post

লাগামহীন নিত্যপণ্যের বাজার দিশেহারা সাধারণ মানুষ

কামরুজ্জামান বাবলু

২৯ ডিসেম্বর ২০২১

২০২১ সালের মাঝামাঝি এক দুপুরবেলা। ঢাকা শান্তিনগর কাঁচাবাজারে সরকার-নিয়ন্ত্রিত ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ বা টিসিবির নিত্যপণ্য বোঝাই একটি ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে। সরকার-ঘোষিত ন্যায্যমূল্যে সাধারণ মানুষের মাঝে নিত্যপণ্য বিক্রি করার উদ্দেশ্যে। সাধারণত এই ট্রাকে চাল, ডাল, চিনি, তেল ও পেঁয়াজ- এই পণ্যগুলো পাওয়া যায় খুচরা বাজারের চেয়ে অনেক কম মূল্যে।
ট্রাকের সামনে দেখা গেল দু’টি লম্বা লাইন। এক লাইনে নারী এবং আরেক লাইনে পুরুষরা দাঁড়িয়ে আছেন। কাছে গিয়ে দেখা গেল অনেক চাকরিজীবী এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষও সেই লাইনে। এরপর হর-হামেশাই টিসিবির ট্রাক ও তার সামনে লম্বা লাইন ঢাকার টিকাটুলী, ফকিরাপুল ও নয়াপল্টনসহ বহু জায়গায় চোখে পড়েছে।
যতই দিন যাচ্ছে ততই টিসিবির ট্রাকের সামনের লাইন যেন দীর্ঘায়িত হচ্ছে। প্রথম প্রথম লোকলজ্জার ভয়ে অনেকেই সেই লাইনে না দাঁড়ালেও এক পর্যায়ে পরিস্থিতি একেবারে ভিন্নরূপ ধারণ করে। এখন এই ট্রাকের সামনে শুধু লম্বা লাইনই নয়, রীতিমতো হুড়োহুড়ি দেখা যায়। ট্রাকভর্তি মালামাল শেষ হয়ে যাবার আগেই যাতে পরিবারের জন্য দরকারি জিনিসটুকু কম দামে কেনা যায় সেজন্য নারীদেরকে ধাক্কাধাক্কি ও চুলোচুলি পর্যন্ত করতে দেখা যাচ্ছে এবং সেটা আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হচ্ছে।
এমনও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হতে দেখা যায়- যেখানে টিসিবির চলন্ত ট্রাকের পেছনে রীতিমতো মানুষের ঢল ছুটছে। ছোটবেলায় হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা গল্পের কথা মনে পড়ে গেল। সেখানে ওই বাঁশিওয়ালার পেছনে একবার হাজার হাজার ইঁদুর এবং পরবর্তীতে হাজার হাজার শিশুকে ছুটে চলতে দেখা যায়।
এমন দৃশ্য কিসের আলামত তা বুঝতে যৎসামান্য জ্ঞানই যথেষ্ট। মানুষ কতটা অভাবী হলে এমনটা করতে পারেন তা সবাই বুঝতে পারলেও শুধু বুঝতে চান না ক্ষমতাশালীরা। কারণ তাদের রয়েছে অঢেল অর্থ। অনেকেই নিজ বাসায় টাকা গণনা করার মেশিন কিনেছেন মর্মেও নানা খবর শোনা যায়। আবার টাকাভর্তি লোহার সিন্দুকও পাওয়া গেছে অনেকের বাসায়। নিত্যপণ্যের দাম কতটা বাড়লো তাতে তাদের কিছুই যায় আসে না।
সাধারণত শীতকালে সব ধরনের সবজির দাম কমে যায়। এই চিত্র বহু বছরের। আমরা সেই ছোটবেলা থেকেই এমনটা দেখে আসছি। শীতে বাজারে হরেক রকমের টাটকা সবজির ছড়াছড়ি, দাম খুবই সস্তা। মানুষ ব্যাগ ভর্তি করে সবজি কিনে বাসায় ফেরেন। এই চিরায়ত শীতের রূপ যেন এবছর একেবারে বিরল। পুরো শীতকালটা জুড়ে সবজির দাম রীতিমতো চড়াই ছিল। শীত কমতে না কমতেই তা অনেকের নাগালের পুরোপুরি বাইরে চলে যায়। মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হয় অস্থিরতা।
