শহীদ মীর কাসেম আলী (রহ) যে জীবন প্রেরণার -মুহাম্মদ আবদুল জব্বার

মীর কাসেম আলী একটি জীবন, একটি ইতিহাস। তিনি আমাদের প্রিয় সংগঠন, পথহারা লাখো তরুণ-মেধাবীর ঠিকানা বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্রিয় প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর হাত ধরে এই প্রিয় কাফেলা ১৯৭৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি কয়েকজন টগবগে তরুণ-যুবক নিয়ে যাত্রা শুরু করে। যারা জাহেলিয়াতের পাহাড়সম বাধা মোকাবেলা করে বাংলাদেশকে আগামী দিনে দক্ষ, দেশপ্রেমিক ও খোদাভীরু নাগরিক উপহার দেয়ার লক্ষ্যে অবিরাম ছুটে চলছেন। সেই সৌভাগ্যবানদের অন্যতম তিনি। সৎ, দক্ষ ও দেশপ্রেমিক একদল নিরলস মানুষ তৈরিতে যার জুড়ি নেই। তিনি ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নির্বাহী পরিষদের সদস্য হলেও মূলত যুবসমাজের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাই ছিল যেন তাঁর অন্যতম পেশা। তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়েও তিনি একজন নিরলস সমাজকর্মী হিসেবেই পরিচিত সর্বমহলে। তিনি বাংলাদেশের প্রাইভেট সেক্টরের এক প্রভূত উন্নতি সাধন করেন। যা দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে আরো কয়েক ধাপ এগিয়ে দিয়েছেন। মীর কাসেম আলী মিন্টু ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড, ইবনে সিনা হাসপাতাল, ইবনে সিনা ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যালস, ইবনে সিনা ইমেজিং সেন্টার, ইবনে সিনা ডেন্টাল, ইবনে সিনা মেডিক্যাল কলেজ, ইসলামী ব্যাংক হাসপাতাল, কেয়ারী ডেপেলপার্স, কেয়ারী ট্যুরিজম, দিগন্ত মিডিয়া করপোরেশন, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, সাইমুম শিল্পীগোষ্ঠীসহ অসংখ্য ব্যবসা, সেবামূলক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা।
তাঁর প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে হাজার হাজার তরুণের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সর্বপ্রথম সুদমুক্ত ইসলামী ব্যাংকিং চালু হয়। ইবনে সিনা হাসপাতাল ও ফার্মাসিউটিক্যালস তৈরির মাধ্যমে চিকিৎসাজগতে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের তিনি উদ্যোক্তা ও সঞ্চালক হলেও এর সিংহভাগ অর্থের জোগানদাতা সাধারণ শেয়ারহোল্ডার। যদিও ওনাকে অনেকে ধনকুবের মনে করেন। এমন প্রচারণা নিছক অপপ্রচার ছাড়া আর কিছু নয়।
প্রাইভেট সেক্টরে ইসলামাইজেশান এর মাধ্যমে ও ইসলামিক শ্যাডো গভর্নমেন্ট করার সুযোগ রয়েছে। পুঁজিবাদের তীব্র প্রতিযোগিতায় কিছু সংখ্যক ধনকুবের দেশকে নিয়ন্ত্রণ করছে, যাদের হাতে সমগ্র জাতি আজ জিম্মি। এহেন পরিস্থিতিতে সবার অংশগ্রহণমূলক অর্থনীতিই মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি দিতে সক্ষম। মূলত সে ধারণা থেকে দেশের জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করতে তিনি ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখে গেছেন।
মীর কাসেম আলী মিন্টু আমাদের সবার কাছে মিন্টু ভাই নামেই সমধিক পরিচিত। তিনি আমাদের প্রিয় শহীদি কাফেলার অগ্রজ। যার জীবনধারা হাজারো তরুণকে দ্বীনের পথে অংশগ্রহণ করতেও কর্মমুখর জীবন গঠন করতে প্রতিনিয়ত প্রেরণা জুগিয়েছে। কারণ তিনি ছিলেন এর জ্বলন্ত প্রকৃষ্ট নমুনা। সত্য ও সুন্দরের প্রতি ভালোবাসায় তাঁর হৃদয় ছিল ভরপুর। যাকে ইসলামবিদ্বেষীরা ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়ে হত্যা করলেও তাঁর পরিচয় চির ভাস্বর হয়ে থাকবে আমাদের হৃদয়ে, আগামীর তরে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম অবধি।

কী তাঁর অপরাধ?

