শার্লি হেবদোর ইসলামবিদ্বেষ ও ফ্রান্সের ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতি

হাসানুজ্জামান হাসান

Internationalফ্রান্সের বিতর্কিত শার্লি হেবদো ম্যাগাজিনের কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে অন্তত ১২ জনকে হত্যা করেছে তিনজন অস্ত্রধারী। হামলা যারা করেছে তারা খোদ ফরাসি নাগরিক এবং সেখানেই তাদের বেড়ে ওঠা। তবে তাদের একটা ধর্মীয় পরিচয় রয়েছে, তারা মুসলিম। এই ঘটনা সমগ্র ইউরোপীয় সমাজকে দুই মেরুতে বিভক্ত করেছে। একদিকে বলা হচ্ছে গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, অন্যদিকে জোর করে ট্যাগ দেয়া কথিত ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদ ও মৌলবাদীকরণ। ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী ম্যানুয়েল ভালস বলেছেন, ‘দেশ এখন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। তার ভাষায়, ‘‘It is a war against terrorism, against jihadism, against radical Islam, against everything that is aimed at breaking fraternity, freedom, solidarity.’
গত ৭ জানুয়ারি হামলার সাদামাটা বিচার করলে বলা যায়, এটা একটা হত্যাকান্ড আর যেকোনো হত্যাকান্ডই নিন্দনীয় ও প্রতিবাদযোগ্য। খেয়াল করার বিষয়, এই হত্যাকান্ডের প্রথম শিকার একজন মুসলিম পুলিশ কর্মকর্তা, যিনি শার্লি হেবদো অফিসের নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন। অস্ত্রধারীরা প্রথমে তাকেই হত্যা করে। কিন্তু আহমেদ মেরাবাত (৪২) নামের এই নিহত মুসলিম পুলিশ পাশ্চাত্য মিডিয়ায় খুব একটা স্থান পায়নি। পাশ্চাত্য মিডিয়ার নীতিই এই যে, মুসলমানরা সংবাদের শিরোনাম হবে তখন, যখন তারা বন্দুকের পেছনে থাকে। বন্দুকের নলের মুখে পড়ে তাদের হাজার হাজার নারী-শিশু নিহত হলে তা আলোচনার যোগ্য নয়।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নামে বিদ্রƒপ ম্যাগাজিন শার্লি হেবদো অনবরত ইসলামের বিরুদ্ধে আক্রমণ চালিয়ে আসছে। ১৯৭০ সালে প্রতিষ্ঠিত এই পত্রিকা ‘হারা কিরি’ নামের আরেকটি পত্রিকার উত্তরাধিকারী। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট চার্লস দ্য গলের মৃত্যুর পর তাকে ব্যঙ্গ করে কার্টুন আঁকায় হারা কিরি ম্যাগাজিন নিষিদ্ধ করা হয়। ১৯৮১-৯২ অর্থাভাবে পত্রিকাটি বন্ধ থাকে। ২০০৬ সালে হজরত মুহাম্মদকে (সা) নিয়ে ড্যানিশ পত্রিকার ১২টি অবমাননাকর কার্টুন পুনর্মুদ্রণ করে বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের ক্ষিপ্ত করে তোলে। ২০১১ সালে আরেকটি কুৎসিত কার্টুন আঁকার পর পত্রিকা অফিসে হামলা হয়। এরপর থেকে এর প্রধান সম্পাদককে পুলিশি নিরাপত্তা দেয়া হয়। কার্টুনের ওই সংখ্যাটি চার লাখ কপি বিক্রি হয়। ২০১২ সালে মুহাম্মদ (সা) এর নগ্ন কার্টুন ছেপে মুসলমানদেরকে আঘাত করার অত্যন্ত ঘৃণ্য জিঘাংসা প্রকাশ করে।
জানা দরকার, এই কথিত স্বাধীনতা কিন্তু শার্লি হেবদো ইহুদি ধর্মের ক্ষেত্রে দেখাতে পারে না। ২০০৮ সালে মরিস সন ইহুদি ধর্মকে ইঙ্গিত করে একটি ক্যারিকেচার তৈরি করলে শার্লি হেবদোর সম্পাদক তাকে ক্ষমা চাইতে বলেন। এটা ফ্রান্সের আইনে ‘এন্টি সেমেটিক’। মরিস সন ক্ষমা চাইতে অস্বীকার করলে তাকে বহিষ্কার করা হয়। মুহাম্মদ (সা) এর কার্টুন প্রকাশের পর ড্যানিশ পত্রিকার জিলান পোস্ট জানিয়েছিলেন, তারা ইহুদি বা খ্রিস্টান ধর্ম নিয়ে এমন কার্টুন প্রকাশ করবে না। অর্থাৎ কেবল ইসলাম নিয়ে যা খুশি বলা যাবে, ইসলামের নবী মুহাম্মদকে (সা) গালাগালি করা যাবে, এতে কোনো সমস্যা নেই। এটা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা।
শার্লি হেবদোতে হামলার পর ফ্রান্স রাষ্ট্রীয়ভাবে যুদ্ধ ঘোষণা করলো ইসলামী উগ্রবাদের বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে শার্লি হেবদোর ইসলামবিদ্বেষকে সমর্থন করে গেল। ইউরোপের রাষ্ট্রপ্রধানদের নিয়ে প্রতিবাদ মিছিল করে ঘোষণা দেওয়া হলো, আমরাও শার্লি। অর্থাৎ শার্লির ঘৃণ্য ও উসকানিমূলক কাজকর্মকে আমরা ভালোবাসি ও সমর্থন করি। ফলস্বরূপ কিছুদিন পরই নতুন সংখ্যায় আবার মুহাম্মদ (সা) কে নিয়ে অবমাননাকর কার্টুন প্রকাশ করা হয়। মরিস সন সম্প্রতি বলেছেন, I’m not Charlie… I ‘m sin. I used to work for Charlie as a cartoonist. In 2009, I created a caricature showing Surkozy’s son converting to Judaism for financial reasons. Charlie asked me to apologize and I refused. Charlie fired me for ridiculing Judaism.

ধর্মরিপেক্ষতার নামে ফ্রান্সের রাষ্ট্রীয় ইসলামবিদ্বেষ মজ্জাগত। মতবাদ হিসেবে ধর্মনিরপেক্ষতা ক্রমেই চরম উগ্র ও মৌলবাদী হয়ে উঠেছে। তত্ত্বগতভাবে যতই মিষ্টি কথা শোনা যাক না কেন, ধর্মনিরপেক্ষতা চরিত্রগতভাবেই ধর্মবিদ্বেষী। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বলে, ধর্মনিরপেক্ষতা মানে রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে আলাদা করা (Separation of state and religion)। ব্যক্তিজীবনে কারো ধর্ম পালন করতে বাধা নেই। কিন্তু এই তত্ত্ব একটা ভন্ডামি ছাড়া আর কিছু নয়। সে কারণেই মুহাম্মদ সা:-এর বিরুদ্ধে কার্টুন আঁকতে রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা দিয়ে আবার ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলান্দ বলেছেন, তার  দেশ সব ধর্মকে সুরক্ষা দেবে। আচ্ছা, ধর্মকে সুরক্ষা দেওয়া বলতে কী বোঝায়? ধর্মনিরপেক্ষতার এই যে বৈশিষ্ট্য- ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষা করা তা এক ভাঁওতাবাজি ছাড়া আর কিছুই নয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান পড়তে গিয়ে সেক্যুলারিজম সম্পর্কে জেনেছি, ফ্রান্স ধর্মনিরপেক্ষতার সর্বোচ্চ মানদণ্ড (Hard Secularism) অনুসরণ করে। এর মূলকথা হচ্ছে, রাষ্ট্র সব ধর্ম থেকে সমান দূরত্ব বজায় রাখবে। কোনো ধর্মকে রাষ্ট্রীয় সুবিধা দেবে না। কিন্তু উগ্র ধর্মনিরপেক্ষ ফ্রান্স তার তত্ত্ব ও প্রয়োগের মধ্যে আকাশ পাতাল ব্যবধান বাস্তবে দেখিয়ে দিয়েছে। ফ্রান্সে মুসলিম মেয়েদের জন্য হিজাব নিষিদ্ধ করা তার অন্যতম প্রমাণ।
কয়েক মাস আগে ব্রিটেনের দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট এক খবরে জানিয়েছে, ফ্রান্সে বাচ্চাদের একটি স্কুল ক্যাফিটেরিয়ায় মুসলমানদের জন্য আলাদা খাবার রান্না করায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। জানা দরকার, ওই ক্যাফিটেরিয়ার প্রতিটি খাদ্যে শূকরের মাংসের উপাদান রয়েছে। বিকল্প খাবার না পাওয়ায় মুসলিম শিশুরা না খেয়েই থাকে। কর্তৃপক্ষের বক্তব্য হচ্ছে, ‘কোন ধর্মে কী নির্দেশনা রয়েছে তা আমাদের জানার বিষয় নয়। এখানকার নিয়ম মেনে চলতে হবে।’ অথচ সারকোজি সরকারের সময় ইহুদি ধর্মীয় দিবসের কারণে কয়েকটি স্কুলের পরীক্ষা পেছানোর জন্য স্বয়ং প্রেসিডেন্ট অনুরোধ করেছিলেন। এ খবর ফাঁস করেছিল ফরাসি লা পয়েন্ট পত্রিকা।
পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী সবচেয়ে বিভ্রান্তিকর ও বিপজ্জনক মতবাদ হচ্ছে ধর্মনিরপেক্ষতা। এই মতবাদ বলে, যে যার ধর্ম পালন করুক, সমস্যা নাই। সবার ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষা করাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব (Secularism seeks to ensure and protect freedom of religious belief and practice for all citizens.)। আবার একই সঙ্গে আইন করে ধর্মীয় আচার পালন নিষিদ্ধ করে। যুক্তি হচ্ছে, ধর্ম পাবলিক প্লেসে নয়। ধর্ম পালন কোন প্লেসে কিভাবে করতে হবে, তা তারাই ঠিক করে দেবে? ধার্মিকদের গোঁড়া চরমপন্থী ট্যাগ দিয়ে তারা নিজেরাই খোদা হয়ে বসে তাদের ধর্ম জনগণকে পালন করতে বলছে।
ফ্রান্সের পর কঠোর ধর্মনিরপেক্ষতা পালনকারী আরেক দেশ তুরস্ক। তবে দেশটির অবস্থা এখন অনেকটাই সহনীয়। একজন ধার্মিক  প্রেসিডেন্ট (এরদোগান) ক্ষমতায় এসে ঘোষণা দিয়েছেন, হিজাব পরতে কাউকে বাধ্য করা যাবে না, আবার কেউ পরতে চাইলে তাকে নিষেধ করা যাবে না। অন্যদিকে নরম ধর্মনিরপেক্ষতা (Soft Secularism) পালনকারী দেশ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত। এই ভার্সনের মূলকথা হচ্ছে, রাষ্ট্র সব ধর্মকে সহযোগিতা দেবে, ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও অবকাঠামোতে ফান্ডিং করবে। কিন্তু বাস্তবে কী ঘটছে তা তো স্পষ্ট।
যাই হোক, কথিত র‌্যাডিকাল ইসলামের বিরুদ্ধে ফ্রান্স যে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে তা পশ্চিমা আদর্শের দীর্ঘমেয়াদি ষড়যন্ত্রের অংশ। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে পুনর্বার রাসূলের কার্টুন প্রকাশের সিদ্ধান্ত তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে সন্দিহান করে তুলেছে। ফ্রান্সের শাসকরা শার্লি হেবদোর উসকানিমূলক কাজকে  নিবৃত্ত করার কোন পদক্ষেপই গ্রহণ করেনি। একদিকে তারা বহু সংস্কৃতিবাদের (Multi-culture) কথা বলে সব ধর্ম ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের কথা বলছে অন্যদিকে তারা নিকটতম সাংস্কৃতিক প্রতিবেশী মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়েই ক্ষান্ত হচ্ছে না, তাদের চরমপন্থা গ্রহণের দিকে  ঠেলে দিচ্ছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নামে হযরত মুহাম্মদকে (সা) নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক নগ্ন কার্টুন এঁকে, ক্যাপশন লিখে কোটি মুসলমানের হৃদয়কে খুন করা যদি কোনো অপরাধ না হয়, তবে অস্ত্রধারীরা হামলা করে কয়েকজনের হত্যা করতে কেন অপরাধ মনে করবে? ধর্মীয় মৌলবাদীদের হাতে যেহেতু ক্ষমতা আইন বা প্রশাসন নেই, তাই ধর্মনিরেপেক্ষ মৌলবাদীদের রুখতে তারা নিজেরাই আইন বানায়, অস্ত্র হাতে নেয়। কোনো আঘাতকারীই সমর্থনযোগ্য নয়- সেটা শারীরিক হোক, আর অনুভূতিগত হোক।
একটি পত্রিকার খবর অনুয়ায়ী, গত এক যুগের তথাকথিত সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে ইরাক, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ফিলিস্তিন, সিরিয়া ও আফ্রিকায় প্রায় ১২ মিলিয়ন মানুষ নিহত হয়েছেন কিন্তু শার্লি হেবদো পত্রিকায় সন্ত্রাসী হামলায় ১২ জন সংবাদকর্মী নিহত হওয়ার সংবাদটি ১২ মিলিয়ন মুসলমান নিহত হওয়ার চাইতে পশ্চিমা বিশ্বে বেশি গুরুত্ব লাভ করেছে এবং বেশি প্রতিক্রিয়া দেখানো হয়েছে। প্যারিসের শার্লি হেবদো পত্রিকায় নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাতে সেখানে বিশ্বের ৪০টি দেশের রাষ্ট্রনেতার উপস্থিতি ঘটেছিল। তারা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ফ্রান্সের পাশে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু গত অর্ধশত বছরে অথবা গত এক যুগে ইসরাইলি সামরিক হামলায় নিহত ফিলিস্তিনিদের রক্ষায় বিশ্বনেতাদের অনুরূপ ভূমিকায় কখনো দেখা যায়নি। আমরা যদি ধরে নেই, হাজার হাজার সাধারণ মানুষ হত্যার ঘটনার চেয়ে একসাথে ১২ জন সাংবাদিক হত্যা বেশি তাৎপর্যপূর্ণ ও নিন্দনীয়, তাহলে বলতে হয়, গত বছর ইসরাইলিদের গাজা আক্রমণের সময় অন্তত দেড় ডজন সাংবাদিককে হত্যা করেছে আইডিএফ।
আসলে পশ্চিমাদের সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের উদ্দেশ্য সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ নির্মূল করা নয়, বরং তার বিস্তার ঘটিয়ে পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদের পতন ঠেকাতে একটি ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি  তৈরি করা। সাম্রাজ্যবাদের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক গাইডলাইন হিসেবে একটি কল্পিত অথবা বাস্তব শত্রু প্রয়োজন। এই প্রয়োজনীয়তার পথ ধরেই রাজনীতির বুদ্ধিজীবীরা নিয়ে এসেছেন ‘সভ্যতার সংঘাত’র ধারণা। স্যামুয়েল পি হান্টিংটন তাই ইসলামকে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের অনিবার্য প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন। সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের পতনের পর অনেক কাঠ-খড় পুড়িয়ে, নানা প্লট সাজিয়ে, একযোগে সকল মূলধারার মিডিয়াকে কাজে লাগিয়ে পশ্চিমা সমাজে মুসলিমবিদ্বেষকে পাকাপোক্ত করা হয়েছে।
তবুও লাভ হচ্ছে না। ফরাসি সমাজে ইসলামের প্রসার লক্ষণীয় হয়ে উঠেছে। একটি ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠী হিসেবে সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে মুসলমানরা সেখানে শক্ত অবস্থান  তৈরি করে নিচ্ছে।  ইসলামোফোবিয়ার জুজু ছড়িয়ে দিলেও তাদের এসব কর্মকান্ড কার্যত কাউন্টার প্রোডাক্টিভ হয়েছে। ইউরোপের ডিএনএ-তে রয়েছে ইসলাম। গত দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে মুসলিম অভিবাসীর সংখ্যা আগের দশকের তুলনায় দ্বিগুণ বেড়েছে। জার্মানির পেজিডারা এখন তাই ইসলামবিরোধী সমাবেশের আয়োজন করে মুসলমানদের ঠেকাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। ইসলামের বিরুদ্ধে পশ্চিমা মিডিয়ায় যত বেশি প্রোপাগান্ডা হয়েছে, রাষ্ট্রশক্তিকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছে পশ্চিমা বিশ্বের সাদা চামড়ার খ্রিস্টধর্মাবলম্বী নাগরিকরা ততই ইসলামের শিক্ষার প্রতি আগ্রহী হয়েছে, অনেকেই কোরআন-হাদিস পড়ায় মনোনিবেশ করার মধ্য দিয়ে ইসলাম গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। শার্লি হেবদো পত্রিকায় হামলার পর প্যারিসে বিশ্বগণসংহতি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর ফ্রান্সের চলচ্চিত্র পরিচালক ইসাবেলা ম্যাটিক ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছেন। ইসাবেলা এটাও বলেছেন, ‘শার্লি হেবদো একটি কাল্পনিক চরিত্রকে ব্যঙ্গ করছে এবং চরিত্রটিকে একটি নাম দিয়েছে। সেই লোকটি আমাদের নবী নন।’ তিনি আরও বলেন, ‘যখন মুহাম্মদ (সা) মাত্র নব্যুয়তপ্রাপ্ত হয়েছিলেন আর অমুসলিমরা মুহাম্মদ (সা) এর ইসলামের দাওয়াতকে অস্বীকার করেছিল। মক্কাবাসী মুহাম্মদ (সা) কে নিয়ে হাসাহাসি করত ও তাঁকে মোদামেম (গালির পাত্র) বলে ডাকতো। মুহাম্মদ (সা) হাসতেন এবং বলতেন তারা মোদামেমকে নিয়ে ব্যঙ্গ করছে, আমাকে নিয়ে নয়।’ নওমুসলিম ইসাবেলা মুসলমানদের উদ্দেশে বলেন, ‘যেকোনো উসকানিতে কিভাবে জবাব দেয়া হয় সেখানেই বুদ্ধিমত্তার পরিচয় এবং আমাদের প্রিয় নবী (সা) আমাদের শিখিয়ে দিয়ে গেছেন। তাই শার্লি হেবদো যখন প্রকাশিত হবে, সেটাকে পাত্তা দিবেন না। তাদের উসকানিতে কান দেবেন না, উত্তর দিবেন না। তাদেরকে কোনো গুরত্ব দিবেন না।’
তারিক রামাদান বলেছেন, ‘এটা নবীর অপমানের প্রতিশোধ নয়, আমাদের ধর্ম, আমাদের মূল্যবোধ এবং ইসলামী নীতিনৈতিকতার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে। কারণ ওই হামলাকারী দুই ভাই সারা দুনিয়ার মুসলমানদের প্রতিনিধি নয়। রাসূলের ইজ্জত রক্ষা করার জন্য বারোজনকে মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত তাদের নিজেদের।’
শেষ করি ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদ উগ্র মৌলবাদী হয়ে ওঠার একটি গল্প দিয়ে। গল্পটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ফেরদৌস স্যারের কাছে শোনা। স্যারের ধর্মনিরপেক্ষ প্রগতিশীল বন্ধু মৌলবাদীদের এক হাত নিতে নিতে বললেন, ‘আমার স্ত্রীকে কখনো হিজাব পরতে দেবো না।’ স্যার বললেন, ‘এটা কেমন কথা! তার ইচ্ছা হলে পরবে, নাহলে পরবে না। তুমি তোমার সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেবে কেন? মৌলবাদী তো তুমি।’
ধর্মীয় মৌলবাদীদের চরমপন্থা থাকলেও ভন্ডামি নেই। ধর্মনিরপেক্ষতা চরিত্রগতভাবেই ধর্মবিদ্বেষী ভাঁওতাবাজ। ভবিষ্যৎ পৃথিবীর বড় সঙ্কট তাই ধর্মীয় মৌলবাদ নয়, ধর্মনিরপেক্ষ মৌলবাদ (Secular Fundamentalism)।
লেখক : সাংবাদিক

SHARE

Leave a Reply