শত্রুর মোকাবিলায় দৃঢ়তা অবলম্বন ও আল্লাহর ওপর ভরসা – ড. মুহাম্মাদ আব্দুল মান্নান

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا لَقِيتُمْ فِئَةً فَاثْبُتُوا وَاذْكُرُوا اللَّهَ كَثِيرًا لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ (৪৫) وَأَطِيعُوا اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَلَا تَنَازَعُوا فَتَفْشَلُوا وَتَذْهَبَ رِيحُكُمْ وَاصْبِرُوا إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ (৪৬) وَلَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ خَرَجُوا مِنْ دِيَارِهِمْ بَطَرًا وَرِئَاءَ النَّاسِ وَيَصُدُّونَ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ وَاللَّهُ بِمَا يَعْمَلُونَ مُحِيطٌ (৪৭) وَإِذْ زَيَّنَ لَهُمُ الشَّيْطَانُ أَعْمَالَهُمْ وَقَالَ لَا غَالِبَ لَكُمُ الْيَوْمَ مِنَ النَّاسِ وَإِنِّي جَارٌ لَكُمْ فَلَمَّا تَرَاءَتِ الْفِئَتَانِ نَكَصَ عَلَى عَقِبَيْهِ وَقَالَ إِنِّي بَرِيءٌ مِنْكُمْ إِنِّي أَرَى مَا لَا تَرَوْنَ إِنِّي أَخَافُ اللَّهَ وَاللَّهُ شَدِيدُ الْعِقَابِ (৪৮)
অনুবাদ
(৪৫) হে ঈমানদারগণ, তোমরা কোনো বাহিনীর সাথে যখন সংগ্রামে লিপ্ত হও, তখন দৃঢ় পদে অবিচল থাক আর আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ করতে থাক যেন তোমাদের উদ্দেশ্য সফল হয়। (৪৬) আর আল্লাহ তা’আলার আনুগত্য কর এবং তাঁর রাসূলের। অতঃপর তোমরা পরস্পরে বিবাদে জড়িয়ে পড়ো না। যদি এমন কর, তাহলে তোমরা শক্তিহীন হয়ে পড়বে এবং তোমাদের প্রভাব নষ্ট হবে। আর তোমরা ধৈর্য ধারণ কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা রয়েছেন ধৈর্যশীলদের সাথে। (৪৭) আর তাদের মতো হয়ো না, যারা নিজেদের অবস্থান থেকে বেরিয়েছে গর্বিতভাবে এবং লোকদেরকে দেখানোর উদ্দেশ্যে। অতঃপর তারা আল্লাহর পথে বাধা দান করত। বস্তুত তারা যা করে সে সব বিষয় আল্লাহর নিয়ন্ত্রণেই আছে। (৪৮) আর শয়তান যখন তাদের কার্যকলাপকে তাদের দৃষ্টিতে শোভনীয় করে দিলো এবং বলল যে, ‘আজকের দিনে কোনো মানুষই তোমাদের ওপর বিজয়ী হতে পারবে না আর আমি হলাম তোমাদের সমর্থক।’ অতঃপর যখন সামনাসামনি হলো উভয় বাহিনী তখন সে অতি দ্রুত পেছনে পালিয়ে গেল এবং বলল, ‘আমি তোমাদের সাথে নেই- আমি দেখছি, যা তোমরা দেখছ না; আমি ভয় করি আল্লাহকে।’ আর আল্লাহর আজাব অত্যন্ত কঠিন। (সূরা আনফাল: ৪৫-৪৮)

নামকরণ
প্রথম আয়াতে উল্লিখিত الْأَنْفَالِ শব্দটি থেকে এ সূরাটির নামকরণ করা হয়েছে। الْأَنْفَالِ শব্দটি আরবি نْفَل থেকে উদ্ভূত। আনফাল বহুবচন। এর একবচন হচ্ছে ‘নফল’। আরবি ভাষায় ওয়াজিব অথবা যথার্থ অধিকার ও মূল পাওনার অতিরিক্তকে নফল বলা হয়। এ ধরনের নফল যদি কোনো অধীনের পক্ষ থেকে হয়, তাহলে তার অর্থ হয়, গোলাম নিজের প্রভুর জন্য স্বেচ্ছাকৃতভাবে অবশ্য পালনীয় কর্তব্যের চেয়ে বাড়তি কিছু কাজ করেছে। আর যখন তা মালিক বা কর্তার পক্ষ থেকে হয়, তখন তার অর্থ হয়, এমন ধরনের দান বা পুরস্কার যা প্রভুর পক্ষ থেকে বান্দা বা গোলামকে তার যথার্থ পাওনা ও অধিকারের অতিরিক্ত বা বখশিশ হিসেবে দেয়া হয়েছে। কাজেই এখানে এ বক্তব্যের অর্থ হচ্ছে, আল্লাহর দেয়া পুরস্কার ও অনুগ্রহ সম্পর্কেই কি এ সমস্ত বাদানুবাদ, জিজ্ঞাসাবাদ ও কলহ-বিতর্ক চলছে? যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে তোমরা কবেই বা তার মালিক ও সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হলে যে, তোমরা নিজেরাই তা বণ্টন করার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলে? যিনি এ সম্পদ দান করেছেন তিনিই সিদ্ধান্ত দেবেন, কাকে দেয়া হবে, কাকে দেয়া হবে না এবং যাকে দেয়া হবে কতটুকু দেয়া হবে?
অনেক সাহাবী এ সূরাটিকে সূরাতুল বদর হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

নাজিলের সময়কাল
এ সূরাটি দ্বিতীয় হিজরিতে বদর যুদ্ধের পরে নাযিল হয়। রাসূলুল্লাহ সা.-এর মদীনায় হিজরতের পর নাজিল হয়েছে, তাই সূরাটি মাদানী।

আলোচ্য বিষয়
১. যুদ্ধ সম্পর্কিত নৈতিক গুণাবলীর আলোচনা করা হয়েছে।
২. যুদ্ধলব্ধ সম্পদের বিধান সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
৩. ইসলামী রাষ্ট্রের শাসনতান্ত্রিক আইনের কতিপয় ধারা বর্ণনা করা হয়েছে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
এ সূরাটি পর্যালোচনা করার আগে বদরের যুদ্ধ এবং তার সাথে সম্পর্কিত অবস্থা ও ঘটনাবলীর ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন। মাক্কী জীবনের রাসূল সা.-এর দাওয়াত মানুষের হৃদয় ও মস্তিষ্কের গভীরে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছিল। জাহেলিয়াতের হিংসা, সঙ্কীর্ণতার প্রাচীর এ দাওয়াতের গতিপথকে কোনোক্রমেই রোধ করতে পারছিল না। এ কারণে আরবের প্রাচীন জাহেলি ব্যবস্থার সমর্থক শ্রেণী প্রথম দিকে একে হালকাভাবে এবং অবজ্ঞার চোখে দেখলেও মক্কী যুগের শেষের দিকে একে একটি গুরুতর বিপদ বলে মনে করছিল। তাই এ দাওয়াত এবং এ দাওয়াতের অনুসারীদেরকে পুরোপুরি শেষ করে দেওয়ার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করতে চাচ্ছিল। কিন্তু তখন পর্যন্ত এ দাওয়াতের মধ্যে কোন কোন দিক দিয়ে বেশ কিছুটা অভাব থেকে গিয়েছিল।
এক: যদিও মক্কায় ইসলামের অনুসারীরা কুরাইশদের জুলুম নির্যাতন বরদাশত করে নিজেদের ঈমানের অবিচলতা ও নিষ্ঠা এবং ইসলামের সাথে তাদের অটুট সম্পর্কের পক্ষে বেশ বড় আকারের প্রমাণ পেশ করেছিল, তবুও এ কথা প্রমাণিত হওয়া তখনও বাকি ছিল যে, ইসলামী আন্দোলন এমন একদল উৎসর্গিত প্রাণ অনুসারী পেয়ে গেছে যারা নিজেদের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের মোকাবিলায় অন্য কোন জিনিসকেই প্রিয়তর মনে করে না। বস্তুত এ কথা প্রমাণ করার জন্য তখনো অনেক পরীক্ষারও প্রয়োজন ছিল।
