শহীদ নোমানী : স্বপ্নচারী অভিযাত্রিক -মো. রাশেদুল ইসলাম

তোমার নয়ন স্বপ্ন দেখে অভিযাত্রিক
বাঁধতে শেখে মননশীল যতো স্বাপ্নিক।

নজরকাড়া নয়ন যুগল অনেকেরই থাকে, কিন্তু তার থেকে যে দৃষ্টি ঝরে- তাতে মমতা এবং স্বপ্ন থাকে ক’জনার। মার্চ এলেই সেই মমতাময় নয়ন আমাকে নাড়া দেয়। মমতার আচ্ছাদনে বাঁধতে শেখায় আমাকে। হাঁটতে শেখায় পথ তৈরি করে করে। আমি জানি, এ অনুভূতি আমি একাই উপলব্ধি করি না। শহীদ নোমানী ভাইকে কাছ থেকে যারা দেখেছেন, যারাই তাঁর সাথে মিশেছেনÑ তারা আজ অনুপ্রাণিত সেই নয়নের মমতা মেখে।

সৃষ্টিশীলতা ও নান্দনিকতার সন্ধানে বিভোর শিল্পী
মতিহারে গাইবো গান তোমার সুরে
সোনালি ভোর আনবো আবার নতুন করে।

উদাস কবিদের ন্যায় বসে বসে ভাবতেন মাঝে মাঝেই। আমি জিজ্ঞেস করতামÑ কী ভাবছেন? বলতেনÑ কই কিছু নাতো! পরক্ষণেই বলে উঠতেনÑ আমাদের অনেক কবি থাকলে কেমন হতো! কবিরা স্বপ্ন দেখতে শেখায়। আমি স্বপ্ন দেখতে চাই। যেখানে স্বপ্নের মেলা বসবে, নাম হবে স্বপ্নলোক। স্বপ্নলোকে যারা প্রবেশ করবে, তারা সবাই স্বপ্নচারী অভিযাত্রিক হতে চাইবে। যেমন আমি চাইÑ আমাদের কাফেলার সারিতে সারিতে থাকবে মাধুর্যতা মন্ডিত কণ্ঠধারীরা। তাদের কেউ গান গাইবে প্রাণ জাগানিয়া, কারো তিলাওয়াতে অশ্রু ঝরবে দর্শক-শ্রোতার।
তাঁর চোখ তখন ভারী। এই বিশাল ভাবনা বোঝার মতো মনন তখনো তৈরি হয়নি আমার। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতাম তাঁর দিকে। হেসে বলতেনÑ কিরে বোকা, কী হয়েছে তোমার, টাইপ করছো না কেন?
সম্বিত ফিরে পেয়ে আমার আঙুল তখন খট্ খট্ শব্দ তুলে এগিয়ে যেতো নোমানী ভাইয়ের নতুন প্রবন্ধের পান্ডুলিপির অক্ষর ধরে ধরে। আর ভাবতাম, এতো ভাবে কেন?
তিনি লিখতে ভালো। ছড়া-কবিতা, প্রবন্ধ-নিবন্ধ লেখার ক্ষেত্রে মুসলিম উম্মাহর সামনে এগিয়ে যাবার উদ্দীপনা সংযোজিত হতো। লেখার ক্ষেত্রে তাঁর একটা টার্গেট ছিলো। তিনি বলতেনÑ আমি প্রতি মাসে কমপক্ষে ১টি করে প্রবন্ধ এবং ২টি করে কবিতা লিখবো। আজ তিনি বেঁচে থাকলে সেগুলো হয়তো অনেকগুলো বই আকারে বের করা সম্ভব হতো।
একবারের একটা ঘটনা, তাঁর এলাকার পিছিয়ে পড়া মানুষের কল্যাণে তিনি ডায়েরিতে পরিকল্পনা লিখেছিলেন। ঘটনাক্রমে সেটা হারিয়ে যায়, সেজন্য খুব আক্ষেপ তাঁর। বলতেনÑ আমার তো স্মৃতিশক্তি ভালো না, আবার লিখতে পারবো বলে মনে হয় না। আর লিখে যেতে পারেননি পরে (শাহাদাতের কয়েক মাস আগের ঘটনা এটা)। তবে বলে গেছেন তাঁর এলাকার মানুষদের কাছে।
তিনি যে মাদরাসায় পড়াশোনা করেছেন, সেই মাদরাসাকে অনেক বড় একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত করার স্বপ্ন ছিলো। গ্রামের যেসব ছেলেমেয়েরা অর্থকষ্টে পড়াশোনা করতে পারছে না, সেই প্রতিষ্ঠানে বিনামূল্যে পাঠের সুযোগ থাকবে তাদের জন্য।
শহর থেকে সেই নির্জন গ্রামে যাওয়ার রাস্তাটা কাঁচা-সরু। সেটা মেরামতে তাঁর স্বপ্নের কথা বলে গিয়েছিলেন কয়েকজনের কাছে। পরে সবাই সেসব বলে কেঁদেছেন।

