শহীদ মুহাম্মদ কামারুজ্জামান স্মৃতির পাতা থেকে

হাসান ইকরাম ওয়ালী#

Kamaruzzaman-Sonপরিবারের ৬ ভাইবোনের মাঝে আমি দ্বিতীয়। জন্ম থেকে যুবক বয়স পর্যন্ত বাবার আদর-স্নেহ, মায়া-মমতায় বেড়ে উঠেছি আমরা সবাই। বাবা হিসেবে পৃথিবীর আরো বাবার মতোই আমাদের সৎ মানুষ এবং সমাজে প্রতিষ্ঠিত করে যেতে কোন রকম কার্পণ্য করেননি। সন্তানের কাছে বাবা হচ্ছেন একটি আদর্শ। ছোটবেলায় সাইকেল চালানো থেকে শুরু করে আর দশ জন বাবার মতোই তাকে আমি পেয়েছি আমার প্রতিটি অর্জনে। শেরপুরে জ্যাঠার বাড়িতে, ১৩ কি ১৪ বছর বয়স, ফোনিক্স (Phoenix) সাইকেলে কেউ উঠিয়ে ধাক্কা দিলে সাইকেল চলতো কিন্তু উচ্চতার কারণে প্যাডেল মারতে পারতাম না। কিছু দূর গিয়ে পড়ে যেতাম। দুপুরের খাবারের পর বাবা একটু হাঁটাহাঁটি করছিলেন। আমার এই কান্ড দেখে কাছে এলেন তারপর বললেন, বড় সাইকেল দেখে ভয় পাবার কিছু নেই, তুমিও চালাতে পারবে কিন্তু একটু অন্যভাবে। তিনি আমাকে দেখালেন সাইকেলের সিটের নিচে ভেতর দিয়ে পা ঢুকিয়ে কিভাবে প্যাডেল দিতে হয়। মোটরসাইকেল চালানো শিখেছি যখন ক্লাস নাইনে পড়ি। সেজো মামার হোন্ডা মাঠে পার্ক করে বাবা আর মামা হাঁটাহাঁটি করছিলেন। মামার কাছে অনেক জোরাজোরি করে চাবিটা নিলাম। বাবা কাছে এলেন, মনে হলো তিনি চালাতে দেবেন না কিন্তু অবাক হলাম! কাছে এসে বললেন, ডান হাতে একসেলেরেটর আর হ্যান্ডব্রেক বাম হাতে ক্লাস, বাম পায়ে গিয়ার, সামনে চাপ দিলে গিয়ার পড়বে এভাবে চারবার চাপ দেয়া যাবে এবং পেছনে চাপ দিলে কমতে থাকবে, ডান পায়ে হচ্ছে ব্রেক। যখন গিয়ার দেয়ার সময় এবং ব্রেক ধরার সময় অবশ্যই বাম হাত দিয়ে ক্লাস চেপে ধরতে হবে তা না হলে মোটরসাইকেলের স্টার্ট বন্ধ হয়ে যাবে। সাইকেল চালাতে পারতাম বলে মোটরসাইকেল ব্যালান্স করা নিয়ে আমার আত্মবিশ্বাস ছিলো কিন্তু একই সময়ে সব কাজ ৪ হাত-পা দিয়ে করতে হবে এটা আমার জানা ছিলো না। এতোই এক্সাইটেড ছিলাম যে ভয় ভুলে গিয়ে স্টার্ট করে চালানো শুরু করলাম। কিছু দূর গিয়ে আবার মোটরসাইকেল ঘুরিয়ে পেছন দিকে এগোতে থাকলাম আগের থেকে একটু বেশি গতিতে। মাথা কাজ করছিলো না। আমি চিল্লাতে থাকলাম ব্রেক কোথায়, স্পিড কমাতে পারছি না। আব্বু বলছিলেন ডান পায়ে কিন্তু আমার মাথা কাজ করছিলো না, আমি বললাম খুঁজে পাচ্ছি না। কোন কিছু পরোয়া না করে তিনি সামনে থেকে আমার দিকে দৌড়াতে থাকলেন, কাছে এসে মোটরসাইকেলের হ্যান্ডেলটা ধরে ফললেন এবং থামিয়ে দিলেন। আমি শুধু বললাম, তোমার উপরে যদি হোন্ডা উঠে যেত। বাবা হাসলেন আর বললেন, এটা হোন্ডা না এটা মোটরসাইকেল আর হোন্ডা হচ্ছে ব্র্যান্ডের নাম!
