লেখালেখির তৃতীয় চোখ -আযাদ আলাউদ্দীন

বাহ্যিকভাবে প্রত্যেক মানুষেরই দু’টি চোখ থাকে কিন্তু তিনটি চোখওয়ালা মানুষ আমরা কখনো দেখিনি। হতে পারে কারো চোখ একটি, আবার কারো চোখ একটিও নেই। তিন চোখওয়ালা মানুষের কথা আমরা ভাবতেও পারি না। তবুও প্রত্যেক মানুষের তৃতীয় একটি চোখ আছে। বাস্তবে এ চোখটি দেখা না গেলেও আমাদের অনুভবে এ চোখটি বিদ্যমান রয়েছে।

আমরা যে কল্পনা করি এ কল্পনার বিষয়বস্তু আমরা তৃতীয় চোখ দিয়েই দেখি। মানুষের পারিপার্শ্বিক অবস্থা, অবস্থান কিংবা শ্রেণি-পেশার উপর নির্ভর করেই তৃতীয় চোখের দৃষ্টি প্রসারিত হয়। এ তৃতীয় চোখ দিয়ে ভালো-মন্দ দুটি বিষয়ই গভীরভাবে অনুভব করা যায়। কিন্তু আমরা সেসব ব্যবহারের দিক না গিয়ে শুধু লেখালেখির ক্ষেত্রে এ তৃতীয় চোখের প্রভাব সম্পর্কে দৃষ্টি ফেরাব।
একজন লেখক তার তৃতীয় চোখের উপর ভর করেই লেখালেখি করে থাকেন। এ তৃতীয় চোখের দৃষ্টি যার যত বেশি প্রসারিত, তিনি তত ভালোমানের লেখক। তবে এ তৃতীয় চোখের দৃষ্টি এমনিতেই প্রসারিত হয় না। এজন্য প্রয়োজন ব্যাপক অধ্যয়ন। যার অধ্যয়ন যত বেশি, তার তৃতীয় চোখের দৃষ্টিও তত প্রসারিত। আর সে কারণেই তিনি ভালোমানের লেখক হয়ে ওঠেন।

যেমন আপনি যদি কবিতা লিখতে চান তাহলে একশজন কবির কবিতা গভীরভাবে বুঝে পড়–ন এবং অনুভব করুন, কে কোন ধরনের উপমা, উপমান, রূপকসহ অলঙ্কার ব্যবহার করেছেন, তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করুন। দেখবেন- আপনার মধ্যেও নিজস্ব একটা স্টাইল কিংবা স্বতস্ত্র সত্তা চলে আসবে। তখন আপনি আপনার মতো করে লিখতে পারবেন। কিন্তু তা না করে যদি আপনি শুধুমাত্র একজন কবির লেখায় বুঁদ হয়ে থাকেন তবে দেখবেন পর্যায়ক্রমে আপনার লেখায়ও তার লেখার প্রভাব পড়ছে। আর থিমও হয়ে যাচ্ছে পরস্পরের কাছাকাছি। তখন সচেতন পাঠকরা বলবেন, উনি তো অমুককে ফলো করছেন!
এইতো গেলো একটি মাত্র উদাহরণ। এমনিভাবে সাহিত্যের প্রতিটি শাখায় আপনার স্বতস্ত্র বৈশিষ্ট্য ও নিজস্ব স্টাইল তৈরি করতে হলে তৃতীয় চোখের দৃষ্টি প্রসারিত করার কোনো বিকল্প নেই।

সাহিত্যের নানা শাখার মধ্যে কিছু কিছু বিষয় আছে যেগুলো লিখতে হয় কল্পনার উপর নির্ভর করে। সেগুলো বাস্তবতার সাথে মিলতেও পারে আবার নাও মিলতে পারে। যেমন গল্প, কবিতা, নাটক, উপন্যাস কিংবা সায়েন্স ফিকশন প্রভৃতি। আবার কিছু বিষয় আছে যেগুলো লিখতে হয় বাস্তবতার নিরিখেই। সেখানে কল্পনার কোনো প্রাধান্য নেই। বাস্তবতাই সেখানে বড় কথা। এ ধারার সাহিত্যের মধ্যে আছে প্রবন্ধ, নিবন্ধ, ফিচার ইত্যাদি। তবে সাহিত্যের এসব তত্ত্বকথায় না গিয়ে এবার আমরা বাস্তবতার নিত্য আনুষঙ্গিক একটি বিষয় সংবাদপত্রের লেখনী সম্পর্কে দৃষ্টি ফেরানোর চেষ্টা করবো।

