শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ কবি ফররুখ আহমদ

মোশাররফ হোসেন খান

কবি ফররুখ আহমদ [১৯১৮-৭৪] তাঁর সমকালে সবচেয়ে বেশি পঠিত, উচ্চারিত এবং অভিনন্দিত হয়েছিলেন। কবির এই গ্রহণযোগ্যতার একমাত্র কারণ যে তাঁর কাল এবং কালের শিখরস্পর্শী কবিতার শক্তি- সে কথা বলাবাহুল্য।
সমকালে তিনিই যে ছিলেন শীর্ষে, এ কথার স্বাক্ষর তো রয়ে গেছে প্রচুর। ধরা যাক, প্রায় তাঁরই সমবয়সী নন্দিত কথাশিল্পী আবু রুশদের [১৯১৯] কথা। ফররুখকে তিনি দেখেছেন খুব কাছে থেকে। শুধুই দেখেননি-তাঁকে জেনেছেনও বটে। সমকালীন বন্ধুদের দৃষ্টি কিছুটা ঘোলাটে, কিছুটা অস্পষ্ট, কিছুটা ঝাঁপসা রয়ে যায়। এটা দোষ বা গুণ-বিচার্য বিষয় নয়। এমনটি ঘটেই থাকে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, ফররুখ বিবেচনায় তাঁর সমকালীন বন্ধু এবং সহযাত্রীদের দৃষ্টিভঙ্গিতে এতটুকু সেই অস্পষ্টতার ছায়ামাত্র নেই। এমনকি নেই তৎকালীন সমালোচকদের মধ্যেও। এখানে ফররুখ আহমদের সমসাময়িক কথাশিল্পী আবু রুশদের [সওগাত : ভাদ্র ১৩৪৮] মন্তব্যের সাথে প্রথমে কিছুটা পরিচিত হওয়া যাক। তিনি বলেছেন-
ফররুখ আহমদ-ফররুখ আহমদ রোমান্টিক কবি, অর্থাৎ তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ঠিক বাস্তববোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়। তাঁর কাব্যে সৌন্দর্যের জয়গান অকুণ্ঠ, সুদূরের প্রতি আকর্ষণও তাঁর কাব্যের আর একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য।
তবুও তিনি নিঃসন্দেহে আধুনিক। তাঁর একটি বলিষ্ঠ সজাগ তীক্ষ অনুভূতিশীল মন আছে যা সৌন্দর্যের অস্তিত্বকে স্বীকার করবার সাহস রাখে, কিন্তু রোমান্টিসিজমের বিপদ সম্বন্ধে যা সর্বদা সচেতন।
তাঁর মেধা এবং সূক্ষ্ম পরিমাণ-জ্ঞান বিস্ময়কর এবং তাঁর বয়সের রচনায় অপ্রত্যাশিত। শব্দের নিপুণ চয়নে, কল্পনার ব্যাপকতায় এবং গভীর অর্থে পরিস্ফুট রূপক-মাধুর্যে তাঁর কবিতা সহজেই বিশিষ্টতা অর্জন করেছে।
আবু রুশদের ঐ মন্তব্যের ঠিক দশ বছর পর, মাসিক মোহাম্মদী পৌষ ১৩৫৮ সংখ্যায় আহমদ শরীফ [১৯২১-৯৮] লেখেন : আমাদের বাংলা ভাষায় স্বকীয় আদর্শে সাহিত্য সৃষ্টি করতে হবে, আদর্শ হবে কোরআনের শিক্ষা, আধার হবে মুসলমানি ঐতিহ্যানুগ আর বিষয়বস্তু হবে ব্যক্তি বা সমাজ অথবা বৃহদার্থে জগৎ ও জীবন। এভাবে আমাদের জাতীয় সাহিত্য ও জাতীয় জীবন গড়ে উঠবে। সাম্প্রতিক সাহিত্যে তরুণ কবি ফররুখ আহমদ একান্তভাবে মুসলিম ঐতিহ্যের পরিপ্রেক্ষিতে কাব্য সাধনা করে পথের দিশারির গৌরব অর্জন করেছেন।
