শহীদ আবদুল মালেক ইসলামী শিক্ষা-আন্দোলনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র

মোবারক হোসাইন

কালো আকাশ, অন্ধকারাচ্ছন্ন পৃথিবী; অমাবস্যার রাত, তিমির অন্ধকার, অমানিশার ঘোর এক ভয়ঙ্কর অবস্থা পৃথিবী নামক গ্রহে, ভীত-সন্ত্রস্ত। ঠিক সেই ক্ষণে সকল আঁধার পেরিয়ে সুবহে সাদিকের আগমনবার্তা নিয়ে আগমন করলেন এক ধ্রুব নক্ষত্র, যার অবিস্মরণীয় নাম শহীদ আবদুল মালেক।
শহীদ মালেক! সেতো কোনো ব্যক্তির নাম নয়, একটি আন্দোলনের নাম। যে নাম ইসলামী আন্দোলনের প্রতিটি কর্মীর হৃদয়ের মণিকোঠায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা। যে নাম বিপ্লবী সুর সৃষ্টি করে, স্পন্দন জাগায় হৃদয়ে হৃদয়ে, স্বপ্ন জাগায় হাজারো যুবকের মনে। মালেক আজ পৃথিবীতে নেই, তবে উদ্ভাসিত হয়ে আছেন হাজারো নক্ষত্রের মাঝে।
কালের পরিক্রমায় আজও ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থার দাবিতে সভা-সমাবেশ, সেমিনার হয় কিন্তু শহীদ মালেক ভাইয়ের সেই ক্ষুরধার হৃদয়গ্রাহী বক্তৃতা শোনা যায় না। ভীত কম্পিত হয়ে ওঠে না বাতিলের রাজপ্রাসাদ।
মহান রাব্বুল আলামিন তাঁর নিজের দ্বীনকে বিজয়ী করার প্রত্যয়ে যারা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, তাদের পথ চলা নিঃসন্দেহে বর্ণনাতীত কঠিন। এ কাঠিন্যের মাপকাঠি দিয়ে মহান প্রভু তাঁর অতি প্রিয় বান্দাদেরকে বাছাই করে নেন। কিছু বান্দার জীবনকে কবুল করে নিয়ে একটি আদর্শের বুনিয়াদ দুনিয়ার মানুষের জন্য তৈরি করে নেন সত্যের সাক্ষ্য রূপে। শহীদ ভাইদের স্মৃতি আল্লাহর প্রিয় হতে আমাদেরকে অনুপ্রাণিত করে। পথ চলতে চলতে যখন নানা মোহ-ভীতি-অশঙ্কা আমাদের পথ আগলে দেয় তখন হৃদয়ের মাঝে অমর হয়ে থাকা শহীদের স্মৃতি আমাদের মনে আশার দ্বীপশিখা জ্বালায়। As the star that are starry in the time of our drakness অর্থাৎ শহীদরা মিল্লাতের জীবন, মিল্লাতের গৌরব, দুর্যোগের রাহবার। হতাশাগ্রস্থ মুসাফিরের জন্য তারা দিশাবহনকারী ধ্রুবতারা। শোহাদায়ে কারবালা মুজাহিদদের হৃদয়ে তাইতো সৃষ্টি করে চলছে বিপ্লবের জযবা।
সত্য-মিথ্যার দ্বন্দ্ব পৃথিবীর চিরন্তন ইতিহাস। মানুষ যখন অন্যায়-অত্যাচার আর অসত্যে নিমজ্জিত, শয়তান তার অনুসারীদের সাথে নিয়ে পৃথিবীতে শয়তানী শক্তির রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করতে ব্যস্ত; তখন আল্লাহ মানব জাতির কল্যাণে যুগে যুগে পাঠিয়েছেন অসংখ্য নবী-রাসূল ও তাঁদের সঙ্গী-সাথী হিসাবে প্রেরণ করেছেন দ্বীনের জন্য জীবন উৎসর্গকারী মর্দে মুজাহিদ। নবী-রাসূলদের পর তাঁদের উত্তরাধিকারীরা এ দায়িত্ব পালনে ব্রত হন। তারা শয়তানী শক্তি নির্মূলের জন্য সর্বশক্তি প্রয়োগ করেন, এমনকি জীবনের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে সাক্ষী হয়ে থাকেন।
হৃদয়ের গহীন কোণে
রক্ত ঝরায় ক্ষণে ক্ষণে
অশ্রুজলের বান ডেকে যায়
রুখবে কে তা সাহস কোথায়!
