লক্ষ্য অর্জনের পথে -মু. রাজিফুল হাসান

পর্ব ১৯

মুসলমানদের জন্য সঙ্কটময় দিনগুলোতে একদিন আল্লাহর ইচ্ছায় এক আকস্মিক ঘটনা ঘটলো। যার মাধ্যমে মদীনার অভ্যন্তরে থাকা মুসলিম নারী-শিশুরা আরো অধিক নিরাপত্তা লাভ করেছিল আর বনু কুরাইজা হয়েছিল ভীতসন্ত্রস্ত। ঘটনাটি ঘটেছিল ফারে নামক দুর্গে, যেখানে মুসলিম নারী ও শিশুরা অবস্থান করছিল। ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে রাসূল সা.-এর ফুফু সাফিয়া রা. বলেন: “এক ইহুদি আমাদের কাছ দিয়ে অতিক্রম করে এবং দুর্গের চারদিকে ঘুরতে থাকে। এটা সে সময়ের কথা যখন বনু কুরাইজা রাসূল সা.-এর সাথে সম্পাদিত চুক্তি লঙ্ঘন করে তার সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল। সে সময় আমাদের এবং চুক্তি ভঙ্গকারী ইহুদিদের মধ্যে এমন কেউ ছিল না যারা আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। রাসূল সা. সাহাবীদের নিয়ে সম্মিলিত শত্রুবাহিনীর মোকাবেলায় ব্যস্ত রয়েছেন। আমাদের উপর কেউ হামলা করলে তিনি আমাদের কাছে আসতে পারতেন না। এসময় আমি হাসসানের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললাম, হে হাসসান, একজন ইহুদি দুর্গের চারদিকে ঘুর ঘুর করছে। আমার সন্দেহ হচ্ছে, সে অন্য ইহুদিদের আমাদের দুর্বলতা সম্পর্কে অবহিত করবে। ওই দিকে রাসূল সা. ও সাহাবীরা অন্য কাজে এত ব্যস্ত যে, তারা আমাদের কাছে আসতে পারবেন না। কাজেই আপনি গিয়ে তাকে হত্যা করুন।

হযরত হাসসান রা. বললেন, আপনি তো জানেন, আমি ওরকম কাজের মানুষ নই। (হাসসানের এ কথা শুনে অতঃপর) আমি (সাফিয়া) কোমরে কাপড় বাঁধলাম। একটা কাঠ নিয়ে দুর্গের বাইরে ইহুদির কাছে গিয়ে নির্মমভাবে প্রহার করে তাকে মেরে ফেললাম। এরপর দুর্গে ফিরে এসে হাসসানকে বললাম যান, সে লোকটির অস্ত্রশস্ত্র এবং অন্যান্য জিনিস খুলে নিন। লোকটি পুরুষ এ কারণে আমি খুলে নেইনি। হযরত হাসসান রা. বললেন, তার অস্ত্র এবং জিনিসপত্র আমার কোনো প্রয়োজন নেই। (আর রাহিকুল মাখতুম)
সেদিন মুসলমানদের সেই দুর্গে নারী ও শিশু ব্যতীত প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ ছিল শুধু হযরত হাসসান ইবনে সাবিত। আর তাই হযরত সাফিয়া রা. হাসসানকে অনুরোধ করেছিলেন ইহুদিকে হত্যা করার জন্য। হযরত হাসসান বিন সাবিত ছিলেন রাসূল সা.-এর ফুফাতো ভাই এবং একজন কবি। স্বভাবগত কারণেই তিনি যুদ্ধ-বিগ্রহ, মারামারি করতে অভ্যস্ত ছিলেন না। আর তাই তিনি সাফিয়া রা.-এর অনুরোধে না-সূচক জবাব দিয়েছিলেন। ফলে সাফিয়া রা. মুসলিম দুর্গের নিরাপত্তার স্বার্থে নিজেই দুঃসাহসিক ভূমিকা রাখেন। আর তার এই দুঃসাহসিক ভূমিকার ফলে বনু কুরাইজার ইহুদিরা মনে করলো মুসলিম দুর্গের ভেতরে পর্যাপ্ত পরিমাণ সৈন্য মোতায়েন রয়েছে। তাই তারা মুসলিম দুর্গে আক্রমণ করা অথবা দুর্গকে নিয়ে অন্য কোনো খারাপ পরিকল্পনা করতে সাহস পায়নি। তবে কুরাইশদের সহযোগিতা স্বরূপ তাদের জন্য নিয়মিতভাবে খাদ্যসামগ্রী সরবরাহ করেছিল বনু কুরাইজা। একটা সময় মুশরিকদের জন্য বনু কুরাইজার পক্ষ থেকে প্রেরিত রসদসামগ্রী থেকে ২০টি উট জব্দ করে মুসলমানরা।
এভাবে সময় অতিবাহিত হতে লাগলো আর রাসূল সা.ও বিজয়ের পথ উন্মোচন করতে চিন্তা-ফিকির করে চলেছেন। এরই মাঝে শত্রুবাহিনীকে দুর্বল করার লক্ষ্যে এক নতুন কৌশলের বিষয়ে চিন্তা করেন রাসূল সা.। আর তা হলো বনু গাতফানের নেতা ওয়ায়না ইবনে হেসন ও হারেস ইবনে আওফের সাথে (বনু গাতফানের) যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে চলে যাওয়ার চুক্তি। আর বিনিময়ে মদীনার উৎপাদিত ফসলের এক-তৃতীয়াংশ দেওয়া হবে তাদের। অর্থাৎ বনু গাতফান যুদ্ধ না করে চলে যাবে, বিনিময়ে মুসলমানরা মদীনায় উৎপাদিত ফসলের এক-তৃতীয়াংশ তাদেরকে দিবে। এই কৌশল বাস্তবায়ন করার মাধ্যমে শত্রুবাহিনীর মাঝে বিভেদ তৈরি করে তাদেরকে দুর্বল করা এবং সর্বদিক থেকে বিরোধিতার মুখে পড়া মুসলমানদের কিছুটা স্বস্তি দেওয়াই ছিল রাসূল সা.-এর উদ্দেশ্য।

