লেবানন সঙ্কটের শিকড় অনেক গভীরে হারুন ইবনে শাহাদাত

আবারও বিশ্বের সংবাদমাধ্যমগুলোর শীর্ষ শিরোনাম হলো, মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষুদ্র দেশ লেবানন। গত ৪ আগস্ট বৈরুত সমুদ্রবন্দরে ভয়াবহ বিস্ফোরণে ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা হয়েছে। মারা গেছে দুই শতাধিক মানুষ। আহত হয়েছে ৫ হাজারের ওপরে। নিহত ও আহতের তালিকায় বাংলাদেশী নাগরিকও আছেন। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ বিজয়। ৪ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। নৌবাহিনীর ২১ জন সদস্যসহ ১০০ জন বাংলাদেশী নাগরিক আহত হয়েছেন। লেবাননের রাজধানী বৈরুতের সাম্প্রতিক ভয়াবহ বিস্ফোরণে এক হাজার পাঁচশ কোটি ডলারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মিশেল আউন। গত ৪ আগস্ট বৈরুত বন্দরের একটি গুদামে ভয়াবহ বিস্ফোরণে তিন লাখ মানুষ ঘরবাড়ি ছাড়া হয়েছেন। বন্দরের গুদামে থাকা ২,৭৫০ টন অ্যামো- নিয়াম নাইট্রেট বিস্ফোরিত হয়। বিস্ফোরণের পর গণ-আন্দোলনের মুখে প্রধানমন্ত্রী হাসান দিয়াবের নেতৃত্বাধীন সরকার পদত্যাগ করেছে। রাজধানী বৈরুতসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের জের ধরে দিয়াবের মন্ত্রিসভা পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছে। অবশ্য প্রেসিডেন্ট মিশেল আউন পরবর্তী সরকার গঠিত না হওয়া পর্যন্ত হাসান দিয়াবকে দায়িত্ব পালন করার আহ্বান জানিয়েছেন।
অর্থনৈতিক সঙ্কটের কারণে বিস্ফোরণের ঘটনার আগে থেকেই লেবাননে সরকারের বিরুদ্ধে জনগণের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছিল। গত বছরের অক্টোবর থেকেই দেশটিতে অর্থনৈতিক সঙ্কট দেখা দিয়েছে। করোনাভাইরাসের কারণে সেই সঙ্কট আরো বেড়েছে। লকডাউনের ফলে মুদ্রার ‘দাম’ কমে গেছে, অনেক মানুষ চাকরি হারিয়েছে। দেশের ৬০ ভাগেরও বেশি তরুণ বেকার। লেবানিজ পাউন্ডে এক ডলারের দাম দিল চার হাজার পাউন্ড। ফলে বিস্ফোরণের ঘটনার আগে থেকেই নিরাপত্তারক্ষীদের সাথে সংঘর্ষ হয়েছে বিক্ষোভকারীদের।
আরো পিছনে তাকালে দেখা যায়, ইসরাইল নামের অবৈধ রাষ্ট্রটির জন্মের পর থেকেই এক সময়ের সমৃদ্ধ দেশ লেবানন জ্বলছে। গোটা মধ্যপ্রাচ্যকেই জ্বলন্ত অগ্নিগিরিরূপী ইসরাইলের আগ্রাসী লাভা জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করছে। ইতোমধ্যেই ফিলিস্তিনকে গ্রাস করেছে। সিরিয়া, ইয়েমেন জ্বলছে যুদ্ধের আগুনে। ইরাক, লিবিয়া এখন একটি ধ্বংসস্তূপ বৈ অন্য কিছু নয়। স্বৈরশাসনের জাঁতাকলে নিঃশেষ হচ্ছে মিশর। জুজুর ভয় আর রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে উসকে দিয়ে পশ্চিমা বিশ্ব দুই ভ্রাতৃপ্রতিম দেশ সৌদি আরব আর ইরানকে সোজা হয়ে দাঁড়তে দিচ্ছে না। লেবাননে বর্তমানে চলমান সঙ্কটকে বুঝতে হলে উল্লিখিত বিষয়গুলোর সাথে সাথে ইতিহাসের পাতার দিকে নজর দিতে হবে।

পিছনে ফিরে দেখা