তুমি ছাড়া সারাটি ক্ষণ
ডুকরে কাঁদছে পাগল হৃদয়
ডানা ভাঙা পাখির মতো
ক’টা দিন আর পার করা যায়?
শহীদ আবদুল মালেক একটি প্রেরণার নাম। যার অসাধারণ মেধা, অতুলনীয় চরিত্র, অনুপম কথামালা, অমায়িক ব্যবহার, পরোপকারী মনোভাব আর আল্লাহভীরু মানসিকতা আমাদের প্রেরণার উৎস। পিতা-মাতার আশা ছিল পড়াশুনা শেষ করে তাদের মুুখ উজ্জ্বল করবেন। কিন্তু প্রভুর প্রেমে পাগল দ্বীনের পথের এ মুজাহিদ দুনিয়ার এ ক্ষুদ্র সার্থে নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে ছিলেন অনেক দূরে। পৃথিবীর অজানা সবচেয়ে বড় ডিগ্রি পাওয়ার যিনি অধিকারী তিনি কি আর ছোট কোনো ডিগ্রির অপেক্ষায় থাকেন? পাড়া-প্রতিবেশীরা ছিল শহীদ আবদুল মালেকের প্রিয় শুভাকাক্সক্ষী। বাড়ি গেলেই সবার সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করতেন, খোঁজ-খবর নিতেন, সালাম বিনিময় করে তাদের পারিবারিক কুশলাদি জানতেন। নামাজে ডাকতেন, আর দরদভরা মন নিয়ে মানুষকে ইসলামের কথা বুঝাতেন।

প্রেরণা জাগায় শহীদ আবদুল মালেক
“আল্লাহর পথে লড়াই করার যোগ্য ব্যক্তি হচ্ছেন তাঁরা যাঁরা দুনিয়ার জীবনকে আখেরাতের বিনিময়ে বিক্রি করে দেন। আর যারা আল্লাহর পথে সংগ্রাম করেন তাঁরা বিজয়ী হোন অথবা নিহত; উভয় অবস্থায়ই আমরা তাঁদের প্রচুর পরিমাণ পুরস্কার দান করবো।” (আল কুরআন)
নাম : আবদুল মালেক
পিতা : মৃত মৌলভী মুন্সী মোহাম্মদ আলী
মাতা : মৃত মোছাম্মত ছাবিরুন নেছা
জন্মস্থান : গ্রাম- খোকসাবাড়ি (স্থানীয় নাম বগা), থানা- ধূনট, জেলা-বগুড়া
জন্মতারিখ : মে ১৯৪৭
পারিবারিক পরিচিতি : ৫ ভাই ১ বোন। ভাইদের মধ্যে তিনি সর্বকনিষ্ঠ, বোনটি ছোট। ভাইয়েরা হলেনÑ মৃত ক্বারী মো: আবদুর রশিদ, মুন্সী মো: আবদুল কাদের, ডা. মো: আবদুল খালেক, মাস্টার আবদুল বারী মুন্সী এবং বোন আয়েশা খাতুন।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহ : প্রথম শ্রেণী থেকে দ্বিতীয় শ্রেণী পর্যন্ত গ্রামের পাঠশালা (খোকসাবাড়ি স্কুল)। ৮ম শ্রেণী পর্যন্ত গোসাইবাড়ি হাইস্কুলে, যা বাড়ি থেকে ৪ মাইল দূরে অবস্থিত। পরবর্তীতে বগুড়া জেলা গভ: হাইস্কুল থেকে এসএসসি, রাজশাহী কলেজ থেকে এইচএসসি শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
অধ্যয়ন : বই খুলে পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে যেতেন, মা বইগুলো গুছিয়ে রাখতেন। ঘণ্টাখানেক পর ঘুম থেকে জেগে আবার পড়তেন।
বিভিন্ন পরীক্ষায় কৃতিত্ব : ১৯৬০ সালে জুনিয়র স্কলারশিপ বৃত্তি, ১৯৬৩ সালে এসএসসি পরীক্ষায় গণিত ও রসায়নে লেটারসহ রাজশাহী বোর্ডে একাদশ স্থান অর্জন করেন। (এ সময় তাঁর পিতা মৌলভী মোহাম্মদ আলী ইন্তেকাল করেন)। ১৯৬৫ সালে রাজশাহী সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় দুই বিষয়ে লেটারসহ মেধা তালিকায় চতুর্থ স্থান লাভ করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাণরসায়ন বিভাগে ভর্তি : উক্ত বিভাগের চেয়ারম্যান ড. কামাল হোসেন আবদুল মালেককে তার রুমে নিয়ে যান। আবদুল মালেক নির্দিষ্ট তারিখ ও সময়ের একটু পরে ভর্তি হতে আসেন। প্রথমত জিন্নাহ হলে (বর্তমান পরিবর্তিত সূর্যসেন হল) প্রভোস্টের কাছে যান। প্রভোস্ট বলেন তিন মাস পরে সিট হবে। তখন বায়ো-কেমিস্ট্রির চেয়ারম্যান ড. কামালের সাথে দেখা করলে তিনি ফজলুল হক হলে ভর্তির পরামর্শ দেন। পূর্বের ফরম ছিঁড়ে ফেলে দিয়ে নতুন হলে ভর্তি হন। প্রভোস্ট আগ্রহ করে তাকে নিয়ে যান। ফজলুল হক হলের আবাসিক ছাত্র হিসেবে ১১২ নম্বর কক্ষে তিনি অবস্থান করতেন।
