লক্ষ্য অর্জনের পথে -মু. রাজিফুল হাসান

১.৯. খন্দকে মুসলিমদের বিজয়: ব্যর্থ হলো ইহুদি, মুশরিক ও মুনাফিক জোট
হিজরি চতুর্থ সন (বছর) পেরিয়ে আবারো এলো শাবান মাস। রাসূল সা.-এর স্মরণে এসে যায় আবু সুফিয়ানের সেই চ্যালেঞ্জের কথা। গত বছর ওহুদের যুদ্ধের দিনে যে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে মুসলমানদের উদ্দেশ্যে আবু সুফিয়ান বলেছিল: ‘তোমাদের সাথে আগামী বছর বদর প্রান্তরে আবারও দেখা হবে।’
চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার কাক্সিক্ষত সময় এখন এসে গেছে। তাই রাসূল সা. সাহাবীদের নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন বদর অভিমুখে। বদরে পৌঁছে তাঁবু স্থাপন করল মুসলিম বাহিনী। এদিকে আবু সুফিয়ান মক্কাবাসীদের নিয়ে যুদ্ধযাত্রা শুরু করে মাঝ পথ থেকে আবারও মক্কায় ফিরে যায়। যুদ্ধ না করে মক্কায় ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্তের বিষয়ে আবু সুফিয়ান বলেন : ‘হে কুরাইশগণ, তোমাদের জন্য যুদ্ধ করা কেবল ভালো ফসল ফলার বছরেই শোভা পায়, যখন তোমরা তোমাদের গাছপালার তত্ত্বাবধান করতে পারবে এবং দুধ পান করতে পারবে। কিন্তু এটা তো আজন্মার বছর। আমি ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তোমরা ফিরে চলো।’

কুরাইশ বাহিনী মক্কায় ফিরে যাওয়ার পর মক্কাবাসীরা তাদেরকে ‘ছাতুখোর বাহিনী’ নাম দিয়েছিল। মক্কাবাসী এই বাহিনীর সৈন্যদের বলতো : ‘তোমরা তো শুধু ছাতু খেতে খেতে লড়াইয়ে গিয়েছিলে।’ এ দিকে রাসূল সা. বদরে চার দিন অপেক্ষা করে মদিনায় ফিরে যান। চ্যালেঞ্জ ঘোষণা করে আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বাধীন কুরাইশ কাফেরদের যুদ্ধের না আসার বিষয়টি লক্ষ্য করে সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা রা. কবিতা আবৃত্তি করে বলেন : ‘আবু সুফিয়ানের সাথে বদর প্রান্তরে মুখোমুখি হবার জন্য আমরা ওয়াদাবদ্ধ ছিলাম। কিন্তু তার ওয়াদার সত্যতা পেলাম না এবং সে ওয়াদা রক্ষাকারী নয়। কসম করে বলছি, (হে আবু সুফিয়ান) তুমি যদি ওয়াদা রক্ষা করতে ও আমাদের মুখোমুখি হতে তাহলে বিকৃত ও তিরস্কৃত হয়ে ফিরে যেতে বাধ্য হতে এবং মিত্রদেরকেও হাতছাড়া করে ফেলতে। এই বদর প্রান্তরে আমরা উতবা ও তার ছেলের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ফেলে গিয়েছি। আবু জাহলের লাশও এখানে রেখে গিয়েছি। তোমরা আল্লাহর রাসূলকে অমান্য করলে! তোমাদের ধর্মমত এবং তোমাদের কুৎসিত ও বিভ্রান্তিকর কর্মকাণ্ডকে ধিক! তোমরা আমাকে যতই ভর্ৎসনা করো, তবুও বলবো, রাসূলুল্লাহর জন্য আমার ধন-জন সবই কুরবানকৃত। আমরা তাঁর অনুগত। তাঁকে ছাড়া কাউকে কোন অঙ্গীকার দেইনি। তিনি আমাদের জন্য অন্ধকার রাতের দিশারি ধ্রুব নক্ষত্র।’ এভাবে হিজরতের চতুর্থ বছরটি পেরিয়ে গেলেও মুসলমানদের বিরুদ্ধে কোনো সম্মুখযুদ্ধে উপনীত হওয়ার সাহস করেনি মক্কার কুরাইশরা। তবে ওহুদ যুদ্ধের পর হতে খন্দক যুদ্ধের পূর্ব পর্যন্ত ছোট-বড় মোট ৮টি যুদ্ধ-অভিযানে অংশগ্রহণ করে মুসলিম বাহিনী।
আর এগুলো হলো: ১. সারিয়ায়ে আবু সালামা ২. আব্দুল্লাহ ইবনে উনাইসের অভিযান ৩. রাজীর মর্মান্তিক ঘটনা ৪. বীরে মাউনার মর্মন্তুদ ঘটনা ৫. বনু নাযিরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ৬. নাজদের যুদ্ধ ৭. বদরের দ্বিতীয় যুদ্ধ ৮. দাওমাতুল জান্দালের যুদ্ধ
পঞ্চম হিজরিতে ইহুদি গোত্র বনু নাযির ও বনু ওয়ালের ২০ জনের একটি প্রতিনিধিদল মুসলমানদের ধ্বংস করার জন্য কুরাইশদের আহ্বান জানাই এবং এ কাজে তাদেরকে সহযোগিতার আশ্বাস দেয়। তা ছাড়া মুসলমানদের ধ্বংসের কাজে মুনাফিকদের একটি দলকেও সহযোগী হিসেবে পাওয়া যাবে বলে কুরাইশদের উৎসাহ দেয় ইহুদি প্রতিনিধিরা। ইহুদিদের এই আহ্বান ও আশ্বাস পেয়ে কুরাইশরা বলল: ‘ইহুদিগণ, তোমরা প্রথম কিতাবের অধিকারী। আমাদের সাথে মুহাম্মাদের যে বিষয় নিয়ে মতভেদ, তা তোমরা ভালো করেই জানা। তোমরাই বল আমাদের ধর্ম ভালো না মুহাম্মাদের ধর্ম ভালো? তারা বলল, তোমাদের ধর্ম মুহাম্মাদের ধর্মের চেয়েও শ্রেষ্ঠ এবং তোমরা সত্যের নিশান বাহিনী।’

