শরিয়তের মানদণ্ডে শবেবরাত । মাহমুদ রনি

শরিয়তের মানদণ্ডে শবেবরাত । মাহমুদ রনিশবেবরাত ফারসি ভাষার শব্দ। শব অর্থ রাত আর বরাত মানে ভাগ্য। সুতরাং শবেবরাত মানে হলো ভাগ্যরজনী বা ভাগ্যের রাত। কেউ কেউ বরাত শব্দটি আরবি ‘বারায়াতুন’ থেকে গৃহীত বলেও মত দিয়েছেন বারায়াতুন শব্দের অর্থ অব্যাহতি, দায়মুক্তি, নিষ্কৃতি। সে ক্ষেত্রে এর অর্থ হবে দায়মুক্তির রাত, অব্যাহতির রাত। এ অর্থ ‘বারাআহ’ শব্দের ব্যবহার পবিত্র কুরআনেও পরিলক্ষিত হয়। যেমন আল্লাহর বাণী :
আল্লাহ তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে সেই মুশরিকদের (কৃত চুক্তির থেকে) অব্যাহতি দেয়া হলো। যাদের সাথে তোমরা চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলে। (সূরা তওবা : ১)
তবে যেহেতু পূর্বেকার শব শব্দটা ফারসি ফলে পরের শব্দটা আরবি নয় বরং ফারসি হওয়াটাই যুক্তিসঙ্গত বলে মনে করি। ফলে এর অর্থ হবে ভাগ্যরজনী। আমাদের সমাজে এ রাতটা শবেবরাত বা ভাগ্যরজনী বলেই পরিচিত। এ রাতকে ইরান ও আফগানিস্তানে ‘নিম শাবান’ ও তুর্কি ভাষাভাষীগণ বলেন ‘বিরাত কান্দিলি’। আরবি ভাষাভাষীগণ এ রজনীকে ‘লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান’ বলেই জানেন। হাদিসেও এ রাতকে এ নামেই অভিহিত করা হয়েছে।
ইসলামী শরিয়তের পরিভাষায় আরবি ৮ম মাস শাবানের ১৪ ও ১৫ তারিখের মধ্য রজনীকে শবেবরাত বলা হয়।
বর্তমানে আমাদের সমাজে শবেবরাত নিয়ে দু’ধরনের বাড়াবাড়ি আছে। এক. অতিরঞ্জনের বাড়াবাড়ি দুই. খাটো করার বাড়াবাড়ি
কেউ কেউ আবার মনে করেন যেহেতু এ শব্দটার ব্যবহার কোরআন-হাদিসে নাই সুতরাং এটি বর্জনীয়। আমরা আগেই জেনেছি এটি ফার্সি শব্দ আর কুরআন-হাদিস যেহেতু আরবি ভাষায় তাই এটি কুরআন ও হাদিসে ব্যবহার হওয়ার কোন সুযোগ নাই। হাদিসে এ রজনীকে লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান বলে উল্লেখ করা হয়েছে। শাব্দিকভাবে কুরআন ও হাদিসে উল্লেখ না থাকলেও আমরা ‘নামাজ’ ও ‘রোজা’ শব্দ দুটোকে কোন বিতর্ক ছাড়াই মেনে নেই। এ দুটোও তো ফার্সি শব্দ; যার আরবি প্রতিশব্দ সালাত ও সওম।

