শত বছরের শিক্ষা । মেহেদী হাসান সানি

শত বছরের শিক্ষা । মেহেদী হাসান সানিইতিহাসের বাঁকে বাঁকে ঘটে যায় অনেক ঘটনা। কিছু ঘটনা যেমন মানবতাকে উচ্চকিত করে তেমনি কিছু ঘটনা আবার মানবতাকে করে চরমভাবে ভূলুণ্ঠিত। ঘটনার নায়ক খলনায়কের দ্বন্দ্বে সভ্যতা কোথাও গড়ে উঠেছে কোথাও বা আবার ধসে পড়েছে বিচূর্ণভাবে। কোথাও পথহারা একটি জনপদ কোনো এক অশ্বারোহীর ডাকে খুঁজে পেয়েছে পথের ঠিকানা কোথাওবা আবার একটি বিস্তৃত জনপদ কারো অঙ্গুলি ইশারায় হারিয়ে গেছে ইতিহাসের অতল গহ্বরে। বিংশ শতাব্দী ছিল মানবসভ্যতার জন্য সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ একটি শতাব্দী। দু’টি বিশ্বযুদ্ধ থেকে শুরু করে বেশ কয়েকটি আঞ্চলিক যুদ্ধ ও সংঘাত যেমন গত শতাব্দীকে সবচেয়ে বেশি কলুষিত করেছে ঠিক তেমনি রাষ্ট্র ও সরকার ব্যবস্থার বিকাশ, তথ্য-প্রযুক্তির উন্নয়ন, যোগাযোগব্যবস্থা ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের সাফল্য মানবতাকে অধিষ্ঠিত করেছে এক অনন্য মর্যাদায়। এ লেখায় শত বছর আগের দু’টি ঘটনা নিয়ে আলোকপাত করা হয়েছে যা ঘটেছিল পৃথিবীর দু’টি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে। ঘটনা দু’টির প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও এর ধরনে রয়েছে যথেষ্ট মিল। নিরস্ত্র জনমানুষের ওপর সশস্ত্র বাহিনীর খবরদারির মাত্রা যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে এগুলো তার যথার্থ সাক্ষ্য বহন করে।

সুরাফেন্দ ম্যাসাকার
‘সুরাফেন্দ ম্যাসাকার’ শত বছর আগের ফিলিস্তিনের সুরাফেন্দ গ্রামের ওপর চালানো একটি বর্বর হত্যাযজ্ঞের নাম। এলাকাটি এখন ইসরাইলে ‘তাজরিফিন’ নামে পরিচিত। অস্ট্রেলিয়ান অ্যান্ড নিউজিল্যান্ড আর্মি কোর (ANZAC)-এর সৈন্যরা ছিল এর নেপথ্যের ভূমিকায়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার মাত্র এক মাস পরের ঘটনা এটি। যুদ্ধে মিত্রশক্তি ব্রিটেন ও রাশিয়ার পক্ষ হয়ে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের সৈন্যরা একযোগে লড়াই করেছিল পক্ষশক্তি ইতালি ও জার্মানির বিরুদ্ধে। এই প্রথম বিশ্বযুদ্ধকে কেন্দ্র করেই ব্রিটিশ সৈন্যরা তাদের মিত্রসহ অনুপ্রবেশ করেছিল ফিলিস্তিনের ভূমিতে।

মূল ঘটনা
সুরাফেন্দের এই নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালানোর পেছনে ছিল ছোট্ট একটি ঘটনা। পালিয়ে যাওয়া এক চোরকে একজন নিউজিল্যান্ডার সৈন্য ধরে ফেললে এই চোরের হাতে ঐ সৈন্য নিহত হয়। কিন্তু অবৈধ অনুপ্রবেশের বড় অভিযোগ এনে আরব সরদাররা ঐ খুনিকে খুঁজে দিতে ও আত্মসমর্পণ করাতে অস্বীকৃতি জানায়। এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে গোপন কিলিং মিশনের পরিকল্পনা করে আনজাকসৈন্যরা। তারা সিদ্ধান্ত নেয় অস্ত্র, বেয়নেট ও ভারী লাঠিসজ্জিত হয়ে সব নারী ও শিশুকে গ্রাম থেকে বের করে দেবে এবং ১৬ বছরের বেশি বয়সী সব পুরুষকে হত্যা করবে ও বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেবে।
