লক্ষ্য অর্জনের পথে -মু. রাজিফুল হাসান]

কিছুদিনের মাঝেই সম্মুখযুদ্ধে অভ্যস্ত কুরাইশ ঘোড়সওয়ার বাহিনীর নিকট এই আপাত অলাভজনক অবস্থান অসহনীয় হয়ে উঠলো। ফলে আক্রমণের পথ খুঁজলো তারা। প্রসঙ্গ আসে মদীনার দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অবস্থান করা বনু কুরাইযার সহযোগিতার কথা। যাদের সহযোগিতার ব্যাপারে ইতঃপূর্বে বনু নাজিরের প্রতিনিধিদল আশান্বিত করেছিল কুরাইশদের। তাই বর্তমান পরিস্থিতির চাহিদা আর পূর্বপরিকল্পনার অংশ হিসেবেই আবু সুফিয়ানের পরামর্শে বনু নাজির গোত্রের হুয়াই ইবনু আখতাব যায় বনু কুরাইযার নেতা কাব ইবনে আসাদের নিকট। উদ্দেশ্য হলো বনু কুরাইযাকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে কৃত চুক্তি লঙ্ঘন করিয়ে শত্রুজোটে শামিল করা। কাব ইবনে আসাদ হলো সেই ব্যক্তি, যিনি বনু কুরাইযার পক্ষ থেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে পরস্পর পরস্পরের শত্রুদের সহযোগিতা না করার চুক্তি করেছিলেন। হুয়াই ইবনে আখতাব অতি সংগোপনে রাত্রিবেলায় কাব ইবনে আসাদের বাড়িতে গিয়ে দরজায় কড়া নাড়ে এবং কাবকে অনুরোধ করে দরজা খোলার জন্য। এদিকে কাব হুয়াইয়ের উপস্থিতি বুঝতে পেরে দরজা খুলতে অস্বীকৃতি জানায়। অতঃপর হুয়াইয়ের অনুরোধের মুখে কাব বলল: ‘ধিক্ তোমাকে হুয়াই, তুমি একটা অলক্ষুণে লোক। আমি মুহাম্মদের সাথে চুক্তিবদ্ধ এবং সে চুক্তি আমি ভঙ্গ করব না। আমি মুহাম্মদের আচরণে প্রতিশ্রুতির প্রতি শ্রদ্ধা ও নিষ্ঠার পরিচয়ই পেয়েছি।’

হুয়াই বলল: ‘কি হলো! দরজাটা একটু খোলো না। আমি তোমার সাথে কিছু আলাপ করবো।’
কাব বলল : ‘আমি দরজা খুলতে পারবো না।’
হুয়াই বলল : ‘তোমার খাদ্য গ্রহণ করব মনে করেই তুমি দরজা বন্ধ করে আছো।’
এ কথা শুনে কাব অপমান বোধ করল। কারণ তৎকালীন আরবে যে কারো জন্য কাউকে না খাওয়ানো নিয়ে খোঁটা শোনাটা ছিল অনেক অপমানজনক। আর কাব সে অপমান নিজের কাঁধে নিতে চায়নি। তাই সে দরজা খুলে দিলো।

অতঃপর ঘরে প্রবেশ করে হুয়াই বলল: ‘আমি তোমার জন্য এই যুগের শ্রেষ্ঠ গৌরব এবং উত্তাল তরঙ্গময় সমুদ্র এনে হাজির করেছি। নেতা ও সরদারসহ সমস্ত কুরাইশ বাহিনীকে আমি জড়ো করেছি এবং তাদেরকে রুমা অঞ্চলের মুজতামাউল আসইয়ালে এনে হাজির করেছি। অপর দিকে গোটা গাতফান গোত্র কেউ তাদের নেতা ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গসহ পার্শ্ববর্তী জাম্ব নাকমায় এনে দাঁড় করিয়েছি। তারা সবাই আমার সাথে এ মর্মে অঙ্গীকার ও চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছে যে, মুহাম্মদ ও তাঁর সঙ্গীদেরকে নিশ্চিহ্ন না করে ক্ষান্ত হবে না।’

