শহীদ হাফেজ রমজান আলী প্রেরণার এক সুউচ্চ মিনার

মুহাম্মদ ওমর ফারুক..

‘আল্লাহর পথে যারা জীবন দিয়েছে তাদেরকে মৃত বলো না। প্রকৃতপক্ষে তারা জীবিত কিন্তু তাদের জীবন সম্পর্কে তোমাদের চেতনা নেই।’ (সূরা আল বাকারা : ১৫৪) অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, ‘যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়, তাদের মৃত মনে করো না। মূলত তারা জীবিত। নিজের প্রভুর কাছ থেকে তারা জীবিকা পায় প্রতিনিয়ত।’ (সূরা আল ইমরান : ১৬৯) পৃথিবীর বুকে যা কিছু আছে কোনো কিছুই চিরস্থায়ী নয়। পবিত্র কালামে পাকে আল্লাহ সুবহানাহতায়ালা বলেন, প্রত্যেক প্রাণীর মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।
শহীদদের মৃত্যু নেই। তারা মরেও অমর। আসমানি কিতাব নাজিলের ধারাবাহিকতা বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু আসমানি কিতাবের আলোকে জীবন রাঙিয়ে শাহাদাতের মর্যাদা লাভের দরজা বন্ধ হয়ে যায়নি। বাতিলের প্রাসাদে আঘাত হেনে তার ভিতকে কাঁপিয়ে দিতে পারে যে শহীদি তামান্না, তা এখনো জাগরুক দ্বীনি আন্দোলনের লক্ষ লক্ষ মুজাহিদের হৃদয় বন্দরে। মরু আরবের ধু ধু বালুচর থেকে যে খুনের নহর প্রবাহিত হয়েছে, তা আজ ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীর প্রান্তরে প্রান্তরে।
হযরত হামজা (রা) ও হযরত হানযালা (রা)-এর বুক চিরে যে স্রোতধারা প্লাবিত করেছিল আরবের বুকে লালিত পুঞ্জীভূত প্রতিম্বিত জাহেলিয়াতকে, সেটি আজ ইরান, তুরান, আফ্রিকা পার হয়ে আছড়ে পড়েছে দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ বাংলাদেশে। মুসলিম মিল্লাতের এক বিরাট দায়িত্ব মাথায় তুলে নিয়ে যারা আসহাবে রাসূলের জীবন চরিত্রের আলোকে, অনাগত ভবিষ্যতের জন্য দেশের তরুণ ছাত্রসমাজকে সৎ, দক্ষ, দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার জন্য দেশের প্রতিটি জনপদকে আলোকিত করার জন্য জ্বালিয়েছে আল হেরার রাজ তোরণ। দুনিয়ার মোহমায়া স্বার্থকে পায়ে দলে যারা এগিয়ে চলেছে লক্ষ্যপানে। সময়ের প্রতিটি বাঁকে বাঁকে যারা তৈরি করেছে প্রেরণার এক সুউচ্চ মিনার, তাদের একটিই পরিচয়Ñ তারা শহীদি কাফেলা বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের যাত্রী।
৯ মার্চ ২০০৯ কালের আবর্তনের একটি মুহূর্ত, একটি দিন। কিন্তু বাংলাদেশের ছাত্র ইসলামী আন্দোলনের জন্য একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিন। এই দিনের সকালবেলার সোনালি সূর্যোদয়ের ঝলমলে রৌদ্রোজ্জ্বল আলোর সাথে মিশে আছে শাহাদাতের পবিত্র উৎসর্গকারী, শহীদদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত জান্নাতের খোশব। ৯ মার্চের ইথারের মাঝে কান পাতলে শোনা যাবে একদিক থেকে ফেরাউন, নমরূদ, আবু জাহেল, আবু লাহাবের উত্তরসূরিদের দুনিয়া কাঁপানো হুঙ্কার আর অন্য দিকে শোনা যাবে হযরত মূসা (আ), হযরত ইবরাহিম (আ) আর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর অনুসারীদের জীবন বাজি রেখে দ্বীনের মশাল প্রজ্বলিত আর অনির্বাপিত রাখার ইস্পাতসম প্রত্যয়।