তিনি গান শুনতে ভালোবাসতেন, এমনকি গাইতেও। শিল্পী আব্দুস সালামের লেখা একটি গান তিনি মাঝে মাঝেই গাইতেনÑ
গান গাই বলে তাই শিল্পী বলো না মোরে
শিল্পীতো নয় মোর পরিচয়
কুরআনের কর্মীতো বড় পরিচয় আমার।

কর্ম এখন প্রেরণার
ভালোবেসে আপন করার প্রমাণ তুমি
উদার হবার আশে তোমার স্বপ্ন চুমি।
সাহাবায়ে আজমাইনের জীবনাচরণকে ধারণ করাটা যেন নোমানী ভাইয়ের বড় একটা লক্ষ্য ছিলো। অতি সাধারণ জীবন-যাপন ছিলো দৈনন্দিন। কম পোশাকে চলতেন, কম খেতেন। অপরকে খাওয়াতে খুব ভালোবাসতেন। এমন অনেক নজির রয়েছে যে, দুপুরের খাবার তিনি কোন একজন বন্ধু/মেহমানকে সাথে করে খেয়েছেন। তাঁর একান্ত বন্ধু শাহীন পারভেজ ভাইয়ের কাছ থেকে আমরা এই বিষয়ে মাঝে মাঝেই শুনতাম। আরো অনেকেই এর বাস্তব সাক্ষী।
তিনি কোনো আলোচনা চক্রে বা প্রশিক্ষণ প্রোগ্রামে গেলে লক্ষণীয় ছিলো যে, কেউ পড়ে না এলে তাকে ধরে ধরে পড়াতেন। বিশেষ করে কুরআন তিলাওয়াতে কারো সমস্যা থাকলে খুব যতœ করে পড়াতেন তাকে। তখন আমি জোহা হলের জনশক্তি ছিলাম না, তারপরও আমাকে জোর করে চক্রে বসাতেন। বলতেনÑ পড়াশোনাকে কোন গন্ডিতে আটকিয়ো না, যেখানে সুযোগ পাবে বসে যাবে।
কুরআন তিলাওয়াত শোনার ব্যাপারে খুব আগ্রহ ছিলো নোমানী ভাইয়ের। একা পেলেই আমাকে কিছু নির্দিষ্ট সূরা ছিল- সেগুলো শোনাতে বলতেন। তিনি যেটা আমার কাছে শুনতেন সেটা আসলে শোনার জন্য নয়, তিলাওয়াতের শুদ্ধতা যাচাই করার জন্য। আশ্চর্যের বিষয় হলোÑ দু’একদিন পর সেই অংশ আমাকেই উল্টো মুখস্থ শুনিয়ে দিতেন।
নোমানী ভাইয়ের কুরআন তিলাওয়াত খুব সুন্দর ছিলো। তিনি মাঝে মাঝেই অফিসের পাশের মসজিদে মাগরিব-এশা-ফজর নামাজে ইমামতি করতেন। স্যারদের অনুরোধে রমজানে মাঝে মাঝে তারাবিহর ইমামতিও করেছেন। মসজিদের সাধারণ মুসল্লিদের কাছেও প্রিয়ভাজন ছিলেন।
তিনি নিয়মিত আয়াত মুখস্থ করতেন। একবার সূরা মুজ্জাম্মিল মুখস্থ করে এসে আমাকে শোনাতে গেলে বার বার সূরা মুরসালাতে চলে যাচ্ছিলেন। সেদিন রাত ২টা পর্যন্ত পড়া শেষ করে আমাকে ডেকে দু’টি সূরাই শুনিয়ে তারপর ঘুমিয়েছিলেন।