কাব বলল: ‘তুমি বরং আমার মুখে চুনকালি মাখানোর আয়োজনই করেছো। তুমি এমন মেঘমালা সমবেত করেছো, যা বৃষ্টি বর্ষণ করে পানিশূন্য হয়েছে। এখন তার শুধু তর্জন-গর্জন সার। তার দেওয়ার মতো কিছুই নেই। অতএব হে হুয়াই, ধিক্ তোমাকে! আমাকে উত্ত্যক্ত করো না। যেমন আছি থাকতে দাও। মুহাম্মদ আমার সাথে কোন খারাপ আচরণ করেনি। সে শুধু সততা, ন্যায়নিষ্ঠা ও প্রতিশ্রুতিপরায়ণতারই পরিচয় দিয়েছে।’
অতঃপর হুয়াই কাবের ঘাড়ে ও দাড়িতে হাত বুলিয়ে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করল এবং এই বলে অঙ্গীকার করলো যে: ‘কুরাইশ ও গাতফান যদি মুহাম্মদকে হত্যা না করেই ফিরে যায় তাহলে সে কাবের সাথে তার দুর্গে অবস্থান করবে এবং পরস্পরের সুখ দুঃখের সমান অংশীদার হবে।’

অতঃপর কাব হুয়াইয়ের কথায় গলে গিয়ে রাসূল সা.-এর সাথে কৃত শান্তি চুক্তিভঙ্গ করতে সম্মত হলো এবং শত্রুজোটকে সহযোগিতার আশ্বাস দিল। মুসলমানদের সাথে চুক্তিভঙ্গ ও শত্রুজোটকে সহযোগিতার বিষয়টি বিশ্বাসযোগ্য করাতে হুয়াইয়ের সামনেই চুক্তিপত্র ছিঁড়ে ফেলে কাব। সকাল হতেই বনু কুরাইযার চুক্তি ভঙ্গ এবং শত্রুজোটকে সহযোগিতার বিষয়টি কিছুটা অবহিত হন রাসূল সা.। বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার জন্য রাসূল সা. অধিকতর তদন্তের প্রয়োজন বোধ করলেন এবং উপস্থিত সাহাবীদের উদ্দেশ্যে বললেন: কে আছো, বনু কুরাইযার চুক্তি ভঙ্গের খবরটি নিয়ে আসবে?
জবাবে যুবাইর ইবনুল আওয়াম রা. বলেন: ‘আমি।’

এভাবে পরপর তিনবার রাসূল সা. একই প্রশ্ন রাখলেন। আর জবাবে কাউকে সুযোগ না দিয়ে প্রতিবারই জুবায়ের ইবনে আওয়াম রা. ‘আমি’ বলে জবাব দেন।
তখন রাসূল সা. জুবায়ের রা.কে খবর আনতে প্রেরণ করেন। এ সময় তিনি তার সম্পর্কে এই মন্তব্য করেছিলেন যে: ‘প্রত্যেক নবীর হাওয়ারি (সহযোগী) ছিল। আমার হাওয়ারি হলো জুবায়ের।’
যুবায়ের রা. ঐদিন রাতেই গোপনীয়তার সাথে কয়েকবার বনু কুরাইজা গোত্রে যাতায়াত করেন এবং তাদের চুক্তিভঙ্গের বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে রাসূল সা.কে অবহিত করেন।
অতঃপর রাসূল সা. আউস গোত্রের নেতা সাদ ইবনে মুয়াজ রা., খাজরাজ গোত্রের নেতা সাদ ইবনে ওয়াদা রা., আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা রা. ও খাওয়াত ইবনে জুবায়েরকে রা. বনু কুরাইজা গোত্রে পাঠালেন। এসময় রাসূল সা. তাদের উদ্দেশে বলেন: ‘তোমরা গিয়ে দেখো যে খবরটা পেয়েছি তা সত্য কিনা। যদি সত্য হয় তাহলে ফিরে এসে সঙ্কেতমূলক ধ্বনি দিয়ে আমাকে জানাবে। প্রকাশ্যে বলে সাধারণ মুসলমানদের মনোবল ভেঙে দিও না। আর যদি তারা চুক্তির অনুগত থাকে তাহলে ফিরে এসে সে কথা প্রকাশ্যে ঘোষণা করবে।’
রাসূল সা.-এর এই নির্দেশনার মাঝে একজন দূরদর্শী নেতার পরিচয় মিলে। এই কঠিন পরিস্থিতিতে বনু কুরাইযার চুক্তিভঙ্গের খবর শুনে সাধারণ মুসলমানদের মাঝে ভয়ভীতি জাগ্রত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তবে পরিস্থিতি যতই জটিল হোক না কেন সাধারণ মুসলমানরা যেন ভীত হয়ে না পড়ে সে জন্যই রাসূল সা. এই সাংকেতিক প্রতি-উত্তরের দূরদর্শী নির্দেশনা দেন।

