা) ঈমানদীপ্ত জবাবের মাঝে মদিনার মুসলমানদের আন্তরিক আগ্রহ, সাহসিকতা এবং দৃঢ় মনোবলের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। আর এটি উপলব্ধি করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে বাইয়াতে আবদ্ধ করেন যেন তাদের এই আগ্রহ, সাহসিকতা এবং দৃঢ়তা পূর্ণতা লাভ করে।
বাইয়াতের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে হযরত জাবের রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমরা নিবেদন করলাম, “হে আল্লাহর রাসূল, আমরা আপনার কাছে কী কী বিষয়ের ওপর বাইয়াত করবো?” তিনি বলেন-
১. ভালো-মন্দ সকল অবস্থায় আমার কথা শুনবে এবং মানবে।
২. সচ্ছলতা অসচ্ছলতা উভয় অবস্থায় ধন-সম্পদ ব্যয় করবে।
৩. (সকল ভয়-ভীতি উপেক্ষা করে) আল্লাহর পথে উঠে দাঁড়াবে এবং তার ব্যাপারে কারও ভর্ৎসনা তিরস্কারের পরোয়া করবে না।
৪. তোমরা (মানুষকে) সৎ কাজের আদেশ দেবে এবং অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখবে।
৫. তোমাদের কাছে যাওয়ার পর আমাকে সাহায্য করবে এবং যেভাবে নিজেদের প্রাণ ও সন্তানদের হেফাজত করো, সেভাবে আমারও হেফাজত করবে। এতে তোমাদের জন্য রয়েছে জান্নাত। (আর রাহিকুল মাখতুম-১৯৫ পৃষ্ঠা)
[উল্লেখ্য শপথে অংশগ্রহণকারী সকলেই পূর্ব থেকে মুসলিম ছিল। অর্থাৎ মুসলিম থাকার পরও তারা এই শপথে আবদ্ধ হয়েছিল।]
উপরোক্ত ঘটনা বর্ণনায় দেখা যায়, যখন মদিনার মুসলমানগণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট যে কোন অঙ্গীকার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করলেন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে নির্দিষ্ট শপথে আবদ্ধ করে নেন। যে শপথের মাঝে ছিল-
প্রথমত: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সর্বাবস্থায় নেতা হিসেবে মেনে নেওয়ার কথা, যা ছিল ইসলামী রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অন্যতম ভিত্তি।
দ্বিতীয়ত: সকল অবস্থায় দ্বীন প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে জান ও মাল দিয়ে সক্রিয় থাকার কথা, যা দ্বীনকে প্রতিষ্ঠার দিকে নিয়ে যাওয়ার একটি ধারাবাহিক প্রচেষ্টা।
তৃতীয়ত: মানুষকে সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখার ওয়াদা, যা একটি কল্যাণকর সুষম সমাজগঠনের মৌলিক পাথেয়।
সর্বশেষ: নিজের প্রাণ ও সন্তানদের ওপর কোন আপদ-বিপদ এলে যেমন নিজের জীবন বাজি রেখে তাদেরকে হেফাজত করবে, একইভাবে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর কোন আপদ বিপদ এলে নিজের জীবন বাজি রেখে তাকে রক্ষা করার ওয়াদা।
উল্লেখ্য, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হেফাজত করার মানে হলো (অর্থই হলো) সকল বিরোধিতার মুখে ইসলামকে রক্ষা করা। কারণ আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদি নাই থাকেন তবে ওহি নাজিল হবে কার নিকট। অর্থাৎ আল্লাহ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রক্ষার ওয়াদা করার মাধ্যমে ইসলামকে হেফাজতের শপথ গ্রহণ করেছিল মুসলিমগণ। যে শপথের মাধ্যমে বান্দা হিসেবে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে দ্বীন প্রতিষ্ঠার পথে সর্বোচ্চ ত্যাগের স্বীকৃতি দিয়েছিল মুসলিমগণ।
