শহীদ আব্দুল্লাহ আল মঞ্জু জান্নাতের নয়া বাসিন্দা

মো: ইসরাইল হোসেন
শহীদ আব্দুল্লাহ আল মনজু। আহ্! আজকে যদি আমার জন্য এই জায়গাটা হতো তাহলে নিজেকে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে সঁপে দিতে পারতাম। মানুষ মরে গেলে দুনিয়া ছেড়ে চলে যায় কিন্তু তার আদর্শ, আচার-আচরণ, কাথাবার্তা ও শিষ্টাচার সব কিছুই তার পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, পরিবার-পরিজন এবং আন্দোলনের সাথী-সঙ্গীদের মনে বারবার নাড়া দেয়।
শাহাদাতের পর আওয়ামী হায়েনারা শহীদের রক্ত নিয়ে মনের খোরাক মিটিয়ে আনন্দ উল্লাস করেছে। কিন্তু, শহীদ আব্দুল্লাহ আল মনজুকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময় সে বলছিল, “আমার মুখটি উঁচু করে ধর, আমি সব কিছু দেখতে দেখতে যাব।” শহীদের এই আকুতি এখনও আমাদের কানে প্রতিনিয়ত প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। শহীদের পিতামাতার একমাত্র আদরের সন্তান হারিয়ে পরিবার যেন খাখা করছে। সেই চিরচেনা স্বর আর পড়ার টেবিলে পড়া মুখস্থ করে না। ভোর বিহানে মাকে সালাম এবং সঙ্গী-সাথীদের কুরআন-হাদিসের কথা আর কখনো সে বলবে না। সে এখন শাহাদাতের অমিয় পিয়ালা পান করে চিরনিদ্রায় আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দরবারে পাড়ি জমিয়েছে।
আমার প্রিয় আব্দুল্লাহ আল মনজুর শাহাদাতের কথা শোনামাত্র চোখের পানি আর ধরে রাখতে পারিনি। তখন আমি ছিলাম কুষ্টিয়া থেকে ৭৫ কিলোমিটার দূরে দৌলতপুর থানার প্রাগপুর গ্রামে একটি টিএস প্রোগ্রামে। আব্দুল্লাহ আল মনজুরের শাহাদাতের খবর শুনে মোটরসাইকেল যোগে দ্রুতবেগে কুষ্টিয়ায় পেঁৗঁছলাম।  অতঃপর তাঁর জানাজার প্রস্তুতি গ্রহণ এবং শহীদের সঙ্গী-সাথীদের শোকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে আমি নিজেকেও স্থির রাখতে পারছিলাম না। শাহাদাতের অমীয় পেয়ালা পানকারী শহীদ আব্দুল্লাহ আল মনজু ভাইয়ের দেহটা আমি দেখলাম- তাঁর পেছন দিক থেকে ফালা মেরে সামনে বুকের ডানপার্শ্ব দিয়ে বের করে দিয়েছে আওয়ামী হায়েনারা। তারা শুধু ফালা মেরে ক্ষান্ত হয়নি, উপর্যুপরি ঐ আঘাতের ওপর বেঁকির আঘাত করে রক্ত পিপাসা পূর্ণ করেছে। এখন আবার শহীদের পিতামাতার কান্না দেখে হাসি ঠাট্টা করছে তারা। হায় ! এ কোন্ হায়েনার দেশে বাস করছি আমরা?
আমার প্রিয় ভাই মনজু প্রতিদিন সকালে উঠে তাঁর মাকে ফজরের নামাজের জন্য ডেকে দিতেন এবং তাঁর দাদাকে সঙ্গে নিয়ে একসাথে মসজিদে যেতেন। বাড়িতে একটা মাত্র কুরআন শরীফ থাকার কারণে মা এবং তিনি ভাগাভাগি করে কুরআন পড়তেন। মা আগে পড়লে তিনি পরে পড়তেন এবং তিনি আগে পড়লে মা পরে পড়তেন। তিনি প্রতিবেশীদের একজন অনুসরণীয় ও অনুকরণীয় হিসাবে সবার কাছে প্রিয় ছিলেন। আমি শহীদের গর্বিত মা ও প্রতিবেশীর কাছ থেকে জানতে পারলাম তিনি কোনো সময় কাউকে গালমন্দ কিংবা কটু কথা বলতেন না।
তিনি বাস্তবেই ছিলেন একজন খোদাভীরু, সৎ, নিষ্ঠাবান ও সচ্চরিত্রের অধিকারী সামাজিক কর্মী। এমন আমল ও আখলাক মহান আল্লাহতায়ালা যুগে যুগে তাঁর জান্নাতি বান্দাদের মাঝেই কেবল দান করেন। তিনি সর্বদা মন্দের জবাব ভালো দিয়ে দেয়ার চেষ্টা করতেন। তাই বলে তিনি বাতিলের কাছে হকের বির্সজন দিতেন না। আর সে কারণেই তো আজ তিনি জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গেলেন এবং শিখিয়ে গেলেন হক প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে বাতিলের কাছে কখনও মাথা নত করা চলবে না। এ মাথা কেবল নত হতে পারে বিশ্বস্রষ্টা-বিশ্বপ্রতিপালক আল্লাহপাকের কাছে।
শহীদ মনজু এদেশের মানবতার জন্য এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। কিন্তু আজ আমাদের মাঝে তিনি নেই; আছে শুধু তাঁর রেখে যাওয়া অজস্র স্মৃতির ভাণ্ডার। আমাদের প্রিয় ভাইকে যারা শহীদ করেছে, দুনিয়াতে হয়তোবা তাদের বিচার হবে না; কিন্তু তাদেরকে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন অবশ্যই আখিরাতের আদালতে বিচারের সম্মুখীন করবেনই করবেন।
কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী থানার পান্টি গ্রামে মা-বাবার অপরিমেয় আদরে লালিত একমাত্র ছেলে শহীদ আব্দুল্লাহ আল মনজু। ইসলামের সরস ধানের শীষের মতো শ্যামল সেই তরুণের মুখে ছড়িয়ে ছিল প্রতিভার অত্যুজ্জ্বলদীপ্তি। আগামীর সম্ভাবনার প্রতিশ্র“তিশীল এ যুবক সবাইকে ডিঙিয়ে আমাদেরকে পিছনে ফেলে চলে গেলেন সামনে। আল্লাহপাক তাঁকে শাহাদাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করুন।

লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির, কুষ্টিয়া জেলা

SHARE

Leave a Reply