মোহাম্মদ বরকতউল্লাহ [১৮৯৮-১৯৭৫] ছিলেন ফররুখ আহমদের অগ্রজ গদ্য- লেখক। ফররুখের চেয়ে বয়সে বড় ছিলেন প্রায় বিশ বছরের। আর তিনি ইন্তেকাল করেছিলেন, ফররুখের ইন্তেকালের এক বছর পরে, ১৯৭৫ সালে। তিনি ফররুখ আহমদের হাতেম তায়ীর [প্রকাশকাল : ১৯৬৬] আলোচনায় [পাকিস্তানী খবর, আগস্ট ১৯৬৬] বলেন :
মুসলিম ঐতিহ্যের ছায়া-ঘেরা এই অপূর্ব অবদান কবিকে চিরদিনের জন্য স্মরণীয় করে রাখবে সন্দেহ নেই। এই ছিল ফররুখ আহমদ সম্পর্কে, তাঁর সমকালীন অজস্র মন্তব্যের মাত্র তিনটি নজির। আর তাঁর মৃত্যুর [১৯ অক্টোবর, ১৯৭৪] পরপরই পত্র-পত্রিকায় যেসব সম্পাদকীয়, নিবন্ধ, শোকবাণী প্রকাশিত হয়েছিল, সে সম্পর্কে তো আজকের অনেকেই পরিচিত আছেন। তবুও সেখান থেকে মাত্র দু’টি সম্পাদকীয় মন্তব্য এখানে তুলে ধরছি :
“ফররুখ আহমদ আর নেই। কবিতার আকাশ থেকে ঝরে পড়ল উজ্জ্বল একটি জ্যোতিষ্ক। তমিস্রা হনন করল আলোর সেই শিখাকে, বাঁকা তলোয়ারের মত ছিল যার তেজ এবং প্রভা।… এই শ্রেষ্ঠ কবির মৃত্যু গোটা বাংলা সাহিত্যকেই দরিদ্র করে দিয়ে গেল না, সেই সঙ্গে এই সাহিত্যের কবিকুল, লেখক আর পাঠকদের আকীর্ণ করল এক আত্মগ্লানিতে যা কখনো স্খালন করা যাবে না।
…তিনি নিজে আজ সে অনন্ত লোকের যাত্রী। কিন্তু তাঁর কবিতাকে স্পর্শ করতে পারবে না মৃত্যু-এটাই আমাদের একমাত্র সান্ত্বনা।” [দৈনিক বাংলা, ২১ অক্টোবর, ১৯৭৪]
এর পরদিন দৈনিক সংবাদ, ২২ অক্টোবর, ১৯৭৪-এ লেখা হয় :
চল্লিশ এবং পঞ্চাশের দশকের প্রথমে একজন প্রখর আধুনিকতাবাদীরূপে এবং পরে ইসলামী জীবনদর্শনের প্রবক্তারূপে কবি ফররুখ আহমদ বাংলা কবিতায় আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন। এই সময় তিনি তাঁর সমসাময়িকদের মধ্যে অনেককেই ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন যশে এবং কৃতিত্বে। তাঁর বক্তব্যে ছিল দুই পর্যায়েই তীব্রতা, শক্তি এবং প্রবলতা।
…তাঁর সৃষ্টিকে আমাদের কাব্য-জগতে মণিঞ্জুষার মধ্যে রাখতে হবে তাঁর সমগ্র সৃষ্টির মূল্যায়ন দ্বারা।”
কবি ফররুখ আহমদ সেইসব ভাগ্যবান কবিদের মধ্যে অন্যতম, যারা কালের মধ্যে বিচরণ করেও হয়েছিলেন কালোত্তীর্ণ। তিনি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং অকুণ্ঠ মূল্যায়ন পেয়েছেন, সংবর্ধিত হয়েছেন, ব্যাপকভাবে আলোচিত এবং উন্মোচিত হয়েছেন তাঁর অগ্রজ, সমসাময়িক, সময়-উত্তর-এমনকি আজকের শতাব্দীর এই প্রজন্মের লেকক, কবি, সমালোচক ও বিপুল-বিশাল পাঠকদের দ্বারা। ফররুখ আহমদ একটি কাল, এমনকি একটি শতাব্দীতেও যে নিঃশেষ হবার মত কবি নন-তাঁর এই দুর্বার চলমানতাই সেই স্বাক্ষর বহন করে।
কবি-সমালোচক আবদুল মান্নান সৈয়দ [১৯৪৩] ফররুখ আহমদকে নিয়েও বিস্তর কাজ করেছেন। বাংলা একাডেমী থেকে তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে ফররুখ রচনাবলীর দু’টি খণ্ড। এ ছাড়াও বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর ফররুখ আহমদ [১৯৮৮], ফররুখ আহমদ জীবন ও সাহিত্য [১৯৯৩]। ফররুখ আহমদ [১৯৮৮] গ্রন্থের প্রসঙ্গ কথায় পঞ্চাশের অন্যতম কবি, গীতিকার ও সমালোচক ড. আবু হেনা মোস্তফা কামাল বলেছেন –