অতঃপর রাসূল সা. আনসার সাহাবীদের দুই নেতা সাদ ইবনে মুয়াজ রা. এবং সাদ ইবনে ওবাদা রা.কে ডাকলেন এবং বনু গাতফানের সাথে চুক্তির বিষয়ে তিনি যা চিন্তা করেছেন তা তাদেরকে জানালেন। বনু গাতফানের সাথে চুক্তির কথা শুনে সাদ ইবনে মুয়াজ রা. ও সাদ ইবনে ওবাদা রা. বললেন: “হে আল্লাহর রাসূল, যদি এ আদেশ আল্লাহ তায়ালা আপনাকে দিয়ে থাকেন তবে আমরা নির্দ্বিধায় মেনে নেবো। কিন্তু আপনি যদি শুধু আমাদের কারণে এরূপ করতে চান, তবে বলছি আমাদের এর প্রয়োজন নেই। আমরা এবং ওরা যখন মূর্তিপূজা করতাম, শিরকে লিপ্ত ছিলাম, তখনও তো ওরা আতিথেয়তা এবং বেচাকেনা ছাড়া অন্য কোন উপায়ে একটা শস্যদানাও আমাদের কাছে আশা করতে পারেনি। বর্তমানে আল্লাহ তায়ালা আপনার মাধ্যমে আমাদের হেদায়েত দান করেছেন, আমরা মুসলমান হয়েছি, আল্লাহ তায়ালা আপনার মাধ্যমে আমাদের সম্মান মর্যাদা দিয়েছেন, এমতাবস্থায় আমরা নিজেদের সম্পদ তাদের দেবো? আল্লাহর শপথ, আমরাতো তাদের দেবো শুধু আমাদের তলোয়ার।”