মন জয় করাই যার লক্ষ্য ছিলো
তোমার হৃদয় শীতল মোম গড়ে গেছে শুধু
শক্ত রশিতে বেঁধেছো অনেক হৃদয় যাদের ধূধূ।
বিরোধী মতের ভাইদের সাথে নিয়মিতই যোগাযোগ রাখতেন তিনি। উদ্দেশ্য ছিলো দ্বীনের দাওয়াত দেয়া, না হলে কমপক্ষে সহযোগিতা-সহমর্মিতা। কোন খারাপ পরিস্থিতি যাতে করে সংঘটিত না হয় সেজন্য তিনি খুব সতর্কতার সাথে সবার সাথে সম্পর্ক রেখে চলতেন।
একবার ছাত্রলীগের এক ছাত্রের হলের রুমে দাওয়াত খেতে যান নোমানী ভাই। সে মার্কেটিং এমবিএ’র ছাত্র ছিলো। তখন নোমানী ভাই মার্কেটিংয়ে এমবিএ পড়ছিলেন। এই ঘটনা নিয়ে ওই ছাত্রলীগ নেতার তাদের নিজেদের মধ্যে মতবিরোধও হয়েছিলো। নোমানী ভাইয়ের মধ্যস্থতায় পরে মীমাংসা করেন বিভাগের এক শিক্ষক। তাঁর মৃত্যুর পর বিরোধী অনেককেই এসব বলেছেন অবলীলায়।
ক্যাম্পাসে চলাফেরার মাঝে একটা বড় সময় ধরে বিশ্ববিদ্যালয় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাথে কথা বলতেন নোমানী ভাই। এসময় ব্যক্তিগত খোঁজ বেশি নিতে দেখতাম। সবচেয়ে কাছে টেনে নিতেন রিকশাওয়ালা-বাদামওয়ালাদের, এমনকি তাদের বাড়ি পর্যন্ত গিয়েও খোঁজ নিতেন। শাহাদাতের পর বিশ্ববিদ্যালয় পার্শ্ববর্তী এক মাইকওয়ালার বাসায় গিয়েছিলাম মাইক ভাড়া করতে। মাইকওয়ালা কাঁদতে কাঁদতে  বললেন -আমার বাসায় এসে রুটি খেয়ে যাবেন বলেছিলেন নোমানী ভাই। আমার মেয়েকে স্কুলে ভর্তি করার খরচ দিয়েছিলেন তিনি।

