লক্ষ্য অর্জনের পথে – মু. রাজিফুল হাসান

লক্ষ্য অর্জনের পথে - মু. রাজিফুল হাসান

পর্ব-৯

(গত সংখ্যার পর)

মুনাফিক
মুনাফিক একটি ইসলামী পরিভাষা, যার আভিধানিক অর্থ হলো প্রতারক বা ভণ্ড ধার্মিক। ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় যে ব্যক্তি মুখে কালেমার (ঈমানের) ঘোষণা দেয় এবং বাস্তবে ইসলামকে চর্চাও করে; কিন্তু (গোপনে) অন্তরে ইসলামের প্রতি অবিশ্বাস বা কুফরি লালন করে তাকে মুনাফিক বলা হয়। অর্থাৎ মুনাফিকরা মুসলিম হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা করে কিন্তু প্রকৃত অর্থে তারা মুসলিম নয়। আর মুনাফিকদের এসকল প্রতারণাকে নিফাক বা মুনাফেকি বলা হয়। নিফাকের আবার দু’টি ধরন রয়েছে। একটি হলো বিশ্বাসগত নিফাক আর অপরটি কর্মগত নিফাক। বিশ্বাসগত নিফাক হলো ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলো বা কোন একটি বিষয়ের উপর ন্যূনতম সন্দেহ-সংশয় বা অবিশ্বাস করার নাম। যেমন: কুরআনের কোন একটি আয়াতের উপর সন্দেহ প্রকাশ করা; ইসলামের ক্ষতি হয় এমন কোন কিছু ভালো লাগা; রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কোন একটি শিক্ষাকেও মিথ্যা মনে করা ইত্যাদি। বিশ্বাসগত নিফাক একটি বড় কুফর, যা করার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি তার মুসলমানিত্ব হারিয়ে ফেলে। অর্থাৎ সে আর মুসলিম মিল্লাতের অন্তর্ভুক্ত থাকে না। কর্মগত নিফাক হলো ইসলামের মৌলিক শিক্ষার সাথে কর্মের (কাজের) মিল না থাকার নাম। অর্থাৎ বিশ্বাসের সাথে আমলের (কাজের) অমিল থাকাটাই হলো কর্মগত নিফাক। কর্মগত নিফাকের বিষয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “চারটি স্বভাব যার মধ্যে বিদ্যমান সে হবে খাঁটি মুনাফিক। যার মধ্যে এর কোনো একটি স্বভাব থাকবে, তা পরিত্যাগ না করা পর্যন্ত তার মধ্যে মুনাফিকের একটি স্বভাব থেকে যায়। সেগুলো হলো : ১. আমানত রাখা হলে খিয়ানত করে; ২. কথা বললে মিথ্যা বলে; ৩. অঙ্গীকার করলে ভঙ্গ করে; এবং ৪. বিবাদে লিপ্ত হলে অশ্লীল গালি দেয়।” (বুখারী ও মুসলিম)
কর্মগত নিফাক তুলনামূলক ছোট কুফর তবে এটি মহাপাপ। মুনাফিকদের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো দ্বিমুখী নীতি অবলম্বন করা। আর এ বিষয়ে আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত হাদীসে উল্লিখিত হয়েছে রাসূল সা.বলেন, “মুনাফিকদের দৃষ্টান্ত ঐ বকরির মতো, যা দুই পালের মধ্যে উদভ্রান্তের মতো ঘুরপাক করে। একবার এদিকে আবার অন্যদিকে। (মুসলিম: ৬৭৮৬, ইফা)
বিখ্যাত তাফসীর গ্রন্থ তাফহীমুল কুরআনের লেখক সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী (রহ) আল্লাহর রাসূল (সা)-এর নবুয়াতের সময়টুকু বিশ্লেষণ করে বিশ্বাস ও কর্মের ভিন্নতার ভিত্তিতে ৫ প্রকারের মুনাফিকি আচরণের কথা উল্লেখ করেন। অর্থাৎ ৫ শ্রেণীর মুনাফিকের বিষয়ে উল্লেখ করেন। এর মাঝে এক শ্রেণীর মুনাফিক পাওয়া গিয়েছিল মক্কী জীবনে আর অবশিষ্ট ৪ শ্রেণী মদিনায়।
১. দুর্বল মুমিন: মক্কায় যারা ঈমান এনেছিল তাদের মধ্যে যারা কাফেরদের অত্যাচার সহ্য করতে সাহস পায়নি, তারা ইসলামকে সত্য বলে বিশ্বাস করা সত্ত্বেও পেছনে হটে গিয়েছিল। এরা দুনিয়ার সুখ-সুবিধা কোরবানি দিতে রাজি হয়নি। এরাই দুর্বল মুমিন।
২. দুর্বল কাফের: এরা আসলে কাফের; কিন্তু সাহসী কাফেরদের মত সামনাসামনি ইসলামী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হিম্মত করেনি। তাই মুসলিম পরিচয় দিয়ে পঞ্চম বাহিনীর মতো ভেতর থেকে ক্ষতি করতে চেষ্টা করেছিল।
৩. সুবিধাবাদী: এরা মুসলিম ও কাফের উভয় দিকের ক্ষতি থেকে জান বাঁচানোর আশায় দুই দিকেই সম্পর্ক রাখত। মুসলিমদেরকে বলত, তারা মুসলিম; আবার কাফেরদের কাছে তাদের লোক বলেই পরিচয় দিত।
৪. সন্দেহবাদী: এরা মনোস্থির করতে অক্ষম। একসময় তাদের মনে হয় ইসলামী ঠিক। আবার অন্য সময় সন্দেহ জাগে, বোধ হয় ইসলাম ঠিক নয়। এরা যখন যেদিকে জয় দেখে তখন সে দিকেই ঝুঁকে পড়ে।
৫. ঠেকে মুসলমান: গোত্রের বা বংশের লোকেরা ইসলাম কবুল করায় তারাও মুসলিম সমাজে শামিল হয়ে গেল; কিন্তু জাহেলি যুগের রীতিনীতি, কুসংস্কার ও অভ্যাস ছেড়ে দিয়ে তাদের নাফস ইসলামের নৈতিক বিধান মেনে চলতে প্রস্তুত ছিল না। মুনাফিকরা ইসলামের প্রকাশ্য শত্রুর চেয়েও বেশি ভয়ঙ্কর। কারণ তারা মুসলিম সমাজে বসবাস করে; তাদের মোয়ামেলাত, লেনদেনসহ সামগ্রিক কার্যক্রম বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মুসলমানদের সাথেই হয়ে থাকে। ফলে মুসলিমদের সামগ্রিক কার্যক্রম সম্পর্কে তাদের জানাশোনার পরিমাণ হয় অনেক বেশি। আর তাই সুযোগ পেলেই সহজেই মুসলমানদের তথা ইসলামের ক্ষতি করার চেষ্টা করে। যেহেতু তারা মুসলিম সমাজেরই অংশ হয়ে বসবাস করে তাই অনেক ক্ষেত্রেই তাদের কপটতা সমূহ (প্রতারণার সমূহ) বুঝতে পারাটা মুসলমানদের জন্য হয় কষ্টসাধ্য। কিন্তু আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা মুনাফিকদের বহুরূপী চরিত্রের কথা বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন পবিত্র কোরআনে।
মুনাফিকদের মুখে এক আর অন্তরে ভিন্ন
মুনাফিকদের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হল তারা মুখে যা প্রকাশ করেন অন্তরে এর ভিন্নতা লালন করে। এবং তাদের কর্মের মাঝেই এই ভিন্নতা ফুটে ওঠে। তাদের এই চরিত্র সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