দুই: এ দাওয়াতের আওয়াজ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়লেও এর প্রভাবগুলো ছিল চারদিকে বিক্ষিপ্ত ও অসংহত। এ দাওয়াত যে জনশক্তি সংগ্রহ করেছিল তা এলোমেলো অবস্থায় সারাদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। পুরাতন জাহেলি ব্যবস্থার সাথে চূড়ান্ত মোকাবিলার জন্য যে ধরনের সামষ্টিক শক্তির প্রয়োজন ছিল তখনও তা অর্জিত হয়নি।
তিন: এ দাওয়াত তখনও মাটিতে কোথাও শিকড় গাড়তে পারেনি। দেশের অভ্যন্তরে এমন কোনো এলাকা ছিল না যেখানে দৃঢ়পদ হয়ে নিজের ভূমিকাকে সুসংহত করে সে সামনের দিকে এগিয়ে যাবার জন্য প্রচেষ্ট চালাতে পারতো। তখন পর্যন্ত যেখানেই যে মুসলমান ছিল, কুফর ও শিরকে নিমজ্জিত সমাজব্যবস্থার মধ্যে তার অবস্থান ছিল ঠিক খালি পেটে গেলা কুইনিনের মতো।
চার: সে সময় পর্যন্ত এ দাওয়াত বাস্তব জীবনের কার্যাবলী নিজের হাতে পরিচালনা করার সুযোগ পায়নি। তখনো সে তার নিজস্ব সভ্যতা সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হয়নি। নিজস্ব অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা রচনাও তার পক্ষে সম্ভব হয়নি। অন্যান্য শক্তির সাথে তার যুদ্ধ ও সন্ধির কোনো ঘটনাই ঘটেনি। তাই যেসব নৈতিক বিধানের ভিত্তিতে এ দাওয়াত সমগ্র দেশ ও সমাজকে প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত করতে চাচ্ছিল তার প্রদর্শনীও করা যায়নি। আর এ দাওয়াতের বাণীবাহক ও তাঁর অনুসারীরা যে জিনিসের দিকে সমগ্র দুনিয়াবাসীকে আহবান জানিয়ে আসছিলেন তাকে কার্যকর করার ব্যাপারে তারা নিজেরা কতটুকু নিষ্ঠাবান, এখনো কোনো পরীক্ষার মানদ-ে যাচাই করার পর তার সুস্পষ্ট চেহারাও সামনে আসেনি।
মক্কী যুগের শেষ তিন-চার বছরে ইয়াসরিবে ইসলামের আলো ছড়িয়ে পড়তে থাকে অপ্রতিহত গতিতে। সেখানকার লোকেরা আরবের অন্যান্য এলাকার গোত্রগুলোর তুলনায় অধিকতর সহজ ও নির্দ্বিধায় এ আলো গ্রহণ করতে থাকে। শেষে নবুওয়াতের দ্বাদশ বছরে হজের সময় ৭৫ জনের একটি প্রতিনিধিদল রাতের আঁধারে নবী সা.-এর সাথে সাক্ষাৎ করলো, তারা কেবল ইসলামই গ্রহণ করলো না বরং তাঁকে ও তাঁর অনুসারীদের নিজের শহরে স্থান দেয়ারও আগ্রহ প্রকাশ করলেন। এটি ছিল ইসলামের ইতিহাসে এক বৈপ্লবিক পটপরিবর্তন। মহান আল্লাহ তাঁর নিজ অনুগ্রহে এ দুর্লভ সুযোগটি দিয়েছিলেন, নবী সা.ও হাত বাড়িয়ে তা লুফে নিয়েছিলেন। ইয়াসরিববাসীরা নবী সা.-কে শুধুমাত্র একজন শরণার্থী হিসেবে নয় বরং আল্লাহর প্রতিনিধি এবং নেতা ও শাসক হিসেবেও আহবান করেছিলেন। আর তাঁর অনুসারীদেরকে তাঁরা একটি অপরিচিত দেশে নিছক মুহাজির হিসেবে বসবাস করার জন্য আহবান জানাচ্ছিলেন না। বরং আরবের বিভিন্ন এলাকায় ও বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে যেসব মুসলমান ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল তাঁদের সবাইকে ইয়াসরিবে জমা করে ইয়াসরিবি মুসলমানদের সাথে মিলে একটি সুসংবদ্ধ সমাজ গড়ে তোলাই ছিল এর উদ্দেশ্য। এভাবে মূলত ইয়াসরিব নিজেকে “মদীনাতুল ইসলাম” তথা ইসলামের নগর হিসেবে উপস্থাপন করলো। নবী সা. তাঁদের আহবানে সাড়া দিয়ে সেখানে আরবের প্রথম দারুল ইসলাম গড়ে তুললেন।
এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণের অর্থ কী হতে পারে সে সম্পর্কে মদীনাবাসীরা অনবহিত ছিল না। এর পরিষ্কার অর্থ ছিল, একটি ছোট্ট শহর সারাদেশের উদ্যত তরবারি এবং সমগ্র দেশবাসীর অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বয়কটের মোকাবিলায় নিজেকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। কাজেই আকাবার বাইআত গ্রহণ করার সময় সেদিনের সেই রাত্রিকালীন মজলিসে ইসলামের প্রাথমিক সাহায্যকারীরা এ পরিণাম সম্পর্কে পুরোপুরি জেনে বুঝেই নবী সা.-এর হাতে নিজেদের হাত রেখেছিলেন। যখন এ বাইআত অনুষ্ঠিত হচ্ছিল ঠিক তখনই ইয়াসরিবি প্রতিনিধিদলের সর্বকনিষ্ঠ যুব সদস্য আসআদ ইবন যুরারাহ (রা) বলে উঠলেন:
رويدا يا أهل يثرب: فإنا لم نضرب إليه أكباد الابل إلا ونحن نعلم أنه رسول الله، وإن إخراجه اليوم مناوأة للعرب كافة وقتل خياركم، [ وأن ] تعضكم السيوف.فإما أنتم قوم تصبرون على ذلك فخذوه وأجركم على الله، وأما أنتم قوم تخافون من أنفسكم خيفة فذروه.
فبينوا ذلك فهو أعذر لكم عند الله.
“থামো, হে ইয়াসরিববাসীরা! আমরা একথা জেনে বুঝেই এঁর কাছে এসেছি যে, ইনি আল্লাহর রাসূল এবং আজ এঁকে এখান থেকে বের করে নিয়ে যাওয়া মানে হচ্ছে সমগ্র আরবের শত্রুতার ঝুঁকি নেয়া। এর ফলে তোমাদের শিশু সন্তানদেরকে হত্যা করা হবে এবং তোমাদের উপর তরবারি বর্ষিত হবে। কাজেই তোমাদের যদি এ আঘাত সহ্য করার ক্ষমতা থাকে তাহালে এর দায়িত্ব গ্রহণ করো। আল্লাহ এর প্রতিদান দেবেন। আর যদি তোমরা নিজেদের প্রাণকে প্রিয়তর মনে করে থাকো তাহলে দায়িত্ব ছেড়ে দাও এবং পরিষ্কার ভাষায় নিজেদের অক্ষমতা জানিয়ে দাও। কারণ এ সময় অক্ষমতা প্রকাশ করা আল্লাহর কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য হতে পারে।”
প্রতিনিধিদলের আর একজন সদস্য আব্বাস ইবন উবাদাহ ইবনে নাদলাহ (রা) এ কথারই পুনরাবৃত্তি করেন এভাবে-
هل تدرون علام تبايعون هذا الرجل ؟ قالوا: نعم ! قال إنكم تبايعونه على حرب الاحمر والاسود من الناس، فإن كنتم ترون أنكم إذا أنهكت أموالكم مصيبة، وأشرافكم قتلا أسلمتموه فمن الآن فهو والله إن فعلتم خزي الدنيا والآخرة، وإن كنتم ترون أنكم وافون له له بما دعوتموه إليه على نهكة الاموال وقتل الاشراف فخذوه، فهو والله خير الدنيا والآخرة.