প্রকৃত সত্য অনুধাবন এরপরও ইহুদিদের এই মিথ্যা বক্তব্য সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা বলেন : “তুমি কি তাদেরকে দেখনি, যারা কিতাবের কিছু অংশ প্রাপ্ত হয়েছে, যারা মান্য করে প্রতিমা ও খোদাদ্রোহী শক্তিকে এবং কাফেরদেরকে বলে যে, এরা মুসলমানদের তুলনায় অধিকতর সরল সঠিক পথে রয়েছে। এরা হলো সে সমস্ত লোক, যাদের উপর লা’নত করেছেন আল্লাহ তায়ালা স্বয়ং। বস্তুত আল্লাহ যার ওপর লা’নত করেন তুমি তার কোন সাহায্যকারী খুঁজে পাবে না।

তাদের কাছে কি আল্লাহর রাজত্বে কোন অংশ আছে, যে তারা মানুষকে তা থেকে তিল পরিমাণও দেবে না? নাকি যা কিছু আল্লাহ তাদেরকে স্বীয় অনুগ্রহে দান করেছেন সে বিষয়ের জন্য মানুষকে হিংসা করে। অবশ্যই আমি ইবরাহিমের বংশধরদেরকে কিতাব ও হিকমত দান করেছিলাম আর তাদেরকে দান করেছিলাম বিশাল রাজ্য। অতঃপর তাদের কেউ তাকে মান্য করেছে আবার কেউ তার কাছ থেকে দূরে সরে রয়েছে। বস্তুত (তাদের জন্য) দোযখের শিখায়িত আগুনই যথেষ্ট। (সূরা আন নিসা : ৫১-৫৫)
ইহুদিদের এই জবাব শুনে কুরাইশরা আনন্দে আত্মহারা হয়ে মুসলমানদের ধ্বংস করতে একমত হলো। অতঃপর ইহুদিরা ও মক্কার মুশরিকরা তাদের এই (মুসলমানদের ধ্বংসের) ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্তকে বাস্তবায়ন করতে কাবার গিলাফ ধরে শপথ গ্রহণ করে। উল্লেখ্য এক বছর পূর্বে ইহুদি গোত্র বনু নাযির রাসূল সা.কে পাথর নিক্ষেপে হত্যার ষড়যন্ত্রের দায়ে মদিনা হতে বিতাড়িত হয়েছিল খাইবারে। এ সময় রাসূল সা.-এর নেতৃত্বে মুসলমানরা বনু নজির গোত্র অবরোধ করলে সাহায্যের ঘোষণা করেছিল মুসলিম নামধারী মুনাফিক আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই। সে ইহুদি নেতাদের উদ্দেশ্যে এই মর্মে বার্তা পাঠিয়েছিল যে: ‘তোমরা ভয় পেয়ো না বা আত্মসমর্পণ করো না। বরং অবিচল থাকো এবং নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করতে থাকো। আমরা কিছুতেই তোমাদেরকে মুসলমানদের হাতে পরাজিত হতে দেবো না। তারা যদি তোমাদের সাথে যুদ্ধ করে তাহলে আমরাও তোমাদের সাথে যুদ্ধ করব। আর যদি তোমাদেরকে বহিষ্কার করে তাহলে আমরাও তোমাদের সাথে যাবো।’ তবে শেষ পর্যন্ত মুনাফিকরা ইহুদিদের জন্য সাহায্য পাঠাইনি। ফলে নিশ্চিত রক্তপাতের শিকার হতে যাওয়া বনু নজির রাসূল সা.কে কাকুতি-মিনতি করে বলেছিল : ‘রক্তপাত করবেন না। বরং আমাদেরকে বহিষ্কার করুন, আমরা আমাদের সব অস্ত্রশস্ত্র রেখে যাবো। অস্থাবর সম্পত্তির যতটুকু প্রত্যেকের উট বহন করে নিয়ে যেতে পারে, ততটুকু নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিন।’ এই অনুরোধের প্রেক্ষাপটে রাসূল সা. তাদেরকে হত্যার পরিবর্তে খাইবারে বহিষ্কার করে অনুকম্পা দেখিয়েছিলেন। তবে স্বঘোষিত মুসলিমবিদ্বেষী ইহুদিরা বছর না পেরোতেই মুশরিকদের সঙ্গে নিয়ে মুসলমানদের ধ্বংস করতে আবারও লিপ্ত হয়েছে ষড়যন্ত্রে।

মুসলমানদের বিরুদ্ধে কুরাইশদের সমর্থন আদায়ের পর এবার গাতফানের নিকট যায় ইয়াহুদি প্রতিনিধিদল। কুরাইশদের মত বনু গাতফানকেও মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অনুপ্রাণিত করে তারা এবং এ কাজে কুরাইশদের সম্মতির কথা জানায় তাদের। ফলে শর্তসাপেক্ষে বনু গাতফান তাদের আহবানে সম্মত হয়। আর শর্তটি ছিল খাইবারে বনু নাযিরের উৎপাদিত এক বছরের খেজুর দিতে হবে বনু গাতফানকে। অতঃপর ইহুদি প্রতিনিধিদল আরবের ছোট ছোট বিভিন্ন গোত্রসমূহে গিয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে তাদের উৎসাহিত করে এবং তাদের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করে। এভাবে ইহুদিদের প্রতিনিধিদলের কূটনৈতিক চালে বৃহত্তম জোড় গঠন হয় মুসলমানদের বিরুদ্ধে, যাদের একমাত্র লক্ষ্য হলো মুসলমানদের সমূলে উৎপাটিত করা।