অতঃপর রাসূল সা. তাদের বক্তব্যকে যথার্থ মনে করলেন এবং বললেন: “আমি ভেবেছিলাম, অন্য কথা। সমগ্র আরব ঐক্যবদ্ধভাবে তোমাদের বিরুদ্ধে উঠে পড়ে লেগেছে। একথা ভেবে শুধু তোমাদের জন্যই আমি এ কাজ করতে চেয়েছিলাম।” (আর রাহিকুল মাখতুম)
এখানে মদীনার দুই আনসারি নেতার বক্তব্যের মাধ্যমে সাহাবীদের ইসলামের উপর অবিচলতার এক সুদৃঢ় দৃষ্টান্ত ফোটে উঠেছে।
যখন তারা বনু গাতফানের সাথে আপসের চুক্তির পরিবর্তে তরবারির সমাধানের কথা বলছিল, তখন একদিকে যেমন মুসলমানরা অর্ধাহারে-অনাহারে অর্থনৈতিক সঙ্কটের মধ্যে দিনানিপাত করছিল, অন্যদিকে তারা মুশরিক (কুরাইশ ও গাতফান), ইহুদি এবং মুনাফিকদের সামষ্টিক ষড়যন্ত্রের চাপে পিষ্ট হওয়ার উপক্রম ছিল। আর এই অবস্থা অনুধাবন করে খোদ রাসূল সা. নিজেই বনু গাতফানের সাথে চুক্তির মাধ্যমে কিছুটা হলেও মুসলমানদের ওপর চাপ কমানোর চিন্তা করছিলেন। ঠিক তখন সাহাবীদের এই বীরোচিত জবাব একথারই প্রমাণ বহন করে যে, ইসলামই হলো তাদের জীবনের সবচাইতে বড় প্রাপ্তি এবং এ পথে অবিচল থাকতে গিয়ে সদাসর্বদা নিজেদেরকে আত্মোৎসর্গ (উবফরপধঃরড়হ) করতে প্রস্তুত তারা।

অবশেষে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার পক্ষ থেকে মুসলমানদের জন্য রহমত নাযিল হলো। আর আল্লাহ তায়ালা এই রহমতের উসিলা করে পাঠিয়েছিলেন নাঈম ইবনে মাসউদ নামে এক মুসলিমকে। নাঈম ইবনে মাসউদ গাতফান গোত্রের একজন, যিনি গোপনে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। নাঈমের ইসলাম গ্রহণের কথা তার স্বগোত্রীয় লোকজনের যেমন জানা ছিল না তেমনি জানা ছিল না মুসলমানদের, এমনকি রাসূল সা.-এরও। হঠাৎ একদিন নাঈম ইবনে মাসউদ রাসূল সা.-এর নিকট এসে বলল: “ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি। তবে আমার গোত্র এ কথা জানে না। এখন আপনি আমাকে প্রয়োজনীয় যে কোন নির্দেশ দিন।”
রাসূল সা. বললেন: “আমাদের মধ্যে তুমিই একমাত্র ব্যক্তি যে শত্রুপক্ষের বিশ্বাসভাজন। তুমি যদি পারো আমাদের পক্ষ থেকে শত্রুদের পর্যুদস্ত করো। যুদ্ধ তো কৌশলের নামান্তর (নাম)।”
নাঈম ইবনে মাসউদ রা. বললেন: “(শত্রুপক্ষকে ধোঁকা দিতে গিয়ে) আমি তাদেরকে কিছু কথা বলব, সেটা যাই হোক না কেন, আপনি আমাকে অনুমতি দিন।”
অতঃপর রাসূল সা. তাকে অনুমতি দিলেন।
এখানে রাসূল সা.-এর এই অনুমতির মাধ্যমে এটি প্রতীয়মান হয় যে, শত্রুপক্ষকে পরাস্ত করার লক্ষ্যে মিথ্যার আশ্রয় নেয়া কোনো অন্যায় নয় বরং কৌশলেরই অংশবিশেষ। আর যুদ্ধকে সংজ্ঞায়িত করতে গিয়ে রাসূল সা. মূলনীতি বলেই দিয়েছেন যে, ‘যুদ্ধ হলো কৌশলের নাম।’
অতঃপর নাঈম ইবনে মাসুদ বনু কুরাইজার নিকট গেলেন। পূর্ব থেকেই বনু কুরাইজার সাথে তার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। আর সেই বন্ধুত্বের সম্পর্কের দাবি নিয়েই তিনি তাদেরকে বললেন: “হে বনু কুরাইজা, আমি তোমাদের কত ভালোবাসি তা নিশ্চয়ই তোমাদের জানা আছে। বিশেষ করে তোমাদের সাথে আমার যে সম্পর্ক রয়েছে, তা তোমাদের অজানা নয়।”
জবাবে বনু কুরাইজার লোকজন বলল: “হ্যাঁ, তোমার কথা সত্য। তোমার বিরুদ্ধে আমাদের কখনো কোনো অভিযোগ ছিল না।”
অতঃপর নাঈম ইবনে মাসউদ বললেন: “কুরাইশ ও গাতফানের অবস্থা তোমাদের থেকে আলাদা। এ (মদীনা) শহর তোমাদেরই শহর। এখানে তোমাদের স্ত্রী, সন্তান ও ধন-সম্পদ রয়েছে। এগুলো অন্য কোথাও সরিয়ে নেয়া তোমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। অন্য দিকে কুরাইশ ও গাতফান মোহাম্মদ ও তার সহযোগীদের সাথে যুদ্ধ করতে এসেছে। তোমরা তাদেরকে সাহায্য সহযোগিতা করছো। অথচ তাদের আবাসভূমি, ধন-সম্পদ ও পরিবার-পরিজন অন্যত্র রয়েছে। সুতরাং তাদের অবস্থান তোমাদের মতো নয়। তারা যদি এখানে বিজয় দেখতে পায়, তাহলে তারা তা গ্রহণ করবেই। আর যদি বিজয় দেখতে না পায়, তবে নিজেদের আবাসভূমিতে চলে যাবে। তখন তোমাদেরকে এই মদীনা শহরে একাকী মোহাম্মদের বাহিনীর সম্মুখীন হতে হবে। সে অবস্থায় তার বিরুদ্ধে তোমরা দাঁড়াতে পারবে না। অতএব মুসলমানদের সাথে লড়াই করতে হলে আগে কুরাইশদের মধ্য থেকে তাদের কতিপয় নেতাকে তোমাদের কাছে জিম্মি করে নাও। তারা তোমাদের নিকট জামানত হিসেবে থাকবে। তখন তোমরা তাদের (কুরাইশ ও গাতফানের) ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারবে।