এসকল বিশ্লেষণ থেকে খুব সহজেই অনুমেয় যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় হিজরতের পর যে ইসলামী সমাজব্যবস্থা কায়েম করেছিলেন, এর মূল ভিত্তি রচিত হয়েছিল এই শপথের মাধ্যমে। তাই এর ঘটনা বিশ্লেষণ হতে আমরা মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করতে পারি।
মূলনীতি-৬ : দ্বীন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য বাস্তবায়নের পথে (প্রয়োজনে) বাইয়াতবদ্ধ হওয়া, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আন্দোলনেরই অংশ।
মূলনীতি-৭ : বাইয়াত (হবে) ইসলামের মৌলিক বিষয়সমূহের ওপর শুধুই আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে, অন্য কোন বিষয়ের ওপর কোন ব্যক্তি বিশেষের সন্তুষ্টি বা পার্থিব কোন কিছু অর্জনের জন্য নয়।
১.৫. প্রজ্ঞাময় হিজরতে বানচাল হলো শয়তান ও মুশরিকদের ষড়যন্ত্র: নবুয়তের চতুর্দশ বছরে আরবি ২৬ সফর মাসে দারুন নোদওয়ায় (কুরাইশদের সংসদে) সমবেত কোরাইশ নেতৃবৃন্দ। ইতোমধ্যে নজদের অধিবাসী পরিচয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ পণ্ডিত বেশে (রূপে) সভায় উপস্থিত হয়েছে শয়তান। তাদের উদ্দেশ্য একটাই, হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দ্বীন প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে মূলোৎপাটন করতে একটি চূড়ান্ত পরিকল্পনা প্রণয়ন করা। অনেক পর্যালোচনার পর অবশেষে শয়তানের সহযোগিতায় মুশরিকরা হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হত্যার সিদ্ধান্তে ঐকমত্য হলো। এ দিকে তাদের এই সিদ্ধান্তের কথা জিবরাইল (আ) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অবহিত করে বলেন, “আল্লাহ তাআলা আপনাকে মক্কা থেকে হিজরতের অনুমতি দিয়েছেন।” (আর রাহিকুল মাখতুম-২০৭ পৃষ্ঠা)
তিনি আরো বলেন, “আপনি প্রতিদিন যে বিছানায় ঘুমান আজ রাতে সে বিছানায় ঘুমাবেন না।” (সিরাতে ইবনে হিশাম-১২৭ পৃষ্ঠা)
এ খবর জেনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আবু বক্কর সিদ্দিক (রা)-এর বাড়িতে গমন করে তাকে হিজরতের বিষয়ে অবহিত করেন। অতঃপর দু’জন মিলে হিজরতের চূড়ান্ত পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। পরিকল্পনা সম্পন্ন করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাড়ি ফিরে যান। এদিকে রাত ঘনিয়ে এলে নবী হত্যার ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নে তৎপর হয় কুরায়েশ নেতারা। কুরাইশদের ১১ জন নেতার নেতৃত্বে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাসভবন ঘেরাও করা হয়।
ইবনে ইসহাক বলেন, “রাতের আঁধার ঘন হয়ে এলে ১১ জন দুর্বৃত্ত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাসভবনের দরজায় ওঁৎ পেতে বসে যায়। তারা অপেক্ষা করছিল তিনি (রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শুয়ে পড়লে একযোগে হামলা করবে।”