চল্লিশের দশকের কলকাতায় যেসব শক্তিমান আধুনিক কবির আবির্ভাব ফররুখ আহমদ তাঁদের অন্যতম। বিভাগোত্তর কালে তিনি ঢাকায় চলে আসেন এবং একান্তভাবেই সাহিত্যসাধনায় আত্মনিয়োগ করেন। কবিতার বিষয়বস্তু, আঙ্গিক ও ভাষা সম্পর্কে তাঁর নিরীক্ষা কাব্যামোদী ও সমালোচকের সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলো।
সন্দেহ নেই, সমালোচকের সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন কবি ফররুখ আহমদ। সপ্রশংস কিন্তু আবেগমথিত কিংবা অন্ধত্বের দৃষ্টি নয়। স্মরণ করা যাক, ফররুখের ওপর প্রথম একক গ্রন্থরচয়িতা বিশিষ্ট সমালোচক সুনীল কুমার মুখোপাধ্যায়ের কথা। কেমন মেদহীন, নির্ভার এবং যুক্তিগ্রাহ্যভাবে তিনি মূল্যায়ন করেছেন ফররুখ আহমদকে। আবদুল মান্নান সৈয়দের দুটো মন্তব্য, যেটাকে তাঁর ফররুখ সম্পর্কিত বিবেচনায় সারাৎসার বলেও মনে করি-এখানে তুলে ধরছি –
১. বাংলা সাহিত্যের যাঁরা শ্রেষ্ঠ সনেট শিল্পী-মাইকেল মধুসূদন দত্ত, দেবেন্দ্রনাথ সেন, অজিত দত্ত, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বিষ্ণুদে-হয়তো ফররুখ আহমদের নাম একদিন তাঁদেরই সঙ্গে উচ্চারিত হবে ॥ [ফররুখ আহমদ : জীবন ও সাহিত্য : পৃ-১৮২]
২. তাঁর সমকালীন চল্লিশের কবি সংঘের সঙ্গে ফররুখ যুক্ত। এই যুক্ততা কালের হাওয়ার যুক্ততা। ফররুখ আহমদ আবহমান বাংলা কবিতার সঙ্গে যুক্ত। যেমন যুক্ত প্রত্যেক বাঙালি কবি ॥
কবি ফররুখ আহমদ আবদুল মান্নান সৈয়দের ভাষায় : ‘আবহমান বাংলা কবিতার সঙ্গে যুক্ত।’ মন্তব্যটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আর মনে করি, ঐ তাৎপর্যপূর্ণ বৈশিষ্ট্যের কারণেই কবি ফররুখ আহমদ তাঁর কালে, কালোত্তরে ছিলেন অনিবার্য এবং আগামীতেও রয়ে যাবেন সমান প্রয়োজনীয়।
একটি শতাব্দী চলে গেছে। চলছে আর একটি শতাব্দী। স্বাভাবিকভাবেই ইতিহাস ধারণ করতে চাইবে এই শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ মনীষীদের। প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলা কাব্য-সাহিত্যে, এই শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ কবি কারা? কেউ কেউ মনে করেন মাত্র চারজন, মাইকেল, রবীন্দ্র নাথ, নজরুল এবং জীবনানন্দ দাশ।
যারা উপরোক্ত চারজনকে শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ কবি বলে মনে করেন এবং যে তালিকাতে জীবনানন্দ দাশও আছেন, সেই তালিকা থেকে কোন বিবেচনায় তাহলে ফররুখ আহমদকে বাদ দেয়া যায়? কোন যুক্তিতে?