এবার পরিকল্পনার আলোকে দক্ষিণ দিক থেকে মদিনা অভিমুখে রওনা হয় কুরাইশ বাহিনী। তাদের সাথে যুক্ত হয় বনু সুলাইম গোত্র এবং কেনানা ও তেহমায় বসবাসকারী কুরাইশদের মিত্র গোত্রসমূহ। সম্মিলিত এ বাহিনীর মোট সৈন্যসংখ্যা ছিল ৪ হাজার। আর এ বাহিনীর প্রধান হলো কুরাইশ সরদার আবু সৃফিয়ান। একই সময়ে পূর্ব দিক থেকে মদিনা অভিমুখে যাত্রা শুরু করে গাতফানের গোত্রসমূহ। গাতফানের ফায়ারা গোত্রের প্রধান ছিল ওয়াইনা ইবনে হেসন, বনু মোররা গোত্রের প্রধান হারেস ইবনে আওফ এবং আশজার গোত্রের প্রধান মেসয়াব ইবনে রাখিলা। এ ছাড়াও গাতফান বাহিনীর সাথে যুক্ত হয় বনু আসাদসহ অন্যান্য গোত্রের লোকজন। ফলে এ বাহিনীও একটি বৃহৎ বাহিনীতে রূপ নেয়, যেখানে সৈন্যসংখ্যা ছিল ৬ হাজার। অর্থাৎ অবস্থা এই ধারালো যে, কুরাইশদের নেতৃত্বাধীন ৪ হাজারের বাহিনী ও বনু গাতফানের নেতৃত্বাধীন ৬ হাজারের বাহিনী মিলে মোট ১০ হাজারের যৌথবাহিনী মদিনা অভিমুখে এগিয়ে যাচ্ছে মুসলমানদের ধ্বংস করতে। এদিকে গোয়েন্দা বিভাগের মাধ্যমে এই দুই বাহিনীর সার্বিক বিষয়ে অবহিত হন মুহাম্মদ সা.। অতঃপর মদিনা নামক ইসলামী রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে কৌশল নির্ধারণের লক্ষ্যে আহ্বান করেন সামরিক পরামর্শ সভার বৈঠক।

যেখানে আলোচনা-পর্যালোচনা আর মতামত প্রদানের এক পর্যায়ে হযরত সালমান ফারসি রা. বলেন: ‘হে আল্লাহ রাসূল, পারস্যে আমাদের ঘেরাও করা হলে আমরা চারদিকে পরিখা খনন করতাম।’ উল্লেখ্য সালমান ফারসি রা. ছিলেন পারস্য বংশোদ্ভূত। তিনি তার জীবনের বড় একটি সময় কাটিয়েছেন পারস্যে। অতঃপর সালমানের রা. মতের ভিত্তিতে সকলের সম্মতিক্রমে মদিনা শহরের উত্তর দিকে পরিখা খননের সিদ্ধান্ত নেন রাসূল সা.। উল্লেখ্য মদিনা শহরের পূর্ব, পশ্চিম ও দক্ষিণ দিক ছিল পাহাড়-পর্বত আর খেজুর বাগানে ঘেরা। শুধু উত্তর দিকটি ছিল উন্মুক্ত। দক্ষিণ-পূর্ব দিকে ছিল ইহুদি গোত্র বনু কুরাইজার বসতি। যাদের সাথে মুসলমানদের এই মর্মে যুক্তি ছিল যে, এক পক্ষের শত্রুকে অন্য পক্ষ কখনো সাহায্য সহযোগিতা অথবা সমর্থন করবে না। সামগ্রিক দিক চিন্তা করলে দেখা যায়, শুধু উত্তর দিকের উন্মুক্ত স্থানটি ছিল মদিনা আক্রমণের একমাত্র পথ। আর তাই রাসূল সা. পরিখা খনন করে এই পথটিই বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিলেন যেন মদিনা আক্রমণে শত্রুবাহিনী কোন পথ খুঁজে না পায়। পরিখা খননের জন্য মুসলমানদের প্রতি ১০ জনের সমন্বয়ে একেকটি গ্রুপ গঠন করা হয়। আর প্রত্যেক গ্রুপের দায়িত্ব ছিল ৪০ হাত দৈর্ঘ্য পর্যন্ত পরিখা খনন করা।