কাফেরদের উপস্থিতি বুঝতে পেরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বললেন, “তুমি আমার এ সবুজ হাদরামি চাদর গায়ে দিয়ে আমার বিছানায় শুয়ে পড়ো। ওদের হাতে তোমার কোন ক্ষতি হবে না।” (আর রাহিকুল মাখতুম ২০৮ পৃষ্ঠা) উল্লেখ্য, এ চাদর গায়ে দিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতে ঘুমাতেন। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কঙ্করযুক্ত এক মুঠো ধুলো হাতে নিলেন এবং কাফেরদের মাথায় নিক্ষেপ করেন। এ সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিলাওয়াত করছিলেন- “আমি তাদের সামনে প্রাচীর ও পশ্চাতে প্রাচীর স্থাপন করেছি এবং তাদের আবৃত করেছি। ফলে তারা দেখতে পায় না।” (সূরা ইয়াসিন: ৯)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিক্ষিপ্ত ধূলিকণা সকল মুশরিকের মাথায় পড়লো এবং তারা নিজেদের চোখ-মুখ কচলাতে লাগল। এদিকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘর থেকে বেরিয়ে হযরত আবু বকরের (রা) বাড়ির দিকে গেলেন, তবে আল্লাহর ইচ্ছায় তাঁকে তারা দেখতে পেল না। হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে সাথে নিয়ে তার ঘরের পেছনের জানালা দিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বেরিয়ে গেলেন। তাঁরা দ্রুতগতিতে চলতে লাগলেন যেন সূর্যোদয়ের আগেই মক্কার সীমানা অতিক্রম করতে পারেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বাভাবিক ধারণা থেকেই বুঝতে পেরেছিলেন সকাল হলেই দুর্বৃত্তরা তাকে খুঁজবে এবং মদিনা অভিমুখী পথ ধরে তারা চলবে। কারণ এইতো কিছুদিন (আড়াই মাস) আগেই মদিনার মুসলমানরা আকাবার শপথের মাধ্যমে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আশ্রয় দেওয়ার ওয়াদা করে গিয়েছিল। আর এ বিষয়টি সম্পর্কে ইতোমধ্যে কুরাইশরাও অবগত আছে। তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা থেকে উত্তর দিকে মদিনার পথ পরিহার করে মক্কা থেকে দক্ষিণ দিকে ইয়েমেনের পথে অগ্রসর হলেন এবং ৫ মাইল (৮ কিলোমিটার) পথ পাড়ি দিয়ে সওর পর্বতের একটি গুহায় আশ্রয় নেন।
এদিকে সকাল হলে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে না পেয়ে হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর বাড়িতে গেল দুর্বৃত্তরা। এ বিষয়ে হযরত আসমা বিনতে আবু বকর (রা) বলেন, “আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রওনা হয়ে যাওয়ার পর, আমাদের বাড়িতে আবু জাহলসহ কুরাইশদের একটি দল এলো। তারা আবু বকরের (রা) দরজার সামনে দাঁড়াল। আমি তাদের কাছে গেলাম। তারা বলল, ‘তোমার আব্বা কোথায়?’ আমি বললাম, ‘আব্বা কোথায় জানি না।’ সঙ্গে সঙ্গে পাষণ্ড নরাধম আবু জাহল আমার মুখে এমন জোরে থাপ্পড় মারল যে আমার কানবালাটি ছিটকে পড়ে গেল। অতঃপর তারা চলে গেল।” (সিরাতে ইবনে হিশাম-১৩১ পৃষ্ঠা)