১০ ডিসেম্বর, ১৯১৮ সাল। পরিকল্পনা মোতাবেক সন্ধ্যায় প্রায় ২০০-এর মতো সৈন্য গ্রামটিতে প্রবেশ করে এবং নারী ও শিশুদেরকে গ্রাম থেকে বের করে দেয়। ভারী লাঠিসোটা ও বেয়নেট নিয়ে সৈন্যরা তখন বাকি গ্রামবাসীর ওপর একযোগে হামলা চালায় এবং বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়। এরপর এরা পাশের বেদুইন ক্যাম্পের ওপর হামলা চালায় এবং তাও আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। এভাবে একটি গ্রাম ও গ্রামের পার্শ্ববর্তী বেদুইন ক্যাম্পের প্রায় ৮০ থেকে ১০০ জনের মতো মানুষকে এক রাতের অভিযানে হত্যা করা হয়। আহত করা হয় বহু সংখ্যক গ্রামবাসীকে। আনজাক সৈন্যদের বেয়নেট থেকে বেঁচে যাওয়া ফিলিস্তিনি নারী ও শিশুদের ভাগ্যে কী ঘটেছিল তা বর্ণনা করা দুরূহ। তবে এতটুকু কল্পনা করা যায় হঠাৎ করে পুরুষ সাথীহারা ও ঘরবাড়িহারা এই নারী-শিশুরা কী ভয়াবহ পরিস্থিতিতেই না নিপতিত হয়েছিল! এ ধরনের বঞ্চনা ভয়াবহ গণহত্যার বর্ণবাদী প্রপঞ্চ ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না। এই হত্যাকাণ্ডের জন্য কাউকে অভিযুক্ত করা হয়নি। সরকারি তদন্ত ছিল একটি আইওয়াশ মাত্র। ফলে একে অন্যকে রক্ষা করার জন্য ব্যাপকভাবে চলে মিথ্যাচার। কতজনকে হত্যা করা হয়েছে, এ হিসাবেও আছে যথেষ্ট গরমিল। এ ঘটনার জন্য স্কটিশরা দোষ দেয় নিউজিল্যান্ডের সৈন্যদের। নিউজিল্যান্ডাররা দোষ দেয় অস্ট্রেলিয়ানদের। আর অস্ট্রেলিয়ানদের অভিযোগ নিউজিল্যান্ডার ও স্কটিশ সৈন্যদের ওপর। ঘটনার প্রায় তিন বছর পর ১৯২১ সালে অস্ট্রেলিয়া ৫১৫ পাউন্ড ব্রিটেনকে দেয় গ্রাম ধ্বংসের ক্ষতিপূরণ হিসেবে। নিউজিল্যান্ড দেয় ৮৫৮ পাউন্ড। আর ব্রিটিশ সরকার প্যালেস্টাইন কর্তৃপক্ষকে দেয় ৬৮৬ পাউন্ড। কারণ, স্কটিশ সৈন্যদের একটি ছোট্ট অংশ এই হত্যাযজ্ঞে অংশ নিয়েছিল।
সুরাফেন্দ ম্যাসাকারের ঘটনাটি অস্ট্রেলিয়ার সামরিক ইতিহাসের অন্যতম একটি ‘ডার্কেস্ট অ্যান্ড ওভারলুকড চ্যাপ্টার’ হিসেবে বিবেচিত। তাই এটি ইতিহাস থেকে লুকানোর প্রবল চেষ্টা করেছে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড উভয়েই। যুক্তরাজ্যের বিবিসির সমকক্ষ অস্ট্রেলিয়ান এবিসি মিডিয়ায় ‘সুরাফেন্দ ম্যাসাকার’ সম্পর্কে সার্চ দিলে জিরো রেজাল্ট পাওয়া যায়। একইভাবে গুগল ‘সুরাফেন্দ ম্যাসাকার’ নামে সার্চ দিলে সঠিক কোনো রেজাল্ট প্রকাশে ব্যর্থ হয়। এটি স্পষ্ট গুগল অবলম্বন করে কুখ্যাত অ্যান্টি-আরব সেন্সরশিপ। গুগলের বোর্ডে রয়েছে ৫০ শতাংশ জায়নবাদী ইহুদি।