অতঃপর চারজন সাহাবী বনু কুরাইযায় গিয়ে তাদেরকে চুক্তির বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিলে তারা বলল: ‘রাসূলুল্লাহ আবার কে? মুহাম্মদের সাথে কোন চুক্তি বা অঙ্গীকার নেই।’
এ কথা শুনে সাদ ইবনে মুয়াজ তাদেরকে তিরস্কার করলেন এবং তারাও পাল্টা তিরস্কার করল। তখন সাদ ইবনে উবাদা সাদ ইবনে মুয়াজকে উদ্দেশ্য করে বললেন: ‘তিরস্কার বাদ দিন। আমাদের ও তাদের মধ্যে যে চুক্তি রয়েছে তা তিরস্কারের চেয়ে অনেক বেশি।’

তারা ফিরে এসে রাসূল সা.কে সাংকেতিক ভাষায় বললেন: ‘আজাল ও কারা।’
(এখানে ব্যবহৃত আজাল ও কারা দুটি সংকেতিক শব্দ। আজাল ও কারার লোকেরা হযরত খুবাইব রাদিআল্লাহু আনহু ও তার সঙ্গী অন্য সাহাবীদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। আর এখন বনু কুরাইযা রাসূল সা.-এর সাথে করা চুক্তি ভঙ্গের মাধ্যমে বিশ্বাসঘাতকতার পথ গ্রহণ করে নিয়েছে। তাই আজাল ও কারা বলার মাধ্যমে মূলত বনু কুরাইযার চুক্তি ভঙ্গের বিষয়টিকেই নিশ্চিত করেছিলেন সাহাবীগণ।)
তখন রাসূল সা. বললেন: ‘আল্লাহু আকবার। হে মুসলমানগণ! তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ করো।’