মীর কাসেম আলী মিন্টুর অপরাধ কী? যার বিরুদ্ধে ২০১০ পূর্ব পর্যন্ত দেশের কোন থানায় একটি জিডি পর্যন্তও ছিল না। ইসলামী অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার অন্যতম অগ্রজ হওয়াই কি, ১৯৭১ এর কুখ্যাত রাজাকার, আলবদর হিসেবে তাঁর নামে অভিযোগ! যিনি ১৯৭১ সালে মাত্র ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্র ছিলেন। তিনি কি করে সে বয়সে অগণিত ধর্ষণ, মানুষ হত্যা ও অগ্নিসংযোগের মত মানবতাবিধ্বংসী ঘটনা ঘটাতে পারেন? আর এমন কিবা হলো যে ওনার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের হঠাৎ এ ধরনের গুরুতর অভিযোগ?
মূলত বাংলাদেশে ইসলামী শক্তি প্রতিনিয়ত অন্যতম শক্তিধর শক্তিরূপে ধীরে ধীরে অগ্রসরমান হওয়ার কারণে ইসলামবিদ্বেষী শক্তিরা ইসলামী পক্ষের সকল শক্তিকে নিঃশেষ করার জন্য ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছে। এর অংশ হিসেবেই বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামী থেকে শুরু করে সকল শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে হত্যার ষড়যন্ত্র করা হয়েছে। এরই মধ্যে তাঁরা জামায়াতের ৫ জন শীর্ষ নেতাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করেছে। বেশ কয়েক জনকে কারাগারে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। জামায়াতসহ দেশের ইসলামী শক্তিকে নির্মূল করার যড়যন্ত্রে আওয়ামী লীগ অনেক আগেই মেতে উঠেছে যা বুঝতে সচেতন দেশবাসীর আর বাকি নেই।
২০১৬ সালে মীর কাসেম আলীর ফাঁসির আদেশ হয়। যারা ওনার বিপক্ষে যারা সাক্ষী দেন এর মধ্যে একজন সাক্ষী ছিলেন যার জন্ম ১৯৭১ এর অন্তত ৩ বছর পর। এমন সাক্ষীর মাধ্যমে একজন নিরপরাধ মানুষকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে হত্যা করাকে জঘন্য নির্মম মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটন ছাড়া কী বলা যেতে পারে?

ইতিহাসের নির্মম নিষ্ঠুরতাকে
হার মানায় যে ইতিহাস!

মীর কাসেম আলী মিন্টুর ফাঁসির আগে তাঁর আইনজীবী সন্তান ব্যারিস্টার মীর আহমেদ বিন কাসেম আরমানকে কে বা কারা গুম করেছিল! তিনি পিতার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের বিবাদি পক্ষের ডিফেন্স আইনজীবী হিসেবে আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিলেন। ঠিক এমন সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে তাকে বারিধারা বাসায় পরিবার পরিজনের সামনে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয়।
নির্ঘাত একজন নিরপরাধ মানুষকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলানোর কুটিল যড়যন্ত্র যখন পাকাপোক্ত ঠিক সেই মৃত্যু পথযাত্রীর জাগতিক একমাত্র ভরসা তাঁর প্রিয় সন্তানকেও দুনিয়ার তরে নাই করে দেয়া হয়, তার চেয়ে নির্মমতার ইতিহাস আর কী হতে পারে?
