শহীদ শরীফুজ্জামান নোমানী শাহাদাতই ছিলো যার কামনা -মো: আফজাল হোসেন

ক্ষণিকের লাগি ফুটিয়া যে ফুল
সুবাস ছড়াইল সবার তরে।
পাই না খুঁজিয়া তাহার তুল
ঝরিয়া গিয়াছে যে দারুণ ঝড়ে।

ফুটন্ত গোলাপ, যেমন সুবাস ছড়ায়। মানুষকে আকৃষ্ট করে তার দিকে। তবে চিরদিনের জন্য ধরে রাখা যায় না, তার ঝরে যাওয়া থেকে। শহীদ নোমানীও ছিলেন এমন একটি গোলাপ। তাঁর সৌরভে সুশোভিত করে চলে গেলেন। আমার সাংগঠনিক জীবনের প্রিয় এক ব্যক্তিত্ব ছিলেন শহীদ শরীফুজ্জামান নোমানী। হয়তো আল্লাহ তাকে এই সংগঠনের জন্য একজন নিয়ামক হিসেবে দুনিয়াতে পাঠিয়েছিলেন। খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল প্রিয় এই মানুষটিকে। আমি লক্ষ করেছিলাম তার ভেতরে থাকা শাহাদাতের তীব্র আকাক্সক্ষা।
শহীদ শরীফুজ্জামান নোমানী ভাইয়ের সাথে আমার পরিচয় ২০০৪ সাল থেকে। তখন নোমানী ভাই ও আমি এক সাথে পাঠচক্রের সদস্য ছিলাম। তখন থেকেই ইসলামী আদর্শের উজ্জ্বল প্রতীক হিসেবে তার প্রাত্যহিক আচরণ, চালচলন, কথাবার্তায় ইসলামের সুমহান শান্তির অকপট দীপ্তি ভাস্বর ছিল। নম্রতা, ভদ্রতা, তাকওয়া, সাংগঠনিক প্রজ্ঞা এবং সবার সাথে মেশার একটা গুণ তার ভেতরে লক্ষ্য করা যেত। অনেক আগে থেকে পরিচয় হলেও তার সাথে সব থেকে কাছে থাকার সুযোগ হয়, ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর জাতীয় নির্বাচন থেকে, তার শাহাদাতের আগ পর্যন্ত। রাজশাহী-৩ আসন (পবা ও মোহনপুর) এর নির্বাচনী প্রার্থী হিসেবে তৎকালীন রাজশাহী মহানগরীর জামায়াতের আমির আতাউর রহমানকে মনোনয়ন দেয়। তার নির্বাচনের জন্য কাটাখালী পৌরসভায় নোমানী ভাইকে প্রধান ও আমাকে তার সহকারী হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয়। সেই সুবাদে আমি ও নোমানী ভাই প্রতিদিন সেই অঞ্চলে নির্বাচনী প্রচারণার জন্য, ফজরের নামাজ পড়ে দু’জনে রওনা হতাম। সারাদিন নির্বাচনী প্রচারণা সেরে আবার দু’ জনে রাতে রুমে ফিরতাম। এর পর দু’জনে এক সঙ্গে খাওয়া দাওয়া ও নামাজ সেরে ঘুমিয়ে যেতাম। মাঝে মাঝে মধ্যরাত্রে হঠাৎ করে ঘুম ভেঙে যেত আমার। ঘুম থেকে জেগে দেখতাম শহীদ শরীফুজ্জামান নোমানী জায়নামাজে দাঁড়িয়ে খুব সুমধুর কণ্ঠে কুরআন তেলাওয়াত করছেন। তার এ কুরআন তেলাওয়াত শুনে আমি খুবই মুগ্ধ হতাম। শুধু তাই নয়, ফজরের নামাজ সেরে যখন নোমানী ভাই তৎকালীন বিনোদপুরে অবস্থিত মহানন্দা শিক্ষা নিবাসে কুরআন তেলাওয়াত করতেন তখন সেখানে অবস্থানরত অনেক দায়িত্বশীল ভাই তার কুরআন তেলাওয়াত শুনার জন্য কান পেতে থাকতেন। জায়নামাজে তাহাজ্জুদের নামাজ সেরে তিনি মহান রাব্বুল আলামিনের কাছে দু’ হাত তুলে দোয়া করতেন, “এই সংগঠনের জন্য এবং শহীদি মৃত্যুর জন্য, শুধু তাই নয় কিভাবে বাতিলের হাত থেকে এই সংগঠনকে রক্ষা করা যায় সে জন্য তিনি মহান রাব্বুল আলামিনের কাছে মোনাজাত করতেন।
