শহীদ আবুজার গিফারী ঋণী করলেন ঋণ পরিশোধ করে -মাওলানা মুহাম্মদ রুহুল আমিন

সাচ্চা মুমিন তো সেই ব্যক্তি যিনি শাহাদাতের তামান্নায় উজ্জীবিত। প্রস্তুত থাকে সর্বদা শাহাদাতের নজরানা পেশ করতে। ব্যস্ত হয়ে পড়েন শাহাদাতের সিঁড়ি বেয়ে দিদারে ইলাহির জন্য। দুনিয়ার কাছে কোন প্রকার দায়গ্রস্ত থাকতে চান না। পরিচ্ছন্ন জীবণ যে জান্নাতি জীবন সে জন্য নিজেকে তৈরি রাখেন তিনি।
শহীদি মিছিলে ডাক পড়েছে
সাড়া দিয়েছেন যিনি,
জান্নাতের ঐ সবুজ পাখি
থাকতে চান না ঋণী।
আল্লাহ মুমিনদের জান-মাল কিনে নিয়েছেন জান্নাতের বিনিময়ে। (সূরা তওবা ১১১) পৃথিবীতে সে সৌভাগ্যবান মুমিনের সংখ্যা নিতান্তই বিরল, যারা তাদের সব কিছু বিলিয়ে দিয়ে তার রবের কাছে পৌঁছে গেছেন। আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন একমাত্র তাঁরই ইবাদত করার জন্য। আর আল্লাহ যৌবন বয়সের ইবাদত বেশি পছন্দ করেন। কয়জন যুবকেরই বা ভাগ্য হয় কলিজার নাড়িছেঁড়া মমতাময়ী জনম দুঃখিনী মায়ের মায়া ত্যাগ করে রক্তের বাঁধনে বাঁধা স্বপ্নের পিতার স্নেহ ভালোবাসা ভুলে মহান রবের সাথে সাক্ষাৎ করাকেই বেশি পছন্দ করেন। রক্তঝরা শহীদি কাফেলার সর্বোচ্চ বাইয়াত গ্রহণ করে আল কোরআনকে ভালোবেসে নিজেকে গড়েছেন আদর্শ যুবক। আর অল্প সময়ের মধ্যেই শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করে আসল ঠিকানায় পৌঁছে গেছেন। সেই প্রিয় হাসিমাখা মুখ দ্বীন কায়েমের প্রত্যয়দীপ্ত শহীদ আবুজার গিফারী। শোকাহত ঝিনাইদহবাসী। চোখে মুখে বেদনার ছাপ। চাপা কান্নায় কলিজা ফেটে যাচ্ছে। মাত্র কয়েকদিন আগে। পাশের উপজেলা ঝিনাইদহ সদর উপজেলার শহীদ হাফেজ জসীম উদ্দিনের নির্মম শাহাদাতের শোক তখনও কেটে উঠতে পারেনি। তখনো গোটা ঝিনাইদহ জেলাজুড়ে থমথমে। অজানা ভয়ে দুরু দুরু হৃদয়ে আতঙ্কে ভুগছে ঝিনাইদহবাসী। প্রায় পাঁচ হাজারের অধিক তরুণ যুবক তাদের নিজ নিজ বাড়ি, ঘর,  মেসে ফিরে আসতে পারছে না- এমনি বিভীষিকাময় পরিস্থিতি ঝিনাইদহজুড়ে। হঠাৎ করে আবারো ঝিনাইদহ  জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার ভাগ্যাকাশে নেমে এলো ঘনকালো মেঘ। গত ১৮ মার্চ শুক্রবার জুমার নামাজ পড়তে যাবে নিয়মিত আজানের সাথে সাথে মসজিদে ছুটে যায় যে ছেলেটি আজকেও তার ব্যত্যয় নয়। জুমার নামাজের আজান হয়ে গেছে পাঞ্জাবি পরে তৈরি প্রতিদিনের মতো আজো মিষ্টি সুরে মাকে বললো, মা কিছু খেতে দাও। মা বললেন, ‘বাবা’! এখনো তো রান্না হয়নি আর ঘরে খাবারের মত তেমন কিছু নেই। মুচকি হেসে মাকে বলে গেলো, মা জুমার নামাজ শেষে বাড়ি এসে খেয়ে নেবো, দোয়া করো নামাজে গেলাম। নামাজ শেষে বাড়িতে ফিরে আসার পথে বাড়ির পাশে ওঁৎ পেতে থাকা বাতিলের কালো থাবা অমনি ঝাপটে পড়লো তার সাইকেলের সামনে। নির্মমভাবে আবুজারের সাথে থাকা দু’টি ছোট ছোট বাচ্চাকে ধমক দিয়ে সরিয়ে দিয়ে কয়েকজন সন্ত্রাসী জোর করে টেনেহিঁচড়ে টগবগে এই মিষ্টি যুবক ছেলেকে মোটরসাইকেলে তোলার চেষ্টা করছে। মুহূর্তে বাড়ির ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো ফুফু আর মা জননীসহ কয়েকজন। বুকের মানিককে বাঁচানোর শেষ চেষ্টাটুকু করতে সন্ত্রাসীদের পা জড়িয়ে ধরলেন মাÑ আমার সোনাকে তোমরা ছেড়ে দাও কোথায় নিয়ে যাবা?