“তোমরা কি জানো! এ ব্যক্তির হাতে কিসের বাইআত করছো? তারা বললো: হ্যাঁ। আমরা জানি। তোমরা এর হাতে বাইআত করে সারা দুনিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার ঝুঁকি নিচ্ছো। কাজেই যদি তোমরা মনে করে থাকো, যখন তোমাদের ধন-সম্পদ ধ্বংসের মুখোমুখি হবে এবং তোমাদের নেতৃস্থানীয় লোকদের নিহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেবে তখন তোমরা একে শত্রুদের হাতে সোপর্দ করে দেবে, তাহলে বরং আজই এঁকে ত্যাগ করাই ভালো। কারণ আল্লাহর কসম! এটা দুনিয়া ও আখেরাতের সবখানেই লাঞ্ছনার কারণ হবে। আর যদি তোমরা মনে করে থাকো, এ ব্যক্তিকে তোমরা যে আহবান জানাচ্ছো, নিজেদের ধন-সম্পদ ধ্বংস ও নেতৃস্থানীয় লোকদের জীবন নাশ সত্ত্বেও তোমরা তা পালন করতে প্রস্তুত থাকবে, তাহলে অবশ্যি তাঁর হাত আঁকড়ে ধরো। কারণ আল্লাহর কসম, এরই মধ্যে রয়েছে দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ।”
এ কথায় প্রতিনিধিদলের সবাই এক বাক্যে বলে উঠলেন-
فإنا نأخذه على مصيبة الأموال وقتل الأشراف
আমরা এঁকে গ্রহণ করে আমাদের ধন-সম্পদ ধ্বংস করতে ও নেতৃস্থানীয় লোকদের নিহত হওয়ার ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত।
এ ঘটনার পর সেই ঐতিহাসিক বাইআত অনুষ্ঠিত হয়। ইতিহাসে একে আকাবার দ্বিতীয় বাইআত বলা হয়।
অন্য দিকে মক্কাবাসীর কাছেও ঘটনাটির তাৎপর্য ছিল সুবিদিত। ইতঃপূর্বে কুরাইশরা মুহাম্মাদ সা.-এর বিপুল প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ও অসাধারণ যোগ্যতার সাথে পরিচিত হয়েছিল এবং এখন সেই মুহাম্মাদই সা. যে, একটি আবাস লাভ করতে যাচ্ছিলেন, তা তারা বেশ অনুধাবন করতে পারছিল। তাঁর নেতৃত্বে ইসলামের অনুসারীরা যে একটি সুসংগঠিত দলের আকারে অচিরেই গড়ে উঠবে এবং সমবেত হবে এ কথাও তারা বুঝতে পারছিল। আর ইসলামের এ অনুসারীরা সংকল্পে কত দৃঢ়, নিষ্ঠা ও আত্মত্যাগে কত অবিচল, এতদিনে সেটা তাদের কাছে অনেকটা পরীক্ষিত হয়ে গিয়েছিল। এহেন সত্যাভিসারী কাফেলার এ নব উত্থান পুরাতন ব্যবস্থার জন্য মৃত্যুর ঘণ্টাস্বরূপ। তা ছাড়া মদীনার মত জায়গায় এই মুসলিম শক্তির একত্র সমাবেশ কুরাইশদের জন্য আরো নতুন বিপদের সঙ্কেত দিচ্ছিল। কারণ লোহিত সাগরের কিনারা ধরে ইয়েমেন থেকে সিরিয়ার দিকে যে বাণিজ্য পথটি চলে গিয়েছিল তার সংরক্ষিত ও নিরাপদ থাকার ওপর কুরাইশ ও অন্যান্য বড় বড় গোত্রের অর্থনৈতিক জীবন ধারণ দুর্বিষহ করে তুলতে পারতো। এ প্রধান বাণিজ্যপথের ভিত্তিতে শুধুমাত্র মক্কাবাসীদের যে ব্যবসায় চলতো তার পরিমাণ ছিল বছরে প্রায় আড়াই লাখ আশরাফি। তায়েফ ও অন্যান্য স্থানের ব্যবসা ছিল এর বাইরে। কুরাইশরা এ পরিণতির কথা ভালোভাবেই জানতো। যে রাতে আকাবার বাইআত অনুষ্ঠিত হলো সে রাতেই এ ঘটনার উড়ো খবর মক্কাবাসীর কানে পৌঁছে গেল। আর সাথে সাথেই সেখানে হইচই শুরু হয়ে গেল। প্রথমে তারা চেষ্টা করলো মদীনাবাসীদেরকে নবী সা.-এর দল থেকে ভাগিয়ে নিতে। তারপর যখন মুসলমানরা একজন দু’জন করে মদীনায় হিজরত করতে থাকলো এবং কুরাইশদের দৃঢ় বিশ্বাস জন্মে গেল যে, এখন মুহাম্মাদও সা. সেখানে স্থানান্তরিত হয়ে যাবেন তখন তারা এ বিপদকে ঠেকিয়ে রাখার জন্য সর্বশেষ উপায় অবলম্বনে এগিয়ে এলো। রাসূল সা.-এর হিজরতের মাত্র কয়েকদিন আগে কুরাইশদের পরামর্শ সভা বসলো। অনেক আলোচনা-পর্যালোচনার পর সেখানে স্থির হলো, বনি হাশেম ছাড়া কুরাইশদের প্রত্যেক গোত্র থেকে একজন করে লোক বাছাই করা হবে, হাশেমের জন্য এ সমস্ত গোত্রের সাথে একাকী লড়াই করা কঠিন হবে। কাজেই এ ক্ষেত্রে তারা প্রতিশোধের পরিবর্তে রক্তমূল্য গ্রহণ করতে বাধ্য হবে। কিন্তু আল্লাহর মেহেরবানি এবং নবী সা.-এর আল্লাহর নির্ভরতা ও উন্নত কৌশল অবলম্বনের কারণে তাদের সব চক্রান্ত ব্যর্থ হয়ে গেল। ফলে রাসূলুল্লাহ সা. নির্বিঘেœ মদীনায় পৌঁছে গেলেন। এভাবে হিজরত প্রতিরোধে ব্যর্থ হয়ে কুরাইশরা মদীনার সরদার আবদুল্লাহ ইবন উবাইকে পত্র লিখলো, “তোমরা আমাদের লোককে তোমাদের ওখানে আশ্রয় দিয়েছো। আমরা এ মর্মে আল্লাহর কসম খেয়েছি, হয় তোমরা তার সাথে লড়বে বা তাকে সেখান থেকে বের করে দেবে। অন্যথায় আমরা সবাই মিলে তোমাদের উপর আক্রমণ করবো এবং তোমাদের পুরুষদের হত্যা ও মেয়েদের বাঁদী বানাবো।”
কুরাইশদের এ উসকানির মুখে আবদুল্লাহ ইবন উবাই কিছু দুষ্কর্ম করার চক্রান্ত করেছিল। কিন্তু সময়মত নবী সা. তার দুষ্কর্ম রুখে দিলেন। তারপর মদীনার প্রধান সাদ ইবন মুআয উমরাহ করার জন্য মক্কা গেলেন। সেখানে হারাম শরীফের দরজার উপর আবু জেহেল তার সমালোচনা করে বললো-
ألا أراك تطوف بمكة آمنا وقد أو يتم الصباة وزعمتم أنكم تنصرونهم وتعينونهم أما والله لولا أنك مع أبي صفوان ما رجعت إلى أهلك سالما،
“তোমরা আমাদের ধর্মত্যাগীদেরকে আশ্রয় দেবে এবং তাদেরকে সাহায্য-সহযোগিতা দান করবে আর আমরা তোমাদেরকে অবাধে মক্কায় তাওয়াফ করতে দেবো ভেবেছো? যদি তুমি আবু সুফিয়ান তথা উমাইয়াহ ইবন খালফের মেহমান না হতে তাহলে তোমাকে এখান থেকে প্রাণ নিয়ে দেশে ফিরে যেতে দিতাম না। ”
সাদ জবাবে বললেন-
أما والله لئن منعتني هذا لامنعنك ما هو أشد عليك منه طريقك على المدينة.