অতঃপর কোরাইশ নেতারা এক জরুরি বৈঠকে মিলিত হয়ে কিছু নতুন সিদ্ধান্ত নিলো। তারা সিদ্ধান্ত মোতাবেক মক্কা থেকে বাহিরে যাবার পথে কড়া পাহারা বসালো এবং ঘোষণা করল যে, যদি কেউ মুহাম্মদ ও আবু বকর এ দু’জনের একজনকেও জীবিত বা মৃত হাজির করতে পারে তবে একেকজনের বিনিময়ে তাকে ১০০টি উট পুরস্কার দেওয়া হবে। (আর রাহিকুল মাখতুম- ২১১ পৃষ্ঠা) এ খবর ছড়িয়ে পড়লে পদচিহ্ন বিশারদগণ হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও হযরত আবু বকর (রা) এর সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে এবং সম্ভাব্য সকল জায়গা খুঁজতে আরম্ভ করল। একটা সময় অনুসন্ধানকারীরা সওর পর্বতের অই গুহার মুখে এসে পৌঁছল। এ বিষয়ে হযরত আবু বকর (রা) বলেন, “আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে গুহায় ছিলাম, মাথা তুলতেই দেখি লোকদের পা দেখা যাচ্ছে। আমি বললাম, ‘হে আল্লাহর রাসূল, ওরা কেউ যদি একটুখানি নিচের দিকে তাকায়, তবে আমাদের দেখতে পাবে।’ তিনি বললেন, “আবু বকর চুপ করো, আমরা এখানে দুইজন নয় বরং আমাদের সাথে তৃতীয়জন হচ্ছেন আল্লাহ তাআলা।” অন্য বর্ণনায় রয়েছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “আবু বকর এমন দু’জন সম্পর্কে তোমার কি ধারণা, যাদের তৃতীয় হচ্ছেন আল্লাহ তাআলা।” (সহীহ বুখারী; প্রথম খণ্ড; পৃষ্ঠা ৫১৬-৫৫৮, আর রাহিকুল মাখতুম- ২১১ পৃষ্ঠা)
আবু বকর (রা) হিজরতের আগে ছেলে আবদুল্লাহকে বলে গিয়েছিলেন, “দিনের বেলায় লোকেরা তাদের (আবু বকর রা ও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সম্পর্কে কিছু বলাবলি করে কিনা, তা যেন সে মনোযোগ দিয়ে শুনে এবং সন্ধ্যার সময় তাদের কাছে গিয়ে সব কথা জানায়।” আর ভৃত্য আমের ইবনে ফুহাইরাকে নির্দেশ দিয়ে গেলেন, “সে যেন দিনের বেলায় তার মেষপাল চরায়, অতঃপর সেগুলোকে সাওরের ওই পর্বত গুহার কাছে ছেড়ে দেয় এবং সন্ধ্যার সময় পর্বত গুহায় তাদের সাথে দেখা করে।” (সিরাতে ইবনে হিশাম- ১৩০ পৃষ্ঠা)
পিতার নির্দেশনার আলোকে আবদুল্লাহ ইবনে আবু বকর কুরাইশদের মাঝে মিলেমিশে সারাদিন থেকে তাদের শলাপরামর্শ শুনতো এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও আবু বকর (রা) সম্পর্কে তারা যত মন্তব্য করতো সেগুলোও মনোযোগ সহকারে খেয়াল করতো। অতঃপর দিনশেষে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও আবু বকরের (রা) নিকট সারাদিনের সকল খবরা-খবর জানাতো এবং তিনি রাতে থেকে যেতেন। আর ভৃত্য আমের ইবনে ফুহাইরা আবু বকরের মেষপাল নিয়ে মক্কাবাসীদের মেষপালের সাথেই সারাদিন চরিয়ে বেড়াতো। আর যখনই সন্ধ্যা নেমে আসতো মেষপাল নিয়ে সওর পর্বতের গুহার নিকট ছেড়ে দিত। তখন এসকল মেষ থেকে দুধ দোহন করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও আবু বকর (রা) পান করতেন। তা ছাড়া প্রতিদিন সন্ধ্যায় আসমা বিনতে আবু বকর তাদের দু’জনের জন্য খাবার নিয়ে আসতেন।
সকাল হলেই আবদুল্লাহ ইবনে আবু বকর সাওর পর্বতের গুহা থেকে বেরিয়ে মক্কা অভিমুখে চলে যেতেন। আর তখন আমের ইবনে ফুহাইরাও তার মেষপাল নিয়ে আবদুল্লাহর পিছু পিছু যেতেন, যেন আবদুল্লাহর সকল পদচিহ্ন মুছে যায়। ফলে মক্কা থেকে সাওর পর্বতের গুহায় আবদুল্লাহর যাতায়াত সম্পর্কে কেউ ধারণা করারও কোনো সুযোগ পেত না। আর এভাবেই তিন দিন অতিবাহিত হলো। এরই মধ্যে মক্কাবাসীদের মাঝে এ বিষয়ে হইচই কমে এলো। তখন আবদুল্লাহ ইবনে আরাফাত নিজে একটি উটে চড়ে এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর জন্য দু’টি উট নিয়ে সওর পর্বতের গুহায় হাজির হলো। আবদুল্লাহ ইবনে আরাফাত একজন মুশফিক, যাকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও আবু বকর (রা) ভাড়া করে রেখেছিলেন হিজরতের সময় পথ দেখিয়ে নেওয়ার জন্য। তাছাড়াও আবু বকর (রা) হিজরতের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে দু’টি উট কিনে রেখেছিলেন, যেগুলো হিজরতের আগের দিন থেকেই আবদুল্লাহ ইবনে আরাফাতের তত্ত্বাবধানে রেখে দেওয়া হয়েছিল। তখন তাকে বলা হয়েছিল, সে যেন তিন দিন পর এই উট দু’টি নিয়ে সওর পর্বতের গুহার নিকট চলে আসে। (সিরাতে ইবনে হিশাম)
আবদুল্লাহ ইবনে আরাফাত যে সময়টিতে সওর পর্বতের গুহায় উপস্থিত হয়েছিল, তা ছিল এক পূর্ণিমার রাত। এদিকে পরিকল্পনার আলোকে আসমা বিনতে আবু বকর (রা) প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী নিয়ে চলে আসেন। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও আবু বকর (রা) মদিনার উদ্দেশে রওনা হলেন। তাদের সাথে আবু বকরের (রা) ভৃত্য আমের ইবনে ফুহাইরাও ছিল। আর রাহবার হিসেবে ছিল আবদুল্লাহ ইবনে আরাফাত। যাত্রা সম্পর্কে বলতে গিয়ে হযরত আবু বকর (রা) বলেন: “গারে সওর থেকে বেরিয়ে আমরা সারারাত এবং পরদিন দুপুর পর্যন্ত পথ চলতে থাকি। ঠিক দুপুরে রাস্তা একেবারে জনশূন্য হয়ে পড়ে।” (বুখারী প্রথম খণ্ড; পৃষ্ঠা ৫৫৬, আর রাহিকুল মাখতুম ২১৩ পৃষ্ঠা)
হিজরতের যাত্রাপথের বর্ণনা করতে গিয়ে সিরাতে আর রাহিকুল মাখতুমের লেখক সফিউর রহমান মোবারকপুরী উল্লেখ করেন, “গারে সওর থেকে বেরোবার পর আবদুল্লাহ তাদের প্রথমে দক্ষিণ দিকে ইয়েমেনের পথে বহুদূর নিয়ে যান। এরপর পশ্চিমাভিমুখী হয়ে সমুদ্রোপকূল ধরে যাত্রা করেন। পরে এমন এক পথে ওঠেন, যে পথ সম্পর্কে সাধারণ লোকেরা অবহিত ছিল না। সে পথে উত্তর দিকে অগ্রসর হন। লোহিত সাগরের উপকূলবর্তী এ পথে লোক চলাচল খুব কমই করতো।” (আর রাহিকুল মাখতুম ২১২ পৃষ্ঠা)
সফরে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং আবু বক্কর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহু একই উটে সওয়ার হয়েছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সামনে বসেছিলেন আর পেছনে আবু বকর (রা)। এ বিষয়ে সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে যে, “এ সফরে হযরত আবু বকর (রা) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পেছনে বসেন। যেহেতু আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু এর চেহারায় বার্ধক্যের নিদর্শন প্রকাশ পেয়েছিল, তাই মানুষের মনোযোগ তার দিকেই আকৃষ্ট হতো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চেহারায় তখনও যৌবনের ছাপ প্রবল ছিল, এ কারণে লোকজনের মনোযোগ তার দিকে আকৃষ্ট হতো না। ফলে কারো সামনে পড়লে সে জিজ্ঞেস করত, আপনার সামনে উনি কে? হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু জিজ্ঞাসার সূক্ষ্ম জবাবে বলতেন, উনি আমাকে পথ দেখান। এতে প্রশ্নকারী বুঝতো, তিনি যান চলাচলের রাস্তার কথা বুঝাচ্ছেন। মূলত এ রাস্তা বলে তিনি নেকি ও কল্যাণের পথে বুঝাতেন।” (বুখারী, আর রাহিকুল মাখতুম- ২১৩ পৃষ্ঠা) আর এভাবেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এগিয়ে চললেন মদিনার পথে।