কার কথা কে শোনে, হীন কায়দায় হায়েনারা জোরে লাথি মেরে ফেলে দিয়ে তুললো মোটরসাইকেলে। বেঁধে নিলো দু’টি হাত, নড়াচড়া করার মতো  শক্তিটুকুও কেড়ে নিলো। কাপুরুষের মতো পরিচয় দিয়ে গেলো আমরা প্রশাসনের লোক। মুখ চেপে ধরে মায়ের সাথে শেষ কথাটা বলার মতো সুযোগও দিলো না। এতো টুকুন বলতে পারলো মা- মা দোয়া করো।
সমস্তÍ এলাকা নিস্তব্ধ, আকাশ বাতাস ভারী হয়ে গেলো। কিন্তু খুনিদের মন গললো না কর্ণকুহরে মায়ের আর্তচিৎকার পৌঁছালো না। দিন পার হয়ে গেলো ২৬টি দিন। ১৩ এপ্রিল রাত যত ঘনীভূত হতে লাগলো আর খুনিদের খুনের স্পৃহা ততই বাড়তে লাগলো। নির্যাতন করতে করতে শেষ পর্যন্ত নিয়ে গেলো শশ্মানে। একজনকে নয় সঙ্গে তারই সাথী শামীম মাহমুদকে। যাকে তুলে নিয়ে গিয়েছিলো আবুজারকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পাঁচদিন পর। রাতের শেষ প্রান্তে যখন মহান মনিবের সাথে একান্ত আবেদনের সময় ঠিক সে মুহূর্তে জান্নাতের দু’টি পাখি পাশাপাশি শুইয়ে কপালে সিজদার জায়গায় অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করলো। মৃত্যু নিশ্চিত করে পাশের নর্দমায় ফেলে দিলো অর্ধেক শরীর কাদাপানিতে আর অর্ধেক শরীর ওপরে। সকাল হতে না হতেই গোটা ঝিনাইদহ জেলা নয় সারা দেশে ছড়িয়ে পড়লো শহীদ আবুজার গিফারী ও শামীম মাহমুদের শাহাদাতের খবর। দলে দলে নারী-পুরুষ ছুটে আসতে লাগলো শহীদদের বাড়িতে।
শহীদ আবুজার গিফারীর মা  চোখের পানি মুছতে মুছতে বিলাপ করছেন আর বলছেন, বাবা আমার নামাজ শেষে বাড়ি আসবে খাবার খাবে। এই বুঝি আসছে আমার সোনা মানিক। একমাত্র বুকের মানিক হারিয়ে কাতরকণ্ঠে আমার সোনা ২৬ দিন পর আমার বুকে ফিরে আসছে। সত্যি ফিরে এলো ঠিকই তবে মায়ের বুকে নয়। সাদা কফিনে জড়িয়ে জান্নাতের মেহমান হয়ে মায়ের বসতবাড়ির পাশে চির নিদ্রায় শায়িত হতে। মায়ের হাতের খাবার নয়, মহান মালিকের দেয়া জান্নাতের খাবার খেয়ে তৃপ্তি পেতে। আল্লাহ বলেছেন, “তোমরা মনে করো না যারা আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হয়েছে তারা মৃত; বরং তারা জীবিত, আর তার রবের পক্ষ থেকে রিজিকপ্রাপ্ত।” (সূরা আলে ইমরান : ১৬৯) আবুজার গিফারীর স্বপ্ন সত্যি হলো! তার ফরিয়াদ মহান আল্লাহ অতি দ্রুত কবুল করলেন! শাহাদাতের তামান্না যার কলিজায় ভরপুর ছিলো। শাহাদাতের অনুপ্রেরণা তাকে সার্বিক দিকগঠনে পূর্ণ করেছিলো। ব্যবধান মাত্র তিন মাস। ৩০ ডিসেম্বর ফেসবুক আইডিতে লিখেছিলো-