বন্ধু-বান্ধবদের মাধ্যমে যুক্তফ্রন্টের সাথে জড়িত হন। প্রথমে মুসলিম লীগ করতেন। জেলা স্কুলে পড়ার সময়ে ছাত্ররাজনীতিতে জড়িত হন, পরে রাজশাহী কলেজে ভালোভাবে জড়িয়ে পড়েন।
ছাত্রসংঘে যোগদান : অনার্স প্রথম বর্ষে থাকা অবস্থায় ইসলামী ছাত্রসংঘে যোগদান করেন।
দায়িত্ব পালন : কর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেন এবং যোগ্যতার সাথে সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত হন। ১৯৬৬-৬৭ সালে তিনি ঢাকা শহর শাখার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ১৯৬৭ সালের জুলাই মাসে শহর শাখার সভাপতি এবং ১৯৬৮ সালে নিখিল পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের কার্যকরী সদস্য নির্বাচিত হন।
তাঁর শিক্ষক : মায়ের কাছে প্রাথমিক ইসলামী শিক্ষা গ্রহণ, হাজী দারেস আলী (খোকসাবাড়ি প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক), মাস্টার আবদুল জলিল, মৌলভী আবু বকর, ড. কামাল হোসন (তৎকালীন ঢাকা বিশ্বদ্যিালয়ের বায়ো-কেমিস্ট্রির চেয়ারম্যান, শামসুদ্দিন (সহকারী হেডমাস্টার, বগুড়া জেলা স্কুল) ও নাজির হোসেন (গোসাইবাড়ি স্কুলের হেডমাস্টার)।
তাঁর লিখিত বিভিন্ন প্রবন্ধ : সংশয়ের আবর্তে আমাদের জীবন, আধুনিক বিশ্ব, প্রত্যয়ের আলোকে আমাদের জীবন, ধর্ম ও আধুনিক চিন্তাধারা। এছাড়াও তৎকালীন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তিনি অসংখ্য প্রবন্ধ-নিবন্ধ লিখেছেন।
অবসর মুহূর্তে : বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক নেতা, সাহিত্যিকদের জীবনী পড়তেন। খাবার সময় ছাড়া তাকে পড়ার টেবিলে পাওয়া যেত।
তাঁর প্রিয় ব্যক্তিত্ব : মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা)।
শখ : টাকা জমিয়ে বই কেনা, পত্রিকা পড়া।
পোশাক : সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবী।
শাহাদাতের পূর্ব ঘটনা : ২ আগস্ট ১৯৬৯ সালে ঢাকার নিপায় (ঘওচঅ) শিক্ষানীতির উপর আলোচনার জন্য ছাত্রদের আহ্বান করা হয়। সেদিন শহীদ আবদুল মালেকের ক্ষুরধার যুক্তি ও বলিষ্ঠ বক্তব্য মিলনায়তনের সবাইকে মুগ্ধ করে। শ্রোতারা ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থার পক্ষেই মত প্রকাশ করল। সেদিন তাঁর কণ্ঠস্বরে দৃঢ় বিশ্বাস ফুটে উঠেছিল। তাঁর সে কণ্ঠের ছিল বলিষ্ঠ, ছিল দ্বিধাহীন। কিন্তু ইসলামবিরোধী চক্র ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষার পক্ষে প্রস্তাব পাস করার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। ১২ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি মিলনায়তনে এক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। সেখানে ইসলামী শিক্ষার পক্ষে আলোচনা করার জন্য শহীদ আবদুল মালেক ও তাঁর সাথীরা দাবি জানান। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষ ও সমাজতন্ত্রের প্রবক্তাদের এটা সহ্য হলো না। তারা আবদুল মালেকসহ ইসালামপন্থী ছাত্রদের ওপর হামলা চালায়। ছাত্র নামধারী দুর্বৃত্তরা লাঠি, লোহার রড প্রভৃতি দিয়ে আক্রমণ করে মালেক ভাইকে গুরুতর আহত করে। তিনি সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেন। প্রায় অর্ধমৃত অবস্থায় দুর্বৃত্তরা তাঁকে সেখানে রেখে চলে গেলে আশপাশের লোকেরা তাঁকে হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়।
