শান্তি কোথায়? কুরআনেই মুস্তাফা জামান আব্বাসী

তালেবান ক্যাম্পে এসেছে নতুন প্রশিক্ষণার্থীরা। কিভাবে তাদের ভালোবাসতে হবে তার প্রশিক্ষণ নয়। কিভাবে মানুষ মারা যায় তার প্রশিক্ষণ, কুরআনের উল্টো শিক্ষা। কোথা থেকে ছুটে এল কিছু পায়রা। প্রশিক্ষক তাদের শেখালেন কিভাবে শান্তির পায়রা হতে পারে পরাস্তু। রক্তাক্ত হলো প্রশিক্ষণ শিবির।

নানা প্রান্তেই আজ রক্তের মিছিল। বড় মাঝারি ছোট। সবখানেই অস্ত্রের জয় জয়-কার। কিভাবে মানুষ মারা যায় তারই প্রশিক্ষণ চলছে বেড়ার এধারে ওধারে। মানচিত্রের যে কোন দিকেই তাকাই, রক্ত আর রক্ত। কাউকে সহ্য করতে পারছি না। প্রথমে ধর্মের কারণে, পরে আধিপত্য বিস্তার। যখন মানুষ সৃষ্টি করলেন আল্লাহ্, ফেরেশ্তারা বললেন, তোমার এবাদত করব আমরাই, অন্যের প্রয়োজন হবে না। আল্লাহ্ বললেন: যা আমি জানি, তোমরা তা জান না। এক পর্যায়ে আদমকে আদেশ দিলেন: ‘নেমে যাও ঐ মাটির পৃথিবীতে। ওখানে থাকবে একে অপরের শত্রু হিসেবে’।

তাহলে এইই বিধির লিখন। খণ্ডাবার কি কোন উপায় নেই?

মানুষের মধ্যে ঐক্যের বাণী প্রচার করি যারা, তারা কি মনে প্রাণে মানুষের ঐক্যে বিশ্বাস স্থাপন করিনি? যদি না করি সংঘাত কোনদিন থামবে না। প্রভুর কাছে সেটাই আমাদের পরীক্ষা। আমরা কতখানি মানুষ, কতখানি পশু। যদি মানুষকে হত্যা করি অকারণে, তা হলে আমি পশু। যদি সহ্য করি, তা হলেই মানুষ। তা হলে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা সহ্যের পরীক্ষা। প্রতিদিন প্রত্যক্ষ করি মানুষে মানুষে হিংসা। পাকিস্তানে, ভারতে, বাংলাদেশে ও বর্মার সীমান্তেও।

পৃথিবীতে কত মানুষ যুদ্ধে মৃত্যুবরণ করেছে তার ইতিহাস কেউ রাখেনি ‘ফ্রি এনসাইক্লোপিডিয়া’ জানাচ্ছে কিছু সংখ্যা।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে প্রাণ দিয়েছেন ছয় কোটি থেকে সাড়ে আট কোটি। প্রথম মহাযুদ্ধে প্রাণ দিয়েছেন দু’কোটি থেকে দশ কোটি। এর মধ্যে আমাদের লোকও আছে। কত যুদ্ধের নাম করব? মোঙ্গলদের যুদ্ধে চার কোটি থেকে সাত কোটি। চীনের যুদ্ধে সাড়ে তিন কোটি থেকে চার কোটি। নতুন যুদ্ধগুলোতে যেমন কোরিয়ান যুদ্ধে বারো লক্ষ। ইরান ইরাক যুদ্ধে দশ লক্ষ। সোভিয়েত আফগানিস্তান যুদ্ধে নয় লক্ষ থেকে এক কোটি বাইশ লক্ষ। ভিয়েতনাম যুদ্ধে আট লক্ষ থেকে আটত্রিশ লক্ষ। আমেরিকানরা কত লোক মেরেছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে তার কোন সঠিক পরিসংখ্যন কেউ দিতে পারবে না। এই সংখ্যাগুলো পাঠ করার সময় আমাদের অনুভূতি কাজ করে না, কারণ আমরা মানুষের মৃত্যুকে ততক্ষণ অনুধাবন করি না, ততক্ষণ তা আমাদের নিজের সামনে এসে ধরা দেয়। কুমিল্লায় যে ওয়ার সিমিটারি আছে সেখানে কয়েকবার গিয়েছি। ব্রিটিশ সরকার সেগুলোতে মালি লাগিয়ে ফুল দেয় পরিচর্যা করে। অবাক হয়ে দেখি ওখানে আছে আমাদের দেশের অনেক মুসলমানদের নাম, অনেক হিন্দুদের নাম, অনেক বৌদ্ধদের নাম। ওরা কেন প্রাণ দিল? কার স্বার্থে? ওরা ছিল ব্রিটিশদের গোলাম। তাই কি ওরা প্রাণ দিল? ওদের প্রাণ কি বিফলে গেল না? কারণ ব্রিটিশরাই ছিল আমাদের শত্রু। তাই ব্রিটিশদের পক্ষে যুদ্ধ করে প্রাণ দেয়া কি গৌরবের, না গ্লানি মাখা। ভারত-পাকিস্তান বিভক্তির আগে যে লক্ষ লক্ষ লোক সাম্প্রদায়িক হত্যায় প্রাণ দিল তার কথা কি আমরা ভাবি? গত পঞ্চাশ বছরে ভারতে যে লক্ষ লক্ষ মুসলমান প্রাণ দিল। বিশেষ করে হায়দ্রাবাদ ও কাশ্মীরে তার কথা কি আমরা ভুলে যাবো? ভ্রাতৃ হত্যায় যারা বাঙালি মুসলমান ও হিন্দুকে হত্যা করল একাত্তর সনে, তাদের কথা কি আমরা ভুলে যাবো? আমাদের স্বাধীনতার মূল মন্ত্র তা হলে কী?