তিনি সর্বদা শহীদ পরিবারগুলোর জন্য ছিলেন নিবেদিত। তাদের দুঃখ বেদনাসহ যে কোন বিষয় সমাধানের জন্য সবার আগে অগ্রাধিকার দিতেন। শহীদ পরিবারের কেউ এলে নোমানীকে তাদের পরিবারের সদস্য মনে করতেন। তার কাছে তাদের সুখ দুঃখসহ পরিবারের সকল সমস্যার কথা বলতেন। মনে হতো যেন তিনি তাদের বাসার একজন সদস্য। তিনি সেভাবে তাদের বিষয়গুলো গুরুত্ব সহকারে দেখতেন।
শহীদ শরীফুজ্জামান নোমানীর শাহাদাতের একদিন আগে অর্থাৎ ২০০৯ সালের ১১ মার্চ। শহীদ দিবস উপলক্ষে তিনি শহীদ আইয়ুব ভাইয়ের বাসায় গিয়েছিলেন, তার মৃত্যুবার্ষিকী পালনের জন্য। সকাল বেলায় ফজরের নামাজ শেষ করে মোটরসাইকেলে করে রাজশাহী স্টেশনে রেখে এসেছিলাম তাকে। চুয়াডাঙ্গা পৌঁছানোর পর শহীদ আইয়ুব ভাইয়ের মৃত্যুবার্ষিকীর কুলখানি সেরে তিনি কবর জিয়ারতের জন্য যান। সেখানে যাবার পর মহান রাব্বুল আলামিনের কাছে দুই হাত তুলে মোনাজাত করেন “হে আল্লাহ, তুমি শহীদ আইয়ুব ভাইয়ের শাহাদাতকে তোমার দ্বীনের জন্য কবুল কর। যেভাবে তুমি শহীদ আইয়ুব ভাইকে তোমার দ্বীনের জন্য কবুল করেছ, একইভাবে আমাকে তুমি তোমার দ্বীনের জন্য কবুল কর। হে আল্লাহ বাতিলকে উৎখাত করতে গিয়ে, এই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যেভাবে একে একে ১৫ জন ভাই তোমার দ্বীনের পথে শাহাদাত বরণ করেছেন। ঠিক একইভাবে এই বিশ্ববিদ্যালয়কে রক্ষা করতে যদি আর কোনো শাহাদাতের প্রয়োজন হয়, তবে আমাকে সেই শাহাদাতের সিঁড়িতে শামিল কর।” এভাবে যখন একে একে শাহাদাতের তামান্নার বাণী তার মুখ দিয়ে উচ্চারিত হচ্ছিল, ঠিক সে সময় তার কানে পৌঁছে গেল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবিরের সাথে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের সংঘর্ষের খবর। এ খবর পাওয়ার পর সাথে সাথে মোনাজাত শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ফেরার জন্য তৈরি হন শহীদ নোমানী। তার ব্যাগ ব্যাগেজ গুছিয়ে শহীদ আইয়ুব ভাইয়ের মায়ের কাছে বিদায় নিতে যান। বিদায় নিতে গেলে শহীদ আইয়ুব ভাইয়ের মা বার বার তাকে কিছু খেয়ে রওনা হবার জন্য অনুরোধ করেন। খাবার না খেয়ে শহীদ আইয়ুব ভাইয়ের মাকে বলেন, ‘মা আপনি জানেন বিশ্ববিদ্যালয়ে বাতিলের সাথে শিবিরের সংঘর্ষ শুরু হয়েছে। সে সংঘর্ষে আমি যদি এখনি রওনা না দিই, খাবার গ্রহণ করতে গিয়ে যদি দেরি হয়ে যায়, তবে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তালার কাছে আমাকে জবাবদিহি করতে হবে? তাই আমার এখানে আর এক মুহূর্ত দাঁড়ানো ঠিক হবে না। আল্লাহতায়ালা আমাকে যদি শহীদ হিসেবে কবুল করেন তাহলে হয়তো আর আপনার সাথে দেখা হবে না মা। কিয়ামতের দিন আপনার সাথে আমার সাক্ষাৎ হবে। আর যদি বেঁচে থাকি তাহলে অবশ্যই আপনার হাতের খাবার খেয়ে যাবো।” এই কথাগুলো বলেই তিনি সেখান থেকে রওনা হলেন। শহীদ আইয়ুব ভাইয়ের মা নির্বাক হয়ে শুধু তার পথের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকলেন।