সুরাফেন্দ ম্যাসাকার ও প্যালেস্টানিয়ান জেনোসাইডকে দেখতে হবে পৈশাচিক ইউরোপিয়ান কলোনিয়াল জেনোসাইডেরই একটি অংশ হিসেবে। অস্ট্রেলীয় লেখক জন ডকারের অভিমত হচ্ছে, “অস্ট্রেলীয় সামরিক ইতিহাসে দীর্ঘ দিন ধরে সুরাফেন্দ ঘটনাকে একটি স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে দেখা হলেও এটি ছিল আদিবাসীদের সরিয়ে সেখানে শেতাঙ্গদের বসত গড়ে তোলারই একটি ঔপনিবেশিক পরিকল্পনা।” তাইতো সেই যে ফিলিস্তিনি গণহত্যার শুরু, তা নানা বাহিনীর হাতে নানাভাবে আজও অব্যাহত। এর পর থেকে এই শত বছরে নানা ধরনের সন্ত্রাসের শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছে প্রায় ২৩ লাখ ফিলিস্তিনি। এক লাখের মত মৃত্যু হয়েছিল আরোপিত বঞ্চনার প্রভাবে। আর প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ফিলিস্তিনে ব্রিটিশ আগ্রাসনের পরবর্তী সময়ে মৃত্যু হয়েছে প্রায় ২২ লাখ নিরীহ ফিলিস্তিনির।

জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকান্ড
জালিয়ানওয়ালাবাগ বা অমৃতসর হত্যাকাণ্ডটি ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে অন্যতম কুখ্যাত একটি গণহত্যা। অবিভক্ত ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের অমৃতসর শহরে ইংরেজ সেনানায়ক ব্রিগেডিয়ার রেগিনাল্ড ডায়ারের নির্দেশে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয় ১৯১৯ সালে। শহরের জালিয়ানওয়ালাবাগ নামক একটি বদ্ধ উদ্যানে সমবেত নিরস্ত্র জনগণের ওপর গুলিবর্ষণ করা হয়েছিল। এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ইংরেজ সরকারের দেয়া ‘নাইটহুড’ উপাধি ত্যাগ করেন।

পটভূমি
১৭৫৭ সালের পলাশী যুদ্ধে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের মাধ্যমে সমগ্র ভারতবর্ষ ইংরেজ শাসনের অধীনে আসে। কিন্তু ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম থেকেই ভারতের উদীয়মান ধনী এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যে স্বায়ত্তশাসন এবং স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা জেগে ওঠে। এই আকাক্সক্ষার সংহত রূপ প্রকাশ পায় ১৮৮৫ সালে ভারতীয় জাতীয়কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। প্রথম দিকে এই রাজনৈতিক দলের লক্ষ্য ছিল ইংরেজ শাসনাধীনে থেকেই ন্যায়বিচার এবং স্বায়ত্তশাসন লাভ। কিন্তু ইংরেজ সরকারের পক্ষ থেকে এ দাবি মেনে নেয়া হয়নি। ইংরেজদের যুক্তি ছিল ভারতবর্ষ অনুন্নত বিধায় স্বায়ত্তশাসনের উপযুক্ত নয়। কিন্তু ভারতে এ ধরনের চিন্তাধারার প্রসার ঘটতে থাকে। ধীরে ধীরে এদেশের অনেক স্থানেই রেলযোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়, একসময় টেলিগ্রাফ তারও বসানো হয়। কিছু কিছু কল-কারখানাও স্থাপিত হয়, মূলত কাপড়ের কারখানা প্রাধান্য বিস্তার করেছিল। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ঘটনার প্রভাবও এখানে পরিলক্ষিত হয়। যেমন ১৯১৪ সালে শুরু হওয়া প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, এই যুদ্ধে জার্মানি ইংল্যান্ড তথা মিত্রবাহিনীর হাতে পরাস্ত হয়। যুদ্ধে ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীও অংশ নিয়েছিলো। ইংরেজ সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, যুদ্ধে অংশ নিলে পরাধীন দেশগুলোকে স্বায়ত্তশাসন প্রদান করা হবে। এই কথায় ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অগ্রদূত মহাত্মা গান্ধীসহ অনেকেই যুদ্ধে যোগ দেন এবং যুদ্ধে ভারতবাসীকে উৎসাহিত করেন।
যুদ্ধ শেষ হয় ১৯১৮ সালে। কিন্তু ইংরেজ সরকারের নীতিতে কোনো রকম পরিবর্তন দেখা যায়নি। যেসব সৈন্য যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল এসময় তাকে বেকার করে নিজ নিজ গ্রামে পাঠিয়ে দেয়া হয়। অর্থনৈতিক মন্দা এবং দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারীতে এক কোটির বেশি মানুষ মৃত্যুমুখে পতিত হয়। ভারতবাসীর মনে সন্দেহ ঘনীভূত হতে থাকে। এই সন্দেহ থেকেই ক্ষোভ এবং ইংরেজবিরোধী মনোভাবের সূচনা ঘটে।শত বছরের শিক্ষা । মেহেদী হাসান সানি

মূল ঘটনা
এপ্রিল মাসের প্রথম দিক, ১৯১৮ সাল। জনসাধারণের মনে যখন বিদ্রোহ দানা বাঁধতে শুরু করল তখন পাঞ্জাবে যাওয়ার পথে গান্ধীজিকে গ্রেফতার কওে ইংরেজ সরকার। এর প্রতিবাদে আহমেদাবাদের শিল্প শ্রমিক এবং পাঞ্জাবের সাধারণ জনগণ বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। সরকার গান্ধীকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। এরপরও বিক্ষোভ কমেনি। দু’দিন যেতে না যেতেই কংগ্রেসের জনপ্রিয় একজন মুসলিম নেতা সাইফুদ্দিন কিচলু, যিনি জার্মানি থেকে ব্যারিস্টারি পাস করে এসেছিলেন, তাকেসহ দু’জনকে অমৃতসর থেকে গ্রেফতার করা হয়। এ খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে আমজনতার মাঝে ক্ষোভের আগুন তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে ওঠে। সাদা চামড়ার ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের ওপর ভারতীয়রা হয়ে ওঠে ভীষণ ক্ষুব্ধ। ধর্মঘট ও বিক্ষোভের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় সরকারি দফতর ও যানবাহন।
অমৃতসরের পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্রিগেডিয়ার ডায়ারকে নিয়ে আসা হয়। তিনি এসেই শহরে যে কোনো ধরনের সমাবেশ নিষিদ্ধ করে দিলেন। কিন্তু অনেক মানুষ এই সিদ্ধান্তের কথা জানত না। ১৩ এপ্রিল, জালিয়ানওয়ালাবাগের পার্কে এক জনসমাবেশের আয়োজন করা হয়। হাজার হাজার মানুষ সেখানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে। বেশ কিছু শিখ তীর্থযাত্রীও ছিলেন। কারণ অমৃতসর শিখ সম্প্রদায়ের একটি পবিত্র শহর। এই শহরেই শিখদের পবিত্র স্বর্ণ মন্দির অবস্থিত।