বাংলাদেশের যে দু-একজন সমালোচক-গবেষক এখনও ফররুখ চর্চা করছেন, তাদের একাধিক লেখাতেই তো ফররুখের শ্রেষ্ঠত্ব বিম্বিত হয়েছে। ফররুখ আলোচনার সূত্রপাত থেকে আজ পর্যন্ত সবাই তো তাঁকে শ্রেষ্ঠত্বের আসনেই রেখেছেন। রেখেছেন যুক্তির মাধ্যমে, আলোচনা এবং সুচিন্তিত বিবেচনার মাধ্যমে। কিন্তু যিনি, যে ফররুখ আহমদ এতটা শ্রেষ্ঠ, এতটা অনিবার্য, এতটা কালোত্তীর্ণ তিনি কিভাবে শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ কবিদের বাইরে থাকেন, কিংবা থাকতে পারেন?-বিস্ময়টা ঐখানেই।
তাহলে কি দ্বিধার করাতে এখনও কেটে যাচ্ছে বিবেক? তাহলে কি এখনও সুস্থির নন তারা ফররুখ বিবেচনায়? প্রশ্নটা উঠতেই পারে।
কিন্তু তার চেয়েও জরুরি বিষয় হলো-এই শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ কবিদের তালিকায় ফররুখ সংযুক্ত আছেন কি না। মীমাংসাটা করার দায়িত্ব বর্তায় ফররুখ চর্চাকারীদের ওপরই। যারা তাঁর ওপর একাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন, এখনও লিখছেন অবিরত।
তবে পাঠকদেরও একটা রায় আছে। সেই রায়েরও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। যেমন কালিদাস, আলাওল, হাফিজ, গালিব কিংবা ইকবাল, রবীন্দ্র, নজরুলÑএদেরকে পাঠক পড়ে আসছেন তাঁদের স্বনির্বাচনেই। না, এখানে সমালোচক বা তাঁদের ওপর গ্রন্থ রচয়িতাদের কোনো ভূমিকা নেই। সাধারণ পাঠকেরা সমালোচকের সমালোচনা পড়ে কোনো কবির কবিতার প্রতি আকৃষ্ট কিংবা বিদ্বিষ্ট হন না। কবি তাঁর শক্তি এবং যোগ্যতার কারণেই আসন করে নেন পাঠকের হৃদয়ে। পাঠক দ্বারাই তাঁরা নির্বাচিত এবং পঠিত হন। হতে থাকেন কাল থেকে কালে, শতাব্দীর পর শতাব্দী। এরও একটা ধারাবাহিকতা আছে, আছে স্রোতধারা। কিন্তু সম্পর্কটা কেবল কবির কবিতা এবং পাঠক। আর সময় বা কালই হলো এই দুই স্রোতের মোহনা।
সন্দেহ নেই, বাংলা কবিতার সাথে, কবিতা পাঠকের সাথে ফররুখ আহমদ গড়ে তুলেছেন যে সেতুবন্ধন, তার পরম্পরা এবং ধারাবাহিকতা চলতে থাকবে শতাব্দীর পর শতাব্দী। এখানেই জয়ী কবি ফররুখ আহমদ এবং তাঁর পাঠক।
লেখক : কবি ও সম্পাদক
নতুন কলম ও নতুন কিশোরকণ্ঠ

SHARE

Leave a Reply