এটি ছিল বেদনাবিধুর রক্তাক্ত স্রোতের বন্যা। বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নতুন কারবালা। হালাকু খান এবং চেঙ্গিস খানের জঘন্যতম বর্বরতার এক চূড়ান্ত দলিল। যেই নির্মমতা হার মানায় আইয়্যামে জাহেলিয়াতকে। জালেমদের জুলুম সেদিন লাল রক্তের ফোয়ারায় রঞ্জিত হয়। জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জের দিঘলকান্দীর জমি। চিরহরিতের সমারোহ গাছপালা, শত লতাপাতা এবং নির্বাক ইটপাথরের দেয়ালগুলো এখন তার স্বাক্ষর বহন করে চলেছে। সে বীভৎসতায় থমকে দাঁড়িয়েছিল আকাশের মেঘলা। গতিবেগ পরিবর্তন হয়েছিল বাতাসের। কেঁপেছিল আল্লাহর আরশ কিন্তু কাঁপেনি নরঘাতক দেওয়ানগঞ্জের মানুষ নামধারী নরপশুদের হৃদয় আওয়ামী যুবলীগ ছাত্র নামধারী ছাত্রলীগের সেই সকল পশুর পাষাণ হৃদয়।
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দ্বীনকে বিজয়ী করার প্রত্যয়ে যারা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ তাদের চলারপথ নিঃসন্দেহে বর্ণনাতীত কঠিন। এই কাঠিন্যের মাপকাঠি দিয়ে মহান প্রভু তার অতিপ্রিয় বান্দাদের বাছাই করে নেন। কিছু বান্দার জীবনকে কবুল করে নিয়ে একটি আদর্শ দুনিয়ার মানুষের জন্য তৈরি করেন সত্যের সাক্ষ্যরূপে। শহীদ ভাইদের স্মৃতি আমাদের অনুপ্রাণিত করে। পথ চলতে যখন নানা মোহ, ভীতি আশঙ্কা আমাদের পথ আগলে দেয় তখন হৃদয়ে অমর হয়ে থাকে শহীদদের স্মৃতি, আমাদের মনে আশার দীপশিখা জ্বালায়। আমার ব্যক্তিগতভাবে কোন শহীদ ভাইয়ের সাথে পরিচয় ছিল না। কিন্তু শহীদ ভাইদের জীবনী আমার হৃদয়কে খুব বেশি উদ্বেলিত করে। তাদের চরিত্রের সাথে নিজেকে মিলিয়ে পার্থক্য করি আর অশ্র“সিক্ত নয়নে করি অনুশোচনা।
সে দিন কী ঘটেছিল
১ মার্চ ২০০৯ সাল। জামালপুর জেলার দেওয়াগঞ্জ উপজেলার সব কিছুই নিয়ম মতো বহমান। প্রকৃতি তার স্বাভাবিক নিয়মে সৌন্দর্যকে তুলতে ব্যস্ত। আকাশের পাখিগুলো উন্মুক্ত মনে ডানা মেলে উড়ছে। হঠাৎ এক কালবৈশাখীর ঝড়ে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল স্বাভাবিক প্রকৃতি, শহীদ হাফেজ রমজান আলী মায়ের কাছ থেকে দোয়া নিয়ে সাথীদের জন্য দোয়া নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে সাথীদের সাথে কথা বলে। তার যাওয়ার কথা ছিল বাহাদুরাবাদের সিনিয়র আলিম মাদরাসায় কিশোরকণ্ঠ পাঠক ফোরামের উদ্যোগে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে। কিন্তু তার আগেই তার মোবাইলে একটি রিং বেজেছিল, সেই ফোনটি ছিল তার একজন কর্মীর- তাকে রেলস্টেশন যেতে হবে। তারপর সে তার কাছে পাওনার হিসাব তালিকা করে দিয়ে দেয় আমি যদি আর ফিরে আসতে না পারি তাহলে পাওনাগুলো দিয়ে দিতে বলে। রেলস্টেশন যাওয়ার পরপরই আওয়ামী সন্ত্রাসীরা অপহরণ করে নিয়ে যায় দিঘলকান্দিতে এবং তার ওপর নির্মম নির্যাতন চালায়। তারপর তাকে বলে তোর জীবনের শেষ চাওয়া কী? শহীদ হাফেজ রমজান আলী বলেছিলেন আমার শেষ চাওয়া হলো আল্লাহর পথে শহীদ হওয়া এবং তার আগে দুই রাকাত নামাজ আদায় করা। একটি ঘটনা উল্লেখ করি- মক্কার অলিগলি ঢেরা পেটানোর শব্দ হযরত খোবাইব (রা)কে হত্যা করা হবে, তাকে শূলে চড়ানো হবে। তোমরা কি খুবাইবকে