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে লেবানন তুর্কি সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তুরস্ক সাম্রাজ্য রক্ষা করতে জার্মানির পক্ষ নিয়েছিলো। কিন্তু ১৯১৮ সালে জার্মানির পরাজয়ের পর মিত্র বাহিনী তুর্কি সাম্রাজ্যের পতন ঘটায়। মিত্র বাহিনীর সৈন্যরা সিরিয়া ও লেবাননে শিবির গড়ে এই অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। ফ্রান্স ১৯২০ ঈসায়ী সালে সিরিয়া ও লেবাননকে নিয়ে গঠিত ‘লেভান্ড স্টেট’ শাসনের জন্য লিগ অব ন্যাশন্সের ম্যান্ডেট পায়। ১৯৪৩ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে আরব জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের তীব্রতায় ফ্রান্স লেবাননকে স্বাধীনতা দিতে বাধ্য হয়। গঠিত হয় স্বাধীন লেবানন। কিন্তু স্বাধীন লেবানন কোন রাজনৈতিক দল শাসন করবে, সেই প্রশ্নে তীব্র মতবিরোধ সৃষ্টি হয়। পরে বিবদমান ধর্মীয় গোষ্ঠী ও রাজনৈতিক দলগুলো সরকার পরিচলনা ও আইনসভার আসন বণ্টনের প্রশ্নে এক সমঝোতায় আসে। তারা সিদ্ধান্ত নেন, লেবাননের প্রেসিডেন্ট হবেন একজন খ্রিস্টান এবং প্রধানমন্ত্রী ও স্পিকার হবেন হবেন সুন্নি ও শিয়া মুসলিমদের মধ্য থেকে। সমঝোতার আলোকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন শেখ বিশারা খাউর। ১৯৫২ সালে দুর্নীতির অভিযোগে তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। তার পদত্যাগের পর প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন কামিল শ্যামন। তার পাশ্চাত্য প্রীতির তীব্রতার কারণে মুসলমানদের মধ্যে মারাত্মক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। ১৯৫৮ সালের জুলাই মাঝে ক্ষমতা বণ্টন প্রশ্নে খ্রিস্টান ও মুসলমানদের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। প্রেসিডেন্ট পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য কামনা করেন। তার চাহিদার ফলে আমেরিকা ১০ হাজার সৈন্য পাঠায়। মার্কিন সৈন্যের উপস্থিতিতে বিরোধ আরো তীব্রতর হয়।

কেন লেবানন ইসরাইলের
এক নম্বর টার্গেট
লেবানন সঙ্কটের শিকড় অনেক গভীরে। দেশটিতে মার্কিন সৈন্যের উপস্থিতির আগে আরেকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যে ঘটে। তা হলো ১৯৪৮ সালের ১৪ মে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। এই ঘটনার পর আরব-ইসরাইলের মধ্যে সামরিক সংঘাত শুরু হলে ফিলিস্তিনিরা রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য দলে দলে লেবাননে হিজরত করতে থাকে। ফিলিস্তিনের জনগণ তাদের অধিকার আদায়ের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহারের জন্য লেবাননের মাটিকে বেছে নেয়। লেবাননের রাজধানী বৈরুতে ১৯৬৪ সালে গঠিত হয় ফিলিস্তিন মুক্তি সংস্থা (পিএলও)। ফলে ইহুদি অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইলের এক নম্বর টার্গেটে পরিণত হয় লেবানন। সেই থেকে মূলত জ্বলছে লেবানন। তবে কেউ জানে না এ জ্বলার শেষ হবে?

দিশেহারা মানুষের আজব চিন্তা
মিডল ইস্ট মনিটর ও এপির প্রতিবেদন সূত্রে প্রকাশ করে, লেবাননের কর্তৃত্ব আগামী ১০ বছরের জন্য ফ্রান্সের হাতে তুলে দিতে চায় দেশটির জনগণ। এই দাবিতে ইতোমধ্যে একটি পিটিশনও খোলা হয়েছে। এতে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত স্বাক্ষর করেছে প্রায় ৬০ হাজার মানুষ। রাজধানী বৈরুতের সমুদ্রবন্দরে ভয়াবহ বিস্ফোরণে প্রাণহানির ঘটনায় ক্ষোভে ফুঁসছে জনগণ। ৪ আগস্টের ওই বিপর্যয়ের জন্য সরকারের দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনাকেই দায়ী করছেন তারা। সরকারের প্রতি তীব্র অনাস্থা জানিয়ে রাস্তায় নেমেছে মানুষ। পিটিশনে দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপট তুলে ধরে ফরাসি শাসন কার্যকরের দাবি জানাচ্ছে তারা। তবে লেবাননের জনগণের এই দাবি নাকচ করে দিয়েছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। তিনি বলেছেন, ফ্রান্স আর লেবানন পরিচালনার দায়িত্ব নিতে চায় না। এটা সম্ভব নয়। এটা কোনোভাবেই সমস্যার সমাধানও নয়। বিস্ফোরণের দু’দিন পর প্রথম কোনো বিদেশি নেতা হিসেবে বৈরুত সফরে আসেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ। ত্রাণ ও উদ্ধারকারী বাহিনীর সঙ্গে গত ৬ আগস্ট বৈরুতে পৌঁছেই বিস্ফোরণস্থলসহ ধ্বংস হয়ে যাওয়া রাস্তাঘাট ঘুরে দেখেন তিনি। তারপরই পপুলার পিটিশন স্বাক্ষর শুরু হয়। এতে বলা হয়, ‘রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনায় লেবাননের শাসকরা চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয়েছেন। দুর্নীতি, সন্ত্রাসবাদ, বিদ্রোহী সঙ্কটে পর্যুদস্ত দেশটি ধ্বংসের কিনারে দাঁড়িয়েছে। আমাদের বিশ্বাস স্বচ্ছ এবং স্থায়ী সরকারব্যবস্থা প্রবর্তনে লেবাননের উচিত ফ্রান্সের শাসনে ফিরে যাওয়া।’ পরদিন লেবাননের প্রেসিডেন্ট আউনের সঙ্গে বৈঠক করেন ম্যাক্রো। বৈঠকে প্রেসিডেন্টকে সতর্কবার্তা দিয়ে ফরাসি প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘লেবানন ডুবতেই থাকবে যদি না দেশটির নেতৃত্বে রদবদল আসে।’ তিনি বলেন, লেবাননের পাশে তার দেশ ছিল, থাকবে। তবে স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ক্ষমতার কাঠামোয় বদল না এলে আর একটি টাকা সাহায্য নিয়েও এগিয়ে আসবে না ফ্রান্স।
বিস্ফোরণের পর লেবাননে
কোন পরিবর্তন আসবে কি?
বিস্ফোরণের পর প্রবল প্রতিবাদের মুখে প্রধানমন্ত্রী হাসান দিয়াব সরকারের পতন ঘটেছে। এখন প্রশ্ন হলো, এই পদত্যাগ কী সত্যি কোন সুফল বয়ে আনতে পারবে? এর আগে গত জানুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরিকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। কিন্তু এতেও সমাধান হয়নি। নতুন সরকারের ওপর আস্থা রাখতে পারেনি দেশটির জনসাধারণ। বিস্ফোরণের পর প্রধানমন্ত্রী হাসান দিয়াব সরকারের পতন ঘটলো? নাগরিকের একটি অংশ লেবাননকে আবারও ফ্রান্সের অধীনে নেওয়ার দাবি জানাচ্ছে। এর মানে খুব সহজ। বিক্ষুব্ধ জনতা রাজনৈতিক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন চাইছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে লেবাননের বর্তমান রাজনৈতিক এস্টাব্লিশমেন্টের বিপরীতের কোনো রাজনৈতিক নেতৃত্ব আন্দোলনকারীরা তৈরিও করতে পারছে না। সে কারণে সাদ হারিরির পদত্যাগও সঙ্কটের সমাধান করতে পারেনি। হাসান দিয়াবের পদত্যাগও সমাধান করতে পারবে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষকরা। তাদের অনেকে মনে করছেন, হয় তো দেশটি দিনে দিনে রাজনৈতিক নেতৃত্ব ব্যর্থ হবে। সামরিক কর্তৃত্ব বাড়বে। তাদের মতে এই জটিলতার মূল কারণ, লেবাননের রাজনৈতিক সঙ্কটের মূলে রয়েছে দেশটির ধর্মীয় বিভাজনে তৈরি করা রাজনৈতিক ব্যবস্থা। কিন্তু এই সঙ্কটে আঞ্চলিক রাজনীতির প্রভাবও রয়েছে।