এ নিয়ে ভাবতে হবে। শত্রু-মিত্র চিনতে হবে। গোলামি বিসর্জন দিয়েছি, গোলামিতে নেই মর্যাদা। অসত্যের কাছে মাথা নত করব না। পশ্চিমি সভ্যতা আমাদেরকে সাহায্য করতে চায়, না দমিয়ে রাখতে চায় তা নিয়ে ভাবতে হবে। এইখানে আসতেই হবে কুরআনের কাছে:

কুরআন শরিফের সূত্র নববিজ্ঞানীরা নতুন করে আবিষ্কারে রত। বিশ্বাস থেকে নয়, বরং অবিশ্বাস থেকে। ‘রিজন বনাম ম্যাটার’ (ৎবধংড়হ াবৎংঁং সধঃঃবৎ) নিয়ে আমেরিকার ক্যামব্রিজে চলছে গবেষণা। ওয়ার্ল্ড ফেনোমোলজিক্যাল ইনস্টিটিউটের গবেষণায় আকাশ গ্রহ-নক্ষত্রের সৃষ্টি বিবর্তনই নয়, চলছে জীবন ও মৃত্যুর দোলাচলের আবর্ত। গবেষণার ফলাফলে কুরআনের কথা ঘুরে ফিরে এসেছে, যদিও তারা কুরআনের সমর্থক নন। জীবনের রহস্য যদি হয় ‘কার্বন’-এর সঙ্গে ‘মলিকিউল’-এর মিশ্রণ, মৃত্যু জীবনের শেষ নয়। এর একটি পর্যায়, বাইওসেনট্রিজম (নরড়পবহঃৎরংস)-এর নতুন থিউরি প্রণিধানযোগ্য। যারা এ সম্পর্কে জ্ঞান আহরণ করতে আগ্রহী তাদের জন্যে রয়েছে ‘রবার্ট ল্যাঞ্জার’-এর বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ গুচ্ছ, যা পৃথিবীতে সাড়া জাগিয়েছে। (তার লেখা ওং ফবধঃয ধহ রষষঁংরড়হ? ঊারফবহপব ংঁমমবংঃং ফবধঃয রংহ’ঃ ঃযব বহফ) এক জীবন থেকে আরেক জীবন, অর্থাৎ আমরা কেউ মৃত হব না। বৈজ্ঞানিকরা আবিষ্কার করেছে যে ‘ফোটন’-এর কাছে আছে সে তথ্য যা পূর্বনির্ধারিত, যার নাম আল্লাহ্ দিয়েছেন ‘কিতাবুল হাফিজ’, অর্থাৎ সংরক্ষিত গ্রন্থ। সব তথ্য এখানে আগে থেকে জমাকৃত। স্মরণ করি সূরা রাহমানের আয়াত: ‘ফাবিআইয়িআলা ই রাব্বিকুমা তুকাজ্জিবান’ অর্থাৎ তোমরা রবের কোন নিদর্শনকে অস্বীকার করবে? (৫৫:৭৫), যা এসেছে ২৯ বার।