“আল্লাহর কসম! যদি তুমি আমাকে এ কাজে বাধা দাও তাহলে আমি তোমাকে এমন জিনিস থেকে রুখে দেবো, যা তোমার জন্য এর থেকে অনেক বেশি মারাত্মক। অর্থাৎ মদীনা থেকে তোমাদের যাতায়াতের পথ বন্ধ করে দেবো।”
অর্থাৎ এভাবে মক্কাবাসীদের পক্ষ থেকে যেন এ কথা ঘোষণা করে দেয়া হলো যে, বায়তুল্লাহ জিয়ারত করার পথ মুসলমানদের জন্য বন্ধ। আর এর জবাবে মদীনাবাসীদের পক্ষ থেকে বলা হলো, সিরিয়ার সাথে বাণিজ্য করার পথ ইসলাম বিরোধীদের জন্য বিপদসঙ্কুল। আসলে সে সময় মুসলমানদের জন্য উল্লিখিত বাণিজ্যপথের ওপর নিজেদের কর্তৃত্ব মজবুত করা ছাড়া দ্বিতীয় কোনো উপায় ছিল না। কারণ এ পথের সাথে কুরাইশ ও অন্যান্য গোত্রগুলোর স্বার্থ বিজড়িত ছিল। ফলে এর উপর মুসলমানদের কর্তৃত্ব বেশি মজবুত হলে তারা ইসলাম ও মুসলমানদের ব্যাপারে নিজেদের শত্রুতামূলক নীতি পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য হতে পারে আশা করা যায়। কাজেই মদীনায় পৌঁছার সাথে সাথেই নবী সদ্যোজাত ইসলামী সমাজে প্রাথমিক নিয়মশৃঙ্খলা বিধান ও মদীনার ইহুদি অধিবাসীদের সাথে চুক্তি সম্পাদন করার পর সর্বপ্রথম এ বাণিজ্য পথটির প্রতি নজর দিলেন। এ ব্যাপারে তিনি দু’টি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা অবলম্বন করলেন।
প্রথমত মদীনা ও লোহিত সাগরের উপকূলের মধ্যবর্তীস্থলে এ বাণিজ্য পথের আশপাশে যেসব গোত্রের বসতি ছিল তাদের সাথে তিনি আলাপ-আলোচনা শুরু করে দিলেন। এভাবে তাদেরকে সহযোগিতামূলক মৈত্রী অথবা কমপক্ষে নিরপেক্ষতার চুক্তিতে আবদ্ধ করাই ছিল এর মূল উদ্দেশ্য। এ ক্ষেত্রে তিনি পূর্ণ সফলতা লাভ করলেন। সর্বপ্রথম নিরপেক্ষতার চুক্তি অনুষ্ঠিত হলো সাগর তীরবর্তী পার্বত্য এলাকার জুহাইনা গোত্রের সাথে। এ গোত্রটির ভূমিকা এ এলাকায় ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারপর প্রথম হিজরির শেষের দিকে চুক্তি অনুষ্ঠিত হলো বনি যামরার সাথে। এ গোত্রটির অবস্থান ছিল ইয়াম্বু ও যুল আশিরার সন্নিহিত স্থানে এটি ছিল প্রতিরক্ষামূলক সহযোগিতার চুক্তি। দ্বিতীয় হিজরির মাঝামাঝি সময়ে বনি মুদলিজও এ চুক্তিতে শামিল হলো। কারণ এ গোত্রটি ছিল বনি যামরার প্রতিবেশী ও বন্ধু গোত্র। এ ছাড়াও ইসলাম প্রচারের ফলে এ গোত্রগুলোতে ইসমলামের সমার্থক ও অনুসারীদের একটি বিরাট গোষ্ঠী সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল।
দ্বিতীয়ত কুরাইশদের সওদাগরি কাফেলাগুলোকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে তোলার জন্য বাণিজ্যপথের উপর একের পর এক ছোট ছোট ঝটিকা বাহিনী পাঠাতে থাকলেন। কোন কোন ঝটিকা বাহিনীর সাথে তিনি নিজেও গেলেন। প্রথম বছর এ ধরনের চারটি বাহিনী পাঠানো হলো। মাগাযী (যুদ্ধ ইতিহাস) গ্রন্থগুলোতে এগুলোকে সারিয়া হামযা, সারিয়া উবাইদা ইবন হারেস, সারিয়া সাদ ইবন আবি ওয়াক্কাস ও গাযওয়াতুল আবওয়া নামে অভিহিত করা হয়েছে। দ্বিতীয় বছরের প্রথম দিকের মাসগুলোয় একই দিকে আরো দু’টি আক্রমণ চালানো হলো। মাগাযি গ্রন্থগুলোতে একে বুয়াত ও যুল আশিরা নামে উল্লেখ করা হয়েছে। এ সমস্ত অভিযানের দু’টি বৈশিষ্ট্য উল্লেখযোগ্য।
এক. এ অভিযানগুলোয় কোনো রক্তপাতের ঘটনা ঘটেনি এবং কোনো কাফেলাও লুণ্ঠিত হয়নি। এ থেকে এ কথা পরিষ্কার হয়ে যায় যে, এর মাধ্যমে কুরাইশদেরকে বাতাসের গতি কোন দিকে তা জানিয়ে দেয়াই ছিল মূল উদ্দেশ্য।
দুই. এর মধ্য থেকে কোন একটি বাহিনীতেও নবী সা. মদীনার কোন একটি লোককেও শামিল করেননি। মক্কা থেকে আগত মুহাজিরদেরকেই তিনি এসব বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করেন। কারণ এর ফলে যদি সংঘর্ষ বাধে তাহলে তা যেন কুরাইশদের পরিবারগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। অন্য গোত্রগুলো যেন এর সাথে জড়িয়ে পড়ে এ আগুনকে চারদিকে ছড়িয়ে না দেয়। ওইদিকে মক্কাবসীরাও মদীনার দিকে লুটেরা বাহিনী পাঠাতে থাকে। তাদেরই একটি বাহিনী কুরয ইবন যাবেরের নেতৃত্বে একেবারে মদীনার কাছাকাছি এলাকায় হামলা চালিয়ে মদীনাবাসীদের গৃহপালিত পশু লুট করে নিয়ে যায়। এ ব্যাপারে কুরাইশরা এ সংঘর্ষের মধ্যে অন্যান্য গোত্রদেরকেও জড়িয়ে ফেলার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল। তা ছাড়া তারা কেবল ভয় দেখিয়েই ক্ষান্ত হচ্ছিল না, লুটতরাজও শুরু করে দিয়েছিল। এ অবস্থায় দ্বিতীয় হিজরির শাবান মাসে কুরাইশদের একটি বিরাট বাণিজ্য কাফেলা সিরিয়া থেকে মক্কার পথে অগ্রসর হয়ে এমন এক জায়গায় পৌঁছে গিয়েছিল যে জায়গাটি ছিল মদীনাবাসীদের আওতার মধ্যে। এ কাফেলার সাথে ছিল প্রায় পঞ্চাশ হাজার আশরাফির সামগ্রী। তাদের সাথে তিরিশ চল্লিশ জনের বেশি রক্ষী ছিল না। যেহেতু পণ্য সামগ্রী ছিল বেশি এবং রক্ষীর সংখ্যা ছিল কম আর আগের অবস্থার কারণে মুসলমানদের কোনো শক্তিশালী দলের তাদের উপর অতর্কিত আক্রমণ করার আশঙ্কা ছিল অত্যন্ত প্রবল, তাই কাফেলা সরদার আবু সুফিয়ান এ বিপদ স্থানে পৌঁছেই সাহায্য আনার জন্য এক ব্যক্তিকে মক্কা অভিমুখে পাঠিয়ে দিলো। লোকটি মক্কায় পৌঁছেই প্রাচীন প্রথা অনুযায়ী নিজের উটের কান কেটে ফেললো, তার নাক চিরে দিলো, উটের পিঠের আসন উল্টে দিলো এবং নিজের জামা সামনের দিকে ও পিছনের দিকে ছিঁড়ে ফেলে এই বলে চিৎকার করতে থাকলো-
اللطيمة اللطيمة، أموالكم أموالكم مع أبي سُفْيان، قد عرض لها مُحَمَّد وأصحابه، الغوث الغوثَ.
“হে কুরাইশরা! তোমাদের বাণিজ্য কাফেলার খবর শোন। আবু সুফিয়ানের সাথে তোমাদের যে সম্পদ আছে, মুহাম্মদ তার সঙ্গী সাথীদের নিয়ে তার পিছনে ধাওয়া করেছে। তোমাদের তা পাবার আশা নেই। সাহায্যের জন্য দৌড়ে চলো। সাহায্যের জন্য দৌড়ে চলো।”
এ ঘোষণা শুনে সারা মক্কায় বিরাট আলোড়ন সৃষ্টি হয়ে গেল। কুরাইশদের বড় বড় সরদাররা সবাই যুদ্ধের জন্য তৈরি হলো। প্রায় এক হাজার যোদ্ধা রণসাজে সজ্জিত হয়ে পূর্ণ আড়ম্বর ও জাঁকজমকের সাথে যুদ্ধক্ষেত্রে রওয়ানা হলো। তাদের মধ্যে ছিল ছয়শত বর্মধারী ও একশজন অশ্বারোহী। নিজেদের কাফেলাকে শুধু নিরাপদে মক্কায় নিয়ে আসাই তাদের কাজ ছিল না বরং এই সঙ্গে তারা নিত্যদিনের আশঙ্কা এবং আতঙ্কবোধ চিরতরে খতম করে দিতে চাইলো। মদীনার এ বিরোধী শক্তির নতুন সংযোজনকে তারা গুঁড়িয়ে দিতে এবং এর আশপাশের গোত্রগুলোকে এত দূর সন্ত্রস্ত করে তুলতে চাচ্ছিল যার ফলে ভবিষ্যতে এ বাণিজ্য পথটি তাদের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ হয়ে যায়।