তাদেরকে সাথে নিয়ে তোমরা মোহাম্মদের সাথে লড়াই করে তাকে পরাজিত করতে পারবে। এই পন্থা অবলম্বন না করে মুসলমানদের সাথে লড়াই করা তোমাদের কখনো ঠিক হবে না।”
বনু কুরাইজার লোকজন বলল: “তুমি সঠিক পরামর্শ দিয়েছো।” (সিরাতে ইবনে হিশাম)
অতঃপর নাঈম ইবনে মাসউদ রা. চলে গেলেন কুরাইশদের নিকট। তিনি সেখানে গিয়ে কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ান ও তার সহযোগী নেতৃবৃন্দের উদ্দেশে বলেন: “তোমরা নিশ্চয়ই জানো যে, আমি তোমাদের পরম হিতাকাক্সক্ষী এবং মোহাম্মদের ঘোর বিরোধী। আমি একটা খবর শুনেছি। সেটা তোমাদেরকে জানানো আমার কর্তব্য ও তোমাদের হিত কামনার দাবি। তবে কথাটা তোমরা আর কারো কাছে প্রকাশ করো না।”
কুরাইশ নেতৃবৃন্দ বলল: “ঠিক আছে, আমরা তা কারো কাছে প্রকাশ করব না।”
এবার নাঈম বললেন: “তাহলে শোনো, ইয়াহুদি গোত্র বনু কুরাইজা মুহাম্মদ ও তাঁর সঙ্গীদের সাথে তাদের সম্পাদিত চুক্তি লংঘনের পর অনুতপ্ত হয়েছে। তারা মোহাম্মদের কাছে বার্তা পাঠিয়েছে যে, ‘আমরা যা করেছি তার জন্য অনুতপ্ত। এখন আমরা যদি কুরাইশ ও গাতফান গোত্রের নেতৃস্থানীয় কিছু লোককে পাকড়াও করে তোমার কাছে হস্তান্তর করি আর তুমি তাদের হত্যা করো, তাহলে কি তুমি আমাদের প্রতি খুশি হবে? এরপর আমরা তোমার সাথে মিলে কুরাইশ ও গাতফানের অবশিষ্ট সবাইকে খতম করব।’ তাদের এ কথায় মোহাম্মদ রাজি হয়েছে।”