وَإِذَا لَقُوا الَّذِينَ آمَنُوا قَالُوا آمَنَّا وَإِذَا خَلَوْا إِلَىٰ شَيَاطِينِهِمْ قَالُوا إِنَّا مَعَكُمْ إِنَّمَا نَحْنُ مُسْتَهْزِئُونَ۞
“আর তারা যখন ঈমানদারদের সাথে মিশে, তখন বলে, আমরা ঈমান এনেছি। আবার যখন তাদের শয়তানদের সাথে একান্তে সাক্ষাৎ করে, তখন বলে, আমরা তোমাদের সাথে রয়েছি। আমরা তো (মুসলমানদের সাথে) উপহাস করি মাত্র।” (সূরা আল বাকারা: ১৪)
অন্য এক আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন: হে রাসূল, তাদের জন্যে দুঃখ করবেন না, যারা দৌড়ে গিয়ে কুফরে পতিত হয়; যারা মুখে বলে, আমরা মুসলমান, অথচ তাদের অন্তর মুসলমান নয় এবং যারা ইহুদি; মিথ্যাবলার জন্য তারা গুপ্তচরবৃত্তি করে। তারা অন্য দলের গুপ্তচর, যারা আপনার কাছে আসেনি। তারা বাক্যকে স্বস্থান থেকে পরিবর্তন করে। তারা বলে, যদি তোমরা এ নির্দেশ পাও, তবে কবুল করে নিও এবং যদি এ নির্দেশ না পাও, তবে বিরত থেকো। আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করতে চান, তার জন্য আল্লাহর কাছে আপনি কিছু করতে পারবেন না। এরা এমনিই যে, আল্লাহ এদের অন্তরকে পবিত্র করতে চান না। তাদের জন্য রয়েছে দুনিয়াতে লাঞ্ছনা এবং পরকালে বিরাট শাস্তি। (সূরা আল মায়িদাহ: ৪১)

মুনাফিকরা সন্দেহবাদী ও সংশয়কারী
যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নেতৃত্বে মুসলমানগণ সিদ্ধান্ত নিয়ে বদর অভিমুখে যুদ্ধ যাত্রা শুরু করলো; যেখানে মুসলিম যোদ্ধাদের সংখ্যা এবং সরঞ্জামাদির পরিমাণ ছিল কোরাইশ কাফেরদের তুলনায় অতি নগণ্য। তখন মুনাফিকরা এ কথা বলে বেড়াচ্ছিল যে, “এরা (মুসলমানরা) আসলে নিজেদের ধর্মীয় আবেগে উন্মাদ হয়ে গেছে। এ যুদ্ধে এদের ধ্বংস অনিবার্য। কিন্তু এ নবী সা.এদের কানে এমন মন্ত্র ফুঁকে দিয়েছে, যার ফলে এরা বুদ্ধিভ্রষ্ট হয়ে গেছে এবং সামনে মৃত্যুগুহা দেখেও তার মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ছে।” আর এ বিষয়টি উল্লেখ করতে গিয়ে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
إِذْ يَقُولُ الْمُنَافِقُونَ وَالَّذِينَ فِي قُلُوبِهِم مَّرَضٌ غَرَّ هَـٰؤُلَاءِ دِينُهُمْ ۗ وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَإِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٌ۞
“যখন মোনাফেকরা বলতে লাগল এবং যাদের অন্তর ব্যাধিগ্রস্ত, এরা নিজেদের ধর্মের উপর গর্বিত। বস্তুত যারা ভরসা করে আল্লাহর উপর, সে নিশ্চিন্ত, কেননা আল্লাহ অতি পরাক্রমশীল, সুবিজ্ঞ।” (সূরা আল আনফাল: ৪৯)
অন্য এক আয়াতে আল্লাহ মুনাফিকদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন-
وَإِذْ يَقُولُ الْمُنَافِقُونَ وَالَّذِينَ فِي قُلُوبِهِم مَّرَضٌ مَّا وَعَدَنَا اللَّهُ وَرَسُولُهُ إِلَّا غُرُورًا۞
“এবং যখন মুনাফিক ও যাদের অন্তরে রোগ ছিল তারা বলছিল, আমাদেরকে প্রদত্ত আল্লাহ ও রাসূলের প্রতিশ্রুতি প্রতারণা বৈ নয়।” (সূরা আল আহ্যাব: ১২)

মুনাফিকরা মিথ্যা কসমকারী
নবম হিজরিতে রাসূল সা. রোমের শাসক কায়সারের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেয়। পরবর্তীতে এটি যুদ্ধে রূপ ধারণ করেনি বরং অভিযানের মাঝে সীমাবদ্ধ ছিল। ইতিহাসে এটি তাবুক অভিযান নামে পরিচিত। তাবুক অভিযানের পূর্বে রাসূল সা.মুসলমানদের সর্বোচ্চ সহযোগিতার এবং যুদ্ধে অংশগ্রহণের আহ্বান জানান। রাসূল সা.এর আহবানে ৩০ হাজার মুসলিম সৈন্য যুদ্ধে অংশগ্রহণ করলেও অনেক মুনাফিক অভিযানে অংশগ্রহণ করেনি। রাসূল সা.তাবুক অভিযান শেষে মদিনায় ফিরলে, ঐসকল মুনাফিক যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করার কারণ স্বরূপ বিভিন্ন অজুহাত পেশ করতে থাকে। এবং তাদের অজুহাতগুলোকে বিশ্বাসযোগ্য করার জন্য মিথ্যা কসম কাটত (খেত)। আর তাদের এই মিথ্যা কসমের কথা পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে বলেন: তুমি যখন তাদের কাছে ফিরে আসবে, তখন তারা তোমাদের নিকট ছল-ছুতা নিয়ে উপস্থিত হবে; তুমি বলো, ছল কারো না, আমি কখনো তোমাদের কথা শুনব না; আমাকে আল্লাহ তা’আলা তোমাদের অবস্থা সম্পর্কে অবহিত করে দিয়েছেন। আর এখন তোমাদের কর্ম আল্লাহই দেখবেন এবং তাঁর রাসূল। তারপর তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে সেই গোপন ও অগোপন বিষয়ে অবগত সত্তার নিকট। তিনিই তোমাদের বাতলে দেবেন যা তোমরা করছিলে। এখন তারা তোমার সামনে আল্লাহর কসম খাবে, যখন তুমি তাদের কাছে ফিরে যাবে, যেন তুমি তাদের ক্ষমা করে দাও। সুতরাং তুমি তাদের ক্ষমা কর-নিঃসন্দেহে এরা অপবিত্র এবং তাদের কৃতকর্মের বদলা হিসাবে তাদের ঠিকানা হলো দোযখ। তারা তোমার সামনে কসম খাবে যাতে তুমি তাদের প্রতি রাযী হয়ে যাও। অতএব, তুমি যদি রাযী হয়ে যাও তাদের প্রতি তবু আল্লাহ তা’আলা রাযী হবেন না, এ নাফরমান লোকদের প্রতি। (সূরা আত তাওবাহ্: ৯৪-৯৬)
অন্য আয়াতে তাদের আরো একটি মিথ্যা অঙ্গীকারের কথা বলতে গিয়ে আল্লাহ বলেন-
وَمِنْهُم مَّنْ عَاهَدَ اللَّهَ لَئِنْ آتَانَا مِن فَضْلِهِ لَنَصَّدَّقَنَّ وَلَنَكُونَنَّ مِنَ الصَّالِحِينَ۞
فَلَمَّا آتَاهُم مِّن فَضْلِهِ بَخِلُوا بِهِ وَتَوَلَّوا وَّهُم مُّعْرِضُونَ۞