আল কুরআনে শবে বরাত
যদিও পবিত্র কুরআনুল কারিমে শবেবরাত নিয়ে সরাসরি কোন বর্ণনা নাই। তবে আল্লাহর বাণী-
“নিশ্চয় আমি কুরআন অবতীর্ণ করেছি বরকতময় রজনীতে। নিশ্চয় আমি সতর্ককারী।” (সূরা দুখান : ১)
বেশ কিছু তাফসিরে এ আয়াতের ‘লাইলাতুম মুবারকা’ বা ববরকতময় রাতের ব্যাখ্যায় শবে কদরের পাশাপাশি শবে বরাতের কথাও বলা হয়েছে। তবে সেখানে কারণ উল্লেখপূর্বক শবে কদরের মতকেই প্রাধান্য দেয়া হয়েছে।
যেমন এ রাতের ব্যাপারে তাফসিরে কাবিরের ভাষ্য হলো:
বরকতময় এ রাতের ব্যাপারে মুফাসসিরগণ মতভেদ করেছেন।
অধিকাংশ মুফাসসির বলেন নিশ্চয়ই এটা লাইলাতুল কদর। তাবেয়ী ইকরামা (র) ও অপর একটি দল মনে করে এটা হলো ‘লাইলাতুল বারাআহ’ আর তা হলো শাবান মাসের মধ্যরজনী। তবে এ তাফসিরে বেশ কিছু আয়াত ও হাদিসের উদ্ধৃতি উল্লেখ করে প্রথম মতকেই প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। কী কী যুক্তির ভিত্তিতে তিনি প্রথম মতকে প্রাধান্য দিয়েছেন সেটা পরে আলোচনা করছি। তার আগে আমরা আরো কিছু তাফসিরের বক্তব্য দেখে আসি।
তাফসিরে কুরতুবিতেও এ রাতের বর্ণনায় উপরোক্ত দু’টি মতই ব্যক্ত করা হয়েছে। ভিন্ন ভিন্ন দু’টি মত বলার পর এখানেও প্রথম মতকেই প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। যেমন এ ব্যাপারে কুরতুবির ভাষ্য হলো
প্রথম মতটাই বিশুদ্ধ বা যুক্তিযুক্ত।
তাফসিরে ইবনে কাসীর ও মারেফুল কোরআনেও একই মত বর্ণিত হয়েছে। এ তাফসিরদ্বয়েও প্রথম মতকেও প্রাধান্য দেয়া হয়েছে।
তা ছাড়া তাফসির ফি যিলালিল কোরআন ও তাফহিমুল কুরআনেও বরকতময় রাত বলতে লাইলাতুল কদর বলেই আখ্যা দেয়া হয়েছে।
সুতরাং এটা নিশ্চিত করেই বলা যায় সূরা দুখানে বর্ণিত বরকতময় রাত শবেবরাত নয় বরং তা শবেকদর।
লাইলাতুন মুবারাকা যে কারণে শবেকদর
যারা লাইলাতুন মুবারাকা বলতে শবেবরাত বলেন তাদের বক্তব্য হলো যেহেতু আল্লাহ তায়ালা কদরের মহত্ত্ব ও মর্যাদা বর্ণনার জন্য আলাদা একটি সূরাই অবতীর্ণ করেছেন সুতরাং এ আয়াতে লাইলাতুন মুবারাকা বলতে আল্লাহ তায়ালা মূলত শবেবরাতই বুঝিয়েছেন। অপরদিকে কেন মুফাসসিরে কেরাম এখানে লাইলাতুন মুবারাকা বলতে শবেকদরের রাতকেই প্রাধান্য দিয়েছেন তার ব্যাখ্যা তারা দিয়েছেন এভাবে-
এক. সূরা কদরের প্রথম আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন-
“নিশ্চয় আমি কোরআন কদরের রজনীতে অবতীর্ণ করেছি।  আর কদরের রজনী অত্যন্ত দামি ও বরকতময় তাতে কোন সন্দেহ নাই। কদরের রজনী হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ।” (সূরা ক্বদর: ১-৩)
আর আমরা সবাই জানি শবেকদর রমজান মাসের শেষ দশকে।
দুই. আল্লাহ তায়ালা সূরা বাকারার ১৮৫ নম্বর আয়াতে বলেছেন-
রমজান মাসই হলো সে মাস যে মাসে নাজিল করা হয়েছে পবিত্র কোরআন। এ আয়াতগুলো দ্বারা এ কথা নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত যে, কোরআন রমজান মাসেই অবতীর্ণ হয়েছে। সুতরাং লাইলাতুন মুবারাকা বলতে শবে বরাতের অর্থ গ্রহণ করার যুক্তিটা দুর্বল।
তিন. হযরত কাতাদা (রা.) হতে বর্ণিত; তিনি বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন হযরত ইবরাহিম (আ.)-এর সহিফাসমূহ রমজানের প্রথম তারিখে, তাওরাত ছয় তারিখে, যাবুর বারো তারিখে, ইঞ্জিল আঠারো তারিখে ও কোরআন চব্বিশ তারিখ অতিবাহিত হওয়ার পর পঁচিশের রাত্রিতে অবতীর্ণ হয়েছে। (কুরতুবী)
সুতরাং লাইলাতুন মুবারাকা শবেবরাত নয় বরং তা অবশ্যই শবেকদর।

আল হাদিসে শবেবরাত
যদিও পবিত্র কুরআনে নির্দিষ্ট ও সুস্পষ্টভাবে শবেবরাতের তেমন কোন বর্ণনা নাই তবে রাসূলুল্লাহ (সা) একাধিক হাদিসে এ রাতের সম্মান ও মহত্ত্ব বর্ণনা করেছেন।
হাদিসে পবিত্র এ রজনীর গুরুত্ব ও তাৎপর্য হচ্ছে-
এক. আবু মুসা আশআরী (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন-
মহান আল্লাহ তায়ালা মধ্য রাতে তার সৃষ্টির প্রতি দৃকপাত করেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যতীত সকলকে ক্ষমা করে দেন।
দুই. আবু হুরাইরা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
যখন শাবানের মধ্য রজনী আসে তখন আল্লাহ তায়ালা মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যতীত তাঁর সকল বান্দাকে ক্ষমা করে দেন।
তিন. আবু বকর সিদ্দিক (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, যখন মধ্য শাবানের রাত আসে তখন আল্লাহ তায়ালা দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন। অতঃপর তাঁর বান্দাদের মধ্য হতে শিরকে জড়িত অথবা নিজের ভাইয়ের প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যতীত সকলকে ক্ষমা করে দেন।
এ ছাড়াও এ রাতে কবর জেয়ারত, দীর্ঘ কেরাতে রাত্রীকালীন নামাজ পড়ার ব্যাপারেই হাদিস বর্ণিত হয়েছে।