পেশাগত কারণে নানা শ্রেণীপেশার মানুষের সাথে আমাদেরকে মিশতে হয়। মানুষের ঘরের খবরটি পর্যন্ত আমাদের অনেককেই জানতে হয়। বহু মানুষকে এখন দেখতে পাচ্ছি যাদের রয়েছে সামাজিক মর্যাদা এবং একটি সম্মানজনক অতীত। তারা না পারছেন অন্যের কাছে হাত পাততে, না পারছেন লাগামহীন উর্ধ্বমূল্যের বাজারে নিজেকে খাপ খাওয়াতে। অনেকজনকে দেখছি, সকালে কোনোমতে খেয়ে বের হন, দুপুরে এক কাপ চা, এক/দুটো বিস্কুট খেয়ে দিন পার করেন, রাতে বাসায় গিয়ে আবার সামান্য যা থাকে তাই খান। অনেকে নিজেকে ডায়েট কন্ট্রোল করা ভালো- এই সান্ত¡না দেন কিংবা প্রকাশ্য সমাজে এমনটা বলে নিজের অভাব আড়াল করতে চান। কিন্তু বিষয়টি এখন এতটাই সাধারণ কিংবা ওপেন সিক্রেট হয়ে গেছে যে সবাই এটা বুঝতে পারেন।
দানবীয় তাণ্ডব
তবে, করোনার এই সংকটময় মুহূর্তে মানুষের যখন এমন দুরবস্থা, তখন কিছু লোভী যাদের টাকার অভাব নেই, তারাই ক্ষমতার জোরে পরিস্থিতিকে আরো সংকটময় করে তুলছে। কৃষকের ফসলের মাঠ থেকে সামান্য দামে বিক্রি হওয়া সবজি ও অন্যান্য নিত্যপণ্যের ট্রাক রাজধানী ঢাকা কিংবা অন্য কোনো শহরে পৌঁছতে রীতিমতো কয়েক ডজন চাঁদাবাজির শিকার হয়। কারা করছেন এই চাঁজাবাজি তা ব্যাখ্যা করার দরকার নেই, সবারই জানা। কিন্তু এই বদমাশদের বিরুদ্ধে বছরের পর বছর কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয় না রহস্যময় রাজনীতির কারণে।
কিন্তু এর কুফলটা শেষ পর্যন্ত ভোগ করতে হয় সাধারণ ক্রেতাদের বা আমাদের মতো আমজনতাকে। কারণ সমস্ত চাঁদাবাজির ফলে যে সিস্টেম লস পথেই হয়ে যায় তা পুষিয়ে নেয়া হয় পাইকারি ও খুচরা বাজারে দাম বাড়িয়ে দিয়ে। নিত্যপণ্যের অসহনীয় উর্ধ্বগতির মধ্যেও পরিস্থিতি এতটুকু বদলায়নি।
পরিস্থিতি যখন এমনই শোচনীয় তখন সরকারের মন্ত্রীরা জোর প্রচারণা চালাচ্ছেন এই বলে যে জিনিসপত্রের দাম বাড়লেও অসুবিধা নেই, কারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু এমন দাবি যে কতটা দুর্বল তা এক গবেষণা প্রতিবেদন থেকেই বোঝা যায়। ২০২০ সালের এপ্রিল মাস থেকে ২০২১ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (Power and Participation Research Centre) এবং ব্রাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (BRAC Institute of Governance and Development)- এর এক যৌথ গবেষণায় দেখা যায় দেশে দুই কোটি ৪৫ লাখ মানুষ নতুন করে দরিদ্র বা গরিব হয়েছেন যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৪.৭ শতাংশ। দেশের প্রায় সব শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমেই এই যৌথ গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছিল।
একজন সাধারণ শিশুর পক্ষেও এটা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়- যেখানে নতুন করে প্রায় আড়াই কোটি মানুষ গরিব হয়েছেন সেখানে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ে কিভাবে? মানুষের বিবেক যখন লোপ পায় এবং ক্ষমতার দম্ভ সীমা অতিক্রম করে তখনই সম্ভবত তারা এমনসব বাগাড়ম্বর করে যা খুবই হাস্যকর এবং যে কেউ বুঝতে পারেন। তবে, কেউ মুখ খুলে কিছু বলতে পারেন না।