নাঈম আবু সুফিয়ানকে আরো বললেন: “খবরদার ইহুদিরা যদি তোমাদের কতিপয় লোককে জিম্মি রাখতে চায়, তাহলে একটি লোকও তাদের হাতে সমর্পণ করো না।”
অতঃপর নাঈম তার নিজ গোত্র বনু গাতফানের কাছে গেল এবং তাদেরকে বলল: “হে বনু গাতফান, তোমরাই আমার স্বগোত্র ও আপনজন। তোমরা আমার কাছে সবার চাইতে প্রিয়। মনে হয়, আমার বিরুদ্ধে তোমাদের কোনো অভিযোগ নেই।”
তারা বলল: “তুমি সত্য বলেছ। তোমার বিরুদ্ধে আমাদের কোনো অভিযোগ নেই।” নাঈম বলল: “তাহলে আমি যে খবর দিচ্ছি তা কাউকে জানতে দিও না।”
তারা বললো: “ঠিক আছে। তোমার কথার গোপনীয়তা রক্ষা করা হবে।”
অতঃপর নাঈম কুরাইশদের কাছে যা বলেছিল গাতফানের লোকদের কাছেও তার পুনরাবৃত্তি করল এবং বনু কুরাইজার নিকট কোন নেতাকে জিম্মি না দেওয়ার ব্যাপারে কুরাইশদের যেমন সতর্ক করেছিল একইভাবে তাদেরকেও সতর্ক করলেন। (সিরাতে ইবনে হিশাম)

এ দিকে মরুভূমিতে দীর্ঘ প্রতীক্ষায় থাকতে থাকতে কুরাইশরা অস্থির হয়ে উঠেছে। তাই আবু সুফিয়ানসহ কুরাইশ নেতৃবৃন্দ ও বনু গাতফান নেতৃবৃন্দ মিলে সিদ্ধান্ত নিলো এই প্রতীক্ষার শেষ হওয়া দরকার। আর সেজন্য প্রয়োজন সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়ে সবদিক থেকে মুসলমানদের উপর চূড়ান্ত আক্রমণ করা। তবে এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে প্রয়োজন বনু কুরাইজার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। আর তাই কুরাইশ ও গাতফানের পক্ষ থেকে ইকরামা ইবনে আবু জেহেলের নেতৃত্বে কুরাইশ ও গাতফানিদের সমন্বয়ে একটি দল পাঠানো হলো বনু কুরাইজার নিকট। প্রতিনিধিদল গিয়ে বনু কুরাইজাকে বলল: “আমরা আর অপেক্ষা করতে পারছি না। আমাদের উট-ঘোড়া সব মারা যাচ্ছে। সুতরাং যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হও। আমরা চাই মোহাম্মদের সাথে যুদ্ধ করে চূড়ান্ত একটা ফয়সালা করতে।”
জবাবে বনু কুরাইজার নেতারা বলল: “আজ শনিবার। এই দিনে আমরা কিছুই করি না। ইতঃপূর্বে আমাদের কিছু লোক শনিবারে একটি ঘটনা ঘটেয়েছিল। আর এর ফলে যে পরিণতি হয়েছিল তা তোমাদের অজানা নয়। তাছাড়া আমরা তোমাদের সহযোগিতা করার জন্য মোহাম্মদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারবো না। তবে তোমরা যদি তোমাদের কিছু লোককে আমাদের হাতে নিরাপত্তার রক্ষাকবচ হিসেবে জিম্মি রাখ তাহলে তোমাদের সহযোগিতা করতে আমরা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করব। আমাদের আশঙ্কা হয় যে, যুদ্ধে তোমরা ক্ষতিগ্রস্ত হলে বা যুদ্ধ অব্যাহত রাখা কঠিন মনে করলে তোমরা আমাদের নিরাপত্তার তোয়াক্কা না করে মোহাম্মদের মুঠোর মধ্যে (আমাদের) অসহায় ভাবে রেখে নিজ দেশে ফিরে যাবে। অথচ মোহাম্মদকে মোকাবেলা করার ক্ষমতা আমাদের নেই।”

প্রতিনিধিদল বনু কুরাইজার এই বার্তা শুনে ফিরে গেল এবং কুরাইশ ও গাতফানদের বিস্তারিত জানালো। বনু কুরাইজার জবাব শুনে কুরাইশ ও গাতফানিরা পরস্পরকে বলল: “নাঈম ইবনে মাসউদ আমাদেরকে যে খবর দিয়েছে তা অক্ষরে অক্ষরে সত্য। অতএব বনু কুরাইজাকে জানিয়ে দেওয়া হোক যে, আমরা তোমাদের কাছে একজন লোকও জিম্মি হিসেবে সমর্পণ করবো না। যুদ্ধ করার ইচ্ছা থাকেতো এসে যুদ্ধ করো।”
কুরাইশ ও গাতফানিদের এ জবাব পুনরায় বনু কুরাইজার কাছে নিয়ে যাওয়া হলো। আর তা জেনে বনু কুরাইজার নেতারা পরস্পরকে বলল: “দেখলে তো নাঈম যা বলেছে তা সম্পূর্ণ সত্য। কুরাইশ ও গাতফানিরা শুধু যুদ্ধই চায়। আমাদের ভালো-মন্দ নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। তারা যদি লাভবান হয় তাহলে তো তাদেরই স্বার্থ উদ্ধার হলো। অন্যথায় তারা আমাদেরকে মোহাম্মদের হাতে অসহায়ভাবে রেখে নিজ নিজ দেশে ফিরে যাবে।”