নবী সা. চলমান ঘটনাবলীর উপর সব সময় সজাগ দৃষ্টি রাখতেন। তিনি উদ্ভূত পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে অনুভব করলেন যেন চূড়ান্ত মীমাংসার সময় এসে গেছে। তিনি ভাবলেন এ সময় যদি একটি সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হয় তাহলে ইসলামী আন্দোলন চিরকালের জন্য নিষ্প্রাণ হয়ে পড়বে। বরং এরপর এ আন্দোলনের জন্য হয়তো আবার মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার আর কোনো সুযোগই থাকবে না। মক্কা থেকে হিজরত করে এ নতুন শহরে আসার পর এখনো দু’টি বছরও পার হয়ে যায়নি। মুহাজিররা বিত্ত সরঞ্জামহীন, আনসাররা অনভিজ্ঞ, ইহুদি গোত্রগুলো বিরুদ্ধবাদিতায় মুখর খোদ মদীনাতেই মুনাফিক ও মুশরিকদের বিরাট একটি গোষ্ঠী উপস্থিত এবং চারপাশের সমস্ত গোত্র কুরাইশদের ভয়ে ভীত। আর সেই সঙ্গে ধর্মীয় দিক দিয়েও তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল। এ অবস্থায় যদি কুরাইশরা মদীনা আক্রমণ করে তাহলে মুসলমানদের এ ক্ষুদ্র দলটি নিশ্চি‎হ্ন হয়ে যেতে পারে। কিন্তু যদি তারা মদীনা আক্রমণ না করে শুধুমাত্র নিজেদের বাণিজ্য কাফেলাকে উদ্ধার করে নিয়ে যায় এবং মুসলমানরা দমে গিয়ে ঘরের কোণে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকে তাহলেও সহসাই মুসলমানদের প্রতিপত্তি এমনভাবে আহত হবে এবং তাদের প্রভাব এত বেশি ক্ষুণœ হবে যার ফলে আরবের প্রতিটি শিশুও তাদের বিরুদ্ধে দুঃসাহসী হয়ে উঠবে। সারাদেশে তাদের কোন আশ্রয় থাকবে না। তখন চারপাশের সমস্ত গোত্র কুরাইশদের ইঙ্গিতে কাজ করতে থাকবে। মদীনার ইহুদি, মুনাফিক, মুশরিকরা প্রকাশ্যে মাথা চাড়া দিয়ে উঠবে। মদীনায় জীবন ধারণ করাও সে সময় দুঃসাধ্য হয়ে পড়বে। মুসলমানদের কোনো প্রভাব-প্রতিপত্তি থাকবে না। ফলে তাদের ধন-প্রাণ-ইজ্জত আবরুর উপর আক্রমণ চালাতে কেউ ইতস্তত করবে না। এ কারণে নবী সা. দৃঢ় সঙ্কল্প নিলেন যে, বর্তমানে যতটুকু শক্তি সামর্থ্য আমাদের আছে তা নিয়েই আমরা বের হয়ে পড়বো। দুনিয়ার বুকে বেঁচে থাকার ও টিকে থাকার ক্ষমতা কার আছে কার নেই ময়দানেই তার ফয়সালা হয়ে যাবে।
এ চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেয়ার সঙ্কল্প করেই তিনি আনসার ও মুহাজিরদের একত্র করলেন। তাদের সামনে পরিস্থিতি পরিষ্কার করে তুলে ধরলেন। একদিকে উত্তরে বাণিজ্য কাফেলা অন্যদিকে দক্ষিণে এগিয়ে আসছে কুরাইশদের সেনাদল। আল্লাহর ওয়াদা এ দু’টির মধ্য থেকে কোন একটি তোমরা পেয়ে যাবে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, বলো, এর মধ্য থেকে কার মোকাবিলায় তোমরা এগিয়ে যেতে চাও? জবাবে বিপুল সংখ্যক সাহাবী মত প্রকাশ করলেন, কাফেলার উপর আক্রমণ চালানো হোক। কিন্তু নবী সা.-এর সামনে ছিল অন্য কিছু অভিপ্রায়। তাই তিনি নিজের প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি করলেন। একথায় মোহাজিরদের মধ্য থেকে মিকদাদ ইবন আমর (রা) বলে উঠলেন-
يا رسول الله امض لما أمرك الله فنحن معك، والله لا نقول كما قالت بنو إسرائيل لموسى: (اذْهَبْ أنْتَ وَرَبُّكَ فَقَاتِلا إنّا هَهُنَا قَاعِدُونَ) المائدة: ২৪؛ ولكن اذهب أنت وربك فقاتلا إنا معكما مقاتلون
“হে আল্লাহর রাসূল! আপনার রব আপনাকে যেদিকে যাবার হুকুম দিচ্ছেন সেদিকে চলুন। আপনি যেদিকে যাবেন আমরা আপনার সাথে আছি। আমরা বনি ইসরাইলের মত একথা বলবো নাÑ যাও তুমি ও তোমার আল্লাহ লড়াই করো, আমরা এখানেই বসে রইলাম। বরং আমরা বলছি, চলুন আপনি ও আপনার আল্লাহ দু’জনে লড়–ন আর আমরাও আপনাদের সাথে জানপ্রাণ দিয়ে লড়াই করবো।”
কিন্তু আনসারদের মতামত না জেনে লড়াই করা সম্ভবপর ছিল না। কারণ এ পর্যন্ত যেসব সামরিক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল তাতে তাদের সাহায্য গ্রহণ করা হয়নি এবং প্রথম দিন তারা ইসলামকে সমর্থন করার যে শপথ নিয়েছিল তাকে কার্যকর করতে তারা কতটুকু প্রস্তুত তা পরীক্ষা করার এটি ছিল প্রথম সুযোগ। সুতরাং রাসূলুল্লাহ সা. সরাসরি তাদেরকে সম্বোধন না করে নিজের কথার পুনরাবৃত্তি করলেন। এ কথায় সাদ ইবন মু‘আয বলে উঠলেন, সম্ভবত আপনি আমাদের সম্বোধন করে বলছেন? জবাব দিলেন, হ্যাঁ। এ কথা শুনে সাদ বললেন, “আমরা আপনার ওপর ঈমান এনেছি। আপনি যা কিছু এনেছেন তাকে সত্য বলে ঘোষণা করেছি। আপনার কথা শুনার ও আপনার আনুগত্য করার দৃঢ় শপথ নিয়েছি। কাজেই হে আল্লাহর রাসূল! “আপনি যা সঙ্কল্প করেছেন তা করে ফেলুন। সেই সত্তার কসম! যিনি আপনাকে সত্য সহকারে পাঠিয়েছেন, আপনি যদি আমাদের নিয়ে সমুদ্্ের ঝাঁপ দেন তাহলে আমরাও আপনার সাথে সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়বো। আমাদের একজনও পিছনে পড়ে থাকবে না। আপনি কালই আমাদের দুশমনদের সাথে যুদ্ধ শুরু করুন। এটা আমাদের কাছে মোটেই অপছন্দনীয় নয়। আমরা যুদ্ধে অবিচল ও দৃঢ়পদ থাকবো। মোকাবিলায় আমরা সত্যিকার প্রাণ উৎসর্গিতার প্রমাণ দেবো। সম্ভবত আল্লাহ আমাদের থেকে আপনাকে এমন কিছু কৃতিত্ব দেখিয়ে দেবেন, যাতে আপনার চোখ শীতল হবে। কাজেই আল্লাহর বরকতের ভরসায় আপনি আমাদের নিয়ে চলুন।”
এ আলোচনা ও বক্তৃতার পরে সিদ্ধান্ত হলো, বাণিজ্য কাফেলার পরিবর্তে কুরাইশ সেনা দলের মোকাবিলা করার জন্য এগিয়ে যাওয়া উচিত। কিন্তু এটা কোন যেনতেন সিদ্ধান্ত ছিল না। এ সংক্ষিপ্ত সময়ে যারা যুদ্ধ করতে এগিয়ে এলেন, তাদের সংখ্যা ছিল তিনশর কিছু বেশি। এদের মধ্যে মাত্র দু’তিনজনের কাছে ঘোড়া ছিল। আর বাকি লোকদের জন্য ৭০টির বেশি উট ছিল না। এগুলোর পিঠে তারা তিন চারজন করে যথাক্রমে সওয়ার হচ্ছিলেন। যুদ্ধাস্ত্রও ছিল একেবারেও অপ্রতুল। মাত্র ষাট জনের কাছে বর্ম ছিল। এ কারণে গুটিকয় উৎসর্গিত প্রাণ মুজাহিদ ছাড়া এ ভয়ঙ্কর অভিযানে শরিক অধিকাংশ মুজাহিদই হৃদয়ে উৎকণ্ঠা অনুভব করছিলেন। তারা মনে করছিলেন, যেন তারা জেনে বুঝেই মৃত্যুর মুখে এগিয়ে যাচ্ছেন। কিছু সুবিধাবাদী ধরনের লোক ইসলামের পরিসরে প্রবেশ করলেও তারা এমন ইসলামের প্রবক্তা ছিল না যাতে ধন-প্রাণের সংশয় দেখা দেয়। তারা এ অভিযানকে নিছক পাগলামি বলে অভিহিত করছিল। তারা মনে করছিল, ধর্মীয় আবেগ উচ্ছ্বাস এ লোকগুলোকে পাগলে পরিণত করেছে। কিন্তু নবী ও সাচ্চা-সত্যনিষ্ঠ মুমিনগণ এ কথা অনুধাবন করতে পেরেছিলেন যে, এটিই প্রাণ উৎসর্গ করার সময়। তাই আল্লাহর ওপর ভরসা করে তারা বের হয়ে পড়েছিলেন। তারা সোজা দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে এগিয়ে গেলেন। এই পথেই কুরাইশদের বাহিনী মক্কা থেকে ধেয়ে আসছিল। অথচ শুরুতে যদি বাণিজ্য কাফেলা লুট করার ইচ্ছা থাকতো তাহলে উত্তর পশ্চিমের পথে এগিয়ে যাওয়া হতো।