দেখতে চাও? তাহলে তোমরা ময়দানে এসো। হযরত খুবাইব (রা)কে ময়দানে নিয়ে যাওয়া হলো। তাকে শূলে চড়িয়ে হত্যা করার আগে তাকে বলা হলো, তোমার জীবনের শেষ ইচ্ছা কী? হযরত খুবাইব (রা) বললেন, দুই রাকাত নামাজ আদায় করা। তাকে নামাজের জন্য সময় দেয়া হলো। হযরত খুবাইব (রা) নামাজ শেষ করে বললেন, আল্লাহর কসম কাফেররা যদি না মনে করত যে, আমি মৃত্যুর ভয়ে নামাজে দেরি করছি তা হলে আমি নামাজ আরো দীর্ঘ করতাম। ঠিক সেভাবে হাফেজ রমজান আলী বলেছিলেন সন্ত্রাসীরা যদি না মনে করতো যে আমি মৃত্যুর ভয়ে নামাজ দীর্ঘ করছি তা হলে আমি নামাজ আরো  দীর্ঘ করতাম। নামাজ শেষ করার পর শহীদ হাফেজ রমজান আলীকে কসাইয়ের ছুরি, চাইনিজ কুড়াল, রামদা ও কিরিচ দিয়ে একের পর এক যখম করতে থাকে এবং অমানুষিক নির্যাতন চালাতে থাকে। এক সময় হাফেজ রমজান আলী জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন, সন্ত্রাসীরা মনে করে রমজান আর জীবিত নেই এই ভেবে আহতাবস্থায় রাস্তার পাশে রেখে যায়। খবর পাওয়ার পর সাবেক জেলা সেক্রেটারিসহ কয়েকজন ভাই ঘটনাস্থলে গিয়ে হাজির হন। শত শত মানুষের ভিড়, শত কথা। হাফেজ রমজান আলীর মুখে একই কথা- আল্লাহু আকবার এবং কালিমা লাইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা)। তৎক্ষণাৎ অ্যাম্বুলেন্সে উঠিয়ে হাসপাতালে আনার পথে অল্পক্ষণ পরই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে শাহাদাত বরণ করেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। সন্ত্রাসীরা কী পৈশাচিক কায়দায় হত্যা করেছে! আমি বিবেকবান দেশবাসী ও ছাত্রসমাজের কাছে প্রশ্ন রাখতে চাই- কী অপরাধ ছিল শহীদ হাফেজ রমজান আলীর? অপরাধ কি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া, সবার সাথে সুন্দর আচরণ করা? মুসলমান পরিচয় বহন করা? হাফেজ রমজান আলী দেওয়াগঞ্জ সাথী শাখার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে সংগঠনের কাজের জন্য পাগলপাড়া হয়েছিলেন। নিজের কাজের চেয়েও, পারিবারিক কাজের চেয়েও সংগঠনের কাজকে বড় করে দেখতেন। প্রতিদিন ফজর নামাজের পরই বেরিয়ে যেতেন দাওয়াতি কাজের জন্য। প্রতিদিন নতুন নতুন ছাত্রের কাছে নামাজের দাওয়াত নিয়ে হাজির হতেন।
বাংলাদেশ সরকারের কাছে আমাদের দাবি হলো- শহীদ হাফেজ রমজান আলীর খুনিদের গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া। আপনারা যদি বিচার না করেন আমাদের বিচার করার ক্ষমতা নেই। আমরা আল্লাহ তায়ালার কাছে বিচার পাবো ইনশাআল্লাহ।

আমি ভাই হয়ে জাতির কাছে ও বাংলাদেশ সরকারের কাছে দাবি রাখতে চাই- আর যেনো কাউকে আমার মতো ভাই হারাতে না হয়। আর কোনো পিতা-মাতাকে সন্তান হারাতে না হয়। বৃদ্ধ পিতার ছোট ছেলের কফিন কাঁধে নিতে না হয়। জাতির বিবেকবান যুবসমাজের কাছে প্রশ্ন একটাই- কেন হাফেজ রমজান আলীকে নির্মমভাবে হত্যা করা হলো? শহীদ হাফেজ রমজান আলীকে হত্যা করার মাধ্যমে ইসলামের আলোকে নিভিয়ে দিতে চেয়েছিল কিন্তু আল্লাহ তায়ালা তাঁর নূরকে প্রজ্বলিত করবেন যতই কাফেররা অপছন্দ করুক না কেন।
লেখক : শহীদ হাফেজ রমজান
আলীর বড়ভাই

SHARE

Leave a Reply