শাহাদাতের তারিখ : ১২ আগস্ট রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) আহত হন। ১৫ আগস্ট ১৯৬৯ সালে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসাপাতালে শাহাদাত বরণ করেন। (আল্লাহপাক তাঁকে কবুল করুন)।
জানাযার স্থান : প্রথমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে, দ্বিতীয়বার কমলাপুর রেল স্টেশনে, তৃতীয়বার ধূনটে। জানাযায় ইমামতি করেন আওলাদে রাসূল মাওলানা সৈয়দ মাহমুদ মোস্তফা আল মাদানী। জানাযার পূর্বে মাওলানা আবদুর রহীম বক্তব্য রাখেন।
কবরস্থান : খোকসাবাড়ি, বগুড়া।
স্মরণীয় উক্তি : ‘কঠিন শপথ নিয়ে আমার সংগ্রামের পথে আমি চলতে চাই। আশীর্বাদ করেন, সত্য প্রতিষ্ঠার এ সংগ্রামে যেন আমার জীবনকে আমি উৎসর্গ করে দিতে পারি।’

শহীদ আবদুল মালেক উত্থাপিত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় প্রশ্ন
বাংলাদেশের বর্তমান সঙ্কটাপন্ন অবস্থার প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন ও সঠিক সমাধান খুঁজতে গেলে আমরা দেখবোÑ রাষ্ট্র ও জাতিকে গড়ে তোলার জন্য গুরুত্বপূর্ণ অনেক প্রশ্নের জবাব না দিয়েই এ দেশকে সামনে এগিয়ে নেয়ার প্রয়াস চালানো হচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হচ্ছেÑ বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা কোন্ নীতির ভিত্তিতে প্রণয়ন করা হবে? আজ থেকে ৪৪ বছর আগে আবদুল মালেক নিজের জীবন দিয়ে এ প্রশ্নটিকে যেমন শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়ে গেছেন, তেমনি শিক্ষানীতি হিসেবে ইসলামী আদর্শ অনুসরণের দাবি সম্বলিত অখণ্ড যুক্তিও তিনি উপস্থাপন করে গেছেন।
১৯৬৯ সালে জেনারেল আইয়ুব খানের স্বৈরশাসনের পতনের পর জেনারেল ইয়াহিয়ার ক্ষমতারোহনের অব্যবহিত পর সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আকাক্সক্ষাকে কায়েমী শক্তির জোরে উপেক্ষা করে এয়ার মার্শাল নূর খানের নেতৃত্বে শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ও বিতর্ক তৈরি হয় যে, শিক্ষাব্যবস্থা এ অঞ্চলের মানুষের আকাক্সক্ষা ও বিশ্বাস অনুযায়ী মূল্যবোধসম্পন্ন নৈতিক শিক্ষা হবে নাকি secular ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র আবদুল মালেক সে সময়ে জাতির বৃহত্তর কল্যাণকে সামনে রেখে secular শিক্ষাব্যবস্থার অবশ্যম্ভাবী পরিণতিকে উপলব্ধি করেছিলেন। একজন দূরদৃষ্টি সম্পন্ন মানুষ হিসেবে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন সমাজতন্ত্র, পুঁজিবাদ কিংবা আধুনিকতা দ্বারা প্ররোচিত হয়ে One set of cultural values সম্পন্ন শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তিত হলে সমাজে মূল্যবোধের অবক্ষয়ের সাথে সাথে বিভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির নির্বাসন হবে।
নতুন ঘোষিত শিক্ষানীতির ওপর শহীদ আবদুল মালেক ভাইয়ের একটি ভাষণের একাংশ (এই নিবন্ধটি নিপা’র উদ্যোগে আয়োজিত নূর খান কর্তৃক প্রস্তাবিত শিক্ষানীতির ওপর আলোচনা সভায় প্রদত্ত শহীদ আবদুল মালেকের টেপরেকর্টকৃত বক্তৃাতার অনুলিপি। শাহাদাতের মাত্র তেরদিন আগে ১৯৬৯ সালের ২ আগস্ট তিনি এই ভাষণটি দেন)
তিনি স্পষ্ট করে সেদিন বলেছিলেন, ‘এ শিক্ষানীতির Basis সম্পর্কে বলা হয়েছে Pakistan must aim at ideological unity, not at ideological vacuum- it must impart a unique and integrated system of education which can impart a common set of cultural values based on the precepts of Islam.