“তাদের মধ্যে কেউ কেউ রয়েছে যারা আল্লাহ তা’আলার সাথে ওয়াদা করেছিল যে, তিনি যদি আমাদের প্রতি অনুগ্রহ দান করেন, তবে অবশ্যই আমরা ব্যয় করব এবং সৎকর্মীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকব। অতঃপর যখন তাদেরকে স্বীয় অনুগ্রহের মাধ্যমে দান করা হয়, তখন তাতে কার্পণ্য করেছে এবং কৃত ওয়াদা থেকে ফিরে গেছে তা ভেঙ্গে দিয়ে।” (সূরা আত তাওবাহ্: ৭৫-৭৬)

মুনাফিকরা লোকদেখানো ইবাদত (কাজ) করে
রাসূল সা.এর মাদানী যুগটি ছিল ইসলামের বিধানসমূহ ক্রমান্বয়ে বাস্তবায়নের সময়। আর তখন কোন ব্যক্তি মুসলিম মিল্লাতের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সাথে সাথে নিয়মিত মসজিদে জামাতে নামাজে অংশগ্রহণ করাটা ছিল তার মুসলমানিত্বের একটি বাস্তবিক স্বাক্ষর। আর কোন মুসলমানের জামাতের সহিত নামাজে অংশগ্রহণ না করাটা ছিল তার ইসলামের প্রতি অনাগ্রহের একটি সুস্পষ্ট লক্ষণ। মুনাফিকরা মনে ইচ্ছার বিরুদ্ধে শুধুমাত্র মুসলিম সমাজে নিজেদের মুসলিম পরিচিতিকে বজায় রাখার জন্য জামায়াতে নামাজে অংশগ্রহণ করত। যাদের নামাজে ছিল না কোনো আন্তরিকতা, সবটুকুই হতো লোকদেখানো। আর তাদের এই লোকদেখানো ইবাদতের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে আল্লাহ বলেন-
إِنَّ الْمُنَافِقِينَ يُخَادِعُونَ اللَّهَ وَهُوَ خَادِعُهُمْ وَإِذَا قَامُوا إِلَى الصَّلَاةِ قَامُوا كُسَالَىٰ يُرَاءُونَ النَّاسَ وَلَا يَذْكُرُونَ اللَّهَ إِلَّا قَلِيلًا۞
“অবশ্যই মুনাফেকরা প্রতারণা করছে আল্লাহর সাথে, অথচ তারা নিজেরাই নিজেদের প্রতারিত করে। বস্তুত তারা যখন নামাযে দাঁড়ায় তখন দাঁড়ায়, একান্ত শিথিলভাবে লোকদেখানোর জন্য। আর তারা আল্লাহকে অল্পই স্মরণ করে।” (সূরা আন নিসা: ১৪২)
মুনাফিকদের এই লোকদেখানো সালাত সম্পর্কে আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত হাদীসে রাসূল সা.বলেন, “ইহা হলো মুনাফিকদের সালাত, মুনাফিকদের সালাত, মুনাফিকদের সালাত; পশ্চিম দিগন্তে শয়তানের দুটি সিং এর মাঝখান দিয়ে সূর্য অস্ত যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সে অপেক্ষা করতে থাকে। অতঃপর দাঁড়িয়ে তাড়াহুড়া করে চার রাকাত (আসর) সালাত আদায় করে; তাতে হ খুব কমই আল্লাহর নাম স্মরণ করা হয়।” (মুয়াত্তা-১/২২০, মুসলিম-১/৪৩৪, তিরমিজি- ১/৪৯৭)

মুনাফিকরা সুযোগ সন্ধানী
মুনাফিকদের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো তারা সব সময় সুযোগসন্ধানী হয়ে থাকে। যে পক্ষ বিজয়ী হয় মুনাফিকরা সেই পক্ষকেই তোষামোদ করে তাদের আস্থাভাজন রূপে নিজেদের প্রকাশ করতে চাই। তাই কোন যুদ্ধে মুসলমানরা বিজয় লাভ করলে মুনাফিকরা মুসলিমদের নিকট এসে বলতো, “আমরা কি তোমাদের সঙ্গে ছিলাম না?” আবার যদি কখনো যুদ্ধে কাফেররা বিজয়ী হতো তবে মুনাফিকরা গোপনে তাদের নিকট গিয়ে বলতো, “আমরাতো গোপনে তোমাদেরকেই সাহায্য করেছি এবং সর্বদা মুসলমানদের ক্ষতি সাধনের চেষ্টা করেছি। এটা ছিল আমাদের একটা কৌশল। যার বলে তোমরা বিজয় লাভ করেছ।”
আর মুনাফিকদের সুযোগ-সন্ধানী চরিত্রের কথা উল্লেখ করে আল্লাহ বলেন-
الَّذِينَ يَتَرَبَّصُونَ بِكُمْ فَإِن كَانَ لَكُمْ فَتْحٌ مِّنَ اللَّهِ قَالُوا أَلَمْ نَكُن مَّعَكُمْ وَإِن كَانَ لِلْكَافِرِينَ نَصِيبٌ قَالُوا أَلَمْ نَسْتَحْوِذْ عَلَيْكُمْ وَنَمْنَعْكُم مِّنَ الْمُؤْمِنِينَ ۚ فَاللَّهُ يَحْكُمُ بَيْنَكُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ۗ وَلَن يَجْعَلَ اللَّهُ لِلْكَافِرِينَ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ سَبِيلًا۞
“এরা এমনি মুনাফেক যারা তোমাদের কল্যাণ-অকল্যাণের প্রতীক্ষায় ওৎ পেতে থাকে। অতঃপর আল্লাহর ইচ্ছায় তোমাদের যদি কোন বিজয় অর্জিত হয়, তবে তারা বলে, আমরাও কি তোমাদের সাথে ছিলাম না? পক্ষান্তরে কাফেরদের যদি আংশিক বিজয় হয়, তবে বলে, আমরা কি তোমাদেরকে ঘিরে রাখিনি এবং মুসলমানদের কবল থেকে রক্ষা করিনি? সুতরাং আল্লাহ তোমাদের মধ্যে কেয়ামতের দিন মীমাংসা করবেন এবং কিছুতেই আল্লাহ কাফেরদেরকে মুসলমানদের উপর বিজয় দান করবেন না।” (সূরা আন নিসা: ১৪১)

মুনাফিকরা সত্যের শত্রু এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টিকারী
মুনাফিকরা মুখে সদিচ্ছা প্রকাশ করলেও তাদের হৃদয়ে রয়েছে সত্যের প্রতি চরম বিদ্বেষ। আর পৃথিবীতে তারা কর্তৃত্ব পেলেই সৃষ্টি করে বিপর্যয়। এ বিষয়ে আল্লাহ বলেন-
وَمِنَ النَّاسِ مَن يُعْجِبُكَ قَوْلُهُ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَيُشْهِدُ اللَّهَ عَلَىٰ مَا فِي قَلْبِهِ وَهُوَ أَلَدُّ الْخِصَامِ۞ وَإِذَا تَوَلَّىٰ سَعَىٰ فِي الْأَرْضِ لِيُفْسِدَ فِيهَا وَيُهْلِكَ الْحَرْثَ وَالنَّسْلَ ۗ وَاللَّهُ لَا يُحِبُّ الْفَسَادَ۞ وَإِذَا قِيلَ لَهُ اتَّقِ اللَّهَ أَخَذَتْهُ الْعِزَّةُ بِالْإِثْمِ ۚ فَحَسْبُهُ جَهَنَّمُ ۚ وَلَبِئْسَ الْمِهَادُ۞
“আর এমন কিছু লোক রযেছে যাদের পার্থিব জীবনের কথাবার্তা তোমাকে চমৎকৃত করবে। আর তারা সাক্ষ্য স্থাপন করে আল্লাহকে নিজের মনের কথার ব্যাপারে। প্রকৃতপক্ষে তারা কঠিন ঝগড়াটে লোক। যখন ফিরে যায় তখন চেষ্টা করে যাতে সেখানে অকল্যাণ সৃষ্টি করতে পারে এবং শস্যক্ষেত্র ও প্রাণনাশ করতে পারে। আল্লাহ ফাসাদ ও দাঙ্গা-হাঙ্গামা পছন্দ করেন না। আর যখন তাকে বলা হয় যে, আল্লাহকে ভয় কর, তখন তার পাপ তাকে অহঙ্কারে উদ্বুদ্ধ করে। সুতরাং তার জন্যে দোযখই যথেষ্ট। আর নিঃসন্দেহে তা হলো নিকৃষ্টতর ঠিকানা।” (সূরা আল বাকারা: ২০৪-২০৬)