যদিওবা সরকারের তরফ থেকে বলা হয়েছে, সরকারের পক্ষ হতে আইন শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী তাকে গ্রেফতার বা গুমের মত কোন ঘটনা সংঘটিত করেনি। যদি তাই হয়েও থাকে তাহলে সরকার তাঁর গুম ঘটনার দীর্ঘ দেড় বছর পরও কেন তাঁর অনুসন্ধান দিতে পারেনি? অথচ দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে যড়যন্ত্রকারীকে যদি স্বল্প সময়ে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়, তাহলে কেন মীর কাসেমের পরিবারের ভরসা মীর আহমেদ বিন কাশেম আরমানকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি? একটি পরিবারের কর্তাব্যক্তি রাজনৈতিক বিবেচনায় হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার পর আবার তাঁর পরিবারের ভরসা একমাত্র ব্যক্তিকেও যেভাবে অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে, তা রাজনীতির নামে অপরাজনীতি ছাড়া কিছু নয়। শহীদ মীর কাসেম আলীর শেষ ইচ্ছা ছিল- মীর আহমেদ বিন কাসেম আরমানকে পরিবারের সব বিষয়ে নির্দেশনা দিবেন এবং তাঁর জানাজার নামাজের ইমামতি করতে বলবেন। কিন্তু বিবেকহীন শাসকবর্গের কাছে শেষ ইচ্ছা পূরণ করার জন্য ইচ্ছা পোষণ করাও যেন জঘন্য অপরাধ! মীর আহমেদ বিন কাসেম আরমানের অপহরণের পর স্বামীহারা মায়ের রোনাজারিতে আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে তাঁর সন্তানকে ফিরিয়ে দেয়ার আবেদন করেছেন। আরমানের জীবন সঙ্গিনী এখনো প্রতীক্ষার প্রহর গুনছেন কখন তাদের প্রিয় মানুষটি এসে তাদের সামনে হাজির হবেন। তাঁর অবুঝ সন্তানরা প্রতিদিন প্রিয় পিতার প্রতীক্ষায় ‘বাবা বাবা’ বলে দিনাতিপাত করছে। তাদের পিতার সন্ধান কে দেবে?

মিডিয়ার গাঁজাখুরি গল্প ও মীর কাসেম আলী

বাংলাদেশের মিডিয়া কতটুকু পরাধীন তা জামায়াত নেতাদের নিয়ে বিচার চলাকালীন সময়ে যে মিথ্যাচার করেছে তা থেকে প্রমাণিত। সত্যকে মিথ্যার প্রলেপে ঢাকার অপচেষ্টা ছিল লক্ষণীয়। যে মিডিয়া খুনি, ধর্ষক ও দানবকে বানিয়েছে দেশপ্রেমিক ও মহান নেতা আর দুর্নীতিমুক্ত, দেশপ্রেমিক ও ইসলামপ্রিয় জনতার প্রিয় নেতাদের বানিয়েছে রাজাকার ও মানবতাবিরোধী অপরাধী। দেশের চিহ্নিত সরকারে পদলেহী হলুদ মিডিয়াগুলো ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় মীর কাসেম আলীকে রাজাকার আর মানবতাবিরোধী অপরাধী বানিয়ে ছেড়েছে। যাকে আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে হত্যার জন্য ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়েছে। ইতিহাস কখনো ইতিহাস ভুল করে না। সময়ের পরিক্রমায় প্রকৃত ইতিহাস ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নেবে। মীর