১৩ মার্চ ২০০৯ সকাল থেকে ক্যাম্পাসের অবস্থা থমথমে। কারণ আগের রাত্রে প্রতি হলে হলে ও এলাকাগুলোতে তল্লাশি চালিয়ে আমাদের প্রায় ৮০ জন ভাইকে বিনা অপরাধে পুলিশ আটক করে। আর তারপর থেকে বুঝা যাচ্ছিল হয়ত তারা পরদিন ক্যাম্পাসে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে। সেই সুবাদে ১৩ মার্চ ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের ক্যাডাররা ফজরের পর পর সকল হলের গেটে তালা লাগিয়ে দেয়। এই খবর পাওয়ার পর তৎকালীন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শিবিরের সভাপতি দেলাওয়ার হোসেন সাঈদী ভাইয়ের আহবানে আমি, নোমানী ভাই, মাহাবুব ভাইসহ প্রায় ৩০ জনের একটি গ্র“প ভোরে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করি। আমরা বিনোদপুর গেট দিয়ে সরাসরি আমীর আলী হলের মাঠে গিয়ে অবস্থান নিই। আমাদের উপস্থিতি টের পেয়ে সেখানে প্রায় পাঁচ ভ্যান দাঙ্গা পুলিশ আমাদের ধাওয়া দেয়। এক সময় নোমানী ভাই আমাকে এসএম হলের গেটের কাছে ডেকে বললেন, “আপনি স্থানীয় ভাইদের সাথে নিয়ে বিনোদপুরে অবস্থান করবেন। এটাই আমার শহীদ নোমানী ভাইয়ের সাথে শেষ কথা। আমি তার কথা মোতাবেক স্থানীয় ভাইদের নিয়ে বিনোদপুরে অবস্থান করি। এমতাবস্থায় ছাত্রলীগের অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা প্রতিটা হলে হলে আমাদের ভাইদের ওপর নির্যাতন শুরু করে। একই সাথে ছাত্রলীগ, যুবলীগ, আওয়ামী লীগের ক্যাডাররা পুলিশকে সাথে নিয়ে বিনোদপুরে আমাদের ওপর আক্রমণ শুরু করে। গোটা বিনোদপুর রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। সংঘর্ষ চলাকালীন সময় একটা ইট এসে আমার ডান পায়ের হাঁটুতে আঘাত হানে। আমি আহত অবস্থায় বাসায় আসি। বাসায় প্রাথমিক চিকিৎসা সেরে বিশ্রাম নিচ্ছিলাম। এমন সময় খবর পেলাম, আমার বাসার দক্ষিণ পাশে লিচু বাগানে অনেকগুলো ছাত্র অবস্থান করছে। এ খবর পাবার পর বিছানা থেকে নেমে বাইরে যেয়ে দেখি আমাদের ভাইয়েরা। আমি তাদের কাছ থেকে শুনলাম শেরেবাংলা হলে আমাদের ভাইদের গেস্টরুমে আটকে রেখে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা তাদের ওপর নির্যাতন চালাচ্ছে। এই খবর পেয়ে আমরা যখন তাদের উদ্ধারের জন্য যাই তখন পুলিশ ও র‌্যাব আমাদের ওপর আক্রমণ করে। অপর দিকে শহীদ নোমানী ভাই, হাফিজুর রহমান শাহীন, রায়হান, জিন্না, মাহাবুব ভাইসহ প্রায় চল্লিশ পঞ্চাশ জন মিলে সকল হলগুলো হতে, ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের হাত থেকে আমাদের ভাইদের উদ্ধার শুরু করে। সর্বশেষ মুজিব হলের সামনে পুলিশি বাধার মুখে আমাদের ভাইয়েরা দু ভাগে ভাগ হয়ে যায়। শরীফুজ্জামান নোমানী ও হাফিজুর রহমান শাহীন ভাইয়ের নেতৃত্বে পনেরো থেকে বিশ জনের একটি গ্রুপ শেরেবাংলা হলে প্রবেশ করে। হলে প্রবেশের পূর্বে ছাত্রলীগের ক্যাডাররা ফরহাদ, রেজাউল, আরিফ ভাইসহ প্রায় পনেরো জন ভাইকে গেস্টরুমে দরজা লাগিয়ে নানাভাবে নির্যাতন করছিল। নোমানী ভাইসহ আমাদের ভাইদের হলে প্রবেশের খবর পেয়ে তারা সেখান থেকে পালিয়ে যায়। এর আগে ফরহাদ ভাইকে একটি কক্ষে আটকে রাখে