মুনাফিকরা জিহাদকে ভয় পায়
ইসলামে মুমিন ও মুনাফিকের মাঝে পার্থক্যকারী একটি কর্মসূচি হল জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ। অর্থাৎ আল্লাহর পথে জান ও মাল দিয়ে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো। যে প্রচেষ্টা করতে গিয়ে নিজের সম্পদ (মাল) হারানোর ও জীবন বিপন্নের সম্ভাবনা থাকে। আর যারা দুনিয়াপূজারি তারা কখনো জান ও মালের ক্ষতির সম্মুখীন হতে চাই না। যখন ওহুদ যুদ্ধের ঘোষণা হল তখন রাসূল (সা)-এর নেতৃত্বে ১০০০ জন মুসলিম ওহুদ প্রান্তরের দিকে যাত্রা করল। মাঝপথে মুনাফিক সর্দার আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের নেতৃত্বে ৩০০ জন মুনাফিক যুদ্ধযাত্রা থেকে ফিরে যেতে উদ্যত হলো। তখন কিছু মুসলিম আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইকে বুঝিয়ে মুসলিম যুদ্ধ বাহিনীতে ফেরানোর চেষ্টা করে। তখন আবদুল্লাহ ইবনে উবাই সেনাদলে ফেরার পরিবর্তে এই জবাব দিল যে, “আমার নিশ্চিত বিশ্বাস আজ যুদ্ধ হবে না, তাই আমরা চলে যাচ্ছি। নয়তো আজও যুদ্ধ হবার আশা থাকলে আমরা অবশ্যই তোমাদের সাথে চলে যেতাম।”
আর মুনাফিক নেতার বক্তব্যের কারণ উল্লেখ করতে গিয়ে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন: এবং তাদেরকে যাতে শনাক্ত করা যায় যারা মুনাফিক ছিল। আর তাদেরকে বলা হল এসো, আল্লাহর রাহে লড়াই কর কিংবা শত্রুদিগকে প্রতিহত কর। তারা বলেছিল, আমরা যদি জানতাম যে, লড়াই হবে, তাহলে অবশ্যই তোমাদের সাথে থাকতাম। সে দিন তারা ঈমানের তুলনায় কুফরির কাছাকাছি ছিল, যা তাদের অন্তরে নেই তারা নিজের মুখে সে কথাই বলে বস্তুত আল্লাহ ভালোভাবে জানেন তারা যা কিছু গোপন করে থাকে। (সূরা আলে ইমরান: ১৬৭)
আবার পঞ্চম/ ষষ্ঠ হিজরিতে যখন খন্দক যুদ্ধের দামামা বেজে উঠল। মক্কার কোরাইশ কাফেররা দলবল নিয়ে মদিনার সীমান্তে অবস্থান নিলো। এমনকি মুসলমানদের সাথে পূর্ব থেকে বহাল থাকা চুক্তি ভঙ্গ করে ইহুদি গোত্র বনু কুরাইজা অবস্থান নিলো মক্কার কাফেরদের পক্ষে। তখন মদিনায় মুসলিম বাহিনীতে ঘাপটি মেরে থাকা মুনাফিকরা যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করার বাহানা বের করল। তারা আল্লাহর রাসূল সা.এর নিকট যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করার ছুটি চাইতে লাগলো। আর অজুহাত হিসেবে পেশ করলো যে, ‘(যেহেতু বনু কুরাইযা চুক্তি ভঙ্গ করে কাফেরদের সাথে হাত মিলিয়েছে তাই) এখন তো আমাদের ঘরই বিপদের মুখে পড়ে গিয়েছে, কাজেই ঘরে ফিরে গিয়ে আমাদের নিজেদের পরিবার ও সন্তানদের হেফাজত করায় সুযোগ দেওয়া উচিত।’ অথচ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকল মদিনাবাসীর হেফাজতের জন্যই পরিখা খননসহ সামগ্রিক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। আর মুনাফিকদের এহেন আচরণের কথা এবং এর কারণ উল্লেখ করতে গিয়ে আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা বলেন-
وَإِذْ قَالَت طَّائِفَةٌ مِّنْهُمْ يَا أَهْلَ يَثْرِبَ لَا مُقَامَ لَكُمْ فَارْجِعُوا ۚ وَيَسْتَأْذِنُ فَرِيقٌ مِّنْهُمُ النَّبِيَّ يَقُولُونَ إِنَّ بُيُوتَنَا عَوْرَةٌ وَمَا هِيَ بِعَوْرَةٍ ۖ إِن يُرِيدُونَ إِلَّا فِرَارًا۞
“এবং যখন তাদের একদল বলেছিল, হে ইয়াসরিববাসী, এটা টিকবার মত জায়গা নয়, তোমরা ফিরে চল। তাদেরই একদল নবীর কাছে অনুমতি প্রার্থনা করে বলেছিল, আমাদের বাড়ি-ঘর খালি, অথচ সেগুলো খালি ছিল না, পলায়ন করাই ছিল তাদের ইচ্ছা।” (সূরা আল আহ্জাব: ১৩)
আবার পরবর্তী আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মুনাফিকদের প্রকৃত চরিত্রের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে বলেন-
وَلَوْ دُخِلَتْ عَلَيْهِم مِّنْ أَقْطَارِهَا ثُمَّ سُئِلُوا الْفِتْنَةَ لَآتَوْهَا وَمَا تَلَبَّثُوا بِهَا إِلَّا يَسِيرًا۞
“যদি শত্রুপক্ষ চতুর্দিক থেকে নগরে প্রবেশ করে তাদের সাথে মিলিত হতো, অতঃপর বিদ্রোহ করতে প্ররোচিত করত, তবে তারা অবশ্যই বিদ্রোহ করত এবং তারা মোটেই বিলম্ব করত না।” (সূরা আল আহ্যাব: ১৪)
উপরোক্ত আয়াতে ‘শত্রুরা ঢুকে পড়তো এবং সে সময় তাদেরকে ফিতনা সৃষ্টি করার জন্য আহ্বান জানানো হতো’ বলার মাধ্যমে কাফেরদের মদিনায় প্রবেশ এবং মুসলিম নিধনের জন্য মুনাফিকদের আহ্বান করাকে বুঝানো হয়েছে। আর যদি এমন হতো তবে কাফেরদের ডাকে সাড়া দিয়ে মুনাফিকরা মুসলিম নিধনে অংশগ্রহণ করতো বলেই আল্লাহ উল্লেখ করেছেন।
নবম হিজরিতে তাবুক অভিযানের উদ্দেশ্যে যখন রাসূল সা. যাত্রা করলেন, তখন সাথে অনেক মুনাফিকও অংশগ্রহণ করলো। রাসূল সা. সানিয়াতুল ওয়াদা নামক পার্বত্য পথ দিয়ে সেনাবাহিনীসহ চলতে লাগলেন, যা মদিনার উপকণ্ঠে অবস্থিত ছিল। মুনাফিক সর্দার আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই তার দলবলকে মুসলমানদের মূল বাহিনী থেকে বিচ্ছিন্ন করে ভিন্নপথে সানিয়াতুল ওয়াদার নিচ দিয়ে নিয়ে গেল। যে পথটি গিয়েছে জুবার পর্বতের দিকে। অতঃপর যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী অনেক দূর এগিয়ে গেল, তখন আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই তার দলবল নিয়ে মদিনায় ফিরে গেল। এভাবেই লুকোচুরি করে জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহর কাজ থেকে বিরত থাকলো মুনাফিকরা।