প্রত্যেক লেখকেরই লেখালেখির শুরুটা হয় আবেগের বশবর্তী হয়ে। আবেগতাড়িত কয়েকটি লেখা পত্রিকার পাতায় প্রকাশিত হওয়ার পর পর্যায়ক্রমে বিষয়টি নেশার দিকে গড়ায়। সেই লেখালেখির নেশা এক পর্যায় পেশায় পরিণত হয়। রিপোর্টিংয়ের প্রথম দিকে দেখতাম- যা লিখেছি তা সম্পাদনার পর অনেকাংশেই সংশোধন, পরিমার্জন করে ছাপা হচ্ছে। তখন বিষয়টির গভীরে যেতে না পরলেও নিজে যখন সম্পাদনার কাজ শুরু করলাম- তখন নিজের কাছেই ধরা পড়েছে ভুলগুলো। এর মধ্যে হয়তো কখনো কখনো সাধু চলিত ভাষার মিশ্রণ হয়েছে। কখনো বা একই শব্দ একবাক্যে অহেতুক একাধিকবার ব্যবহার হয়েছে। আবার কখনো দেখা গেল শব্দচয়নে ভারসাম্যহীনতাসহ নানা রকম সমস্যা। পরবর্তীতে এসব সমস্যা দূর করার চেষ্টা এখনো অব্যাহত রেখেছি।
বলছিলাম তৃতীয় চোখের কথা। আমরা পত্রিকার ডেস্কে কিংবা মফস্বলের রিপোর্টারদের প্রায়ই বলি, কী ভাই! কয়েকদিন যাবৎ আপনার নিউজ পাচ্ছি না কারণ কী? উত্তর আসে একটাই- কী নিয়ে লিখব? লেখার বিষয় পাচ্ছি না, সোজা কথায়- ভালো কোনো নিউজ নেই। কিন্তু এ কথাটা বলার আগে তিনি একবারও ভাবলেন না যে, নিউজ কিংবা ফিচার করার মতো শত শত বিষয় তার চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে।
ইদানীং আমাদের সাংবাদিকতার একটি বদ্ধমূল ধারণা যে, কোনো ঘটনা না ঘটলে কিংবা খুন, রাহাজানি, সহিংসতা, দুর্নীতি না হলে বোধ হয় ভালো নিউজ তৈরি হয় না। ‘ব্যাড নিউজ ইজ গুড নিউজ’- এই অনাকাক্সিক্ষত বাক্যটিই যেন অনেক সংবাদকর্মীর স্লেøাগানে পরিণত হয়েছে। আমাদের দেশের অধিকাংশ কাগজ খুললেই আমরা এ কথার বাস্তব প্রমাণ পাই। এ জাতীয় পত্রিকাগুলো পড়লে মনে হয় বাংলাদেশে ভালো কিছুই হচ্ছে না। সবকিছুই যেন খারাপে ছেয়ে গেছে। কিন্তু আসলে কি তাই?

উন্নত বিশ্বে সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে কিন্তু এমনটি হয় না। সেসব দেশের মিডিয়ায় অপরাধ, দুর্নীতি আর সমস্যার পাশাপাশি অর্জিত সাফল্যগুলোকেও সমানভাবে তুলে ধরা হয়। আমরা কি পারি না সমস্যার পাশাপাশি সম্ভাবনাকে সমানভাবে তুলে ধরতে? আমরাও পারি- তবে খারাপ খবরগুলো আমাদের কাছে বাতাসের গতির চেয়েও প্রবলবেগে চলে আসে। কিন্তু ভালো খবরগুলো আসে অত্যন্ত মন্থর গতিতে। আবার অনেক সময় আসেই না। এ জন্য দায়ী যে শুধু সাংবাদিকরা তা কিন্তু নয়। ভালো কাজটি যিনি করেছেন তিনি যদি সঠিকভাবে তথ্য সরবারাহ না করেন তাহলে সাংবাদিক কিভাবে তা তুলে ধরবেন?
মূল কথা হচ্ছে, বর্তমান সময়ে সাংবাদিকতায় দুঃসংবাদ বা খারাপ বিষয়টি অটোমেটিকভাবে সাংবাদিকের কাছে পৌঁছে যায়, আর ভালো নিউজটি অর্গানাইজ করে মিডিয়ায় পৌঁছাতে হয়, এই হচ্ছে পার্থক্য। এই ধারা ভাঙতে হলে আমাদের তৃতীয় চোখের দৃষ্টি আরো প্রসারিত করতে হবে। আমাদের চারপাশেই যে অসংখ্য লেখার রসদ ছড়িয়ে আছে তা নিয়ে ভাবতে হবে।

বহুল আলোচিত-সমালোচিত নায়িকা পরীমণিদের নিউজগুলো যেরূপ আগ্রহ নিয়ে পড়ি কিংবা লিখি, এশিয়ার নোবেলখ্যাত র‌্যামন ম্যাগসেস পুরস্কার পাওয়া বাংলাদেশের বিজ্ঞানী ড. ফেরদৌসি কাদরীর অর্জন বা ভালো খবরটি কি আমরা তদ্রƒপ আগ্রহ নিয়ে লিখতে কিংবা পড়তে পারি? নিজেকে কখনো কি এ প্রশ্নের মুখোমুখি করেছি। যদি না করে থাকি তাহলে এবার ভাবি কোনটিতে আমরা বেশি আগ্রহী?
বাড়ির পাশের বেকার যুবকটি, যে কিনা বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি পেয়ে এখন স্বাবলম্বী হয়ে অন্যদেরও আলোর পথে দেখাচ্ছেন। কিংবা পাড়ার সেই মাদকাসক্ত তরুণটি- যে এখন স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুনছে। কিভাবে ভালো মানুষের কাতারে শামিল হলেন তিনি? লিখে ফেলুন এসব সাফল্যগাথা। এসব পড়ে দেশ, সমাজ ও আগামী প্রজন্ম উপকৃত হবে। তবেই তো একজন লেখকের লেখার সার্থকতা। আর এজন্য প্রয়োজন আমাদের তৃতীয় চোখের দৃষ্টি আরো শাণিত করা।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

SHARE

Leave a Reply