রাসূল সা. নিজে সাহাবীদের সাথে পরীক্ষা খননের কাজ করতেন। এ সময় ক্ষুধা নিবারণের জন্য মুসলমানদের পর্যাপ্ত পরিমাণ কোন খাবার ছিল না। এ বিষয়ে হযরত বারা ইবনে আযেব রাযিআল্লাহু আনহু বলেন: ‘আল্লাহর রাসূলকে সা. আমি দেখেছি তিনি খন্দকের যুদ্ধে মাটি খনন করেছেন। ধুলোবালিতে তাঁর দেহ আচ্ছন্ন হয়ে গিয়েছিল। তাঁর মাথায় চুল ছিল অনেক বেশি। সে অবস্থায় তিনি মাটি খনন করছেন আর বলছেন,
‘তুমি বিনে হেদায়াত পেতাম না হে রাজাধিরাজ
দিতাম না যাকাত আর পড়তাম না নামাজ।
শান্তি দাও যেন আমাদের শক্ত থাকে মন
লড়াই হলে অটল রেখো আমাদের চরণ।
আমাদের বিরুদ্ধে ওরা দিল লোকদের উসকানি
ফেতনাতে শির হবে না নত সে তো আমরা জানি।’ (বুখারী, দ্বিতীয় খণ্ড)
হযরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন : ‘পরিখা খননকারীদের কাছে কিছু জব এবং গরম করা কিছু চিকনাই নিয়ে আসা হতো। নীরস ও বিস্বাদ এ খাবারই তারা খেতেন, যা থেকে দুর্গন্ধ বের হতো।’ (বুখারি, দ্বিতীয় খণ্ড)
অপর এক বর্ণনায় আবু তালহা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন: ‘আমরা রাসূল সা.-এর কাছে ক্ষুধার কথা বলে পেটের কাপড় খুলে এক একটি পাথর দেখলাম, তখন তিনি আমাদের তাঁর পেটে বাঁধা দুটি পাথর দেখান। (জামে তিরমিজি; মেশকাত, দ্বিতীয় খণ্ড) এ সময় ক্ষুধার্ত সাহাবীদের সান্ত¡না ও উৎসাহ দিয়ে রাসূল সা. বলতেন : ‘আখিরাতের জীবনই তো প্রকৃত জীবন। ওগো করুণাময়, আনসার এবং মোহাজেরদের ক্ষমা করে দাও।’ (সহীহ বুখারি, অধ্যায়: খন্দক যুদ্ধ, দ্বিতীয় খণ্ড)
অপর এক বর্ণনায় হযরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন : ‘রাসূল সা. এক শীতের সকালে খন্দকের দিকে গমন করে দেখতে পেলেন, মোহাজের ও আনসাররা পরিখা খননকাজে নিয়োজিত রয়েছেন। তাদের কাছে কোন ক্রীতদাস ছিল না, যারা তাদের পরিবর্তে এ কাজ করে দেবে। রাসূল সা. সাহাবীদের কষ্ট এবং ক্ষুধার্ত অবস্থা দেখে বললেন-
‘হে আল্লাহ, জীবন তো আখেরাতের জীবন সে নিশ্চয়ই
মোহাজের ও আনসারদের করো ক্ষমা ওগো দয়াময়।’
এর জবাবে আনসার ও মুহাজিররা বললেন-
‘যতদিন আমাদের থাকবে হায়াত
মোহাম্মদের হাতে জেহাদের জন্য করলাম বায়াত।’ (বুখারি প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড)