এ রাতের করণীয়
ইসলাম ধর্মমতে নিঃসন্দেহে এ রাত একটি বরকতপূর্ণ রজনী। আমরা হাদিস থেকেও সে কথাই জানলাম। এ রাতে আল্লাহ তায়ালা অধিকাংশকেই মাফ করে দেন। তবে নবী (সা) ও সাহাবীদের জীবদ্দশায় সম্মিলিতভাবে এ রাতে বিশেষ কোন আমলের বর্ণনা পাওয়া যায় না। তবে যেহেতু এটি অত্যন্ত পুণ্যবান একটি রাত সুতরাং আল্লাহর ক্ষমা প্রাপ্তির জন্য এ রাতে নিম্নোক্ত কাজগুলো করতে পারি
১. বেশি বেশি নফল সালাত আদায় করা
২. সালাতে দীর্ঘ কেরাত পড়া
৩. বেশি বেশি কুরআন তেলাওয়াত করা
৪. রাত জেগে অশ্রুবিজড়িত অবস্থায় ক্ষমা চাওয়া
৫. রোযা রাখা (তবে তা শুধু ঐ দিন না)
৬. কবর জেয়ারত করা।

প্রচলিত ভ্রান্ততা
শবেবরাতের মহিমান্বিত এ রাতকে কেন্দ্র করে ইবাদতের নামে আমাদের সমাজে নানাবিধ কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। যার কোন ভিত্তি কুরআন-হাদিসে নাই। তার কিছু যেমন :

১. হালুয়া রুটি বানানো
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এ দিনে হালুয়া রুটি খাওয়ার প্রচলন আজো বিদ্যমান। তারা মনে করে উহুদ যুদ্ধে হুজুরের দাঁত মুবারক শহীদ হওয়ার ফলে তিনি হালুয়া রুটি খেয়েছিলেন। সুতরাং আমাদেরও হালুয়া রুটি খাওয়া উচিত। যদিও রাসূলের জীবনের বাকি সব সুন্নাহ মেনে নিতে আমদের বড় চতুরতা। আমাদের সমাজে অনেক সময় এ রুটি বানাতে গিয়ে ব্যস্ততায় ফরজ নামাজও কাযা হয়ে যায়। অথচ সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ি ও তাবে তাবেয়ির যুগে এর কোন প্রচলন ছিল না। এটি হিজরি ৫ম শতকের দিকে আবিষ্কৃত একটি নব্য ইবাদত। এ ব্যাপারে ফুরফুরার পীর আল্লামা আবু জাফর সিদ্দিকী তার আল মাওজুয়াত গ্রন্থে বলেছেন মূর্খ লোকেরা মনে করে যে, রাসূল (সা.) যখন যুদ্ধে আহত হন এবং তাঁর দাঁত ভেঙে যায় তখন তিনি হালুয়া খেয়েছিলেন। তাই এ রাতে হালুয়া রুটি বানাতে হবে। অথচ নব আবিষ্কৃত ইবাদতের ব্যাপারে রাসূল (সা.) বলেছেন- ‘যে ব্যক্তি আমাদের দ্বীনের মধ্যে এমন নতুন বিষয় আবিষ্কার করে, যা তার অন্তর্গত নয়, তাহলে তা প্রত্যাখ্যত হবে। (বুখারি ও মুসলিম)

২. নামাজের নির্দিষ্ট রাকাত নির্ধারণ করা
এ রাতকে কেন্দ্র করে কখনো দল বেঁধে মসজিদে গিয়ে ১০০ বা ৫০০ রাকাত নামাজ পড়তেই হবে বলে লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করে নেয়া হয়। এরপর চলে যেন অলিখিত প্রতিযোগিতা। কে কার আগে তা শেষ করতে পারে। কখনো তারা ঠিকমত রুকু সেজদার ধার না ধরে শুধুমাত্র রাকাতের সংখ্যা বাড়াতে ব্যস্ত হয়ে যায়। যা পুরোপুরি শরিয়া বিরোধী।

৩. নামাজের জন্য নির্ধারিত পন্থা অবলম্বন
আবার কখনো কেউ কেউ এ রাতের নামাজের জন্য প্রতি রাকাতে সূরা ফাতিহার পর ৩ বা ১০ বার সূরা ইখলাস পড়ার নিময়টা খাস করে নেয়া হয়। অথবা ভিন্ন কোন নিয়ম। যেমন আল্লাহর বাণী:
কুরআনের যতটুকু তোমাদের সহজ মনে হয় ততটুকু পড়। (সূরা মুজাম্মিজল : ২০)

৪.আতশবাজি ও ফটকা ফুটানো
৫. অহেতুক আলোকসজ্জা
৬. বন্ধুরা মিলে বেহুদা ঘুরাঘুরি করা
আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে মহিমান্বিত এ রজনীর পবিত্রতা বজায় রেখে শরিয়তসম্মত আমল করার তাওফিক দিক। মহান রব যেন আমাদের সবাইকে এ রাতের মাগফিরাতে শামিল করেন। আমিন।

লেখক : শিক্ষক, মানারাত ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল কলেজ

SHARE

Leave a Reply