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডায়ার খবর পেলেন শহরের জালিয়ানওয়ালাবাগে বিক্ষোভের জন্য মানুষজন জড়ো হচ্ছে। সাথে সাথেই তিনি একদল সৈন্য নিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে সেখানে গেলেন। পার্কে ঢোকা মাত্রই নির্দেশ দিলেন গুলি করার। মানুষ প্রাণে বাঁচার জন্য দিগি¦দিক ছোটাছুটি শুরু করল। মুহূর্তের মধ্যেই শত শত গুলিবিদ্ধ লাশ মাটিতে লুটিয়ে পড়ল এবং পার্কটি রক্তের নদীতে পরিণত হলো।
ঐ ঘটনা সম্পর্কে ব্রিগেডিয়ার ডায়ার নিজেই ব্রিটিশ সরকারকে রিপোর্ট করেন এভাবে-
‘সরু একটি গলির ভেতর দিয়ে আমি উদ্যানে ঢুকলাম। রাস্তা সরু হওয়ায় আমাকে আমার সাঁজোয়া গাড়ি রেখে আসতে হয়েছিল। পার্কে ঢুকে দেখলাম হাজার পাঁচেক মানুষ। একজন মানুষ একটি উঁচু বেদিতে দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে নেড়ে ভাষণ দিচ্ছে। আমি সাথে সাথে বুঝলাম মানুষের তুলনায় আমার সাথে সৈন্যদের সংখ্যা অনেক কম। আমি গুলির নির্দেশ দিলাম। দু’শ থেকে তিন শ’ লোক মারা যায়। এক হাজার ছয় শ’ পঞ্চাশ রাউন্ড গুলি চালানো হয়। সন্ধ্যা ছয়টার দিকে আমি সেনা সদরদফতরে ফিরে যাই।’
ঐ হত্যাকাণ্ড নিয়ে পরে ব্রিটিশ সরকার একটি তদন্ত করে। রিপোর্টে নিহতের সংখ্যা বলা হয় ৩৭৯। কিন্তু ভারতের করা তদন্তে এই সংখ্যা প্রায় এক হাজার।

প্রতিক্রিয়া
জালিয়ানওয়ালাবাগের ভয়ানক ও মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ব্রিটিশ শাসনের প্রকৃত নগ্ন রূপের প্রকাশ হয়ে পড়ে। সরকার জেনারেল ডায়ারের কাজকে সমর্থন করে। কিন্তু এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গোটা বিশ্ব শিহরিত হয়। দেশে-বিদেশে সরকারের নগ্ন স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে, সর্বত্র ঘৃণা ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে এবং ডায়ারের বিচার দাবি শুরু হয়। দুই দিন পরে, ১৫ এপ্রিল, এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে গুজরাওয়ায় ব্যাপক বিক্ষোভ সংঘটিত হয়। বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশ ও বিমান ব্যবহার করা হয়, এর ফলে ১২ জন মারা যায় এবং ২৭ জন আহত হয়।
অন্যদিকে ইংল্যান্ডে এই সেনা কর্মকর্তা জোরালো সমর্থন পাচ্ছিলেন। ইংল্যান্ডের মানুষজন এটা এভাবে দেখছিলো যে ডায়ার তার দায়িত্ব পালন করেছেন। অনেকে বলছিলেন, ডায়ার পরিস্থিতির শিকার! ডায়ারের সমর্থনে সেখানে তহবিল সংগ্রহ শুরু হয়েছিল। ২৬ হাজার পাউন্ড সংগ্রহ করা হয়েছিল। ব্রিটেনে ফিরে আসার পর তাকে দামি পাথরখচিত তরবারি উপহার দেয়া হয়েছিল যাতে খোদাই করা ছিল– Saviour of Punjab অর্থাৎ পাঞ্জাবের রক্ষাকর্তা।