ওগো দয়াময় অসীম ও অপার
শহীদি মরণ দিয়ো মিনতি আমার
আবেদন করতে দেরি হয়েছে কিন্তু মঞ্জুর হতে যে মোটেই সময় লাগেনি। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে শহীদি মিছিলে যোগ দিলো সকলের প্রিয় আবুজার গিফারী। শহীদের কফিন নিজ বাড়িতে আসার পর আরো বেদনাবিধুর পরিবেশ। সকলের চোখে আপনাহারা বেদনা। অশ্রুসিক্ত নয়নে একনজর দেখার জন্য ব্যাকুল সবাই। সাথে মায়ের আহাজারি যে বুক ফেটে যাচ্ছে কিন্তু কেউ কথা বলতে পারছে না। শুধু মায়ের কথাগুলো শুনছে আর চোখ মুছে মুছে আল্লাহু আকবার শব্দে আকাশ বাতাস ভারী করে তুলছে।
কফিনের পাশে বসে মায়ের কলিজার বত্রিশটা নাড়িছেঁড়া ধন, বুকের মানিক একমাত্র ছেলে আবুজার গিফারীর মুখে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন জনম দুঃখিনী মা। আদর মাখা সোহাগ ভরা জননীর হাতের ছোঁয়া দেখে উপস্থিত জনতা আল্লাহু আকবার ধ্বনি দিয়ে ডুকরে কাঁদতে লাগলো। এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হলো। তবে দ্বীন কায়েমেরে সাথীরা পেলো শক্ত হয়ে দাঁড়াবার মতো শহীদের মায়ের কণ্ঠের আওয়াজ। মা জননী বলছেন, ও আল্লাহ তোমার নবীর সাহাবীর নামের সাথে নাম মিলিয়ে বড় শখের নাম রেখেছিলাম আমি আমার মানিকের নাম আবুজার গিফারী। বাজান ! তুমি শহীদ হয়ে গেছো বাজান! তুমি শহীদ হয়ে গেছো। আল্লাহ আমার একমাত্র বুকের মানিক তুমি নিয়ে নিলে ও আল্লাহ! আমার আবুজার গিফারীর তুমি শহীদি মরণ কবুল করো। মায়ের সার্টিফিকেট আর উপস্থিত জনতার পরিষ্কার বক্তব্য আবুজার গিফারী শহীদ। আল্লাহর আরশ পানে তাকিয়ে মা জননীর বুকফাটা আর্তনাদ, ও আল্লাহ আমি শহীদের মা। তুমি আমার বাজানের শাহাদাত কবুল করো। আমাকে কবুল করো শহীদের মা হিসেবে। জান্নাতের সিঁড়িতে আমার বড় আদরের শহীদ আবুজার গিফারীর সঙ্গে সাক্ষাৎ দিয়ো। তাই যেনো আকাশ বাতাসে সুরের মূর্ছনা শোনা যাচ্ছেÑ
দ্বীনের কথা বলতে গিয়ে / খোদার পথে চলতে গিয়ে
খোদার পথে চলতে গিয়ে / ফিরে এলো না
আকাশ পানে চেয়ে কাঁদে / জনম দুঃখী মা,
আরশ পানে চেয়ে কাঁদে / আবু জারের মা।