একদিকে যখন মুসলমানরা অর্ধাহারে-অনাহারে থেকে পরিখা খননের কাজ করে যাচ্ছেন অন্য দিকে তখন নামধারী মুসলিম মুনাফিকরা বিভিন্ন ছলচাতুরী আর অজুহাত দেখিয়ে পরিখা খননের কাজ থেকে বিরত থাকতো। অনেক সময় রাসূল সা.কে না জানিয়ে বিনা অনুমতিতে চুপচাপ বাড়ি চলে যেত।
মুনাফিকরা নিজেরা কাজ থেকে বিরত থেকেই ক্ষান্ত হয়নি বরং পূর্ণ আন্তরিকতার সহিত কাজ করতে থাকা মুমিনদের নিয়ে তারা বিদ্রƒপ করত। পরিখা খননের একপর্যায়ে একটি বিরাট পাথর অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছিলো, যা সাহাবীরা কোনোভাবেই ভাঙতে পারছিলেন না। অবশেষে রাসূল সা.-এর আঘাতে পাথরটি ভেঙে যায়। এ বিষয়ে হযরত বারা ইবনে আযেব রা. বলেন: ‘পরিখা খননের সময় এক বিরাট পাথর অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। কোদাল দিয়ে আঘাত করলে কোদাল ফিরে আসছিলো। আমরা ব্যাপারটা রাসূল সা.কে জানালাম। তিনি কোদাল হাতে নিয়ে বিসমিল্লাহ বলে আঘাত করেন। এতে পাথরের একাংশ ভেঙে যায়। তিনি বললেন, আল্লাহু আকবার আমাকে সিরিয়ার চাবি দেয়া হয়েছে। আল্লাহর শপথ, আমি ওখানকার লাল মহলগুলো দেখতে পাচ্ছি। এরপর তিনি দ্বিতীয় আঘাত করলে আরো একটি টুকরো বের হয়। এবার বললেন, আমাকে পারস্যদেশ দেয়া হয়েছে। আল্লাহর শপথ, আমি এখন মাদায়েনের শ্বেত মহল দেখতে পাচ্ছি। এরপর তৃতীয় আঘাত করে বললেন, বিসমিল্লাহ, এতে পাথরের বাকি অংশ কেটে যায়। এবার তিনি বললেন, আল্লাহু আকবার, আমাকে ইয়ামেনের চাবি দেয়া হয়েছে। আমি এখন সানাআর ফটক দেখতে পাচ্ছি।’ (সুনানে নাসাঈ দ্বিতীয় খণ্ড)
রাসূল সা.-এর মুখে সিরিয়া, পারস্য এবং ইয়েমেন বিজয়ের কথা শুনে মুনাফিকরা বিদ্রƒপের অট্টহাসি হেসেছিল। মুনাফিকদের এহেন আচরণের কথা বলতে গিয়ে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা বলেন: “রাসূলের আহবানকে তোমরা তোমাদের একে অপরকে আহ্বানের মত গণ্য করো না। আল্লাহ তাদেরকে জানেন, যারা তোমাদের মধ্যে চুপিসারে সরে পড়ে। অতএব যারা তাঁর আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করে, তারা এ বিষয়ে সতর্ক হোক যে, বিপর্যয় তাদেরকে স্পর্শ করবে অথবা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি তাদেরকে গ্রাস করবে। মনে রেখো নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলে যা আছে, তা আল্লাহরই। তোমরা যে অবস্থায় আছ তা তিনি জানেন। যেদিন তারা তাঁর কাছে প্রত্যাবর্তিত হবে, সেদিন তিনি বলে দেবেন তারা যা করেছে। আল্লাহ প্রত্যেক বিষয়ই জানেন।” (সূরা আন নূর : ৬৩- ৬৪)