তারা। নোমানী ভাই গেস্টরুমে থেকে ভাইদের উদ্ধার করে ফরহাদ ভাইকে উদ্ধারের জন্য বিভিন্ন কক্ষে খোঁজাখুঁজি করে আবার ফিরে আসেন। ঠিক সে সময় পুলিশ ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের ডেকে ডেকে হলের ভেতরে প্রবেশ করায় এবং আমাদের ভাইদের ওপর পুলিশের উপস্থিতিতে আক্রমণ শুরু করে। এই আক্রমণে আমাদের প্রায় ১০-১২ জন ভাই গুরুতর আহত হয় বিশেষ করে জিন্না ভাইয়ের পায়ে গুলি লাগে, রায়হান ভাইয়ের হাত ও পায়ের হাড় ভেঙে যায়, মাহাবুব ভাইয়ের মাথাসহ সমস্ত শরীর রক্তাক্ত হয়ে যায়। এ দিকে ছাত্রলীগ ও পুলিশের আক্রমণের হাত থেকে জনশক্তিকে রক্ষা করার জন্য নোমানী ভাই তাদের নিরাপদ জায়গায় সরে যাবার নির্দেশনা দেন। এমন সময় ছাত্রলীগ ও পুলিশ আমাদের ভাইদের ওপর আক্রমণ শুরু করে। নোমানী ভাই সবাইকে পেছনে সরিয়ে বাতিলের অস্ত্রের সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলেন, আমি নোমানী, শিবিরের সেক্রেটারি বলছি, তোমরা শান্ত হয়ে যাও আমাদের জনশক্তিকে নিরাপদে বের হওয়ার সুযোগ করে দাও, আমরা তোমাদের সাথে মারামারি করতে আসিনি, আমরা আমাদের জনশক্তিকে উদ্ধার করতে এসেছি। এমন সময় সন্ত্রাসীরা পুলিশের সামনে একটি ধারালো চাপাতি দিয়ে নোমানী ভাইয়ের মাথায় আঘাত করে। সেই আঘাত প্রতিহত করতে গেলে তার ডান হাতের বৃদ্ধ আঙ্গুলটি কেটে পড়ে যায়। দ্বিখন্ডিত হয়ে যায় মস্তক। মাটিতে লুটিয়ে পড়ে তার রক্তাক্ত শরীরটি। সেই রক্তাক্ত শরীরের ওপর তারা বিভিন্ন লাঠিসোটা দিয়ে উপর্যুপরি আঘাত করতে থাকে। তার দ্বিখন্ডিত মাথার ওপর লাঠি দিয়ে আঘাত করে মাথা থেকে মগজগুলো বের করে ফেলে। ছিটকে পড়ে শেরেবাংলা হলের মাটিতে শহীদ নোমানীর মাথার মগজের টুকরোগুলো। পুলিশ শুধু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দৃশ্যগুলো দেখছিলো। তারা ইচ্ছে করলে সেদিন নোমানীকে বাঁচাতে পারত। কিন্তু তারা মৃত্যু নিশ্চিত ভেবে সেখান থেকে চলে যায়। পড়ে থাকে শুধু নোমানীর রক্তাক্ত দেহটা। তখনও বেঁচেছিলেন নোমানী ভাই। শেরেবাংলা হলের ইমাম ও সেখানকার ডাইনিং কর্মচারী আলতাফ ভাই, নোমানী ভাইকে মেডিক্যালে নেয়ার জন্য হলের গেটে নিয়ে আসে এবং অ্যাম্বুলেন্সের জন্য চিৎকার করতে থাকে। কিন্তু সেখানে অনেক চিৎকার করেও একটা গাড়ি সংগ্রহ করে দিতে পারেনি কেউ। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ছিল নির্বাক ও নীরব। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এমন বিমাতাসুলভ আচরণ কেউ কখনো আশা করিনি। ইতিহাস তাদেরকেও কখনো ক্ষমা করবে না। তারা কেবল সরকারি ছাত্রসংগঠনের সন্ত্রাসীদের বাঁচানোর চেষ্টায় ব্যস্ত ছিল। দীর্ঘ এক ঘণ্টা পর নোমানী ভাইকে মেডিক্যালে নেয়া হয়। সেই মেডিক্যালে নেয়ার পথেই শরীফুজ্জামান নোমানী শাহাদাত বরণ করেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। নোমানী ভাইয়ের এই শাহাদাতের খবর পাওয়ার পর সেখানে অবস্থানরত সকলেই হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল। নেমে