শহীদ আবুজার গিফারী নিজের ঋণ পরিশোধ করে গেছেন। ঋণী করে গেছেন আমাদের। নিখোঁজ হওয়ার আগের দিন বৃহস্পতিবার। আমি মাহফিলে যাওয়ার জন্য বের হয়েছি। অমনি আবুজার গিফারীর ফোন একটু আপনার সাথে দেখা করা জরুরি। আমি বললাম, আমি তো মাহফিলে বের হয়ে গেছি ফিরে এসে দেখা করবো। নাছোড়বান্দা, আমাকে দুই মিনিট সময় দেন। আমি প্রাইভেট গাড়ি থামিয়ে দেখি কথার সাথে একদম মিল, পাঁচ মিনিটের মধ্যে এসে হাজির। সাতশত টাকা পকেট থেকে বের করে দিয়ে স্বভাবসুলভ মুচকি হেসে বললো, দেরি হয়ে গেলো টাকাটা দিতে। জিজ্ঞেস করলাম, কিসের টাকা? বললো ঐযে ফরম ফিলাপের সময় নিয়েছিলাম। আমি বললাম পাগল, এর জন্য এত ব্যস্ত। বললো না, আমি যে ঋণী হয়ে আছি। আমি বললাম ভালো থাকো, ফিরে আসি সাক্ষাতে বাকি কথা হবে। মুচকি হেসে আবার বললো আর একটা প্রশ্ন। জিজ্ঞেস করলাম, আবার কি প্রশ্ন? হেসে বলছে বিরক্ত হয়েন না। আমি স্বপ্নে দেখেছি সাদা পাঞ্জাবি পাজামা পরা আসলাম ভাইয়ের মতো একজন আমাকে বলছে, আবুজার গিফারী তুমি সর্বোচ্চ বাইয়াত (সদস্য) গ্রহণ করেছো তোমাকে ফুলেল শুভেচ্ছা। বলে আমার হাতে একটি লাল রঙের ফুল দিলো, আমি ফুলটি চিনতে পারিনি। আমি বললাম, আমি তো ভাই আপনাকে চিনলাম না; বললো তুমি আমাকে চিন না? আমি তোমাদের বড় ভাই আসলাম, আমি তোমাদের এতো কাছের আর তুমি আমাকে চিন না। হঠাৎ ঘুম ভেঙে শুনি ফজরের আজান হচ্ছে। আমি কি তাহলে স্বপ্নে শহীদ আসলাম ভাইকে দেখলাম?। বলেই মুচকি হাসি হেসে দিলো। আমি বললাম একটু সাবধানে থেকো তোমার সম্মান বৃদ্ধি পাবে। সকলের সাথে সুন্দর করে কথা বলো দায়িত্বের প্রতি যতœবান হয়ো। পরদিন শুক্রবার জুমার নামাজ শেষে আমি যার কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে দিয়েছিলাম (আমার কাছে তাৎক্ষণিক টাকা ছিলো না বলে) সেই মিলু ভাইকে টাকা দিয়ে বললাম, গিফারী টাকা দিয়েছে। টাকাটা দিয়ে দু’জন বিদায় নিয়ে এখনো আমি গাড়িতে উঠতে পারিনি মাত্র পাঁচ মিনিট সময়ের ব্যবধানে ফোন পেলাম আবুজার গিফারীকে তুলে নিয়ে গেছে। আমি তখনো বুঝতে পারিনি। ঋণ পরিশোধের জন্য কেন গতকাল এত ব্যস্ত হয়ে গিয়েছিলো। দুনিয়ায় কারো কাছে সামান্য ঋণী থাকতে চাননি তাই তো এতো তড়িঘড়ি। নিজের ঋণ ঠিকই পরিশোধ করে গেছেন কিন্তু ঋণী করে গেছেন আমাদের। তার রেখে যাওয়া কাজ আমরা সঠিকভাবে যেনো করতে পারি। যদিও তাকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর আমরা তার জন্য কিছুই করতে পারিনি। আল্লাহর কাছে শুধু এতো টুকুন ফরিয়াদ, হে আমাদের মহান মালিক! তুমি আবুজার গিফারীর শহীদি মরণ কবুল করো, তাকে জান্নাতের উচ্চ মাকাম দান করো। একমাত্র বুকের মানিক ছেলেহারা হত দরিদ্র পিতা-মাতাকে ধৈর্য ধারণ করার তাওফিক দান করো। আমিন।
লেখক : চেয়ারম্যান, ইসলামিক দাওয়াহ ফাউন্ডেশন

SHARE

Leave a Reply