নিষ্ঠাবান ও অনুগত মুসলমানদের কথা বলতে গিয়ে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা বলেন: “মুমিন তো তারাই; যারা আল্লাহর ও রাসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে এবং রাসূলের সাথে কোন সমষ্টিগত কাজে শরিক হলে তাঁর কাছ থেকে অনুমতি গ্রহণ ব্যতীত চলে যায় না। যারা আপনার কাছে অনুমতি প্রার্থনা করে, তারাই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে। অতএব তারা আপনার কাছে তাদের কোন কাজের জন্য অনুমতি চাইলে আপনি তাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা অনুমতি দিন এবং তাদের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। আল্লাহ ক্ষমাশীল, মেহেরবান।” (সূরা আন নূর : ৬২)
এভাবেই মুনাফিকদের অসহযোগিতা সত্ত্বেও ক্ষুধাও কষ্টকে সহ্য করে পরিখা খননের কাজ সম্পাদন করে মুসলিমরা। পরিখাটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল যে মদিনার বাহিরের দিক থেকে এটি ছিল ঢালো (নিচু)। অর্থাৎ শত্রুরা যে দিক থেকে আক্রমণ করতে আসছে, পরিখার পাড়ের সেই অংশটি ছিল উঁচু এবং সেই স্থানে হতে পরিখাটি ছিল নিম্নগামী। মূলত শত্রুরা যেন সহজে পরিখাটি পাড়ি দিতে না পারে এটাই ছিল মুসলমানদের অন্যতম কৌশল।