এলো এক শোকের ছায়া। কেউ কাউকে সান্ত্বনা দিতে পারছিল না। কেউই যেন নোমানী ভাইয়ের শাহাদাতকে মেনে নিতে পারছিলেন না। আমিও ধরে রাখতে পারলাম না অঝোরে ঝরে যাওয়া দুই চোখের অশ্রুকে। বারবার চেষ্টা করছিলাম, যতই চেষ্টা করি ততই কান্নার আবেগটা তীব্র হতে থাকে। এ সময় আমার বারবার মনে পড়ছিল নোমানী ভাইয়ের তাহাজ্জুদের নামাজের সেই মোনাজাতের কথাগুলো। শহীদ আইয়ুব ভাইয়ের কবর জিয়ারতের সময় তার মুখ থেকে উচ্চারিত শাহাদাতে তামান্নার বাণীগুলো। হলো না তার শহীদ আইয়ুব ভাইয়ের মায়ের হাতের খাবার খাওয়া। তার শাহাদাতের আকাক্সক্ষা এতই তীব্র ছিল যে, তার কাক্সিক্ষত মনজিলে পৌঁছাতে কোন বাধাই তার সামনে এসে দাঁড়াতে পারেনি। মহান আল্লাহ নিয়ে নিলেন তার বাগানের প্রিয় ফুলটিকে। শুধু বাংলাদেশে নয় গোটা পৃথিবীতে এই আন্দোলনের যে যেখানে ছিলেন সবাই কেঁদেছিলেন সেদিন। আমাদের মাঝ থেকে হারিয়ে ফেললাম শহীদ শরীফুজ্জামান নোমানীকে। আর কোনদিন হয়ত ফিরে পাবো না শহীদ নোমানী ভাইকে। তবে তার রেখে যাওয়া আদর্শ ও প্রেরণা পাথেয় হয়ে রবে আমাদের জীবনের প্রতিটা মুহূর্তে। নোমানী ভাইয়ের শাহাদাতে আমাদের হৃদয় যেমন ব্যথিত তেমনি আবার বুকে জ্বলে উঠেছিল দ্রোহের আগুন । আমরা কাজলা অক্টোমোড় দিয়ে চারুকারুর গেট দিয়ে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগকে ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত করে বিজয় মিছিল নিয়ে গোটা ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করে প্রধান ফটক দিয়ে বের হয়ে বিনোদপুরে এসে মিছিল শেষ করি। সেখানে তৎকালীন সভাপতি সাঈদী ভাইয়ের সংক্ষিপ্ত বক্তব্যের মধ্য দিয়ে শেষ হয় সেই দিনের ঘটনা। এর পর রাত্রের বিনোদপুরে জানাজার নামাজ শেষ করে শহীদের লাশ নিয়ে রওনা হই তার গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে।
জালিমের এই শাসনামলে হয়তোবা নোমানী হত্যার বিচার আমরা পাইনি, নোমানীর হত্যার বিচার দেখে যেতে পারেননি তার পিতা। ছেলে হত্যার বিচারের আশায় ব্যর্থ হয়ে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন তার পিতা। প্রায় তার পিতার সাথে আমার কথা হতো তার জীবনের একটাই আশা ছিল তার ছেলে হত্যার বিচার। দিনে-দুপুরে প্রকাশ্যে হত্যা করেও আসামিদের খালাস দিয়েছে জালিম সরকার। তবে এই বিচার একদিন হবে দুনিয়াতে ও আখিরাতে। সে প্রত্যাশায় চেয়ে আছেন তার মাসহ তার সহকর্মীরা। তোমরা ভেবেছ নোমানীকে হত্যা করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামী ছাত্রশিবিরের এই অগ্রযাত্রাকে স্তব্ধ করে দেবে? তা কোন দিনই পারবে না। এই ক্যাম্পাসকে রক্ষা করার জন্য এমন হাজারো নোমানী প্রস্তুত আছে। যারা তাদের রক্ত দিয়ে এই ক্যাম্পাস থেকে বাতিলকে উৎখাত করবে ইনশাআল্লাহ। আল্লাহতায়ালা শহীদ নোমানীকে শহীদ হিসেবে কবুল করুন। আমাদেরকে তার রেখে যাওয়া কাজ সমাপ্ত করার তৌফিক দান করুন ।

SHARE

Leave a Reply