শহীদ মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের জানাজা এবং জনতার ঢল

 মুহাম্মদ আলী#

JanaZaঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে খুব কাছ থেকে দেখেছি শহীদ মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের জানাজা, দাফন, সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া এবং প্রশাসনের কড়া নিরাপত্তার নামে অনৈতিক বাড়াবাড়ি। কিন্তু এরপরও কি মানুষের হৃদয় থেকে মুছে দেয়া যাবে শহীদ মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের নাম?
১১ এপ্রিল ফাঁসি কার্যকর করা হবে এই আশঙ্কায় প্রিয় ভাইকে এক নজর দেখতে আগেই চলে গেলাম শেরপুরে। এর আগে সরকার ফাঁসি কার্যকর নিয়ে যে নাটক করেছে তা থেকে আজকের দিনটিতে তাদের কর্মকান্ড ভিন্নরূপ পরিলক্ষিত হচ্ছিল। তারা প্রস্তাব দিয়েছিল রাষ্ট্রপতির নিকট ক্ষমা চাওয়ার কিন্তু তিনি সে প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। শেরপুরে পৌঁছে জেলা সভাপতি ফরহাদ ভাইয়ের সাথে পরামর্শ করে বাজিতখিলা বাজারে যেতে চাইলাম কিন্তু তিনি জানালেন সেখানে পুলিশি চেক রয়েছে, পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করে তারপর  সেখানো যাবেন। কিছুক্ষণ ভেবে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, সেখানে এখনই যেতে হবে। নইলে লাশ নিয়ে আসার পর তারা আরও শক্ত অবস্থান নেবে। তখন সেখানে যাওয়ার আর সুযোগ থাকবে না। তাই আমরা বিভিন্ন উপায়ে দায়িত্বশীলরা বাজিতখিলার পাশে গিয়ে অবস্থান করলাম। মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ভাইয়ের প্রতিষ্ঠিত ইয়াতিমখানার পাশে জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি হাফিজ ভাইয়ের বাসায় গেলাম। সেখানে গিয়ে দেখা গেলো জেলা আমীর ডা: শাহাদাৎ হোসেন ভাইয়ের সাথে। রাস্তার উভয় দিকে পুলিশি ব্যারিকেড। পুলিশ পাহারায় কড়া নিরাপত্তার মধ্যে কবর খোঁড়ার কাজ চলছে। জামালপুর জেলা জামায়াতের আমীর ও সেক্রেটারি বাজিতখিলার পাশাপাশি রয়েছেন। জামালপুর জেলা থেকেও আমাদের অনেক ভাই এসে শেরপুর শহরে এবং আশপাশের গ্রামে অবস্থান করছেন। জামালপুর থেকে শেরপুর আসার পথে রয়েছে পুলিশি তল্লাশি। রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে বসে রয়েছে তারা। সন্দেহ হলেই জিজ্ঞাসাবাদ কোথায় যাচ্ছেন,  কেন যাচ্ছেন। এ ধরনের পরিবেশের মুখোমুখি হওয়া লাগতে পারে এ আশঙ্কায়, জনশক্তিদের লুঙ্গি পরে আসার পরামর্শ দেয়া হয়েছিল। তাই তাদেরকে স্থানীয় মনে করে রাস্তায় পুলিশ তেমন সমস্যা সৃষ্টি করেনি। পরামর্শ করে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম লাশ আসার আগেই প্রচুর লোকের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হবে। কারণ প্রশাসনের সাথে কথা বলে মনে হচ্ছিল তারা আমাদেরকে জানাজায় অংশগ্রহণ করতে দেবে না এবং প্রিয় ভাইটিকে শেষবারের মতো এক নজর  দেখতেও দেবে না। ফাঁসি কার্যকর হওয়ার আগে সহ¯্রাধিক লোক কররের চারপাশ ঘিরে  নেয়। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যে পুলিশ, র‌্যাব এসে সবাইকে সরিয়ে দেয়। পুলিশের ধাওয়ায় লোকেরা আশ্রয় গ্রহণ করে আশপাশ ঘরবাড়িগুলোতে। যদিও পুলিশ দিনেরবেলায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে কোন বাইরের  লোককে আশ্রয় না দিতে এবং বাড়ির পুরুষদের বাড়ির বাইরে থাকতে বলে আসে। কিন্তু এলাকাবাসী ঘরবাড়ি তো ছাড়েইনি বরং বাইরের লোকদের জন্য আন্তরিকতার সাথে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। অন্য দিকে বিকেলে এসপি ও ডিসি এসে ডিশ মালিকদেরকে ডিশ বন্ধ করে দেয়ার নির্দেশ দেয় যাতে এলাকার লোকেরা ফাঁসি কার্যকর হওয়া ও লাশ নিয়ে আসার খবর না জানতে পারে। একটু পরে শুরু হয় মুষলধারে বৃষ্টি। নির্ঘুম রাত আর বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে নামে জনতার ঢল। বৃষ্টি শেষ হওয়ার সাথে সাথে আমরা পুনরায় মাদরাসা মাঠ এবং কবরের চারপাশে অবস্থান করি। কিন্তু এবারও পুলিশ হাজার হাজার জনতাকে ধাওয়া করে কবর ও মাদরাসা মাঠ তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। জনতার মাঠে অবস্থানের চেষ্টা এবং পুলিশের ধাওয়ার মধ্য দিয়ে চলছে রাতের প্রহর। ধাওয়া খেয়ে আহত হয়েছে শতাধিক লোক। উপস্থিত জনতা শুধু তাদের প্রিয় নেতাকে এক নজর দেখা ও জানাজায় শামিল হওয়ার জন্য সারারাত অপেক্ষা করছিলো। অবশেষে রাত ৪টার দিকে লাশের গাড়ি বাজিতখিলা এসে  পৌঁছে। সাথে সাথে প্রচুর সংখ্যক র‌্যাব, পুলিশ, বিজিবির সদস্য এসে এমনভাবে অবস্থান গ্রহণ করে যা দেখে মনে হচ্ছিল তারা কোন শক্তিশালী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। চারদিকে কান্নার আহাজারিতে আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠছে। ‘নারায়ে তাকবির আল্লাহু আকবার’ মুহুর্মুহু স্লোগান চতুর্দিক থেকে ভেসে আসছে। প্রশাসনের লোকেরা মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ভাইয়ের বড় ভাই কফিল উদ্দিনকে ডেকে নিয়ে তাদের পরিবারের কয়েকজন লোককে কেবল দেখার সুযোগ দেয়। কয়েকজন বৃদ্ধ শেষবারের মতো এক নজর দেখার আকুতি জানায় কিন্তু তাদেরকেও দেখার অনুমতি দেয়া হয়নি। সারারাত জেগে থাকা বন্দুকের নলের মুখে অসহায় মুসল্লিগণ প্রিয় মানুষটিকে শেষবারের মতো এক নজর দেখার অনুমতি না পেয়ে জানাজায় অংশগ্রহণের বায়না ধরে কিন্তু প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেয়া হয় তার পরিবারের সদস্যরা ছাড়া কেউ জানাজায়ও শরিক হতে পারবে না। শোকাহত জনতার কান্নার চিৎকারই ছিল প্রতিবাদের একমাত্র ভাষা। মাত্র ৪০-৫০ জন লোককে জানাজায় উপস্থিত হওয়ার সুযোগ দেয়া হয়। তারপর বিক্ষুব্ধ জনতা জানাজায় শরিক হতে না পেরে চারদিকের মাঠঘাট যারা যেখানে সুযোগ পেয়েছে সেখানে ফজর নামাজ আদায়ের পর গায়েবানা জানাজা আদায় করে। এরপর সকলে একত্রিত হয়ে কবর জিয়ারতের উদ্দেশে রওনা হলে প্রথমে পুলিশ বাধা দেয় পরে জনতার ¯্রােত দেখে বাধাকে শিথিল করে। কবর জিয়ারতে হাজার হাজার মানুষের ঢল নামে। মুনাজাতে অংশগ্রহণকারী হাজার হাজার জনতা কান্নায় ভেঙে পড়ে। কিছু পুলিশ সদস্যকেও মুনাজাতে অংশগ্রহণ ও কান্নাকাটি করতে দেখা গেছে। কিন্তু মুনাজাত শেষ হতে না হতেই পুলিশ আবার সবাইকে তাড়িয়ে দেয়। আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করে বুকে চাপা ক্ষোভ নিয়ে বিক্ষুব্ধ জনতা বাড়ি ফিরে। এখনও প্রতিদিন শেরপুরসহ সারাদেশ থেকে হাজার হাজার লোক কবর জিয়ারতের জন্য আসছেন এবং এতে এটাই প্রমাণ করে যে, মুহাম্মদ কামারুজ্জামানকে পৃথিবী থেকে বিদায় করে দেয়া সম্ভব হলেও মানুষের অন্তর থেকে বিদায় করা যাবে না।
লেখক : সভাপতি, জামালপুর জেলা, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির

SHARE

Leave a Reply