মুনাফিকদের ইসলাম বিদ্বেষ
মুনাফিকদের কার্যক্রম শুধুমাত্র ঈমানের দুর্বলতা প্রদর্শন ও ইসলামের নিয়ম-কানুন পালনে শৈথিল্য প্রদর্শনের মাঝে সীমাবদ্ধ নয়। বরং সুযোগ পেলেই ইসলাম ও মুসলমানদের ক্ষতি করা তাদের অন্যতম লক্ষ্য। যা তাদের ইসলাম বিদ্বেষের বহিঃপ্রকাশ। ষষ্ঠ হিজরিতে বনু মুস্তালিক গোত্রে অভিযান চালান রাসূল সা.। ওই অভিযানে রাসূল সা.-এর স্ত্রী হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা তার সঙ্গী হিসাব ছিল। অভিযান থেকে ফেরার পথে হযরত আয়শা (রা) মুসলিম কাফেলা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। পরবর্তীতে সাহাবী হযরত সাফওয়ান ইবনে মায়াত্তাল সুলামি (রা) এর সহযোগিতায় কাফেলার সাথে যুক্ত হোন তিনি। ঘটনাটি বর্ণনা করতে গিয়ে হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, বনু মুসতালিক অভিযান শেষে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রত্যাবর্তনকালে মদিনার নিকটে এসে এক জায়গায় একরাত কাটালেন। তারপর আবার যাত্রার ঘোষণা হলে সদলবলে যাত্রা শুরু হলো। এই সময় আমি প্রকৃতির ডাকে বাইরে গিয়েছিলাম। আমার গলায় একটা ইয়ামানি মুক্তার মালা ছিল। প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিয়ে ফিরে আসার পর আমি দেখলাম যে, সেই হার আমার গলায় নেই। কখন যে তা পরে গেছে আমি মোটেই টের পাইনি। অগত্যা আমি তা খুঁজতে আবার কাফেলা থেকে বেরিয়ে যেখানে প্রকৃতির ডাকে গিয়েছিলাম সেখানে ফিরে গেলাম। ইতোমধ্যে কাফেলা যাত্রার আয়োজন করলো। আমি হারটি খুঁজে পেলাম। যারা আমার উটের হাওদা উঠায় তারা আমার উটের কাছে এসে যথারীতি হুদাটা উঠিয়ে দিল। ততক্ষণে তাদের যাত্রার প্রস্তুতি শেষ হয়েছে। তারা যখন হাওদা উঠালো, তখন ভাবলো আমি যথারীতি হাওদার ভেতরেই আছি। তাই তারা হাওদা উঠিয়ে তা উটের সাথে বেঁধে দিল। আমার হাওদার অবস্থান সম্পর্কে তাদের মোটেই সন্দেহ হলো না। তারপর তারা উট হাঁকিয়ে যাত্রা করলো। আমি হার কুড়িয়ে নিয়ে যখন কাফেলায় রাত্রি যাপন স্থানে ফিরে এলাম তখন ময়দান ফাঁকা। সেখানে কেউ নেই। সমগ্র কাফেলা রওনা হয়ে গেছে। অনন্যোপায় হয়ে আমি চাদর মুড়ি দিয়ে ঐ স্থানেই শুয়ে রইলাম। ভাবলাম আমার অনুপস্থিতি দেখলে তারা অবশ্যই আমার খোঁজে ফিরে আসবে। আমি তখনো শুয়ে আছি। দেখলাম সাফওয়ান ইবনে মুয়াল্লাল সুলামি আমার কাছ দিয়ে যাচ্ছে। সেও কোন প্রয়োজনে কাফেলা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। সে কাফেলার সাথে রাত যাপনও করেনি। দূর থেকে আমাকে দেখে সে এগিয়ে এলো এবং আমার আছে এসে দাঁড়ালো। পর্দার হুকুম নাযিল হবার আগে সে আমাকে দেখেছিল। সে আমাকে দেখেই বলে উঠলো, “ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। এ যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রী।” আমি তখনো কাপড়ে আবৃত। সে বললো, “আল্লাহ আপনার ওপর রহমত বর্ষণ করুন। আপনি কিভাবে পেছনে পড়লেন?” আমি তার সাথে কোন কথা বললাম না। অতঃপর সে উট এগিয়ে দিয়ে বললো, “আরোহণ করুন।” সে একটু দূরে সরে গেল। আমি উটের পিঠে সওয়ার হলাম। আর সে উটের মাথা ধরে কাফেলার দিকে দ্রুত এগিয়ে চললো। এবাবে সকাল হলো। লোকজন এক জায়গায় বিশ্রাম করছিলো। এমন সময় সে আমাকে উটের পিঠে চড়িয়ে নিয়ে হাজির হলো। এই দৃশ্য দেখেই অপবাদ আরোপকারীরা অপবাদ রটালো। মুসলমানদের মধ্যে তা নিয়ে চাঞ্চল্য ও হুলস্থল পড়ে গেল। কিন্তু আমি কিছুই জানতে পারলাম না।
আর এই অপবাদ রটনার প্রধান ও নেপথ্য নায়ক ছিল মুনাফিক সর্দার আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই। তার সাথে সহযোগী হিসেবে ছিল খাজরাজ গোত্রের কিছু মুনাফিক। পরবর্তীতে আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা কোরআন নাযিলের মাধ্যমে এই মিথ্যা অপবাদের মুখোশ উন্মোচন করেন। এ বিষয়ে পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে যে-
“যারা (নবী পরিবার সম্পর্কে) মিথ্যা অপবাদ রটনা করেছে, তারা তোমাদেরই একটি দল। তোমরা এ (বিষয়টি)-কে নিজেদের জন্যে খারাপ মনে করো না; বরং এটা তোমাদের জন্যে মঙ্গলজনক। তাদের প্রত্যেকের জন্যে ততটুকু আছে যতটুকু সে গোনাহ করেছে এবং তাদের মধ্যে যে এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছে, তার জন্যে রয়েছে বিরাট শাস্তি। তোমরা যখন এ (মিথ্যা ঘটনা)-টি শুনলে, তখন ঈমানদার পুরুষ ও নারীগণ কেন নিজেদের লোক সম্পর্কে উত্তম ধারণা করনি এবং বলনি যে, এটা তো নির্জলা অপবাদ?” (আন নূর: ১১-১২)