তিনি বক্তব্যে  Common set of cultural values–এর ধারণা উত্থাপন করে এর সুন্দর ব্যাখ্যা ও যুক্তি দাঁড় করিয়েছিলেন। তিনি বলেন, এর মানে One set of cultural values নয়, One set of cultural values সোভিয়েট রাশিয়াতে রয়েছে, যেখানে রয়েছে একটি Authoritian society আর সেখানে বিভিন্ন অংগরাষ্ট্রগুলো তাদের Culture-কে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দিয়ে সেখানে একটা One set of cultural values তৈরি করেছে। আমরা এটার বিরোধী। আমরা এখানে চাই Common set of cultural values not one set of cultural values.”
আবদুল মালেকের এ বলিষ্ঠ উচ্চারণে সেকুলারপন্থী কায়েমী স্বার্থান্বেষী মহলের যুক্তির অসাঢ় ভিত কেঁপে উঠেছিলো। আবদুল মালেক বক্তব্য শেষ করে চলে আসার পথে টিএসসিতে প্রতিক্রিয়াশীল সেকুলার সন্ত্রাসীচক্র মারাত্মক অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে তাঁর ওপর হামলা করে এবং রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে) নিয়ে এসে মাথার নিচে ইট দিয়ে উপরে ইট ও লোহার রড দিয়ে আঘাত করে অর্ধমৃত অবস্থায় ফেলে যায়। এভাবেই আবদুল মালেকের আদর্শ ও যুক্তির কাছে পরাজিত হয়ে সেকুলারপন্থীরা তাঁকে চিরতরে থামিয়ে দেয়ার প্রয়াস চালায়। আহতাবস্থায় তাঁকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করার পর ১৫ আগস্ট তিনি তাঁর প্রত্যয়ের বাস্তবায়ন করে শাহাদাত বরণ করেন, জাতির এ গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর দেবার জন্য।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের মাত্র ২ বছর আগে শিক্ষানীতির ব্যাপারে এমন প্রশ্ন তুলে তিনি যেন এ দেশের ভবিষ্যতের নির্ধারণী ইঙ্গিত দিয়ে গেছেন। অর্থাৎ তিনি আমাদেরকে এমন একটি পথের সন্ধান দিতে চেয়েছেন যে পথে সুন্দরভাবে চলার জন্য নতুন প্রজন্ম নিজেকে গড়ে তুলতে হবে।
তাঁর উক্ত বক্তব্য বাংলাদেশের জন্য পুরোপুরিই প্রযোজ্য। কারণ সফলভাবে মানুষের চাষ করার মাধ্যমটা হলো শিক্ষা, আর পদ্ধতিটা হলো শিক্ষাব্যবস্থা বা শিক্ষানীতি। মহাকবি আল্লামা ইকবালের মতে, ‘মানুষের খুদী বা রূহকে উন্নত করার প্রচেষ্টার নামই শিক্ষা।’ কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে, ‘মানুষের অন্তর্নিহিত গুণাবলীর উন্নতি ও বিকাশ সাধনই শিক্ষা।’ সক্রেটিস কিংবা তার শিষ্য প্লেটোর মতে, ‘নিজেকে জানার নামই শিক্ষা।’ মিসরীয় দার্শনিক প্রফেসর মুহাম্মদ কুতুবের মতে, ‘শিক্ষা হলো বস্তুজীবন, পার্থিব জীবন ও আত্মিক জীবনের সমন্বয় স্থাপনকারী একটি মাধ্যম।’ মহাকবি John Milton-এর মতে, Education is the harmonious development of body, mind and soul অর্থাৎ ‘দেহ, মন ও আত্মার সমন্বিত ভারসাম্যপূর্ণ উন্নতির নামই শিক্ষা।’ এ তিনের উৎকর্ষ সাধনের জন্য যে শিক্ষা সে শিক্ষাই প্রকৃত শিক্ষা। কিন্ডারগার্টেন পদ্ধতির উদ্ভাবক ফ্রোবেলের মতে, ‘শিক্ষার উদ্দেশ্য হবে সুন্দর বিশ্বাসযোগ্য পবিত্র জীবনের উপলব্ধি। English Dictionary-তে Educate মানেto bring up and instruct, to teach to train অর্থাৎ প্রতিপালন করা ও শিক্ষিত করিয়ে তোলা, শিক্ষা দেয়া, অভ্যাস করানো।