রাসূল সা.-এর এ বক্তব্যের মাধ্যমে একজন নেতা হিসেবে তার সাহসিকতা ও দূরদর্শী বিচক্ষণতার পরিচয় মিলে। কারণ বনু কুরাইযার চুক্তি লঙ্ঘনের বিষয়টি স্বাভাবিক দৃষ্টিতে মুসলমানদের জন্য কোনো সুখবর ছিল না। কেননা ইতোমধ্যে কুরাইশ ও গাতফান গোত্রের ১০ হাজারের বাহিনী মদীনা অবরোধ করে রেখেছে। আর এরই মাঝে মদীনার অভ্যন্তরে থাকা বনু কুরাইযার চুক্তি লঙ্ঘন ও শত্রুজোটকে সহযোগিতার ঘোষণা মুসলমানদের সঙ্কটকে আরও ঘনীভূত করবে এটাই ছিল স্বাভাবিক। তবে এই অবস্থায় রাসূল সা. আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করে মুসলমানদের সুসংবাদ গ্রহণের যে বার্তা দিয়েছেন, তাতে মুসলমানরা তাৎক্ষণিকভাবে বীতশ্রদ্ধ হওয়ার পরিবর্তে আশান্বিত হয়েছিল। আর এই সঙ্কটময় পরিস্থিতিতে ময়দানে জনশক্তিদের দৃঢ়পদ রাখার জন্য নেতা হিসেবে রাসূল সা.-এর এই ভূমিকার মাঝে তার সাহসিকতা ও দূরদর্শী বিচক্ষণতার যথার্থ পরিচয় পাওয়া যায়। যা যুগ যুগ ধরে দ্বীনকে বিজয়ের চেষ্টায় রত সকল মুসলিম নেতাদের জন্য অনুসরণীয় আদর্শ হয়ে আছে।
যদিও প্রকৃত মুমিনরা ঈমানের বলে বলীয়ান হয়ে ময়দানে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখে চলেছেন, তবে প্রকৃত অর্থেই মুসলমানদের সঙ্কট কিছুটা বেড়ে গেল এবং তাদের কিছু সংখ্যক এর মাঝে ভয়ভীতি কাজ করলো। এ অবস্থায় কিছু দুর্বল মুসলমান যাদের হৃদয়ে কিছুটা মুনাফিকি জেঁকে বসেছিল তারা বিভিন্ন অজুহাত নিয়ে হাজির হলো রাসূল সা.-এর নিকট। তাদের একজন মুআত্তিব ইবনে কুশাইর বলে উঠলো: ‘মুহাম্মদ আমাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, আমরা পারস্য ও রোমান সা¤্রাজ্যের যাবতীয় ধনদৌলতের মালিক হয়ে যাবো। অথচ আজ অবস্থা এই যে, আমরা নিরাপদে পায়খানায় যেতেও পারছি না।’

অন্য একজন আওস ইবনে কায়যী বলল: ‘হে আল্লাহর রাসূল, আমাদের বাড়িঘর তথা পরিবার-পরিজন অরক্ষিত হয়ে পড়েছে। অতএব আমাদেরকে বাড়িতে ফিরে যেতে দিন। কেননা আমাদের বাড়িঘর মদীনার বাহিরে অবস্থিত।’
আর এভাবে যারাই রাসূল সা.-এর নিকট অজুহাত পেশ করে জিহাদের ময়দান ছেড়ে ঘরে ফিরে যাওয়ার জন্য ছুটি চাচ্ছিল, সবাইকেই তিনি ছুটি দিয়ে দিচ্ছিলেন। দুর্বল মুসলমানদের এমন মুনাফিকি আচরণ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা বলেন:
“সে সময়ে মুমিনগণ পরীক্ষিত হয়েছিল এবং ভীষণভাবে প্রকম্পিত হচ্ছিল। এবং যখন মুনাফিক ও যাদের অন্তরে রোগ ছিল তারা বলছিল, আমাদেরকে প্রদত্ত আল্লাহ ও রাসূলের প্রতিশ্রুতি প্রতারণা বৈ কিছুই নয়। এবং যখন তাদের একদল বলেছিল, হে ইয়াসরেববাসী, এটা টিকবার মতো জায়গা নয়, তোমরা ফিরে চল। তাদেরই একদল নবীর কাছে অনুমতি প্রার্থনা করে বলেছিল, আমাদের বাড়ি-ঘর খালি, অথচ সেগুলো খালি ছিল না, পলায়ন করাই ছিল তাদের ইচ্ছা। যদি শত্রুপক্ষ চতুর্দিক থেকে নগরে প্রবেশ করে তাদের সাথে মিলিত হতো, অতঃপর বিদ্রোহ করতে প্ররোচিত করত, তবে তারা অবশ্যই বিদ্রোহ করত এবং তারা মোটেই বিলম্ব করত না। অথচ তারা পূর্বে আল্লাহর সাথে অঙ্গীকার করেছিল যে, তারা পৃষ্ঠপ্রদর্শন করবে না। আল্লাহর অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।” (সূরা আল আহ্যাব : ১১-১৫)