কাসেম আলী শুধুমাত্র বাংলাদেশ জামায়াতের ইসলামীর কেন্দ্রীয় নেতা (নির্বাহী পরিষদ সদস্য) ছিলেন তাই নয়, বরং তিনি ছিলেন বাংলাদেশ ইসলামী অর্থনীতির অন্যতম পুরোধা। যিনি দেশের মানুষকে সুদভিত্তিক ব্যাংকিংয়ের পরিবর্তে ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা প্রথম ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে চালু করেছেন। যিনি অসংখ্য ব্যবসা বাণিজ্যের শাখা-প্রশাখা বিস্তৃত করার পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ-মাদরাসা স্থাপন করেছেন। হেফজখানা, চিকিৎসালয়, এতিমখানা প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করেছেন। যিনি তরুণ ও যুব প্রজন্মকে বেকারত্ব গোছাতে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছেন এবং আত্মপ্রত্যয়ী হতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। যা কারো কাছে অজানা নয়। এ সরকার শুধু রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে তাকে হত্যা করে ক্ষান্ত হয়নি বরং তাঁর প্রতিষ্ঠিত সকল প্রতিষ্ঠানকে দেউলিয়া করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। ইতোমধ্যে তাঁর শাহাদাতের পূর্বে তাঁর পরিচালিত দিগন্ত টিভি বন্ধ করে দেয়া হয়। ইসলামী ব্যাংককে নিঃশেষ করার জন্য ব্যবস্থাপনা পর্ষদ নতুন করে নিয়োগ দেয়া হয়। এভাবে সবকিছু লুটতরাজ করে তাঁর অবদানকে নিঃশেষ করতে সরকার উঠে পড়ে লেগেছে। তিনি উল্লিখিত সকল প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা হলেও মিডিয়াগুলো তাকে সকল প্রতিষ্ঠানের মালিক ও ধনবুবের বানানোর পাশাপাশি যুদ্ধাপরাধ বিচারকে ঠেকানোর জন্য বিদেশী লবি নিয়োগে ডোনেট করেছেন বলে অভিযোগ উঠিয়েছে। অথচ মীর কাসেম আলীর শাহাদাতের পর তাঁর পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সন্তানকে হারিয়ে এখন অনেকটা কষ্টে দিনাতিপাত করছেন। মিডিয়ার গাঁজাখুরি গল্প যতই প্রচার প্রসার করুক না কেন সত্য কিন্তু সম্মুখে এগিয়ে চলে আপন গতিতে।
মীর কাসেম আলী বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। স্বাভাবিকভাবে আমিও এই কাফেলার একজন নগণ্য সদস্য হিসেবে ওনার সাথে টুকটাক যোগাযোগ ছিলো। ওনাকে সর্বদা কর্মতৎপর দেখতাম। ধৈর্য, ধীরস্থিরতা, সৃজনশীলতা, পরোপকারিতা ছিল ওনার অন্যতম গুণ। তিনি কত মানুষের উপকার করেছেন তার সংখ্যা অগণিত। আমি কারাগারে থাকাকালীন এক কারারক্ষীর কাছে তাঁর কিছু বিষয় শুনলাম। তিনি বলেছিলেন আফসোস! মীর কাসেম আলীর মতো ভালো লোককে আওয়ামী লীগ সরকার মেরে ফেলল। তিনি বললেন, উনি যখন জেলে ছিলেন তখন সেখানে কিছুদিন ডিউটিরত