ভালোবাসার নমুনা দেখালেন
জীবন দিয়ে
আকাশ সমান ভালোবাসার প্রমাণ দিলে
ভাসাই কপোল নীরব মনে নয়ন জলে।
১৩ মার্চ ইতিহাসে ভালোবাসার বিরল এক উজ্জ্বল দিন। আন্দোলনের কর্মী ভাইদেরকে ভালোবেসে নিজের জীবন দিয়েছেন নোমানী ভাই।
আমাদের ভাইয়েরা যখন হলে হলে ছাত্রলীগ ও প্রশাসন কর্তৃক বন্দি। তখন মাথা ঠান্ডা রেখে একে একে সকল হলে ভাইদের ফোন করে করে খোঁজ নিয়ে পরিস্থিতি বুঝেছেন তিনি। প্রতিটি হলে বন্দি ভাইদের উদ্ধারে এমন ব্যবস্থা নিয়েছেন, যেন কোন সংঘর্ষের ঘটনা না ঘটে।
নির্মম বিষয় হলোÑ যেখানে তিনি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অপারগ হলেন, সেখানে সর্বোচ্চ ভালোবাসার নমুনাটিই দেখালেন। শের-ই-বাংলা হলে ভেতর থেকে তালাবদ্ধ অবস্থায় আমাদের ভাইয়েরা ছাত্রলীগের অস্ত্রের মুখে জিম্মি ছিলো। নোমানী ভাই একটি গ্রুপকে দুইভাগ করে এক গ্রুপকে তালা ভাঙার নির্দেশ দিয়ে অপর গ্রুপকে সাথে করে পেছনের গেট দিয়ে ঢুকে ছাত্রলীগের ছেলেদের বোঝাতে চেষ্টা করেন। সর্বশেষ সব প্রচেষ্টা যখন ব্যর্থ, ছাত্রলীগের ছেলেদের সাথে কথা বলবেন বলে আমাদের ভাইদের সবাইকে একে একে বের করে দিতে থাকেন তিনি। মোটামুটি সবাইকে বের করে দিয়ে যখন তিনি স্বস্তিবোধ করছিলেন, ঠিক তখনি বাহির থেকে পুলিশসহ ছাত্রলীগের অন্য গ্রুপ এসে অতর্কিত হামলা চালিয়ে নির্মমভাবে কুপিয়ে মারাত্মক যখম করে, যাতে প্রথমে তাঁর ডান হাতের বৃদ্ধাঙুলি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। নরপিশাচরা এতেই ক্ষান্ত হয় না, রক্তের পিপাসা হায়েনাদের উন্মাতাল করে তোলে। উপর্যুপরি ধারালো চাপাতি চালাতে থাকে প্রিয় ভাই নোমানীর মাথা লক্ষ্য করে, দ্বিখন্ডিত হয়ে যায় মাথা। আল্লাহু বলে লুটিয়ে পড়েন জমিনে।
নিথর দেহ যখন মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে, তখন পিপাসা মিটিয়ে সত্যের কাছে পরাজিত শক্তি ফিরতে থাকে রক্তমাখা হাতে। হলের কর্মচারী আর জাতির বিবেক সাংবাদিকদের সহায়তায় হল অভ্যন্তরের দেয়ালের পাশ থেকে বাইরে আনা হয় কুরআনের মহান এই সৈনিককে।
এদিকে মৃতপ্রায় দেহ নিয়ে আহতের সাথীরা যখন হতবিহ্বল, তখন অ্যাম্বুল্যান্সের ব্যবস্থা করতে গিয়ে যে নাটকের অবতারণা ঘটায়, তা জাতিকে আরো একবার ভাবতে অবকাশ দেয়। বিশ^বিদ্যালয় চিকিৎসাকেন্দ্রের দু’টি অ্যাম্বুল্যান্স ব্যস্ত ক্যাডার বাহিনী আনা নেয়ায়। শেষে বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষক মহোদয়ের কয়েকজন পুলিশের অ্যাম্বুল্যোন্সে করে ক্ষত-বিক্ষত নোমানীকে নিয়ে রওনা হন হাসপাতাল অভিমুখে। হাসপাতাল পর্যন্ত আর যেতে হয়নি জীবন্ত নোমানীর।
আমাদের যেসব ভাই সেদিন সেখান থেকে বের হতে পেরে মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিচ্ছিলো, তারা হয়তো তখনো জানতেই পারেনি যে, তাদেরকে প্রাণের চেয়েও ভালোবেসে যে ভাইটি আগলে রাখতেন সবসময়Ñ আজো নিজের কথা না ভেবে সবাইকে বের করে দিলেন ছাত্রলীগের পিস্তল ও তরবারির নিচ থেকে। তিনি ইতোমধ্যেই চলে গেছেন তাঁকে তাঁর চেয়েও যিনি বেশি ভালোবাসেন সেই মহান প্রভুর সান্নিধ্যে।
আমরা সবাই তোমার ভালোবাসার কাছে পরাজিত হে প্রিয় নোমানী!

তাঁর স্মৃতি আমাকে কাঁদায় না আজ
মতিহার কাঁদে আজো
নোমানীর জন্য কাঁদে।

আল্লাহ বলেনÑ হে নবী, আমি তোমাকে সাক্ষী, সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী রূপে প্রেরণ করেছি। এবং আল্লাহর আদেশে তাঁর দিকে আহবায়ক ও উজ্জ্বল প্রদীপরূপে। (আল কুরআন ৭৩ : ৪৫-৪৬)
নোমানী আজ আমার কাছে সেই আলোকবর্তিকাÑ যাকে আমি আমার জীবনের ধূসর গলিতে চলার ক্ষেত্রে শুধুমাত্র ঔজ্জ্বল্য হিসেবেই পাই না, বরং মাইলফলক হিসেবে দেখি।
এক একটি মাইলফলক অতিক্রম করলে নোমানী তাঁর কল্পিত স্বপ্নলোকের আরো একটি মাইলফলক নির্দেশ করে। তখন প্রিয় নোমানীর না থাকা আমাকে যতটা না কষ্ট দেয়, কাঁদায়Ñ তার চেয়েও বেশি স্বপ্ন দেখতে শেখায়।
আমিও আজ স্বপ্নচারী হতে পথ চলি।

SHARE