অতঃপর বনু কুরাইজার নেতারা কুরাইশ ও গাতফানিদের এই বার্তা জানিয়ে দিলো যে, “যতক্ষণ পর্যন্ত না তোমরা আমাদের হাতে জিম্মি দেবে ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা তোমাদের সহযোগী হয়ে মোহাম্মদের সাথে যুদ্ধ করবো না।”
বনু কুরাইজা যেদিন কুরাইশ ও গাতফানিদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা জানালো সেদিন রাতেই মরু অঞ্চলজুড়ে প্রচণ্ড ঠাণ্ডা বাতাস প্রবাহিত হয়। যে বাতাসে কুরাইশ কাফেলার তাঁবু মাটিতে পড়ে যায় এবং তাদের রান্নাবান্নার সামগ্রী ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। এমনকি বাতাসের ফলে কুরাইশরা তাদের চুলাগুলো জ্বালাতে পারছিল না। এতে করে তারা শীতের প্রকোপ তীব্রভাবে অনুভব করল।
এ দিকে বনু কুরাইজার পিছুটান অন্যদিকে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে নাস্তানাবুদ কুরাইশ বাহিনী অতিষ্ঠ হয়ে গেল। এ অবস্থায় কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ান যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে মক্কায় ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। অতঃপর পুরো বাহিনী মক্কার উদ্দেশে যাত্রা করে। সেদিন রাতের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে হুজাইফা ইবনে ইয়ামান বলেন: “রাসূল সা.-এর সাথে আমরা পরিখায় ছিলাম। তিনি রাতের একাংশ নামাজ পড়ে কাটালেন। পরে তিনি আমাদের দিকে ফিরে তাকিয়ে বললেন, “তোমাদের মধ্যে এমন কে আছে যে শত্রুদের গতিবিধির খোঁজ নিয়ে আবার ফিরে আসতে পারে? আমি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছি, সে যেন জান্নাতে আমার সাথী হয়!” রাসূলুল্লাহ সা. কাজ সেরে ফিরে আসার শর্ত আরোপ করেছিলেন। মুসলমানদের মধ্যে কেউই ভয়, শীত ও ক্ষুধার দরুন যাওয়ার শক্তি পাচ্ছিল না। কেউ যখন প্রস্তুত হলো না তখন রাসূলুল্লাহ সা. আমাকে ডাকলেন। ফলে আমাকে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হতেই হলো। তিনি বললেন, “হে হুজাইফা, যাও শত্রুদের ভেতরে যাও, তারপর দেখো তারা কী করছে। আমাদের কাছে ফিরে না এসে তুমি কিছু ঘটিয়ে ফেল না যেন।”

এরপর আমি গেলাম এবং সন্তর্পণে শত্রুবাহিনীর ভেতরে ঢুকে পড়লাম। তখনও বাতাস ও আল্লাহর অদৃশ্য সৈন্যরা তাদেরকে হেস্তনেস্ত করে চলেছে। তাদের তাঁবু ও রান্নার হাঁড়ি-পাতিল সবই লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে এবং আগুন নিভে গেছে। তখন আবু সুফিয়ান তাদের বলল, “হে কুরাইশগণ তোমরা প্রত্যেকে নিজের আশপাশে খেয়াল করে দেখো অন্য কেউ আছে কি না।”
এ কথা শোনার পর আমি প্রথম পার্শ্ববর্তী লোকের গায়ে হাত দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কে? সে বলল, ‘অমুকের ছেলে অমুক।’
অন্য এক বর্ণনায় এসেছে যে, হুজাইফা বলেন: “আমি আমার ডান পাশে বসা ব্যক্তির হাতের উপর হাত রেখে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুমি কে?’ সে বললো, ‘আমি আবু সুফিয়ানের ছেলে মুয়াবিয়া।’ তারপর বামপাশে বসা লোকটিকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুমি কে?’ সে বললো, আমি আমর ইবনুল আস।” (শরহুল মাওয়াহেরে)
উল্লেখ্য, এই বর্ণনা হতে বোঝা যায় হুজাইফা একেবারেই কুরাইশদের ভিতর থেকে খবর নিয়ে এসেছিলেন এবং এ কাজটি যে কারো জন্যই করা ছিল খুবই বিপজ্জনক।