নবম হিজরিতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাবুক অভিযানে যাওয়ার সময় তার পরিবার-পরিজনকে তত্ত্বাবধানের জন্য হযরত আলী ইবনে আবু তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু কে মদিনায় রেখে যান। হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুর মদিনায় থেকে যাওয়া নিয়ে অপবাদ রটনা করতে থাকলো মুনাফিকরা। তারা এই বলে অপবাদ রটানো যে, ‘আলিকে অলস মনে করে তার থেকে অব্যাহতি লাভের জন্যই রাসূল সা. তাকে (আলীকে) রেখে গিয়েছেন।’ তাবুক অভিযানের প্রস্তুতির জন্য রাসূল সা.সহযোগিতার জন্য মুসলমানদের আহ্বান জানান। মুনাফিকদের মাঝে অনেক বড় বড় ধনশালী ছিল, তবে তারা ন্যূনতম সহযোগিতাও করেনি। বরং নিষ্ঠাবান মুসলমানগণ যখন সহযোগিতার হাত বাড়ালো, তা নিয়ে বিদ্রƒপে মেতে উঠলো মুনাফিকরা। অনেক সামর্থ্যবান মুসলমান নিজেদের অবস্থানের আলোকে বা তার চেয়েও বেশি সহযোগিতা নিয়ে এগিয়ে আসলো। আর এসকল মুসলমানদের এ বলে মুনাফিকরা অপবাদ দিত যে, “তারা লোক দেখানোর ও সুনাম কুড়াবার জন্য এ পরিমাণ দান করেছে।” আবার অনেক দরিদ্র মুসলমান ছিল যারা অনেক মেহনত করে উপার্জিত কিছু খেজুর অথবা নিজে ও পরিবারের সদস্যরা অভুক্ত থেকে কিছু টাকা জমিয়ে তা নিয়ে রাসূল সা.এর নিকট হাজির হতো। আরে সকল গরিব মুসলমানকে উদ্দেশ করে মুনাফিকরা বলতো, ‘সাবাস এবার এক ফড়িংয়ের ঠ্যাং পাওয়া গেল। এ দিয়ে রুমের দুর্গ জয় করা যাবে।’ মুনাফিকদের এসকল অপবাদ ও ঠাট্টা-বিদ্রƒপের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে আল্লাহ বলেন-
الَّذِينَ يَلْمِزُونَ الْمُطَّوِّعِينَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ فِي الصَّدَقَاتِ وَالَّذِينَ لَا يَجِدُونَ إِلَّا جُهْدَهُمْ فَيَسْخَرُونَ مِنْهُمْ ۙ سَخِرَ اللَّهُ مِنْهُمْ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ۞
“সে সমস্ত লোক যারা ভর্ৎসনা-বিদ্রƒপ করে সেসব মুসলমানদের প্রতি যারা মন খুলে দান-খয়রাত করে এবং তাদের প্রতি যাদের কিছুই নেই শুধুমাত্র নিজের পরিশ্রমলব্ধ বস্তু ছাড়া। অতঃপর তাদের প্রতি ঠাট্টা করে। আল্লাহ তাদের প্রতি ঠাট্টা করেছেন এবং তাদের জন্য রয়েছে বেদনাদায়ক আযাব।” (সূরা আত তাওবাহ্: ৭৯)
তা ছাড়া তাবুক অভিযানকালে মুসলমানদের মনোবল ভেঙে দেওয়ার লক্ষ্যে মুনাফিকরা বিদ্রুপ করত। তখন এক মজলিসে আড্ডারত মুনাফিকদের একজন বলল, ‘আরে এ রোমানদেরকেও কি তোমরা (মুসলমানরা) আরবদের মত মনে করছো? কালকে দেখে নিও যেসব বীর বাহাদুর লড়তে এসেছেন, এদের সবাইকেই রশি দিয়ে বেঁধে রাখা হবে।’ দ্বিতীয় একজন বলল, ‘মজা হবে তখন যখন একশটি করে চাবুক মারার নির্দেশ দেওয়া হবে।’
তারা বিদ্রুপ করা থেকে বাদ দেয়নি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকেও। রাসূল সা. কে অভিযানের প্রস্তুতিতে তৎপর দেখে এক মুনাফিক বন্ধুদের বলে উঠলো: ‘উনাকে দেখো উনি রোম ও সিরিয়ার দুর্গ জয় করতে চলেছেন।’ তাবুক যাওয়ার পথে রাসূল সা.এর উট হারিয়ে যায় এবং সাহাবীগণ তা খুঁজতে লাগলেন। আর রাসূলের সা. উট হারানোর কথা জেনে যায়িদ ইবনে লুছাইত নামক এক মুনাফিক তার গোত্র বনু কাইনুকা লোকদের বলল: ‘আচ্ছা মোহাম্মদ তো দাবি করেন যে, তিনি নবী এবং তিনি তোমাদেরকে আকাশের খবর জানান। তিনি এতটুকু জানেন না যে তার উট কোথায়?’ এভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাহাবীদের সম্পর্কে বিভিন্ন অপবাদ রটানো এবং তাদেরকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য ও বিদ্রুপ করার মাধ্যমে ইসলাম ও মুসলমানদের ক্ষতি করার চেষ্টা করত মুনাফিকরা।
তাবুক অভিযান শেষে মদিনার দিকে যাত্রা করেন রাসূল সা.-এর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী। পথিমধ্যে একটি ক্ষুদ্র পাহাড়ি ঝরনা ছিল, যেটি ওয়াদিউল মুশাককাক নামক উপত্যকায় অবস্থিত। ঝরনার পানির পরিমাণ ছিল খুবই সীমিত, যা দ্বারা দুই থেকে তিনজন পিপাসা মেটাতে পারে। অথচ মুসলিম বাহিনীর অনেকেই ছিল তৃষ্ণার্ত। তাই রাসূল সা. কাফেলার উদ্দেশ্যে বললেন, “আগে যারা ঐ উপত্যকায় পৌঁছবে, তারা যেন আমার না আসা পর্যন্ত পানি পান না করে (বরং) অপেক্ষা করে।” কিন্তু একদল মুনাফিক সবার আগে ওই স্থানে পৌঁছে এবং সবটুকু পানি পান করে ফেলে। রাসূল সা. ঝরনার নিকট এসে কোন পানি না দেখে বললেন, আমাদের আগে এখানে কে এসেছে? সাহাবিগণ তাকে কিছু মুনাফিকের কথা জানান। তখন রাসূল সা. বললেন, “আমি তো নিষেধ করেছিলাম যে, আমি এসে পৌঁছার আগে কেউ পানি পান করবে না।” অতঃপর তিনি ঐসকল মুনাফিককে অভিশাপ দেন এবং তাদের জন্য বদদোয়া করেন।
এভাবেই রাসূলের সা. আনুগত্য হীনতার মাধ্যমে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির লক্ষ্যে ইসলামের বিরোধিতা করে মুনাফিকরা। মুনাফিকদের এই ইসলামবিদ্বেষ এতোটুকুর মাঝে সীমাবদ্ধ থাকেনি বরং তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও মুসলমানদের হত্যা করার ষড়যন্ত্রও করেছিল। তাবুক অভিযান শেষে ফেরার পথে এক পাহাড়ি পথের নিকট পৌঁছলো মুসলিম সেনাদল। তখন কিছু মুনাফিক মিলে এই সংকল্প করল যে, ‘রাতে উঁচু গিরিপথ দিয়ে চলার সময় রাসূল সা.-কে পার্শ্ববর্তী গভীর খাদে মাঝে ফেলে দিবে তারা।’ রাসূল সা. এ কথা জানতে পেরে মুসলিম সেনাদলকে গিরিপথের পরিবর্তে উপত্যকার সমতলভূমি দিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত দিলেন। শুধুমাত্র রাসূল সা. নিজে সাথে দু’জন সাহাবী আম্মার ইবনে ইয়াসির ও হুজাইফা ইবনে আমানকে নিয়ে গিরিপথে চলতে লাগলেন। মাঝপথে জানতে পারলেন মুখোশ পরে দশ-বারোজন মোনাফিক তাদের পেছনে পেছনে আসছে। এমতাবস্থায় মুনাফিকদের লক্ষ্য করে ছুটে গেলেন হযরত হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু আনহু। দূর থেকে তাদের দিকে এগিয়ে আসা হুজাইফাকে (রা) দেখে ফেলে মুনাফিকরা। ফলে প্রাণ ভয়ে ও ধরা পড়ার লজ্জায় পালিয়ে যায় তারা। চতুর্থ হিজরিতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পাথর নিক্ষেপে হত্যার ষড়যন্ত্র এবং চুক্তি ভঙ্গের দায়ে ইহুদি গোত্র বনু নাজিরকে ১০ দিনের মাঝে মদিনা ছেড়ে যাওয়ার নোটিশ দেন আল্লাহ রাসূল (সা)। অন্যথায় মুসলমানদের পক্ষ থেকে অবরোধের সিদ্ধান্তও জানানো হয় তাদের। তখন মুনাফিক সর্দার আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই ও তার সহযোগী মুনাফিক নেতারা বনু নজিরকে মদিনা ছেড়ে যেতে নিষেধ করে। এবং এই বলে সাহস যোগালো যে, ‘আমরা দুই হাজার লোক নিয়ে তোমাদেরকে সাহায্য করার জন্য আসব। আর বনি কুরাইজা এবং বনি গাতফানও তোমাদের সাহায্যে এগিয়ে আসবে। অতএব তোমরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াও এবং কোন অবস্থায় তাদের কাছে আত্মসমর্পণ করো না। তারা তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করলে আমরাও তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করবো। আর তোমরা এখান থেকে বহিষ্কৃত হলে আমরাও চলে যাবো।’
আর মুনাফিকদের এই ভূমিকার কথা বর্ণনা করতে গিয়ে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন-
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ نَافَقُوا يَقُولُونَ لِإِخْوَانِهِمُ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ لَئِنْ أُخْرِجْتُمْ لَنَخْرُجَنَّ مَعَكُمْ وَلَا نُطِيعُ فِيكُمْ أَحَدًا أَبَدًا وَإِن قُوتِلْتُمْ لَنَنصُرَنَّكُمْ وَاللَّهُ يَشْهَدُ إِنَّهُمْ لَكَاذِبُونَ۞
“আপনি কি মুনাফিকদেরকে দেখেননি? তারা তাদের কিতাবধারী কাফের ভাইদেরকে বলে, তোমরা যদি বহিষ্কৃত হও, তবে আমরা অবশ্যই তোমাদের সাথে দেশ থেকে বের হয়ে যাব এবং তোমাদের ব্যাপারে আমরা কখনও কারও কথা মানব না। আর যদি তোমরা আক্রান্ত হও, তবে আমরা অবশ্যই তোমাদেরকে সাহায্য করব। আল্লাহ তা’আলা সাক্ষ্য দেন যে, ওরা নিশ্চয়ই মিথ্যাবাদী।” (আল হাশ্র: ১১)
মুনাফিকরা ইহুদিদের এই সহযোগিতার আশ্বাস দেয়ার মাধ্যমে তারা যে ইসলামের চরম বিরোধী এবং শত্রু এর প্রমাণ দিল। আর বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করে নিলো আহলে কিতাবদের। অথচ ঈমানদারদের প্রতি আল্লাহর নির্দেশ হলো তারা যেন ইহুদি ও খ্রিস্টানদের নিজেদের বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করে না নেই। এ বিষয়ে আল্লাহ বলেন-
۞ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا الْيَهُودَ وَالنَّصَارَىٰ أَوْلِيَاءَ ۘ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ ۚ وَمَن يَتَوَلَّهُم مِّنكُمْ فَإِنَّهُ مِنْهُمْ ۗ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ۞
“হে মুমিণগণ! তোমরা ইহুদি ও খ্রিষ্টানদেরকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করো না। তারা একে অপরের বন্ধু। তোমাদের মধ্যে যে তাদের সাথে বন্ধুত্ব করবে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ জালেমদেরকে পথ প্রদর্শন করেন না।” (সূরা আল মায়িদাহ: ৫১)
উপরোক্ত আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মুনাফিকদেরকে ইহুদি ও খ্রিস্টানদের (কাফেরদের) অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য করেছেন। আর যারা কাফেরদের বন্ধু হিসেবে গণ্য হয়, তাদের পরিণতির কথা বলতে গিয়ে আল্লাহ বলেন-
بَشِّرِ الْمُنَافِقِينَ بِأَنَّ لَهُمْ عَذَابًا أَلِيمًا۞
“সেসব মুনাফেককে সুসংবাদ শুনিয়ে দিন যে, তাদের জন্য নির্ধারিত রয়েছে বেদনাদায়ক আযাব।” (সূরা আন নিসা: ১৩৮)

মুনাফিকদের পরিণতি
ঈমান আনয়নের পর একজন ঈমানদারের কাজ হচ্ছে ক্রমান্বয়ে ইসলামের বিধিনিষেধগুলো নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করা। এবং ইসলাম গ্রহণের পূর্বেকার কুফরি কার্যক্রমগুলো পরিহার করা। কিন্তু মুনাফিকদের অবস্থান ঠিক এই নীতির বিপরীতে। তারা ঈমান আনয়নের পরও লিপ্ত থেকেছে কুফরিতে। আবার বারবার ঈমানের উপর সুদৃঢ় থাকার সংকল্প করেও পুনরায় লিপ্ত হয়েছে কুফরি কর্মকাণ্ডে। তাদের এহেন আচরণের কারণে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তাদেরকে পথভ্রষ্ট বলে উল্লেখ করে তাদেরকে ক্ষমা করবেন না বলেও ঘোষণা দিয়েছেন এ বিষয়ে কোরআনে বর্ণিত হয়েছে যে-
إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا ثُمَّ كَفَرُوا ثُمَّ آمَنُوا ثُمَّ كَفَرُوا ثُمَّ ازْدَادُوا كُفْرًا لَّمْ يَكُنِ اللَّهُ لِيَغْفِرَ لَهُمْ وَلَا لِيَهْدِيَهُمْ سَبِيلًا۞
“যারা একবার মুসলমান হয়ে পরে পুনরায় কাফের হয়ে গেছে, আবার মুসলমান হয়েছে এবং আবারো কাফের হয়েছে এবং কুফরিতেই উন্নতি লাভ করেছে, আল্লাহ তাদেরকে না কখনও ক্ষমা করবেন, না পথ দেখাবেন।” (সূরা আন নিসা : ১৩৭)
مُّذَبْذَبِينَ بَيْنَ ذَٰلِكَ لَا إِلَىٰ هَـٰؤُلَاءِ وَلَا إِلَىٰ هَـٰؤُلَاءِ ۚ وَمَن يُضْلِلِ اللَّهُ فَلَن تَجِدَ لَهُ سَبِيلًا۞
“এরা দোদুল্যমান অবস্থায় ঝুলন্ত; এদিকেও নয় ওদিকেও নয়। বস্তুত যাকে আল্লাহ গোমরাহ করে দেন, তুমি তাদের জন্য কোন পথই পাবে না কোথাও।” (সূরা আন নিসা: ১৪৩)