বাবা বহুবার প্যারিসে এসেছিলেন কিন্তু এবারের সফরটা একটু অন্যরকম, কারণ আমি সেখানে থাকি। সারা প্যারিস ঘুরে বেড়িয়েছি বাবা-মাকে নিয়ে। আইফেল টাওয়ার, রেইন নদী, সাঞ্জেলিজে (Champs), স্যাতু দো ভ্যারসাই, আরো অনেক যায়গায়। কিন্তু বিপত্তি এলো প্যারিস গেটে গিয়ে। টিকিট কাটার আগে আমি জানতাম না যে লিফট নেই উপরে উঠতে হলে সিঁড়ি ভেঙে উঠতে হবে। হিসাব করে দেখলাম ১০ কি ১১ তলা উঠতে হবে। কিন্তু বাবা নাছোড় বান্দা, উনি হেঁটেই উপরে উঠবেন। আমি মায়ের দিকে তাকালাম একবার আবার বাবার দিকে তাকালাম। কী করবো বুঝতে পারছি না। নিরুপায় হয়ে উপরে উঠতে থাকলাম। ২-৩ তলা ওঠার পর আম্মু বললেন একটু বিশ্রাম নিই, বাবাও বসলেন। এভাবে ২-৩ তলা ওঠে বিশ্রাম নিয়ে চূড়ায় পৌঁছলাম। বাবা পকেট থেকে নোট প্যাড আর কলম বের করে ফ্রেঞ্চ রেভুলিউশনের টুকিটাকি ইনফরমেশন টুকে নিচ্ছিলেন আর বলছিলেন ফ্রেঞ্চ রেভুলিউশন আর নেপোলিয়ানের তথ্যসমৃদ্ধ জায়গার এতো কাছে এসে কিছু না জেনেই ফিরে যাবো, এটাতো হয় না। সবসময় তো বইয়েই পড়েছি কিন্তু কাছ থেকে দেখা, উপলব্ধি করা, তথ্য সংগ্রহ করার আলাদা একটা স্যাটিসফেকশন আছে। নিজ চোখে যা দেখেছি এবং বইয়ে যা পড়েছি তার বর্ণনা তো এক নয়। আমার মতো দেখলে, আমার মতো করে বর্ণনা করতে পারবো যার একটা পরিপূর্ণতা আছে। দিনাজপুরের জলঢাকায় কিংবা মক্কা-মদিনার হেরেম শরিফে, লন্ডনের বিগ বেন, লন্ডন আইতে, প্যারিসের আইফেল টাওয়ার, ক্যাথেড্রাল নটোরে ডেম (Notre Dame de Paris), লা দেফন্সে (La Défense), সাঞ্জেলিজে (Champs-Élysées), স্যাতু দো ভ্যারসাই (château de Versailles), নোরমোন্দির তীরে (Normandy), সুইডেনের সিটি হল কিংবা রয়েল প্যালেস যেখানেই গিয়েছি সেখানেই নোট প্যাড আর কলম বের করে তথ্য টুকে নিতে দেখেছি। জ্ঞান আহরণের যে আগ্রহ তার মাঝে ছিলো তা দেখে সত্যি খুব অবাক হতাম। বাবার আর একটা বিষয় আমাকে ঈর্ষান্বিত করতো তা হলো, তিনি কারো নাম এবং চেহারা ভুলে যেতেন না। কারো সাথে পরিচয় হলে খুঁজে ফিরে একটা লিং বের করে ফেলতেন। বলতেন বাড়ি কোথায়, অমুককে চেনেন নাকি? আপনি কাজ করেন কোথায়, অমুক আপনাদের জোনাল ডাইরেক্টর না? কোন না কোনোভাবে উনি পরিচয় বের করে ফেলতেন। বাইরে এলে প্রথমবার কারো সাথে পরিচয় হলে ভিজিটিং কার্ড দিয়ে বলতেন, বাংলাদেশে এলে অবশ্যই আমার সাথে যোগাযোগ করবেন, আমার অফিসে এক কাপ চায়ের দাওয়াত রইলো, দেশকে সমৃদ্ধ এবং শক্তিশালী করার জন্য আপনাদের পরামর্শ অত্যন্ত জরুরি। সাধারণ মানুষের সাথে মিশে যাবার যে গুণ ছিলো তাও আমাকে অভিভূত করতো। বাসা থেকে প্যারিস এয়ারপোর্ট যাচ্ছি। গাড়ির ড্রাইভারকে প্রশ্ন করে বসলেন; তোমার মাতৃভূমি কোথায়, সে বললো আলজেরিয়া, আব্বু একে একে রাজধানী, জনসংখ্যা তখনকার ইসলামিক লিডার, প্রেসিডেন্ট, প্রাইমমিনিস্টার আর অপজিশন লিডারের নাম বলে দিলেন। ড্রাইভার তাজ্জব হয়ে জিজ্ঞাসা করলো, তুমি কোন দেশ থেকে। বাংলাদেশ বলার পর সে চিনতেই পারলো না। তখন বাবা বাংলাদেশের পরিচিতি তুলে ধরলেন এবং বললেন তুমি কোন যায়গা থেকে কাপড় কেন? সে বললো বেশির ভাগ এইচ অ্যান্ড এম (H & M, Hennes & Mauritz) কারণ প্রাইজ রিজন্যাবল। বাবা বললেন, আমার বিশ্বাস তুমি যদি কাপড়ের ম্যানুফ্যাকচারিং ট্যাগটা পড় তাহলে দেখতে পাবে মেইড ইন বাংলাদেশ। আমার দেশ এসব কোম্পানিকে ৮০%-এরও বেশি গার্মেন্ট সাপ্লাই করে। বাংলাদেশকে না চেনার কারণে এবং আব্বুর ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে চালকটি কোন পয়সা নিতে অস্বীকৃতি জানায়। বাবা তার টেলিফোন নাম্বার নিয়ে তার মোবাইলে সেভ করতে করতে বললেন, পরের বার এলে তোমার ট্যাক্সিতেই ঘুরবো!