ব্রিটিশ সরকার একটি তদন্ত কমিশন গঠন করেছিল। কমিশন ব্রিগেডিয়ার ডায়ারের সাথে কথা বলে। কমিশনকে তিনি বলেছিলেন, সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা ভাঙার শিক্ষা দিতে চেয়েছিলেন তিনি। ‘আমি মনে করি যা করেছি ভালো করেছি। দ্বিতীয়বার স্পর্ধা দেখানোর আগে তারা একবার ভাববে।’
ব্রিটিশ সরকারের নির্দেশে ডায়ার ১৯২০ সালের মার্চ মাসে তার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেন এবং ১৯২৭ সালে ইংল্যান্ডে তার মৃত্যু হয়। যদিও শেষ বয়সে তিনি তার কাজের জন্য অনুশোচনা করতেন। এই গণহত্যা ভারতের জাতীয়তাবাদকে আরও কঠোর করে তুলেছিল। গান্ধী লিখেছিলেন ‘আমরা ডায়ারের শাস্তি চাই না, যে ব্যবস্থা ডায়ারের মত মানুষ তৈরি করে, আমরা তার পরিবর্তন চাই।’ ওই ঘটনার পরই গান্ধীর স্বাধীনতা আন্দোলন চূড়ান্তরূপে শুরু হয়। এর আগে গান্ধী কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্রিটিশদের কাছ থেকে ছাড় দাবি করছিলেন। কিন্তু এরপর তিনি একবারেই ব্রিটিশবিরোধী হয়ে পড়লেন।
ঘটনাগুলোর পেছনে সামরিক বাহিনীর নগ্নতা প্রকাশ পেলেও এর নেপথ্যে আরও গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণ লুকিয়ে আছে। শত বছর আগের ঘটনাগুলো মূলত আজকের পৃথিবীর আধিপত্যবাদীদের শৈশবকালকেই প্রতিনিধিত্ব করে। সমরাস্ত্রের দাপটে এই সাম্রাজ্যবাদীরা একদিন সমগ্র বিশ্ব চষে বেড়িয়েছে, সম্পদ চুষে নিয়ে নিজেদের সাম্রাজ্যকে করেছে পাহাড়সম। ইতিহাসের নানা চড়াই উতরাই শেষে ভারতবর্ষ স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু হতভাগ্য ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতার সূর্য আজও উদিত হয়নি। জালিয়ান-ওয়ালাবাগের যে ঘটনার ফলে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন তীব্র হতে থাকে সেখানে সুরাফেন্দ ম্যাসাকারের দ্বারা ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা যেন অস্তমিত হয়। শত বছরের বঞ্চনার মাঝে আজও ফিলিস্তিনে স্থানীয় আদিবাসীদের সরিয়ে দখলদার ইসরাইল বাহিনী ক্রমাগত আগ্রাসন চালিয়ে যাচ্ছে। এর প্রতিবাদে বিশ্বসম্প্রদায় নিশ্চুপ। শুধু তাই না, মোড়লদের আগ্রাসন আজ ইরাক আফগানিস্তান হয়ে লিবিয়া, সিরিয়া পর্যন্ত পৌঁছেছে। তাদের আগ্রাসী নীতি আর মানববিধ্বংসী অস্ত্রে সমগ্র মানবতা খাদের কিনারে এসে আশ্রয় নিয়েছে। তিলে তিলে গড়ে ওঠা একেকটি শহর বন্দর এখন গোরস্থানে পরিণত হয়েছে। প্রতিটি মানুষের রয়েছে স্বাধীন জীবনের অধিকার। অথচ পৃথিবীর ভাঁজে ভাঁজে সেই অধিকার এখন চরমভাবে ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে। যারা আজ নানা অজুহাতে মানুষের এই মৌলিক অধিকার কেড়ে নিচ্ছে তারা মানবতার শত্রু। তাদের সবাইকে একদিন ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। এর কোনো ব্যত্যয় হবে না।

লেখক : বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক

SHARE

Leave a Reply