ছিলাম। ডিউটিরত অবস্থায় আমার স্ত্রী অসুস্থ ছিলেন। গর্ভবতী। ডাক্তার আমার স্ত্রীকে হাসপাতালে ভর্তি হতে পরামর্শ দিলেন এবং সিজার করাতে হবে বলেছিলেন। আমি সামান্য বেতনে চাকরি করতাম, তাই আমার দ্বারা স্ত্রীর চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করা সম্ভব ছিল না। তাই আমি কাসেম সাহেবকে আমার এ ব্যাপারে সাহায্য করার জন্য অনুরোধ করেছিলাম। তিনি আমাকে ১টি চিঠি লিখে দিয়ে একটি হাসপাতালে যাওয়ার জন্য বললেন। আমি ওনার দেয়া চিঠি ওনার ঠিকানা অনুযায়ী ঐ হাসপাতালে কর্তৃপক্ষকে দিলাম। তাঁরা আমার স্ত্রীকে হাসপাতালে ভর্তি করালেন। সম্পূর্ণ বিনা পয়সায় তাঁরা আমার স্ত্রীর চিকিৎসা করিয়ে দেন।
কারাগারে এসে মীর কাসেম আলী মিন্টু ভাইয়ের অনেক অনেক ঘটনা শুনেছি। একজন কারারক্ষী আমাদের সাথে পরিচিত হলেন। ওনার বাড়ি ময়মনসিংহ। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মাঝে মধ্যে আমাদের মধ্যে নানা কথা নিয়ে জমে উঠত। কারারক্ষী (জমাদার) যদিও বা জামায়াত সংগঠনের সমর্থক নন, বরং নানা বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করতেন। তিনি একদিন আমাদের শহীদ নেতৃবৃন্দের ব্যাপারে বললেন। এর মধ্যে শহীদ মীর কাসেম আলীর ব্যাপারে বলতে গিয়ে বলেন, “শুনেছি মীর কাসেম আলী সাহেব অনেক অর্থের মালিক। আমি কখনো তাঁর মধ্যে এমন ভাব দেখিনি। তিনি কখনো প্রয়োজনের অতিরিক্ত খরচ করতেও ওনাকে দেখিনি।”
ওনার ব্যাপারে কারাগারে অনেকে অনেক স্মৃতিকথা বলেছেন। একবার কাশিমপুর ২ নং কারাগারের ২ নং মাঠে (ভেতরে) ফুটবল খেলা হয়েছিল, ছাত্রশিবির ও ছাত্রদলের মধ্যে। আর তিনি কথা দিয়েছিলেন ছাত্রশিবির হারলে ছাত্রদলের সবাইকে তিনি খাওয়াবেন। এর মধ্যে ছাত্রশিবির একটি ম্যাচে জিতল আর ছাত্রদল ২টি ম্যাচে জিতেছিল। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, ছাত্রশিবিরের হারে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি ছাত্রশিবিরের এই সামান্য হারকেও মেনে নিতে পারছিলেন না। ছাত্রশিবিরের প্রতি তাঁর কত আবেগ আর কত ভালোবাসা! অবশ্য পরে তিনি সবাইকে মেহমানদারি করিয়েছিলেন।
তিনি কাশিমপুর কারাগারে থাকাকালীন যারা দেখেছেন তাদের ভাষ্য মতে, তিনি প্রতি ওয়াক্তে নামাজে ভিন্ন ভিন্ন ড্রেস পরে নামাজ পড়তে আসতেন। তিনি বলতেন, “আমরা যখন কোনে সম্মানিত বা ক্ষমতাধর ব্যক্তির কাছে যাই তখন সবচেয়ে ভালো পোশাক পরে যাই। আর আমি যখন নামাজে হাজির হই তখনতো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ক্ষমতাধর ও সম্মানিত আল্লাহর সামনে হাজির হই। কেন তাহলে আমি আমার সবচেয়ে ভালো ভালো কাপড়গুলো পরে নামাজে হাজির হবো না?”