এভাবে একদিকে কুরাইশ ও গাতফানের অবরোধ, অন্যদিকে বনু কুরাইযার চুক্তি লঙ্ঘনের ফলে মদীনার অভ্যন্তরে থাকা মুসলিম নারী ও শিশুদের নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কা। আবার এরই মাঝে পরিখার নিরাপত্তা (যুদ্ধের ময়দান) ছেড়ে মুনাফিকদের বাড়িমুখী প্রত্যাবর্তন এক অভাবনীয় সঙ্কটাপন্ন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল মুসলমানদের মাঝে।
এ অবস্থায় রাসূল সা. সাহাবীদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে বললেন: “শোনো, যে আল্লাহর হাতে নবী মুহাম্মদের জান রয়েছে, তার কসম করে বলছি- তোমরা যে বিপদে আছো আল্লাহ অবশ্যই সে বিপদ সরিয়ে নিবেন। আমি আশা রাখি (আল্লাহর উপর ভরসা রাখি), আমরা সবাই শেষ হয়ে যাবো না। আল্লাহ, একদিন কাবাঘরের চাবি আমাদের হাতে এনে দিবেন। পারস্য ও রোমানদের শেষ করে ছাড়বেন। তাদের সমস্ত গচ্ছিত সম্পদ একদিন আল্লাহ তোমাদের হাতে তুলে দিবেন। সেদিন সেগুলো দিয়ে তোমরা আল্লাহর দ্বীনের কাজকে আরো প্রসারিত করবে।”

রাসূল সা.-এর মুখে এই সুসংবাদ শুনে প্রকৃত ঈমানদার সাহাবীরা আরো সুদৃঢ় হলেন। তারা বুঝে নিলেন যে ময়দানে টিকে থাকার মধ্যেই নিহিত রয়েছে কাক্সিক্ষত বিজয় এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি।
সাহাবীদের সান্ত¡না দেওয়ার পর রাসূল সা. মদীনার অভ্যন্তরে থাকা মুসলিম নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা, নিজেদের ঘর বাড়ির নিরাপত্তা এবং সর্বোপরি মুসলমানদের শক্তি সাহস বৃদ্ধির লক্ষ্যে ৫০০ জনের দুটি বাহিনীকে পরিখার অঞ্চল থেকে মদীনায় অভ্যন্তরে প্রেরণ করেন। এই দুই বাহিনীর মাঝে একটি বাহিনীর নেতা ছিলেন সালামা ইবনে আসলাম, যার নেতৃত্বে ছিল ২০০ জনের একটি গ্রুপ। আর অবশিষ্ট ৩০০ জনের অন্য একটি গ্রুপের নেতৃত্বে ছিলেন যায়েদ ইবনে হারেসা। এই দুই বাহিনীর প্রধান দায়িত্ব ছিল রাতের বেলায় মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলকে পাহারা দেওয়া। এ সময় মুসলমানরা কিছুক্ষণ পরপর তাকবির ধ্বনিতে চারিদিকে আওয়াজ তুলতো যেন সাধারণ মুসলিমরা ভয়ভীতি কাটিয়ে নিজেদের মাঝে সাহস সঞ্চার করতে পারে। আর বনু কুরাইজাও মনে করে মুসলমানরা সদা প্রস্তুত অবস্থায় আছে এবং মুসলমানদের আক্রমণ করার কোনো সাহস না পায়।

এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো যে, চারিদিক থেকে সঙ্কটে পড়া ভয়ভীতিতে আচ্ছন্ন সাধারণ মুসলমানদের মনে নতুন করে সাহস সঞ্চার করা এবং প্রকৃত অর্থেই মুসলমানদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে রাসূল সা. যে দুটি পদক্ষেপ নিয়েছেন সেগুলো ছিল বাস্তবসম্মত এবং যথার্থ। একটু বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়- প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে রাসূল সা. সকল সাহাবীদের কাছে গিয়ে গিয়ে তাদের মনে সাহস সঞ্চার করেছেন। আর এ কাজটি করতে গিয়ে তিনি সাহাবীদেরকে সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর ভরসা ও তার পথে এস্তেকামাত (অটল-অবিচল) থাকার কথা স্মরণ করিয়ে দেন, কাবাঘর রক্ষণাবেক্ষণের মতো সম্মানিত দায়িত্ব পাওয়ার আকাক্সক্ষা জাগ্রত করেন, ইসলামের দুশমনদের পরাজয়ের কথা বলেন এবং বিপুল পরিমাণ অর্থ-সম্পদ অর্জনের মাধ্যমে দ্বীন প্রতিষ্ঠার কাজকে আরো প্রসারিত করার স্বপ্ন দেখান।
আর দ্বিতীয় পদক্ষেপ হিসেবে মদীনার অভ্যন্তরের মুসলমানদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে সৈন্য বাহিনী প্রেরণ করেন।
এখানে দেখা যায় সঙ্কট মোকাবেলায় রাসূল সা.-এর প্রথম পদক্ষেপটি ছিল বলিষ্ঠকরণের মাধ্যমে সাহাবীদের আশান্বিত করা আর দ্বিতীয় পদক্ষেপটি একটি বাস্তবিক কার্যকরী পদক্ষেপ। যা প্রকৃত অর্থেই একজন বলিষ্ঠ নেতৃত্বে পরিচায়ক। রাসূল সা.-এর এ দুটি পদক্ষেপ হতে মুসলিম উম্মাহর জন্য আদর্শ ও অনুকরণীয় এই শিক্ষা পাওয়া যায় যে, যেকোনো সঙ্কট মোকাবেলায় অভ্যন্তরীণভাবে জনশক্তিদের মনোবল চাঙ্গা করার জন্য যেমন আশার বাণী শোনাতে হবে পাশাপাশি পরিস্থিতি উত্তরণের জন্য নিতে হবে সুদৃঢ় বাস্তবিক কার্যকরী পদক্ষেপ।

এভাবে মুসলমানরা সদা সতর্ক অবরুদ্ধ অবস্থায় এবং শত্রুবাহিনী মুসলমানদের নিঃশ্বেষের চেষ্টায় ২৫-৩০ দিন অতিবাহিত করে ফেলল। এ সময় মুসলমানদের সাথে কুরাইশ বাহিনীর কয়েকবার তীর নিক্ষেপের ঘটনা ছাড়া অন্য কোন বাহিনীর সাথে তেমন কোনো সংঘাত সংঘটিত হয়নি। ঘটনাগুলো ছিল এমন যে, কুরাইশরা আক্রমণের উদ্দেশ্যে পরিখা অতিক্রম করতে আসলে মুসলিম সৈন্যরা তীর নিক্ষেপ করত। তখন কুরাইশরাও তীর নিক্ষেপ করত। এভাবে কুরাইশরা পরিখা অতিক্রম করার সুযোগ না পেয়ে পুনরায় ফিরে যেত। তবে একটি ঘটনা হয়েছিল যেখানে কুরাইশদের কিছু লোক আক্রমণের উদ্দেশ্যে পরিখা অতিক্রম করেছিল। ঘটনাটি হলো- আমর ইবনে আবদুল উদ, ইকরিমা ইবনে আবু জাহল, হুবাইরা ইবনে আবু ওয়াহাব ও দিনার ইবনে খাত্তাবসহ কতিপয় কুরাইশ অশ্বারোহী যুদ্ধ শুরুর উদ্যোগ নিলো। তারা বনু কিনানার বাহিনীর নিকট ঘোড়ায় চড়ে গেল এবং তাদের উদ্দেশ্যে বলল: ‘হে বনু কিনানা, যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হও। আজ দেখবে যুদ্ধে কারা বেশি পারদর্শী।’
অতঃপর তারা পরিখার কাছে গেল এবং বলল: ‘আল্লাহর কসম, এটা এমন একটা যুদ্ধ কৌশল যা আরবরা কখনো উদ্ভাবন করতে পারেনি।’