পরে আবু সুফিয়ান আরো বলল, হে কুরাইশগণ, তোমরা যে স্থানে অবস্থান করছো সেটি আর অবস্থানের যোগ্য নেয়। আমাদের উট-ঘোড়াগুলো মারা যাচ্ছে। আর বনু কুরাইজা আমাদেরকে পরিত্যাগ করেছে। আমরা যা অপছন্দ করি তারা তাই করেছে। প্রচণ্ড ঝড় বাতাসে আমাদের কী দশা হয়েছে তা দেখতেই পাচ্ছো। আমাদের রান্নার সাজ-সরঞ্জাম, তাঁবু ইত্যাদি লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। এমনকি আগুনও নিভে গেছে। অতএব তোমরা সবাই নিজ বাড়ির অভিমুখে যাত্রা করো। আমিও রওনা হচ্ছি।”
এ কথা বলেই সে তার উটের দিকে এগিয়ে গেল। উটটি ছিল বাঁধা। সে উটের পিঠে উঠে বসলো তারপর একে আঘাত করল। তিনবার আঘাত করার পর উটটি লাফিয়ে উঠল। উটটির বাঁধন খুললেও সেটি দাঁড়িয়ে ছিল। রাসূলুল্লাহ সা. যদি আমাকে নির্দেশনা দিতেন যে, “ফিরে না আসা পর্যন্ত কোন কিছু ঘটিয়ে ফেলবে না।” তাহলে আমি ইচ্ছা করলেই তাকে হত্যা করতে পারতাম। এরপর আমি রাসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে ফিরে গেলাম। তখন তিনি একটি ইয়েমেনি কম্বল গায়ে জড়িয়ে নামাজ পড়ছিলেন। নামাজের মধ্যেই তিনি আমাকে দেখে পায়ের কাছে টেনে নিলেন এবং কম্বলের একাংশ আমার গায়ের ওপর তুলে দিলেন। এই অবস্থায়ই তিনি রুকু ও সিজদা করলেন। সালাম ফিরানোর পর আমি তাঁকে শত্রুদের সব খবর জানালাম।” (সিরাতে ইবনে হিশাম)
এ দিকে জোহরের সময় রাসূল সা.সহ মুসলিম বাহিনী খন্দক হতে মদীনার মূল শহরে মাত্রই ফিরে আসলেন। এরই মাঝে জিন পরিহিত খচ্চরে চড়ে রাসূল সা.-এর নিকট আসেন জিবরাইল (আ)। এসময় তার মাথায় রেশমের পাগড়ি শোভা পাচ্ছিল। জিবরাইল (আ) রাসূল সা.কে উদ্দেশ করে বললেন: “হে আল্লাহর রাসূল আপনি কি অস্ত্র ত্যাগ করেছেন?”
জবাবে রাসূল সা. বললেন: “হ্যাঁ”
অতঃপর জিবরাইল (আ) বললেন: “কিন্তু ফেরেশতারা এখনো অস্ত্র ত্যাগ করেনি। আর আপনিও রণাঙ্গন থেকে মুসলমানদের দাবিতেই ফিরেছেন। হে মোহাম্মদ, আল্লাহ আপনাকে বনু কুরাইযার বিরুদ্ধে অভিযানে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। আমিও সেখানে যাবো এবং তাদের তছনছ করে ছাড়বো।…
এ কথা শুনে রাসূল সা. এক সাহাবীকে তার পক্ষ হতে নি¤েœাক্ত ঘোষণাটি দেওয়ার জন্য নির্দেশ দেন। আর ঘোষণাটি ছিল: “যেসব লোক আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের কথা মানবে, তারা যেন বনু কুরাইজার এলাকায় গিয়ে আসরের নামাজ পড়ে।” (সিরাতে ইবনে হিশাম)
(চলবে)
লেখক : কলামিস্ট ও গবেষক

SHARE

Leave a Reply