যারা ক্ষমতার অপব্যবহার করে মীর কাসেম আলীকে শহীদ করে দিল, তারা একবারও ভাবেনি তারা দেশের একজন ক্ষণজন্মা পুরুষকে হত্যা করছে। আর অপবাদকারীরা গাঁজাখুরি গল্প বানিয়ে ইতিহাসের পাতাকে কলঙ্কিত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। হয়ত এমন এক সময় আসবে যেদিন ক্ষমতাসীনদের বন্ধ চোখ খুলবে। যাদেরকে জাতির সামনে মহা অপরাধী হিসেবে শনাক্ত করা হচ্ছে তারাই জাতির শ্রেষ্ঠসন্তান হিসেবে বিবেচিত হবেন। যারা আল্লাহকে একমাত্র পরওয়ারদিগার হিসেবে মনে প্রাণে মেনে নিয়েছেন তাদের কাছে দুনিয়ার পাহাড়সম ষড়যন্ত্র খুবই তুচ্ছ ব্যাপার মাত্র। আল্লাহর আজাব থেকে রক্ষা ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের নিমিত্তে যে কোন পরিস্থিতি হাসি মুখে বরণ করে নিতে পারে। আমাদের অগ্রজ মীর কাসেম আলীও ছিলেন সেই অকুতোভয় লড়াকুদের অন্যতম। যিনি সরকারের মিথ্যা অভিযোগকে কোন তোয়াক্কা না করে নেহাত আল্লাহর দ্বীনকে গালিব করার নিমিত্তে মিথ্যার সাথে কোন রূপ আপস না করে শির উঁচু করে ফাঁসির মঞ্চে দৃঢ়চিত্তে এগিয়ে গিয়েছেন এবং ফাঁসির কাঠিন্যতাকেও হাসিমুখে বরণ করে নিয়েছেন।
মীর কাসেম আলী ছিলেন সৌভাগ্যবানদের সৌভাগ্যবান। কারণ তিনি দেশে এমন একটি ইসলামী ছাত্রসংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছেন যে সংগঠনটি নিরলসভাবে আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য দক্ষ এবং দেশপ্রেমিক ও খোদাভীরু আগামীর নেতৃত্ব তৈরির জন্য কাজ করে যাচ্ছে। এই কাফেলার প্রতিটি সদস্যর আমলে সালেহের একটি অংশ আল্লাহ চাহেন তো তিনিও পাবেন।
মীর কাসেম আলী সাহেবের কাছ থেকে সাহচর্য পেয়েছেন এমন একজন বন্দি বলেন, কাশিমপুর-২ এ হাই সিকিউরিটতে মীর কাসেম আলী ভাই থাকতেন। তাঁর যখন ফাঁসির সময় আসন্ন তখন ওনাকে নিয়ে তখনকার কাশিমপুর ২-এর জেলার নাসির উদ্দিন ভাবনায় পড়ে গেলেন। কারণ ফাঁসির মঞ্চ থেকে ওনার সেল বেশ কিছুটা দূরে ছিল। তাকে ফাঁসির জন্য ফাঁসির মঞ্চে নেয়ার সময় যদি তিনি হাঁটতে না পারেন অথবা অন্য কোন সমস্যা হয় তাহলে তাকে ফাঁসি দিতে বিলম্ব হতে পারে। এ আশঙ্কায় জেলার মীর কাসেম আলীকে ফাঁসির মঞ্চের কাছাকাছি সর্বশেষ সেলে আসার অনুরোধ জানান। তিনি জেলারকে দৃঢ়চিত্তে আস্বস্ত করেন আমাকে নিয়ে চিন্তা করবেন না। আমাকে জানালেই আমি গন্তব্যে পৌঁছে যাবো। তিনি তাঁর সেল পরিবর্তন করেননি। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর পথে উৎসর্গীকৃত জীবন ছাড়া এমন দৃঢ়চেতা হওয়া কোনভাবেই সম্ভব নয়। নচেৎ ফাঁসির দড়িতে যাকে ঝুলতে হবে, তিনি কিভাবে এত আত্মপ্রত্যয়ী ও মৃত্যুকে আলিঙ্গন জানাতেও দ্বিধা করেন না। কী তাঁর এমন আত্মিক শক্তি? সত্য পথের যাত্রীরা যুগে যুগে যে শক্তির বলে মৃত্যুকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে সত্যকে জীবনের শেষবিন্দু পর্যন্ত লালন করেছেন, সেই শক্তিই কখনো পরাজয় ডরে না মুমিন। তিনি যখন যুবকদের সামনে কথা বলতেন, আবেগ, ভালোবাসা দিয়ে কথা বলতেন। পিঠ চাপড়িয়ে সাহস জোগাতেন। আল্লাহর পানে অগ্রজ পথিক হওয়ার জন্য অনুপ্রাণিত করতেন। যা আমাদেরকে এখনো আলোড়িত করে।