অতঃপর পরিখার সবদিক ঘুরে সবচেয়ে কম প্রশস্ত জায়গা চিহ্নিত করলো তারা এবং এদিক দিয়ে পরিখা পার হয়ে ওপারে গেল শত্রুবাহিনী। আবার যেদিক দিয়ে শত্রুবাহিনী পরিখা পার হলো ঠিক সে দিকটাতেই ছিল মুসলমানদের অবস্থান। তখন হযরত আলী রা.-এর নেতৃত্বে কিছু মুসলিম তাদের প্রতিহত করতে এগিয়ে এলো। ওই সময় কুরাইশদের মধ্য থেকে আমর ইবনে আবদে উদ হুঙ্কার ছেড়ে বলে উঠলো: ‘কে আছ, লড়াই করবে আমার সাথে?’
এ কথা শুনে হযরত আলী রা. সামনে এগিয়ে গেলেন এবং তিনি বললেন: ‘হে আমর, তুমি আল্লাহর কাছে অঙ্গীকার করেছিলে যে কুরাইশদের কোন লোক তোমাকে যে কোন দুটি কাজের একটির দিকে দাওয়াত দেবে, তুমি তা গ্রহণ করবে। সত্য কিনা?’
আমর : ‘হ্যাঁ।’
আলী : ‘তাহলে আমি তোমাকে আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও ইসলামের দিকে দাওয়াত দিচ্ছি।’
আমর : ‘এতে আমার কোন প্রয়োজন নেই।’
আলী : ‘তাহলে আমি তোমাকে যুদ্ধের দাওয়াত দিচ্ছি।’
আমর : ‘তা কেন ভাতিজা, আমিতো তোমাকে হত্যা করতে চাই না।’
আলী : ‘কিন্তু আমি তো তোমাকে (আল্লাহর জন্য) হত্যা করতে চাই।’
হযরত আলী রা.-এর এ বক্তব্য শুনে আমর উত্তেজিত হলো এবং ঘোড়া থেকে লাফিয়ে নেমে নিজেই ঘোড়ার পা কেটে দিল। অতঃপর হযরত আলী রা.-এর সাথে যুদ্ধ শুরু করে আমর। প্রথমে আমর আঘাত হানে যা আলী রা. দক্ষতার সাথে প্রতিহত করেন। পরে আলী রা. আঘাত শুরু করলে আমর তা প্রতিহত করতে ব্যর্থ হয় এবং আঘাতে সে মারা যায়।

কুরাইশদের দৃষ্টিতে বড় যোদ্ধা আমরের শোচনীয় পরাজয় ও মৃত্যুতে ভীত হয়ে যায় তারা। কুরাইশ নেতা ইকরিমা তার বর্শা ফেলে দিয়ে অন্যদের সাথে নিয়ে দ্রুত পালিয়ে যায়।
ইকরিমা ছিল আবু জাহেলের ছেলে। অবশ্য মক্কা বিজয়ের পরে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি একাধিক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং সর্বশেষ রোমানদের বিরুদ্ধে ইয়ারমুকের যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেন। খন্দক যুদ্ধে ইকরিমার পালানোর দৃশ্য দেখে সাহাবী কবি হাসসান ইবনে সাবিত রা. একটি কবিতা রচনা করে বলেন:
‘সে পালিয়ে গেল এবং আমাদের জন্য তার বর্শা ফেলে রেখে গেল।
হে ইকরিমা, তুমি এমন ভান করেছ যেন (যুদ্ধ) করোনি।
তুমি নর পাখির মতো ঊর্ধ্বশ্বাসে পালিয়েছো। ভাবখানা এই যে, তুমি যেন রাস্তা থেকেই আলাদা হয়েছো
তুমি আপসের মনোভাব নিয়ে একটুও পেছনে ফেরনি।
(তোমার পালানো দেখে) তোমার পিঠ হায়েনার পিঠ বলে মনে হচ্ছিল।’ (চলবে)
লেখক : কলামিস্ট ও গবেষক

SHARE

Leave a Reply