উপরোক্ত হিজরতের ঘটনাটি সূক্ষ্মভাবে পর্যালোচনা করলে এর প্রতিটি পদক্ষেপে প্রজ্ঞার চিহ্ন ফুটে ওঠে। যেখানে আছে দূরদর্শী সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সুষ্ঠু পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিকল্পনার যথার্থ বাস্তবায়ন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন জানতে পারলেন কাফেররা তাকে হত্যার পরিকল্পনা করেছে এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁকে হিজরতের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, সময়ক্ষেপণ না করে তখনই তিনি হযরত আবু বকরের (রা) বাড়িতে গিয়ে হিজরতের সিদ্ধান্ত গ্রহণসহ সামগ্রিক পরিকল্পনা পাকাপোক্ত করেন। যেই পরিকল্পনার ভেতরে ছিল হিজরতের স্থান নির্ধারণ, যাত্রার সময় নির্ধারণ, যাতায়াতের রাস্তা নির্ধারণ এবং গারে সওরে তিন দিন অবস্থানের সিদ্ধান্ত।
মক্কা থেকে মদিনার পথে সরাসরি রওনা না হয়ে বরং বিপরীত পথ দিয়ে গারে সওরে যাওয়া এবং সেখানে তিন দিন অবস্থানের সিদ্ধান্তটি আসলেই দূরদর্শিতার পরিচয় বহন করে। গারে সওরে তিন দিন অবস্থানের বিষয়টি ছিল খুবই চ্যালেঞ্জিং। কারণ এই সময়ে কাফেররা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও আবু বক্কর (রা)কে হন্যে হয়ে খুঁজছিল। আর মক্কায় তাদেরকে না পেয়ে কাফেররা এরকম করবে তা পূর্বেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনুধাবন করেছিলেন। আর তাই এই সময়টি কিভাবে নিরাপদে কাটানো যায়, এ নিয়ে তাদের ছিল পরিকল্পনার আলোকে সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থাপনাও। যেই ব্যবস্থাপনার সুসামঞ্জস্যতা ফুটে ওঠে আবু বকরের (রা) ছেলে আবদুল্লাহ, ভৃত্য আমের ইবনে ফুহাইরা এবং মেয়ে আসমার (রা) ভূমিকায়। যাদের নিয়মতান্ত্রিক ভূমিকায় গারে সওরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও আবু বক্করের (রা) তিন দিনের অবস্থান হয়েছিল কাফেরদের সন্দেহমুক্ত এবং নিরাপদ। আর সর্বশেষ আবদুল্লাহ ইবনে আরাফাতের সুনির্দিষ্ট সময়ে উট নিয়ে গারে সওরে উপস্থিত হওয়া যেন এই ব্যবস্থাপনাকে দিয়েছিল পূর্ণাঙ্গ রূপ। আবার গারে সওর থেকে মদিনায় যাবার রাস্তা নির্ধারণ এবং চলার পথে আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহুর প্রজ্ঞাময় প্রশ্নোত্তর এই হিজরতকে করেছিল আরো সহজতর এবং সন্দেহাতীত বিপদমুক্ত। হিজরতের এই অধ্যায় থেকে দ্বীন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য অর্জনের পথে আমরা মূলনীতি হিসেবে পাই।
মূলনীতি-৮ : দ্বীন প্রতিষ্ঠার কন্টকাকীর্ণ (কাঁটাযুক্ত) পথে বিজয়ের (সফলতার) জন্য প্রয়োজন দূরদর্শী সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সুষ্ঠু কার্যকরী পরিকল্পনা প্রণয়ন আর সঠিক ব্যবস্থাপনা। (চলবে)
লেখক : কলামিস্ট ও গবেষক

SHARE

Leave a Reply