মুনাফিকদের এই পথভ্রষ্টতার অন্যতম কারণ হচ্ছে তাদের দ্বিমুখী নীতি। আর এ বিষয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “মুনাফিকদের অবস্থা হচ্ছে দুটি পালের মধ্যবর্তী ছাগলের ন্যায়, যা ভ্যা-ভ্যা করতে করতে কখনো এ পালের দিকে দৌড় দেয় এবং কখনও ঐ পালের দিকে দৌড় দেয়। যে এখনো স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেনি যে এর পেছনে যাবে নাকি ওর পিছনে যাবে।” (মুসলিম-৪/২১৪৬, তাবারী-৯/৩৩৩)
অন্য এক জায়গায় আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেছেন ঈমান আনার পর পুনরায় কুফরি পন্থা অবলম্বনের কারণে মুনাফিকদের তওবা কবুল করা হবে না। এ বিষয়ে আল্লাহ বলেন-
“অবশ্যই যারা একবার ঈমান আনার পর কুফরীর (পথ) অবলম্বন করেছে, অতঃপর তারা এই বেঈমানি (কার্যকলাপ) দিন দিন বাড়াতেই থেকেছে, (আল্লাহর দরবারে) তাদের তওবা কখনো কবুল হবে না, কারণ এ ধরনের লোকেরাই হচ্ছে পথভ্রষ্ট।” (আল ইমরান: ৯০)
মুনাফিকদের তওবা যেমন কবুল হবে না, আবার তাদের মাগফিরাতের জন্য রাসূলের সা. দোয়াও কাজে আসবে না। এ বিষয়ে আল্লাহ বলেন-
اسْتَغْفِرْ لَهُمْ أَوْ لَا تَسْتَغْفِرْ لَهُمْ إِن تَسْتَغْفِرْ لَهُمْ سَبْعِينَ مَرَّةً فَلَن يَغْفِرَ اللَّهُ لَهُمْ ۚ ذَٰلِكَ بِأَنَّهُمْ كَفَرُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ ۗ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفَاسِقِينَ۞
“তুমি তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর আর না কর। যদি তুমি তাদের জন্য সত্তর বারও ক্ষমা প্রার্থনা কর, তথাপি কখনোই তাদেরকে আল্লাহ ক্ষমা করবেন না। তা এজন্য যে, তারা আল্লাহকে এবং তাঁর রাসূলকে অস্বীকার করেছে। বস্তুত আল্লাহ না-ফরমানদেরকে পথ দেখান না।” (সূরা আত তাওবাহ্: ৮০)
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মানুষকে শ্রেষ্ঠ অবয়ব দিয়ে সৃষ্টি করার পর দিয়েছে খেলাফতের দায়িত্ব। অর্থাৎ আল্লাহ মানুষকে করেছেন তার খলিফা বা প্রতিনিধি। আর আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষকে দেওয়া এই খেলাফতের দায়িত্বটি মানুষের নিকট আমানতস্বরূপ। এই আমানতের যথার্থ সংরক্ষণ তথা প্রতিনিধিত্বের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে না পারার কারণে আল্লাহ মুনাফিকদের শাস্তি দিবেন। এ বিষয়ে আল্লাহ বলেন-
لِّيُعَذِّبَ اللَّهُ الْمُنَافِقِينَ وَالْمُنَافِقَاتِ وَالْمُشْرِكِينَ وَالْمُشْرِكَاتِ وَيَتُوبَ اللَّهُ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ ۗ وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَّحِيمًا۞
“যাতে আল্লাহ মুনাফিক পুরুষ, মুনাফিক নারী, মুশরিক পুরুষ, মুশরিক নারীদেরকে শাস্তি দেন এবং মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদেরকে ক্ষমা করেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (সূরা আল আহ্যাব: ৭৩)
আর মুনাফিকদের চূড়ান্ত শাস্তির কথা বলতে গিয়ে আল্লাহ বলেন-
إِنَّ الْمُنَافِقِينَ فِي الدَّرْكِ الْأَسْفَلِ مِنَ النَّارِ وَلَن تَجِدَ لَهُمْ نَصِيرًا۞
“নিঃসন্দেহে মুনাফেকরা রয়েছে দোযখের সর্বনিম্ন স্তরে। আর তোমরা তাদের জন্য কোন সাহায্যকারী কখনও পাবে না।” (সূরা আন নিসা: ১৪৫)
আল্লাহর পক্ষ থেকে চূড়ান্তভাবে ঘোষিত জাহান্নামিদের ব্যাপারে মুসলিমদের হতে হবে সতর্ক। সাময়িকভাবে তারা সমাজে ও রাষ্ট্রে শক্তিশালী অবস্থানে থাকলেও আনুগত্য করা যাবে না তাদের। যদি মুসলমানরা দুর্বল অবস্থানে থাকে তবে প্রয়োজনে তাদের ষড়যন্ত্র আর উৎপীড়নের বিরুদ্ধে আল্লাহর উপর ভরসা করে ধৈর্যের নীতি অবলম্বন করতে হবে। কিন্তু নিজেদের গা ভাসিয়ে দেওয়া যাবে না মুনাফিকদের ষড়যন্ত্রের সাথে। এ বিষয়ে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা বলেন-
وَلَا تُطِعِ الْكَافِرِينَ وَالْمُنَافِقِينَ وَدَعْ أَذَاهُمْ وَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ ۚ وَكَفَىٰ بِاللَّهِ وَكِيلًا۞
“আপনি কাফের ও মুনাফিকদের আনুগত্য করবেন না এবং তাদের উৎপীড়ন উপেক্ষা করুন ও আল্লাহর ওপর ভরসা করুন। আল্লাহ কার্যনির্বাহীরূপে যথেষ্ট।” (সূরা আল আহ্যাব: ৪৮)
আর যখন মুসলিমরা শক্তি সামর্থ্যবান হবে। বাহিরের শক্তির মোকাবেলা করে নিজেদের অবস্থান করবে সুদৃঢ়। তখন মুসলিমদের ভেতরে থাকা মুনাফিকদের ব্যাপারে নিতে হবে কঠোর পদক্ষেপ, যেন সকল প্রকার ফিতনা ফাসাদ দূর হয়ে দ্বীন হয়ে যায় একমাত্র আল্লাহর জন্য। এ বিষয়ে আল্লাহ বলেন-
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ جَاهِدِ الْكُفَّارَ وَالْمُنَافِقِينَ وَاغْلُظْ عَلَيْهِمْ ۚ وَمَأْوَاهُمْ جَهَنَّمُ ۖ وَبِئْسَ الْمَصِيرُ۞
হে নবী, কাফেরদের সাথে যুদ্ধ করুন এবং মুনাফেকদের সাথে তাদের সাথে কঠোরতা অবলম্বন করুন। তাদের ঠিকানা হলো দোযখ এবং তাহল নিকৃষ্ট ঠিকানা। (সূরা: আত তাওবাহ্: ৭৩)
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ جَاهِدِ الْكُفَّارَ وَالْمُنَافِقِينَ وَاغْلُظْ عَلَيْهِمْ ۚ وَمَأْوَاهُمْ جَهَنَّمُ ۖ وَبِئْسَ الْمَصِيرُ۞
হে নবী! কাফের ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে জেহাদ করুন এবং তাদের প্রতি কঠোর হোন। তাদের ঠিকানা জাহান্নাম। সেটা কতই না নিকৃষ্ট স্থান। (সূরা আত তাহরিম: ৯)
এভাবেই যুগে যুগে সত্যনিষ্ঠ মুসলিমদেরকে মোকাবেলা করতে হবে মুনাফিকদের ষড়যন্ত্র।
(চলবে)
লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, প্রেরণা

SHARE

Leave a Reply