রমজান মাসের ১৭ তারিখে বদর নামক স্থানে উভয় পক্ষের মোকাবিলা হলো। নবী সা. দেখলেন, তিনজন কাফেরের মোকাবিলায় একজন মুসলমান দাঁড়িয়ে আছে। তাও আবার পুরোপুরি অস্ত্র সজ্জিত নয়। এ অবস্থা দেখে তিনি আল্লাহর সামনে দোয়া করার জন্য দু’হাত বাড়িয়ে দিলেন। অত্যন্ত কাতর কণ্ঠে ও কান্নাবিজড়িত স্বরে তিনি দোয়া করতে থাকলেন, “হে আল্লাহ! এই যে কুরাইশরা এসেছে, তাদের সকল ঔদ্ধত্য ও দাম্ভিকতা নিয়ে তোমার রাসূলকে মিথ্যা প্রমাণ করতে। হে আল্লাহ এখন তোমার সেই সাহায্য এসে যাওয়া দরকার, যার ওয়াদা তুমি করেছিলে আমার সাথে। হে আল্লাহ! যদি এ মুষ্টিমেয় দলটি ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে এ পৃথিবীতে আর কোথাও তোমার ইবাদাত করার মত কেউ থাকবে না।”
এ যুদ্ধের ময়দানে মক্কার মুহাজিরদের পরীক্ষা ছিল সবচেয়ে কঠিন। তাদের আপন ভাই-চাচা ইত্যাদি তাদের বিরুদ্ধে ময়দানে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কারোর বাপ, কারোর ছেলে, কারো চাচা, কারোর মামা, কারোর ভাই দাঁড়িয়েছিল তার প্রতিপক্ষে। এ যুদ্ধে নিজের কলিজার টুকরোর উপর তরবারি চালাতে হচ্ছিল তাদের। এ ধরনের কঠিন পরীক্ষা একমাত্র তারাই উত্তীর্ণ হতে পারে যারা পরিপূর্ণ নিষ্ঠা ও আন্তরিকতা সহকারে হক ও সত্যের সাথে সম্পর্ক জুড়েছে এবং মিথ্যা ও বাতিলের সাথে সকল প্রকার সম্পর্ক ছিন্ন করতে পুরোপুরি উদ্যোগী হয়েছে। ওই দিকে আনসারদের পরীক্ষাও কিছু কম ছিল না। এত দিনেও তারা শুধুমাত্র মুসলমানদের আশ্রয় দিয়ে কুরাইশ ও তাদের সহযোগী গোত্রগুলোর শত্রুতার ঝুঁকি নিয়েছিল। কিন্তু এবার তো তারা ইসলামের সমর্থনে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে যাচ্ছিল। এর মানে ছিল, কয়েক হাজার লোকের একটি জনবসতি সমগ্র আবর দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে প্রস্তুত হয়ে গেছে। এ ধরনের দুঃসাহস একমাত্র তারাই করতে পারে যারা সত্য আদর্শের ওপর ঈমান এনে তার জন্য নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থকে পুরোপুরি জলাঞ্জলি দিতে প্রস্তুত হতে পারে। অবশেষে তাদের অবিচল ঈমান ও সত্যনিষ্ঠা আল্লাহর সাহায্যের পুরস্কার লাভে সফল হয়ে গেল। আর নিজেদের সমস্ত অহঙ্কার ও শক্তির অহমিকা সত্ত্বেও কুরাইশরা এ সহায় সম্বলহীন জানবাজ সৈনিকদের হাতে পরাজিত হয়ে গেল। তাদের ৭০ জন নিহত হলো ৭০ জন বন্দী হলো এবং তাদের সরঞ্জামগুলো গনিমতের মাল হিসেবে মুসলমানদের দখলে এলো। কুরাইশদের যে সব বড় বড় সরদার তাদের মজলিস গুলজার করে বেড়াতো এবং ইসলামবিরোধী আন্দোলনে যারা সর্বক্ষণ তৎপর থাকতো তারা এ যুদ্ধে নিহত হলো। চূড়ান্ত বিজয় আরবে ইসলামকে একটি উল্লেখযোগ্য শক্তিতে পরিণত করলো। একজন পাশ্চাত্য গবেষক লিখেছেন, বদর যুদ্ধের পরে তা রাষ্ট্রীয় ধর্মে বরং নিজেই রাষ্ট্রে পরিণত হয়ে গেল।
আয়াতগুলোর ব্যাখ্যা
يا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذا لَقِيتُمْ فِئَةً فَاثْبُتُوا وَاذْكُرُوا اللَّهَ كَثِيراً لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
হে ঈমানদারগণ! যখন কোন দলের সাথে তোমাদের মোকাবিলা হয়, তোমরা দৃঢ়পদ থাকো এবং আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করতে থাকো। আশা করা যায়, এতে তোমরা সাফল্য অর্জন করবে। এখানে فِئَةً অর্থ দল, জামাআত, সৈন্যবাহিনী। فَاثْبُتُوا অতঃপর তোমরা দৃঢ়পদ থাকো। শব্দটি নির্দেশবাচক যার দ্বারা যুদ্ধের সময় ময়দানে দৃঢ়পদ থাকার জন্য মুমিনদেরকে আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ঠিক একইভাবে এই সূরার ১৫ ও ১৬ নং আয়াতে ময়দান থেকে পৃষ্ঠ প্রদর্শন না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং এর পরিণতি আলোচনা করা হয়েছেÑ
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا لَقِيتُمُ الَّذِينَ كَفَرُوا زَحْفًا فَلَا تُوَلُّوهُمُ الْأَدْبَارَ (১৫) وَمَنْ يُوَلِّهِمْ يَوْمَئِذٍ دُبُرَهُ إِلَّا مُتَحَرِّفًا لِقِتَالٍ أَوْ مُتَحَيِّزًا إِلَى فِئَةٍ فَقَدْ بَاءَ بِغَضَبٍ مِنَ اللَّهِ وَمَأْوَاهُ جَهَنَّمُ وَبِئْسَ الْمَصِيرُ (১৬)
“হে ঈমানদারগণ! যখন তোমরা একটি সেনাবাহিনীর আকারে কাফেরদের মুখোমুখি হও তখন তাদের মোকাবিলায় পৃষ্ঠ প্রদর্শন করো না। যে ব্যক্তি এ অবস্থায় পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে সে আল্লাহর গজবে ঘেরাও হয়ে যাবে। এবং তার আবাস হবে জাহান্নাম আর ফিরে যাওয়ার জন্য সেটা বড়ই খারাপ জায়গা। একটি আদেশ ও অন্যটি নিষেধ হলেও উদ্দেশ্য একই।”
وَاذْكُرُوا اللَّهَ তোমরা আল্লাহর স্মরণ কর এ কথার তিনটি অর্থ হতে পারে যথা-
এক: তোমাদের অন্তরে ভয় ভীতির সময় তেমরা আল্লাহকে স্মরণ কর কেননা বিপদ মুসিবতের সময় তা তোমাদেরকে দৃঢ়পদ রাখবে।
দুই: তোমাদের অন্তরকে মজবুত রাখ, এবং মুখে আল্লাহকে স্মরণ কর। যেমন আসহাবে তালুতরা বলত-
رَبَّنا أَفْرِغْ عَلَيْنا صَبْراً وَثَبِّتْ أَقْدامَنا وَانْصُرْنا عَلَى الْقَوْمِ الْكافِرِينَ [البقرة: ২৫০].
তিন: আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সাথে তোমাদের জান ও মালের কৃত ওয়াদাকে স্মরণ কর। যেমন আল্লাহ বলেন-
إِنَّ اللَّهَ اشْتَرَى مِنَ الْمُؤْمِنِينَ أَنْفُسَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ بِأَنَّ لَهُمُ الْجَنَّةَ يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَيَقْتُلُونَ وَيُقْتَلُونَ وَعْدًا عَلَيْهِ حَقًّا فِي التَّوْرَاةِ وَالْإِنْجِيلِ وَالْقُرْآنِ وَمَنْ أَوْفَى بِعَهْدِهِ مِنَ اللَّهِ فَاسْتَبْشِرُوا بِبَيْعِكُمُ الَّذِي بَايَعْتُمْ بِهِ وَذَلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ (১১১)
কেননা মুখের স্মরণ অন্তরের প্রশান্তির জন্য সহায়ক। মুহাম্মদ ইবনে কাব আল কুরতুবি বলেন, যিকর পরিত্যাগ করার যদি অনুমতি থাকত তাহলে যাকারিয়া (আ)কে সেই অনুমতি দেওয়া হতো। যেমন আল্লাহ বলেন-
:” أَلَّا تُكَلِّمَ النَّاسَ ثَلاثَةَ أَيَّامٍ إِلَّا رَمْزاً وَاذْكُرْ رَبَّكَ كَثِيراً” [آل عمران: ৪১].