রহস্যঘেরা পৃথিবী, গভীর রহস্যে আবৃত মানবদেহ ও মন, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ। বিজ্ঞান আবিষ্কার করেছে খানিকটা, সিংহভাগ অনাবিষ্কৃত। সবচেয়ে রহস্যের আধার আল্লাহ্। বিজ্ঞান বা বিশ্বাস যে দিকেই যান, মূলে থাকতে হবে একটি ‘প্রেমিস’। না হলে অনুসন্ধান এগুবে না।

ঈমানের বা বিশ্বাসের খুঁটি যতখানি মজবুত, অবিশ্বাসের কাছে তা ততখানি ভঙ্গুর। প্রকৃতিকেই কেউ কেউ ঈশ্বর বলে শনাক্ত করেছেন। ঈশ্বর অথবা তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আধ্যাত্ম জগৎ বলে কিছু নেই, ‘থিইজম’ অর্থাৎ ঈশ্বরের অস্তিত্ব, ‘এথেইজম’ ঈশ্বরের অনবস্থিতি, পৃথিবী সৃষ্টির জন্যে নেই প্রয়োজন ঈশ্বরের অথবা কোন গ্রন্থের। জীবন পরিচালনার জন্য মনুষ্য প্রস্তুত নৈতিক মূল্যবোধ প্রস্তুত, যা নিয়ে জীবন গড়িয়ে যাবে আপাত স্বাচ্ছন্দ্যে। ইউরোপ ধর্ম থেকে সরে এসেছে। ধর্মের অনুশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে বিবাহ ব্যবস্থা সন্তান উৎপাদন, সমলিঙ্গ বিবাহ, নিজের ইচ্ছেমত জীবনযাপন, সবকিছুই এ পার্থিব জীবন উদ্যাপনের ব্যবস্থা নিজেরাই করে ফেলেছে। জীবন বল্গাহীন হরিণের স্রােতে, ঈশ্বর জীবন থেকে পালিয়ে গেছে জানালা দিয়ে। বলছে: ধর্মের ভিত্তি নড়বড়ে, ধর্ম বুদ্ধিহীনদের করায়ত্ত, যাদের ধর্মবিশ্বাস ছিল এককালে, তারা তা হারিয়ে ফেলেছে, তারা ধর্মহীন সংস্কৃতির অনায়াস বিস্তৃতিতে আবদ্ধ, ধর্ম তাদের জীবনে কোন মহত্তই বয়ে আনতে পারেনি। এদের মধ্যে কেউ সেকিউলারিস্ট, যাদের কাছে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও ধর্মের কথা মূল্যহীন। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা দু’দিক সামলে চলেন অর্থাৎ না ঈশ্বরবাদী না নিরীশ্বরবাদী। ইহুদি খ্রিষ্টানদের অনেকেই আধুনিক জীবনের বৃত্তে ক্যারিয়ারকেই জীবন ধর্ম বলে মেনেছেন; যিশু একদিনের জন্যে, যখন গির্জায় ঘণ্টা বেজে ওঠে, বাইবেলের ধার ধারেন না তারা। ‘এথেইস্ট’-রা ধর্ম না মানলেও নৈতিকতাকে অবহেলা করেন না তারা।