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় মা ও বাবা আমেরিকা থেকে সুইডেনে আমাকে এবং আমার স্ত্রীকে দেখতে শেষবার যখন এসেছিলেন খুব অল্প সময়ের জন্য। এরই মাঝে তিনি আবহাওয়া দেখে বললেন, ওয়ালী সুইডেনে তো অনেক খাল বিল, তোমরা মাছ ধরো না? তেমনি মাছ ধরতে চললাম বাবাকে নিয়ে স্টোকহলের নাক্কা স্থান্দ্রে (nacka strand)। বড়শিটা ছিলো একটু অন্য রেকম, সুতাতে আট থেকে নয়টি বড়শি আর একবার বড়শি মারলে এক বড়শিতে ৭ থেক ৮টা মাছ ওঠে। মাছগুলো ঝাঁকে ঝাঁকে চলে। ফলে বড়শি নিক্ষেপ করে টান দিলে কোনটার মাথা, কোনটা পেটে, কোনটার লেজে আটকে যায়। বাবা বলছিলেন, ওয়ালী মাছগুলো খুব বোকা। দুই ব্যাগের মতো মাছ ধরে ফেলেছি কিন্তু বাবার নেশা কাটছিলো না। সেখান থেকে আমরা তড়িঘড়ি করে রওনা দিলাম এক শুভাকাক্সক্ষীর বাসাতে। স্টোকহলের সবাই মোটামুটি উনাকে মুসা নানা হিসেবে চিনেন। বাসার সামনে গিয়ে আমরা উপলব্ধি করলাম যে একটা বাসাতে যাবো কোন কিছু নিয়ে আসিনি। কেমন দেখাচ্ছে বিষয়টা। বাবা গাড়ি থেকে মাছের ব্যাগটা নিয়ে কলবেলে চাপ দিলেন, দরজা খুলতেই বললেন, টাটকা মাছ ধরে নিয়ে এসেছি আপনার জন্য! আমরা সবাই হাসলাম। পরদিন আমার খালু শ্বশুরের বাড়িতে দাওয়াত ছিলো। আমার স্ত্রীর মামা-খালারা মোটামুটি সকলে সুইডেনেই থাকেন তারা সবাই তাকে নানানভাবে বোঝালেন আরো কিছুদিন থেকে যেতে, দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে তখন যেতে। কিন্তু বাবার একটাই কথা ছিলো-  আমাকে রুকন সম্মেলন ধরতে হবে। এখনো অনেক কাজ বাকি আছে, দেশের একেক প্রান্ত থেকে রুকনরা আসেন কেন্দ্রীয় নেতাদের দেখতে, পরিচিত হতে, তাদের কথা শুনতে। এটা আল্লাহর একটা নেয়ামত, এই নেয়ামত থেকে আমি নিজেকে বঞ্চিত করবো না। চার দিনের সফর দেখতে দেখতে ফুরিয়ে গেলো। সুইডেনে তখন ছিলো গ্রীষ্মকাল, এশার নামাজের ঘণ্টাখানেক পরই ফজরের নামাজ। আমার এখনো মনে পড়ে, এশার নামাজ পড়ে আব্বু-আম্মু জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকতেন আর দেখতেন সূর্য এক দিকে অস্ত যাচ্ছে, আরেক দিকে উদিত হচ্ছে। চারিদিকে সূর্যের আলো ফুটে উঠছে কিন্তু ঘড়ির কাঁটাতে বাজছে রাত ০১:৪০। আব্বু বলে উঠলেন আল্লাহু আকবার…!
লেখক : শহীদ মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের ছেলে

SHARE

Leave a Reply