কাতাদাহ (র.) বলেন, যুদ্ধের ময়দানে যিকর ফরজ, তবে যোদ্ধা যদি একা হয় তাহলে যিকর উচ্চস্বরে নয় অবশ্যই চুপিসারে হতে হবে। আর সৈন্য সংখ্যা যদি বেশি হয় সে ক্ষেত্রে উচ্চস্বরের যিকর শত্রুদেরকে ভীত করে তুলবে। আবু দাউদের হাদীসে রাসূল সা. বলেন-
– بَابٌ فِيمَا يُؤْمَرُ بِهِ مِنَ الصَّمْتِ عِنْدَ اللِّقَاءِ
২৬৫৬- ، عَنْ قَيْسِ بْنِ عُبَادٍ ، قَالَ : كَانَ أَصْحَابُ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم يَكْرَهُونَ الصَّوْتَ عِنْدَ الْقِتَالِ
৭৩৮৯- ، عَنْ عَطَاءِ بْنِ السَّائِبِ ، قَالَ : كَانَ يُكْرَهُ التَّلَثُّمَ فِي ثَلاَثٍ فِي الْقِتَالِ ، وَفِي الْجَنَائِزِ ، وَفِي الصَّلاَة. الكتاب : مُصنف ابن أبي شيبة في التلثم فِي الصَّلاَة
عَنْ زَيْدِ بن أَرْقَمَ ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ، قَالَ : إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ يُحِبُّ الصُّمْتَ عِنْدَ ثَلاثَ : عِنْدَ تِلاوَةِ الْقُرْآنِ وَعِنْدَ الزَّحْفِ وَعِنْدَ الْجِنَازَةِ . الكتاب : المعجم الكبير أبو القاسم الطبراني
৪৬৪০ – عَنْ أَبِى النَّضْرِ عَنْ كِتَابِ رَجُلٍ مِنْ أَسْلَمَ مِنْ أَصْحَابِ النَّبِىِّ -صلى الله عليه وسلم- يُقَالُ لَهُ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ أَبِى أَوْفَى فَكَتَبَ إِلَى عُمَرَ بْنِ عُبَيْدِ اللَّهِ حِينَ سَارَ إِلَى الْحَرُورِيَّةِ يُخْبِرُهُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- كَانَ فِى بَعْضِ أَيَّامِهِ الَّتِى لَقِىَ فِيهَا الْعَدُوَّ يَنْتَظِرُ حَتَّى إِذَا مَالَتِ الشَّمْسُ قَامَ فِيهِمْ فَقَالَ ্র يَا أَيُّهَا النَّاسُ لاَ تَتَمَنَّوْا لِقَاءَ الْعَدُوِّ وَاسْأَلُوا اللَّهَ الْعَافِيَةَ فَإِذَا لَقِيتُمُوهُمْ فَاصْبِرُوا وَاعْلَمُوا أَنَّ الْجَنَّةَ تَحْتَ ظِلاَلِ السُّيُوفِ গ্ধ. ثُمَّ قَامَ النَّبِىُّ -صلى الله عليه وسلم- وَقَالَ ্র اللَّهُمَّ مُنْزِلَ الْكِتَابِ وَمُجْرِىَ السَّحَابِ وَهَازِمَ الأَحْزَابِ اهْزِمْهُمْ وَانْصُرْنَا عَلَيْهِمْ গ্ধ. الجامع الصحيح المسمى صحيح مسلم باب كَرَاهَةِ تَمَنِّى لِقَاءِ الْعَدُوِّ وَالأَمْرِ بِالصَّبْرِ عِنْدَ اللِّقَاءِ.
وَأَطِيعُوا اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَلا تَنازَعُوا فَتَفْشَلُوا وَتَذْهَبَ رِيحُكُمْ وَاصْبِرُوا إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ (৪৬)
আল্লাহর আনুগত্য কর অর্থ জীবনের সকল ক্ষেত্রে আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলা সকল মুসলমানের জন্য ফরজ। বিশেষ করে যুদ্ধের ময়দানে সফলতার জন্য এ নির্দেশনা অপরিহার্য। রাসূল সা.-এর আনুগত্য কর অর্থ এখানে যুদ্ধের সকল বিষয়ে রাসূল সা. এর যাবতীয় আদেশ ও নিষেধ পালন করা সফলতার সোপান তার বাস্তব প্রমাণ উহুদের যুদ্ধ। যুদ্ধের ক্ষেত্রে দৃঢ়পদ থাকা, শত্রুদের সাথে যুদ্ধের ব্যাপারে নিজেদের মধ্যে মতপার্থক্য ও ঝগড়া বিবাদ না করাই আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য। এরপর আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্যহীনতার দু’টি অনিবার্য পরিণতির হুঁশিয়ারি মুসলমানদেরকে দেওয়া হয়েছে।
فَتَفْشَلُواْ অতঃপর তোমরা দুর্বল হয়ে পড়বে। অর্থাৎ যদি যুদ্ধের ময়দানে তোমরা দৃঢ়পদ না থাক, নিজেদের মধ্যে পরস্পর মতপার্থক্য ও ঝগড়া বিবাদে লিপ্ত হও তাহলে শত্রুর মোকাবিলায় তোমরা দুর্বল হয়ে পড়বে।وَتَذْهَبَ رِيحُكُم এতে তোমাদের শক্তি ও প্রতিপত্তি চলে যাবে এবং তোমরা আল্লাহর সাহায্য থেকে বঞ্চিত হবে।
(وَاصْبِرُوا إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ) তোমরা সবরের পথ অবলম্বন কর, অবশ্যই আল্লাহ সবরকারীদের সাথে রয়েছেন। অর্থাৎ নিজেদের আবেগ-অনুভূতি ও কামনা-বাসনাকে সংযত রাখো। তাড়াহুড়ো করো না। ভীত-আতঙ্কিত হওয়া, লোভ-লালসা পোষণ করা এবং অসঙ্গত উৎসাহ-উদ্দীপনা প্রকাশ থেকে দূরে থাকো। স্থির মস্তিষ্কে এবং ভারসাম্যপূর্ণ ও যথার্থ পরিমিত বিচক্ষণতা ও ফায়সালা করার শক্তি সহকারে কাজ করে যাও। বিপদ-আপদ ও সঙ্কট সমস্যার সম্মুখীন হলেও যেন তোমাদের পা না টলে। উত্তেজনাকর পরিস্থিতি দেখা দিলে ক্রোধ ও ক্ষোভের তরঙ্গে ভেসে গিয়ে তোমরা যেন কোন অর্থহীন কাজ করে না বসো। বিপদের আক্রমণ চলতে থাকলে এবং অবস্থা সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে মোড় নিয়েছে দেখতে পেলে মানসিক অস্থিরতার কারণে যেন তোমাদের চেতনাশক্তি বিক্ষিপ্ত ও বিশৃঙ্খল না হয়ে পড়ে। উদ্দেশ্য সফল হবার আনন্দে অধীর হয়ে অথবা কোন আধা-পরিপক্ব ব্যবস্থাপনাকে আপাতদৃষ্টিতে কার্যকর হতে দেখে তোমাদের সঙ্কল্প যেন তাড়াহুড়োর শিকার না হয়ে পড়ে। আর যদি কখনও বৈষয়িক স্বার্থ, লাভ ও ইন্দ্রিয় সুখভোগের প্ররোচনা তোমাদের লোভাতুর করে তোলে তাহলে তাদের মোকাবিলায় তোমাদের নফস যেন দুর্বল হয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সেদিকে এগিয়ে যেতে না থাকে। এ সমস্ত অর্থ শুধু একটি মাত্র শব্দ ‘সবর’- এর মধ্যে নিহিত রয়েছে। আল্লাহ বলেছেন, এসব দিক দিয়ে যারা সবরকারী হবে তারাই আমার সাহায্য ও সমর্থন পেয়ে ধন্য হবে।
ثبت في الصحيحين، عن عبد الله بن أبي أوفى، عن رسول الله صلى الله عليه وسلم أنه انتظر في بعض أيامه التي لقي فيها العدو حتى إذا مالت الشمس قام فيهم فقال: ” يا أيها الناس، لا تتمنوا لقاء العدو، واسألوا الله العافية، فإذا لقيتموهم فاصبروا (৩) واعلموا أن الجنة تحت ظلال السيوف”. ثم قام النبي صلى الله عليه وسلم وقال: ” اللهم، مُنزل الكتاب، ومُجري السحاب، وهازم الأحزاب، اهزمهم وانصرنا عليهم” (৪) صحيح البخاري برقم (২৮১৮) وصحيح مسلم برقم (১৭৪২).

وَلَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ خَرَجُوا مِنْ دِيَارِهِمْ بَطَرًا وَرِئَاءَ النَّاسِ وَيَصُدُّونَ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ وَاللَّهُ بِمَا يَعْمَلُونَ مُحِيطٌ (৪৭)
আর তোমরা এমন লোকদের মত আচরণ করো না, যারা অহংকার করতে করতে ও লোকদেরকে নিজের মাহাত্ম্য দেখাতে দেখাতে ঘর থেকে বের হয়েছে এবং যারা আল্লাহর পথ থেকে (মানুষকে) বিরত রাখে। তারা যা কিছু করছে তা আল্লাহর নাগালের বাইরে নয়।
بَطَرًا এর কয়েকটি অর্থ- অত্যধিক অনুগ্রহ প্রাপ্ত হইয়া মাতিয়া গিয়াছে, অহংকারে সত্য পরিত্যাগ করিয়াছে, নেয়ামতকে হেয়জ্ঞান করিয়াছে ফাড়িয়া ফেলিয়াছে অর্থে ব্যবহৃত হয়।
এখানে কুরাইশ গোত্রভুক্ত কাফেরদের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। তাদের সেনাবাহিনী মক্কা থেকে বের হয়েছিল অত্যন্ত জাঁকজমকের সাথে। বাদ্য-গীত পারদর্শিনী ক্রীতদাসী পরিবেষ্টিত হয়ে তারা চলছিল। পথের মাঝখানে বিভিন্ন জায়গায় থেমে তারা নাচ-গান, শরাব পান ও আনন্দ উল্লাসের মাহফিল জমিয়ে তুলছিল এবং পথের বিভিন্ন গোত্রের উপর নিজেদের শান শওকত, সংখ্যাধিক্য, শক্তির দাপট, যুদ্ধ সরঞ্জামাদির ভীতি ও প্রভাব বিস্তার করে চলছিল। তারা এমনভাবে বাহাদুরি দেখাচ্ছিল যেন তাদের সামনে দাঁড়াবার মতো কেউ নেই।
فقالوا: “والله لا نرجع حتى ننزل بدرًا، فنقيم فيه ثلاث ليالٍ، ويرانا من غَشِينا من أهل الحجاز، فإنه لن يرانا أحد من العرب وما جمعنا فيقاتلنا”. وهم الذين قال الله: “الذين خرجوا من ديارهم بطرًا ورئاء الناس”
এমনি একটা উৎকট অহংকারের ভাব তাদের নৈতিক চরিত্রে ফুটে উঠেছিল। আর যে উদ্দেশ্যে তারা ঘর থেকে বের হয়েছিল তা ছিল আরো নোংরা এবং অপবিত্র। তারাতো সততা, সত্য ও ন্যায়পরায়ণতার ঝা-া বুলন্দ করার জন্য ধন প্রাণ উৎসর্গ করতে এগিয়ে আসেনি বরং এ ঝা-া যাতে বুলন্দ না হয় এবং যে একটি মাত্র দল এ সত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এগিয়ে এসেছিল তাদেরকে নির্মূল করার জন্য তারা বের হয়েছিল। এ ব্যাপারে মুসলমানদেরকে তাদের মত না হয়ে ঈমানের দাবি পূরণের জন্য আহ্বান করা হয়েছে।
وَإِذْ زَيَّنَ لَهُمُ الشَّيْطَانُ أَعْمَالَهُمْ وَقَالَ لَا غَالِبَ لَكُمُ الْيَوْمَ مِنَ النَّاسِ وَإِنِّي جَارٌ لَكُمْ فَلَمَّا تَرَاءَتِ الْفِئَتَانِ نَكَصَ عَلَى عَقِبَيْهِ وَقَالَ إِنِّي بَرِيءٌ مِنْكُمْ إِنِّي أَرَى مَا لَا تَرَوْنَ إِنِّي أَخَافُ اللَّهَ وَاللَّهُ شَدِيدُ الْعِقَابِ (৪৮)
বদরের যুদ্ধের দিন শয়তান বনু বকর বিন কিনানাহ গোত্রের শুরাকা বিন মালিক বিন জুসামির সুরাতে এসেছিল। কুরাইশদের একটা ভয় ছিল যুদ্ধের সময় বনু বকর তাদের পিছন থেকে আক্রমণ করতে পারে কেননা পূর্বে তাদের অনেককে কুরাইশরা হত্যা করেছিল। কিন্তু শয়তান তাদেরকে আশস্ত করল যে তারা তাদের মত বাপ দাদাদের ধর্মের জন্য যুদ্ধ করবে।
ইবনে আব্বাস (রা) বলেন- আল্লাহ তায়ালা রাসূল সা. ও তাঁর নবীকে বদর যুদ্ধের দিন হাজার হাজার ফেরেশতা দিয়ে সাহায্য করেছিলেন, জিবরাইল (আ) ৫ হাজার সৈন্য এবং মিকাঈল (আ) ৫ হাজার সৈন্য নিয়ে মুসলিম শিবিরের পার্শ্বে অবস্থান করছিলেন। অন্যদিকে ইবলিস শয়তান তার সঙ্গী সাথীদের নিয়ে অবস্থান করছিল। শয়তানের সঙ্গীরা বনু মুদলিজের লোকদের সুরতে এসেছিল, আর ইবলিস সুরাকা বিন মালেক আল জুসামির সুরতে এসেছিল। শয়তান মুশরিকদের উদ্দেশ্য করে বলল, তোমাদের উপর আজ কেউ বিজয়ী হতে পারবে না, এবং আমি প্রতিবেশী হিসাবে তোমাদের সাথে রয়েছি। তখন আবু জাহেল বলল-: اللهم أولانا بالحق فانصره “হে আল্লাহ! আমাদের মধ্যে যারা হকের উপরে আছে তাদেরকে তুমি সাহায্য কর।” এরপর রাসূল সা. হাত উত্তোলন করে বলেন- يا رب إنك تهلك هذه العصابة فلن تعبد في الأرض أبدا “হে আমাদের রব! যদি আমাদের এই ক্ষুদ্রবাহিনীকে ধ্বংস করে দাও তাহলে জমিনে তোমার ইবাদত করার জন্য আর কেউ অবশিষ্ট থাকবে না।” অতঃপর জিবরাইল (আ) রাসূল সা.-কে বললেন- আপনি এক মুষ্টি মাটি নেন এবং মুশরিকদের মুখে নিক্ষেপ করেন। এতে তাদের চোখ ও মুখ অন্ধকারাচ্ছন্ন হলো এবং তারা পলানো শুরু করলো। এরপর জিবরাইল (আ) ইবলিসের দিকে এগিয়ে আসলেন। ইবলিস যখন জিবরাইল (আ)কে দেখল তখন তার হাত একজন মুশরিকের হাতের সাথে ধরা ছিল এবং সে তার কাছ থেকে হাত টান দিয়ে ছুটিয়ে নিয়ে দলবলসহ পালাতে লাগল। ঐ ব্যক্তি তখন বলল, হে শুরাকা! আপনি তো বলেছিলেন আপনি আমাদের প্রতিবেশী, শুরাকা তখন বলল, আমি তোমাদের থেকে মুক্ত এবং আমি যা দেখছি তোমরা তা দেখছ না। (বায়হাকী)

আয়াতগুলোর শিক্ষা
উপরোক্ত আয়াতগুলো থেকে নি¤েœর শিক্ষা পাওয়া যায়। যথা:
১. শত্রুর মোকাবিলায় ময়দানে দৃঢ়পদ থাকতে হবে।
২. নিজেদের মধ্যে সব সময় ঐক্য বজায় রাখতে হবে; কখনও নিজেরা নিজেরাই বিবাদে জড়ানো যাবে না।
৩. যুদ্ধের সময় আল্লাহর যিকর করতে হবে।
৪. সকল সময়ে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করতে হবে।
৫. নিজেদের ভিতরে কোন অবস্থায় মতভেদ করা যাবে না।
৬. পরিস্থিতি প্রতিকূল হোক বা অনুকূল হোক ধৈর্য ধারণ করতে হবে।
৭. ময়দানে মোকাবিলার সময় গর্ব অহংকার করা যাবে না।
৮. কোন অবস্থাতেই শয়তানের প্ররোচনায় পড়া যাবে না, কেননা শয়তান মানুষের কাজকে তাদের চোখে ঔজ্জ্বল্যময় করে দেখায়।
৯. ময়দানে মোকাবিলা শুরু হলে শয়তান পালিয়ে যায়।
১০. শয়তান ফেরেশতাদেরকে দেখতে পায়।
১১. ইবলিস সর্বদা মিথ্যা কথা বলে।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, বাংলাদেশ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

SHARE

Leave a Reply