ইউনিভার্সিটি অব বনের ইনস্টিটিউট অব ওরিয়েন্ট অ্যান্ড এশিয়ান স্টাডিজের ভিজিটিং রিসার্চ ফেলো রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. মারুফ মল্লিক মনে করেন, ‘লেবাননে কারা ক্ষমতায় থাকবে, রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করবে, এর সঙ্গে ইসরাইলের নিরাপত্তা জড়িত। ইসরাইলের নিরাপত্তায় কোনো ধরনের গড়বড় বা শঙ্কা তৈরি হলেই অন্যান্য প্রতিবেশী দেশের মতো লেবাননেও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হবে। লেবাননের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করে মুসলিম ও খ্রিষ্টানরা মিলেই। এদের মধ্যে উপবিভাজনও আছে। মুসলিমদের মধ্যে শিয়া হিজবুল্লাহ ও সুন্নি নেতৃত্বে মতভেদ আছে। খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের মধ্যে অর্থনৈতিক বিভাজন রয়েছে। নিয়মানুসারে প্রেসিডেন্ট খ্রিষ্টান, প্রধানমন্ত্রী সুন্নি ও পার্লামেন্টের স্পিকার শিয়া দলগুলো থেকে নির্বাচিত হয়। সরকারি পদ ও চাকরিও ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ করা হয়। এভাবেই লেবাননের রাজনীতির ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করা হয়েছিল। ক্ষমতার ভাগাভাগিতে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হলেও সম্পদের ভাগাভাগিতে ভারসাম্য আসেনি কখনোই। এ কারণেই লেবাননের ৫০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে রয়েছে। বিভিন্ন সময় সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম ও অযোগ্যতার অভিযোগ নিয়ে নাগরিকেরা পথে নেমে আসেন। এবার বিক্ষোভকারীরা বলছেন, তোমরা সবাই চলে যাও। কিন্তু সবাই চলে গেলে আসবে কে? নতুন নেতৃত্বের আভাস আপাতত লেবাননের রাজনীতিতে নেই। বলা হচ্ছে, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কারণে দেশটি ব্যর্থ রাষ্ট্রের কাছাকাছি চলে এসেছে। লেবাননের মোট জনসংখ্যা ৭০ লাখ। তাদের মাথায় এখন ১০ হাজার কোটি ডলারের ঋণের বোঝা। সরকার আছে বটে কিন্তু কোনো কিছুর ওপর তার নিয়ন্ত্রণ নেই। দুর্নীতি ও অনাস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, বৈরুত বিস্ফোরণের পর আসা বিদেশি সাহায্য সরকারকে না দিয়ে সরাসরি নাগরিকদের দেয়ার কথাও অনেকে বলেছেন। প্রশ্ন হচ্ছে, লেবাননের সরকার কি ব্যর্থ, নাকি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনৈতিক স্বার্থে তাদের পঙ্গু করে রাখা হয়েছে? যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই লেবাননের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে রেখেছে। এতে লেবাননের বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিদেশি সহায়তাও সরকারকে দেয়া হয় না। লেবাননের রাজনীতিতে হিজবুল্লাহর একচ্ছত্র প্রভাবের কারণে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা জারি করে এবং হিজবুল্লাহকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ করে। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল, সৌদি আরবসহ পশ্চিমারা চায় লেবাননের রাজনীতি থেকে হিজবুল্লাহকে হটাতে। হিজবুল্লাহ বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী বেসরকারি সামরিক বাহিনীর অধিকারী। হিজবুল্লাহকে ইরান, সিরিয়াসহ অনেক দেশ সহায়তা করে। তাদের ইসরাইল সীমান্তে ইরানের ছায়াপ্রতিনিধি বা প্রক্সি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। হিজবুল্লাহ ইসরাইলের নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি। এই অবস্থায় হিজবুল্লাহর সমর্থনপুষ্ট কোনো সরকার সফল হবে না, এইটা স্বাভাবিক। লেবাননের সরকার যে অদক্ষ ও দুর্নীতিগ্রস্ত, এটা সবাই স্বীকার করে। সদ্য পদত্যাগী প্রধানমন্ত্রী হাসান দিয়াবও স্বীকার করেছেন, তাঁর সরকারে দুর্নীতি ও অনিয়ম ছিল। সাদ হারিরিও দুর্নীতিবাজদের সতর্ক করে বলেছিলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা লেবাননকে বিপাকে ফেলবে। কিন্তু দুর্নীতি আর দূর হয় না। নতুন সরকার যে দুর্নীতিমুক্ত হবে, এমন কোনো নিশ্চয়তাও নেই। পরবর্তী নির্বাচনেও বর্তমান দলগুলোই জিতে আসতে পারে। তাহলে পরিস্থিতির খুব বেশি পরিবর্তন হবে না। তাহলে কি ভবিষ্যতে আবারও একই দাবিতে আন্দোলন হবে? লেবাননে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ এই প্রথম নয়। ২০০৫ সালেও বড় ধরনের বিক্ষোভ হয়েছিল। রাজনীতিতে মৌলিক পরিবর্তনের দাবিতে পথে নেমেছিল সবাই। পরিবর্তন যে আসেনি তা বোঝাই যাচ্ছে। পশ্চিমাদের প্রয়োজন লেবাননে হিজবুল্লাহ প্রভাবমুক্ত সরকার; যেমনটা হয়েছিল মিসরে। ইসরাইলবিরোধী মুরসিকে সরানোর খুব প্রয়োজন ছিল। মিসরে বিপ্লবের এক বছর পরেই দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে কায়রোর তাহরির স্কয়ারে আবারও সমবেত হয় বিক্ষোভকারীরা। সেই বিক্ষোভ যে অধিকতর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার চেয়ে বরং মুরসিকে হটানোর উদ্দেশ্যেই হয়েছিল, তা পরবর্তী সময়ে পরিষ্কার হয়েছে। জেনারেল সিসি মুরসির চেয়ে আরও কঠোর শাসন কায়েম করলেও তাহরির স্কয়ারের ওই সব অধিকারকর্মী বা বিক্ষোভকারীকে আর মাঠে দেখা যায়নি। বরং তাদের অনেকেই গুম হয়েছে। কেউ কেউ জেলে ধুঁকছে। লেবাননের ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে, তাদের সেনাবাহিনী এতটা শক্তিশালী নয় যে হিজবুল্লাহকে চ্যালেঞ্জ করে মিসরের মতো একটি কর্তৃত্ববাদী সরকার গঠনে পশ্চিমাদের সহায়তা করবে।’
তারপরও পশ্চিমারা লেবাননে শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং মানবাধিকার রক্ষার চেয়ে ইসরাইলকে রক্ষা করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করে, তাই তারা চায় না দেশটিতে বিভাজনমুক্ত গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা হোক। আবর বিশ্বের মুসলিম দেশগুলোর নেতৃত্বও জনগণের অধিকার রক্ষার চেয়ে নিজেদের ক্ষমতা রক্ষাকেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। তাই সহসা লেবানন সঙ্কটের সমাধান হবে এমনটা বলা যা না। তবে হ্যাঁ, চলমান বিক্ষোভের ফলে আরেকটা আরব বসন্ত এলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কারণ দুঃশাসন কোন কালেই চিরস্থায়ী হয় না। একটি নির্দিষ্ট সময় পর পরিবর্তন আসবেই, ইতিহাস সে কথাই বলে।
লেখক : কথাসাহিত্যিক ও
সিনিয়র সাংবাদিক

SHARE

Leave a Reply