২০০৫ সালে ঢাকার আল ফালাহ মিলনায়তনে ছাত্রশিবিরের বাছাইকৃত দায়িত্বশীলদেরকে নিয়ে ১০ দিনব্যাপী এক শিক্ষাশিবির অনুষ্ঠিত হয়। আমিও সেখানে একজন ডেলিগেট ছিলাম। এতে গুণী-জ্ঞানী দায়িত্বশীলবৃন্দ আমাদের আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। ইসলামী ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান আ.ন.ম. আবদুজ জাহেরও আমাদের আলোচক হিসেবে আলোচনা করেছিলেন। তিনি মীর কাসেম আলী ভাইয়ের কথা বলতে গিয়ে বলেন, “আমরা যখন ছাত্রজীবনে একসাথে মেস করে থাকতাম, তখন একদিন মীর কাসেম আলী বাজার থেকে কিছু পুঁটি মাছ এনে বললেন, আজ পুঁটি মাছ এনেছি। দীর্ঘ ২৩ দিন পরে আমরা ভালো খাবো! আমরাও দীর্ঘদিন পর মাছ খাবো জানতে পেরে খুশি হলাম। আলহামদুলিল্লাহ! আজ মীর কাসেম আলীর দিকে তাকালে সম্মানে আমাদের মাথার টুপি যেন পড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়!
মীর কাসেম আলী কাশিমপুর ৪০ নং সেলের ২নং সিরিয়ালের ১ নং রুমে ছিলেন। পরিচিত লোক দেখলেই ডাক দিতেন, কুশল বিনিময় করতেন। দন্ত ডাক্তার ওনার কাছে প্রায় সময় আসতেন। তিনি কারাগারের আগত ছাত্রশিবিরের ভাইদের খুব খোঁজ খবর রাখতেন। ওনার হিতাকাক্সক্ষী যারা ছিলেন, তাঁরা যখন ওনার কিছু প্রয়োজন এর কথা জানতে চাইতেন। তিনি খুব রাগ করতেন, আর বলতেন যে, পৃথিবীতে সব কিছুর অভাব পূরণ করা সম্ভব কিন্তু মানুষের অভাব পূণ করা সম্ভব নয়। তিনি শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন এনে ইসলামী ও যুগোপযোগী কর্মমুখী উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার বিষয়ে খুব ফিল করতেন এবং কারাগারে অন্যদের সাথে শেয়ার করতেন। তিনি কয়েদি, হাজতি, কারারক্ষী যে কারো সমস্যা সমাধান করতে আপ্রাণ চেষ্টা করতেন। বিশেষ করে চিকিৎসা, অর্থ দিয়ে তিনি সেবার চেষ্টা করেছেন।
ফাঁসির সময় ওনার জল্লাদ হিসেবে কাজ করেছেন, এর মধ্যে জল্লাদ শাহজাহান, দ্বীন ইসলাম, বিডিআর সদস্য হাসপাতাল রাইটার মশিউর, ফার্মাসিস্ট সোহেল (যার বাড়ি কাসেম আলী ভাইয়ের মানিকগঞ্জে)।