এ দিকে মদিনার সীমান্তে পৌঁছে কুরাইশদের নেতৃত্বাধীন ৪ হাজারের বাহিনী অবস্থান নেয় রুমা নামক স্থানে এবং শিবির স্থাপন করে জুরুফ ও জুগবার মধ্যবর্তী মুজতামউল আসইয়ালে। আর গাতফানের নেতৃত্বাধীন ৬ হাজারের বাহিনী শিবির স্থাপন করে ওহুদের পূর্বদিকে জাম্ব নামক স্থানে। এ দিকে রাসূল সা. ৩ হাজার মুসলিম বাহিনীকে নিয়ে মদিনা শহরের বাহিরে পরিখার নিকটে অবস্থান নেন। পরিখাটি ছিল মদিনা শহরের বাইরের অংশ জুড়ে, যা মূল শহর থেকে কিছুটা দূরে। এ সময় মদিনার দায়িত্ব আব্দুল্লাহ ইবনে মাকতুমকে দেয়া হয়। আর মদিনার নারী ও শিশুদের বিভিন্ন দুর্গে নিরাপদে রাখা হয়। অতঃপর রাসূল সা. মুসলিম সৈন্যদের এমনভাবে মোতায়েন করলেন, যাদের সামনে ছিল পরিখা আর পেছনে সালা পাহাড়। পরিখার সমগ্র অঞ্চলজুড়ে মুসলমানদের ছোট ছোট টহল দল নিয়োগ দেন রাসূল সা.। এ সময় সাহাবীদের নির্দেশনা দিতে গিয়ে যুদ্ধ সংঘটিত হলে সাংকেতিক ধ্বনি ব্যবহারের কথা বলেন তিনি। আর রাসূলের সা. শিখিয়ে দেওয়া সাংকেতিক ধ্বনিটি ছিল, ‘হুম লা ইউনছারুন’ অর্থ: শত্রুপক্ষের পরাজয় অবধারিত।

মূলত এই ধ্বনি শিখিয়ে দেয়ার মাধ্যমে সাহাবীদেরকে উজ্জীবিত রাখলেন সমর নায়ক মুহাম্মদ সা.।
আবার পরিখাটি ছিল শত্রু বাহিনীর সাথে মুসলিম বাহিনীর প্রতিবন্ধক। অর্থাৎ দুই বাহিনীর অবস্থান পরিখার দুই প্রান্তে। এখানে একটু পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় যে মদিনাকে নিরাপদ রাখতে গিয়ে রাসূল সা. প্রাথমিকভাবে যে কয়েকটি পদক্ষেপ নিয়েছেন এর সবগুলোই ছিল কৌশলী পদক্ষেপ।
প্রথমত : পরিখা খননের সিদ্ধান্ত।
দ্বিতীয়ত : পরিখা খননের জন্য মদিনার উত্তর দিকটি বাছাই করা।
তৃতীয়ত : পরিখা খনন করতে গিয়ে শত্রুপক্ষের দিক থেকে পরিখাটি নিম্নগামী রাখা।
চতুর্থত : পরিখার সমগ্র অঞ্চলজুড়ে সৈন্য মোতায়েন।
পঞ্চমত : বিশেষ ধ্বনি শেখানোর মাধ্যমে যুদ্ধের ময়দানে সাহাবীদের উজ্জীবিত রাখা।

প্রতিরোধ কৌশলের অংশ হিসেবে রাসূল সা.-এর এ সকল পদক্ষেপের মাঝে যেমন রয়েছে একজন শ্রেষ্ঠ সমর নায়কের স্বাক্ষর তেমনি দ্বীন প্রতিষ্ঠান আন্দোলনে রত উম্মাহর জন্যও রয়েছে সুনির্দিষ্ট (কৌশলী) দিকনির্দেশনা।
এবার মদিনা শহরে প্রবেশ করে মুসলমানদের সমূলে ধ্বংস করার লক্ষ্যে আক্রমণ করতে যাওয়া মুশরিক ও ইহুদি জোট সম্মুখীন হয় অনাকাক্সিক্ষত প্রতিবন্ধকতার। আর তা হলো পরিখার (খন্দকের) সমস্যা। ইতঃপূর্বে তারা এমন প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়নি এবং এবারের যুদ্ধে এমন প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হবে তাও চিন্তা করেনি কাফেরদের যৌথবাহিনী। তবে মুসলমানদের আত্মরক্ষার এই কৌশলকে প্রাথমিকভাবে তাদের দুর্বলতা হিসেবেই চিহ্নিত করে শত্রুবাহিনী। মুসলমানদের এই দুর্বলতায় উচ্ছ্বসিত হয়ে শত্রুজোট এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলো যে, মুসলমানদের আবদ্ধ অবস্থায় তারা অবরুদ্ধ করে রাখবে এবং এই ভেবে আশান্বিত হলো যে, কিছুদিনের মাঝেই খাদ্য রসদের অভাবে মুসলমানরা দুর্বল হয়ে তাদের নিকট আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হবে। তাই গৃহীত সিদ্ধান্তের সফলতা দেখতে অবস্থান করতে লাগলো কাফের বাহিনী।

লেখক : কলামিস্ট ও গবেষক

SHARE

Leave a Reply