শরীর, মন ও আত্মার সমন্বিত অগ্রগতি কোনো আদর্শ (Idelog) ছাড়া যে হতে পারে না, তা একান্তভাবে সুসম্পর্ক। ইসলামের দৃষ্টিতে চিরন্তন ও শাশ্বত নৈতিক মূল্যমানের ভিত্তিতে সত্য-মিথ্যা, ভালো-মন্দ নির্ধারণের ক্ষমতা অর্জন, পরিবেশ মুকাবিলার জন্য বৈজ্ঞানিক কলাকৌশল ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জনের সমন্বিত ব্যবস্থাপনার নামই শিক্ষা।
অন্যদিকে সেকুলার শিক্ষাব্যবস্থা এমন শিক্ষাব্যবস্থা, যা ধর্মের বিষয়াবলীর সাথে সংশ্লিষ্ট নয় বা যে শিক্ষাব্যবস্থাকে ধর্মের বিধান দ্বারা নিয়ন্ত্রিত করা যায় না। সেকুলার শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমেই মূলত আমাদের একজন ছাত্রকে অঙ্ক, ইংরেজি, বিজ্ঞান পড়িয়ে একেকটি চালাক প্রাণীতে পরিণত করা গেলেও মানবিকতা সম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা যাচ্ছে না। নৈতিক মূল্যবোধ সম্পন্ন শিক্ষাব্যবস্থার অনুপস্থিতিতে মানবিক মানুষ, আলোকিত মানুষ, সাদা মনের মানুষ বা বদলে যাওয়া মানুষ বানানোর জন্য নানান অনুষ্ঠান আয়োজন ও শ্লোগান দেয়া সত্ত্বেও কোনো সুফল আসছে না। বরং দেখা যাচ্ছে প্রজন্মান্তরে বাংলাদেশে শিক্ষার যতো প্রসার ঘটছে দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও বৈষম্যই সমাজে ততো বেশি বিস্তার লাভ করছে। আর বাংলাদেশ দিন দিন শুধু রাষ্ট্র হিসেবে ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশকে একটি গণতান্ত্রিক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে ইসলামী শিক্ষানীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন এমন যৌক্তিক জন-আকাক্সক্ষা যা পূরণ না করলে এদেশ সামনে এগিয়ে যেতে পারবে না।
উপমহাদেশের শিক্ষা-আন্দোলনের ইতিহাসে শহীদ আবদুল মালেক একাই একটি চিরভাস্বর অধ্যায় এবং এক আলোর মশাল, এক অনাগত বিপ্লবের অগ্রিম সুসংবাদ। তাঁর শাহাদাতের মধ্য দিয়ে নতুন মাত্রা যুক্ত হলো এদেশের ছাত্র-ইসলামী আন্দোলন। তাঁর শাহাদাত ঘরে ঘরে জন্ম দিলো লক্ষ মালেকের। শহীদ মালেকের রেখে যাওয়া সে কাজ আমার, সে কাজ আমাদের সকলের। সচেতন ছাত্রসমাজের প্রতি তাই আকুল আবেদন, আসুন মালেক ভাইয়ের সেই অকুতোভয় বিপ্লবী ঘোষণার সাথে কণ্ঠ মিলাই। তিনি বলেছিলেন, ‘বিশ্বের সমস্ত শক্তি আল্লাহর দেয়া জীবনবিধানকে পৃথিবীর বুক থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা করছে। আমরা যুবকেরা বেঁচে থাকতে তা হতে পারে না।’ Let us make a promise today and raise a slogan–
We the Muslim Ummah
We the Bangladeshi
We the Islam as ideology
লেখক : কেন্দ্রীয় শিক্ষা সম্পাদক
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির

SHARE

Leave a Reply