জেলার নাসির উদ্দিন (বাড়ি গোপালগঞ্জ, এখন কুমিল্লা কারাগারের জেল সুপার), প্রশান্ত কুমার ছিলেন জেল সুপার (ওনার বাড়ি টাঙ্গাইল)। ফাঁসির আগে তিনি জল্লাদ শাহজাহানসহ তাঁর সহযোগীদের বলেন, আপনারা আপনাদের কর্ম সাধন করবেন, যাতে আমার কষ্ট না হয়। জল্লাদ শাহজাহান বলেছিল “আপনার সামান্যতম কষ্টও হবে না, আমরা সেভাবেই আমাদের কাজ শেষ করবো। ওনার সেবক ছিলেন হাফিজ। ফাঁসির আগে ওনাকে পায়েস খাওয়াতে চেয়েছিলেন সেবক হাফিজ কিন্তু তিনি তা খাননি। তিনি কফি চেয়েছিলেন এবং কফি খেয়েছেন। আবার তিনি বলেছিলন আমি জান্নাতের খাবার খাবো, ইনশাআল্লাহ! এসব কথাগুলো ঠিক ফাঁসির পূর্বের ঘটনা বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। পরিবারের সদস্যরা ফাঁসির দিন বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে সাক্ষাৎ শেষে বিদায় নেন। ওনাকে ফাঁসির মঞ্চের দিকে রাত সাড়ে ৯টার দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি আতর খুব পছন্দ করতেন, যে কারো সাথে তিনি সাক্ষাৎ হলে হাতে ওনার প্রিয় সুগন্ধি আতর লাগিয়ে দিতেন। সেল থেকে ফাঁসির কাষ্ঠে ওনাকে নিয়ে যাওয়ার প্রাক্কালে জেল সুপার জম টুপি ও হাতকড়া পরাতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তা পরেননি। তিনি বলেন যে, আমি হেঁটেই ফাঁসির মঞ্চে যাবো। জেলার বলেন, অসুবিধা নেই আপনি এমনিই চলেন। সেলের থেকে বের হয়ে ফাঁসির কাষ্ঠের দিকে যাওয়ার সময় অনেকগুলো সেল অতিক্রম করে ফাঁসির মঞ্চে যেতে হয়। তিনি যখন যাচ্ছিলেন, তখন সেলের দুই পাশের বন্দির কাছ থেকে বিদায় নিলেন, বন্দিদের অনেকে তখন তাকবির ধ্বনি দিচ্ছিলেন। জান্নাতে গেলে আমার সাথে দেখা হবে, আপনারা ইসলামের পথে অটল থাকুন। সব বন্দি ওনাকে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করতে বলেন। তিনি আল্লাহ হাফেজ বলে বিদায় নিলেন। ফাঁসির পূর্বেই ওনাকে জমটুপি ও হ্যান্ডকড়া পরালেন। ওনারা বললেন এটা এ কারণে পরানো হয়েছে না পরালে আপনার প্রতি মায়া এসে যেতে পারে। তিনি ফাঁসির প্রস্তুতিকালে সংশ্লিষ্টদের প্রতি বলেন, “আমার ফাঁসি যখন কার্যকর করবেন তখন আমাকে জানাবেন। আমি কিছু কথা বলতে চাই।” তিনি বলেন, “আপনাদের প্রতি আমার কোনো অভিযোগ নেই, আল্লাহ আপনাদেরকে হেদায়েতের পথে পরিচালিত করুন। ফাঁসি ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের অহঙ্কার। আপনারা মুসলমানদের সন্তান। আমাদের ওপর আজ যে ইসলামী আন্দোলনের দায়িত্ব আছে, আপনাদের ওপরও সে দায়িত্ব আছে। বর্তমান মুশরিক রাষ্ট্র ভারত বাংলাদেশের ইসলামের অগ্রযাত্রাকে ধ্বংস করতে চায়, কিন্তু তারা কখনো এতে সফল হবে না।” ঐ সময় কথা বলতে গেলে জেলের একজন সিনিয়র কর্তৃপক্ষ সদস্য আর কথা বলতে দিতে চাইছিলেন না। তখন জেলার ওনাকে কথা বলার সুযোগ দিয়েছিলেন। তাঁর কথা শেষ হওয়ার পরক্ষণেই এই ক্ষণজন্মা প্রিয় মানুষটি দুনিয়াকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আগামীর শত বিপ্লবীর প্রেরণার উৎস হয়ে আল্লাহর দরবারে চলে গেলেন।
লেখক : বিশিষ্ট কলামিস্ট ও গবেষক

SHARE

Leave a Reply