বৈজ্ঞানিক ইব্রাহিম আবু হারব-এর ‘প্রবাবিলিটি অব ম্যাক্রো ইভোলিউশন’ প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়েছে ২৬শে আগস্ট, ২০১৩। পড়ে চমৎকৃত। যারা এটি পাঠ করবেন তাদেরও কিঞ্চিৎ মাথা ঘুরে যেতে পারে, কারণ জেনেটিক্সের রাজ্যে এটি একটি সবচেয়ে বড় সংবাদ, যা ক্ষুদ্র ইভোলিউশন থিওরির সবকিছু নতুনভাবে নির্ণয় করছে, অর্থাৎ আপনাআপনি যে জগৎ সৃষ্ট হচ্ছে তার মূল চাবিকাঠি ম্যাক্রো ইভোলিউশনের মধ্যে। ইভোলিউশন থিওরি বলছে যে সৃষ্টির সঙ্গে সংযুক্ত যা তা সে আদিম যুগ থেকেই একটি প্রাণ বিন্দু থেকে অর্থাৎ ‘প্রক্যারিওটস’-এর সা¤্রাজ্য থেকে উৎপাদিত, যার মূল একই। মানুষের প্রাণ বিন্দু অর্থাৎ শুক্রবিন্দুতে আছে তিন শ’ কোটি কেমিক্যাল নিউক্লিওটাইডস যা জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্ট (এ.সি.টি.জি.) এর মধ্যে ৩৪ মিলিয়ন নিউক্লিওটাইডস প্রয়োজন প্রোটিন তৈরি করার জন্যে, যা প্রতিটি জীবনের জন্য অত্যাবশ্যকীয়। প্রোটিন তৈরি হয় অ্যামিনো এ্যাসিড দিয়ে। একটি জীবন্ত প্রাণের জন্যে তাহলে প্রয়োজন লক্ষ লক্ষ নিউক্লিওটাইডস্ যা চারটি অক্ষরের সমষ্টি। যা তৈরি হবে, ধরা যাক, ব্যাকটেরিয়া, একটি বৃক্ষ, একটি মশা, একটি মাছ অথবা একটি মানুষ। তার জন্যে প্রয়োজন এ কোডিং-এর যার মানবিক উপাদান অর্থাৎ কোডম থেকে তৈরি হবে সৃষ্টি। কিভাবে মানবিক শুক্র উৎপাদিত তার রহস্য অনেকখানি প্রস্তুত এ প্রবন্ধে। এর থেকে পাওয়া যাচ্ছে যে সৃষ্টির আবর্তে প্রথম দিন থেকেই এ সৃষ্টি ধারাবাহিকভাবে সৃষ্ট এবং এর আছে বৈজ্ঞানিক নিয়মানুবর্তিতা। কোনটাই আপনাআপনি নিয়ম বহির্ভূত ভাবে সৃষ্ট নয়। ডক্টর এম এস হক জানাচ্ছেন যে, ডি.এন.এ সৃষ্টিতে বংশের ধারায় প্রবাহিত রক্ত কণিকা পরম্পরা সৃষ্টিতে অনেক অবদান রেখে চলেছে। ইভোলিউশন থিওরির প্রবক্তারা বলছেন: এটি সৃষ্ট প্রাকৃতিক নিয়মে। এর ব্যাখ্যা করেছি আমার মত করে। তা হলো:

কুরআনে আল্লাহ্ বলছেন:

আমিই সৃষ্টি করেছি, আপনা আপনি নয়।
যারা আমাকে বিশ্বাস করবে, তাদের ‘প্রেমিস’: ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্’, আল্লাহ্ ছাড়া কোন উপাস্য নেই। আমি আছি, ছিলাম, থাকব, বিশ্বাস কর, আর নাই কর।
বিশ্বাস না করলে, নেই জবরদস্তি। অপেক্ষমাণ কালগহ্বরে নিকৃষ্টতম শাস্তি। তাই কি চাও?
পথ চিনে নেয়ার দায়িত্ব তোমার।
‘স্পষ্ট জ্যোতি’ তোমার সামনেই।
‘আন্ কারিব’। এস আমার কাছে। আমি তোমার অভিভাবক।

নিজ কলবে অর্থাৎ ‘র্সিহে’, ‘আল্লাহ্’ শব্দটি ধ্বনির তরঙ্গ সৃষ্টির মাধ্যমে পরিচয় হবে দৃঢ়। করুণাময়ের বিগলিত ধারা অন্তর মাঝে এসে উপস্থিত হয় মুহূর্তে বাঁধভাঙা বন্যাস্রােতের মত, হৃদয়ের একূল ওকূল দেখা যায় না। অপেক্ষার পর অপেক্ষা, ধৈর্যের পরীক্ষা, এ বুঝি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া আর হলো না। যখন প্রহর এল প্রতীক্ষা শেষের, তখন খানিকটা আনন্দের প্রাপ্তি। আল্লাহ্ আমাকে ক্ষমা করুন।

মানুষ ক্ষয় হয়েছে যুদ্ধে একি তা হলে বিধির বিধান? শান্তির অমিয় বাণী তা হলে মিথ্যা? শান্তি হবে না পৃথিবীতে? মজলুমরা চিরদিন নির্যাতিত হয়েই চলবে, কুরআন তা বলে না।
লেখক : সাহিত্য-সঙ্গীত ব্যক্তিত্ব

SHARE

Leave a Reply