বিষয়টি এখন এমন পর্যায়ে চলে গেছে যে অস্বীকার করার উপায় নেই। তাইতো বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি পর্যন্ত বলতে বাধ্য হয়েছেন- অসাধু ব্যবসায়ীরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। তিনি বলেছেন, এই অসাধু ব্যবসায়ীরা সংখ্যায় সীমিত হলেও শক্তিতে কঠিন। এজন্য সরকার তাদের প্রতি কঠোর হচ্ছে। কিন্তু দুর্নীতিবাজ ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট কাদের নিয়ন্ত্রণে, কারা আঙুল ফুলে কলাগাছ হচ্ছে, তা কারো অজানা নয়। তাই বিষয়টির গভীরে যেতে হবে।
শুধু রাজনীতির মারপ্যাঁচে বুলি আওড়ানোর মধ্য দিয়ে সমস্যার সমাধান কখনোই সম্ভব নয়। যেই দানব নিত্যপণ্যের আকাশছোঁয়া দামের জন্য দায়ী তার বিষদাঁত ভাঙতে পারে একমাত্র সরকারই। কিন্তু সরকারই যদি ওই দানবের অধীন হয়ে পড়ে তাহলে সাধারণ মানুষের কিছুই করার থাকবে না।
ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)- এর সভাপতি গোলাম রহমান গত ১৫ মার্চ ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে বলেন, এখন ভোক্তাদের দারুণ দুঃসময় চলছে। জিনিসপত্রের দাম হু হু করে বাড়ছে। নিম্নবিত্ত ও সীমিত আয়ের মানুষ পণ্যমূল্যে নিষ্পেষিত হচ্ছে। দৈনিক যুগান্তরে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে গোলাম রহমানের উদ্ধৃতি দিয়ে অবশ্য আরো বলা হয়- আন্তর্জাতিক বাজার, জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধি, ডলারের বিনিময় হার অবমূল্যায়নসহ রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পরিস্থিতি দেশের বাজারে পণ্যমূল্যে বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। ফলে সরকারকে আরো জোরালো ভূমিকা নিতে হবে।
সহজ সমাধান
যে যেভাবেই ব্যাখ্যা দিক না কেন- এই সমস্যার সমাধান করতে হলে সবার আগে দুর্নীতিকে নির্মূল করতে হবে। দুর্নীতি বাংলাদেশে এমনভাবে বিস্তার লাভ করেছে যে তা সমস্ত সেবামূলক খাতকে রীতিমতো ধ্বংস করে দিচ্ছে। আজকে একজন কৃষক যদি তার ফসলের ন্যায্যমূল্য পায়, পথে পথে চাঁজাবাজি বন্ধ হয়, দুর্নীতিবাজ আমলা ও প্রশাসনের ছত্রছায়ায় লুটপাটকারী চক্র যদি রেহাই না পায় - এটা হলফ করে বলা যায় যে দেশের পরিস্থিতি এমন থাকবে না।
স্বাভাবিক নিয়মে জিনিসপত্রের দাম যতটুকু বাড়বে বা কমবে তা তখন মানুষের নাগালের মধ্যেই থাকবে। সামান্য এক ছাত্রনেতার বাসা থেকে যদি টাকার বস্তা আর না বের হয়, হাজার হাজার কোটি টাকা যদি বাইরে পাচার না হয়, মানুষের জীবনমান এমন থাকবে না। কিন্তু এই দায়িত্ব মূলত সরকারের। একটি দায়িত্বশীল ও সৎ সরকারই পারে- সেই আদর্শ দেশ জাতিকে উপহার দিতে।
এবার অপেক্ষার পালা- কখন আসবে এমন দেশ যেখানে টিসিবির গাড়ির পেছনে মানুষকে পঙ্গপালের মতো ছুটে বেড়াতে হবে না, যেখানে একটু কম মূল্যে নিত্যপণ্য নিয়ে কাড়াকাড়ি করতে গিয়ে প্রকাশ্য দিবালোকে হাজারো মানুষের সামনে মধ্যবয়সী নারীদের চুলোচুলি করতে হবে না, যেখানে রাজনীতির মাঠে আদর্শের বাণী উচ্চারিত হয়ে রাতের আঁধারে লুটপাটের মহাপরিকল্পনা হবে না। তবে, এটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে এজন্য আমজনতাও কম দায়ী নয়- তাদেরকেও জেগে উঠতে হবে, সচেতন হতে হবে।
লেখক : সাংবাদিক

আপনার মন্তব্য লিখুন

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির